Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১
jannatul firdaus mithila

“ ঠিক যেমনটা প্রথম দর্শনে লেগেছিল! এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ অনুভূতি। নাম না জানা অনুভুতি! এককথায় — সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি!”
থমকায় রূঢ় মানবের বরফ গলা কন্ঠ! বুকের খাঁচায় লুকায়িত স্পন্দিত অঙ্গটা বুঝি এক্ষুণি বেরিয়ে আসতে চাইছে বুক পিঞ্জরের বাঁধন থেকে। তার শান্ত কন্ঠস্বর বাঁধ পেয়েছে কন্ঠার উঁচু হাড়খানার হস্তক্ষেপে। বলা নেই কওয়া নেই, হুট করেই কন্ঠনালীর মধ্যাংশে এক অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথা শুরু হলো রূঢ় মানবের। যে ব্যথায় কুঁচকে গিয়েছে মানবের সরু ভ্রু-দ্বয়, গুটিয়ে গিয়েছে কপাল! মুগ্ধের হাসফাস বাড়ল। তক্ষুনি সপ্তদশীর নরম বক্ষে পেঁজা তুলোর ন্যায় গুটিয়ে নিলো নিজ মুখ।

গলার কাছে হুটহাট সৃষ্টি হওয়া উদ্ভট ব্যথার উপশমে, যুবকের তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটজোড়ার মধ্যকার দুরত্ব বাড়ল খানিক। নাকের বদলে নিশ্বাস টানার কর্মে লিপ্ত হলো মুখ! বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস টানছে রূঢ় মানব। বুকের ওঠানামার গতি বড়ো জোরালো এমুহূর্তে। ফাঁকা মস্তিষ্ক তার, ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা শিথিল করতে চাইছে! চোখদুটো কুঁচকে আছে এখনো। সপ্তদশীর নরম বক্ষে মুখ গুঁজে রেখে, যুবক ফের লম্বা এক নিশ্বাস টানতেই হঠাৎ কুঁচকে গেল তার বদ্ধ চোখদুটো। মুহুর্ত ব্যয়ে তড়াক করে পর্দা সরালো রূঢ় মানবের ঘোলাটে দৃষ্টি! ত্বরিত বেগে মাথাটা উঠে এলো সপ্তদশীর বক্ষ হতে। পরক্ষণে যুবকের কুঞ্চিত দৃষ্টিযুগল একযোগে গিয়ে আছড়ে পড়ল সপ্তদশীর নির্মল মুখপানে। সপ্তদশী মৃদু হাসছে! তার দৃষ্টিতে আচ্ছন্ন ভাব স্পষ্ট। যুবকের ঘোর ধরল না এতে। সে কেমন ঘোলাটে দৃষ্টে মাহি’র মুখপানে তাকিয়ে থেকে আচমকা অনিহাবোধে বলে বসল,

“ তোর গায়ে আমার চাশমিসের ঘ্রাণ নেই! দূরে সর আমার কাছ থেকে।”
যুবকের এহেন অনিহা মিশ্রিত কন্ঠে সপ্তদশীর হরিণী চোখদুটোতে নামল ঘোর বর্ষা। মুখে নামল রাজ্যের আঁধার! কুষ্ঠিত হলো নারী কায়া। সুনিপুণ চিবুকখানা রয়েসয়ে গিয়ে ঠেকল কন্ঠার কাছে। মাথাভর্তি এলোমেলো চুল তার! উড়ছে অবাধ্যের ন্যায়। নতুন করে গজানো দুর্বাঘাসের ন্যায় ছোট ছোট চুলগুলো কেমন বেয়াদবের ন্যায় আছড়ে পড়ছে সপ্তদশীর পত্রপল্লবের ন্যায় মুখখানার ওপর। যুবক ঘোলাটে চোখে দেখছে সব। হুট করেই বেয়াদব মস্তিষ্কটা কেমন জ্বলে উঠল তার। সে তক্ষুনি নড়েচড়ে উঠে এসে আচানক খামচে ধরল মাহি’র সিল্কি চুলগুলো। এহেন কান্ডে মোটেও ভড়কায়নি সপ্তদশী! উল্টো পিটপিট চোখে আড়াআড়ি দৃষ্টে মুখ তুলে চাইলো। ওদিকে রূঢ় মানব কেমন কটমট করছে চুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে। হালকা খাঁজ যুক্ত দৃঢ় চোয়ালখানা ফুটে উঠল শক্তভাবে। চোখেমুখে সে-কি রাগ তার! কন্ঠে একরাশ হিংসে নিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“ ডোন্ট টাচ হার বাস্টা’র্ডস! শি ইজ মা’ই প্রপার্টি।”
নির্জীব চুলের সঙ্গেও সে কি অদ্ভুত হিংসে মাফিয়া বিস্টের। মুখখানার সর্বত্র লেপ্টে আছে বিরক্তির ভাঁজ। সপ্তদশীর আড়দৃষ্টি এবার প্রশস্ত হলো। ঠোঁটের কোণে ঝুললো মুচকি হাসির রেশ! নজর ধীরে ধীরে সুদর্শনের বাড়ন্ত হাতের পানে নিবদ্ধ হলো। সুদর্শনের গৌরবর্ণ শক্তপোক্ত হাতের পৃষ্ঠে নীলচে শিরাগুচ্ছ স্পষ্ট! কব্জিসন্ধিতে আঁটসাঁট হয়ে আঁটকে আছে একখানা কালো রঙা রিবন ব্যান্ড। তক্ষুনি সংকুচিত হলো সপ্তদশীর ভ্রুযুগল। আচানক নড়েচড়ে ওঠে, হাত বাড়িয়ে এক খাবলায় আঁকড়ে ধরে মুগ্ধের বাহাত। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ হাতে এটা কি?”
মুগ্ধের বিমুগ্ধ নয়ন মাহি’র পানে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। সেথায় নেই বিন্দুমাত্র নিরাগ্রহ! কন্ঠে একরাশ মলিনতা ঢেলে সে আওড়াল,
“ আমার না পাওয়া ধন!”
সহসা কুঁচকে গেল সপ্তদশীর বাঁকান ভ্রু-দ্বয়। ললাটে নামল সন্দিহান ভাঁজের ছাপ। মেয়েটা খানিক ঠোঁট উল্টে চেয়ে রইল রূঢ় মানবের পানে। যুবক দেখল তা! পরক্ষণে আলতো করে বা-চোখের পিয়ার্সিং করা ভ্রু-টা সামান্য উঁচিয়ে নিরবে জিজ্ঞেস করল,

