Home পদ্মপ্রিয়া পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৭

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৭

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৭
ঈশিতা রহমান সানজিদা

একটা বিশ্বস্ত হাত থাকলে সেই হাত ধরে সারাজীবন নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দেওয়া যায়। জীবনের প্রতিটি দিনে বসন্তের আগমন ঘটে। এক জীবন সুখে কাটিয়ে দিতে একজনের ভালোবাসাই যথেষ্ট। যেমন রাশেদ সাহেবের ভালোবাসায় নূর নিজেকে যথেষ্ট গুছিয়ে নিতে পেরেছে। কষ্ট গিলে থাকতে পেরেছে। আর দ্বিতীয় জন হলো আজমাঈন। উত্তম জীবনসঙ্গী সে।
ফজরের নামাজের সময় মোনাজাত ধরেছে নূর। ওর ভালোবাসার দু’জন মানুষের জন্য সর্বপ্রথম দোয়া প্রার্থনা করলো। তারপর বাকিদের জন্য। নূরের কান্না পাচ্ছে খুব। এতটা আশা করেনি সে। কিন্তু রাশেদ সাহেব বেছে বেছে মেয়েকে সঠিক মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন।

নামাজ শেষে ট্যালি কাউন্টার হাতে নিয়ে জায়নামাজে বসে দোয়া পড়তে থাকলো। পা ভাঁজ করে বসেছে। চোখ বন্ধ করে বসে দোয়া পড়ছে সে। আচমকাই আজমাঈন ফিরলো, বিছানা থেকে কুশন নিয়ে নূরের জায়নামাজের উপর শুয়ে পড়লো। খেয়াল করেনি নূর, চমকে তাকায়। বলে,’ভয় পেয়ে গেছি।’
আজমাঈন শব্দ করে হাসে,’আজকাল আমাকে ভয় পাচ্ছো যে? আমি কি ভালোবাসা কমিয়ে দিয়েছি?’
এই প্রশ্নের আদৌও উত্তর হয়? নূরের চাহনি অন্যরকম দেখায়। আজমাঈন বলে,’রিল্যাক্স, ওভাবে বলিনি।’
চোখ বন্ধ করে বলে,’তুমি আমাকে কোরআন পড়া শেখালে না।’
‘আইশাও শিখতে চেয়েছে, আপনাদের দু’জনকে একসাথে শেখাব তাহলে।’
আজমাঈন কাত হয়ে নূরের দিকে ফিরলো,’ধ্যাত! ওর সাথে আমি শিখব কেন, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তিকে টানতে নেই।’

‘আপনার কথার ধরন ভালো না!’ বলেই উঠতে নিলে আজমাঈন হাত টেনে ধরে,’তোমার কাছে আমি ভালো তো?’
নূর ফিরে তাকিয়ে বলে,’আমার কাছে ভালো হলেও বাকিদের সাথে ঝগড়া করেন শুধু। এটা মোটেও ভালো নয়।’
আজমাঈন উঠে বসে বললো,’আমি যা করি ভালোবেসে করি, ঝগড়াও ভালোবেসে করি। কিন্তু তুমি তো আমার ভালোবাসা চোখে দেখো না।’ শেষের কথাগুলো আফসোসের সহিত বললো আজমাঈন। নূর উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’আজকে আব্বুর কাছে নিয়ে যাবেন বলেছেন।’
‘এই খুশিতে রাতারাতি জ্বর সেরে গেল?’ কুশনটা হাতে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। নূর তৎক্ষণাৎ জায়নামাজ ভাজ করে তুলে রাখলো। এখনও সূর্য ওঠেনি। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলে মন্দ হয়না। নূর তানাজের রুমে গিয়ে উঁকি দিলো। বাবু মাত্রই উঠেছে, তানাজ ভেজা কাপড় বদলে দিচ্ছে আর ঢুলছে। পাশেই ওর শ্বাশুড়ি মরার মত পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। রাতে একবার ঘুমানোর পর তার কানের কাছে ঢোল বাজালেও সে উঠে না। অগত্যা তানাজকেই সব করতে হয়। ভোর বেলায় বাবু উঠে যায়, কোলে না নেওয়া পর্যন্ত কান্না চলে। নূর রুমের ভেতরে গিয়ে বলে,’আমি কোলে নেই?’

