পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৬
ঈশিতা রহমান সানজিদা
নূর তখনও কানে ফোন ধরে রেখেছে, আজমাঈনের এমন কথার পরিপ্রেক্ষিতে কি বলবে তৎক্ষণাৎ ভেবে পেলো না। চতুর ছেলেটার মতো তো ঠোঁটের ডগায় কথা ঝুলে থাকে না। এভাবে হঠাৎ করে কল করায় এখন কেমন লজ্জা লজ্জা লাগছে নূরের। রক্তিম আভা গালে ছেয়ে গেছে তা টের পায়নি নূর। চোখের পলক বারবার উপর নিচ করছে। মেয়েটা কিছুতেই কথা বলতে পারছে না। আজমাঈন আগের মতোই আদুরে স্বরে বললো,’কথা বলবে না? কলটা কিন্তু তোমার থেকেই এসছে। নিশ্চয়ই কিছু বলতে চাও।’
নূর কেমন হাঁসফাঁস করে উঠলো। অস্থিরের তাড়নায় মাথায় পেঁচানো ওড়না টেনে খুলে ফেললো। মুখ গলা ঘেমে গেছে, গলা শুকিয়ে গেছে। আজমাঈন ঠোঁট কামড়ে হাসে, দূর থেকেই নূরের অবস্থা টের পায়। নাহ এভাবে কথা বলা যাবে না, নাহলে দেখা গেল জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। ভাবতেই ভীষণ হাসি পেল আজমাঈনের। সে গলার স্বর চেঞ্জ করে বললো, ‘আচ্ছা থাক বলার দরকার নেই। রিসেপশনের কাজ না করেই চলে গিয়েছিলে মনে আছে? এবার এসে বাকি কাজটা দেখে যাও। তাহলেই হবে।’
সেবার খুব তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিল নূর, রিসেপশন এর ডেকোরেশন সম্পূর্ণ টাই নূর দেখছে। এখন আজমাঈন এমনভাবে ধরেছে না গিয়ে উপায় কোথায়? আগেরবার তো কাজ ব্যতীত কোন সম্পর্ক ছিলো না। এখন এই বন্ধনের সে সুতাটা রয়েছে সেটা ধরেই অনর্গল টানবে আজমাঈন। না করার উপায় রাখেনি ছেলেটা। তবে নূর এবার নিজের মনের কথাগুলো বলতে চায়। থেমে থেমে বলে,’আমার কিছু বলার ছিলো।’
আজমাঈন ঝটপট জবাব দেয়,’বলো শুনছি।’
‘জানি না আব্বুর সাথে আপনার কোন বিষয়ে কথা হয়েছে। এখনও কিছু বলেনি আব্বু। তাই ভাবলাম আপনাকেই জিজ্ঞেস করি। আমার বিজনেস নিয়ে আপনার কোন আপত্তি আছে?’
আজমাঈন চুপচাপ শোনে, হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন করছে বোধগম্য হচ্ছে না ওর। বলে,’অন্য পুরুষের সান্নিধ্যে যাওয়া ব্যতীত তোমার সবকিছু আমি মেনে নেব।’
এই ছেলেটা কেমন করে কথা বলে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপক্রম হয় নূরের। এত ভারি কথার ওজন নূর নিতে পারে না, একথা কি জানে না আজমাঈন? আজমাঈন বলে,’আর কিছু জানতে চাও?’
