অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৫
রিদিতা চৌধুরী
দরজায় জোরালো টোকার শব্দে রিদির ঘোর যেন হঠাৎ ভেঙে গেল। তার হৃৎপিণ্ড তখনও ধুকপুক করছে, যেন কোনো বড় বিপদ থেকে বেঁচে ফেরার হাফ ছেড়ে বাঁচল সে। দরজার ওপাশের মানুষটির জন্য মনে মনে অসংখ্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল রিদি। লজ্জায় আর চরম অস্বস্তিতে তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, যেন কেউ আগুনের আঁচ দিয়েছে তাতে। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে এক ধাপ পিছিয়ে গেল।
সৌহার্দ্যের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এমন একটা মুহূর্তে ব্যাঘাত ঘটায় সে রীতিমতো বিরক্ত। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“কাম ইন!”
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সুজন। সে বুঝতেই পারেনি ভেতরে ঠিক কী পরিস্থিতি চলছে। রিদিকে এভাবে সৌহার্দ্যের চেম্বারে অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে সুজন একটু অবাক হয়ে বলল, “ও এখানে কী করছে? কী করছিস ওর সাথে? এরকম ভয় পেয়ে আছে কেন?”
সৌহার্দ্য বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে বলল, “কী করতে দিয়েছিস তুই, স্টুপিড? কী এমন কাজ যে তোর এখন না আসলে হতো না?”
সৌহার্দ্যের এমন বেপরোয়া কথায় রিদির অবস্থা নাজেহাল। সে বিরবির করে বলল, “অসভ্য লোক!” বলেই এক সেকেন্ডও আর দাঁড়াল না, দৌড়ে কোনো রকম সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেল।
এদিকে সৌহার্দ্যের এমন আচরণে সুজন থমথম খেয়ে গেল। সুজনকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য রাগ আর বিরক্তি নিয়ে বলল, “গাধার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে বল কেন এসেছিস?”
সুজন একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, “তুই এমন রেগে যাচ্ছিস কেন? কাহিনী কী বল তো? বউ মানিনা মানিনা ব…”
সুজন বাকিটা শেষ করতে পারল না, তার আগেই সৌহার্দ্য চেঁচিয়ে বলল, “জাস্ট শাট আপ, সুজন! ফালতু কথা বলবি না। ও একটা পড়া বুঝতে পারেনি ক্লাসে, তাই বুঝে নিতে এসেছে!”
সুজন দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “এমন একটা ছাত্রী কেন যে নাই দরজা বন্ধ করে প…” আর বলতে পারল না, সৌহার্দ্য ফাইল ছুড়ে দিয়ে বলল, “গো!”
সুজন ফাইলটা নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যাবে, তার আগে কিছু একটা মনে পড়তেই থমকে দাঁড়াল। সৌহার্দ্য বিরক্তি নিয়ে তাকাল। সুজন সিরিয়াস মুখ নিয়ে বলল, “তোর সতান আসছে!”
সৌহার্দ্য চেঁচিয়ে বলল, “হোয়াট ইজ সতান?” সুজন একটু ভাবুক হয়ে বলল, “মেয়েদের বেলায় যাকে সতিন বলা হয়?”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকালে সুজন একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল, “ওই যে বীরের চাচাতো ভাই, যার কথা বীর বলত। রিদি যাকে ছোটবেলায় বিয়ে করব করব বলে হেদিয়ে মরত, তাজওয়ান শিকদার এই হাসপাতালে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে জয়েন করবে!”
কথাটা বলেই আবার যেতে যেতে বলল, “ভাই সাবধান, বউ কিন্তু আগে থেকে ক্রাশ খেয়ে আছে!” সৌহার্দ্য রাগী দৃষ্টিতে তাকালে সুজন কোনো রকম ফাইলটা নিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়ল।
সুজন চলে যেতেই সৌহার্দ্য রাগে বিড়বিড় করে বলল, “একটা দেড় ব্যাটারি জীবন বরবাদ করে দিল। শান্তি নেই কপালে, ছেঁড়া জিন্দেগি!”
