Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৬

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৬

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৬
জাবিন ফোরকান

“পারফেকশনিস্ট—
ইংরেজি ভাষায় শব্দটির অর্থ হলো এমন একজন ব্যক্তি যার বৈশিষ্ট্য, মানসিকতা এবং কার্যকলাপে কোনো খুঁত নেই। ছোটবেলা থেকে আমি ছিলাম একজন পারফেকশনিস্ট। আমার বাবা, জাফর আরেফিন দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। নিজের ব্যস্ততাঘেরা জীবনে পরিবারকে দেয়ার মতন সময় তার কোনোকালে হয়নি। আমার মা, জেসমিন শিকদার, পক্ষান্তরে একজন ডিজাইনার ছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর ঘর সংসারী হওয়াতেই তার আগ্রহ ছিল অত্যধিক। একজন পারফেকশনিস্ট হয়ে ওঠার গুণাবলী শহুরে মা বাবার ভিন্ন ভিন্ন কর্মযজ্ঞ ঘেরা জীবনে শিক্ষা দেয়া সম্ভব ছিলনা। এসবকিছু আমি শিখেছি, পড়েছি, জেনেছি বিভিন্ন বইয়ের পাতায়।

আ পারফেক্ট ম্যান টু বি, গুড ডে টু বিকাম আ গুড চাইল্ড, সদাচরণ নামক বইগুলো আমার একাকী শৈশবের সঙ্গী। কারণ, আমি আমার মা বাবাকে খুশি করতে চাইতাম। তাদের ভালো রাখতে চাইতাম। বিশেষ করে আম্মুকে।
আমি মন খুলে হাসতে পারতাম না। এখনো পারিনা। হাসি কিংবা কান্নার অনুভূতি কেমন আমার জানা নেই। জন্মের পর থেকেই আমি এমন ছিলাম। আর পাঁচটা গড়পড়তা শিশুর চাইতে আলাদা। আমার মাঝে অনুভূতির বড্ড অভাব ছিল। সবসময় ভাবুক থাকতাম। পৃথিবী কেন গোল? পানি কেন বর্ণহীন?মাছ কেন ডাঙায় বেঁচে থাকতে পারেনা? ডায়নোসর কি আদও পৃথিবীতে ছিল নাকি এসব স্রেফ বিজ্ঞানের ছলচাতুরি? এই ধরণের চিন্তাভাবনায় নিজের সময় পার করতে আমি পছন্দ করতাম।
সমবয়সী শিশুদের চাঞ্চল্যের ভিড়ে আমি ছিলাম নিছক নীরব এক অস্তিত্ব। বিষয়টা নিয়ে আমার আম্মু সুখী ছিলেন না। তাকে আমি খুশি দেখতে চাইতাম। পিতামাতার গর্বের কারণ হতে গিয়েই বুঝি অজান্তেই একজন পারফেকশনিস্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।

আমাকে দেখিয়ে অন্যান্য পরিবারের পিতা মাতারা নিজেদের সন্তানদের কাছে উদাহরণ দিত। সকল বাচ্চাদের আমার মতন হওয়া উচিত, নিজেদের পিতামাতাকে সম্মান, শ্রদ্ধা, মান্য করা উচিত। পড়ালেখায় ভালো করা উচিত, মেধাবী হওয়া উচিত। আমাদের সমাজে অধিকাংশের মেধাবী কূলকে নিয়ে ভ্রান্ত কিছু ধারণা আছে। বিশেষ করে যারা উদাহরণে পরিণত হয়, তাদের পিতা মাতা পরম সম্মানের চোখে দেখলেও সন্তানেরা মেনে উঠতে পারেনা। তারা ভাবে, তাদের কেন অন্যের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? বিষয়টার সঙ্গে আমিও একমত। কাউকে কখনো অন্যের সাতগে তুলনা করা উচিত নয়। মানুষ মাত্রই স্বতন্ত্র সত্তা। তবে, আমি তো কখনো উদাহরণ হতে চাইনি! নাকি চেয়েছিলাম? জানা নেই। অনুভূতি আমার কাছে বড্ড জটিল লাগে। এর চাইতে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি অনেক সহজ।
আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটেছে। আবার যেন কিছুই ঘটেনি। এসব আমার অনুভব করার ক্ষমতা না থাকায় তুচ্ছ মনে হতে পারে। কে জানে? আমি বলিনা, এসব মানুষ বলে। আমি নাকি রোবট। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু মিসিরই কথায় কথায় আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের চাইতে আমি কতটা আলাদা। তাতে আমার কিছু যায় আসতো না। এখনো কিছুই যায় আসেনা। এইযে যায় আসেনা, কোনো পরোয়া হয়না, এটাই বোধ হয় মিসির বোঝাতে চেয়েছে।

