Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪
রিদিতা চৌধুরী

সকালের মিষ্টি রোদের আভা জানালার ফাঁক গলে ঘরে এসে পড়েছে, সাথে যোগ হয়েছে পাখির কিচিরমিচির এক অপূর্ব সুর। এই স্নিগ্ধ আলো আর কোলাহলে রিদির ঘুমের ঘোরটা একটু হালকা হলো। আধবোজা চোখেই হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা টেনে নিল সে। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল—সাতটা বেজে গেছে! ধুর! নামাজটাও মিস হয়ে গেল। রাতে দেরি করে ঘুমানোর মাসুল যে এভাবে গুনতে হবে, তা কে জানত!

​বিছানা ছেড়ে তাড়াহুড়ো করে উঠে, শরীরে ওড়নাটা কোনোমতে জড়িয়ে রিদি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। বুকটা ধকপক করছে, রিমা চৌধুরীকে এখন কী বলবে ভাবতে ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে!
​রান্নাঘরে পা রাখতেই মসলার ঝাঁঝালো গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে। সাথী একাগ্র মনে মাংস কষাচ্ছে। পাশের পিঁড়িতে বসে আমেনা এ বাড়ির কাজের খালা, যে এতদিন গ্রামে ছিল, পরম মমতায় মসলা বাটছে। আর রিমা চৌধুরী নিপুণ হাতে আমেনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন দুপুরের মেনুর খুঁটিনাটি। রিদি রান্নাঘরের দরজায় এসে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। অপরাধীর মতো হাত কচলাতে কচলাতে আমতা আমতা করে বলল, “রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল তো… তাই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল, ছোট মা।”
​রিদি ভেবেছিল হয়তো বরাবরের মতো বকাঝকা শুনতে হবে। কিন্তু রিমা চৌধুরী তাকে অবাক করে দিয়ে শুধু একটু বিরক্তির স্বরে বললেন, “কলেজে যাওয়ার আগে দুপুরের রান্নাটা যেন সেরে যাস।” কথাটুকু বলেই তিনি দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।

রিমা চৌধুরী চলে যেতেই পরিবেশটা যেন একটু হালকা হয়ে এল। সাথী এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এবার সুযোগ বুঝে রিদির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে দুষ্টুমির সুরে বলল, “কী রে ননদীনি, আর কত দিন এভাবে ঘোমটার আড়ালে রাত জেগে জামাইয়ের সেবা করে যাবি?”
​আরহানের কোনো বোন নেই, তাই রিদিকে সে আপন বোনের মতোই আগলে রাখে। সেই সুবাদে সাথীও রিদিকে ভালোবাসার জায়গা থেকে ‘ননদীনি’ বলে ডাকে। সাথীর মুখে এমন কথা শুনে রিদি মুখটা ভেঙচি কেটে বলল, “আমার বয়েই গেছে তোমার ওই বেয়াদব দেবরের সেবা করতে!
​কথাটা বলেই সে সাথীকে রান্নায় সাহায্য করতে চেয়ে বলল, আমাকে দাও ভাবী বাকিটা আমি করে দিচ্ছি, তুমি বরং টেবিলে খাবার সাজিয়ে দাও!
সাথী হেসে বারন করে দিয়ে বলল “তুই বরং দুপুরের রান্নার বাকি কাজটুকু একটু গুছিয়ে নে, নাস্তা প্রায় শেষ। আমি ওদিকে সাজিয়ে দিচ্ছি।”

​সাথী ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ির বড়রা ততক্ষণে টেবিলে এসে বসে পড়েছেন। রিদি দুই চুলায় রান্নার চাপিয়ে দিয়ে, আমেনার খালার ওপর নজর রাখার দায়িত্ব সঁপে দিয়ে ডাইনিংয়ের দিকে ছুটল। এত মানুষের খাওয়া-দাওয়া, সব গুছিয়ে পরিবেশন করতে সাথী একা হিমশিম খেয়ে যাবে, হয়তো বাচ্চারাই এতক্ষণে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে।
​ঠিক সেই মুহূর্তেই সিঁড়ির দিক থেকে হাসিখুশি গলার আওয়াজ শোনা গেল। আরহান তার দুই মেয়েকে দুপাশে বগলদাবা করে নিয়ে নিচে নামছে, ঠিক তার পিছু পিছুই নামছে আরবান। রিদি পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত এগিয়ে গেল এবং আরহানের কোল থেকে যোহাকে আলতো করে নিজের কোলে তুলে নিল। আরহান মুচকি হেসে তোহাকে সাথীর কোলে তুলে দিয়ে নিজে নাস্তার টেবিলে বসল।
সাথী আর রিদি বাচ্চা দুটোকে কোলে নিয়ে সবাইকে এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে। আরহানকে খুব তাড়াহুড়া করে খেতে দেখে রিদি এগিয়ে গিয়ে পাতে মাংস তুলে দিতে দিতে বলল— ভাইয়া, আস্তে ধীরে খাও তো। এত তাড়াহুড়া করছো কেন?
আরহান খেতে খেতে বলল— বনু, আজ জরুরি একটা মিটিং আছে রে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে ক্লায়েন্ট অপেক্ষা করছে।

