অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৯
রিদিতা চৌধুরী
ইউ উইল গেট ইট, অন টাইম।”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠে কোনো বাড়তি সুর নেই, নেই কোনো সংশয়—আছে কেবল এক জমাটবাঁধা বরফশীতল নিশ্চয়তা। রিদির মনে হলো, ওর বুকের ভেতরটা কেউ যেন ধারালো কোনো ছুরি দিয়ে নিপুণ দক্ষতায় চিরে দিল। যে ‘মুক্তি’র আশায় সে নিজেই এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিল, আজ সেই শব্দগুলোই তার গলার কাঁটা হয়ে বিঁধছে। অবরুদ্ধ এক দীর্ঘশ্বাস কোনোমতে বুকের গভীরে চেপে রেখে রিদি ক্ষীণ স্বরে বলল, “ঠিক আছে।”
‘ঠিক আছে’—কথাটা কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই সৌহার্দ্যের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুহূর্তের ব্যবধানেই যেন নিয়ন্ত্রণ হারাল তার ধৈর্য। রাগে উন্মত্ত হয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফুলদানিটি সে আছড়ে মারল দেয়ালের গায়ে। কাঁচ ভাঙার তীব্র শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল। ভয়ে রিদি এক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে থাকল সৌহার্দ্যের ওপর।
সৌহার্দ্যের মুখমণ্ডল রাগে আর অপমানে লালচে হয়ে উঠেছে, জ্বলন্ত চোখজোড়া থেকে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে। রিদির দিকে তাকিয়ে বজ্রকঠিন স্বরে গর্জে উঠে বলল, “গেট আউট ফ্রম মাই রুম! এখনই বেরিয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। আবারও যদি তোমাকে আমার সামনে দেখি, তবে ফল তোমার জন্য মোটেও ভালো হবে না!”
কথাটা বলেই উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো দ্রুত পায়ে সে নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল ভাঙা কাঁচের টুকরো আর একরাশ দমবন্ধ করা স্তব্ধতা।
এতক্ষণ ভয়ে স্থবির হয়ে থাকা রিদির ভেতরটা এখন তীব্র অভিমানে আর রাগে টগবগ করে ফুটছে। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,”তোর মত অসভ্য ডাঃ এর সামনে পড়ার ইচ্ছা ও আমার নাই, বেয়াদব লোক জাতে মাতাল তালে ঠিক নিজে বলছে তাতে সমস্যা নাই , আমি বলাতে জ্বলে যাচ্ছে!
নিজের ওপর রাগ আর বিরক্তিতে গুমরে না থেকে সে দ্রুত রুমটা পরিষ্কার করে নিচে নেমে গেল। সাথী বাচ্চাদের নিয়ে আজ ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। এদিকে ফুফুদের তো আর অভুক্ত রাখা যায় না। আরিফা খান যদিও চলে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রিদির অশেষ অনুরোধে ডিনার শেষ করে যেতে তিনি ডিনার টাইম পর্যন্ত রয়ে গেল। রিমা চৌধুরী অবশ্য আজ সকালে বোনের সাথে তার বাড়ি গিয়েছেন, দিন দুয়েকের আগে ফেরার সম্ভাবনা নেই।
রাত ডিনার শেষে রিদির ফুফুরা বিদায় নিলো। ঘরজুড়ে নেমে এল এক নিস্তব্ধতা। রিদি ড্রয়িং রুমে একা বসে আছে। আরবান ফোনে জানিয়েছে, সৌহার্দ্যের হাসপাতালে একটা বড় ঝামেলা চলছে। কোনো এক নার্সের ভুল ইনজেকশনের কারণে এক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌহার্দ্য। কখন ফিরবে তার কোনো ঠিক নেই।