কলেজের গেট দিয়ে বের হতেই রিদির চোখ আটকে গেল সামনের দৃশ্যটিতে। আরহানের সাথে শাহেদা চৌধুরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সমস্ত সংকোচ আর দ্বিধা ভুলে রিদি দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরল শাহেদা চৌধুরীকে, তার কন্ঠ চিরে বেরিয়ে এল এক আর্তনাদ, “আম্মু! আপনি? আপনি এখানে কীভাবে?”
শাহেদা চৌধুরী দুই হাতে রিদিকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলেন। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে, অভিমান আর আদরের মিশ্রণে ভারী গলায় বললেন, “কে তোর আম্মু? সত্যি যদি মা বলে মানতিস, তবে কি এভাবে বুক খালি করে চলে আসতে পারতিস?”
রিদির চোখের কোণে জল চিকচিক করছে, কিন্তু গলার কাছে একটা পাথরের মতো দলা পাকিয়ে আছে কান্না। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দগুলো তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল না। তার মনের আর্তনাদ প্রতিধ্বনি করে উঠল—’আমি কী করব আম্মু? যার জন্য তুমি আমাকে নিজের করে নিয়ে গিয়েছিলে, সে তো আমাকে চায়ই না! সে তো আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও মেনে নিতে পারছে না!’
মনের গহীনে জমানো এই তীব্র হাহাকারগুলো সে কেবল নিজের ভেতরেই চেপে রাখল। শাহেদা চৌধুরীর বুক থেকে মাথা তুলে চোখের জল মুছে রিদি ম্লান স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আপনার শরীর এখন কেমন আম্মু? ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছেন তো?”
শাহেদা চৌধুরী রিদির কপালে আলতো করে একটা স্নেহের চুমু খেলেন। ভেজা চোখে হাসার চেষ্টা করে বললেন, “খাচ্ছি মা, সব খাচ্ছি। তুই এখন আমার সাথে চল।”
রিদি অসহায় চোখে তাকিয়ে বিনয়ের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করে বলল, “না আম্মু, প্লিজ রাগ করবেন না। আমি যেতে পারব না।”
শাহেদা চৌধুরী রিদির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন, “আমার জন্য চল আমার মেয়ে হয়ে, তোকে বাবুর জন্য যেতে বলছি না ? আমার মেয়ে হয়ে তুই কি তোর মায়ের কথাটা রাখতে পারবি না? মাত্র দুটি দিনের জন্য একটু ঘুরে আয় না মা?”
রিদি কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই আরহান কাতর স্বরে বলল, “প্লিজ বোন, তুই চল। আমি কথা দিচ্ছি, দুদিন পরেই তোকে আবার আমি নিজে শিকদার বাড়িতে দিয়ে আসব।”
রিদির চোখের সামনে ভেসে উঠল একঝাঁক মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। একটা মানুষের অবহেলা আর তিক্ততার জন্য কি বাকি সবার এই পবিত্র ভালোবাসা সে অস্বীকার করতে পারে? রিদি আর অমত করতে পারল না, মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
দীর্ঘ এক মাস বিশ দিন পর রিদি যখন চৌধুরী বাড়ির চেনা চৌকাঠে পা রাখল, তখন তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হুহু করে উঠল। যে বাড়িটিতে সে তার জীবনের চারটি বছর হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার মিশেলে কাটিয়ে দিয়েছে, আজ সেই প্রিয় অন্দরমহলের প্রতিটি কোণ তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর নস্টালজিয়া জাগিয়ে তুলল। রিদির চোখজোড়া ভিজে এল, সে মায়াভরা দৃষ্টিতে বাড়ির চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
ঠিক তখনই, সব নীরবতা ভেঙে সাথি আর রিভা দৌড়ে এসে রিদিকে জাপটে ধরল। সাথির চোখের কোণ চিকচিক করছিল, সে রিদিকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় বলল, “এতটা নিষ্ঠুর তুই কীভাবে হতে পারিস রিদি? একটা মানুষের ভুলের শাস্তি তুই আমাদের সবাইকে দিচ্ছিস কেন?”
