সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২১
জাবিন ফোরকান
“আমি দুঃখিত সাবিন, কিন্ত আমার পক্ষে নিজের ক্লায়েন্টের সম্পর্কে তথ্য দেয়া সম্ভব না। এটা পলিসির বাইরে।”
মিসিরের বক্তব্যে বেজায় চটে গেলাম আমি। ইচ্ছা হলো টেবিলের উপর জোরসে এক চাপড় বসিয়ে ছেলেটার মোটা মাথাটাকে চটকে ফেলি। অথচ বহু কষ্টে নিজেকে দমিয়ে রাখলাম। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে বললাম,
“মিসির, আমি অশিক্ষিত নই। বিজনেস পলিসি কেমন হয় তার হালকা পাতলা হলেও ধারণা আমার আছে।”
প্রাক্তনের বন্ধু তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না করে স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
আমি আজ এসেছি মিসিরের আর্কিটেকচারাল ফার্মের হেড অফিসে। অবশ্যই, এই মানুষটার কাছে আসার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। এবারের উদ্দেশ্য অবশ্য ডেটিং সম্পর্কিত কিছু নয়। ওই স্তর আমরা বহু আগেই পেরিয়ে এসেছি। নিজেকে খানিক ধাতস্থ করলাম। তারপর শান্ত গলায় মিসিরকে বোঝাতে চাইলাম,
“আমি জানি, ব্যাপারটা তোমার জন্য কিছুটা ক্ষতিকর হতে পারে তবে এখন একমাত্র তুমিই আমাকে সাহায্য করতে পারো।”
“সাবিন…”
“প্লীজ, মিসির। ব্যাপারটা আমার জন্য খুবই গুরুতর। তোমার ফার্মের গুলশান তিনে একটা প্রোজেক্ট চলছে, রাইট? তুমি কি জানো, গুলশান তিনের জমিটার অরিজিনাল মালিক ছিল তাকদীর হুসেইন, আমার ড্যাড?”
মিসিরকে এবার খানিকটা বিভ্রান্ত দেখাল। কি যেন ভাবলো সে মনে মনে। চিন্তা করলে ছেলেটার কপালে একটি পাতলা ভাঁজ পড়ে আজ খেয়াল করলাম।
মিনিট খানেক বাদে মুখ খুললো মিসির।
“দেখো সাবিন, জমির মালিকানা কার সেসব তো আমাদের বোঝাপড়ার ব্যাপার নয়। আমরা প্রজেক্ট অফার পাই, সেই অনুযায়ী কাজ করি। জমির বর্তমান মালিক তোমার বাবা নয়, অন্য কেউ। এটুকু ছাড়া আমি তোমাকে আর কোনো তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারব বলে মনে হয়না।”
ভ্রু কুঁচকে ফেললাম আমি। ঝুঁকে এলাম। যদিও এটা মিসিরের ব্যক্তিগত অফিস কেবিন এবং বর্তমানে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউই কেবিনে উপস্থিত নেই, তবুও আশেপাশে একবার নজর বুলিয়ে ঝুঁকে এলাম টেবিলের উপর। মৃদু কন্ঠে জানালাম,
“জমিটা আর ড্যাডের নেই সেটা আমি জানি। ব্যাংকের হিসাবে চলে গিয়েছে সব। আমি শুধু এটুকু জানতে চাই, যে জমির বর্তমান মালিক জমিটা কি আদও ব্যাংকের কাছ থেকে কিনেছেন, নাকি অন্য কারো কাছ থেকে?”
“অন্য কারো কাছ থেকে? যেমন?”
একটি ঢোক গিললাম আমি। অবশেষে বললাম,
“যেমন আমার চাচা, তাকবীর হুসেইন।”
মিসিরের ডাগর ডাগর গোলগাল নয়নজোড়া বিস্ময়ে প্রশস্ত হলো আরও। তাকে দেখালো রীতিমত শিশুসুলভ। যেন কোনো শিশু মাত্রই পৃথিবীতে ক্যান্ডি আবিষ্কার করেছে।
“তোমার ড্যাড কি তোমার চাচাকে জমি লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন?”
