অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫
রিদিতা চৌধুরী
গাড়ির ভেতরটা পিনপতন নীরবতায় ভারী হয়ে আছে। এসি চললেও রিদির সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে—একদিকে তীব্র টেনশন, অন্যদিকে অহেতুক ভয়। এই মানুষটির সঙ্গে এক মুহূর্তও থাকা তার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে। যে পুরুষ নিজের ঘরে বৈধ স্ত্রী রেখে অন্য কোনো মেয়ের প্রতি এই বাড়তি দায়িত্ববোধ দেখায়, তার কাছে নিজের পরিচয়টুকু দেওয়াও রিদির আত্মসম্মানে লাগছে। সৌহার্দ্য নির্বিকার ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ধরে আছে, তার দৃষ্টি সামনের পিচঢালা রাস্তার দিকে নিবদ্ধ; যেন পাশে বসে থাকা রিদি তার কাছে কোনো অস্তিত্বই রাখে না।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সৌহার্দ্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “কোথায় নামবে? এড্রেস বলো।”
রিদি রাগে আর অভিমানে গিজগিজ করে বলল, “জাহান্নামে নামিয়ে দিন, অসভ্য লোক!”
সৌহার্দ্য এক পলক রিদির দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর সেই ঠান্ডা অথচ গম্ভীর স্বরে বলল, “স্টুপিড, তুমি এমনিতে জাহান্নামে যাবেই, বড়দের সঙ্গে মুখে মুখে যা তর্ক করো!”
সৌহার্দ্যের এই অটল শান্ত ভঙ্গি রিদির ভেতরের জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিল। সে ফুঁসে উঠে বলতে চাইল, “আপনি জাহান্নামে যাবেন! ঘরে আপনার বউ—” কিন্তু কথাগুলো তার গলার কাছেই আটকে গেল। সৌহার্দ্যের চাহনি লক্ষ্য করতেই রিদি শিউরে উঠল। লোকটা এমনভাবে চোখ গরম করে তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তে তাকে গিলে ফেলবে!
সৌহার্দ্য যতই শান্ত গলায় কথা বলুক, রিদি জানে তার ওই শান্ত রূপের আড়ালে কী ভয়ংকর আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। সে নিজে কখনো না দেখলেও বাড়ির সবার মুখে শুনেছে—বিশেষ করে আরবান তো সবসময় বলে, সৌহার্দ্যের রাগ যখন চড়ে, তখন সামনে থাকা মানুষটার কী পরিণাম হবে, সেটা খোদ সৌহার্দ্যও ভুলে যায়!
সৌহার্দ্যের সেই শীতল কিন্তু ধারালো চাহনি দেখে রিদি আর টু শব্দ করার সাহস পেল না। মনে মনে রাগে ফুঁসলেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইল।
তার এই নীরবতার মাঝেই সৌহার্দ্য গমগমে স্বরে ধমকে বলল, “উইল ইউ স্টপ সিটিং দেয়ার উইথ ইয়োর মাউথ শাট অ্যান্ড টেল মি হোয়ার ইউ ওয়ান্ট টু গেট ডাউন?”
রিদি কিছু একটা ভেবে কোনোমতে তোতলামির স্বরে সুমির বাড়ির ঠিকানাটা বলে দিল। সুমিদের বাসা থেকে তাদের বাড়ির দূরত্ব বড়জোর দশ মিনিটের পথ। রিদির মুখে ঠিকানাটা শুনেই সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, “আর ইউ শিওর?”
রিদির একটা পুরোনো স্বভাব—মিথ্যা বলতে গেলেই ধরা পড়ে যায়, গলা আটকে আসে। সে কাঁপা গলায় বলল, “জ-জ্বি।”
সৌহার্দ্য এক ঝলক রিদির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “তুমি যেভাবে ঠিকানা বলতে গিয়ে কাঁপছো, মনে হচ্ছে তোমার বাবার ঘরে স্মাগলিং-এর টাকা লুকানো আছে!” আর আমি সেটার তদন্ত করতে যাচ্ছি?
রিদি রাগে তিরবির করে উঠল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমার বাবা আপনার মতো অসভ্য-ইতর নন!”
