সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৭
জাবিন ফোরকান
~হাজার কবিতা বেকার সবই তা~
তার কথা কেউ বলেনা
বন্ধুদের হাততালির জোর বাড়লো। গিটারের শব্দ চড়াও হলো। সঙ্গে ধ্বনিত হলো মিসিরের কন্ঠস্বর,
“সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা, সে প্রথম প্রেম আমার…”
“আহ!”
মিসির খেয়ালই করেননি কখন গাইতে গাইতে পা দুলিয়ে সে পিছনে এসে পড়েছে। পিঠের সঙ্গে কারো একটা ধাক্কা লাগতেই অবাক করা শব্দটিতে মিসিরের গান বন্ধ হয়ে গেল। চট করে ফিরে তাকাতেই ক্ষণিকের জন্য তার চোখের সামনে বুঝি দুনিয়া থমকে পড়ল।
দন্ডায়মান এক রমণী। দীঘল রেশমি চুলগুলো কপালের দুপাশে ছড়িয়ে আছে। পরনের ফ্রকজুড়ে ফুলের ছাপ তার নিষ্পাপতাকে বাড়িয়ে তুলেছে কয়েকগুণ। টানা টানা গভীর চোখদুটো মেলে অবাক নয়নে মিসিরের দিকে চেয়ে আছে। আহামরি চোখে লাগার মতন সুন্দরী কেউ নয়। অথচ মিসিরের দৃষ্টিতে তাকে মনে হলো যেন অপ্সরী।
“দেখেশুনে নড়াচড়া করতে পারেন না?”
মেয়েটি চোখ রাঙানি দিতেই মিসির বাস্তবতায় ফিরে এলো। পিছনে বন্ধুদের দলের গিটারের সুর ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
“দুঃখিত, আমি দেখতে পাইনি আপনি পিছন থেকে এগিয়ে আসছিলেন।”
মেয়েটি কিছু বললোনা। নিজের কাঁধের একপাশে ঝোলানো ব্যাগটি টেনে তুলে মিসিরের দিকে চেয়ে নিজের কাজে এগোলো। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় থমকে গিয়ে পিছনে ফিরে চাইলো। হতবাক মিসির এবার আবিষ্কার করলো, তার হাতঘড়ির সঙ্গে মেয়েটার পরনের জর্জেট ওড়নার অংশ আটকে গিয়েছে।
“ওওওওও!”
নেকড়ে দলের মতন বন্ধুর দল খেঁকিয়ে উঠতেই লজ্জায় মিসিরের গাল দুটো টকটকে হয়ে উঠল। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দ্রুত সে এগিয়ে গেলো মেয়েটির দিকে। ঘড়ি থেকে টেনেটুনে ওড়না খুলতে খুলতে বলে উঠলো,
“আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি!”
“আপনার ঘড়িরও দেখছি গায়ে পড়া স্বভাব।”
মেয়েটির মন্তব্যে মিসির দ্বিতীয় দফায় লাল টুকটুকে হয়ে উঠলো। নিজের ওড়না ফিরিয়ে নিয়ে মেয়েটি ঠোঁটে মোলায়েম এক হাসি মেখে তাকালো তার দিকে, অতঃপর বললো,
“গানটা কিন্তু খারাপ গান না।”
হৃদস্পন্দন থমকে যাওয়া বুঝি একেই বলে? মিসির নিঃশ্বাস প্রশ্বাসকেই ভুলে গেলো ক্ষণিকের জন্য। উল্টো ঘুরে গেলো মেয়েটি। তার অবয়বটি ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে দেখে বুকের ভেতরটা নিদারুণ এক টানে হাহাকার করে উঠলো। মিসির অজান্তেই কয়েক পা এগিয়ে গেলো, ডেকে উঠলো,
“আপনার নামটা, মিস?”
মিসির ভেবেছিল সে আর ফিরে তাকাবেনা। অথচ সে তাকালো। মাথা হেলিয়ে চাইতেই বায়ুর ঝাঁপটায় তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গেলো মুখে। আঙুলে সেসব সরিয়ে গভীর চোখে সে দেখলো মিসিরকে।
“আরওয়া। আপনি?”
বিস্তৃত হাসি ফুটলো মিসিরের চেহারায়।
“মিসির…”
“আলী?”