‘নাহ।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি কিছুক্ষণ পর তোমাকে কল করছি, ভিডিও কল।’
ফোন রাখল আজমাঈন। নূর ওভাবেই তব্দা মেরে বসে রইল। তবে কিছুক্ষণ পর ফোন করা হলো না। আজমল শিকদারের সাথে খাওয়া নিয়ে ফের এক চোট ঝগড়া হলো। তারপর রুমে আসতেই ফয়েজের ফোন। ধরবে না ধরবে না করেও রিসিভ করলো। ফয়েজ গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,’কিরে ফাজিল, কোনো খবর নেই তোর।’
আজমাঈন বিছানায় টান হয়ে শুয়ে পড়লো। বাম হাতটা ছড়িয়ে দিয়ে বললো,’তা এখনও কি করছিস? টিকিট কেটে দিলাম, রুমে বসে হাওয়া খাচ্ছিস।’
ফয়েজ আয়েশ করে বসে,’ধ্যাত, একা একা ভালো লাগবে না। তোর তো হিল্লে হয়ে গেল। চল দু’জনে একসাথে যাই।’
আজমাঈন মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়ে,’ছ্যাহ, তোর সাথে হানিমুন শেয়ার করতে আমার বয়েই গেছে।’
‘এমন করে বলছিস যেন এক রুমেই সবাই থাকব।’
‘তোরা ঘুরে আয়, আমার এখনও বউয়ের সাথে ভাব জমানো বাকি।’
ফয়েজ হরহর করে বলে উঠলো,’খবরদার! বেশি ভাব জমাবি না। নাহলে আমার টার মতো মাথায় চড়ে বসবে। কি জেদি মেয়ে রে ভাই।’
আজমাঈন শব্দ করে হাসে, হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়,’নূর তো তেমন নয়, তবে তুই ট্রেনিং নিস বেশি বেশি। বউয়ের সাথে মিষ্টি কথা না বললে তো এমন করবেই।’
‘মিষ্টি মিষ্টি কথা কেমনে বলে হ্যাঁ? এখন তোর থেকে শিখতে হবে আমাকে, দুই দিনের সাধু ভাত রে কয় অন্ন।’ কটাক্ষ স্বর ফয়েজের,’বিয়ে করলি দু’দিন হলো না, ভাবছিস খুব সংসার করছিস তাই না?’
‘হিংসে হচ্ছে খুব? আমাকে সুখে থাকতে দেখে জ্বলছে?’
ফয়েজ ধমকে ওঠে,’তোর সাথে কথা বলাই ভুল হয়েছে আমার।’
ফোন কাটতেই সাহারা বলে উঠলো,’বদনাম করা শেষ?’
ফয়েজ ফোন রেখে চোখ তুলে তাকায়, সাহারা লাগেজ গোছাচ্ছে। আগামীকাল দুপুরে ওদের ফ্লাইট। কাজের চাপ থাকার কারণে ফয়েজ দেশের বাইরে যাওয়ার কথা নাকচ করে দিয়েছে। সেজন্য আজমাঈন কক্সবাজার যাওয়ার টিকিট কেটে দিয়েছে, পাঁচ দিনের জন্য হোটেল বুকিং দিয়েছে। আজমাঈনের সাথে ওর যত ঘুরা ঘুরি। কলেজ, ভার্সিটি লাইফে কত ঘুরেছে। দেশের কোনো জায়গা বাদ রাখেনি। আজমাঈন যেহেতু বিয়ে করেই ফেলছে দুজন একসাথে হানিমুনে যাবে ভেবেছে। কিন্তু আজমাঈন ওর আশায় বালি ঢেলে দিয়েছে। তার উপর এখন সাহারা কথা বলা শুরু করেছে। ফয়েজ হাত বাড়িয়ে সাহারার হাত ধরে। পাশে বসিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলে,’সবসময় এতো রুড মুডে থাকো কেন বলতো? একটু আদুরে গলায় কথা বলতে তো পারো। আমি তো সেই অপেক্ষায় থাকি নাকি?’
সাহারা মৃদু হাসলো। দু’হাতে ফয়েজের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,’শুনুন না, বলছি আমার নামে বদনাম করা শেষ হয়েছে? যদি শেষ হয় তাহলে আপনার আর কোন কোন জামাকাপড় নিব একটু দেখিয়ে দিন।’ চোখ পিটপিট করে তাকায়,’আর একটা কথা ওখানে গিয়ে আমি কিন্তু আলাদা রুমে উঠব। যে স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয় তার জায়গা আলাদা রুমে হওয়া উচিত তাই না?’ সাহারা ফয়েজের গাল টেনে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ওদিকে ফয়েজ বেচারা হতভম্ব হয়ে গেছে। ও তো আজমাঈনের সাথে মজা করছিল। সেটাই সিরিয়াসলি নিয়েছে মেয়েটা। সাহারা উঠে দাঁড়াতেই বলে উঠলো,’এ্যাই মেয়ে, কি বললে তুমি?’
