কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৫
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
অয়ন যখন ক্যাম্পেইন শেষে ফিরল,সৈয়দ নিবাসের সবসময়কার গুরুগম্ভীর আমেজ তখন বদলে গেছে। বদলে গেছে এর গোটা পরিবেশ। গাড়ি থেকে নামতেই ও শুনতে পেলো অনেক নারীকণ্ঠের হাসাহাসির শব্দ। ভীষণ অবাক হলো অয়ন। ভ্রু দুটো গুছিয়ে বসল এক দিকে। সৈয়দ বাড়িতে এত হাহাহিহি হয় না। এটা একটা ঝিমানো,ঘুমন্তপুরি। যেখানে সবার মনে কিছু না কিছু বিষাদ লেগে থাকে। তবে কি ভাইয়ার ছেলেটা এসে ওসব পালটে দিলো?
অয়ন চৌকাঠ পেরোলো বেশ তাড়াহুড়ো করে। ও চাচা হয়েছে, বড়ো ভাইয়ের ছেলে এসেছে দুনিয়ায়! এই নিয়ে সারা রাস্তা কী যে ছটফট লেগেছে ওর।
কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখল বসবার ঘর খালি। একটা লোকও নেই। আসমা কেবল টেবিল চেয়ার মুছছে। অয়ন এদিক-ওদিক চেয়ে বলল
“ সবাই কোথায়?”
“ মেজো ভায়ের গরে। রান্দোন,খাওন,শোওন ছাড়া সবডি দুইডাদিন হেইনেই আছে।”
অয়ন তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে উঠল। হাসির আমেজ আরো বাড়ছিল পথে। সবাই এত খুশি,এত! ভাবতেই ভালো লাগল ওর। যাক,অন্তত একটু হলেও এই মরা মরা পরিবেশ কাটছে এ বাড়ির। কিন্তু ইতস্তত লাগল ঘরের দোরগোড়ায় এসে। ভারি পর্দাটা টানা। ঢুকতে গিয়েও থমকাল অয়ন।
সার্থর সাথে ওর সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। হয়ত হবেও না! যাই করুক না কেন,মাঝখানে একটা চিড় থেকে যাবে। অয়ন কি যাবে ভেতরে?
পরপর ভাবল,কেন যাবে না? ও তো তুশির প্রতি নিজের ভেতরে আর কোনো মোহ রাখেনি। সব মেনে নিয়েছে। নিজেকে সরিয়ে এনেছে। অয়ন নিজেই সব দ্বিধা ঠেলে গলা ঝারল। জানতে চাইল,
“ আসব?”
ভেতরের কথাবার্তা থামল তখনই। অয়ন টের পেলো এক জোড়া পা হুড়মুড়িয়ে আসছে। ও জানে,সে কে! পর্দা সরাতেই বেরিয়ে এলো ইউশার প্রাণোচ্ছল মুখটা। পরনে আজও শাড়ি, চুলটা হাফ আপ-হাফ ডাউন করে বাঁধা। খালামণি হওয়ার মতো তৃপ্ত একটা চিহ্ন সারা মুখে। দুগাল ভরে হেসে বলল,
“ এসেছ,এসো এসো।”
মেয়েটা হাত টেনে অয়নকে ভেতরে নিয়ে যায়। মিন্তু চেয়ারটা ছেড়ে দেয় ভাইকে বসতে। অয়ন দেখল শওকত আর সাইফুল বাদে,বাকি প্রত্যেকে এখানেই আছেন। তুশি শুয়েছিল,অয়নের গলা পেয়ে বসল নিজেকে গুছিয়ে। কাপড় ঠিকঠাক করল। তবে
অয়ন খুব আশ্চর্য হল একটা দৃশ্যে। ও ভেবেছিল নতুন সদস্যকে ঘিরে বসে থাকবে সবাই। কিন্তু এসে দেখল নারীমহল গোল হয়ে আড্ডায় ব্যস্ত! আর ক্ষুদ্র, ছোট্ট, নতুন প্রাণটা কোলে নিয়ে রুমের এমাথা থেকে ও মাথা হাঁটছে সার্থ। বুকের সাথে মিলিয়ে দোলাচ্ছে, ঘুম পাড়াচ্ছে। বিড়বিড় করে কথা বলছে ছেলের সঙ্গে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে,সার্থ দুনিয়ায় নেই। ছেলের সাথে কোনো এক অন্য রাজ্যে বিচরণ তার। এই যে ভাই এলো, খেয়ালই করেনি।
অয়নের মুখটা রীতিমতো ফাঁকা হয়ে গেল। ভাইয়া! ওর কাঠখোট্টা ভাইয়াটা ছেলেকে এভাবে বুকে জড়িয়ে ধৈর্য নিয়ে,আহ্লাদ করে ঘুম পাড়াচ্ছে! পরপরই মুচকি হাসির তোড়ে অয়নের ঠোঁট দুটো দুদিকে সরে গেল অমনি। প্রসন্ন লাগল বড়ো! ঘোর ভাঙল তনিমার কথায়।
“ কী রে,বোস। এতক্ষণে এলি? আমরা আরো বলাবলি করছিলাম এত সময় লাগছে কেন!”
