পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৮
ঈশিতা রহমান সানজিদা
‘দেখ আম্মু, এভাবে আর কতদিন? নূরের বিয়ে হয়ে গেছে। সামনের মাসে শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। আব্বু এখনো কোন ব্যবস্থা নিলো না! আমি কত করে বললাম আমাকে শেয়ারে নিতে তাও না করে দিলো। তুমি কিছু বলোনি?’
সাইমনের মাথায় হাত, তার ব্যবসার ধ্বংস স্তুপ দেখে এসেছে আজ। এবার বোধহয় নিজের নামের জমিটুকু এবং দোকান বিক্রি করে দিতে হবে। এতো কঠিন ধাক্কা সে কিছুতেই সামলে উঠতে পারছে না। তার চেয়ে বড় কথা এখন ওর মনে নূরের বিজনেস হাতানোর লোভ জমেছে। তাই সে ইচ্ছে করে এই ধ্বংস স্তুপ ঠিক করতে চাচ্ছে না। দোকানের ফার্নিচার গুলো সব সেল করে দিবে অন্য কোম্পানির কাছে। সেখানে দাম অর্ধেক। সেই টাকায় কিছুই হবে না। এজন্য সে অনেকটা বাধ্য হয়ে ফের রাশেদ সাহেবের কাছে সাহায্য চাইলো। যতই হোক ছেলে বিপদে পড়েছে, রাশেদ সাহেব টাকা দিতে চেয়েছেন কিন্তু সাইমন টাকা নিবে না। তাকে নূরের সাথে শেয়ারে বিজনেস করতে দিতে হবে। এমন কথাবার্তা শুনে রাশেদ সাহেব নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি টাকা দিবেন, কিন্তু মেয়ের বিজনেসে কাউকেই হাত দিতে দিবেন না। সেখানেই কথা সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাতেও হাল ছাড়েনি সাইমন। সে এবার এসেছে রেহানার কাছে।
রেহানা ছেলের অসহায়ত্ব দেখে দুঃখ প্রকাশ করেন। বলেন,’তোর বাবাকে আমি কিছুই বলতে পারব না। তিনি আমার কথা শুনবেন না। নূরকে বলেছিলাম সেও আমাকে না করে দিয়েছে।’
একথা শুনে সাইমন অবাক হলো। মুখ থেকে কথা বের হতো না নূরের, আর সেই মেয়ে কিনা এত বড় কথা বলেছে। রেহানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,’তোকে একথা জানাইনি আগে। ও না চাইলে জোর করে আনব কিভাবে? মারধর করে তো আনতে পারব না। তোরা তো আমার সন্তান। হেলাফেলা যাই করি, ক্ষতি চাই না। তোর মামাদের থেকে তো টাকা এনে দিলাম। লোন শোধ করা তো শেষ, তোর বাবা যখন টাকা দিতে চাইছে নিয়ে নে। তারপর শক্ত করে ব্যবসা ধর এবার। ছেলেটার তো ভবিষ্যৎ আছে।’
সাইমন ভীষণ রেগে গেল। চোয়াল শক্ত করে বললো, ‘তোমার ছোট মেয়ের বিজনেসের লাভ কত হয়, কত টাকা ইনভেস্ট করে জানো কিছু?’ দম নেয় সাইমন, ‘কোটি কোটি টাকা। এমনি এমনি এত দামি গাড়িতে চড়ে না সে। দামি ফোন, জামাকাপড়, সাজসজ্জা সবই ওর নিজের টাকায়। এখনও স্বামীর টাকায় হাত দিতে হয়না ওর। কি ভাবছ, ওই ছেলেটা এমনি এমনি তোমায় মেয়ের জন্য সবকিছু করতে রাজি হয়েছে? ওর লোভ আছে বিধায় তোমার মেয়েকে সবকিছুর বিনিময়ে বিয়ে করেছে। একদিন এই ব্যবসা ওই ছেলের নামে হবে দেখে নিও।’
রেহানা বেগম বিরক্ত হয়। একে তো নিজে লোভ করে বসে আছে। তার উপর অন্য জনকে দোষ দিচ্ছে। সে বলে উঠলো,’তোর যা ইচ্ছে তাই কর তো। আমাকে এর মধ্যে ডাকিস না। আমি চেষ্টা করেছি সবকিছু সামলে নেওয়ার কিছুই তো হচ্ছে না।’
রেহানা বেগম উঠলেন, এই রাত দুপুরে তিনি স্বামীকে শেষবারের মতো চেপে ধরলেন। অনুরোধ করে বলেন,’ছেলেটাকে শেষবারের মতো একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?’