“ কী?”
সহসা চোখ ঘোরালো মাহি। যুবকের শক্তপোক্ত হাতখানা ছেড়ে দিয়ে, দু’হাতে চেপে ধরল নিজ অবাধ্য চুলগুলো। হাত ঘুরিয়ে খোপা বাঁধার ভঙ ধরে বলল,
“ রিবন ব্যান্ডটা দিন তো। চুলগুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে!”
যুবক তক্ষুনি নাকচ করে ওঠে সপ্তদশীর এহেন বাক্য। মাথার ওপর একরাশ ভার নিয়ে সহসা ঘাড়টা এলিয়ে দিলো বিন ব্যাগের গায়ে। লম্বা এক নিশ্বাস টেনে দু-চোখ বুঁজে আওড়াল —
“ উঁহু! এটার ভাগ আমি কাওকে দিব না। ইভেন আমার হ্যালুসিনেশনকেও দিব না। এটা আমার! শুধু আমার….”
ধীরে ধীরে কন্ঠ জুড়িয়ে আসছে রূঢ় মানবের। চোখদুটোর পাতা ভার হলো বেশ। তারা কেমন আপনমনে বুঁজে গেল আপনাআপনি! পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানায় নামল অসারতা। হাতদুটো আলগোছে নেমে গেল দেহের দুপাশে। অতঃপর রূঢ় মানব ডুব দিলো ক্লান্তির নিদ্রায়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামবার যোগাড়। সেইন্ট পিটার্সবার্গের আকাশটা আজ বহুদিন পর স্বচ্ছ হলো। রৌদ্রের খুব একটা প্রখরতা না থাকলেও তার উপস্থিতি অস্পষ্ট নয়। হাটখোলা জানালার দ্বারে বিছিয়ে রাখা মখমলি কাউচের ওপর পাদুটো ভেঙে বসে আছে মাহি। কাউচের হ্যান্ডেলে কুশন চেপে, পিঠ হেলিয়ে রেখেছে তাতে। হরিণী চোখদুটো তার আঁটকে আছে রিমলেস গোল ফ্রেমের চশমার আড়ালে। দু’হাতে ধরে রাখা একখানা মোটা বই। আপাতত সপ্তদশীর সকল মনোযোগ বইয়ের ভাঁজে নিবদ্ধ। মসৃণ পাদু’টোর সম্মুখে কুটকুট করছে কিউটি, খাচ্ছে গাজরের স্লাইস। মাঝেমধ্যে মনিবের কোলে আসার বায়না জুড়েন মহাশয়, তবে সে বায়না আর পূরণ হলো কই? সপ্তদশী যে বড্ড বইপোকা মানুষ! বইয়ের মাঝে একবার ডুবে দিতে পারলে, তার থোড়াই খবর থাকে দিনদুনিয়া নিয়ে! মাহি’র মনোযোগী চোখদুটো সামান্য কুঁচকে আছে। বোধহয় এতক্ষণে বইয়ের বেশ ইন্টারেস্টিং অংশে চলে এসেছে সে। তবে শেষটুকু পড়তে গিয়ে বাঁধল আরেক কান্ড! কাহিনী তো খতম হলোই না, উল্টো লেখা আছে — To be continue…..
সপ্তদশী বড্ড অস্থির হলো এহেন কান্ডে। মসৃণ ললাটের চামড়ায় গোটাকতক ক্ষোভের ভাঁজ ফেলে, তক্ষুনি পাদু’টো নামিয়ে রাখল মার্বেলের তকতকে মেঝেতে। নরম হাতের মুঠোয় সদ্য শেষ হওয়া বইটা নিয়েই পায়ের গতি টানল মাহি। এক্ষুণি লাইব্রেরীতে গিয়ে বাকিটুকু পড়তে হবে তার। নয়তো অভ্যন্তরীণ আগ্রহ এবং কৌতুহলতায় অস্থির হবে তার তন-মন। এহেন চিন্তার পরিক্রমায় পায়ের গতি জোরালো হলো সপ্তদশীর। ধুপধাপ কদমে বেরিয়ে গেল কক্ষ ছেড়ে।