ইউশা বলল,
“ রাস্তায় কি জ্যাম ছিল?”
অয়ন বসেনি। দাঁড়িয়ে রইল। জানাল তবে,
“ একটু তো ছিল।”
তারপর ফের সার্থর দিকটায় দেখল ও। জয়নব খেয়াল করলেন নাতিকে। সোজাসুজিই শুধালেন –
“ কোলে নেবে দাদুভাই?”
অয়ন নিজেই এগিয়ে গেল।
সার্থ থামল এবার,দেখল ওকে। জিজ্ঞেস করল,
“ কখন এলি?”
উত্তরের বদলে হাসল অয়ন। তাহলে যা ভেবেছিল ঠিকঠাক? ছেলে পেলে মানুষটা পৃথিবী ভুলে গেছে? অয়ন কাছ থেকে রায়ানকে দেখল ভালো করে। চোখ পিটপিট করে আঙুল চুষছে বাচ্চাটা। অয়ন ওর মুখ থেকে আঙুলটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
“ বাহ,তোমার মতো হয়েছে।”
সার্থ শ্বাস ফেলল। এই নিশ্বাসে একটা গর্ব মিশে আছে,বুঝতে পারল অয়ন। পকেটে হাত দিলো সে। লাল লম্বা বাক্সটা এনে একটা স্বর্ণের চেইন বার করল। নিজেই পরিয়ে দিলো বাবুর গলায়। সার্থ কপাল কুঁচকে বলল,
“ এসব ক্যানো?”
জয়নব বললেন,
“ আর দিতে হয়। চাচা না? খালুও তো। একটা গিফট তো পাবেই নাকি!”
অয়ন দুহাত বাড়িয়ে বলল,
“ আমাকে দাও একটু।”
সার্থর মাঝে অল্পস্বল্প আতঙ্ক দেখা গেল,
বলল – তুই পারবি? ও কিন্তু অনেক ছোটো। ওর হাত পা খুব নরম। ধরলেই মনে হচ্ছে গলে যাচ্ছে।”
অয়ন হেসে ফেলল এবার।
“ ভাইয়া আমি পিডিয়াট্রিক্স। দিনে কত বাচ্চা ধরি তুমি জানো?”
সার্থর মাঝে দোটানা। তাও কোলে দিলো।
অয়ন একটু দোলাতে দোলাতে বলল
“ রায়ান না?”
মিন্তু লাফিয়েচড়িয়ে জানায়,
“ হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার রাখা নাম।”
অয়ন বলল – রায়ান,আমাকে চেনো? আমি তোমা…”
সার্থ কথা কেড়ে বলল,
“ বড়ো মামা!”
অয়নের হাসিটা দপ করে নিভে গেল সহসা। তাকাল হতভম্ব চোখে। জিভ কাটলেন হাসনা। বাকিরা কাচুমাচু ভাব করে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তুশি এক টুকরো বিরক্ত শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল ইউশার কানে কানে,
“ তোমার বিটকেল ভাইটা কি কোনোদিন ভালো হবে না? সমস্যা কী তোমাদের?”
ইউশা ঠোঁট উলটে বলল,
“ ভাইয়া অনেক পজেসিভ! কিন্তু এখানে আমার কী দোষ?”
তনিমা ফিসফিস করে বললেন,
“ দেখলেন আম্মা,সার্থর কাণ্ডটা দেখলেন? কিছু একটা করে সামাল দিন না!”
জয়নব সাথে সাথেই বললেন,
“ ওই মনে হয় তুমি তো তুশির কাজিন, সেদিক থেকে বলেছে মনে হয় । আসলে চাচার চেয়ে মামা শুনতে খুব আপন আপন লাগে তো!”
