Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৪

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৪

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৪
বন্যা সিকদার

“কিন্তু আমার যে আপনাকে চাই-ই চাই প্রফেসর সাহেব। শুধুই আপনাকে চাই আমার এই জীবনে। আমি সারাজীবন আপনার ওই শক্ত বুকটার আলিঙ্গনে আবদ্ধ থেকে নিজের শেষ নিশ্বাসটুকু ত্যাগ করতে চাই। আপনার এই পাথুরে মনের ভালোবাসায় আমি নিজেকে রাঙাতে চাই। এই ‘মৌ চৌধুরী’ নামটা শুধুমাত্র ‘উজান চৌধুরী’ নামক মানুষটাতে পরিপূর্ণ হতে চায়। আমি আপনাকে ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝি না।
​কথাগুলো বলতে বলতে মৌ কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে যে এই নিষ্ঠুর মানুষটার একটুখানি ভালোবাসার জন্য বড্ড বেশি কাঙাল। তাকে ঘিরেই তো সে নিজের জীবনের সবটুকু সুন্দর স্বপ্ন বুনে ফেলেছে‚ একটা সুখের সংসার গড়ে তুলতে চেয়েছে।
​ঠিক তখনই উজান মৌ’য়ের খুব কাছাকাছি ঝুঁকে এলো। উজান নিজের কন্ঠ গম্ভীর করে অত্যন্ত কর্কশ কণ্ঠে আওড়াল„

​“শোনো মেয়ে‚ তুমি নিজের মনে মনে যেটা চাও বা যে স্বপ্ন দেখছো তা উজান চৌধুরীর এই জীবনে কোনোদিনও পসিবল নয়। বিগত কয়েকটা দিন তোমার সাথে আমি একটু ভালো বিহেভিয়ার করেছি বা চকোলেট এনে দিয়েছি মানে এই নয় যে‚ আমার এই শক্ত মনে তোমার জন্য কোনো গভীর ফিলিংস বা ভালোবাসা কাজ করে। ওটা শুধুমাত্র আমার দায়িত্ববোধ ছিল‚ অন্য কিচ্ছু নয়। এই উজান চৌধুরী দেখিয়ে দেবে‚ সে কোনো নারীর মায়া বা ভালোবাসা ছাড়াও চিরকাল একাই বেঁচে থাকতে পারে। সো‚ নিজের এই মায়া দয়া করে অন্য কোথাও গিয়ে দেখাও।
​উজানে’র এই চরম শেষ বাক্যটি মৌ’য়ের বুকে তীরের মতো এসে বিঁধল। মৌ’য়ের হাত-পায়ের সমস্ত শক্তি যেন নিমিষেই হারিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় দড়ফড় করে উঠল। চোখ দুটো থেকে অনবরত নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে তো নিজের মুখ ফুটে আগেই বলেছিল‚ সে বড় অভাগী‚ বড্ড বেশি ভালোবাসার কাঙাল সে। তবুও কেন প্রতিদিন এই একটি মানুষের দেওয়া কথার তীব্র আঘাতে তাকে এভাবে তিলতিল করে পুড়তে হয়? ​দুনিয়ার সব কষ্ট সে মুখ বুজে সহ্য করতে পারলেও‚ এই একটি মানুষের দেওয়া সামান্যতম অবহেলাও যে তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে। ভীষণ ভালোবাসে সে এই পাথুরে মনের মানুষটাকে! তাকে ঘিরেই তো নিজের মনের গহীনে একটা পরিপূর্ণ ঘর বাঁধার রঙিন স্বপ্ন বুনেছে সে। অনন্তকাল শুধু তাকেই ভালোবেসে যেতে চায়। কিন্তু তার এই পবিত্র স্বপ্ন কি কোনোদিনও পূর্ণ হবে না? সে কি কোনোদিনও ঠাঁই পাবে না #প্রফেসর_উজান_চৌধুরী’র হৃদয়ের মণিকোঠায়?