ঘড়ির কাঁটা প্রায় রাত একটা ছুঁইছুঁই। ক্লান্ত শরীর নিয়ে রিদি আর বসে থাকতে পারল না। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমেনা খালাকে কড়া করে বলে দিয়ে গেল, সৌহার্দ্য ফিরলেই যেন তাকে ডেকে তোলা হয়। মানুষটা এত ধকল সামলে ফেরার পর যদি না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে, এই চিন্তায় ঠিক ভাবে ঘুমটা ও হলো না—
রিদির আজ সকালটা শুরু হয়েছে একরাশ অস্বস্তি নিয়ে। আরবান গতকাল রাতে হাসপাতালের যে ঝামেলাগুলোর কথা বলেছিল, তা শোনার পর থেকেই মনের ভেতর এক অজানা ভয় বাসা বেঁধেছে। নাস্তার টেবিলে সবাই উপস্থিত; রিদি খুব যত্নের সাথে সবাইকে খাবার পরিবেশন করছে। সাথী পাশে বসে দুই বাচ্চার জ্বর নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে—গতকাল রাত থেকেই মেয়ে দুটোর শরীর বেশ গরম। সবার মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ কাজ করছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সদর দরজা ঠেলে ভেতরে এল সৌহার্দ্য। তার সাথে সুজন। সৌহার্দ্যর অবয়ব দেখে ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো, যা তাজা রক্তের দাগে লালচে হয়ে আছে। ডান হাতটা কাঁধের সাথে ঝোলানো—যেন কোনো এক বড় দুর্ঘটনার নীরব সাক্ষী।
ছেলের এই রক্তাক্ত রূপ দেখে শাহেদা চৌধুরী নিজেকে সামলাতে পারলেন না। দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে জাপটে ধরে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে তার ওপর। সারহান চৌধুরী চেয়ারে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন, নিজের বুকের ওপর হাত চেপে ধরে। যে ছেলেকে কোনদিন এতটুকু আঁচড় লাগতে দেননি, যার ওপর কোনো দিন ধুলোবালি পড়তে দেননি, আজ তার এই বীভৎস দশা দেখার মতো মানসিক শক্তি তার নেই।
আরহান দৌড়ে গিয়ে ভাইয়ের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিল। সুজনের দিকে অগ্নিশর্মা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে চিৎকার করে বলল, “কী করে হলো এসব? আরবান কোথায়? রাতে এতবার ফোন দিলাম, একটা বারও ধরলি না কেন?” এত বড় একটা ঘটনা আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলিনা!
সুজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে বলল, ভাইয়া শান্ত হও“আরবান ওষুধের খোঁজে গেছে। এত সকালে এই এলাকায় খোলা ফার্মেসি পাওয়া কঠিন, তাই আমার এক বন্ধুর ফার্মেসিতে ওকে পাঠিয়েছি।”
সারহান চৌধুরী আরহান বা সুজনের দিকে তাকানোর মতো পরিস্থিতিতে ছিলেন না। তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “এসব প্রশ্নের উত্তর পরে পাওয়া যাবে। আগে ওকে উপরে নিয়ে যা। দেখছিস না, ছেলেটা সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না?”