জোরে জোরে মাথা নাড়লাম আমি এই প্রশ্ন শুনে। কপালে আঙুল ঘষে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কন্ঠে জানালাম,
“আমার জানামতে নয়।”
“তবে হঠাৎ করে এমন সন্দেহ করছ কেন?”
“আই হ্যাভ মাই রিজনস মিসির।”
অধৈর্য্য হয়ে পড়লাম। দুহাত শক্তভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে বলে উঠলাম,
“প্লীজ মিসির, এছাড়া তোমাকে আর কোনোভাবে অনুরোধ করার উপায় আমার জানা নেই। এই একটা তথ্য আমার জানা অতি জরুরী।”
নিজের চেয়ারে হেলান দিল মিসির। নিঃশব্দে এক হাতে টেবিলের উপর পেপারওয়েট ঘুরিয়ে গেল খানিকটা সময়। অতঃপর তর্জনীতে পেপারওয়েটের ঘূর্ণন ঠেকিয়ে বলল,
“আমার ফার্মের প্রজেক্ট তোমার চাচার নয়, এটুকু নিশ্চিত থাকো। আর রইল ব্যাপার জমিটা ব্যাংকের ছিল কিনা, আমি আমার ক্লায়েন্টের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করব। কোনো কথা দিতে পারছিনা, তবে আই উইল ট্রাই অ্যান্ড দ্যাটস অল আই ক্যান সে টু ইউ রাইট নাউ, সাবিন।”
একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মোলায়েম হাসলাম।
“যথেষ্ট। ধন্যবাদ।”
সোজা হয়ে বসল মিসির এবার।
“কফি, ড্রিংকস কিছু নিলেনা। নাস্তা আনতে বলি কিছু?”
“না না। এমনিতেও আমাকে ক্যাফেতে যেতে হবে। রিক্রুটদের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে এসেছি। তোমাকে আবারো ধন্যবাদ। অনেক বড় উপকার করলে আমার।”
উঠে পড়লাম আমি। পরনের টি শার্টটা হাত বুলিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে টোটব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়ে বাইরে এগোলাম। মিসির আমাকে অনুসরণ করল, যদিও এগিয়ে দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলনা।
ফার্মের কর্পোরেট অফিস পেরিয়ে রিসিপশন এরিয়ার দিকে এগোতে এগোতে মিসির একেবারে আমার পাশাপাশি এসে পড়ল। নিজের স্যুটের একটি বোতাম খুলে আনমনে হঠাৎ বলল,
“এই মুহূর্তে জমিজমার ঝামেলায় না জড়ানোই তোমার জন্য শ্রেয় হবে।”
“থ্যাংকস। তবে আমার ব্যাপার আমি বুঝে নিতে পারব।”
“শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে বলছি, তোমার গল্পটা আমার ভালো লাগেনি। আমার অভিজ্ঞতায় ভরসা করো, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসলে মুশকিলে পড়বে।”
থেমে গেলাম আমি চট করে। পাই করে ঘুরে মিসিরের মুখোমুখি দাঁড়ালাম। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম প্রাক্তনের বন্ধুর নয়নমাঝে। মিসির ভড়কালো না, বরং সুস্থির চেয়ে দেখলো আমায়।
“তোমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি তার মানে এই নয় যে তুমি আমাকে উঠতে বসতে জ্ঞান দেবে। জ্ঞানটুকু নিজের পকেটেই রাখো।”
“জ্ঞান পকেটে রেখে লাভ কি? একলা একজন মেয়ে, ডিভোর্সী, সম্পত্তি -মামলার ঝামেলায় জড়ালে কে তোমাকে রক্ষা করবে বলে তুমি মনে করো?”