​উজান আর একটি সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না‚ নিজের নিষ্ঠুর গন্তব্যের দিকে পা বাড়িয়ে অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে গেল। মৌ পূর্বের ন্যায় নিথর পাথরের মতো নিস্পন্দ হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই এক তীব্র যন্ত্রণায় তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। যন্ত্রণার তীব্র বেগ সহ্য করতে না পেরে সে ওখানেই শক্ত মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল। বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে তার! অথচ মৌ’য়ের ওভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যাওয়ার পরেও উজান একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাল না। ​কত শত রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল মৌ অথচ সেই স্বপ্নের প্রাসাদ আজ এক নিমিষেই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।

সে মেঝেতে বসেই চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত চোখে উজানে’র চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। ভালোবাসার দহন বুঝি এমনই ভয়ানক হয়। সে আজ বুঝতে পারছে‚ লোকটার এই সামান্য রুক্ষ কথাতেই তার বুকটা এভাবে ভেঙে যাচ্ছে অথচ চোদ্দো বছর আগে যখন শিরিন ওনাকে ধোঁকা দিয়েছিল তখন ওনার ঠিক কতটা কষ্ট হয়েছিল? কতটা যন্ত্রণার পাহাড় বুকে চেপে মানুষটা আজও বেঁচে আছে।
​কিছুক্ষণ পর মৌ নিজের চোখের জলটুকু মুছে অত্যন্ত ক্লান্ত ও ধীরপায়ে নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেল। নিস্তেজ ও অবশ শরীরটা বিছানার এক কোণে এলিয়ে দিল সে। তবে প্রতিদিনের মতো আজ আর সে উজানে’র ব্যবহৃত বালিশটার দিকে হাত বাড়াল না‚ মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর সেই চিরচেনা অভ্যাসটা আজ সে জোর করেই চেপে রাখল। আজ থেকে সে একাই ঘুমানোর অভ্যাস করবে কিন্তু এই কঠিন চেষ্টায় সে কতটুকু সফল হবে তা কেবল উপরওয়ালাই জানেন। যে মানুষটা তার সামান্য ছোঁয়াতেই বিরক্ত হয়‚ তাকে অন্তত মৌ আর নিজের থেকে যেচে জ্বালাতন করতে যাবে না।

​প্রায় ঘণ্টাখানেক পর উজান অত্যন্ত শান্ত পায়ে রুমে প্রবেশ করল। ভেতরে ঢোকা মাত্রই এক অদ্ভুত ও থমথমে শূন্যতা এসে গ্রাস করল তাকে। প্রতিদিন রুমে ঢুকলেই যে মেয়েটা প্রজাপতির মতো ডানা মেলে তার চারপাশটা মুখরিত করে রাখত‚ আজ সে বড্ড নিশ্চুপ। উজান’কে একটু হার্ট করার জন্যই হয়তো আজ মৌ রুমের সব মেইন লাইট অফ করে রেখেছে। কেবল একটা ছোট ডিমলাইট জ্বালানো। সেই ডিমলাইটের লাল‚ নীল আর সবুজ আলোর মিশ্রণে পুরো রুমটা এক মায়াবী আলো-আঁধারিতে আলোকিত হয়ে আছে। ​উজান ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। মৌ’য়ের একদম পাশে বসে তার শান্ত‚ ঘুমন্ত মুখখানির দিকে তাকিয়ে আনমনে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল„
​“আই অ্যাম রিয়েলি সরি মিসেস চৌধুরী! আপনাকে আমি হার্ড করতে চাই না‚ তবে আমাকে নিয়ে আপনার ঘর বাঁধার স্বপ্নও যে আমি পূরণ করতে পারবো। সারাজীবন আমি আপনাকে আগলে রাখবো কথা দিলাম। তবে ভালোবাসতে পারবো না।