হাসনাও তাল মিলিয়ে বললেন,
“ হ হ,মামা ভাইগ্না যেইহানে,শয়তান নাই সেইহানে!”
অয়ন ফোস করে শ্বাস ফেলে হাসল। ও তো আর বাচ্চা না। ভাইয়ের দিকে চেয়ে খুব আস্তে বলল,
“ আমার বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় এক বছর ,তুশিও তোমার বাচ্চার মা হয়ে গেছে ভাইয়া। এবার অন্তত এসব বাদ দাও।”
সার্থ ধরাই দিলো না। নিজেও হাসল একইরকম। দুইহাত ট্রাউজারের পকেটে ভরে বলল,
“ নট লাইক দ্যাট। আমি মন থেকে বলেছি। আমি চাই আমার ছেলে তোকে মামা ডাকুক! বাবা মারা গেলে,চাচারা জমি ভাগাভাগি নিয়ে খুব ঝামেলা করে। মামারা তা করবে না। সব চাচা তো আবার ছোটো চাচ্চুর মতোও হবে না। তুই তাই মামা হয়েই থাক!’’
অয়ন এবারেও নির্ভেজাল হাসল।
“ তোমার যা ভালো লাগে!”
রায়ান হঠাৎই শান্ত হয়ে গেছে। চেয়ে আছে চোখ মেলে! আজকে সে আধো আধো চোখ খুলতে পারে। তবে একটা হাত উঠে এসেছে অয়নের শার্টের বোতাম অবধি। কুটু কুটু মুঠোয় আকড়ে ধরেছে সেটা। অয়নের কী যে ভালো লাগল এটুকু! মনে হলো বুক জুড়িয়ে যাচ্ছে ওর। এর একটু পরই রায়ান চোখ বুজে ফেলল। ঘুমিতে যেতেই আলগা হলো হাতটা। অয়নের মন-মস্তিষ্ক শান্ত হয়ে যাচ্ছিল খুব। এত আপন,এত কাছের, এত মায়া লাগছে বাচ্চাটাকে।
এটাই বুঝি রক্তের টান! নিজের,বংশের?
অয়ন খেয়াল করল, রায়ান ঘুমের মাঝেই হাসল হঠাৎ । ভ্রুটা বেঁকে গেল ওর। হাসলে রায়ানের এক গাল ডেবে যাচ্ছে। গাঢ় ভাবে টোল পড়ছে একটা! অয়ন মনে মনে বলল,
“ মায়ের মতো হাসি!”
রাত ১টা বাজে। তুশিকে নিয়ে প্রথম দিন হাসনা ঘুমিয়েছেন। কাল আর আজ ঘুমোতে চাইছেন রেহণূমা। সার্থর এসব ভালো লাগছে না। ওর বউ,ওর বাচ্চা ওর কাছে থাকবে না?
কিন্তু সবার এত ভালোবাসা,ঠেলেঠুলে কথাটা বলাও যাচ্ছে না।
সার্থ বেশ কয়েকবার নিজের ঘরে এসে উঁকি দিলো। ওর ঘর থেকে ওকেই বের করে দেয়া হয়েছে। কাল ঘুমিয়েছে গেস্ট রুমে,আজ ঘুমোবে চাচ্চুর কাছে। একজন বিবাহিত পুরুষের এমন যাযাবর জীবন সহ্য করার মতো? রেহণূমা বাবুকে অয়েল ম্যাসাজ করছেন। বাবুর মাথার ওপর ঝুনঝুনি নাড়ছে ইউশা। কত কথা বলছে রায়ানের সাথে!
আর শুয়ে শুয়ে তুশি মনের সুখে টিভি দেখছে। তূর্কির একটা ড্রামা,ওর পছন্দ হয়েছে খুব। মা হওয়া থেকে কী যে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট পাচ্ছে মেয়েটা। খাই-দাই বাচ্চাকে একটু খাওয়াই,ঘুমাই!
সার্থ নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে কপাল কুঁচকে ফেলল। যে কারণে ও ছটফট করছে সে মেয়ের কোনো চিন্তাই নেই। দুদিনেই স্বামী ছাড়া থাকতে পটু হয়ে গেছে! তক্ষুনি
পেছন থেকে কাঁধে হাত পড়তেই, একটু চমকে ফিরল সার্থ। সাইফুল আফসোস করে বললেন,
“ দুঃখ হচ্ছে রে তোকে দেখে।”
“ ক্যানো?”