গোলাপি আভায় ছেয়ে আছে চেরি ব্লসম গার্ডেনের জমিন। জ্যাপানিজ সৌন্দর্যের প্রতীকী ফুলগুলোর নরম-সরম গোলাপি পাপড়িগুলো কেমন ঝরে পড়ছে নিজ দায়িত্বে! ঢেকে দিচ্ছে বাগান জমিনের আসল রুপ। কয়েকজোড়া ব্যুটজুতো পরুয়া দাম্ভিক কদম কেমন রুষ্টতার সঙ্গে পিষে দিচ্ছে গোলাপি নরম পাপড়িগুলো। গটগটিয়ে এগুচ্ছে প্যালেসের দিকে। সম্মুখের দাম্ভিক কদমজোড়ার রূঢ় মালিক বড়ো ব্যতিব্যস্ত। আজ আবারও সেজেছে দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের সজ্জায়। গায়ে কালো রঙা ওভারকোট, বক্ষে আঁটসাঁট হয়ে আঁটকে আছে কালো রঙা শার্ট! সঙ্গে মিলিয়ে পরেছে কালো রঙা প্যান্ট। ডানহাতের কব্জিসন্ধিতে শোভা পাচ্ছে — দ্য শ্যাডো মনস্টার — নামক সিগনেচার ব্রেসলেট। যুবকের মাথায় এঁটে বসে আছে কালো রঙা গোলাকার ফেডোরা টুপি। সুদর্শন মুখখানা আপাতত উম্মুক্ত! যুবকের পিছুপিছু এগোচ্ছে এলেক্স এবং এডউইন। দু’টো গম্ভীর মুখো বলিষ্ঠবান পুরুষ একে-অপরের পাশাপাশি হাঁটলেও দু’জনার দৃষ্টি একে-অপরের বিপরীত। নাকের পাটা সমানে ফুলছে দু’জনার! চোয়ালের পেশি হয়েছে টানটান। ভাগ্যিস মনস্টার সামনে আছে! নয়তো এতক্ষণে দু সাপেনেউলের মধ্যে ফের বাঁধত হাতাহাতি।

জোরালো ভঙ্গিতে প্যালেসের সম্মুখ সিঁড়িতে পা রাখল মুগ্ধ। দায়িত্বরত গার্ডেরা তক্ষুনি মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ জানালেন মনস্টারকে। রূঢ় মানব সেদিকে ফিরেও তাকালেন না। উল্টো পায়ের গতি বাড়িয়ে ঢুকলেন ভেতরে। তার ব্যস্ত কদমজোড়া গ্রাউন্ড ফ্লোরের মাঝখানের কারুকার্যে খোঁচিত গোলাকার স্থানে এসে পড়তেই আচমকা পায়ের গতিতে রুখ টানলেন নির্দয় মানব। থেমে গেলেন সশরীরে! তার হৃদয়টা এবার একটু বেশিই জ্বালাচ্ছে মনে হচ্ছে। বেয়াদব অঙ্গটাকে এতক্ষণ কোনমতে সামলে রাখতে পারলেও এখন কেন যেন অবাধ হতে চাইছে সে! বারেবারে মনের মধ্যিখনে উত্থাপন করছে,
“ মেয়েটাকে একটু দেখে নিলে কি’বা হয়ে যাবে?”
হৃদয়ের এহেন বেয়াদবি দেখে দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে মুগ্ধ। বেয়াদব অঙ্গটার কতোবড় সাহস! তার দেহের খাঁচায় থেকে ঐ বান্দীর মেয়েকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করছে! এ যে ঘোর অন্যায়। মায়াভরা হৃদয়ের এহেন অবাধ ইচ্ছেকে একপ্রকার চুলোয় চড়ালেন মাফিয়া বিস্ট। ওতো সহজে থোড়াই শুনবে হৃদয়ের কথা! মুগ্ধ কেমন তিতিবিরক্ত রূপে তক্ষুনি শরীর ঘুরিয়ে উল্টো পথে পা ঘোরালো। পেছন থেকে ধেয়ে আসা দু-গম্ভীর পুরুষদের পানে কটমট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধু শুধুই গর্জন তুলে শুধালো,

“ ইউ্য ব্লাডি মর’নস! এটুকু পথ আসতে এতক্ষণ লাগে তোদের? পায়ে জোর নেই রাস্কেল’স?”
ভড়কায় এলেক্স এবং এডউইন! বেচারারা কেমন তৎক্ষনাৎ নজর ঝুঁকিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেল মাঝপথে। বেচারারা ভেবে ভেবে কুপোকাত — মনস্টারের আবার জ্বলে উঠার কারণ সম্পর্কে। ওদিকে মুগ্ধ মহাশয় সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে! সুদর্শন মুখখানায় এক অদৃশ্য আগুন লেপ্টে যুবক কেমন গটগট পায়ে এগিয়ে এলো বেচারা দুটোর সম্মুখে। অতঃপর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক হিং স্র থাবায় আচানক কাত করল এডউইনের ফর্সা গালটা! ইশশ্! মনস্টারের ওমন ব্যগ্র থাবা গালে পড়তেই গালের মাংসগুলো বুঝি খুলে খুলে পড়ছে তার, সঙ্গে যা জ্বলুনি হচ্ছে না! মনে হচ্ছে কেউ জোর করে এক মুঠো মরিচের গুঁড়ো এনে ইচ্ছেমতো ডলে দিয়েছে গালটায়। বেচারার এরূপ অবস্থা অবলোকন করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলেক্স মহোদয় খানিকটা খুশি হতেই যাবেন ঠিক তখনি এক শক্তপোক্ত মুঠোর পাঞ্চ এসে বসল তার উদর বরাবর। সহসা ব্যথায় কুঁচকে গেল এলেক্সের সুদর্শন শ্যামবর্ণ মুখখানা! বেঁকে গেল মেরুদণ্ডের হার! বেচারার আর সটানভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জো নেই! পাদু’টোর শক্ত হাড়গোড় কাঁপছে ভীষণ। এই বুঝি তারা ভেঙে বসিয়ে দিবে বেচারাকে। তাদের ওমন করুণ দশা দেখেও গললেন না মাফিয়া বিস্ট। তক্ষুনি ওভারকোটের অভ্যন্তরণে হাত গলিয়ে কোমর থেকে রিভলবারটা বের করে এনে তাক করল এডউইনের দিকে। কটমট করতে করতে হুংকার ছুঁড়ে বলল,