সাথির কথার রেশ কাটতে না কাটতেই রিভা তার স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, “আমি এখানে থাকা পর্যন্ত তোমাকে আর এখান থেকে এক কদমও যেতে দেব না! বলে দিলাম, দরকার হলে ভাইয়াকে আমি বাড়ি থেকে বের করে দেব, তবুও তোমাকে যেতে দেব না।”
রিভার এই পাগলামিতে রিদির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে ওদের দুজনকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। এই ভালোবাসাটুকুই তো ছিল তার বেঁচে থাকার রসদ। ওদের এই খুনসুটির মাঝে হঠাৎই রিমা চৌধুরী উপস্থিত হলেন। রিদির দিকে তাকিয়ে তিনি কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেন, দৃষ্টিতে এক ধরনের অপরাধবোধ আর অস্বস্তি। তিনি ঢোক গিলে অনুতপ্ত সুরে বললেন, “কেমন আছিস?”
রিদি কিছুটা অবাক হলো। রিমা চৌধুরীর কাছ থেকে এমন সৌজন্যবোধ আশা করেনি সে। তবুও রিদি নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি টেনে বলল, “ভালো আছি, ছোট মা।”
চৌধুরী বাড়িটা যেন আজ দীর্ঘদিন পর পূর্ণতা পেল, প্রতিটি দেয়ালে যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটার সুর বাজছে।
সন্ধ্যা প্রায় গড়িয়ে আসছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি, টানা দুটো ওটি—সব মিলিয়ে সৌহার্দ্য যেন আজ শরীর আর মনের দিক থেকে পুরোপুরি নিঃশেষ। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই সে সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিল। পরনের কালো শার্টটা প্যান্ট থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছে, কপালে লেপ্টে থাকা অবিন্যস্ত চুলগুলো তার চূড়ান্ত ক্লান্তির সাক্ষী দিচ্ছে। চোখের পাতা দুটো যেন একে অপরের সাথে আঠার মতো লেগে আছে।
হঠাৎ করেই পাশে কারো উপস্থিতির আভাস পেল সে। চোখ না খুলেই আলতো করে মাথাটা ফেরাল। ঠিক তখনি তার চোখের সামনে ভেসে উঠল শরবতের গ্লাস। তৃষ্ণার্ত শরীর আর অবচেতন মন কোনো যুক্তিই মানল না, সে হাত বাড়িয়েই গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পান করে ফেলল। কিন্তু শরবতের স্বাদটা জিভে আসতেই কেমন যেন এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল তার শরীরে। চোখ মেলে তাকাতেই তার সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই উবে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে রিদি!
সৌহার্দ্য পলকহীন তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই ভাবল, হয়তো মনের ভুল, অতিরিক্ত ক্লান্তিতে ভ্রম দেখছে সে। বিরবির করে কিছু একটা বলে সে আবার চোখ বুজল, কিন্তু দ্বিতীয়বার তাকাতেই বুঝল, এটা স ভ্রম নয়, রিদি আসলেই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও সে কোনো কথা বলল না, চেহারায় কোনো পরিবর্তনের রেখাও ফুটল না। রিদি যখন খালি গ্লাসটা নিয়ে নিঃশব্দে চলে যেতে চাইল, সৌহার্দ্য গলা খাঁকারি দিয়ে এক রাশ নির্লিপ্ততা নিয়ে বলল, “এক কাপ কফি নিয়ে উপরে এসো।”
সে ওঠার জন্য প্রস্তুতি নিতেই রিদি তীক্ষ্ণ স্বরে থামিয়ে দিল, “শুনে রাখুন মিঃ চৌধুরী! এই বাড়িতে আমি এসেছি আম্মুর মেয়ে হিসেবে, দুদিনের জন্য অতিথি হয়ে। একদম বউ ভেবে আমাকে হুকুম করবেন না!”
সৌহার্দ্য স্থির হয়ে কয়েক সেকেন্ড রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার কণ্ঠে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল, “ঠিক আছে, এই যে ‘আম্মুর মেয়ে’, আমাকে ‘আম্মুর ছেলে’ ভেবেই না হয় এক কাপ কফি দিয়ে যান, মিসেস চৌধুরী!”