এবার শব্দ তুলে খিলখিল করে হাসলো মিসির, সঙ্গে হেসে উঠলো মেয়েটিও। পূবাকাশে উদিত হওয়া সূর্যের ন্যায় ওই হাসি রোশনাইয়ে সিক্ত করে তুললো মিসিরের অন্তর।
ঠিক গানের মতন করেই মিসিরের জীবনে সেদিন এসেছিল প্রথম প্রেম। তবে এই প্রথম প্রেমের নাম নীলাঞ্জনা নয়, আরওয়া।
নিজের অফিস কেবিনে বসে বহু বছর অতীতের স্মৃতিটুকু আজ মনে পড়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই। কিংবা হয়ত রয়েছে? মিসির জানেনা। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ জানালার বাইরে দিগন্তের দিকে। শীতের গোধূলী বিকেল, কমলাভ রশ্মিতে মাতোয়ারা চারিপাশ। আরওয়ার সবচেয়ে প্রিয় সময়। সেও কি একই রকমভাবে এই শহরের কোনো প্রান্তে বসে আজ আকাশ দেখছে?
আরওয়ার প্রতিটা পছন্দ, প্রতিটা ইচ্ছা – আকাঙ্ক্ষার কথা মিসির জানে। তবে, আরওয়া কি জানে? উঁহু। মেয়েটি এটাও হয়ত জানেনা, বাদামে অ্যালার্জি আছে মিসিরের। যেমনটা সে জানেনা, আজও তার পুরাতন ওয়ালেটের পকেটে রমণীর ফটোগ্রাফ তোলা আছে। মিসির চায়না আরওয়া জানুক। জেনেও বা কি হবে?
প্রথম প্রেম সারাটা জীবনভর একপাক্ষিক অধরা প্রেম হয়েই থেকে যাবে মিসিরের জীবনে।
জোরপূর্বক দিগন্ত থেকে দৃষ্টি হটিয়ে নিজের টেবিলে ফিরে এলো মিসির। স্তূপ করে রাখা ডকুমেন্টে মনোযোগ দিলো। মলিন হেসে নিজেকে নিজে বলল,
“গেট আ গ্রিপ, মিসির। এমনিতেই হুমায়ূনের মিসির আলীর দৌরাত্ম্যে জীবন ঝালাপালা, এবার কি শরৎচন্দ্রের দেবদাস হতে চাস?”
“স্যার?”
নমনীয় ডাকটি এলো দরজার বাহির থেকে। মাথা তুলে তাকাতেই মিসির দেখলো অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটি মুখ বাড়িয়ে তার দিকে চেয়ে আছে।
“হুম?”
“আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।”
মিসির ভ্রু কোঁচকালো। এমন সময়ে তার সঙ্গে কে দেখা করতে আসবে? কারো তো আসার কথা ছিলনা। এমন হুটহাট না জানিয়ে আসে কেবল জায়দান। কিন্তু তাকে তো অ্যাসিস্টেন্ট চেনে। নাম বলতো সে এসে থাকলে। তবে?
“কে? নাম জিজ্ঞেস করে…”
“মিসির?”
অতি পরিচিত কন্ঠস্বরটি মিসিরকে জমিয়ে দিলো, বরফের ন্যায়। অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটি ইতস্তত করে সরে দাঁড়াতেই তার পিছন থেকে ভেতরে প্রবেশ করলো আরওয়া। খয়েরী সালোয়ার কামিজ পরনে, হাতে ঝুলছে হ্যান্ডব্যাগ। মুখজুড়ে নির্মল চাহুনি।
নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো মিসির। এর আগে কোনোদিনও তার অফিসে আরওয়ার আগমন ঘটেনি। চোখ পিটপিট করে তাই মিসির শুধালো,
“তুমি?”
মৃদু হাসলো আরওয়া। কয়েক পা এগিয়ে এসে মোলায়েম গলায় বলে উঠলো,
“বসতে পারি?”
নিজের অন্তরকে শান্ত করতে খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হলো মিসিরের। অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটির দিকে আড়চোখে তাকাতেই ইশারা বুঝে সে দরজা আটকে চলে গেলো কেবিন থেকে। মিসির টেবিলের বিপরীত দিকের সোফার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
“বসো। চা কফি কিছু…”
“না না, ধন্যবাদ। আমি তোমার সঙ্গে কিছু ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।”
সোফায় বসে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে জানালো আরওয়া। মিসির অজান্তেই একটি ঢোক গিললো। অতঃপর বিপরীত দিকের সিঙ্গেল সোফায় বসে হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে বসে জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপারে কথা?”