“ দেরি করলি কেন তোরা? কোথায় ছিলি উত্তর দে! নাহলে…..”
বাকিটা জিভ খসে বেরুনোর আগেই যুবকের ক্রুর দৃষ্টি আচমকা গিয়ে ঠেকল তিনতলার প্রশস্ত করিডর পানে। সেথায় অতি কাঙ্ক্ষিত নির্মল মুখখানার পরিদর্শন পেয়ে তৎক্ষনাৎ থমকায় রূঢ় মানব। থমকায় তার ক্রুর দৃষ্টি! এতক্ষণ যাবত সম্পূর্ণ মুখমণ্ডলে জড়িয়ে থাকা একরাশ আগুনে কেউ বুঝি মাত্রই একপশলা বৃষ্টি নামালো। সে বৃষ্টির ঝাপ্টায় নিভে গেল যুবকের মাথাভর্তি উত্তপ্ত আগুন! বিস্টের ক্রুরতার পরশ ক্ষীণ হতেই রিভলবারের চাবি থেকে আনমনে সরে গেল তর্জনী। আলগা হলো হাতের বাঁধন! অদূরের তিনতলার করিডর দিয়ে আপনমনে হাঁটছে সপ্তদশী। হাতে একখানা বই তার, মনোযোগী দৃষ্টিযুগল বইয়ের মসৃণ পৃষ্ঠে নিবদ্ধ। মুগ্ধ কেমন বিগলিত নয়নে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। হতবিহ্বলতায় যুবকের রিভলবার ধরে রাখা বাড়ন্ত ডানহাতখানা আলগোছে নেমে গেল। বাহাতে বোধহয় ভর করেছে রাজ্যের সব ভার! কিছুতেই বেচারা উঠছে না ওপরে।

রূঢ় মানবের সম্পূর্ণ বদনে ছেয়ে গিয়েছে প্রবল শান্তি। তার বাদামী চোখদুটোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গোলকাকার টুপির ছত্রছায়ার আড়ালে সপ্তদশীর নির্মল মুখখানা অবলোকন করতে বাঁধ পাচ্ছে বোধহয়। অস্থির যুবক তক্ষুনি ডানহাতখানা উঠিয়ে এনে আলগোছে মাথার ওপর থেকে টুপিটা নামিয়ে নিলো। এবারে সম্মুখ দৃষ্টি স্পষ্ট তার! বাদামী চোখদুটো ফের ডুব দিলো গভীরতায়। তারা অপেক্ষায়িত — সপ্তদশীর ফিরে তাকানোর জন্য। প্রবলভাবে দায়বদ্ধ — একটাবার চোখাচোখি করার জন্য। রূঢ় মানব এতক্ষণে টের পেল — সে তৃষ্ণার্ত। গ্রীষ্মের বিদঘুটে গরমে মরুভূমিতে হাঁটতে থাকা পথিকের ন্যায় তৃষ্ণার্ত সে। খরায় জরাজীর্ণ তার কন্ঠা! শুকিয়ে কাঠ হয়েছে দৃষ্টি। যে দৃষ্টি বোধহয় স্বস্তি পাবে সপ্তদশীর নিরেট চাহনিতে। অথচ কান্ড দেখো! সপ্তদশীর গভীর মনোযোগে একচুল নড়চড় হচ্ছে না। সরছেনা বইয়ের ভাঁজ থেকে তার দৃষ্টি। মনস্টার ক্ষুদ্র করলেন নিজ চোখদুটো। ফর্সা মসৃণ ললাটে গোটাকতক রুষ্টতার ভাঁজ টেনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মেয়েটার পানে। মাহি বইয়ের পৃষ্ঠে চোখ রেখেই এগোচ্ছে। তার কদম ছুটছে ব্যাক্তিগত লাইব্রেরীর দিকে।