রিদি ঠোঁট বাঁকিয়ে দৃড় গলায় বলল, “পারব না। আমি আপনাকে একদম বিশ্বাস করি না। কফির বাহনায় রুমে নিয়ে গিয়ে ঠিকই সকালের মতো বলবেন—’কার অনুমতিতে আমার বাড়ি এসেছ? এর জন্য ফাইন দিতে হবে!’ অসভ্য ডাক্তার!”
সৌহার্দ্যর ধৈর্য যেন বাঁধ ভাঙল। রাগ আর বিরক্তি মিশিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “স্টুপিড! মুখ চালানো বন্ধ করে রুমে কফি নিয়ে এসো!”
বলেই সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে হনহন করে ওপরের দিকে চলে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রিদি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, অসভ্য লোক দুই মিনিট ভালো ব্যাবহার করলে যেন ইজ্জত চলে যাবে!
রিদি সৌহার্দ্যের জন্য কফি নিয়ে যাওয়ার বদলে আমেনা খালাকে দিয়েই পাঠিয়ে দিল। ওদিকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে টি-টেবিলে কফির মগ দেখে সৌহার্দ্যর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। রিদি নিজে এলো না—এই বিষয়টাই তার মেজাজটা আরও বিগড়ে দিল। মাথাটা তোয়ালে দিয়ে মুছে তাড়াহুড়ো করে একটা শার্ট গায়ে জড়িয়ে সে নিচে নেমে এলো। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে রিমোট টিপে টিভি চালু করলেও তার মনটা যেন অগোচরেই রান্নাঘরের দরজার দিকে বারবার ছুটে যাচ্ছে।
ততক্ষণে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সারহান চৌধুরী আর আরহান রীতিমতো অবাক! তারা যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের কিছু দেখছে। সৌহার্দ্য হাসপাতাল থেকে ফেরার পর নিজের রুমে নিজেকে বন্দি করে রাখে; খাওয়ার টেবিল ছাড়া বাড়ির কেউ তাকে ড্রয়িংরুমে বসে থাকতে দেখেনি। আজ এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে বাবা আর বড় ভাই তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন সে ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী!
অবশেষে বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে সৌহার্দ্য কড়া গলায় বলল, “হোয়াটস দ্য প্রবলেম? হোয়াই আর ইউ লুকিং অ্যাট মি লাইক দ্যাট?”
ছেলের এমন মেজাজি প্রশ্নে সারহান চৌধুরী গলা খাঁকারি দিয়ে একটু হাসি টেনে বললেন, “না, আসলে ভাবছিলাম আজ সূর্যটা ঠিক কোন দিক থেকে উদয় হলো!”
বাবার ব্যঙ্গাত্মক কথায় সৌহার্দ্যর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু সে কোনো উত্তর দিল না। পাশেই আরহান যোহাকে কোলে নিয়ে বসে ছিল। ছোট্ট যোহা বাবার কোল থেকে অবাক চোখে বারবার তার চাচ্চুর দিকে তাকিয়ে আছে। সৌহার্দ্য যোহার আদুরে গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে হাত বাড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলল, “কাম মাই বেবি, চাচ্চু হিয়ার?”
সৌহার্দ্যর এমন সচরাচর না দেখা গম্ভীর ভঙ্গি দেখে যোহা হঠাৎই কেঁদে উঠল! সে ভয়ে বাবার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলল। আরহান মেয়েকে আদর করে শান্ত করার চেষ্টা করল, “যাও না মা, চাচ্চুর কোলে যাও না?”
কিন্তু যোহা দুই পাশে মাথা নেড়ে তার নিজের ভাষায়, ভাঙা গলায় অভিযোগ জানাল, “তাতু ভয়!”