আরওয়া খানিকটা সময় ইতস্তত করল। অতঃপর মাথা ঝেড়ে বলেই বসলো,
“তুমি প্রফেসর জায়দানের বন্ধু রাইট? তাকে একদম ছোটবেলা থেকে দেখছ।”
মিসিরের বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলোনা। ঠোঁটজুড়ে এক সূক্ষ্ম মলিন পরিহাসের হাসি ফুটলো তার। সোফায় খানিকটা হেলান দিয়ে একটি নিঃশ্বাস ফেলে উদাসী ভঙ্গিতে সে বলল,
“আমার কাছে জায়দানের ব্যাপারে জানতে চাও তুমি।”
আরওয়া মুখ খুলতে যাচ্ছিলো, তবে মিসির একটি আঙুল তুলে তাকে থমকে দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো, বরাবর রমণীর নয়নমাঝে। মুচকি হেসে জানালো,
“তোমার প্রশ্ন পর্ব শুরু করতে পারো। তবে একটা বিষয় মাথায় রেখো, তোমার কিছু না হওয়ার আগে আমি জায়দানের বন্ধু।”
নিজের প্রতি নিজে মুগ্ধ হওয়ার অনুভূতি কেমন আজ আমি তা জোরদারভাবে অনুভব করতে পারছি। আয়নায় নিজের প্রতিফলন আপন অন্তরকেই করে তুলেছে তৃপ্ত। সাদা শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট এবং কালো স্যুট। চুলগুলো লো পনিটেইল বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছি কাঁধে। ছোট ছোট চুলগুলো ছড়িয়ে আছে আমার কপালে। হালকা ন্যাচারাল মেকআপ এবং সুচারু মুখভঙ্গিতে নিজেকে নিজের কাছে ভীষণ দূর্ধর্ষ লাগছে। পুরোদস্তুর প্রস্তুত আমি জীবনের এক নব অধ্যায় প্রবেশের জন্য।
আজ দ্যা ভাইরাল পিৎজা স্টেশন—ক্যাফের উদ্বোধন। ১ তারিখ করার ইচ্ছা থাকলেও নানা কারণে খানিকটা পিছিয়ে আনতে হয়েছে। ব্লগার এবং ইনফ্লুয়েনসারদের জ্বালা যন্ত্রণায় সবটাই গোপনভাবে আয়োজন করেছি। অন্যথায় অস্থিরতা আর ভীড়েই ক্যাফে চাঙ্গে উঠে যেত। সে অনলাইনের বাসিন্দাগুলো পরে ভীড় করুক, তাদের আপ্যায়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া আছে আমার।
গতকাল রাতেই একান্তে মিলাদ পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। আজ সকাল থেকেই ক্যাফে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। এই সময়টা শুধু যারা ইনভাইটেশন পেয়েছে, তাদের জন্যই। আমার কয়েকজন এবং মীরার ভার্সিটির বেশ কতক বন্ধু – চেনাজানা ব্যক্তি এসেছে। কাজে নিয়োগ দেয়া পার্ট টাইমের যুবক ছেলেমেয়েগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে। কিচেনে ইতোমধ্যেই দুজন শেফ রান্নাবান্না শুরু করেছেন। প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে অতিথিদের হাসিমুখে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আমি। তবে আমার মন পড়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গায়। বারংবার চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখছি। কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে এখনো কোথাও দেখতে পাচ্ছিনা। তবে কি সে আসবেনা?
মীরা আজ আসতে পারেনি। গতকাল মিলাদে থাকলেও আজ হুট করে একটা ক্লাস টেস্ট পরে যাওয়ার কারণে এত প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও সে উপস্থিত হতে পারেনি। উদ্বোধনের দিন আর পেছানো সম্ভবপর ছিলনা বিধায় আজ আমাকে একাই সবকিছু সামলাতে হচ্ছে।
“আসসালামু আলাইকুম স্যার, ভেতরে আসুন।”
অদূর থেকে কণ্ঠটি কানে আসতেই ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ক্যাফের দরজা খুলে ভেতরে অতিথিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কাজে থাকা ইউনিফর্ম পরিহিত যুবতী। প্রবেশ করল ছ ফুটি দু দুজন ব্যক্তি। একজন আমার প্রাক্তন স্বামী, অপরজন প্রাক্তন দেবর।
নিজের চোখের সামনে ক্ষণিকের জন্য বুঝি পৃথিবীটা থমকে গেলো। নিষ্পলক চেয়ে থাকলাম। জায়দান সত্যিই এসেছে! আজকের পরিধান ফরমাল নয় বরং ক্যাজুয়াল। অফিস প্যান্টের উপর ফুলহাতা সোয়েটশার্ট, বুকের ডানপাশটায় শার্টের বোতামের মতন করে ফুটিয়ে তোলা ডিজাইন। চোখের চশমাটাও ফ্রেম বদলেছে, গোলাকৃতির, সোনালী। জায়দান সাধারণত এমন পোশাক পড়েনা। তাই তার পানে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইলাম আমি। দৃষ্টিসুমুখে যে পুরুষটিকে দেখতে পাচ্ছি, সে যে আমার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম, তাতে আমার আর কোনো সন্দেহ নেই।
আয়দানকে খুব বেশি নজরেই এলোনা। ছেলেটা কোনদিক গলে কোনদিকে চলে গেলো আমি খেয়াল করলাম না। প্রয়োজন নেই। আমার দৃষ্টি ওই একজনেই আবদ্ধ। জায়দান মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে চেয়ে শেষমেষ আমার দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ। স্পষ্টত দেখলাম, তার গভীর বাদামী নয়নজোড়া আমায় আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকাটা সমীচীন মনে হলোনা। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।
“ধন্যবাদ, এখানে আসার জন্য।”
না চাইতেও সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটল আমার ঠোঁটজুড়ে। জায়দান সেদিকে নিষ্পলক চেয়ে পরক্ষণে দ্রুতই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠল,
“তোমাকে আজ…অন্যরকম দেখাচ্ছে।”
থমকালাম। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে আরেক দফা নিজের অবয়ব পর্যবেক্ষণ করলাম।
“কেমন দেখাচ্ছে?”