আমার সাদা কালো যান্ত্রিক জীবনটা নতুন মোড়ে এসে দাঁড়ায় এই পারফেক্ট জীবনে সাবিন নামের এক দূর্যোগের আগমনের পর। বিয়ের প্রস্তাব শোনার পর আমি দ্বিমত করিনি। তাকদীর হুসেইন, আমার প্রয়াত শ্বশুড়ের তরফ থেকে সতর্কতা ছিল। তিনি বলেছিলেন, তার মেয়ে লাগামছাড়া হয়ে গিয়েছে। অবুঝ শিশুদের মতন। তাকে আদর, যত্ন নিয়ে বোঝানোর মতন সামর্থ্য থাকতে হবে। বিষয়টা আমার কাছে না ভালো লেগেছে, না খারাপ লেগেছে। আমার বাবা জাফর আরেফিন রাজী ছিলেন, তাই নিজের মনকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করিনি। তার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। তখন যদি জানতাম, অনুভূতির হিসাব এতটা জটিল, তবে হয়ত বিয়েতে সম্মতি জানানোর আগে অন্তত একবার ভাবতাম।

গণিতে অনেক সূত্র আছে। সেসব সূত্র মিলিয়ে অংক মেলানো সহজ। শুধুমাত্র কোন ধাপে কোন সূত্রের প্রয়োজন সেটা ধরতে পারাটাই আসল খেলা। আমি সূত্র মেলানোর খেলায় পটু। অথচ বিয়ের পরের সমীকরণ সব কেমন যেন খাপছাড়া লাগতে লাগলো। সাবিন আমার স্ত্রী ছিল। তাই মেয়েটার প্রতি আমি সকল কর্তব্য পালন করতাম। সেখানে অনুভূতি নামক কোন জটিল সূত্র ছিলনা। কিন্তু দিন যেতে যেতে মনে হতে লাগল, আমি নিজের স্ত্রীকে নয়, বরং এক অবুঝ শিশুকে লালন পালন করছি। ছোটবেলা থেকেই সবার থেকে বেশি বোঝা আমি সবকিছু ধরতে পারলেও তা সমাধানের উপায় পেলাম না। অংক মেলাতে পারলেও আমি নিজের জীবনের সমীকরণ মেলাতে অপারগ ছিলাম। তাই হয়ত আমাদের বিচ্ছেদ।