সাহারা নিজের কাজে মন দিয়েছে। ব্যস্ত হয়ে বলে, ‘কেন? মিষ্টি করেই তো কথা বলেছি। এখন কি এভাবেও কথা বলা যাবে না? কিভাবে কথা বলব বলে দিন!’
ফয়েজ পড়লো মহা বিপদে, তার এই বউকে মানানোর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। কেননা মিষ্টি কথায় ভোলে না ওর বউ। সাহারার জন্য যে সারপ্রাইজ রেখেছে সেটার কি হবে তাহলে। এই মেয়ে এখন যদি না মানে তাহলে! তবুও শেষ চেষ্টা করলো ফয়েজ। পেছন থেকে বউকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল, মাথা কাঁধে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকলো। এবার শতবার জোড়া জুড়ি করেও সাহারা ওকে ছাড়াতে পারবে না। শরীরের অর্ধেক ভর ছেঁড়ে দিয়েছে ফয়েজ।
দিন দুয়েক বাদে আজমাঈন নিতে এসেছে নূরকে। এবার ওদের টিম যাবে না। ফারিন দু’দিন যাবে, তবে থাকবে না। দু’দিনেরই ব্যাপার, নারায়ণগঞ্জ থেকেই যাতায়াত করবে। আসার পর নূরের রুমে যায়নি আজমাঈন, তাহলে দেখা গেল রেডি হতে গিয়ে আর পাত্তাই পাওয়া যাচ্ছে না নূরের। অগত্যা ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে সে। রাশেদ সাহেব বাড়িতে নেই, উনি অফিসে গেছেন। তাই আজমাঈন একা একাই বসে আছে। অনুপমা সৌজন্য মূলক কথাবার্তা বলে গেছেন। নাস্তা নিয়ে এসে সে আজমাঈনের মুখোমুখি সোফায় বসলো। মৃদু হেসে বললো,’তোমার কাজকর্ম কেমন চলছে? সব ঠিকঠাক?’
আজমাঈন হেঁসে মাথা নাড়ে,’জি, কিছু কাজ বাকি আছে। যদি সব ঠিকঠাক থাকলে তাহলে দুমাসের মধ্যে ওপেন হয়ে যাবে। দোয়া করবেন!’
অনুপমা আগের ন্যায় হাসে,’যাক সবকিছু ভালো হলেই ভালো। আসলে নূরকে নিয়ে আমাদের অনেক চিন্তা ছিলো।’ আজমাঈনের ভ্রু কুঁচকে এলো। অনুপমা সহসাই বলে উঠলো,’তুমি তো জানোই ওর জন্মের কথা। সেসময় সাহারার জন্ম হয়েছে। তারপর শ্বাশুড়ি মায়ের এই অবস্থার কথা জানতে পেরে সবাই অবাক হয়েছি। অবশ্য পরিবারের কারো আপত্তি ছিলো না। কিন্তু বাইরের মানুষের কথা আর কি বলব।’ ভঙ্গুর শোনালো অনুপমার কন্ঠস্বর,’ওদের জন্য শ্বাশুড়ি মায়ের অবস্থার অবনতি হয়েছিল। তারপর নূরের জন্ম হলো। ভেবেছিলাম এইসব বাইরের মানুষের জন্য নূরের বিয়েই হবে না। তবুও একটা ভালো সম্বন্ধ এনেছিলাম। তাও শ্বশুর না করে দিলেন। কিন্তু শেষমেশ মেয়েটার একটা গতি হলো এতেই খুশি আমরা। নাহলে এই বুড়ো বয়সে চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে যেতাম।’
হঠাৎ করেই অনুপমার কন্ঠস্বর বদলে গেল। রসিকতা করে বললো,’বুড়ো বয়সে ননদের বিয়ে খাব কে ভেবেছিল বলো, বিয়েতে যারা এসেছে সবাই কি হাসি ঠাট্টা করে গেল। আমার নাকি ভাগ্য ভালো।’