সৌহার্দ্যের মুখের আদলটা যোহার কান্নায় মুহূর্তেই থমথম করে উঠল। সে হাত গুটিয়ে নিতেই সারহান চৌধুরী বিরক্তিভরে খেঁকিয়ে উঠলেন, “এমন রাক্ষুসে মুখ করে বাচ্চা কোলে নিতে চাইলে তো সে ভয়ই পাবে! একটু হাসলে কি তোমাকে ট্যাক্স দিতে হবে? দেখলে তো, কেমন ভয় পাইয়ে দিলে বাচ্চাটাকে!”
সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে রুক্ষ গলায় বলল, “আশ্চর্য! আমি তো আদর করেই নিতে চেয়েছিলাম। ভয় পেলে আমি কী করব?”
বাবা-ছেলের এই তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মাঝেই রিদি নাস্তার ট্রে হাতে প্রবেশ করল। সবার সামনে নাস্তা সাজিয়ে সে শেষমেশ সৌহার্দ্যের সামনে দাঁড়াল। কিন্তু সৌহার্দ্য এমন ভাব করল যেন টিভিতে কোনো অমূল্য কিছু দেখছে সামনে রিদির অস্তিত্ব তার কাছে অর্থহীন। রিদি তার এই উপেক্ষা দেখে ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিরক্ত হলো। কফির মগটা টেবিলে রেখে সে তিক্ত স্বরে বলল, “আপনার কফি!”
সৌহার্দ্য একবারও রিদির দিকে তাকাল না, শুধু নির্লিপ্তভাবে হাত বাড়িয়ে কফির মগটা টেনে নিল। রিদি যখন সেখান থেকে সরে আসতে উদ্যত, তখনই যোহা বাবার কোল থেকে ঝাঁপিয়ে রিদির কোলে আশ্রয় নিল, যেন রিদির কোলেই সে সবচেয়ে নিরাপদ। যোহাকে নিয়ে রিদি যখন রান্নাঘরের দিকে ফিরে যাচ্ছে, সৌহার্দ্যর দৃষ্টি তখন সেই দৃশ্যটার ওপর স্থির।
নিজের মনেই সে বিড়বিড় করে উঠল, “আমি কত আদর করে ডাকলাম, আমার কোলে এল না! অথচ ওই দেড় ব্যাটারিটার কোলে কেমন ঝাঁপিয়ে চলে গেল!”
নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগে কাজ করছিল সৌহার্দ্য। বাইরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই রুমের দরজাটা সজোরে খুলে গেল। লাফাতে লাফাতে ঘরে প্রবেশ করলো রিভা। সতেরো বছর বয়স হলেও মেয়েটার মধ্যে এখনো ছোটবেলার চপলতা একদমই কমেনি—আদরে-আহ্লাদে বেড়ে ওঠা ঘরের একমাত্র আদরের মেয়ে বলে কথা!
সৌহার্দ্য বিরক্তির সাথে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “কি সমস্যা তোর? এভাবে লাফাচ্ছিস কেন? আবার কী চাই?”
রিভা যেন ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। ভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আদুরে গলায় আবদার করে বললো, “প্লিজ ভাইয়া, আমাদের মার্কেটে নিয়ে চলো না? কাল একটা ‘রাক্ষুসের’ জন্য কেনাকাটা করতে গিয়ে কিছুই নিতে পারিনি!”
সৌহার্দ্য কাজ থামালো না, বরং কিবোর্ডে টাইপ করতে করতেই নিরস গলায় বলল, “আই ডোন্ট হ্যাভ টাইম নাউ, রিভা।
রিভার গাল ফুলিয়ে অভিমানে মুখটা ছোট হয়ে গেল। সে আবদারের সুরে বলল, “প্লিজ ভাইয়া, ভাবিও যাবে বলছে!”