“ আমার সময় আমি তাও নিজের ঘরে ছিলাম। কিন্তু তুই তো সেটাও থাকতে পারছিস না।”
সার্থর মুখটা দেখার মতো হলো। কপালের ভাঁজ আরো গাঢ় করে বলল,
“ চাচ্চু তোমার কি উচিত হচ্ছে ছোটো মাকে ফেলে আমার সাথে ঘুমোতে যাওয়া?”
সাইফুল কাঁধ উঁচিয়ে বললেন,
“ আর কী করব?
“ কী করবে মানে,নিজের বউ নিজের কাছে রাখবে।”
সাইফুল হাসলেন।
“ তুশিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিস সেটা বললেই হয়!”
মাথা নুইয়ে ঘাড় ডলল সার্থ। সাইফুল পিঠ চাপড়ে বললেন,
“ আর তো কটা দিন। নতুন মায়েদের অনেক রকম ব্যাপার থাকে,এই সময় মুরুব্বি পাশে থাকা দরকার। একটু ধৈর্য রাখ। আমিও রেখেছিলাম! এখন আয়,অনেক রাত হলো।”
সার্থ ফের নজর ঘুরিয়ে ঘরের দিকে তাকাল। আঙুর মুখে দিতে দিতে তক্ষুনি তুশির চোখ পড়ল এদিকে। অমনি নড়েচড়ে বসল মেয়েটা।
সার্থ চাচাকে বলল ,
“ তুমি যাও,আমি আসছি।”
সাইফুল ঘাড় নেড়ে বিদেয় হলেন। রেহণূমা দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসেছিলেন,নাতিকে আহ্লাদে ব্যস্ত দুইহাত। ইউশারও খেয়াল এদিকে নেই। সার্থ নিঃশব্দে চোখের ইশারায় ডাকতেই,তুশি ত্রস্ত উঠে এলো কাছে।
অমনি হাতের কনুই টেনে সার্থ নিয়ে চলল কোথাও। ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়াল দুজন। তুশি বড্ড চিন্তিত হয়ে বলল,
“ কী হয়েছে,আপনার?”
সার্থ দু পল চেয়ে রইল স্ত্রীর মুখের দিকে। তুশিকে দেখতে পূর্ণাঙ্গ নারী লাগে এখন। পরেছে তারওপর শাড়ি। আঁচল গিন্নীদের মতো দুই ভাঁজ করা। এত স্নিগ্ন,মায়াময় কেন চোরটা? কেন এত ললিত ওর মুখ? সার্থ হাত বাড়িয়ে হঠাৎ ওর খোপা খুলে দিলো। তুশির রেশমের মতো কালো চুল ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়তেই,মুচকি হাসল মেয়েটা। সার্থ ওর চুল বেঁধে রাখা পছন্দ করে না। কিন্তু ওর এই হাসিটা সার্থর বুক খাবলে হৃদপিণ্ড খামচে ধরার মতো। হাসলে তুশির গাল ডেবে যায়,খেয়াল করলে বোঝা যায় সেটুকু। ওই গর্তের ওপর সার্থ টুপ করে একটা চুমু খেয়ে ফেলল।
তুশি মৃদূ আর্তনাদ করল চাপা স্বরে,
“ কী করছেন,কেউ দেখবে!”
সার্থ একটু কাছে এসে তুশির বুকের ওপর থেকে কিছু চুল হাতের মুঠোয় তুলল। ঝুঁকে নাকের কাছে ধরে লম্বা ঘ্রাণ নিয়ে ডাকল,
“ তুশিইইইই!”
এক বাচ্চার মা হয়ে গেলেও,সেই একইরকম স্বামীর অন্তরঙ্গতায় তুশি নুইয়ে এলো আজও। জবাব দিলো ধীরে,
“ হু?”
“ আমার ঘুম হচ্ছে না।”
“ আমারো না।”
“ বাবুর জন্যে? ”
তুশি সরল স্বীকারোক্তি দেয়,
“ না, আমি আপনাকে মিস করেছি।”
ভ্রু নাঁচাল সার্থ,
“ আচ্ছা? কী করে বুঝব? প্রুফ তো করছো না।”
“ কী করলে বুঝবেন!”
“ চুমু দিই!”
তুশি আশেপাশে চাইল প্রকট চোখে,
বলল,
“ এখানে?”