সৌহার্দ্য আর কথা বাড়াল না। বিরক্তি নিয়ে মুখটা কুঁচকে সে বিড়বিড় করে বলল, “এই স্টুপিড বোচা নাকটার চেয়ে আমার বাড়ির ওই দেড় ব্যাটারির মিউট টাই ভালো!”
গাড়ির গতি কমিয়ে সৌহার্দ্য রিদির দেওয়া ঠিকানায় গাড়ি থামাল। রিদি নামার সাথে সাথেই এক মুহূর্ত দেরি না করে, টায়ারের ধুলো উড়িয়ে সৌহার্দ্য গাড়ি নিয়ে উদাও হয়ে গেল। চোখের সামনে থেকে গাড়িটা সরে যেতেই রিদির বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। বুকের ভেতর জমানো কষ্টগুলো যেন দলা পাকিয়ে উঠছে, দম আটকে আসছে তার।কোনোমতে নিজের আবেগকে সামলে নিয়ে, ভারী পায়ে রিদি বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
বাড়ির চৌকাঠ পেরোতেই রিদির মনে হলো, আজ বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন অন্য দিনের চেয়ে বেশি সজীব, কর্মচঞ্চল। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা বাসনপত্রের মৃদু টুংটাং আর রান্নার সুঘ্রাণ জানান দিচ্ছে অন্দরে কোনো বিশেষ আয়োজনের ধুম পড়েছে। কৌতূহল সামলাতে না পেরে রিদি দোতলার দিকে না গিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।
রান্না ঘরে পা রাখতে দেখলো , সাথী ভাবী ব্যস্ত হাতে হরেক রকম নাস্তার আয়োজন করছে, আর পাশে আমেনা খালা নিপুণ হাতে মাছ-মাংস কাটাকাটি করছেন।
রিদির দিকে চোখ পড়তে আমেনা খালার মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে মায়াবী হাসি। পরম স্নেহে ডেকে বলল, “আইসা পরছেন ছোট আম্মা?”
আমেনা খালার এই অকৃত্রিম সম্বোধনে রিদির এক টুকরো ম্লান হাসি দিল। সাথীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা কৌতূহলী স্বরেই সে জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ রাতে এত আয়োজন কেন ভাবী? বিশেষ কেউ আসছে?”
সাথী ব্যস্ততার মাঝেও মিষ্টি হেসে জবাব দিয়ে বলল, “আসবে মানে? এসে গেছে তো! সৌহার্দ্যর লন্ডনের ছোট খালা এসেছেন তার মেয়ে নিয়ে। আজ রাতে এখানেই থাকবেন, কাল গ্রামে রওনা দেবেন।”
রিদি ব্যাগপত্র এক পাশে রেখে চুপচাপ সাথীকে সাহায্য করতে বসে পড়ল। কাজের মাঝে হঠাৎ সাথীর নজর পড়ল রিদির বিষণ্ণ মুখটার দিকে। এক মুহূর্ত থমকে গিয়ে আলতো করে রিদির মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় নিয়ে বলল, “কী হয়েছে আমার বোনটার? আমায় বলবি না?”