“শোনো। তোমার মতন কিছু অতি সুপুরুষ মানুষ নিজের নিরাপত্তায় চোখে ঠুলি পরে বসে থাকতে পারলেও আমি পারিনা। ঠিক আছে। তাছাড়া তুমি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে কতটুকু চেনো? যতটুকু সাহায্য চেয়েছি, পারলে করো অন্যথায় ক্ষমা দাও। আই অ্যাম ডান উইথ ইউ!”
খানিকটা রেগেমেগেই উল্টো ঘুরলাম আমি। মাথাটা চট করে গরম করে দিয়েছে এই ছেলে। তবে বেশিদূর এগোতে পারলাম না, মিসিরের কন্ঠস্বর ভেসে এলো পিছন থেকে।
“সাবিন, জাস্ট লিসেন টু মি ফর আ গডড্যাম সেকেন্ড!”
ক্ষীপ্র গতিতে মিসিরের হাত আমার কব্জি পাকড়াও করল। হ্যাঁচকা একটা টান খেলাম। বোধ হয় লোকটা নিজেও বুঝতে পারেনি এমন হবে। ভারসাম্য হারিয়ে যেতেই মিসিরের বুকে আছড়ে পড়লাম। পারলে সে ছেড়ে দিতে পারত, সেক্ষেত্রে মেঝেতে ছিটকে আমার দুটো দাঁত ভাঙত। মিসির ছাড়লোনা, দুবাহুর মাঝে আমায় আগলে নিলো। জমে গেলাম সম্পূর্ণ। হতবাক চোখে মুখ তুলে দেখলাম মিসিরকে। যে নিজেও আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
“ঠিক আছো?”
খানিকটা উদ্বিগ্ন গলায় শুধালো মিসির। খুব নিকটে এসে পড়েছি আমরা। যদি বান্দা সামান্য একটু বেহিসাবী নড়চড় করে তাহলে বিপদ ঘটতে সময় নেবেনা। দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। পিছনে কয়েক কদম সরে যেতেই অনুভব করলাম শক্ত কোনোকিছুর সঙ্গে আমার পিঠ গিয়ে ঠেকেছে। কোনখান থেকে মুক্তি পেয়ে আবার কোথায় গিয়ে ধাক্কা খেলাম? শিউরে উঠে মাথা তুলে তাকাতেই মনে হলো, কেউ বুঝি শোষণ যন্ত্র দিয়ে আমার ফুসফুসের সবটুকু অক্সিজেন শোষণ করে নিয়েছে।
বাদামী নয়নজোড়া, বিস্তৃত সমুদ্র যেন। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হওয়ার সময়টায় আলতো রোদের ছোঁয়ায় চিকচিক করছে। তার উপর চশমার স্বচ্ছ আস্তরণ। যেন কাঁচের বাক্সে আবদ্ধ একজোড়া জহরত। ওই দৃশ্য দেখে ছোটবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়ার কথা মনে পড়ে।
চিকচিক করে বালি কোথা নাই কাদা~
দাঁড়িয়ে আছে আমার প্রাক্তন, জায়দান।
শিহরণ খেলে গেল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে, আরো নিচে, অন্তরের আরো গভীরে।
“জায়দান, তুই?”