“ ছোট্ট করে দেব। কেউ দেখার আগেই ছেড়ে দেব।”
তুশি লজ্জা লজ্জা ভাব করে চোখদুটো নামাল। চিবুক গলায় মিশিয়ে ঘাড় নাড়তেই, সঙ্গে সঙ্গে ওর পিঠে ধাক্কা দিয়ে বুকে এনে ফেলল সার্থ। দু জোড়া ঠোঁটের সন্ধি হলো বিদ্যুৎ এর গতিতে। মিলল ওদের শ্বাস-প্রশ্বাস!
কিন্তু বিপত্তি বাঁধল সময় ফুরালে। ছোট্ট চুমুর কথা বলে,তুশির জীবনটা যেন নিয়ে নিলো সার্থ। এই কদিনের দুরুত্ব আর দীর্ঘ বিরতির একটা উশুল ঐ এক চুমুতে তুলে নিচ্ছে সে। তুশি দুবার ঠেলল, নিজেকে সরাতে চাইল- দিলোই না। উলটে এত এগ্রেসিভ হয়ে যাচ্ছিল সার্থ,তুশির পিঠ ধ্রিম করে গিয়ে লাগল দেওয়ালে। সেখানে পিষে গেল মেয়েটা। সময় কাটতে কাটতে
ঘর থেকে রেহণূমা হঠাৎ ডাকলেন,
“ তুশি,বাবুর খিদে পেয়েছে! কোথায় গেলি?”
উপায় না পেয়ে এইবার ঠোঁটের আদরে রাশ টানল সার্থ। কোমরের বাঁকে শক্ত হাত শিথিল হতেই,নিজেকে ধড়ফড় করে ছাড়িয়ে নিলো তুশি। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে এক ডলায় ঠোঁট মুছতে মুছতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ বিটকেল পুলিশ একটা!
সার্থ ফিসফিস করে বলল,
“ পাশে একটা রুম আছে,কেউ আসে না। চলো!”
তুশির চোখ কপালে। ইঙ্গিত বুঝতেই উল্টোঘুরে
ছুট লাগাল। সার্থ চাপা কণ্ঠে ডাকল,
“ অ্যাই চোর, চুমু শেষ হয়নি কিন্তু!”
শোনা গেল তুশির অতীষ্ঠ স্বর,
“ আপনি যান এখান থেকে,গুড নাইট।”
ইউশার রায়ানকে রেখে যেতে ইচ্ছে করে না। সারাক্ষণ কোলে নিয়ে ঘুরতে মন চায়। এত আদুরে হয়েছে রায়ান! এত কিউট!
আজকে এ রুমেই ঘুমাতো। কিন্তু অয়ন ভাই এসছেন,ওনার কাছেও যাওয়া জরুরি না? রেহণূমাও বলে বলে তাড়া দিয়ে পাঠিয়ে দিলো ওকে।
রাত প্রায় দুটোর কাছাকাছি সময়। ইউশা আস্তেধীরে ঘরে ফিরল নিজের। তুশি মাঝেমধ্যে শাড়ি পরলেও,ইউশা শাড়ি পরে সব সময়। পরতে ভাল্লাগে। মা, বড়ো মা সবাই বলেন গরমে আরামদায়ক কিছু পরতে, কিন্তু ইউশার মনে হয় বউ মানেই শাড়ি। ও যে এ বাড়ির বউ,সেটার হাতেকলমে প্রমাণ দরকার না?
এত রাত, অয়ন ঘুমিয়ে যাওয়ার কথা। শেষ দুজনের দেখা হয়েছিল রাতে খাবার টেবিলে। অয়ন বলেছিল,আজ তাড়াতাড়ি ঘুমোবে। কিন্তু ইউশা ঘরে এসে একটু বোকা বনে গেল।
খুব গুরুতর চোখমুখ করে ফোন ঘাটছে অয়ন। কপালে বিশদ ভাঁজ,হয়ত বিরক্ত বেশ। ইউশা
এগিয়ে এসে বলল,
“ ঘুমোওনি এখনো?”
অয়ন শান্ত চোখে চাইল। ইউশা আবিষ্কার করল,ভদ্রলোকের হাতের মোবাইল ফোনটা ওর। একটু তাজ্জব হলো বৈকি! অয়ন ভাই আবার আজকাল ওর ফোনও চেইক করছে!