এই মহিলার কথাবার্তার ধরন ভালো না। ফয়েজের বিয়ের সময় নূর সম্পর্কে যে মিথ্যা বলেছিল সেদিনই বুঝেছিল আজমাঈন। এখন সম্পর্কে মহিলা টি ওর বড় ভাবি হয়। সে যখন খোঁচা দিয়ে কথা বলছে তাহলে আজমাঈন দিলে দোষ কোথায়। তাই ও বলে,’সন্তান হলো সৃষ্টিকর্তার দান, তিনি কাকে কখন দিবেন সে তো কেউ জানে না। এই ধরুন চাইলে এখন আপনাকেও দিতে পারে। আপনিও এই বয়সে মা হতে পারেন।’
মুহুর্তেই অনুপমার মুখের রং পাল্টে গেল। হাসি মিলিয়ে গেল, আজমাঈন বললো,’আল্লাহ খুশি হয়ে দিলে ফেলে দেওয়া যাবে না তো। তবে আপনি চাইলে এখন থেকেই সাবধান থাকবেন।’
কথার মাঝেই নূরকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখা গেল। আজমাঈন ঠোঁটে হাঁসি ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নূর এগিয়ে আসতেই বলে,’চলো।’
মেয়েটা এক পলক আজমাঈনকে দেখে বাইরের দিকে হাঁটা ধরে। আজমাঈন আপেলের টুকরো হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,’ভাইয়ার থেকে দূরে দূরে থাকবেন কেমন?’
অনুপমাকে হতবাক করে দিয়ে আজমাঈন আপেলের টুকরোতে কামড় বসিয়ে চলে গেল। ছেলেটা ভারি পাজি তো, কথায় তো খই ফোটে। এর সাথে পাঙ্গা নেওয়া সহজ হবে না। মুখ বেঁকিয়ে রুমে চলে গেল অনুপমা।
নূর শান্ত, ভীষণ রকমের শান্ত। ওর কেন যেন রাগ লাগছে। কালো বোরকার আড়ালে থাকা বউয়ের ভাবগতিক বুঝতে পারছে না আজমাঈন। চোখের নেকাব টাও নামানো। শরীরের কোন অংশই দৃশ্যমান নয়। আজমাঈন গলা খাঁকারি দিলো,’কাচ তোলা আছে তো, অন্তত চোখের পর্দা সরাও। আমি আবার কারো চোখ না দেখে কথা বলতে পারি না। অস্বস্তি হয়, সে কিছু বললে বুঝতেও পারিনা।’
যদিও নূরের মুখ থেকে কথা বের হওয়া অবিশ্বাস্য। তবে নূর আজমাঈনের কথা শুনলো না। সে বাইরের দিকে তাকিয়ে। আজমাঈনের কথা যেন কানেই যাচ্ছে না। নূরের এমন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আজমাঈন কথার খেলাপ করেছে, কথা দিয়ে কথা রাখেনি। দু’দিন আগে ফোনে বলেছিল যে খাওয়া শেষ করে কল করবে, নূর যেন অপেক্ষা করে। সেই অপেক্ষায় নূর রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত করেছে। তবুও ফোন করেনি আজমাঈন। কথা রাখেনি, তাহলে আজ সে কেন শুনবে? তার এই ভাবনার মাঝেই টের পেল কেউ তাকে টানছে, ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো আজমাঈন এক হাতে ড্রাইভ করছে আরেক হাতে নূরের বোরকা ধরে টানছে।
হতভম্ব হয়ে যায় নূর, এই ছেলে টানাটানি ছাড়া কিছু জানে না? ওইদিন ওড়না ধরে টেনেছে আজ বোরকা, মাথায় সমস্যা আছে নিশ্চয়ই। নূর আতঙ্কিত গলায় বলে,’এভাবে ড্রাইভ করছেন কেন? দুর্ঘটনা ঘটে যাবে।’