রাশেদ সাহেব বই পড়ছিলেন। মাথা তুলে বলেন,’তা দিয়েছি, টাকা দিয়ে ওর বিজনেস ঠিক করে দিতে চেয়েছি কিন্তু তোমার ছেলে তা নিবে না। ওর চেয়েও ছোট বোনটার বিজনেস অনেক বেশি বড় এবং লাভবান। সে এখন এই বিজনেস হাতাতে চাইছে।’
‘শেয়ারে করতে চাইছে, পুরোপুরি নিতে চাইছে না তো।’
‘নিজের ছেলেকে এই চিনলে এতদিনে? এভাবে বিজনেসে ঢুকতে চাইছে মাত্র, ধীরে ধীরে সবটা নিজের করে নিবে। তাছাড়া অফিসের সর্বনিম্ন যার সেলারি তার চিন্তাশক্তি তোমার ছেলের চেয়ে বেশি। হুট করে কাউকে নেওয়া যায় না। কোন এমপ্লয়ি নিতে হলে তার মানসিক দক্ষতা এবং কাজের ধরন দেখে নেই। সেখানে তোমার ছেলের তো কোনো যোগ্যতা নেই।’
রেহানা হতাশ হলেন। রাশেদ সাহেবের সাথে কথা বলে যে কিছুই হবে না, এবার সে পুরোপুরি নিশ্চিত।
সাইমন নিজ রুমে বসে রাগে গজগজ করছে। ইচ্ছে করছে সব কিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। যদিও নিজের এই অবস্থার জন্য সে নিজেই দায়ি তবুও মন মানতে চাইছে না।
ক’দিন আগে সে রেহনুমা নূর ইন্টেরিয়র স্টুডিও কোম্পানির সকল ডিল এবং লাভ সম্পর্কে জানতে পেরেছে সাইমন। সেখানে এমপ্লয়িদের বেতন অনেক, তাছাড়া প্রতিটি ডিলেই ব্যাপক লাভ হয় ওদের। এমন একটা বিজনেসের শেয়ারে থাকলেও লাভবান হওয়া যাবে। কপালের রগ গুলো কেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছে সাইমনের। স্বামীর এমন চিন্তা দেখে অনুপমা দ্রুত ঠান্ডা পানি এনে দেয়। শান্ত স্বরে বলে,’সবসময় মাথা গরম করতে হয়না। বিপদে পড়লে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হয় পরবর্তী পদক্ষেপ কি নেওয়া উচিত। তুমি বরং নূরের সাথে কথা বলো, ওকে বোঝাও। ভাই হয়ে তো কখনও কিছু চাওনি। এখন চাইলে নিশ্চয়ই তোমাকে ফিরিয়ে দেবে না।’
সাইমন জ্বলন্ত চোখে তাকায়। চোখদুটো লাল হয়ে আছে ওর। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে বলে,’নূর নিজেও না করে দিয়েছে।’
‘কি বলো, কবে?’
‘জানি না, মা তো তাই বললো।’
‘তবুও তুমি একবার কথা বলে দেখো। দেখো কি বলে। ওর মনটা বেশ নরম, হয়তো রাজি হতেও পারে। একটু ইমোশনাল হয়ে কথাবার্তা বলবে তাহলেই দেখবে কাজ হয়ে গেছে।’
সাইমন এবার গভীর চিন্তায় পড়ে যায়। কিভাবে নূরকে মানানো যায় সেই চিন্তা ভাবনা করতে থাকে।
ল্যাপটপ ওপেন করা অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছে আজমাঈন। মাথার নিচে এক হাত রেখে ঘুমে অচেতন সে। বিছানার মাঝামাঝি কাত হয়ে শুয়ে আছে, নূর ওয়াশ রুম থেকে বেশ সময় নিয়ে বের হয়েছে। এতটুকু সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেল ছেলেটা! আশ্চর্য হয় নূর, পুলে ডুব দেয়নি সে। চুলগুলো খোপা করা ছিলো বিধায় ভিজে যায়নি। জারুল রঙের সুতি গাউন গায়ে ওর, ওড়না মাথায় পেঁচিয়ে খাটের দিকে এগিয়ে গেল। সাবধানে আজমাঈনের ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে দিয়ে সরিয়ে রাখলো। ফিরে আসতে না আসতেই ফোনটা বেজে উঠলো। রাশেদ সাহেব কল করেছেন। নূর দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে রুমের বাইরে এলো। ওর কথায় যদি আজমাঈনের ঘুম ভেঙে যায়! রিসিভ করে সালাম দিলো। রাশেদ সাহেব সালামের জবাব দিয়ে বলেন,’কেমন আছিস রে মা?’