​উজান খেয়াল করল অতিরিক্ত কান্নার ফলে মৌ’য়ের চোখ-মুখ একদম ফুলে লাল হয়ে আছে। এমনকি সেই পায়েও। তার বড্ড মায়া হলো। সে ড্রয়ার থেকে একটা পেইন কিলার স্প্রে এনে মৌ’য়ের সেই ব্যথাপ্রাপ্ত পায়ে আলতো করে স্প্রে করে দিল এবং নিজের দু-হাত দিয়ে পরম যত্নে মালিশ করে দিতে লাগল।
​সে নিজের এই ছন্নছাড়া ও অভিশপ্ত জীবনে কোনো নারীকে জড়াবে না বলেই তো দীর্ঘ এতগুলো বছর নিজের মাতৃভূমিতে পা রাখেনি। কোনোদিন কোনো নারীকে আপন করতে পারবে না বলেই সে বিয়ের মতো পবিত্র শব্দটাকেও সারাজীবন এড়িয়ে চলেছে। অথচ আজ পরিবারের নেওয়া একটা ভুলের কারণে এই নিষ্পাপ পুঁচকে মেয়েটাকে তার পাশে এসে কতই না কষ্ট পেতে হচ্ছে! ​উজান মালিশ শেষ করে মৌ’য়ের মুখের দিকে তাকানোর জন্য যেই না একটু কাছে এগিয়ে গেল আর ঠিক তখনই ঘুমের ঘোরে সজোরে নিজের পা চালিয়ে উজানে’র বুক বরাবর এক মস্ত বড় লাথি বসিয়ে দিল মৌ। উজান সামলাতে না পেরে একদম ছিটকে বেড থেকে নিচের মেঝেতে ধপাস করে পড়ে গেল। ​মেঝেতে পড়ে গিয়েও কিন্তু উজান একটুও রাগ করল না বরং নিজের বুকের ওপর হাত রেখে আনমনে হেসে উঠল।

এটা তো তার এই পিচ্চি বিড়াল বাচ্চার রোজকারের কাণ্ড। ঘুমের ঘোরে প্রতিদিন রাতে তাকে বউয়ের হাতের চড় আর পায়ের লাথি খেতেই হয়। তবে কপাল ভালো যে আজ পর্যন্ত সে বিছানা থেকে নিচে পড়ে যায়নি‚ আজই প্রথম রেকর্ড হলো। অথচ এই অবুঝ মেয়েটা নিজেই জানে না‚ সে গভীর ঘুমের ঘোরেও তার এই গম্ভীর প্রফেসর বরটাকে কতটা ভালোবাসায় আর অত্যাচারে জ্বালাতন করে রাখে। অবশ্য এতে উজান বিন্দুমাত্র বিরক্ত হয় না বরং এক অদ্ভুত সুখনুভূতি তার ভেতর কাজ করে।
​উজান মেঝে থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর আবারও বিছানায় এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত সাবধানে মৌ’য়ের নরম কোমরটা নিজের শক্ত দু-হাতে আঁকড়ে ধরল এবং এক হ্যাঁচকা টানে তাকে নিজের চওড়া বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল। উজানে’র সেই পরিচিত ও উষ্ণ ছোঁয়া পাওয়া মাত্রই মৌ ঘুমের ঘোরেই এক তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে কোনো এক অবুঝ পাখির বাচ্চার মতো উজানে’র বুকের ভেতর নিজের পরম সুখ খুঁজে নিয়ে শান্ত হয়ে গেল।

​পরের দিন সকাল…
​উজান নিজের কালো বাইকটা নিয়ে যেই না ভার্সিটির মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল ওমনি ক্যাম্পাসের সাধারণ স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে লেডি টিচাররা পর্যন্ত সবাই হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ​করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে উজানে’র এই রাজকীয় এন্ট্রি আর মেয়েদের ওই হাঁ করে তাকিয়ে থাকা পাহারা দিচ্ছিল মৌ। মুখে সে কাল রাতে বলেছিল বটে যে উজান’কে আর বিরক্ত করবে না কিন্তু এই পাগল মানুষটাকে চোখের আড়াল করে রাখা কি আর তার পক্ষে সম্ভব?

সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পরও সে উজান’কে ইচ্ছেমতো জ্বালিয়ে এসেছে আর এখন আবার এখানে চোরের মতো লুকিয়ে পাহারা দিচ্ছে। মৌ’য়ের মতে‚ বাইরের এই ডাইনি মেয়েগুলোর অনেকগুলো চোখ তার হ্যান্ডসাম বরের ওপর লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এই ‘মিসেস উজান চৌধুরী’ বেঁচে থাকতে ওসব অন্য মেয়েদের ডাল গলতে সে কিছুতেই দেবে না। ​উজান বাইকটা পার্কিংয়ে রেখে নিজের পার্সোনাল কেবিনের দিকে যেই না পা বাড়াবে ঠিক তখনই ঝড়ের গতিতে এসে তার সামনে পথ আগলে দাঁড়াল শিরিন। শিরিনও আসলে এই একই কলেজের নতুন জয়েন করা ম্যাম। অবশ্য এই স্বনামধন্য কলেজে তার জয়েন করার একমাত্র প্রধান কারণই হলো উজান চৌধুরী! উজান’কে যেকোনো মূল্যে নিজের জীবনে ফিরিয়ে পাওয়ার এক নতুন কুৎসিত উপায় এটি।

​শিরিন আজ একটা জমকালো লাল রঙের শাড়ি পরে‚ চড়া মেকআপ নিয়ে একদম সেজেগুজে উজানে’র সামনে এসে দাঁড়াল। উজান ধীরপায়ে হেঁটে আসছিল কিন্তু শিরিন’কে সামনে দেখামাত্রই সে তার দিকে এক পলক না তাকিয়ে সোজা তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল! ​পুরো করিডোরে বেশ কয়েকজন স্টুডেন্ট আর স্টাফ তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল‚ ফলে সবার সামনে এমন উপেক্ষায় চরম অপমান বোধ করল শিরিন। সে রাগে‚ ক্ষোভে আর দুঃখে আবারও তড়িৎ গতিতে উজানে’র পিছু নিল এবং সোজা তার পার্সোনাল কেবিনে গিয়ে পৌঁছাল। ​উজান নিজের কেবিনে ঢুকে সবেমাত্র চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল ঠিক তখনই অনুমতি ছাড়া ধড়ফড় করে রুমে আগমন ঘটল শিরিনে’র। তাকে ভেতরে ঢুকতে দেখামাত্রই উজানে’র জোড়া ভ্রু কুঁচকে কপাল চওড়া হয়ে গেল। সে নিজের চোখের সানগ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে রাগান্বিত দৃষ্টিতে বাঘের মতো গর্জন তুলে চেঁচিয়ে উঠল„
​“এই কালনাগিনী! তুই কার পারমিশন নিয়ে আমার পার্সোনাল কেবিনে ঢুকেছিস‚ হ্যাঁ? তোকে কি আমি এখানে আসার কোনো রাইট দিয়েছি? জাস্ট গেট আউট!

​শিরিন উজানে’র এমন রুক্ষ ব্যবহারে বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে উল্টো নিজের ওড়নাটা ঠিক করে বলল‚ “জাস্ট শাট আপ উজান! তুমি সবসময় আমার সাথে এমন মিসবিহেভ কেন করো বলো তো? আমি মানলাম চোদ্দো বছর আগে তোমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য তুমি বড্ড বেশি কষ্ট পেয়েছিলে তাই বলে আজ এত বছর পরও তুমি আমার সাথে রোজ এমন থার্ড ক্লাস আচরণ করবে?
​উজান নিজের চেয়ার ছেড়ে বিদ্যুৎ গতিতে টেবিলের ওপাশে এসে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় ধমকে উঠল‚ “ইউ জাস্ট শাট আপ শিরিন। তোর মতো একটা চরিত্রহীন আর খচ্চর মেয়ে চলে যাওয়ার জন্য উজান চৌধুরী নিজের লাইফে কোনোদিন এক সেকেন্ডের জন্যও কষ্ট পায়নি মনে রাখিস! সো‚ বেশি নাটক না করে এখনই আমার কেবিন থেকে দূর হ। জাস্ট গেট আউট ফ্রম হেয়ার!