মিসির স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করল, তবে সামান্য কম্পন আমাদের কারো নজর এড়ালোনা। জায়দান আমার মুখ থেকে দৃষ্টি হটিয়ে বন্ধুর দিকে তাকালো। কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে অত্যন্ত শান্ত গলায় জবাব দিলো,
“কিছু সাইবার রেকর্ডস লাগবে বলেছিলি। তুই কখন সময় পাবি, আমার কাছে যাবি, নিয়ে আসবি? এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম অফিসে ঢুকে দিয়ে যাই।”
জায়দান আমার কাছ থেকে একচুলও সরলোনা। আমার পিঠ তখনো তার পাথরের মতন শক্ত বুকে ঠেকানো। ওই অবস্থায়ই ডান হাতটি তুলে মিসিরের দিকে একটা ফাইল বাড়িয়ে ধরল সে। বন্ধু সেটি হাতে নিলো নিঃশব্দে। একনজর দৃষ্টি মেলালো আমার সঙ্গে। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলাম, নিজের পিঠে জায়দানের বুকের সুস্থির হৃদস্পন্দন টের পাচ্ছি। কেমন যেন শিরশির তরঙ্গ খেলিয়ে দিচ্ছে তা আমার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে।
“এসেছিস যখন কেবিনে এসে বস। আমি ব্ল্যাক কফি দিতে বলছি।”
অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে শেষমেষ বলল মিসির। জায়দান মাথা নাড়ল।
“অন্য কোনো সময়। নিচে আরওয়া অপেক্ষা করছে।”
আরওয়ার নাম শুনে আমি এবং মিসির দুজন একসাথে চমকে উঠলাম।
দুহাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল আমার। শুধু কাজ আছে বললেই হতো! আরওয়ার নাম নেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল? নাকি জায়দান ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটা করলো? আমাকে শোনানোর জন্য? এতই ক্ষোভ লোকটার?
আমি নাহয় চমকেছি এক কারণে। তবে মিসির কেন অবাক হলো বুঝতে পারলাম না। সে যাক গে। আমার তাতে কি আসে যায়? জায়দানের কাছ থেকে সরে মিসিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“আমি আসছি। আশা রাখছি শীঘ্রই তোমার কাছ থেকে জবাব পাবো।”
উল্টো ঘুরলাম। সাবধানে জায়দানকে পাশ কাটিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলাম আমি। স্পষ্ট টের পেলাম উভয় পুরুষ আমার চলার পথে নজর বিছিয়ে রেখেছে।
সাবিন দৃষ্টিসীমার আড়াল হয়ে যাওয়ার পর জায়দান মিসিরের দিকে ঘুরে তাকালো। এতক্ষণ যাবৎ নয়নজুড়ে থাকা শীতলতা রূপ নিলো তীক্ষ্ণতায়। সামান্য কুঞ্চিত হলো ভ্রুজোড়া শক্তিতে। যেন মিসিরের দেহকোষ ভেদ করে অন্তরে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে ওই দৃষ্টি।
“আমার কি বিচলিত হওয়া উচিত?”
প্রশ্নটি শান্ত কন্ঠেই ধ্বনিত হলো। মিসির হাতের ফাইলে আঙুল আঁকড়ে মোকাবেলা করল বন্ধুর সুচারু দৃষ্টিকে,
“তোর যা মনে চায় হতে পারিস।”
জায়দান ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে এক পদক্ষেপ এগোলো। অত্যন্ত লম্বা হওয়ার দরুণ এই এক কদমই যথেষ্ট, মিসিরের মুখোমুখি পৌঁছতে। উচ্চতায় মিসিরকে তার নাকসমান দেখাচ্ছে।
“হেঁয়ালি পছন্দ নয় আমার।”
বন্ধুর মাঝে আজ আতঙ্কের অভাব পেলো জায়দান। বরং মৃদু হাসলো মিসির।
“তোর চাইতে বড় হেঁয়ালি দুনিয়ায় দুটো আছে নাকি?”
জায়দানের লম্বাটে আঙুল মিসিরের গলায় বাঁধা টাই অহেতুক টেনে ঢিলে করল। অতঃপর এক ঝটকায় সেটি এতটা জোরে টাইট দিলো যে টাইয়ের প্রান্ত আঁকড়ে বসলো মিসিরের গলাজুড়ে। সামান্য হিসিয়ে উঠল সে। জায়দান খানিক ঝুঁকে বন্ধুর চোখে চোখ রেখে মধ্যাঙ্গুলিতে চশমা ঠিক করল।
“ইউ বেটার কিপ হার অ্যাওয়ে ফ্রম এনি কাইন্ড অব হার্ম। আদারওয়াইজ, আই উইল হোল্ড ইউ দ্যা সোল রেসপন্সিবল!”