সাবিনের সঙ্গে আমার আম্মুর সম্পর্কটা শুরু থেকেই ভালো ছিলনা। প্রথমত, আব্বুর মতে বিয়ে করাটা আম্মু মানতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, সাবিনের উড়নচণ্ডী স্বভাব। সম্পর্কে একজন আগুন থাকলে নাকি অন্যজনকে পানি থাকতে হয়। সেখানে সাবিন আগুন হয়ে থাকলে আমার আম্মু ছিল পেট্রোল ডিজেল। কেউই কারো সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারেনি। আমি বলব, মানিয়ে নিতে চায়নি। দুজন দুজনের অহংকারে একদম স্থির ছিল শেষ দিন অবধি। দোষ গুণ বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে আমি আমার আম্মুর সাবিনের প্রতি এতটা রাগের কারণ বোধ হয় ধরতে পারছি।
আমার স্ত্রী মানুষের মতে রগচটা, বেয়াদব, উশৃঙ্খল, অহংকারী। তবে হয়ত কোনো মানুষ তাকে এতটা কাছ থেকে কখনো দেখেনি বিধায় জানতে পারেনি, সাবিন যত্নশীল। আমি জানিনা, অন্য কারো প্রতি তার এতটা আবেদন কখনো ছিল কিনা। জানার প্রয়োজনবোধ করিনা, আমার প্রতি ছিল জেনেই আমি তৃপ্ত। আমাদের সম্পর্কের শেষদিকে আম্মুর সঙ্গে সাবিনের অধিকাংশ ঝামেলা লাগতো আমাকে নিয়ে। আম্মু কেন শুধু আয়দানের জন্য সোয়েটার বানায়, আমায় কেন বানিয়ে দেয় না, কেন আম্মু নিজের হাতে আচার বানালে সেসব আয়দান ফিরে আসার পর খাওয়াবে বলে তুলে রাখে, আমাকে দেয়না এসব নিয়ে তার কতশত অভিযোগ – আপত্তি ছিল। আমি নিজেও মাঝে মধ্যে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়তাম। আম্মুর কাছ থেকে আমার এত ছোট ছোট পাওনা, চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা ছিল সেসব সাবিন কোনোদিন নজরপাত না করলে আমি নিজেও কি উপলব্ধি করতে পারতাম?

হয়ত পারতাম না।
বৈষম্য। শব্দটার অর্থ আমি টের পাইনি কখনো। কিংবা হয়ত পেয়েছি। ওই বাড়িতে আমার আর আমার ছোট ভাইয়ের মাঝে রাত দিনের ফারাক এবং বৈষম্য। এটাকে যে আদও বৈষম্য হিসাবে ধরা যায় সেটা আমি ভাবিনি। কিংবা ভেবেছি। আম্মুর অবহেলায় সবসময় কেমন একটা ভার চেপে বসে থাকতো বুকের ভেতর। এই ভারটা কি তবে কষ্ট ছিল? আম্মু দূরে ঠেলে দিলে কি আমি কষ্ট পেতাম? কিন্তু আমি যে কষ্ট অনুভব করতে জানিনা!
সাবিন আমায় উপলব্ধি করিয়েছে। ওই বাড়িটার চার দেয়ালের মাঝে আমার গোটা একটা পরিবার ছিল। অথচ আমার মনে হয়, আমি বুঝি তাদের সাথে ভাড়ায় বসবাস করছি। আমরা শুধু মাথার উপরে একটি ছাদ ভাগাভাগি করি, আর কিছুনা। এটাই কি আদতে পরিবার? সুস্থ, স্বাভাবিক পরিবার কি অন্যরকম হয়? আমি জানিনা।
শুধু এটুকু জানি, সাবিন নামের একটামাত্র বদমেজাজী – অহংকারী মেয়ে ছিল, যে আমার না বলতে পারা চাহিদাগুলোর খেয়াল রাখতো। তাই হয়ত শেষদিকে তাকে জোর করে ধরে রাখতে চাইনি। কারণ আমি জানতাম, সাবিন আমার সঙ্গে ভালো থাকতে পারবেনা। আমি পারফেকশনিস্ট, সে ট্রাবলমেকার। এই জুটি কখনোই সফল হওয়ার ছিলনা।”

“স্যার?”
ডায়েরীর পাতায় জায়দানের কলম তৎক্ষণাৎ থেমে গেল। মাথা তুলে চশমার লেন্সের ভেতর থেকে তাকালো সে। অফিস কেবিনের দরজা সামান্য ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে আছে পিয়ন। প্রশস্ত হেসে পিয়ন দ্বিতীয় দফায় বলল,
“আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।”
জায়দান নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালো। সময় নিশ্চিত হতেই দ্রুত ডায়েরী বন্ধ করে নিজের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে লক করতে করতে পিয়নকে জানালো,
“ওকে ভেতরে পাঠিয়ে দিন।”