এদিকে তার ওমন অগ্রাহ্যতা দেখে রূঢ় মানবের মাথার তালু জ্বলে উঠল দাউদাউ করে। মুখাবয়বে সদ্য ফুটে ওঠা মুগ্ধতাটুকু উধাও হলো নিমিষেই। সেথায় এবার ভর করল রূঢ় মানবের চিরচেনা রূপ। ক্রুরতায় ব্লেডের ন্যায় ফুটে উঠল ক্ষীণ খাঁজ যুক্ত চোয়ালখানা। নিখাঁদ সৌন্দর্যের প্রতীকী বাদামী চোখদুটো ক্রমশঃ ঝাপ দিলো টগবগে লেলিহান দাবানলে। গৌরবর্ণ সুদর্শন মুখখানা সহসা রুপ ধরল টকটকে লালিমার। মুষ্টিবদ্ধ হলো শক্ত হাতদুটো। সপ্তদশী তখনো দৃষ্টিপাত করেনি রূঢ় মানবের পানে। এতে বুঝি ঘি পড়ল মানবের জ্বলতে থাকা বদনে। মিনিট পাঁচেক অতিবাহিত হওয়া স্বত্বেও নিষ্পলক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ! অপেক্ষায় আছে মেয়েটা ফিরে তাকাবে বলে। অথচ বালাইষাট! মেয়েটা যে কোন মুগ্ধতায় ডুবলো কে জানে। সে কেমন আপনমনে ঢুকে পড়ল লাইব্রেরীর কক্ষে। তার এহেন উপেক্ষা যেন সরাসরি তীরের ফলার ন্যায় এসে বিঁধল মুগ্ধের বুকটায়। সারাটাদিন তার চোখদুটো তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় খুঁজেছে মেয়েটাকে। মন-মস্তিষ্কের দোলাচলে দ্বিধায় পড়েছে বহুবার, অথচ মেয়েটা কেমন নির্বিকার! সম্পূর্ণ ব্যাপারটা মোটেও হজম হলোনা মুগ্ধের। সে কেমন সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব, ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল পিয়ার্সিং করা নিম্নাংশের ঠোঁটখানা। শক্ত হাতে অনবরত ঘাড় ডলতে ডলতে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ এডউইন! বোতল আনা।”

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশালাকার লাইব্রেরির কক্ষ! চারদিকের দেয়াল জুড়ে বড়ো বড়ো বুকশেলফ। সেথায় ভীড় জমিয়েছে নানান বাহারি বইয়ের স্তুপ। বা-দিকের উঁচু উঁচু শেলফের দ্বারে দাঁড় করিয়ে রাখা একখানা মই, অন্তর্মুখী মানবী ধীরে ধীরে নামছে মই বেয়ে। তার হাতে একখানা নোবেল পার্ট। মেয়েটার চোখেমুখে ঝিলিক দিচ্ছে আনন্দের রেশ। মনের কোণে জমে থাকা মাত্রাতিরিক্ত অস্থিরতায় মইয়ের শেষ সিড়িঁতে পা বাঁধিয়ে টুপ করে নামল সে। তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলো দু’হাত দুরত্বে বিছিয়ে রাখা একখানা সফেদ রঙা মখমলি তোশকের পানে। সেথায় দু-হাটুঁ ভাঁজ করে বসল মাহি, হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে কোলে তুলে নিলো নরম তুলতুলে কুশনখানা। অতঃপর নতুন বইয়ের কভার খুলে উদ্বিগ্নতায় চোখ রাখল বইয়ের ভাঁজে। বোল্ড হরফের দু’টো লাইনের স্তবকে গভীরভাবে ডুব দিতেই আচমকা সপ্তদশী কর্ণকুহরে ভেসে এলো অতিপরিচিত বজ্রকন্ঠের হুংকার!

“ হাউ ডেয়ার ইউ্য!”
তক্ষুনি হকচকিয়ে ওঠে মাহি। হকচকানোর দরুন নড়েচড়ে উঠে তার সর্বাঙ্গ। ভড়কানো দৃষ্টি সহসা সম্মুখে পড়তেই দেখল — ঝড়ের বেগে গটগটিয়ে এগিয়ে আসছে রূঢ় মানব। তার চোখেমুখে সে-কি রাগ! তা অবলোকন হওয়া মাত্রই শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলল মাহি। হাত থেকে আলগোছে নামিয়ে রাখল বইটা। ওদিকে মুগ্ধের পায়ের গতি জোরালো। তা এসে রুখ টানল সপ্তদশীর সন্নিকটে। অবোধ মাহি ঘাড়ের পেশি কুঁচকে মুখ তুলে চাইলো। ওমন একটা পাহাড়সম মানুষের পানে তাকিয়ে থাকতেই ঘাড় বুঝি বলছে — ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি! তবে সপ্তদশী নাছোড়বান্দা। চেয়ে রইল একমনে। যুবক দাঁত কিড়মিড় করছে। দাঁত কপাটির রুষ্ট আওয়াজ স্পষ্ট কানে বাজছে সপ্তদশীর। সহসা ঘাবড়ে গেল মাহি। নরম-সরম অধরযুগল তিরতির করে হালকা কাঁপিয়ে জিভ খসিয়ে বাক্য আওড়াতে উদ্যোত হতেই আচমকা মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে আনল রূঢ় মানব। অতঃপর চোখের পলকে তক্ষুনি এক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম চোয়াল। হকচকানোর সময় পায়নি মাহি। চোখের ফেলার আগেই ঘটল যা ঘটার। যুবক জোর বাড়াচ্ছে হাতের। সপ্তদশীর নরম চোয়ালখানা পিষ্ট হচ্ছে তার রুক্ষ হাতের মুঠোয়। কটমট শব্দ তুলছে চোয়ালের হাড়। ব্যথায় মুখ কুঁচকে নেয় মাহি। দু’হাতে চেপে ধরে কঠিন মানবের শক্ত হাত। পিষ্ট হতে থাকা চোয়ালখানা যুবকের রুক্ষ মুঠো হতে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত সে। ঠোঁট ভেঙে ফুপিয়ে উঠতেই সম্মুখ থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের হিং স্র গর্জন!
“ হাউ ডেয়ার ইউ্য বান্দীর মেয়ে? হাউ ডেয়ার ইউ্য ইগনোর মি? এ্যাই আমাকে, দ্য শ্যাডো মনস্টারকে ইগনোর করার মতো এতোবড় কলিজা তোর কোত্থেকে এলো জানোয়ারের বাচ্চা? কি আছে তোর বইয়ে যা আমার চাইতেও বেশি নোটিসেবল? উত্তর দে বান্দীর মেয়ে!”