​কিন্তু উজানে’র এই সিংহসুলভ রাগী কণ্ঠস্বরেও শিরিনে’র মাঝে কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। সে নিজের জায়গায় নির্লজ্জের মতো দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ করেই সে আরও এক পা এগিয়ে গিয়ে উজানে’র একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
“এত রেগে যাচ্ছ কেন বেবি? আমি তো তোমায় আজও ঠিক আগের মতোই ভালোবাসি। চলো না‚ অতীত ভুলে আমরা দুজনে আবারও নতুন করে সবকিছু শুরু করি?”
​’ভালোবাসি’ আর ‘নতুন করে শুরু করার’ ওই নির্লজ্জ প্রস্তাব শোনা মাত্রই উজানে’র মাথার রগ দপদপ করে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে শিরিনে’র গলা শক্ত করে চেপে ধরে তাকে দেয়ালের সাথে ডলে ধরল উজান! নিজের দাঁতে দাঁত পিষে চোখ দুটো লাল করে কটমট স্বরে বলল‚

​“ওই কালনাগিনী ‘ভালোবাসি’ ওয়ার্ডটা যদি তোর এই অপবিত্র মুখ দিয়ে আর একটা বারও রিপিট করিস তবে তোকে আমি এখানেই খুন করে মাটিতে পুঁতে ফেলব। আর তুই কী বললি? সবকিছু নতুন করে শুরু করবি? লাইক সিরিয়াসলি? তোর কি মনে হয় প্রফেসর উজান চৌধুরীর তোর মতো একটা অন্যের ফেলে দেওয়া ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ জিনিসের প্রতি বিন্দুমাত্র কোনো ইন্টারেস্ট বা রুচি আছে?
​উজান শিরিনে’র মুখের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে তীব্র উপহাসের সুরে আবারও আওড়াল„ “যেখানে আমার নিজের ঘরে অলরেডি একটা লাল টুকটুকে‚ আসমানের ডানাকাটা পরীর মতো পবিত্র বউ রাজত্ব করছে। সেখানে আমি তোর মতো একটা থার্ড ক্লাস আর সস্তা মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাবো এটা তুই তোর ওই গোবরভরা মাথায় ভাবলি কীভাবে‚ শুনি?

​শিরিন উজানে’র ওই লোহার মতো শক্ত হাতের খাঁচায় আটকে গিয়ে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। সে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ছটফট করতে লাগল। উজান তাকে এক ঝটকায় দূরে ছুড়ে মারলে সে মেঝেতে পড়ে গিয়ে কোনোমতে নিজের গলা চেপে ধরে কাশতে লাগল। ​হঠাৎ করেই উজানে’র মুখ থেকে ‘নিজের ঘরের বউ’ আর ‘আসমানের পরী’র কথা শোনা মাত্রই শিরিন আকাশ থেকে পড়ার মতো তীব্র চমকে সোজা হয়ে তাকাল। উজান চৌধুরী বিয়ে করেছে অথচ সে নিজেই এই খবর জানে না। সে বড় বড় চোখ করে জিজ্ঞেস করল‚
​”বউ মানে? তু তু তুমি বিয়ে করেছো উজান? কবে? কখন? কাকে বিয়ে করলে তুমি?
​উজান নিজের ঠোঁটের কোণে এক চরম বিজয়ের হাসি ঝুলাল। সে প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে‚ পা ফেলে আবারও নিজের সেই ঘূর্ণায়মান চেয়ারটায় গিয়ে বসল। তারপর নিজের ব্ল্যাক সানগ্লাসটা স্টাইল করে চোখে পরতে পরতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জবাব দিল‚