এদিকে যোহা রিদির কোল থেকে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বাবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আরহান সে দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কী করবে, কাজের চাপে বউ বাচ্চাগুলোকে সময় দিতে পারে না, সকালে বের হয় রাত বারোটায় বাড়ি ফিরতে হয়। এত বড় ব্যবসা পুরোটা তাকে একা সামলাতে হচ্ছে। দুই ভাই যে পেশা বেছে নিয়েছে তাতেই তাদের দম ফেলার ফুরসত নেই। তবুও সৌহার্দ্য দেশে আসার পর থেকে টুকিটাকি হেল্প করার চেষ্টা করে! আর আরবান সময় পেলে আড্ডা দিতে ব্যাস্ত!
ওদের কথাবার্তার মাঝে সারহান চৌধুরী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন— তোমার ছেলে কোথায়? বাড়ি ফিরেছে?
শাহেদা চৌধুরী কিছু বলবে তার আগে রিদি মিনমিন করে বলল— আব্বু, উনি রাতে দেরি করে ফিরেছেন। মনে হয় ঘুমাচ্ছেন।
সারহান চৌধুরী কিছু বলবেন তার আগে সিঁড়ির দিকে ধুপধাপ পায়ের শব্দে সবার চোখ সেদিকে ঘুরে গেল। সৌহার্দ্য নামছে। ঘুম ঘুম চোখ, এলোমেলো চুল, পরনে কালো টিশার্ট। ফোনে কিছু টাইপ করছে, মুখটা পাথরের মতো গম্ভীর।

রিদি এক পলক তাকিয়েই দ্রুত মাথার ঘোমটা টেনে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এই লোকের আশে পাশে থাকলে বুকের ভিতর কেমন তোলপাড় করে!
সৌহার্দ্য এসে চেয়ার টেনে বসতেই সারহান চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন— তোমার সাথে আমার কথা আছে।
সৌহার্দ্য প্লেটে নাস্তা নিতে নিতে শান্ত গলায় বলল— বলো!
সারহান চৌধুরী ছেলের প্রতি ভীষণ বিরক্ত। জন্মের পর থেকে এই ছেলে মুখটা পেঁচার মতো করে রাখে আর কথার মাঝে রসকষ বলতে কিছু নেই! মাঝে মাঝে তিনি ভাবেন ডাক্তারের কথা শুনে ছেলের মুখে মুধু না দিয়ে চরম ভুল করছে যার মাসুল গুনছেন এখন! তিনি নিজেকে স্বাভাবিক করে বললেন— রিদিতার ব্যাপারে কিছু ভেবেছ?
সৌহার্দ্য বাবার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গমগমে স্বরে বলল— কে রিদিতা? আর আমি কী ভাববো ওটার ব্যাপারে?
এক সেকেন্ডের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। এই ছেলে নিজের বউয়ের নাম পর্যন্ত জানে না! আদৌ এমন মানুষ আছে যে নিজের বউয়ের নাম জানে না?

সারহান চৌধুরী রাগে গিজগিজ করতে বললেন— অসভ্য ছেলে, তোমার বউ রিদিতা। তার কথাই বলছি আমি!
সৌহার্দ্য একটু নড়েচড়ে বসে খুব ছোট করে বলল— ওহ! যেন কারো নাম মনে পড়েছে মাত্র।
ছেলের এমন উদাসীন ছোট শব্দে তিনি আরও রেগে গেলেন। তিরতিরিয়ে বললেন— কি সিদ্ধান্ত নিলো ওর ব্যাপারে? তুমি কি ওকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছো?
ডিভোর্স শব্দটা কানে যেতেই রিদির বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো। এতক্ষণ রান্নাঘরের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ওদের কথা গুলো শুনছিল। না চাইতেও অবাধ্য চোখগুলো থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। শেষ পর্যন্ত ডিভোর্সি মেয়ের তকমা পেতে হবে? ভাবতেই কেমন অজানা কষ্টে বুক চেপে ধরলো!
এদিকে সৌহার্দ্য নির্বাক হয়ে খাচ্ছে। যেন বাবার কথাটা তার কান পর্যন্ত যায়নি!
সারহান চৌধুরীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। উনি চেঁচিয়ে বললেন— কী সমস্যা তোমার? কথা কানে যাচ্ছে না? উত্তর দিচ্ছ না কেন?
সৌহার্দ্য বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বাবার দিকে এক পলক তাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল— সেটা সময় হলে দেখা যাবে! আর আমার বউকে নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালে চলবে! আমি বুঝে নিবো কি করতে হবে ওটাকে!