আজমাঈন গভীর শ্বাস ফেলে,’এ তো সামান্য। দুর্ঘটনা তো সেদিন ঘটেছে যেদিন প্রথম তোমার চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম।’ নূরের জবাব কেড়ে নিয়ে হাসলো আজমাঈন। এমনিতেই মেয়েটা কম কথা বলে তার উপর আজমাঈন এমন সব কথা বলে যে নূর আর কিছু বলতেই পারে না। আজমাঈন আবার বলে,’বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটার আগে নেকাব সরাও, এবার মুখের নেকাব সহ সরাবে। নাহলে বোরকা ধরে টানাটানি থামবে না।’
নূর খুব দ্রুতই নেকাব খোলে, মুখ দৃশ্যমান হয়। তবে আজমাঈনের দিকে তাকায় না। ভুলেও তাকাবে না, কেমন করে তাকায় যেন। আজমাঈন বোরকা ছাড়ে। তবে মাঝে মাঝে নূরের দিকে তাকায়, এখন তো হলো মহা বিপদ। এভাবে গাড়ি চালালে খাদে যেতে সময় লাগবে না খুব একটা। তবে দক্ষ চালক আজমাঈন। ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সময় সবগুলো পরীক্ষায় পাশ করেছে। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় অনেকে ঘুষ দিয়ে পাশ করলেও আজমাঈন নিজ দক্ষতায় পাশ করেছে। তার গাড়ি চালানোর হাত দারুন। সময় মতো হোটেলে পৌঁছায় দু’জনে। প্রায় সবগুলো রুমই কমপ্লিট। রিসেপশনের পাশের রুমটায় নূরকে নিয়ে যাওয়া হলো। ছোট্ট ট্রাভেল লাগেজ সাথে এনেছে নূর। আজমাঈন এয়ার ফ্রেশনার দিলো, এসি অন করে দিয়ে সোফায় বসে হাঁফ ছাড়লো। বললো, ‘আজকের দিনটা রেস্ট করো, আগামীকাল থেকে নাহয় কাজ শুরু করলে। ফারিন আপু তো আজ আসবে না।’
নূরের মনে হচ্ছে সে আটকে গেছে, এখন কি আজমাঈন তার সাথে এখানে থাকবে নাকি? কথাটা ভাবতেই বোকা বনে গেল নূর। থাকবে না তো কি করবে। ওকে এখানে একা রেখে চলে যাবে? নিজের গালে নিজেই থাপ্পড় মারার ইচ্ছে পোষণ করলো নূর। ফ্রেশ হয়ে লম্বা ঘুম দিলো। আজমাঈন ততক্ষণে বাহিরে চলে গেছে। ভেতরে ঢুকলো চাবি দিয়ে, আসার পর মেয়েটার খাওয়া দাওয়া হয়নি। এখন ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। খাওয়া দাওয়া পরে করা যাবে। নূর কে নিয়ে আজ ব্যস্ত ঢাকা শহর ঘুরবে বলে মনস্থির করলো আজমাঈন। তার এই ইচ্ছায় ব্যাঘাত ঘটায় নূর।
হোটেলের ভেতরে দু’জন ব্যতীত কেউ নেই। গেইটের কাছে দু’জন দারোয়ান আছে পাহারা দেওয়ার জন্য। নূর কাগজ কলম নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এশার নামাজ কিছুক্ষণ আগেই আদায় করেছে সে। আজমাঈন এখনও মসজিদ থেকে ফেরেনি। এই ফাঁকে সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছে নূর। যদিও এত বড় হোটেলে একা সে, আজমাঈন থাকতে ভয়ের কিছুই নেই। বলতে গেলে ওরা দু’জনই এই হোটেলের প্রথম কাপল। আজমাঈন যখন ফিরলো দেখলো নূর তার কাজের জিনিসপত্র গুছিয়েছে। সে জিজ্ঞেস করলো,’এসব দিয়ে এখন কি করবে?’