ইউশা আর অয়ন খাটের এপাড়,ওপাড় ছিল। অয়ন খাটের শক্ত কাঠে হেলান দিয়ে বসা,ইউশা দাঁড়িয়ে। আচমকা দুজনের মাঝে থাকা জায়গায় ফোনটা ছুড়ে মারল সে। জিজ্ঞেস করল রুক্ষ স্বরে,
“ কী এসব?”
ইউশা আঁতকে ওঠে। ভয় পেয়ে যায়! কী দেখল অয়ন ভাই? রাগলো কেন এত?
ফোনটা তুলে দেখতে গেলে কব্জি খপ করে চেপে ধরল অয়ন। আরো ভয় পেলো মেয়েটা। ঘাবড়ে চাইল। অয়ন শক্ত চোয়ালে শুধাল,
“ ফারিণ কে?”
“ আমা- আমার বা-বান্ধবি। মনে নেই,বিয়েতে এসেছিল তো।”
“ হোয়াট ওয়াজ হার লাস্ট টেক্সট?”
ইউশার ভেতরটা চিন্তায় চৌচির। ফারিণের সাথে ওর চ্যাটিং হয়েছিল গতকাল। রায়ান হওয়ার খবর দিয়েছিল। এরপর বাড়ির এত আয়োজনে অনলাইনে যাওয়া হয়নি। ও জিভে ঠোঁট ভেজাল বেশ চিন্তিত ভাবে। কিছু কি উল্টোপাল্টা লিখেছে?
অয়ন আগের চেয়েও শক্তভাবে বলল,
“ দ্যাখ কী লিখেছে!”
ইউশা অস্থির অস্থির ভাব করে হোয়াটসঅ্যাপ খুলল। সবার ওপরের কনভারসেশনই ফারিণের। ভেতরে ঢুকতেই লম্বা একটা ম্যাসেজ পড়ে সারামুখ লাল হয়ে গেল ওর।
“ তোর বোন তোর ৫ মিনিটের ছোট হয়েও তোর আগে ছেলের মা হয়ে গেল।
আর তুই এতদিনে নিজের বরকে একটা চুম্মা দিতেও পারলি না। বেঁচে আছিস কেন?
শোন,টিপস লাগলে আমার থেকে নে। কাল না ফিরবে? তাহলে কাল রাতেই বিড়ালটা মেরে দে তাহলে। আচ্ছামতো সিডিউস কর ব্যাটাকে। আর আমি বুঝি না ভাই, কোন পুরুষ পাশে তোর মতো বউ রেখে এক বছর এমনি ঘুমাতে পারে? ব্যাটার মালপত্রে আবার সমস্যা নেই তো?”
ইউশার মাথাটা চক্কর কাটল। চোখে ঝাপসা দেখতে দেখতে জিভ কাটল আস্তে। দিলো রে,দিলো! সব শেষ করে দিলো। ও আর মুখ তুলে চাইতে পারল না। কোনোরকম টলমল চিত্তে জানাল,
“ আসলে ও একটু ঠোঁ-ঠোঁট কাটা। তুমি কিছু মনে করো না প্লিজ!”
তারপর ওয়াশরুমের দিকে ছুটতে গেলেই,পেছন থেকে হাতটা ধরে ফেলল অয়ন। খুব কড়া গলায় শুধাল,
“ কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
“ ওই,রায়ান আমার গায়ে,ইয়ে চেঞ্জ করে আসছি।”
কথাটা মিথ্যে, ইউশার আপাতত পালানো দরকার। বাঁচানো দরকার নিজেকে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কোথাও তো একটা লুকিয়ে থাকা চাই!
তবে অয়ন আজ বাধ সাধল তাতে। তুরন্ত হাতে হ্যাচকা টান মেরে নিজের কোলে বসিয়ে দিলো। প্রচণ্ড হকচকাল ইউশা। তাকাল বিকট চোখে।
অয়নের মুখখানা শিথিল হলো হঠাৎই। ঠোঁটের কোণে এক ছটা ফিচেল হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ মেয়েটা তো ভুল কিছু বলেনি। সত্যিই তো,আমি খেয়ালই করিনি,এত দিন বিয়ে হলো তুই আজ অবধি আমাকে একটা চুমু খাসনি। নট ইভেন আ সিঙ্গেল কিসেস ইউশা!”