নূর কিছুটা রাগি স্বরে বলে,’দুপুর থেকে কতবার কল করেছি, রিসিভ করোনি। এখন জিজ্ঞেস করছো কেমন আছি?’
রাশেদ সাহেব শব্দ করে হাসেন,’আজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো, কয়েকজন এমপ্লয়ি নিয়োগ দিলাম। ওদেরই ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম। দু’জন দক্ষ ডিজাইনার নিলাম যাতে তোর খাটুনি কম যায়।’
‘ফারিন আপুকে দিয়ে তো একটা ফোন দিয়ে বলাতে পারতে? আর এত চাপ নিতে কে বলেছে তোমাকে? ফারিন আপু কে বললেই তো হয়ে যেত।’
‘বেচারির চাপ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তাই একটু সাহায্য করলাম।’
নূরের মন শান্ত হলো, সে শিথিল কন্ঠস্বর তুলে বলে, ‘রাতের খাবার খেয়েছ?’
‘খাবার ওষুধ সব খেয়েছি। শোন, কাল ফারিন যাচ্ছে।সব কাগজপত্র দেখিয়ে দিবে তোকে। দু’দিন থেকে চলে আসিস।
‘আচ্ছা!!’ অন্য সময় এই আচ্ছা শব্দ বলতে মন খুশিতে নেচে উঠতো নূরের, কিন্তু আজ আজমাঈনের চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। নূর দ্রুত দেয়াল ধরে নিজেকে সামলায়। নিজের এই পরিবর্তন খেয়াল করে অবাক হয়। একটা ছেলেকে নিজের জীবনে জায়গা দেওয়া কঠিন, কিন্তু সে যদি স্বামী হয়? তাহলে অতি দ্রুতই মনে জায়গা করে নেয়। এক্ষেত্রে আর পাঁচটা পর্যন্ত টিপিক্যাল স্বামীর মতো আজমাঈন নয়। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক শারীরিক দিক থেকে কাছাকাছি আসা নয়, মনের দিক থেকে কাছাকাছি আসাই আসল সম্পর্ক। কিন্তু বেশিরভাগ মেয়েরাই এই সময়টা পায়না। এজন্য তাদের সবকিছু মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়ে যায়। তখন তাদেরকে বলা হয় যে তারা স্বামীর হক আদায় করছে না। খুব সহজেই অভিযোগের আঙুল তোলা যায়, কিন্তু বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকার নারীর মনের ভাব বোঝার ক্ষমতা তাদের হয়না।
আজমাঈন তাদের থেকে ব্যতিক্রমী ছেলে, হয়তো এজন্যই নূরের আকর্ষণ বেড়েছে। কল কেটে নূর রুমে ফিরে আসে, আজমাঈন তখনও ঘুমে। সে বালিশ তুলে নেয়, অতঃপর আলতো হাতে আজমাঈনের মাথা তুলে ধরে বালিশে শুইয়ে দেয়। এক খানা ঘুমন্ত মুখ, তাকিয়ে রয় নূর। তখন হতচকিত হয়ে আস্তাগফিরুল্লাহ বলাটা বড্ড ভুল হয়ে গেছে। নিজের বোকামোর কথা ভেবে হাসলো। আনমনেই হাত এগিয়ে দিলো আজমাঈনের ঘন চুলের দিকে। কোমল হাত ডুব দিলো আজমাঈনের চুলের গভীরে। বিড়বিড় করে বললো,’মাশআল্লাহ!!’