রিদি গলার কাছে জমে ওঠা কান্নার দলাটা জোর করে গিলে ফেলল। হাসির আড়ালে কষ্টটা ঢাকার প্রাণপণ চেষ্টায় বলল, “কিছু না ভাবী, শরীরটা আজ বড্ড নিস্তেজ লাগছে, তাই একটু দুর্বল লাগছে।”
সাথী কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইতস্তত স্বরে বলল, “রিদি, এভাবে আর কতদিন চলবে? সামনে যা, কথা বল, পরিস্থিতিটা ঠিক করার একটা চেষ্টা তো কর।”
সাথীর কথাগুলো রিদির বুকের ভেতর একরাশ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল। সে মনে মনেই বলল, ‘যে মানুষটা একবারের জন্যও আমার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি, তার সামনে আমি কেন বেহায়ার মতো গিয়ে দাঁড়াব? যে আমাকে চায়ই না, তার প্রতি আমার কোনো চাহিদাও নেই।’
সাথীর আড়ালে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু দ্রুত মুছে রিদি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “ভাবী, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি, তারপর তোমাকে হেল্প করছি। শরীরটা বড্ড মেজমেজ করছে।”
সাথী মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। একার পক্ষে এত কাজ সামলানো তার জন্যও কঠিন, তার ওপর বাচ্চাদের কান্না যেকোনো সময় শুরু হয়ে যেতে পারে।
নিজের ঘরে ঢুকে রিদি ব্যাগটা এক কোণে ছুড়ে ফেলে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিল। অঝোর ধারায় নামা কান্নায় বালিশটা মুহূর্তেই ভিজে একাকার। নিজের কষ্টগুলোকে কতকাল চেপে রাখা যায়? সৌহার্দ্য যদি কোনোদিন তাকে স্বীকৃতি না দিত, হয়তো রিদি এতটা কষ্ট পেত না। কিন্তু সৌহার্দ্য অন্য কোনো নারীর প্রতি যতটা কনসার্ন, সেটা ভেবেই রিদির বুকটা ভেঙে যাচ্ছে। এটা বড় অদ্ভুত এক যন্ত্রণা—সৌহার্দ্য তো আর জানে না যে, যে মেয়েটিকে সে আগলে রাখছে, সে আসলে তার অদেখা স্ত্রী। কথাটা ভাবতে রিদির বুকটা হাহাকার করে উঠলো!
সৌহার্দ্য কি একবারও পারতো না রিদির একটা খোঁজ নিতে? নিজের ওপরই এক ধরনের তাচ্ছিল্য মিশ্রিত হাসি হাসল রিদি। তার মতো পোড়াকপাল হয়তো পৃথিবীতে খুব কমই আছে। কিশোরী বয়সে যখন পৃথিবীটাকে নতুন করে চেনার কথা, তখনই আপনজনদের হারিয়ে নিঃস্ব হলো সে। বিয়ের অর্থ বোঝার আগেই জীবনটা জড়িয়ে গেল এক পাষাণ মানুষের সাথে, যে কিনা তার মুখটা দেখার প্রয়োজনও মনে করেনি। রিদির মনে হলো, জীবনের এই ধূসর পথটা যেন শেষ হওয়ার নয়।
অতীত….
সেদিন ছিল রিদির এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন। সবে ১৫ বছর বয়স, বাবা-মায়ের প্রথম আদরের সন্তান হওয়ার সুবাদে কিছুটা কম বয়সেই শখ করে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে মা মালিহা খান। সকাল থেকেই এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর টেনশনে বুক দুরুদুরু করছিল তার—কী হবে ফলাফল?
রিদির বাবা আকরাম খান, পুলিশের ডিএসপি। বাবা ঘরে ঢুকতেই রিদি তার পাশে গিয়ে বসল। কিছু একটা বলতে চাইছে সে, কিন্তু বাবা তখন ফোনে জরুরি কাজে ব্যস্ত। অগত্যা বাবার দিকে তাকিয়ে গালে হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে রইল মেয়েটা। কিছুক্ষণ পর আকরাম খান ফোনের কথা শেষ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “কী হয়েছে আমার মামুনিটার? এমন চুপচাপ হাপ ছেড়ে বসে আছো কেন? খুব টেনশন হচ্ছে?”
রিদি বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। বাবার হাত ধরে আবদার করে বলল, “পাপা, আমার রেজাল্ট যদি ভালো হয়, তবে আমাকে পার্কে নিয়ে যাবে?”
মেয়ের সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে আকরাম খান কাজ থাকা সত্ত্বেও না করতে পারলেন না। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, যাবো। তবে পার্কে না, আজ তোমাদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবো। চলবে?”
রিদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল, “পাক্কা চলবে” ছোটবেলা থেকেই রিদি অনেক বুঝদার, কখনোই কোনো কিছু নিয়ে অহেতুক বায়না করে না। তাই বাবার কাছ থেকে এমন উপহার পাওয়া তার জন্য ছিল দারুণ কিছু।
ফলাফল সন্তোষজনকই হলো, জিপিএ ৫ না পেলেও তার খুব কাছাকাছি। সন্ধ্যায় আকরাম খান, স্ত্রী মালিহা খান, রিদি আর ছোট বোন ৭ বছরের রিদাকে নিয়ে গেলেন এক রেস্টুরেন্টে। খাওয়া-দাওয়া আর আনন্দের পর ফেরার পথে দেখা হয়ে গেল রিদির মায়ের চাচাতো বোনের সাথে। তিনি রিদিকে দুদিনের জন্য তাদের বাসায় নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরলেন। আকরাম খান শুরুতে রাজি না হলেও, শেষ পর্যন্ত তার জোরাজুরিতে মেনে নিলেন।
রিদি খালার সাথে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই খালা তাকে নিয়ে পুনরায় দ্রুতগতিতে ফিরে এলেন তাদের নিজেদের ফ্ল্যাটের দিকে। খালার গম্ভীর এবং চিন্তিত মুখ দেখে রিদির বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। তবুও কিছু না বলেই সে খালার সাথে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করল। কিন্তু ড্রয়িংরুমের দরজার কাছে গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে গেল সে।
চোখের সামনে যা দেখল, তাতে রিদি চিৎকার করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। বাবা, মা আর আদরের ছোট বোন রিদার রক্তাক্ত, নিথর শরীরগুলো পড়ে আছে। সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো ক্ষমতা ছোট্ট মেয়েটার ছিল না; যেন চোখের জলও শুকিয়ে পাথর হয়ে গেল তার। ঠিক তখনই তার বাবা আকরাম খানের বন্ধু সারহান চৌধুরী এবং তার স্ত্রী শাহেদা চৌধুরী সহ সেখানে এসে পৌঁছালেন। এক্সিডেন্টের খবর শুনেই ছুটে এসেছিলেন তারা। রিদির বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে শাহেদা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এসে মেয়েটিকে নিজের বুকের ভেতর আগলে নিলেন।
সমরহান চৌধুরী যখন ওদের সব দায়বদ্ধতা চুকিয়ে রিদিকে নিয়ে ফিরে এলেন, তখন চারপাশটা বড় নিস্তব্ধ। ছোট মেয়েটাকে কোথায় বা কার কাছে রেখে আসতেন তিনি? আপন বলতে বিদেশে থাকা ওই এক ফুফু ছাড়া পৃথিবীতে যে তাদের আর কেউ নেই!
সেদিন সৌহার্দ্য দুই দিন পর রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফিরল। ঘরের চৌকাঠ পেরোতেই তার কানে এল এক চাপা কান্নার সুর। শব্দটা খুব করুণ, যেন এক চিলতে বুকফাটা আর্তনাদ। সৌহার্দ্য থমকে দাঁড়িয়ে একটু ঘুরতেই দেখল, ঘরের মেঝেতে পুতুলের মতো ছোট্ট একটা মেয়ে বসে আছে। মাথায় ঘোমটা টানা, মুখটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তাকে ঘিরে বসে আছেন বাবা, মা আর চাচি—সবার চেহারায় এক গভীর বিষাদ। সৌহার্দ্য জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাতেই শাহেদা চৌধুরী একে একে সব খুলে বললেন।
মায়ের মুখ থেকে দুর্ঘটনার সেই নিষ্ঠুর সত্যটুকু শোনার পর সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল। মনে পড়ে গেল ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। সে নিজেও বাবা-মায়ের সাথে কয়েকবার রিদিদের বাড়ি গিয়েছিল। তখন রিদি মাত্র পাঁচ বছরের এক ফুটফুটে শিশু। সৌহার্দ্য যখনই যেত, রিদি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকত। বড় বড় ড্যাবড্যাবে চোখে কী যেন এক মায়া। কিন্তু সৌহার্দ্যের কাছে তখন রিদির সেই মুগ্ধ চাহনি ছিল চরম বিরক্তির কারণ।
একদিন মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে ছোট শিশুটির দিকে তাকিয়ে সে তিক্ত কণ্ঠে বলেছিল, “হেই ইউ ট্যাবলেট! এত বড় একটা ছেলেকে এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছ কেন? স্টুপিড, এই বয়সে এত পেঁকে গেছ?” কথাগুলো বলে সে হনহন করে চলে এসেছিল। কিন্তু অবুঝ রিদি কি আর এত কিছু বুঝে সে তো কোনো খারাপ অভিসন্ধি নিয়ে নয়, বরং সুন্দর একটা ভাইয়াকে দেখতে ভালো লাগে বলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত! এরপর পড়াশোনা আর ব্যস্ত জীবনের যাঁতাকলে পড়ে সৌহার্দ্যর আর রিদিদের বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
ভাবনা চিন্তা ছেড়ে যখন সৌহার্দ্য সিঁড়ির দিকে পা বাড়াবে তখনি পিছন থেকে ডাকলেন সারহান চৌধুরী ওনার কন্ঠস্বর আজ অন্যরকম,
-তোমার সাথে আমার কথা আছে সৌহার্দ্য আমার রুমে এসো!