ব্র্যাকের করিডোর অত্যন্ত আধুনিক। অফিসের নিকটবর্তী হওয়ায় এদিকে শিক্ষার্থীদের ভীড় তুলনামূলক কম। দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আশেপাশে হাঁটাচলা করতে থাকা স্টাফ এবং অন্যান্যদের দেখছি আমি।
খানিকটা দূরেই আমার ঠিক বিপরীত পাশে সিঁড়ির গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে তরুণী গোছের একটি দল গল্পগুজব করছে। পেশায় স্টুডেন্ট না, থাকলে ব্যাগপত্র থাকতো সঙ্গে। বোধ হয় অ্যাসিস্টেন্ট, স্টাফ কিংবা অন্য কোনো পদে কর্মরত প্রত্যেকে। অফিশিয়াল পোশাক আশাকে তাই ধারণা হচ্ছে। তাদের টুকরো কথাবার্তা আমার কানে ভেসে আসছে।
গোলাপী বর্ণের শার্ট পরনে এক মেয়ে বলছে,
“হি ইয ম্যারিড। আমি থার্ড ইয়ারের ব্যাচের কাছে শুনেছি।”
“প্রফেসর আরেফিন ম্যারিড? সত্যিই?”
“হুম। ওরা নাকি সেদিন ক্যাফে ল্যাটেতে দেখেছে ওনার ওয়াইফকে।”
আমার কান খাড়া হয়ে গেল। যদিও পাড়ার আন্টি চাচীদের মতন গল্প ছড়ানো পাবলিক আমি দুই চোখে সহ্য করতে পারিনা, তবে এদের কথা না শুনলে আমার বুকটা ফেটে যাবে। দেয়াল ঘেঁষে সুরসুর করে যাচ্ছে সরে কান পাতলাম। গল্প চলমান আছে,
“কিন্তু উনি বেশ হ্যান্ডসাম। আর কতখানি লম্বা দেখেছ? সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে কেমন যেন বুক ধড়ফড় করে। ইশ! সিঙ্গেল হলে ভালো হত।”
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। বুক ধড়ফড় করে? শালী তোর হাই ব্লাড প্রেশারের সমস্যা আছে! স্ট্রোক করার আগে ডাক্তার দেখা!

“কেন সিঙ্গেল হলে কি করতেন আপনি? ট্রাই মারতেন নাকি?”
“হাহাহা। সুযোগ তো একটা নেয়াই যায়। আফটার অল হি ইয আ লিটারেল জিনিয়াস।”
একটা ঘুষি মেরে বেটির নাকশা ফাটিয়ে দিতে পারলে শান্তি লাগত। কিন্তু বিরাট ভাইরালের ঝামেলা পেরিয়ে সদ্য ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি, নতুন করে ঝামেলায় জড়ালে আমাকে কারো আব্বাও বাঁচাতে পারবেনা।
“আহারে রুবিনা। আপনার তো আশা ভরসা সব জলে গেল দেখা যায়। ঝড়ের বেগে সকল কাজকর্ম করেও প্রফেসরের মন গলানো গেল না।”
এক কার্ডিগান পড়া রমণীকে ঠেলে বাকিরা হাসাহাসি করছে। বুঝলাম, ওটাই রুবিনা। আমার চোখজোড়া চকচক করে উঠল শিকারের দেখা পাওয়া মাত্রই। রুবিনা আবার লজ্জাও পাচ্ছে, গাল দুটো লাল দেখাচ্ছে। ওই দুটো সাঁড়াশি দিয়ে যদি উপড়ে না নিয়েছি আমার নাম সাবিন…তওবা তওবা! এসব কি ভাবছি আমি?
রুবিনা মুচকি হাসলো।