ইউশা হাঁ করে ফেলল দুই ঠোঁট।
অয়ন কোলে বসানো শরীরটা দুহাতে জোর দিয়ে আরেকটু কাছে টানল নিজের। বুকে, বুক মিশল দুজনের। ঠিক তার নাকের ডগায় এসে ঠুকলো ইউশার ঠোঁটটা।
অয়ন বলল,
“ ইউশা…”
ইউশার ভেতর অবধি টলে উঠল ঐ ডাকে। অস্থির হয়ে বলল
“ এরকম করো না। আমার কেমন যেন লাগছে!”
“ কেমন লাগছে?”
“ বুক ধড়ফড় করছে,হাতপা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
অয়ন দুষ্টুমি করে বলল,
“ ঠান্ডা হোক,আবার গরম করে দেবো।”
ইউশা চোখদুটো খিচে নেয়। অয়ন ফুঁ দেয় মুখে। বজ্রের ন্যায় কেঁপে ওঠে মেয়েটা। অনুনয় করে মৃদূ স্বরে,
“ এমন করো না,অয়ন!”
“ আজ তো একটা চুমু দিতেই পারিস।”
ইউশা চমকে বলল
“ আমি?”
অয়ন গাল বাড়িয়ে দেয়। বলে,
“ দে।”
ইউশা ভীষণ লজ্জায় মিইয়ে যায়। লাজুকলতার মতো বুজে আসে শরীর। অয়ন তাগিদ দেয় আরো,
“ দু সেকেন্ডও লাগবে না। দে,ঘুমাব।”
ইউশা ধুকপুক করা বুক নিয়ে,রয়েসয়ে,নিজেকে সামলে,সাহসী বানিয়ে ঠোঁটদুটো বাড়াল, প্রথম স্বামীর ফরসা গালে একটা চুমু দেয়ার আশায়। ঠিক তক্ষুনি,নিজের মুখ ঘুরিয়ে ফেলল অয়ন।
তুরন্ত দুই জোড়া ঠোঁট ঠুকে গেল। ইউশার উষ্ণ অধর জোড়া এসে ভীষণ গতিতে মিশল অয়নের সাথে। কী হয়েছে বুঝতে পেরে,
চোখদুটো প্রকাণ্ড হয়ে গেল ওর। যেই ইউশা সরতে নেবে,ঘাড়ের পেছন ধরে ফেলল অয়ন। দুজনের শরীরী দুরুত্ব তখন উধাও হয়ে গেছে। বাতাস যাওয়ারও জায়গা নেই সেথায়।
শুধু ইউশার বুকের তোলপাড় একইরকম সরব রইল। গলা শুকাল ওর। চোখের মণি বসে যাওয়ার অবস্থা। অয়নের নয়ন জুড়ে ভ্রম। ঘোর দুই দৃষ্টিতে। যাতে একবার চিবুক তুলে চাইতেই,বিপদ ঘনিয়ে এলো।
পৃথিবীটা সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেল ইউশার। অয়ন ঝড়ের বেগে ঠোঁট দুটো নিঃসঙ্কোচে গলিয়ে দিলো ওর ঠোঁটের মাঝে। ঘুচিয়ে দিলো এই এক বছরের দুরুত্ব,জড়োতা,সংকোচ আর সাথে সব দ্বিধাদের। ইউশা এই আক্রমণের প্রস্তুতি অল্পস্বল্প নিয়েছিল বোধ হয়। টালমাটাল হয়ে খামচে ধরল তার বুকের শার্ট। আজ গভীর আদরে অয়নের সবটুকু উষ্ণতা গলে পড়ল ওর ঠোঁটে। ঘটল খুব দীর্ঘ চুমু।
সেই সাথে সুখে বা তৃপ্তিতে এক ছটা জল বেয়ে ইউশার চোখ ছুঁয়ে নামল।
মিনিট কয়েকে সরে এলো অয়ন। ইউশার চোখ বন্ধ। রুদ্ধশ্বাসের দশায় তাকাতেই পারছে না৷ অয়ন মেয়েটার এলোমেলো চুল ঘাড় থেকে সরিয়ে,পিঠে গুছিয়ে রাখে। আজ তার কথায় জড়োতাই নেই। খুব সোজাসুজি বলল,
“ নিজের প্রথম অনুভূতি তোকে না দিতে পারলেও,
আমার ঠোঁটের প্রথম স্পর্শটা কিন্তু তোকেই দিয়েছি।”
ইউশা চোখ তুলে চাইল এতক্ষণে। বলল,
“ বলেছিলে প্রথম স্পর্শ ভালোবেসে হবে। তাহলে আজ কেন?”