‘ভাবি’ শব্দ শুনতেই সৌহার্দ্যের আঙুলগুলো কিবোর্ডে থমকে গেল। এক মুহূর্ত ভাবলো সে, তারপর ল্যাপটপটা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আচ্ছা ঠিক আছে, তুই রেডি হয়ে নে। আমি নিচে বের হচ্ছি।”
সৌহার্দ্যের মুখে সম্মতিটুকু শোনা মাত্রই রিভার বিষণ্ণতা নিমেষেই আনন্দে রূপ নিল। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে খুশিতে ডগমগ হয়ে রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
নিচে গাড়ির কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। বার কয়েক হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো, তারপর বিরক্তি নিয়ে বাড়ির গেইট দিকে চোখ রাখলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলো রিদি আর রিভা। ওদের সাজগোজ দেখে সৌহার্দ্য শুধু একবার তাদের দিকে তাকালো, তারপর আর কথা না বাড়িয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো।
রিভা আর রিদি পিছনের সিটে পাশাপাশি গিয়ে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগেই তারা নিজেদের গল্পের সমুদ্রে ডুবে গেছে—যেন চারপাশে আর কিছুই নেই। গাড়ির লুকিং গ্লাসে রিদি আর রিভার হাসিখুশি মুখের দিকে তাকালো সৌহার্দ্য। তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
বসুন্ধরা শপিং মলের গেটে গাড়ি থামতেই রিভা রিদির হাত ধরে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ল। সৌহার্দ্য গাড়ি পার্কিংয়ের ঝামেলা সামলে যখন শপিং মলের ভেতরে প্রবেশ করল, ততক্ষণে রিভা আর রিদি ক্লোথিং সেক্টরে পৌঁছে গেছে। রিভা ব্যস্ত হয়ে একের পর এক পোশাক দেখছে, আর রিদি পাশে থেকে উৎসাহ নিয়ে সেগুলো যাচাই করে দিচ্ছে। রিদির মনে এক চিলতে আক্ষেপ—নিজের পকেটে যে শূন্য, তাই নিজের জন্য কিছু দেখার সাহস তার নেই।
রিভা বারবার রিদিকে জিজ্ঞেস করছে, “ ভাবি, দেখো তো এটা কেমন?”
রিদি একঝলক আড়চোখে তাকাল সৌহার্দ্যের দিকে। সে যেন অন্য কোনো গ্রহে আছে—নির্বাক হয়ে ফোনে চোখ আটকে আছে, আশপাশের কোনো কিছুর প্রতি তার সামান্য খেয়ালও নেই। রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে মনে মনে বলল, ‘অন্তত ভদ্রতার খাতিরেও কি একবার জিজ্ঞেস করা যেত না যে, আমার কিছু পছন্দ হয় কি না? বললে কি আর আমি নিয়ে নিতাম! এতোটুকু সৌজন্যবোধ কি এই মানুষের নেই?’
কেনাকাটা শেষে রিভা বলল, “ভাইয়া, চলো জুয়েলারি সেকশনে যাই!”
সৌহার্দ্য তখনও ফোনের স্ক্রিনেই মগ্ন। শীতল আর গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “গোল্ড নাকি ডায়মন্ড?”
“ডায়মন্ড,” রিভার চটজলদি উত্তর।
সৌহার্দ্য ওদের নিয়ে গেল এক অভিজাত ডায়মন্ড শপে। উজ্জ্বল আলোর নিচে রিংগুলো ঝিকমিক করছে। রিভা একটা একটা করে আংটি দেখছে আর রিদির মত নিচ্ছে। রিদিও বাধ্য হয়ে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার অবচেতন মন বারবার সৌহার্দ্যের সেই উদাসীনতার কথা ভেবে বিষণ্ণ হয়ে উঠছে।
হঠাৎ সৌহার্দ্যের গমগমে কণ্ঠস্বরে তাদের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। সে ফোনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই দোকানের সেলসম্যানকে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা গলায় বলল, “ওটা প্যাক করুন।”
সে দিকে তাকিয়ে দেখল, একটা অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু মার্জিত ডায়মন্ড সেট। রিদি মুহূর্তের জন্য সেদিকে তাকাল, কিন্তু দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। অবহেলায় আর অভিমানে তার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল। মনে মনে বলল, ‘যা খুশি করুক, ‘এই মানুষটার দিকে তাকাতেও এখন আমার আর ইচ্ছে করছে না।’
কেনাকাটা শেষ করে সৌহার্দ্য ওদের নিয়ে শপিং মল থেকে বেরিয়ে এল। গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় ওদের বসিয়ে রেখে সে সামান্য সময়ের জন্য কোথায় যেন গেল। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে যখন ড্রাইভিং সিটে বসতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই রিদির চোখ পড়ল পাশের এক ফুচকার স্টলে। লোভনীয় সেই দৃশ্য দেখে রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না, উৎসাহ নিয়ে বলল, ” রিভা, চলো না ফুচকা খাই!”