“যাহ। এভাবে বলবেন না। আমি তো শুধু নিজের প্রফিশিয়েন্সি ধরে রাখতে চাই। আর কিছু না। তাছাড়া প্রফেসর আরেফিন ভীষণ রকমের প্রাইভেট মানুষ। ওনাকে আমি শ্রদ্ধা করি। ওনার এই গুণটা আমার ভালো লাগে।”
“শ্রদ্ধা? প্রফেসর আরেফিনকে? লেডিসগণ, বোধ হয় আপনারা একটু বেশীই দিবাস্বপ্ন দেখে ফেলছেন।”
আমার কন্ঠস্বর ধ্বনিত হতেই প্রত্যেকটি চোখ ভীষণ সতর্কতা নিয়ে ফিরে তাকাল। প্রত্যেকে অজানা অচেনা একজন মেয়েকে এভাবে বলতে শুনে নিশ্চয়ই অবাক হয়েছে। আমার মুখে কালো মাস্ক পরনে আছে, তার আড়ালে তীর্যক হাসলাম আমি। সিঁড়ির কাছে এগিয়ে মাথা কাত করে বললাম,
“প্রাইভেট মানুষ হলেই যে খুব ভালো হয়, তার কি কোন গ্যারান্টি আছে? ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানেন ওনার?”
“আপনি কে? আপনি কিভাবে প্রফেসর আরেফিনকে নিয়ে এমন কথা বলতে পারেন?”
রুবিনার কঠোর প্রশ্নে আমার হাসি বিস্তৃত হলো। বুকে দুবাহু ভাঁজ করে রেখে অত্যন্ত গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে তাকালাম।
“ক্রাশ খাওয়ার আগে বুঝেশুনে খাওয়া উচিত বুঝেছেন? আমার পরিচয় নাহয় দিলাম, তবে আপনি জানেন আপনাদের ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি হ্যান্ডসাম প্রফেসর তলে তলে টেম্পু চালায়?”
আঙুল গুণে গুণে হাতের দশটা সহ পায়ের তিনটা আঙুল তুলে দিয়ে বললাম,

“এইযে। তেরোটা! ওনার এক্সের সংখ্যা ১৩! ওয়াইফ তো আছেই, এর উপর প্রতিদিন ডিস্কো ক্লাবে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড তো অহরহ। এমন একটা মানুষকে ভালো লাগে? এমা! ছিঃ! ইয়াক!”
আমার ভাবভঙ্গি দেখে এবং কথাবার্তা শুনে রমণীর দলকে মনে হল, তারা বুঝি বজ্রাহত হয়েছে। একে অপরের দিকে ভ্রু তুলে তাকাচ্ছে। ফিসফিস করছে। বিজয়ীর হাসি হাসলাম। ভাগ্যিস মাস্ক পরে এসেছি এখানে। অনেক ফায়দা লুটতে পারছি। রুবিনা কন্ঠ পরিষ্কার করে বিব্রত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এতকিছু কিভাবে জানেন ওনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে? আপনি কে হন প্রফেসরের?”
“দুঃসম্পর্কের আত্মীয়।”