বলেই চলে যেতে নিলে চোখ পড়লো রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়ানো রিদির দিকে।
সে দিকে তাকিয়ে চিরচেনা সেই গম্ভীর কণ্ঠে বলল— “ইউ” দেড় ব্যাটারি, এক কাপ কফি দিয়ে যাও ছাদে! বলেই কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেল!
এদিকে সৌহার্দ্যর চোখ অনুসরণ করে তাকাতে সবার চোখ চানাবড়া। আরবান খাওয়া মুখে চিবাতে ভুলে গেল। বেচারা হাসতে গিয়েও বাপ চাচার ভয়ে কোনোরকম চেপে গেল!
আরহান প্রচুর বিরক্ত হলো। নিজের বউকে এমন অদ্ভুত নামে কে ডাকে? ভাই তার জানা নেই!
সারহান চৌধুরী ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা হতাশার নিশ্বাস ফেললেন— এই ছেলে তার আল্লাহর কাছে অনেক করে চাওয়া রহমতের ফল। বিয়ের পর থেকে শরীরের কিছু জটিলতার কারণে মা হতে পারছিলেন না। শাহেদা চৌধুরী একপ্রকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের প্রায় সাত বছর পর ছোট ভাই সারবান চৌধুরীর ছেলে আরহান হওয়ার প্রায় দুই বছর পর অপ্রত্যাশিতভাবে জানতে পারেন তারা বাবা-মা হচ্ছেন!
তাই তো এই ছেলে ওনার প্রাণ। বেশি ধমকে কথা বললে ও বুকটা কেঁপে ওঠে! আর তার ফলাফল হিসাবে এত রাগী আর জেদি!

সবার সামনে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যে রিদির গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় তার দৃষ্টি মাটিতে নেমে গেল। বুকের ভেতরটা তখন ধকধক করছে, অথচ করার কিছুই নেই। যাকে বলে ‘বেয়াদব লোকের পাল্লায় পড়া’—রিদি এখন ঠিক সেই পরিস্থিতির শিকার। দীর্ঘশ্বাস চেপে, লজ্জা-সরম একপাশে সরিয়ে সে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। চুলার ওপর থাকা তরকারিগুলো নামিয়ে দ্রুত হাতে কফির পানি বসাল সে। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দেখল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে কফিটা বানিয়ে সে আমেনা খালার হাতে ধরিয়ে দিয়ে মিনতির সুরে বলল, “খালা, প্লিজ তুমিই ছাদে গিয়ে ওনাকে কফিটা দিয়ে এসো তো? আমার কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি এখন বেরোচ্ছি বলেই কলেজের উদ্দেশ্যে চলে গেল।”
​ওদিকে, খোলা আকাশের নিচে ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সৌহার্দ্য। হাতে ফোন থাকলেও তার চোখ দরজার দিকে, যেন কারো অপেক্ষায় আছে !কিছুক্ষণ পর যখন আমেনা খালাকে কফির মগ হাতে দেখলো, মুহূর্তেই সৌহার্দ্যের চোখে মুখে একরাশ বিরক্তি ফুটে উঠল। রিদির জায়গায় অন্য কাওকে দেখতে পেয়ে সে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
​আমেনা খালা ভয়ে ভয়ে মগটা বাড়িয়ে দিতেই সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল, “আপনি কেন? ওই দেড় ব্যাটারিটা কোথায়?”

​সৌহার্দ্যের এমন রূঢ় আচরণে আমেনা খালা কিছুটা থতমত খেয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন, “দেড় ব্যাটারি? কেডা ছোট স্যার?”
​সৌহার্দ্য গম্ভীর মুখে শীতল গলায় জবাব দিল, “কেউ না, আপনি যান।”
​কথাটা বলেই সে কফির মগটা টেনে নিয়ে এক চুমুক দিল। তার দৃষ্টি তখন ছাদের রেলিং ছাপিয়ে বাড়ির মেইন গেটের দিকে। কফির তিক্ততা আর মনের ভেতরের জটিল অনুভূতি—সব মিলিয়ে তার মুখটা পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে, যা দেখে বোঝার উপায় নেই মনে কি চলচে!
কলেজের করিডোর দিয়ে আপনমনে হেঁটে যাচ্ছিল সুমি। হঠাৎ কারো সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতেই এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত আলতো করে তাকে টেনে দাঁড় করালো। সুমি চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী, শ্যামবর্ণের সুদর্শন পুরুষ। লোকটির চোখের চাহনি যেন সুমিকে গ্রাস করতে চাইছে। সুমির গা শিউরে উঠল বিরপ্তিতে।
সুমি মুখ কুঁচকে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, “জীবনে কখনো মেয়ে মানুষ দেখেননি? এভাবে জাউড়ার মতো তাকিয়ে আছেন কেন? অসভ্য ব্যাটা ছেলে একটা!”