“পাওয়ারফুল।”
জমে গেলাম। উষ্ণতা ছেয়ে গেল আমার দুই গালজুড়ে। রমণী মাত্রই প্রশংসার কাঙাল। তবে বিউটিফুলের চাইতে পাওয়ারফুল শোনায় যে এতটা সুখ, কে জানতো? নারীরা দূর্বল হিসাবেই আখ্যায়িত সমাজে। সেক্ষেত্রে তাদের শুধুমাত্র সৌন্দর্যের দাঁড়িপাল্লায় না মেপে ক্ষমতাবান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করলে অনুভূতিটা চমৎকার হয়। আমার হাসিটা তাই বিস্তৃত হলো। নিজের স্যুটের কলার খানিকটা টেনে বললাম,
“থ্যাঙ্কস।”
“তোমার ব্যবসার জন্য শুভকামনা।”
জায়দান একটি ছোট গিফট ব্যাগ আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। ভীষণ কৌতূহলী হয়ে সেটা হাতে নিলাম। বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। প্রচন্ড ইচ্ছা হলো এই মুহুর্তেই খুলে দেখি ভেতরে কি রয়েছে। অথচ সাহস করে উঠতে পারলাম না। তার আগেই জায়দান খানিকটা অস্থির এবং দ্রুতগলায় বলল,
“আমার একটা কাজ আছে, আব্বুর কিছু বিজনেস অ্যাসোসিয়েটদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। আমি তবে আসলাম।”
জায়দান সত্যি সত্যিই উল্টো ঘুরতে নিলো। বুঝতে বাকি রইলনা আমার, বান্দা এখানে থাকার পরিকল্পনা করে আসেনি। যত দ্রুত সম্ভব সে চলে যেতে চায়। এটা কি আমার সেই ইনভাইটেশন কার্ডের জন্য? ইদানিং আমায় দেখলেই কেন পালাতে চায় জায়দান? একটা তীব্র ব্যথার অনুভব ছড়িয়ে পড়ল অন্তরজুড়ে। অজান্তেই হাত বাড়িয়ে পাকড়াও করে ফেললাম প্রাক্তনের হাতের কব্জি। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফিরে তাকাল সে, অথচ তার চোখের মাঝে লোকায়িত বিস্ময়টুকু টের পেতে আমার সমস্যা হলোনা। স্থির তাকালাম ওই গভীর দৃষ্টির মাঝে, আরো শক্তভাবে তার হাতটি ধরে বললাম,
“এভাবে চলে যেতে দেয়ার জন্য তো তোমায় আসতে বলিনি।”
চোখ পিটপিট করল জায়দান। নিঃশব্দে তাকাল আমার হাতের মাঝে ধরে রাখা তার হাতটির দিকে, পরক্ষণে সামান্য ঝুঁকে চাইল আমার দৃষ্টিমাঝে।
“আর কিছুক্ষণ থেকে যাও।”
আমি নিশ্চিত, উচ্চারণ করতে চেয়েছি ভিন্ন কিছু, অথচ উচ্চারিত হয়েছে এমন এক বাক্য যা আমায় নিজেকেও বিস্মিত করে তুলল। একটি ঢোক গিললাম। অন্তরের চাহিদা আর উপেক্ষা করা সম্ভব কি? জায়দান যথারীতি নিজের নির্বিকার দৃষ্টিতে আমায় পর্যবেক্ষণ করল, অতঃপর মৃদু কন্ঠে বলতে গেল,
“সাবিন। আমি এসেছিলাম এটা নিশ্চিতে যে এটাই যেন আমাদের শেষবারের….”