মা হওয়ার পর তানাজের ক্লান্তি বেড়েছে, সাথে ঘুম বেড়েছে অনেক। একটু অবসর পেলেই ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটা। নূরের কথাটা শুনে বেশ খুশী হলো তানাজ। বললো,’আচ্ছা নাও, খাইয়ে দিয়েছি। আর কাঁদবে না।’
বাবুকে নিয়ে আসতেই তানাজ ঘুমিয়ে পড়েছে। আর নূর ড্রয়িং রুম জুড়ে হাঁটছে। বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে আছে। আজমাঈনও আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। দশটার দিকে উঠে বেরিয়ে যাবে। আপাতত নূর বাবুর সাথে সময় কাটাচ্ছে। একটু পর পর নড়ে উঠছে ছোট্ট শরীর, বেশ ভালোই লাগছে। মনে মনে নাম ঠিক করার চেষ্টা করতে করতে হাঁটতে লাগলো। আজমল শিকদার নামাজ শেষে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেন প্রতিবেশীদের সাথে। বাড়ি ফিরে দেখলেন সব ঘুমে। আর নূর সোফায় বসে বসে বাবুর সাথে কথা বলছে। তিনিও নূরের সাথে শামিল হলেন। বাবুর সাথে কিছুক্ষণ বকবক করলেন।

রাশেদ সাহেব একা একা বারান্দায় বসে আছেন। বিকেল বেলায় এই সময়ে তিনি চা খান। কিন্তু আজ খাচ্ছেন না। সামনে দুই মেয়ে বসে আছে। তাদের মুখ গম্ভীর, রাহা তো যারপরনাই বিরক্ত বাবার সিদ্ধান্তের উপর। সে রাগি কন্ঠে বলে,’এটা কোনো কাজের কাজ হলো আব্বু? বলা নেই কওয়া নেই বাড়ি ছেড়ে চলে এলে? ওটা তো তোমারও বাড়ি। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাড়িটা বানিয়েছ, এখন ওখানে থাকবে না?’
নূরের দিকে তাকাতেই নূর বলে ওঠে,’আপু কিছু ভুল বলেনি আব্বু, এভাবে একা একা থাকাটা ঠিক হবে না তোমার।’
রাশেদ সাহেব বড্ড কঠোর মনোভাবের ব্যক্তি। তিনি মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে থাকবেন একথা ভাবতেই পারেন না। এজন্যই দুই মেয়ের কেউই সে কথা তোলেনি। তিনি বলেন,’তোদের মায়ের সাথে আর আমার যাচ্ছে না রে। ছেলে ছেলে করে মাথা খাচ্ছে।আমি তো ওকে কিছুতেই ক্ষমা করব না।’
রাহা বললো,’ভাইয়ার উপর আমারও রাগ আছে আব্বু। আর আম্মুর কথা অতো ধরতে হবে না। সেই শুরু থেকেই তো ভাইয়াকে তাল দিয়ে গেছে। এজন্যই ভাইয়া এতো বিগড়ে গেছে। যাই হোক তোমার শরীর খারাপ হয় মাঝে মাঝে। আমরা এভাবে তোমাকে একা থাকতে দিতে পারিনা।’
রাশেদ সাহেব জবাব দিলেন না। নূর বাবার হাত ধরে বললো,’কেন বাচ্চাদের মতো করছো? এতে তোমার ক্ষতি জানো তো। আমাদের চিন্তা হয় না?’

রাশেদ সাহেব বুঝলেন যে মেয়েদের সাথে পারবেন না। তিনি বলেন,’আমি আপাতত কিছুদিনের জন্য একা থাকতে চাই। তোর মায়ের থেকে ক’দিন দূরে থাকলে ভালো লাগবে।’
রাহা ও নূর একে অপরের দিকে তাকায়। রাহা চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে নূরকে। আর জোর করা ঠিক হবে না। রাহা বললো,’আচ্ছা কিছুদিন থাকতেই পারো, কিন্তু খুব বেশিদিন নয়। সামনের মাসে এসে নিয়ে যাব তোমাকে।’
একটা কাজের মেয়ে রেখেছন রাশেদ সাহেব। ওকেই বললেন চা দিতে। বাবা মেয়েরা মিলে একসাথে চা খেলো। অনেক দিন পর ওরা একসাথে আলাদা সময় কাটালো। কোন বাজে কথা নয়, ছোটবেলার কথায় মেতে উঠলো সবাই। সাইমনের বিষয়টা কৌশলে এড়িয়ে গেল সবাই। তবে রাহা জানে, এই কেস বছরের পর বছর ঘুরবে। ঘুরতে ঘুরতে হয়তো একদিন জামিন পাবে সাইমন। কিন্তু আজমাঈন তো ছাড়ার পাত্র নয়। যত দূর যাওয়ার দরকার সে যাবে। রেহানা বেগম বারবার করে রাহাকে বুঝিয়েছে। কিন্তু রাহাও রাগ করে আর কথা বলেনি মায়ের সাথে। একটা পরিবার এভাবে ভেঙে যাবে ওরা কেউই ভাবেনি।
রাহা আজকে রাশেদ সাহেবের কাছে থেকে গেলো। কিন্তু নূরকে ফিরতে হবে। রাতের খাবার বাবার আর বোনের সাথে খেল নূর। আজমাঈন রাত দশটার দিকে নূরকে নিতে এসেছে। বাবাকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো। আজমাঈন বললো,’রেহনুমা জান্নাত নূর!!’
‘জি শিকদার সাহেব!!’