সৌহার্দ্যর হুঁশ প্রায় নেই বললেই চলে। শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারছে না, বারবার একদিকে হেলে যাচ্ছে। তার চোখদুটো যেন কোনো এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে, তন্দ্রাচ্ছন্ন সেই চোখের পাতাগুলো বারবার বুজে আসছে।
রিদি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কণ্ঠনালীতে যেন এক দলা হিমশীতল শূন্যতা দলা পাকিয়ে আটকে আছে; সমস্ত ভাষা, সমস্ত আবেগ এক নিমেষে বিলীন হয়ে গেছে। শরীরটা ধীরে ধীরে পাথরের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে তার। মনের গহীনে এক তীব্র আর্তনাদ—ছুটে গিয়ে লোকটাকে বুকের ভেতর জাপটে ধরার প্রবল এক বাসনা দানা বাঁধছে। কিন্তু সেই অধিকার? সেই লোকটাই তো সেই আকাশচুম্বী দূরত্ব তৈরি করে রেখেছে, যে সীমানা ডিঙানোর অনুমতি তার নেই।
রিদির এই নীরবতাকে চিরে সুজনের কণ্ঠ ভেসে এল, কিছুটা ব্যস্ততা আর অনেকখানি নির্লিপ্ততায়, “রিদু বোন, ফার্স্ট এইড বক্সটা আর একটু গরম পানি নিয়ে আসো তো। সৌহার্দ্যের ব্যান্ডেজটা বদলাতে হবে।” কথাগুলো শেষ করেই সুজন আর আরহানকে নিয়ে সৌহার্দ্যকে তার ঘরে নিয়ে গেল।
সুজনের ডাকে রিদির ঘোর ভাঙল। সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটল, যেন ব্যস্ততা দিয়ে সে নিজের ভেতরের এই হাহাকারটুকু ঢেকে ফেলতে চাইছে। গরম পানি আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে যখন সে ঘরের দরজায় পৌঁছাল, তখন ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।
ব্যান্ডেজ খোলার সুবিধার্থে আরহান সৌহার্দ্যকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বসাতে গেল। আচ্ছন্নতার ঘোর কাটিয়ে সৌহার্দ্য নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “তুই আমাকে কেন জড়িয়ে ধরছিস?”হোয়্যার ইজ মাই ওয়াইফ? লেট মি গো!”
সৌহার্দ্যের এই আকস্মিক দাবিতে আরহান খানিকটা থমকে গেল। বিরক্তি আর অস্বস্তিতে সে কড়া গলায় বলল,
“অসভ্য, থাম একটু! এমনি তো বউকে মানিস না, এখন বউ বউ করে কি করবি বউ দিয়ে?”
সৌহার্দ্য যেন সেই কথার মানেই বুঝতে পারল না, আচ্ছন্ন অবস্থাতেই আবার বলে উঠল, “তুই যা করিস…”
আরহানের গলায় যেন দলা পাকানো অস্বস্তি, সে শুকনো কাশিতে নিজেকে সামলানোর ভান করল , ছোট ভাইয়ের মুখে এমন কথা ,অস্বস্তিতে ফেলল বেচারেকে। এই বেয়াদবের সাথে এখন কথা বলা মানে নিজের ইজ্জতের ফালুদা করা!
সুজন অসহ্য বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফিসফিস করে বলল, “শালা! বউ বলে স্বীকারই করে না, অথচ এক্সিডেন্টের পর থেকে বউ বউ করে মুখের ফেনা তুলে ফেলেছে। কী যে জ্বালান জ্বালিয়েছে আমাকে আর আরবান কে!”
কথাগুলো বলতে বলতেই সুজন ব্যান্ডেজ খোলার কাজে মন দিল।
ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে সবটা শুনে রিদির লজ্জা যেন আর ধরছিল না। গাল দুটো লাল হয়ে উঠল তার। মানুষটা এমন বেহায়া যে এই শারীরিক অবস্থাতেও এমন অসভ্য কথা কীভাবে বলতে পারে! সে লজ্জা আপ্রাণ চেপে কোনোমতে পানি আর ফার্স্ট এইড বক্সটা সুজনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
সুজন পেশাদার হাতে মাথার ব্যান্ডেজটা ঠিকঠাক করে একটা ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে দিল সৌহার্দ্যকে। এরপর পরম যত্নে তাকে বালিশের ওপর এলিয়ে দিল, যাতে ক্ষতের ওপর কোনো চাপ না লাগে। রিদির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “রিদু, কোনো সমস্যা হলে আমাকে বা আরবানকে ফোন দিও। ইনজেকশনের প্রভাবে ও কয়েক ঘণ্টা টানা ঘুমাবে, তাই চিন্তার কিছু নেই। ঘুম ভাঙলে হয়তো ও নিজের চাহিদার কথা নিজেই বলতে পারবে। তবে খেয়াল রাখিও, জ্বর আসতে পারে। আরবান আসলে ওষুধগুলোর নিয়ম বুঝে নিও।”
কথা গুলো বলে আরহানের কে নিয়ে সুজন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রিদি অপলক তাকিয়ে রইল অচেতন সৌহার্দ্যের সেই নিথর চেহারার দিকে।