মিসিরের অফিসের সামনের সড়কে এসে দাঁড়াতেই এক বি এম ডব্লিউকে অপেক্ষারত দেখতে পেলাম। ওটার ভেতরে যে আরওয়া রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একনজর পাশে তাকালাম। আমার স্কুটি পার্ক করে রাখা আছে। চলে যাব? তাই যাওয়া উচিত। দরকার কি ফালতু কাহিনীতে নিজেকে জড়িয়ে?
তবে আমার চিন্তা সফল হলোনা। গাড়ির দরজা খুলে হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো আরওয়া। একটি জর্জেট শাড়ী পরনে রমণীর, কানে দুলছে বিশালাকায় ঝুমকো। কবি – সাহিত্যিকেরা যেমন নারীকে নিয়ে কবিতা লিখেন, আরওয়াকে দেখাচ্ছে ঠিক তেমনি। বোধ হয় অফিসের ভেতরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। অথচ আমায় দেখে সহসাই থমকে গেলো। ঠোঁটে ফুটে উঠতে দেখলাম এক মোলায়েম হাসি।
আমার দিকে এগিয়ে এলো আরওয়া। পাথুরে সড়কে তার হিলের ঠকঠক আওয়াজ হলো।
“হাই, সাবিন! কেমন আছেন আপনি?”
খানিক বিব্রতবোধ হলেও এই মুহূর্তে আরওয়াকে উপেক্ষা করে সটকে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে মুখে কৃত্রিম হাসি ফোঁটালাম।
“হেই, আরওয়া। এইতো ভালো। আপনাকে দেখেও মনে হচ্ছে সুস্থ স্বাভাবিক আছেন।”
একগাল হাসলো আরওয়া। বরাবর আমার সামনে এসে থামলো।
“তা আর বলতে? এদিকে কাজে এসেছিলেন বুঝি? নাকি বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে?”
চোয়াল ফাঁক হয়ে গেলো আমার। বয়ফ্রেন্ড? ওহ! মিসির! আরওয়া জানে আমরা ডেটিং করছি!
“হ্যাঁ! ওই মানে…এলাম একটু। ইদানিং খুব বেশি ব্যস্ত তো, ঠিকমতো সময় দিতে পারেনা। তাই ভাবলাম অফিসে এসে দেখে যাই।”
“হাউ সুইট!”
প্রশংসায় জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলাম আমি। আরওয়াকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলাম আনমনে। এই মেয়ে কি আসলেই এতটা ভালো? বোকা? নাকি মীরার মতন অতীব সহজ সরল? প্রথম প্রথম তাকে আমাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবেই মনে হয়েছে। অথচ যখন জানলাম সে আমার প্রাক্তনকে বিয়ে করতে চলেছে, তখন থেকেই কেমন একটা খচখচ অনুভূতি কাজ করে হৃদয়মাঝে। মেয়েটাকে ঘৃণা করার কোনো কারণ নেই আমার। উল্টো আমার দুঃসময়ে কথা দিয়ে হলেও পাশে থাকার জন্য আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। অথচ সেই বোধটুকু কিছুতেই আর মন থেকে অনুভব করতে পারছিনা।
“সো…আপনার জীবন কেমন কাটছে, আরওয়া? বিয়ের ব্যাপারে কতদূর এগোলেন?”