আধা ঘন্টা যাবত সৌহার্দ্য বসে আছে , বাবার রুমে বাবার সামনে, তিনি ছেলের পাশে বসে আছেন অথচ কোন শব্দ মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না! হয়তো কিভাবে বলবে বুঝে উঠছেনা,
অনেকক্ষন বসে থেকে সৌহার্দ্য এবার বিরক্তি নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা কিছু বলবে বলছিলে?
সারহান চৌধুরী ছেলের হাত দুটো নিজের হাতের মুটোতে নিয়ে একটু দ্বিধা বোধ করে বলল, তোমার কাছে কিছু চাইবো দিবে?
সৌহার্দ্য ভাবলো বাবা হয়তো ওর লন্ডন যাওয়া নিয়ে কিছু বলবে, তাই সে ভাবনা চিন্তা ছাড়া বলে দিলো, ওকে বলো!
সারহান চৌধুরী ছেলের হাত দুটো নিজের হতে শক্ত করে চেপে ধরে বলল, আকরামের মেয়েটাকে বিয়ে করো তুমি! বলেই ছেলের দিকে আকুতি ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো!
সৌহার্দ্য যেন টুপ করে আকাশ থেকে পড়ল, বাবার কথায় অবাক দৃষ্টিতে বারার দিকে তাকিয়ে বলল,
তোমার মাথা খারাপ বাবা কি বলছো এসব? ওই ট্যাবলেট কে কিছুতে আমি বিয়ে করতে পারবো না, আর আমাদের বয়সের ব্যবধান দেখছো আমি ২৬+ অলরেডি আর ওটা অসম্ভব!
সারহান চৌধুরী একটু অসহায় কন্ঠে বলল , ও কিন্তু খুব ছোট না পনেরো বছর চলে, তোমার মা ও আমার থেকে ৮ বছরের ছোট ছিলো , এখানে আমি কোন সমস্যা দেখছি না!
সৌহার্দ্য চোখে মুখে একরাশ বিরক্তি টেনে বলল, সে যাই হোক আমি নিজের বাচ্চা পালার বয়সে পরের বাচ্চা পালতে পারবোন, তার থেকে বড় কথা আমি এই মুহূর্তে বিয়ে করতে চাচ্ছি না!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সৌহার্দ্য বাবার অসুস্থতার কাছে হার মানলো, ছেলেকে রাজি না করাতে পেরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে , এমনিতে ওনার হার্ট এ সমস্যা ছিলো!
সে দিন রাত বারোটায় কাজি ডেকে বিয়ে পড়ানো হয় তাদের, তখন বাবার প্রতি রাগ অভিমানে সৌহার্দ্য কবুল বলেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, এরপর সুজনের বাসায় ২ মাস থেকে সেখান থেকে সোজা লন্ডন পাড়ি জমায়! ফেলে রেখে যায় তার নববিবাহিতা কিশোরী বধূ যে এখন তার কাছে #অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী!
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪
বর্তমান
রিদির ফ্রেশ হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। রান্নাঘরে সাথী একা সব সামলাতে পারছে কি না, সেই চিন্তায় তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে বের হয়ে রান্না ঘরে যেতে মেইন দরজায় কাওকে দেখে থমকে দাঁড়ায়….