জবাব এলো,’এখন তো কোন কাজ নেই, তাই একটু ঘুরে দেখি। কোথাও কোন ত্রুটি আছে কিনা দেখতে হবে।’
ব্যস আজমাঈনের ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিতে হলো। যদিও সে আবদার করলে নূর ফেলতে পারত না। তবে একদিনে এত আবদার সাজে না। হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই আজমাঈন তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো, ‘থামো থামো, সিসিটিভি ক্যামেরা গুলো অফ করে দিয়ে আসি।’
ছেলেটার এমন পাগলামোতে নূর কি করবে ভেবে পেল না। আজমাঈন ছুটলো ক্যামেরা গুলো অফ করতে। কিছুক্ষণ বাদে এসে নূরকে নিয়ে বের হলো। নূরের নেকাব নেই, সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে। আধঘন্টা পার হতে না হতেই দারোয়ানের ফোন। কানে ধরেতেই আজমাঈন চমকে গেল। তখন ওরা দোতলায় ছিলো। নিচের তলায় কি হচ্ছে খেয়াল করেনি। নূরকে দোতলায় দাঁড় করিয়ে রেখে দৌড়ে নিচে নামলো সে। দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। সে বলে, ‘স্যার দেখেন, দু’টো লাইট খুলে নিয়ে গেছে।’
দামি দু’টো লাইট হাওয়া, আজমাঈন হতাশ হয়ে গেল। বউ লুকাতে ক্যামেরা অফ করলো আর ওদিকে চোর এসে লাইট খুলে নিয়ে গেল। দারোয়ান বলতে শুরু করল,’ঢোকার সময় দেখতে পারিনি, হঠাৎ দেখলাম দৌড়ে যাচ্ছে। আমিও দৌড় দিলাম কিন্তু ব্যাটাকে ধরতে পারিনি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখুন স্যার। এলাকারই ছিঁচকে চোর হবে। দেখলেই চেনা যাবে।’
আজমাঈন চারিদিকটা দেখে নিলো ভালো করে। তারপর বললো,’আপনি যান, আমি দেখছি।’ দারোয়ান চলে গেল। নূর সিঁড়ির কাছে এসে দাড়িয়ে ছিলো। লুকিয়ে লুকিয়ে কথাবার্তা শুনেছে সব। কেন যেন ওর ভীষণ হাসি পাচ্ছে। আজমাঈনের মুখটা দেখার মতো ছিল তখন। কোনটা রেখে কোনটা সামলাবে সে। নিঃশব্দে পেছনে এসে দাড়িয়ে বলে, ‘পরে ফুটেজ ডিলিট করে দিলেই হতো, আর নাহয় আমি নেকাব পড়েই আসতাম।’
আজমাঈন ফিরে তাকায়, চমৎকার হাসে। কিছুটা শিথিল কন্ঠে বলে,’এই ক্যামেরা গুলো তোমাকে দেখুক তা আমি চাইনা।’
‘বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।’
আজমাঈন ঠোঁট উল্টে বলে,’আমি বেশি বেশিই করি। আচ্ছা যেহেতু চুরি হয়ে গেছে কিছু করার নেই। এবার পাহারা বাড়াতে হবে। তুমি আমি আজ সারারাত পাহারা দিব কেমন?’
আজমাঈন ভেবেছিল নূর মানা করে দিবে। কিন্তু নূর রাজি হয়ে গেল। রুমের ভেতর একা একা ওর ভালো লাগছিলো না। বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে ভালো লাগবে। হাতের কাগজপত্র রেখে নেকাব বেঁধে নিলো। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে পুলের ধারে এলো। নূরের চোখজোড়া কেমন জ্বলজ্বল করে উঠলো। কি সুন্দর টলমল করছে স্বচ্ছ পানি। দেখেই পা ভেজাতে ইচ্ছে করে। আজমাঈন বোধহয় ওর মনের কথা বুঝতে পারলো। বললো,’সাঁতার জানো!’
থতমত খেয়ে গেল নূর। মুখে বললো,’জানি!’
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৫
‘পুলে নামবে? চলো আজ সাঁতারের প্রতিযোগিতা হয়ে যাক।’
বাচ্চাদের খেলা মনে হলো নূরের। তারপরও সে জিজ্ঞেস করলো,’পুরষ্কার কি হবে?’
আজমাঈন খানিকটা কাছে এগিয়ে এলো। মুচকি হেসে বললো,’জিতলে আমি তোমার আর হারলে তুমি আমার।’