আমার প্রশ্নটি আরওয়াকে বিব্রত করলোনা। আমি এখনো নিশ্চিত নই সে আমার আর জায়দানের সম্পর্কে জানে কিনা। বাজিয়ে দেখা দরকার।
“এইতো, শুধু আমাদের সম্মতির অপেক্ষায় পরিবার। চিন্তা করবেন না, আমার বিয়েতে আমি অবশ্যই আপনাকে দাওয়াত দেব, তাও সবার আগে।”
ভ্রু উঁচু হয়ে উঠলো আমার। প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে আরওয়া দ্রুত বললো,
“না মানে, আমার একজন ভালো পরিচিত ব্যক্তি হিসাবে। আমি তো ঠিক করে রেখেছি, আমাদের এঙ্গেজমেন্ট পার্টির কেক এবং পিৎজা আপনার পিৎজা স্টেশন থেকেই অর্ডার করা হবে।”
ঠোঁটে বিনোদনের এক হাসি ফুটল আমার। নিজেকে আর রুখতে পারলাম না।
“আরওয়া? আপনার মাথা ঠিক আছে? আপনি বোকা বলে তো মনে হয়না, নিশ্চয়ই এতদিনে বুঝে গিয়েছেন আমি কে?”
“আপনি সাবিন হুসেইন। আমার হবু স্বামীর প্রাক্তন স্ত্রী। তো?”
থমকে গেলাম। আরওয়ার অতি শান্ত প্রতিক্রিয়ায় অবাক হলাম ভীষণ।
“তো মানে কি?”
“আপনি কি বলতে চাইছেন আপনি অযোগ্য? নাকি ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে বলে আপনার সঙ্গে আর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা সম্ভব না? কোনটা?”
দৃষ্টি সরু হয়ে এলো আমার। আমি জানি, আমার মুগ্ধ হওয়া উচিত, অথচ পারলাম না।
“সরি টু সে মিস আরওয়া এহসান, বাট আপনি আমাকে যতটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করতে চাইছেন, আমি আপনাকে ততটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করতে পারছিনা।”
“কেন? আমাদের বন্ধুত্বে সমস্যা কোথায়?”
সামান্য একটু ঝুঁকলাম, বাঁকা হাসি ফুটলো ঠোঁটজুড়ে আমার।
“সমস্যা? যে ব্যক্তিকে নিজের করতে চাইছেন, সেই ব্যক্তির উপর এখনো আমার আগ্রহবোধ আছে জানলেও বলবেন বন্ধুত্বের কথা? আরওয়া। আমি আর আপনি সার্ভার আর কাস্টমার হিসাবেই ঠিক আছি।”
আমার কন্ঠ খাঁদে নেমে এলো, রীতিমত হুমকিস্বরূপ শোনালো,
“আমি আপনাকে আমার পিৎজা স্টেশন লিখে দিতে পারব, কিন্তু আমার স্বামীর একটা পশমের ভাগও দিতে পারব না! দ্যাট মাচ অব আ পজেজিভ, সাবিন ইয!”
আরওয়া স্থির নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার হাসিখানি মুছল না।
“আপনার মাথা গরম হয়ে আছে। সময় গেলে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে যাবেন।”
দাঁড়ালোনা রমণী। উল্টো ঘুরে গাড়ির দিকে এগোলো। আমি নিজের জায়গায় দন্ডায়মান রইলাম। আরওয়াকে দূরে ঠেলার কিংবা খারাপ লাগার কোনোপ্রকার কারণ না থাকা সত্ত্বেও আমার অন্তর মানতে নারাজ।
নিজের পিছনে শীতল এক উপস্থিতি টের পেলাম সহসাই। বুঝলাম, আরওয়া কাকে দেখে গাড়িতে ফিরে গিয়েছে। জায়দান এসেছে। ঠিক আমার পাশে এসে দাঁড়ালো প্রাক্তন। তাকালোনা আমার দিকে। চশমার অন্তরালে দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত অদূর দিগন্তে। যেখানে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে ধীরে ধীরে।
“অনধিকার চর্চার নাম শুনেছ?”
হিমশীতল কণ্ঠের প্রশ্নের অর্থ বুঝতে আমার ফিজিক্সের জ্ঞানের প্রয়োজন নেই।
“তুমি আমার অনধিকার।”
নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিলাম। আমরা কেউই কারো দিকে সরাসরি তাকিয়ে নেই। অথচ সমস্ত অস্তিত্ব যেন অচিরেই অনুভব করতে পারছে একে অপরের সকল অনুভূতি। জায়দান মুখ খুললো দ্বিতীয় দফায়,
“তোমার সর্বদাই নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণ, তাইনা?”