চোয়ালের হাড় ভাঙার উপক্রম সপ্তদশীর। মুখ ফসকে কথা বেরুনোর জো নেই। অথচ রূঢ় মানব কি-না তাকেই প্রশ্ন করছে? ব্যথায় গোঙাচ্ছে মাহি। ছলছল দৃষ্টিযুগল সম্মুখে তাক করতেই ব্যগ্র হলো রূঢ় মানব। তক্ষুনি বুঝি তার ক্রুর দৃষ্টিতে এক টুকরো বরফের দানা ছুঁড়ে মা’রল কেউ। সপ্তদশীর ছলছল চোখদুটোর নিরেট চাহনি ঝড় তুলছে মানবের বুকে। মাথাভর্তি উত্তপ্ত আগুন যেখানে দাউদাউ করে জ্বলছে, সেখানে হৃদয় কাঁপছে দুর্বার গতিতে। যুবক সহসা ঝটকা মে’রে ছেড়ে দিলো মাহি’র নরম তুলতুলে চোয়ালখানা। এক আকাশসম রাগ এখনো চলমান তার মধ্যে। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব তৎক্ষনাৎ দু’হাতে টেনে ধরে নিজ মাথার লম্বা লম্বা বাবরিছাঁটা চুলগুলো। অতঃপর এক ভয়ংকর হিং স্র হুংকারে মাফিয়া বিস্ট চিৎকার করে বলে ওঠে,
“ আআআআআ! হোয়ায় আই কান্ট কন্ট্রোল মা’ইসেলফ! হলি ফা’ককককক!”
যুবকের বিকট চিৎকারে কাঁপছে কক্ষের প্রতিটি দেয়াল। সেই সঙ্গে কাঁপছে ভীতু সপ্তদশী। ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে বেচারি। রূঢ় মানব থামছেনা। একবার ইচ্ছেমতো টানছে নিজ চুলগুলোকে, তো আরেকবার নিজ গালেই একের পর এক শক্ত চাপড় বসাচ্ছে বেপরোয়া পুরুষ। দু’পায়ের সচল গতিতে এদিক ওদিক অস্থিরতায় পায়চারি চালিয়ে রাশিয়ান ভাষায় বিড়বিড় করে বলছে,

“ নো নো! ওর গায়ে হাত তোলা যাবে না। ও কাঁদলে আমার সহ্য হচ্ছে না। আ’ই কান্ট টলারেট হার টিয়ার্স। উফফ! আই কান্ট!”
সপ্তদশী নির্বিকার! দু-হাটুঁর ভাঁজে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে সে। রূঢ় মানব আড়দৃষ্টে একপলক চাইল মেয়েটার পানে। সহসা তার মানসপটে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা। আর ওমনি ফের হিতাহিত জ্ঞান হারালো মাফিয়া বিস্ট। তক্ষুনি ব্যগ্র পায়ে এগিয়ে এসে হাঁটু ঠেকাল মেঝেতে। পরক্ষণে নিজ শক্তপোক্ত রুক্ষ আঙুলগুলো সহসা সপ্তদশীর চুলের গোড়াঁয় ঢুকিয়ে দিয়ে আঁকড়ে ধরল চুলের গোছা। এবারে আর চুপ করে থাকতে পারেনি সপ্তদশী। ব্যথায় কেঁদে উঠে ঠোঁট ভেঙে। মুগ্ধ দেখল সে কান্না। বাদামী চোখদুটো তার এক অজানা ব্যথায় ডুব দিয়েছে তার। জ্বলছে অগ্রাহ্যের আগুনে। সে তক্ষুনি মেয়েটার মাথা সামান্য ঝাঁকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলে ওঠে,
“ এই বান্দীর মেয়ে, তুই আমার না? বল, তুই আমার তো তাই না? তাহলে তুই আমাকে ইগনোর করলি কেনো? তোর চোখদুটো আমার বদলে অন্যকিছুতে মনোযোগ টানলো কেনো? কি নেই আমার মধ্যে? আর কি আছে তোর ঐ বইয়ে? কই দেখি তো!”

বলেই উম্মাদ পুরুষ তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিলো মাহি’র নরম চুলের গোছা। বেপরোয়ার ন্যায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে, খানিকটা সরে এসে তোশক থেকে আলগোছে তুলে নেয় অবহেলিত আকারে পড়ে থাকা বইটা। বইয়ের মসৃণ পৃষ্ঠাগুলো অস্থির ভঙ্গিতে উল্টেপাল্টে দেখছে মুগ্ধ। মানবের সর্বাঙ্গ কাঁপছে রাগে! চোয়ালের কটমট শব্দে কাঁপছে সপ্তদশী। ওদিকে মুগ্ধ ফের বজ্রকন্ঠে গর্জে বলল,
“ এ্যাই এ্যাই বান্দীর মেয়ে! এটায় কি আছে যা তোকে আমার দিকে তাকানো থেকে বিরত রাখল। কি আছে এটায়? একটু দেখা তো!”
এপর্যায়ে হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে আছে মাহি। কন্ঠরুদ্ধ তার! জিভের ডগায় রা নেই। সে-তো লোকটাকে দেখেইনি, তাহলে ইগনোর করবার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? সপ্তদশী যখন নিজ ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তখনি ঝড়ের বেগে এগিয়ে এলো মুগ্ধ। অস্থির কায়দায় হাতের বইটা অদূরে ছুঁড়ে দিয়ে, আলগোছে নিজ দু-হাটুঁর ভর ঠেকাল মেঝেতে। অতঃপর পরাস্ত সৈনিকের ন্যায় নিজ দু’হাতের রুক্ষ আজলায় সপ্তদশীর নরম মুখখানা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বেপরোয়া কন্ঠে আওড়াল,