​“আজ থেকে ঠিক ২১ দিন‚ ১৭ ঘণ্টা‚ ৩৪ মিনিট এবং ১১ সেকেন্ড আগে! আর উজান চৌধুরী কোনো থার্ড ক্লাস মেয়েকে নয়। একটা কিউট বিড়ালের বাচ্চার মতো পুঁচকে পরীকে নিজের বউ বানিয়েছে! সো‚ স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি মিস শিরিন। নয়তো পরের বার শুধু গলা টেপাতে শেষ হবে না‚ মাইন্ড ইড।
শিরিন এবার চিৎকার করে উঠল‚ “কীহহহ? বিয়ে করেছ মানে? আমি মানি না তোমার এই বিয়ে। উজান তোমার বউ শুধু আমি হবো আর কেউ নয়‚ ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও।
​উজান খানিকটা সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে আওড়াল‚ “প্রফেসর উজান চৌধুরী একবার ইউস করা টিস্যু কখনো দ্বিতীয়বার ইউজ করে না। তোর মতো থার্ড ক্লাস মেয়েকে তো কোনো জন্মেও নয়। উজান চৌধুরীর লাইফে অলরেডি একটা পরী রাজত্ব করছে‚ সেখানে তোর মতো মেয়ের নোংরা ছায়া তো ভুলেও আর আমার ওপর পড়বে না। এরপরেও যদি নেক্সট টাইম তুই আমাকে বা আমার পার্সোনাল লাইফে কোনো রকম ডিস্টার্ব করতে আসিস তবে আমার ওই বিড়ালের বাচ্চাকে তোর পেছনে লেলিয়ে দেবো। উজান চৌধুরীর হাত থেকে হয়তো তুই কোনোমতে বেঁচে ফিরলেও ফিরতে পারিস কিন্তু মিসেস উজান চৌধুরীর হাত থেকে তোর ছাড়া পাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই‚ মাইন্ড ইট!

​কথাটা শেষ করেই উজান আর কোনো সুযোগ না দিয়ে শিরিন’কে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে নিজের কেবিন থেকে বের করে দিল। তারপর ধীরপায়ে এসে নিজের ঘূর্ণায়মান চেয়ারটায় আরাম করে বসল। নিজের দুই চোখ বন্ধ করে এক স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। অতঃপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটিয়ে শান্ত স্বরে আওড়াল„
​“পিচ্চি এদিকে এসো।
​কিন্তু কেবিনের ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ এলো না। উজান আগের মতোই চোখ বন্ধ রাখা অবস্থাতেই এবার গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলে উঠল‚ ​“কী হলো? পুঁচকে বিড়ালের বাচ্চা নিজে থেকে লক্ষ্মী মেয়ের মতো সামনে আসবে নাকি আমি নিজে গিয়ে টেনে নিয়ে আসব?

কড়া নির্দেশ শোনা মাত্রই কেবিনের এক কোণে থাকা বড় পর্দার আড়াল থেকে গুটি গুটি পায়ে ভেজা বিড়ালের মতো বের হয়ে এলো মৌ! তার ড্যাবড্যাব করা বড় বড় চোখ দুটোতে তখন এক আকাশ বিস্ময় আর কৌতূহল। সে উজান এই কেবিনে আসার অনেক আগেই এখানে এসে লুকিয়ে ছিল অথচ মানুষটা চোখ বন্ধ রেখেই তাকে এক নজর না দেখেই একদম নিখুঁতভাবে বুঝে ফেলল মৌ এখানেই আছে! ​উজান এবার নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে মৌ’য়ের সামনে গিয়ে এক ঝটকায় মৌ’কে দু-হাতে উঁচু করে তার সামনে থাকা বড় টেবিলটার ওপর বসিয়ে দিল। তারপর সে নিজে আবারও নিজের চেয়ারটায় গিয়ে আরাম করে বসল। মৌ তখনও উজানে’র এই জাদুকরী কাণ্ডের দিকে পুরো হাঁ করে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে উজান শব্দহীন হাসল। ​মৌ এবার অত্যন্ত মিনমিন স্বরে জিজ্ঞেস করল‚

“আচ্ছা প্রফেসর সাহেব আপনি কীভাবে বুঝলেন যে আমি ওই পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছি?
“তুমি যে শুধু এখানে লুকিয়ে রয়েছো উজান চৌধুরী কেবল ততটুকুই জানে না। তুমি যদি আমার নজর থেকে দশ মাইল দূরেও থাকো না কেন‚ তবুও কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই উজান চৌধুরী বলে দিতে পারবে তার এই পুঁচকে বউটা সেখানে বসে বসে কী কী ফাজলামো করছে।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৩

​মৌ এবার উজানে’র চোখের দিকে নিজের গভীর দৃষ্টি স্থির করল। অত্যন্ত আকুল ও নরম সুরে প্রশ্ন করল‘ “প্রফেসর সাহেব আপনি তো আমায় একটুও ভালোবাসেন না তাহলে কেন আমার প্রতিটা….

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here