“একদম তোমার মতন। পার্থক্য শুধু আমি স্বীকার করতে জানি, আর তুমি গুমড়ে মরো একাকী।”
জায়দান প্রথমবারের মতন সরাসরি তাকালো আমার দিকে। চশমার অন্তরালে নয়নজোড়া বুঝি ছন্দিত হলো। আমি দিগন্ত থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাথা উঁচু করে প্রাক্তনের নয়নমাঝে তাকালাম।
“একটাই আক্ষেপ আমার, তুমি সারা জগতের প্রতি সৎ হলেও নিজের হৃদয়ের কাছেই অসৎ।”
“মানে?”
“এই যেমন ধরো, তুমি আরওয়াকে নিয়ে যখনি বের হও, পারিবারিক গাড়ি ব্যবহার করো। হবু স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তোমার বাইকের সিটের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি রমণী। বাকিটা, তুমি বুদ্ধিমান। আর বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট।”
নির্বাক, নিষ্পলক চেয়ে রইলো জায়দান। আমি আর দাঁড়ালাম না। ঘুরে এগিয়ে গেলাম নিজের স্কুটির দিকে। ঠোঁটে মৃদু হাসি মেখেই চেপে বসলাম সিটে। মাথায় হেলমেট চড়িয়ে হ্যান্ডেল ধরে ইঞ্জিন চালু করলাম। নেমে গেলাম সড়কে। একবারও আর পিছন ফিরে দেখলাম না।
রাত প্রায় এগারোটা।
ক্যাফের লোকজন কমে এসেছে। মীরা দাঁড়িয়ে কাউন্টারের পাশে। সাবিন এই মুহূর্তে ক্যাফেতে নেই। আগামী দিনের সামগ্রীর কেনাকাটা করতে দুজন ছেলেকে নিয়ে বাজারে গিয়েছে। মীরা ক্যাফে বন্ধ করে বাসায় ফিরবে একটু পরই। কাউন্টারের ক্যাশ ঠিকঠাক গুণে হিসাব করছিল সে। ঠিক তখনি ক্যাফের দরজা খোলার মৃদু আওয়াজ ভেসে এলো। মুখ তুলে তাকিয়ে প্রবেশ করা মানুষটাকে দেখে জমে গেলো মীরা।
হুডির টুপি নামিয়ে তীক্ষ্ণ চেহারার ক্লিন শেভড যুবক এগিয়ে এলো। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ তাকে খুব বেশি জেল্লাদার লাগছে। সারাদিনের ভার্সিটি এবং কাজের পর মীরার অন্তর স্পন্দিত হলো যেন নব উদ্যমে।
“জায়দান!”
বিস্তৃত এক হাসি ছড়িয়ে পড়ল আয়দানের ঠোঁটজুড়ে। কোনো পরোয়া না করেই কাউন্টারের উপর ঝুঁকে এলো সে। ছয় ফুট উচ্চতার কারণে বেগ পোহাতে হলোনা তাকে। মীরার মাথার পাশে গাঢ় এক চুমু এঁকে দিলো সে। শিউরে উঠল মীরা। এক হাতে তার বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁপা কন্ঠে বলল,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২০
“তুমি? এত রাতে!”
এবার মীরার কানের লতিতে আলতো এক কামড় বসিয়ে আয়দান ফিসফিস করলো,
“আমায় কতটুকু বিশ্বাস করো?”
একটি শক্ত ঢোক গিললো মীরা। খানিকটা দূরে সরে আয়দানের চোখে চোখ রাখল।
“যতটুকু নিজেকে করি, ততটুকু।”
সন্তুষ্ট হলো আয়দান। মীরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে আবেশিত এক গভীর গলায় বললো,
“দ্যান ইটস টাইম টু প্রুভ ইওর ট্রাস্ট অন মি, কিটেন!”