সুজন আর আরহান ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শাহেদা চৌধুরী ভারী পায়ে এগিয়ে এলেন ছেলের শিয়রে। অপলক তাকিয়ে রইলেন প্রিয় সন্তানের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে। সরহান চৌধুরীও পাশে এসে দাঁড়ালেন, কিন্তু ছেলের এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে তিনি বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারলেন না। রিদির দিকে তাকিয়ে আলতো করে তাকে দেখার দায়িত্ব দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। তার ছলছল চোখ দুটো তখন যেন বহু কষ্টের আড়ালে থাকা এক সমুদ্র অশ্রু আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল।
রিদি আর স্থির থাকতে পারল না। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শাহেদা চৌধুরীকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল সে। গলায় কান্নার রেশ নিয়ে মিনতি করে বলল, “আম্মু, প্লিজ, এভাবে কাঁদবেন না। আপানি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ওনি ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে, আমি ওনার পাশে আছি। আপনি বরং ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেন, আমি ওনাকে দেখছি।”
ছেলের মাথায় আর কপালে শেষবার আদরের হাত বুলিয়ে শাহেদা চৌধুরী চোখের পানি মুছে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সবাই চলে যেতেই চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে এল। রিদি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সৌহার্দ্যের মাথার কাছে বসল। এতক্ষণ সবার সামনে নিজেকে সামলে রাখলেও, এখন আর বাঁধ মানল না তার চোখের জল। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া সেই উষ্ণ জলবিন্দুগুলো টুপ করে ঝরে পড়ল বিছানার চাদরে। বুকের ভেতরটা তীব্র অভিমানে আর যন্ত্রণায় পুড়ে যাচ্ছে রিদির।
অচেতন সৌহার্দ্যের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রিদির মনে পড়ে গেল সেই নিষ্ঠুর মুহূর্তগুলো। মানুষটা কত সহজে ডিভোর্স দিতে রাজি হয়ে গিয়েছিল, অথচ এই মানুষটাকেই সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে! কতটা অবহেলা আর ঘৃণা জমে থাকলে মানুষ এতটা নির্দয় হতে পারে?
রিদি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আলতো হাতে সৌহার্দ্যের কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে শুরু করল সে। জীবনে প্রথমবার সৌহার্দ্যের এত কাছে আসার সুযোগ পেল রিদি, অথচ সেই ভাগ্যটা এল এমন এক দুঃসময়ে, যখন সে মানুষটিই হুঁশহীন।
সকাল গড়িয়ে বিকেল নামল। বাড়ির বাকি সবাইকে দুপুরের খাবার খাইয়ে, সব কাজ গুছিয়ে রিদি যখন সৌহার্দ্যের রুমে ফিরল, তখনো চারপাশটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। ঘরে গিয়ে দেখল, সৌহার্দ্য ঠিক একইভাবে শুয়ে আছে—কোনো নড়াচড়া নেই। বিকেলের ম্লান আলোয় তার নিথর মুখটা দেখে রিদির বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল তার। কোনো অশুভ আশঙ্কায় রিদি দ্রুত শয্যার পাশে গিয়ে বসল। কাঁপাকাঁপা হাতে সৌহার্দ্যের বুকের ওপর মাথা রাখল সে, হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনার আশায়। ধুকপুক আওয়াজটা শোনা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘশ্বাসগুলো বড্ড বেশি ক্ষীণ মনে হচ্ছে।
নিজেকে আর সামলাতে না পেরে কাঁপতে থাকা আঙুলে ফোনটা তুলে আরবানকে কল করল রিদি। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই উদ্বেগে গলা ধরে এল তার। রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল, “ভাইয়া, ওনি এখনো উঠছে না কেন? নিশ্বাসগুলো এত আস্তে কেন নিচ্ছে? আমার খুব ভয় করছে, ভাইয়া!”