এগিয়ে গেলাম, মাথা ঝুঁকিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে নিচু গলায় বললাম,
“শুনেন বোন সিস্টাররা, পুরুষ মানুষ হচ্ছে ইবলিশের বংশধর, বুঝেছেন? ওনাদের টাওয়ারের মতন উচ্চতায় আর মখমলি সৌন্দর্যে একদম ভুলবেন না। শয়তান যেমন করে মানুষকে ভ্রমে ফেলে বশ করে, তেমনি পুরুষেরাও করে। প্রফেসর আরেফিন তো ইবলিশের এক্স অ্যাসিস্টেন্ট! নারীদোষ, বাজিদোষ, নেশাদোষ ওনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এইযে সাবধান করলাম। এরপর গরু যদি দেয়ালে গিয়ে গুঁতোয় তাহলে আমার দোষ কি? আমার কাজ সাবধান করা, করে দিলাম।”
সকলের চোখেমুখে হতভম্ব ভাব ফুটে উঠলো। যেন তারা কিছুতেই নিজেদের গম্ভীর প্রফেসরের সঙ্গে এমন চিত্র কল্পনা করতে পারছেনা। হাতে হাত ঘষে শয়তানি হাসি হাসলাম আমি, নীরবে। কাজ হয়েছে!
“আপনাকে স্যার কেবিনে যেতে বলেছেন।”
কণ্ঠটি কানে আসতেই পিছনে ঘুরে দেখলাম পিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। চটজলদি রমণীর দলের দিকে ঘুরলাম,
“মনে রাখবেন, প্রফেসর আরেফিনে ক্রাশ তো জীবনের পাছায় বাঁশ! আসি। আসসালামু আলাইকুম।”
বাকরুদ্ধ রমণীদের পিছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে গেলাম আমি নিজের গন্তব্যের দিকে। এখন বুকের ভেতর একটু শান্তি লাগছে। তবে ওই রুবিনার চুলের মুঠি ধরে কয়েকটা ঠেঙানি দিতে পারলে বিশেষ লেভেলে ভালো লাগত।
আমরা যখন বিবাহিত ছিলাম, তখন জায়দান নর্থ সাউথে অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর হিসাবে ছিল। ব্র্যাকে সে এসেছে আমাদের ডিভোর্সের পর। আমি নিজেও জানতাম না, যতদিন না আয়দানের বেয়াদবির সুবাদে আমাদের দেখা হয়েছিল। তাই এখানে এই আমার প্রথম আসা। কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নক করতেই ভেতর থেকে উত্তর এলো,

“কাম ইন।”
একটি শক্ত ঢোক গিলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বুকের ভেতর কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে। আমি আমার প্রাক্তন স্বামীকে ভালোবাসি, বিষয়টা অনুধাবনের পর থেকে তার মুখোমুখি হওয়াটা আমার জন্য পানিপথের যুদ্ধ লড়ার থেকে কম কিছু নয়। মনে হচ্ছে যেন সাড়া দেহ অসাড় হয়ে আসছে। নিজেকে বহু কষ্টে দমন করে পাগলাটে হৃদস্পন্দন বুকে চেপে আমি সামনে তাকালাম। মাস্ক খুলে নিলাম।
প্রশস্ত মেহেগণি ডেস্কের ওপাশে বসে আছে জায়দান। সদা নির্লিপ্ত, নির্বিকার। চারকোনা লেন্সের চশমার ওপাশে স্থির প্রশান্ত দৃষ্টি। ডেস্কের উপর দুহাত ভাঁজ করে রেখে আমায় দেখছে। একপাশে ল্যাপটপ খোলা, অন্যপাশে বেশ কতক বই এবং স্টুডেন্ট শিট। কয়েকটি মার্কার পেন গড়াগড়ি খাচ্ছে ল্যাপটপের ধার ঘিরে।
“বসো।”

ছোট্ট একটা শব্দ উচ্চারণ করল জায়দান। আমি ধপাস করে ডেস্কের অপর পাশে বসে পড়লাম। না চাইতেও উদ্ভ্রান্ত এবং বিব্রত দৃষ্টি আমার কেবিনের চারপাশে ঘুরে বেড়ালো। জায়দানের চেহারার দিকে তাকালেই কেমন লজ্জাবোধ হচ্ছে। আমাকে কোনোকিছু না বলে জায়দান টেলিফোনের রিসিভার তুলে একটা নাম্বার ডায়াল করল।
“এক কাপ হানি টি এবং ব্ল্যাক কফি। থ্যাংকস।”
নীরবে আড়চোখে তার কার্যক্রম দেখলাম। রিসিভার রেখে জায়দান ফিরে তাকালো। আমি ভেবেছিলাম, ক্যাফের রেস্টরুমের সেই ঘটনার পর থেকে বান্দা একটু হলেও সংকোচ বোধ করবে। কিংবা অন্তত সেই বিষয়ে কথা বলতে চাইবে। তবে এমন নির্লিপ্ত ভাবে একটুও অবাক হলাম না। বুকের ভেতর আড়ালে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম শুধু।
এক রোবটের প্রেমে পড়েছি আমি।
“তুমি দেখা করতে চেয়েছিলে।”
আমি কিছু বলছিনা লক্ষ্য করে জায়দান নিজে থেকেই বলল। সামান্য লজ্জা পেলাম। গতকাল রাতেই আমি এই বান্দাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করেছিলাম আজ দেখা করার জন্য। কন্ঠ পরিষ্কার করে তাই দ্রুত বললাম,
“হ্যাঁ, ইয়ে মানে…”