আজমাঈন এক প্রকার লাফিয়ে উঠলো,’আমার কথা আমাকেই ফেরত দিচ্ছো!’
‘আপনি তো আঙ্কেল কে প্রায়ই বলেন তাই না? ভাবলাম আমিও বলি।’
আজমাঈন গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললো,’আমি বাড়িতে না থাকলে তুমি একটুও মিস করো না।’ নূরের দিকে তাকিয়ে বলল,’সকাল থেকে এই অব্দি একটা কল করলে না।’
‘আচ্ছা!! আমার ফোনটা তো আপনার কাছে। এখনও তো আমাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।’
আজমাঈন গলা ঝেড়ে বলে,’এক্ষেত্রে তোমাকে দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই।’
নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,’একবার মনে হচ্ছে ভাইয়াকে শাস্তি দিতে আরেকবার মনে হচ্ছে মুক্তি দিতে। আমি বড্ড দোটানায় পড়েছি। বিপদের সময় রাগ হলেও বিপদ কেটে গেলে অতোটা ক্ষোভ থাকে না।’
আফসোসের সুর পাওয়া গেল নূরের কথায়। আজমাঈন সামনের রাস্তায় দৃষ্টি দিয়ে বললো,’আজ যদি আমি তোমাকে ফিরে না পেতাম, তখন তুমি কি করতে?’
একথা নূর ও ভাবে, খুব করে ভাবে। কিন্তু জবাব পায় না। বলে,’আল্লাহর ইচ্ছা, তিনি যা চান তাই করেন।’
‘আমি তোমার ভাইয়াকে সন্দেহ করিনি, আঙ্কেল বলার পরেও করিনি। ভেবেছিলাম ভাই যেমনই হোক। এমন কাজ কিছুতেই করতে পারবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো যখন ফয়েজ আমাকে জানায় তোমাকে ভাইয়া ই আটকে রেখেছে।’

নূর কিছুটা চমকে তাকায়। আজমাঈন হাসে,’চমকে গেলে? আজ থেকে দিন পনের আগের কথা, সাহারা তোমার ভাবিকে তোমার ব্যাপারে কথা বলতে শোনে। সম্ভবত তোমাকে অন্য জায়গায় রাখার চিন্তা ভাবনা করতেছিল।‌ তারপর সে ফয়েজ কে সব জানায়। আসলে মিথ্যা, অন্যায় কখনো চাপা থাকে না। একদিন না একদিন বের হয়ে আসবেই। এই অন্যায় কে প্রশ্রয় দিতে নেই। মন‌ শক্ত করো।’
নূরের বিষ্ময় কাটে না। বলে,’তারপর কি হয়েছিল?’
‘তারপর আর কি হবে, আমি রিকোয়েস্ট করেছিলাম তোমার ভাইয়ের কাছে। যেহেতু কোনো প্রমাণ ছিলো না তাই কঠোর ভাবে ধরতে পারছিলাম না। তবে তার উপর নজর রাখা হয়েছিল। তোমার ভাই তো কিছুতেই হাল ছাড়বে না। কিন্তু আল্লাহ সহায় ছিলো বলেই তুমি আমাকে কল করতে পেরেছো। আর আমি কাউকে কিছুই জানাইনি, কেননা ভাইয়া জানতে পারলে হয়তো খারাপ কিছু করে ফেলতে পারত।’
কথায় কথায় নূর ভুলেই গেছিল সবকিছু। হঠাৎ হুশ ফিরতেই দেখলো এটা বাড়ি ফেরার রাস্তা নয়। জিজ্ঞেস করে,’কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
আজমাঈন রহস্য করে হাসে। ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,’এমন জায়গায় যাব যেখানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউ থাকবে না।’

নূর নড়েচড়ে বসল। বললো,’বাড়ির সবাই কি ভাববে? এভাবে কোথাও যাব না। আপনি ফিরে চলুন।’
‘আমার কিপটে বাপ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে টিকিট কেটে দিয়েছে, আমি এর সদ্ব্যবহার করতে চাই। প্লিজ না করো না।’
‘আঙ্কেল!! কখন দিলো?’

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৬

‘আজ সন্ধ্যায়, বললো ঘুরে আয় ভালো লাগবে। অবশ্য আমিই জোর করেই টাকা আদায় করেছি। শিকদার সাহেব ঘুরতে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি টাকাও আদায় করে নিয়েছি।’
সঙ্গে সঙ্গে আজমাঈনের ফোন বেজে উঠল। আজমাঈন ফোন রিসিভ করলো না। কেননা ওনার অ্যাকাউন্ট থেকে অনেক টাকা তুলেছে আজমাঈন। এবার বুঝি জুতোর বাড়ি একটাও মাটিতে পড়বে না।

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here