“ কেন এমন করলি চাশমিস? কি কমতি আছে আমার মধ্যে? কেন তাকালি না আমার দিকে? আমি কি দেখতে খুব খারাপ? আমি… আমি.. আমি ইগনোরেন্স সহ্য করতে পারিনা চাশমিস! বিশ্বাস কর, এই জায়গাটায়… ”
বলতে বলতেই বেপরোয়া পুরুষ তক্ষুনি চেপে ধরে মাহি’র ডানহাতের নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি। পরক্ষণে সপ্তদশীর সে-ই কব্জি টেনে এনে আলগোছে ছোঁয়ালো নিজ বুকের বাঁপাশে। হতভম্ব মাহি! মুগ্ধের এহেন উন্মত্ততা আজ প্রথম পরোখ করল সে। যদিওবা লোকটার এরুপ বিচলিত হবার কারণ অজানা তার। এদিকে মুগ্ধ বুঝি আজ নিজের হুঁশে নেই। মাহি’র হাতখানা নিজের বুকে চেপে রেখে কটমটিয়ে বলতে লাগল,
“ এ জায়গাটা জ্বলছে! বড্ড জ্বলছে চাশমিস। তুই কি করলি এটা? কেনো উপেক্ষা করলি আমায়? আমার মধ্যে কি নেই বল? আমি দেখতে অসুন্দর?”

দৃষ্টি সন্দিগ্ধ রূঢ় মানবের। থেমেছে বাক! বসে থেকে তক্ষুনি পাগলের ন্যায় নিজ গা থেকে এক ঝটকায় খুলে নিলো ওভার কোটটা। পরক্ষনে একে একে খুলে নিলো শার্টের সবগুলো বোতাম। অতঃপর উম্মুক্ত করল নিজ পেটানো দেহখানা। মাহি’র সম্মুখে নিজ সুদর্শন উম্নুক্ত দেহখানা দাঁড় করিয়ে উম্মাদ যুবক ফের আওড়াল,
“ এম আই নট হ্যান্ডসাম? এই তাকা আমার দিকে! আমি কি দেখতে খারাপ? তোকে পাগল করার মতো সুন্দর নই আমি? তাহলে তুই আমাকে ইগনোর করলি কেনো বান্দীর মেয়ে? কেনো করলি আমায় ইগনোর?”
শেষ বাক্যটুকু হুংকারের ন্যায় শোনালো আবদ্ধ কামরায়। সপ্তদশীর কোমল দেহখানি ফের কেঁপে উঠল কেমন। মেয়েটা ভয়ে সিটিয়ে যাচ্ছে! চোখ নামিয়ে কাঁদছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। রূঢ় মানব থামছেনা। সপ্তদশীর কান্না দেখে কাঁপছে তার বুক, তারচেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে — নিজের প্রতি সপ্তদশীর এহেন পাত্তাহীনতা দেখে। মুগ্ধ অস্থির! শক্ত হাতে অনবরত ডলছে ঘাড়। কটমট করতে করতে ঘরভর্তি বইয়ের স্তুপের পানে তাক করল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল তার মসৃণ ললাট। একমুহূর্ত থেমে থেকে হঠাৎ কটমট কন্ঠে আওড়াল,

“ বই রাইট? এই বই! ওয়েট।”
বাক্যটুকু আওড়েই পায়ে গতি টেনেছে মুগ্ধ। গটগটিয়ে দু-কদম এগোতেই দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন দু’জন নতমুখী গার্ড। দু’হাতে ঠেলেঠুলে আনছেন ট্রলিভর্তি রা-মের বোতল। যুবক সটান হলো এবার। দু’হাত পকেটে গুঁজে গমগমে গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ ভেতরে আন!”
হুকুম তামিল করলেন গার্ডস। আলগোছে ট্রলিটা ঠেলে আনলেন ভেতরে। মনস্টারের অভিমুখে নতমুখে দাঁড়াতেই ফের কর্ণকুহরে শুনতে পেলেন মনস্টারের বজ্রকন্ঠ!
“ আউট!”
যথার্থ হুকুমে বেরিয়ে গেলেন দুজন। তারা যেতেই উম্মাদ যুবকের পাগলামি শুরু হলো। খানিকক্ষণ এলকোহলের বোতলগুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখে আলগোছে ঘাড় কাত করে তাকাল ক্রন্দনরত মাহি’র পানে। মাহি হতবিহ্বল! কান্না থামিয়ে তাকিয়ে আছে কেমন। যুবক বাঁকা হাসলো। আচমকা চোখ টিপে তক্ষুনি হাতে থাকা এলকোহলে পরিপূর্ণ কাঁচের বোতলগুলো একে একে ছুঁড়তে লাগল বইয়ের স্তুপের দিকে। এরূপ কান্ডে ভড়কায় মাহি। আচমকা হতবিহ্বল কন্ঠে চেঁচিয়ে বলে,