দ্রুত নিজের হ্যান্ডব্যাগের ভেতর হাত চালালাম। একটা ছোট পকেট ডায়েরী বের করে জায়দানের দিকে এগিয়ে দিলাম। প্রাক্তন সেটি গ্রহণ করে খুললো। একজন এসে কেবিনে চা এবং কফি দিয়ে চলে যাওয়ার পর আমি বললাম,
“এটা ব্যাংক বাজেয়াপ্ত করার আগে ড্যাডের থাকা মোটামুটি সকল সম্পত্তির লিস্ট।”
জায়দানের নোটবুকে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালো।
“ড্যা.. আই মিন, মিস্টার হুসেইনের প্রপার্টির লিস্ট হঠাৎ করে আমায় দেখাচ্ছ?”
প্রশ্নটির জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দিলাম না। হানি টির কাপে বেশ লম্বা একটা চুমুক দিলাম। শীতের দিনে চায়ের মাঝে মধুর স্বাদ অত্যন্ত জাদুকরী লাগলো। টেবিলে দুই কনুই রেখে সুস্থির দৃষ্টিতে মোকাবেলা করলাম প্রাক্তনের বাদামী সমুদ্রকে।

“আমি চাই, তুমি ড্যাডের প্রপার্টির মূল্যের একটা হিসাব করো। আমি নিশ্চিতভাবে জানতে চাই, ড্যাডের সম্পদের পরিমাণ টাকার হিসাবে এক্সাটলী কতটুকু।”
জায়দান বেশ লম্বা একটা সময় আমার দিকে নীরবে চেয়ে রইল। মনে হলো, সে বুঝি প্রশ্ন করবে। আমি কেন হঠাৎ করে এতোদিন বাদে নিজের বাবার সম্পত্তির হিসাব চাইছি? অথচ আমাকে অবাক করে দিয়ে জায়দান কোনো প্রশ্ন করলোনা। বরং নোটবুকটা নিঃশব্দে নিজের জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে রেখে বলল,
“বর্তমান বাজারে প্রপার্টি, অ্যাস্টেটের মূল্য নিয়ে আমি আপডেটেড নই। আগামীকালের মধ্যে তোমার কাছে হিসাব পৌঁছে যাবে।”
চা শেষ করে মাথা দোলালাম। হালকা গলায় বললাম,
“ধন্যবাদ।”
“আর কিছু?”

জায়দানের কন্ঠস্বর অন্যান্য দিনের তুলনায় খানিক বেশি শীতল শোনালো। তার চেহারায়ও সূক্ষ্ম একটা পরিবর্তন চোখে পড়ল যেটা এতক্ষণ যাবৎ খেয়াল করিনি। আমার সামনে যে নমনীয়তাটুকুর দেখা পাওয়া যেত, তার অস্তিত্ব বিলীন। সুস্থিরতার মাঝেও কেমন যেন একটা অস্থির ভাব তার ভেতর, যেন চাইছে আমি দ্রুত এখান থেকে চলে যাই। বিষয়টা আমাকে প্রয়োজনের চাইতে বেশীই কষ্ট দিলো।
“দশ মিনিট বাদে আমার লেকচার আছে। ক্লাসে যেতে হবে।”
জায়দান হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে জানালো। একটি শক্ত ঢোক গিলে উঠে পড়লাম চেয়ার থেকে। হ্যান্ডব্যাগ হাতড়ে দ্বিতীয় আরেকটি জিনিস বের করে জায়দানের দিকে এগিয়ে দিলাম। প্রাক্তন হাত বাড়িয়ে সেটি স্পর্শ করলো। একটি ইনভাইটেশন কার্ড। না খুলেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো সে। মৃদু হাসলাম,
“আগামীকাল আমার আর মীরার ক্যাফের ওপেনিং। ছোটখাটো একটা সারমোনির আয়োজন করেছি। যদি আসতে পারো খুশি হবো। আফটার অল, তুমি আমায় অনেক সাহায্য করেছ।”
জায়দান কিছু বললনা। শুধু তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। কেমন যেন অনুভূত হলো। হৃদয়টাকে খামচে ধরেছে যেন কেউ। তলপেটে উড়ছে অসংখ্য প্রজাপতি। তাই দ্রুত দরজার দিকে এগোলাম। বাইরে এক পা রেখে আবার পিছনে ফিরে তাকালাম। হঠাৎ করেই তীর্যক হেসে বলে উঠলাম,
“ওই কুলাঙ্গার আটার বস্তাটাকেও নিয়ে এসো যদি পারো। ওকে আমি আমার ক্যাফের প্রথম পিৎজাটা খাইয়ে রমরমে ব্যবসার সূচনা করবো!”
এটুকুই। মাস্ক মুখে দিয়ে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে গেলাম। দ্বিতীয়বার আর পিছনে ফিরে দেখলাম না।