পরদিন সময়টা যেন হুট করেই কেটে গেল। ফারিনের সাথে পুরো ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করার পর কর্মচারীদের সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া হলো। লাস্ট ফিনিশিং দেওয়ার পর নূর আরেকবার এসে দেখে যাবে। দু’দিন পর আজমাঈন নিজেই নূরকে বাড়ি পৌঁছে দিলো। গাড়ি থেকে নামার আগে নূর জিজ্ঞেস করল,’আপনি যাবেন না?’
আজমাঈন সিটে গা এলিয়ে দিলো। ঘাড় কাত করে তাকিয়ে বললো,’তুমি যদি বলো অবশ্যই যাব, থাকতে বললে থাকতেও পারি। যদি তুমি চাও!’
নূরের মনে হলো কথাটা বলাই ভুল হয়েছে। কথাতেই আটকে দেয়। নূরকে জবাব দিতে না দেখে আজমাঈন বলে ওঠে,’জানি তুমি জবাব দিবে না। তাই দায়িত্ব নিয়ে থাকার ব্যাপারটা আমিই নিলাম। তাছাড়া আঙ্কেলের সাথে পেমেন্ট নিয়ে কথা আছে।’
নূর মাথা নাড়ে, গাড়ি থেকে দু’জনেই বের হয়। সাইমন আশায় আশায় ছিলো, কিন্তু নূরের সাথে আজমাঈনকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দেখে থেমে যায়। অনুপমার মুখে এই ছেলের গুণগান শুনেছে সে। তাই আপাতত এর ধারেকাছে যাওয়া যাবে না। কখন থাবা মেরে বসে কে জানে।
রাশেদ সাহেব সন্ধ্যায় ফিরেছেন, তিনি লাইব্রেরী তে আজমাঈনের সাথে বৈঠকে বসেন। শুরুতে কাজ নিয়ে কথাবার্তার প্রাথমিক ধাপ শেষ করেন। তারপর বলেন,’তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল।’
আজমাঈন স্বাগতিক হয়ে বলে,’জি বলুন।’
রাশেদ সাহেব গম্ভীর স্বরে বলেন,’যদি এক সপ্তাহের মধ্যে রেজিষ্ট্রি করে নূরকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যেতে বলি পারবে?’
আজমাঈন সম্মতি জানায়,’পারব, কিন্তু এর কারণ জানতে পারি?’
জবাব দিলেন না রাশেদ সাহেব। আজমাঈন ফের বলে,’আমি নূরের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছি আঙ্কেল। ওর সব বিষয়ে অবগত না থাকলে বিপদে আগলে রাখব কিভাবে?’
যৌক্তিক কথা মনে হলো রাশেদ সাহেবের। তিনি হতাশার স্বরে বলেন,’সাইমন এখন নূরের ব্যবসা দখলের পায়তারা করছে। যতটুকু বুঝতে পারছি ও খুব শীঘ্রই নূরকে হাত করার চেষ্টা করবে। মেয়েটার মন বড্ড নরম, ইমোশনাল ব্লাকমেইল করলেই রাজি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাছাড়া বিপদ আপদ হতেও পারে। আমি এখন ওকে আগলে রাতে অক্ষম। তাই যত দ্রুত সম্ভব ওকে নিয়ে যাও। আমি ওকে বুঝিয়ে বলব।’
আজমাঈন আজ একজন ভঙ্গুর পিতাকে দেখলো। মেয়ের নিরাপত্তার জন্য কতটা ভাবছেন তিনি। এক কালে ওনার শক্তি ছিলো, তখন মেয়েকে একা হাতে আগলে রেখেছেন। এখন তিনি সত্যিই নুইয়ে পড়েছেন, নিজেকে ধরে রাখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সেখানে মেয়েকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তিনি। বাবার পর একটা মেয়ের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো স্বামীর ঘর। সেখানে নূরকে পাঠিয়ে দিয়ে শান্তির নিশ্বাস ফেলতে চাইছেন রাশেদ সাহেব।
দু’জনের কথোপকথনের মাঝে নূর দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতরে আসার অনুমতি পেয়েই পা বাড়ায়। নিচু গলায় রাতের খাবারের জন্য ডাকে। রাশেদ সাহেব আর কথা বাড়ান না। তিনি নূরকে এই বিষয়ে জানাতে চাচ্ছেন না, ইশারায় আজমাঈন কেও না করে দিলেন।
রাতের খাবার শেষ করে দু’জন একইসাথে রুমে ফেরে। নূর আগে আগে রুমে ঢুকলেও আজমাঈন দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। পেছন থেকে ডেকে ওঠে,’রেহনুমা জান্নাত, নূর।’ একটু থেমে থেমে ডেকে ওঠে আজমাঈন। নূর পেছন ফিরে তাকায়। আজমাঈন ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে বলে,’আমি কখনো ঋণ রাখি না জানো?’