কথামাত্রই সৌহার্দ্য যেন বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। গম্ভীর গলায় ঝাড়ি দিয়ে বলল, “অসম্ভব! এসব আনহেলদি খাবার খাওয়া যাবে না।”
রিদি এক মুহূর্তও দেরি করল না। রিভার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বিরক্তি নিয়ে বলল, “অসভ্য লোক! আপনাকে তো কেউ জোর করে খেতে বলেনি, আমরাই খাব।” বলতে বলতেই তারা ফুচকার দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু মুহূর্তের দ্বিধা কাটিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে ওদের পিছু পিছু এগিয়ে এল। রিভা আর রিদি একে অপরের সাথে খুনসুটি আর আনন্দে ফুচকা খাচ্ছে। সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে, যেন কোনো অদ্ভুত দৃশ্য দেখছে এমনভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। রিদি খেয়াল করল সৌহার্দ্যকে, একটু দুষ্টুমি করেই বলল, “একটা খান না, নাহলে তো আপনি আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমাদেরই পেট খারাপ হয়ে যাবে!”
সৌহার্দ্য বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে যেন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “স্টুপিড! তুমি খাও।”
রিদি আর রিভার ফুচকা খাওয়া শেষ হলে সৌহার্দ্য আর কোনো কথা না বলে দোকাদারকে টাকা চুকিয়ে দিল। তারপর অত্যন্ত কাঠখোট্টা ভঙ্গিতে ওদের নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিল।
টানা দুই ঘণ্টার ধকল শেষে রিদি ক্লান্ত শরীরে নিজের রুমে পা রাখতেই থমকে দাঁড়াল। বিছানাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নামী-দামী ব্র্যান্ডের অসংখ্য শপিং ব্যাগ। কার কাণ্ড বুঝতে তার বাকি রইল না!
রিদি এগিয়ে গিয়ে ব্যাগগুলো খুলল। ভেতরে ১০-১২টার মতো শাড়ি আর থ্রি-পিস। শাড়ির আধিক্যই বেশি, আর সবগুলোর রঙ যেন এক ধাঁচের, পাতার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কেনা। রিদি নাক-মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “দিতেই যখন চেয়েছিলেন, তখন এত ভাব দেখানোর কী ছিল? বললেই তো পারতেন, অন্তত আমার পছন্দমতো নেওয়া যেত। অসভ্য ডাক্তার কোথাকার!”
গজগজ করতে করতে চোখ পড়ল সেই ডায়মন্ডের সেটটার ওপর। শপিং মলে যে সেটটা সৌহার্দ্য প্যাক করতে বলেছিল, সেটিই। ছোট্ট একটা ডায়মন্ড স্টোন বসানো পেন্ডেন্টসহ চেইন আর এক জোড়া ইয়ারিং। চিকচিক করছে আলোর নিচে। রিদি সেগুলো হাতে নিল, কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখটা বিষণ্ণতায় ভরে উঠল। যে সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই, যেখানে বউয়ের মর্যাদাটাই নেই, সেখানে এই দামী গয়নাগুলো কি বিসদৃশ ঠেকছে না? আলমারিতে তুলে রাখার জন্য এগিয়ে গিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এসব পড়ার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৪
হঠাৎ তার নজর কাড়ল একটা র্যাপিং পেপারে মোড়ানো ছোট গিফট বক্স। তাতে সুন্দর হাতের লেখায় লেখা—‘স্পেশাল গিফট ফর ইউ!’
রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। কৌতুহল নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে সে গিফট বক্সের ফিতেটা খুলল। বক্সের ডালা খুলতেই ভেতরে রাখা জিনিসটা দেখে দুচোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল…..