“ জানি না। হয়ত তুই দিন দিন মনে ঢুকে যাচ্ছিস তাই!”
“ মনে ঢুকতে পারছি বলছো?”
“ মন, মাথা সবখানে শুধু তুই।”
ইউশা আকুল হয়ে বলল,
“ তাহলে তো ভালোও বেসে ফেলতে পারো।”
“ সব সম্পর্ক ভালোবাসার পরে তৈরি হয়। আমাদের ভালোবাসা সম্পর্ক হওয়ার পরে হচ্ছে। ক্ষতি কী?”
“ তুমি আসলে কী চাও?”
“ বলব?”
“ হুউউউ!”
অয়ন দু পল চুপ থেকে বলল,
“ ভাইয়ার কোলে রায়ানকে দেখলাম আজ সারাদিন। সারাদিন ওদের দুজনকে দেখে গেছি। বাবার কোলে সন্তান কী সুন্দর দৃশ্য! আমার এত ভালো লাগছিল!”
থামল সে। এক দণ্ড শ্বাস নিয়ে বলে ফেলল,
“ ইউশা…
আমাকেও একটা রায়ান এনে দিবি?”
ইউশা হতবিহ্বল চোখে বলল,
“ তুমি কী বলছো,তুমি জানো?”
“ জানি। অনেক তো হলো। মনের দুরুত্ব যখন নেই, শরীরের রেখে কী হবে?”
মেয়েটা মূহুর্তে উঠে গেল ওর কোল থেকে। ঘুরে দাঁড়াল ওয়ারড্রবের সাথে। পলিশ করা কাঠ খুটতে খুটতে বলল,
“ পরে যদি তোমার আক্ষেপ হয়? মনে হয় ভুল করছো? তখন!”
অয়নও বসা থেকে উঠে এলো। ঘুরে থাকা ইউশার পিঠ থেকে সরিয়ে দিলো চুল। ফাঁকা ঘাড়ে থুত্নি রেখে দুহাত বাড়িয়ে দুপাশ থেকে আকড়ে ধরল মেয়েটাকে।
বলল,
“ একটু ভুল হোক না! তাছাড়া তোকে তো সত্যিই প্রমাণ দেয়া হয়নি,আমার মালপত্র ঠিক আছে কিনা!”
ইউশা লজ্জায় দিশাহারিয়ে ছুটে গেল ওর বাহুর ভেতর থেকে। ছটফটিয়ে বলল,
“ ছিহ,আমি তোমাকে ভদ্র ছেলে ভাবতাম!”
অয়ন হাসল। এগিয়ে এলো ফের। ঝট করে মেয়েটাকে কোলে তুলতেই,কিংকর্তব্যবিমুঢ় বনে গেল যেন। কোন দিকে তাকাবে,কী করবে উদ্ভ্রান্ত ইউশা। অয়ন ওর শরীরটা বিছানায় রাখতে রাখতে বলল,
“ এমনিতে ভদ্রই আমি। শুধু এরপরের রাতগুলোয় একটু অভদ্র হতে চাচ্ছি!”
শরীরের ওপর ভারি শরীরের উপস্থিতিতে ইউশা আর নিঃশ্বাস নিতে পারল না। শুধু দিগভ্রমের ন্যায় বলল,
“ আরেকবার ভাবো! আরেকবার!”
অয়ন ভাবল না। বরং এসির ঝিমঝিমে শব্দে রাশ টানল ব্লাঙ্কেট তুলে দিয়ে। দুজনকে ঢেকে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ অনেক ভেবেছি। মন বলেছে তোকে চাই,মস্তিষ্ক বলছে তোকে চাই, নিজের অস্তিত্বের সবটা বলছে তোকে চাই। তাহলে এই শরীরটার কী দোষ!”
এক নিস্তব্ধ রাত পাড় হতে চলল। সেই তালে ভীষণ ভালোবাসায়,গভীর অন্তরঙ্গতায় মিলল ওরা দুজন! রাত জাগা নিশাচরের গা ছুঁয়ে কিছু কথা সুরে সুরে বলল,
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৪
“ Yeh kya baat hai aaj ki chandni mein,
Ke hum kho gaye, pyaar ki raagini mein,,
Yeh baahon mein baahein,
Yeh behki nigaahein,
Lo aane laga zindagi ka maza…”