​সুজন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ৩০ বছরের জীবনে যে মানুষটি কোনো নারীর দিকে ফিরেও তাকায়নি, সে কিনা আজ হাঁটুর বয়সী এক মেয়ের দিকে ভ্যাবলাকান্তের মতো চেয়ে ছিল! নিজের ওপরই ভীষণ লজ্জা আর অস্বস্তি ভর করল তার। কৈফিয়ত স্বরে কিছু বলবে তার আগেই সুমি মুখ ঝামটা দিয়ে হনহন করে চলে গেল।
সুজন সুমির যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল, “কী বেয়াদব মেয়ে বাবা! একটু তাকিয়েছি বলে মনে হলো গায়ে ফোসকা পড়ে গেল! ঠিক যেন সৌহার্দ্যের মহিলা ভার্সন -পুরা একটা রাগের ড্রাম!” ডাঃ সুজন হায়দার সৌহার্দ্যের সব থেকে কাছের বন্ধু!
​কলেজ শেষ করে রিদি আজ পাশের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে এসেছে। পিরিয়ডের সময় পেটে তীব্র ব্যথাটা গত দুই মাস ধরে অসহ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। শাহেদা চৌধুরীকে জানাতে ওনার পরামর্শে একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ কাছে সিরিয়াল নিয়েছিল সে। কিন্তু ডাক্তারের অপারেশন থাকায় বের হতে হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল।
​হাসপাতাল থেকে কিছুটা দূরে হেঁটে এসে রিদি রিকশা জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। রাস্তাটা বেশ নির্জন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্তি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই একটা কালো গাড়ি এসে তার সামনে ব্রেক কষল। রিদির ভয়ে বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। মাথা তুলে তাকাতে দেখলো, গাড়ির ভেতর থেকে বিরক্ত মুখে কেউ একজন তাকিয়ে আছে তার দিকে।

রিদি এক পলক তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল—লোকটার মুখটা এমন করে রেখেছে যেন, মুখে তিতা করলা গুঁজে বসে আছে!
​রিদি পাশ কাটিয়ে দ্রুত হাঁটা দিতেই সৌহার্দ্যের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ,” হেই স্যাসি গার্ল, গাড়িতে ওঠো। রাস্তাটা ভালো না, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”
​সৌহার্দ্যের কণ্ঠে অধিকারবোধের সুর রিদির শিরদাঁড়া দিয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে দিল। ঠিক তখনই কিছু মনে পড়তে রাগে-অভিমানে শরীর কাঁপছে তার। বাসায় নিজের স্ত্রী জীবিত না মৃত, সেই খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই, অথচ রাস্তাঘাটে অন্য মেয়ের প্রতি কী অসীম কনসার্ন! কথাটা মাথায় আসতে রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
রাগে অভিমানে দাঁতে দাঁত চেপে বলে বলল, “লুচ্চা অসভ্য ডাক্তার! ঘরে বউ রেখে অন্য মেয়ের প্রতি এমন দরদ দেখাতে লজ্জা করে না?”

​রিদির এমন বিস্ফোরক আচরণে সৌহার্দ্যের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন এল না, বরং শান্ত গলায় নির্বাক হয়ে বলল, “আমার ঘরে বউ আছে, এটা তুমি জানলে কীভাবে?”
​রিদি মুহূর্তেই থমকে গেল। রাগের মাথায় বড় ভুল করে ফেলেছে বুঝতে পেরে ছটফট করে বলল, “না জানার কী আছে? আধবুড়া একটা লোক, ঘরে বউ থাকা তো স্বাভাবিক!” বলেই সে আবার হাঁটা শুরু করল।
এবার সৌহার্দ্য রেগে গিয়ে দাঁত চেপে ডাকল, “এই মেয়ে, কানে যাচ্ছে না আমার কথা?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩

​রিদি এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। যে করেই হোক, এই লোকটির গাড়িতে ওঠা যাবে না। সে কঠোর গলায় বলল, “আপনি যদি আমাকে আর একবার বিরক্ত করেন, আমি কিন্তু লোক জড়ো করব চিৎকার করে!”
​সৌহার্দ্য কোনো কথা বলল না, শুধু নির্বিকার ভঙ্গিতে একবার তাকাল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৌহার্দ্য গাড়ি থেকে নেমে এল। রিদির কোনো আপত্তির তোয়াক্কা না করে তার জামার হাতার এক অংশ আলতো করে টেনে ধরে সোজা গাড়ির দিকে নিয়ে চলল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে গাড়িতে ছুঁড়ে ফেলার মত বসিয়ে দরজা আটকে দিল।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here