জায়দান বাক্যটি সমাপ্ত করতে পারলোনা। আমিও ঠিকমত শুনতে পেলাম না, কি বলতে চেয়েছিল সে। এর আগেই ভিন্ন একটি কন্ঠস্বর অত্যন্ত বিশ্রীভাবে আমাদের মুহূর্তে বাগড়া দিল।
“হ্যালো হ্যালো হ্যালো, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান…”
অবাক হয়ে ঝট করে পিছনে ঘুরে দাঁড়ালাম। ক্যাফের একদম মাঝখান বরাবর দাঁড়িয়ে আছে আয়দান। মুখজুড়ে চওড়া হাসি, হাতে ধরা একটি গিটার। চোখ কপালে উঠে গেল আমার। এই ব্যাটা এসব নিয়ে ক্যাফেতে ঢুকল কখন? আমার চোখে পড়লনা? নাকি জায়দানকে দেখতেই এত ব্যস্ত ছিলাম যে আয়দানকে বিশেষ খেয়াল করিনি? আমার গালজোড়া অজান্তেই খানিক লালচে হয়ে উঠল। তবে এই মুহূর্তে লজ্জাবোধের থেকে বেশি ক্রোধ কাজ করছে আমার মাঝে।
আয়দান বেশ আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে ক্যাফের মেঝেতে হেঁটে সামনে এগোল। যেন সে কোনো সুপারস্টার আর তাকে এখানে শো করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমন ভঙ্গিতে দুহাত ছড়িয়ে বান্দা বলল,
“আজ, আমার প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর শ্রমিক থেকে মালিক পর্যায়ে উঠে আসার শুভ দিনে, তাকে আমার অন্তর থেকে জানাই প্রাণঢালা ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।”
একে অপরের দিকে তাকাল অতিথিগণ। বোঝা দায়, আয়দান আসলে আমার প্রশংসা করল নাকি নিন্দা। আর প্রাণপ্রিয় বান্ধবী? দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললাম আমি নিজের আক্রোশ নিয়ন্ত্রণে। আমার অবস্থা লক্ষ্য করে বাঁকা হাসলো আয়দান। কণ্ঠের জোর বাড়িয়ে বলতে থাকল,
“আপনারা তো জানেনই, কত চড়াই উৎরাই পার হয়ে মিসেস, উপস! মিস সাবিন আজ এই পর্যায়ে পৌঁছে স্যাভেজ সাবিন হয়েছেন! আপনাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আমার অতি প্রিয়, অতি সাধের মানুষটা আজ নিজের নামে ক্যাফে পর্যন্ত খুলে ফেলল। জীবনে এতটুকু নির্লজ্জ্ব…আই মিন সাকসেসফুল তো হওয়ারই দরকার বলুন?”
কতক মানুষ হেসে উঠল, বাকিরা ভীষণ অস্বস্তিতে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইল। হুমকিস্বরুপ এক পা এগোলেও আশেপাশে চেয়ে নিজেকে জোরপূর্বক আটকালাম আমি। এই আয়দানের বাচ্চাটা চায় কি? আমার দিকে ভ্রু উঁচু করে ভাব নিয়ে তাকাল সে। তারপর নিজের গিটারে হাত রেখে অপর হাত তুলে নির্দেশ করে বলল,
“তাই আজকের এই পরিবেশনাটা আমার তোমার জন্য একটা উপহার…”
আমি ধরেই নিতাম আয়দান আমার দিকেই নির্দেশ করছে, যদিনা তার ওই অতি শয়তানি দৃষ্টি আমায় ছাপিয়ে ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা জায়দানের উপর পড়ত।
প্রফেসর নির্লিপ্ত, তার মাঝে অনুভূতির ছিটেফোঁটা অবধি নেই। বুকের উপর দুবাহু বেঁধে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে সে আয়দানকে। আমার দিকে চেয়ে অস্বাভাবিক এক ভঙ্গি করে আয়দান গিটারে সুর তুলতে শুরু করল। তারপরই গেয়ে উঠলো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৬
“আমার বন্ধু জানে সবই, কার সাথে খাও কফি, বলে দাও সত্যি এত কি ভয়~”
বুকটা ধ্বক করে উঠলো যেন আমার। চড়া গলায় গাইলো আয়দান,
“আমার মা বলেছিল খোঁকা তুই প্রেম করিস না, ভালো ছেলেদের কপালে ভালো মেয়ে জোটে না~”