ওপাশে আরবান শান্ত গলায় রিদির অস্থিরতা অনুভব করতে পারল। সে ধীরস্থির স্বরে বোনকে আশ্বস্ত করে বলল, “রিল্যাক্স, রিদু। তুই শান্ত হ। ব্রো কে যে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, তা বেশ শক্তিশালী। ওষুধের ঘোর কাটতে একটু সময় লাগবে, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ও জেগে উঠবে। একদম টেনশন করিস না। আমি ডিউটি শেষ করে একটু পরেই আসছি।”
আরবানের আশ্বাসে রিদি কিছুটা ধাতস্থ হলো। সে ফোনটা রেখে আবার সৌহার্দ্যের শিয়রে বসল। বিকেলের বিষণ্ণ আলোয় ঘুমন্ত সৌহার্দ্যের চিবুকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে সে নিস্তব্ধ অপেক্ষায় প্রহর গুনতে লাগল।
রাত তখন প্রায় আটটা। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সৌহার্দ্যের ভাঙা ভাঙা ঘুমের ঘোর কাটল। চোখ মেলতেই মাথার ভেতরটা চক্কর দিয়ে উঠল, শরীরের যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল সে। বুকের ওপর কেমন ভারী একটা অনুভূতি, নিচের দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল—রিদি তার বুকের কাছে মুখ গুঁজে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে।
সৌহার্দ্য পলকহীন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রিদির শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। রিদির এলোমেলো চুলগুলো তার চোখের ওপর এসে পড়ছে। নিজের বাম হাতটা বাড়িয়ে অত্যন্ত আলতো করে রিদিকে পাশে সরিয়ে শুইয়ে দিল সে। এরপর আঙুল দিয়ে রিদির চোখের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে উঠল, “স্টুপিড! রোগীর সেবা করতে এসে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে।”
বলেই একটু ঝুঁকে রিদির মুখের খুব কাছে চলে এল সৌহার্দ্য। নিজের অগোচরেই, ঘোরলাগা আবেশে সে রিদির কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল। পরক্ষণেই নিজের এই আচরণের ওপর প্রচণ্ড বিরক্তি এল তার। নিজেকে সামলে নিতেই সে সরে আসার চেষ্টা করল, ঠিক তখনই রিদির চোখের পাতা কেঁপে উঠল। রিদি তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে তাকাতেই সৌহার্দ্য যেন পাথরের মতো জমে গেল।
হঠাৎ করেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটল। গলার স্বর খাঁকারি দিয়ে ঠিক করে নিল সে, মুখে ফুটিয়ে তুলল কৃত্রিম বিরক্তি। কঠিন গলায় বলল, “ইউ দেড় ব্যাটারি! আমার রুমে কী করছ? গেট আউট ফ্রম মাই রুম!”
হঠাৎ এমন ধমক খেয়ে রিদি বুক থেকে হাত নামিয়ে ভড়কে উঠে বসল। রাগে-ভয়ে বুকে থুথু করতে করতে বলল, “অসভ্য ডাক্তার একটা! আরেকটু হলে তো হার্ট অ্যাটাক করিয়ে মেরেই ফেলতেন! এমন করে চেঁচানোর কী হলো?” রিদি নিজেই বুঝতে পারল না, কখন সে সৌহার্দ্যের পাশে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সৌহার্দ্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমার রুমে আসার পারমিশন দিল কে তোমাকে? কে বলেছে এত নাটকীয় দরদ দেখাতে? বের হও বলছি আমার রুম থেকে!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৮
রিদি এবার মেজাজ হারাল। নাক-মুখ কুঁচকে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, “বেয়াদব লোক! হাত ভেঙে, মাথা ফাটিয়ে জমের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে, তবু তেজ কমছে না! আর একটা উল্টোপাল্টা কথা যদি মুখ দিয়ে বের করেছেন, তবে ওই ভালো হাতটাও ভেঙে দেবো বলে দিলাম!”
রাগে গজগজ করতে করতে রিদি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার পিছু পিছু তাকিয়ে সৌহার্দ্য আবারও বিরবির করে উঠল, “স্টুপিড দেড় ব্যাটারি একটা… কপালে জুটছে আমার!”