“ বিস্ট! কি করছেন আপনি এগুলো?”
সপ্তদশীর কথাগুলো কানে তুলেনি রূঢ় মানব। সে নিজ বেপরোয়া কর্মে মত্ত! বইয়ের স্তুপের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে এলকোহলীয় তরল। সম্পূর্ণ কক্ষের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে কাঁচের তীক্ষ্ণ টুকরো। কিছু কিছু এসে দেবে যাচ্ছে রূঢ় মানবের উম্মুক্ত দেহে। লোমহীন পেটানো বক্ষের কিছু অংশ হতে চুইয়ে পড়ছে লহু। সেদিকে অবশ্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই মুগ্ধের। প্রায় মিনিট সাতেক চলল তার প্রলয়ঙ্কারী ঝড়। অবশেষে মনস্টার কেমন বড় বড় নিশ্বাস টেনে আলগোছে দু’হাত গুঁজল পকেটে। ঘাড় বাকিয়ে সপ্তদশীর পানে তাকিয়ে ফের বাঁকা হাসল। সঙ্গে এবার ক্যানাইন দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল ঠোঁট। মাহি ভ্রু কুঁচকায়। চোখেমুখে সন্দিহান ভাব টানতেই দেখতে পায়— মুগ্ধ নিজ পকেট থেকে লাইটার বের করছে। তৎক্ষনাৎ আঁতকে ওঠে মাহি। স্থানকাল ভুলে একছুটে এগিয়ে আসতে গেলেই আচমকা তার পানে তর্জনী উঁচিয়ে ধরে মুগ্ধ। চোয়ালের রেখায় টান বসিয়ে কটমট দৃষ্টিতে তাকায় সে। শাসানির সুরে গর্জন ধ্বনিতে বলে ওঠে,

“ উমমম! সামনে এগোবি না বান্দীর মেয়ে। ফ্লোরে কাঁচের টুকরো আছে, পা কেটে যাবে। খবরদার, তোর শরীর থেকে যদি একবিন্দুও র’ক্ত ঝরে, তাহলে বাকিটা আমি নিজ হাতে ঝরাব। মাইন্ড ইট!”
সহসা থেমে গেল সপ্তদশী ব্যস্ত পদ। বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে রইল সম্মুখে। রূঢ় মানব দাঁত খিঁচল ফের। বৃদ্ধা আঙুলের সাহায্যে লাইটার ধরিয়ে, তক্ষুনি আগুনটুকু ছুঁড়ে দিলো এলকোহলে সিক্ত বইয়ের স্তুপের মাঝে। মুহুর্তেই এক প্রলয়ঙ্কারী অগ্নিশিখার রেশ ছড়িয়ে পড়ল সম্পূর্ণ কক্ষে। দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল ঘরভর্তি অসংখ্য বই। সপ্তদশীর ছলছল দৃষ্টে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা। তার বুকটা বোধহয় কেউ চৌচির করে দিলো মাত্রই! মেয়েটা আনমনে চোখ নামিয়ে আনল রূঢ় মানবের পানে। ভঙ্গুর কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল —

“ পোড়ানোই যদি হতো, তাহলে আনলেন কেনো?”
কঠিন মানবের মুখভঙ্গি আগের চাইতেও কঠোর হলো বোধহয়। সে তক্ষুনি ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মাহি’র পানে। চোখদুটোতে আগুন লেপ্টেছে তার। চোয়ালের পেশী শক্ত! শরীর ঘুরিয়ে পায়ের গতি টানলেন নির্দয় মানব। সদ্য টুকরো হওয়া তীক্ষ্ণ কাঁচের টুকরোগুলোর ওপর অনায়াসে পা দাবিয়ে এগিয়ে আসে ধীর কদমে। তীক্ষ্ণ সীসার টুকরোর গায়ে রূঢ় মানবের রুক্ষ কদমতলের ত্বক পড়তেই তুলছে কুড়মুড় শব্দ। মার্বেলের তকতকে মেঝেতে ছাপ বসাচ্ছে তাজা লহু। অথচ মানবের চোখেমুখে ব্যথার লেশমাত্র নেই! সেথায় লেপ্টে আছে এক আকাশসম রাগ। বাদামী চোখদুটো যেন আজ বাজপাখির দৃষ্টিকেও হার মানাবে অনায়াসে। মাহি হতভম্ব! বিস্ময়ে চোখ ছুঁয়েছে ললাট। জিভের ডগা বাকশূন্য। এদিকে মাফিয়া বিস্ট পায়ের গতি অটল রেখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে গর্জন তুলে আওড়াল,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪০ (২)

“ আমি একচ্ছত্র আধিপত্যে বিশ্বাসী বান্দীর মেয়ে। যার ওপর একবার আমার নজর পড়বে , সে আমৃত্যু শুধু আমারই অধীনস্হ থাকতে বাধ্য! তার ওপর সকল অধিকার কেবল আমার হবে। ইভেন নো ওয়ান ক্যান ডেয়ার টু লুক অন দ্যাম। তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস বান্দীর মেয়ে — তুই আমার শিকার! তোর ধ্যান- জ্ঞান সবটায় কেবল আমার, এই শ্যাডো মনস্টারের আধিপত্য থাকবে। থাকবে মানে থাকবেই! সেটা তুই চাস বা না চাস, আই ডোন্ট কেয়ার! তোর দৃষ্টিতে আমি বাদে অন্য যেকোনো কিছু প্রাধান্য পেলে তার অস্তিত্ব আমি এভাবেই মিটিয়ে ফেলব! ধ্বংস করে ফেলব সবকিছু। জাস্ট মার্ক মা’ই ওয়ার্ডস বান্দীর মেয়ে!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here