নূরের ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো, কথার মানে বুঝলো না তখনই। আজমাঈন হাসে, দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুকে পা দিয়ে ঠেলে দরজা বন্ধ করে। বলে,’এসির টেম্পারেচার কমিয়ে দাও, আমি কিছু বললেই তো আবার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে।’
কি সব কথাবার্তা বলছে ছেলেটা! বোঝা মুশকিল। নূরকে বোঝানোর জন্য আজমাঈন বলে,’আমার চুল স্পর্শ করে আমাকে ঋণী বানিয়ে দিয়েছ এখন আমার পালা।’
নূর স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আগের মতো কপাল বেয়ে ঘাম ঝরলো না। অস্বস্তি বোধ করলো না। সে আজমাঈনের বক্তব্য সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেল। বিছানা গুছিয়ে ঘুমানোর উপযুক্ত করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে টুল টেনে বসে। আজমাঈন তখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে, প্রথম নূরের হাবভাব বুঝতে পারছে না সে। নূর বেশ স্বাভাবিক ভাবেই লোশনের বোতলটা হাতে নিলো। আজমাঈনের দিকে তাকিয়ে বললো,’ঋণ!! শোধ করবেন?’
এবার জবাব দেওয়ার খেই হারায় আজমাঈন। নূরের চাহনিতে বুঝি অন্যকিছু আছে। ডুবে গেছে সে এক নিমিষেই, তার এই হাবুডুবু খাওয়ার ব্যাপার টা কি নূর খেয়াল করেছে? নূর সহাস্যে বলে উঠলো,’প্রার্থনা করুন, হয়ে যাবে।’
বলেই চোখ ফেরায়, তবে আজমাঈন যেন ঝড়ের গতিতে কাছে এসে দাঁড়ায়। হাঁটু গেড়ে বসে, হাতের বোতলটা ছো মেরে নিয়ে দূরে সরিয়ে রাখে। বলে, ‘কোন প্রার্থনায় চাইলে তাড়াতাড়ি কবুল হবে?’
থতমত খায় নূর, হুট করে বসে পড়ায় চমকে গেছে। চটজলদি জবাব না দিলেও ধীরে ধীরে বলে, ‘তাহাজ্জুদ!’
‘তুমি পড়বে?’
‘আমি তো রোজ পড়ার চেষ্টা করি, তবে মাঝে মাঝে বাদ যায়।’
‘তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে কি চাও তুমি?’
নূর যথেষ্ট ঠান্ডা এবং কোমল স্বরে বললো,’চাওয়া সব খোদার কাছে, একমাত্র তিনিই সব দিতে পারেন। তাই শুধুমাত্র তাকেই জানাই।’
আজমাঈন কেমন সাহসী হয়ে উঠলো। অধিকার ফলিয়ে নূরের দুহাত চেপে ধরে বললো,’চলো, আজ একসাথে আমরা তাহাজ্জুদ পড়ব। মোনাজাতে তুমি আমাকে চাইবে আর আমি তোমাকে চাইব।’
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৭
আজমাঈনের অস্থিরতা টের পেল নূর। বারবার নূরের হাতে হাল্কা চাপ প্রয়োগ করছে। ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নূর বলে উঠলো,’আমরা আলাদা বলতে চাইছেন?’
আজমাঈন চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে সরাসরি নূরের চোখের দিকে তাকায়। অস্থির চিত্তে বলে ওঠে,’তুমি কি সত্যি আমাকে পেয়েছ বা আমি কি আদৌও তোমাকে পেয়েছি?’