সাবিন চলে যাওয়ার পরেও বেশ খানিকটা সময় জায়দান একদম স্তব্ধ হয়ে নিজের জায়গায় বসে রইলো। হাতঘড়ির কাঁটার টিকটিক আওয়াজ তার মনোযোগ কেড়ে নিতেই চেয়ার থেকে উঠে পড়ল সে। এক হাত বাড়িয়ে দ্রুত ল্যাপটপ বাগড়ে ধরে নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো সে।
করিডোর ধরে এগিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে অপর হাতে শক্তভাবে ধরে রাখা কার্ডটা খুলল সে। সাদা শক্ত খড়খড়ে কাগজের উপর গাঢ় গোলাপী বর্ণের……
জায়দানের মস্তিষ্কে বুঝি বি*স্ফোরণ ঘটল।
“লিপস্!”
ফিসফিস করে উঠলো জায়দান। কার্ডের মাঝখান বরাবর গোলাপী বর্ণের ঠোঁটের ছাপ। একটা দুটো নয়, অসংখ্য! যেন কেউ একজন ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে বারংবার এই কার্ডে চুমু খেয়েছে। সেই ছাপের উপর গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,
॥ ইউ আর কর্ডিয়ালি ইনভাইটেড টু মাই হার্ট ॥
ধ্রেএএএক!
জায়দানের পা হড়কে গেলো। সিঁড়ির উপরে মোক্ষম এক উষ্টা খেয়ে স্লাইড করে তার লম্বাটে শরীরটা নেমে এলো নিচের দিকে। কার্ডটা চেপে ধরে ভারসাম্য হারিয়ে সে সটান গিয়ে বিশাল এক ধাক্কা খেলো সিঁড়ির নিচে দাঁড়ানো কারো সঙ্গে। তাকে ধরে ফেললো সেই ব্যক্তি।

“প্রফেসর!”
উদ্বিগ্ন নারীকন্ঠ কানে যেতেই জায়দান নিজেকে জোরপূর্বক সোজা করে দাঁড় করিয়ে ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে অস্থির নয়নে সামনে তাকালো। দাঁড়িয়ে আছে রুবিনা, কম্পিউটার স্পেশালিস্ট হিসাবে কয়েক মাস আগে জয়েন করা জুনিয়র কলিগ। চোখ পিটপিট করলো জায়দান, হাতের ল্যাপটপটা ফস্কে গিয়েছিল, সেটা রুবিনা কোনমতে ধরে বাঁচিয়েছে। ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে চেয়ে ল্যাপটপ ফিরিয়ে দিয়ে সে শুধালো,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৫

“আপনি ঠিক আছেন, প্রফেসর?”
ল্যাপটপ ফিরিয়ে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জায়দান জবাব দিতে গিয়ে প্রথমবারের মতন তোতলালো,
“স…সরি…আ.. আই স্লীপড!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here