Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৫

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৫

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৫
জাবিন ফোরকান

হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তীব্র ঔষধি ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণটি জায়দানের বহু চেনা। নাসারন্ধ্র বেয়ে ঢুকে সমস্ত শরীরজুড়ে ছড়িয়ে ভয়ানক জ্বালার সৃষ্টি করে তা। দেয়ালের সঙ্গে ঘেঁষা ওয়েটিং চেয়ারে শিরদাঁড়া টানটান করে নির্বিকার পাথুরে মুখে বসে আছে সে। খানিকটা দূরেই নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন জেসমিন।
ডাক্তারদের সঙ্গে যত আলাপ আলোচনা সারছে মিসির এবং জাফরই। অদূরে বসে থাকলেও জায়দান স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ডাক্তারের সতর্কবাণী।

“মাইল্ড স্ট্রোক। বড় কিছুর লক্ষণ। যদি এখনই সাবধান হওয়া না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।”
অতঃপরের ভবিষ্যতটা কি হতে পারে সেটা আন্দাজ করতে জায়দানকে বেগ পোহাতে হচ্ছে না। ইতোমধ্যেই ছক আকারে মস্তিষ্কজুড়ে গড়ে উঠেছে গল্পটা।
আয়দানকে আইনের মুখোমুখি আনার আর কোনো উপায় তার হাতে রইলনা। যে কেউ বলতে পারবে জেসমিনের এমন অবস্থার কারণ। যদি জাফর জোর দিয়ে নিজের স্ত্রীর স্বার্থে সন্তানকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতে চায়, সেক্ষেত্রে শক্ত বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা কি জায়দানের থাকলো? ন্যায়ের অবতার হওয়ার অর্থ কোথায় যেখানে তার ঘরটাই ভাঙাচোরা?
কোনো অনুভূতির অনুভবই আর নেই জায়দানের। কষ্টটুকু বিদায় নিয়েছে বহু পূর্বে। নিজের কাঁধে বন্ধু মিসিরের স্পর্শ টের পেয়েও তাই প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। মিসির ঝুঁকে মৃদু আঁচে বলল,
“চিন্তা করিস না। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
“চিন্তা করছি না।”

সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো জায়দান। ঠিক তখনি সামনে এসে দাঁড়ালেন জাফর। ঠান্ডা নয়নে দেখলেন নিজের বড় সন্তানকে। অতঃপর কন্ঠে বিতৃষ্ণা নিয়ে উচ্চারণ করলেন,
“তুমি কি জানো তোমার আম্মুর এই অবস্থার সম্পূর্ণ দায় তোমার?”
জায়দান ভ্রু তুলে নিজের পিতার দিকে তাকাল। গভীর বাদামী দৃষ্টিজুড়ে খেলা করা শীতল চাহুনি যেন পিতার শিরদাঁড়া বেয়ে তরঙ্গ খেলিয়ে দিল।
অথচ জায়দান এমন ছিলনা। তার নির্বিকার সবটা মেনে নেয়ার কথা ছিল!
“আংকেল। এসব কথা এখন থাক। আমরা নাহয় আন্টির দিকে ফোকাস করি?”
মিসির জটিল পরিস্থিতি সামলাতে মাঝখানে আসতে উদ্যত হলেও জায়দান তার হাত চেপে ধরে ইশারায় মানা করল। অতঃপর নিজেই উঠে দাঁড়ালো। নিজেও ছ ফুট উচ্চতার হলেও বড় সন্তানের উচ্চতা জাফরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে ইঞ্চিকয়েক। তাই সে যখন মুখোমুখি দাঁড়ালো তখন তাকে ঘাড় তুলে দেখতে হলো। সন্তানের দৃষ্টি নির্বিকার হলেও তার সত্তা আর নির্বিকার নেই এটুকু বোধগম্য হতে সময় লাগলোনা জাফরের।
সামান্য ঝুঁকে এলো জায়দান, পিতার চোখে চোখ রাখার জন্য। ক্ষুরধার দৃষ্টিযুগল মিলিত হতেই হিমশীতল কণ্ঠে ধ্বনিত হলো,

“আম্মুর পরিস্থিতির জন্য যদি কারো দায় আদও থেকে থাকে সেটা সম্পূর্ণরূপে আয়দানের।”
জাফরের চোখজোড়া চওড়া হয়ে উঠলো বিস্ময়ে। আজীবন নিঃশব্দে মাথা পেতে সবকিছু হজম করে যাওয়া ছেলে আজ ভিন্ন সুর গাইছে কেন? জায়দান সোজা হয়ে দাঁড়াল। প্যান্টের পকেটে দুহাত ভরলো। গুরুগম্ভীর হয়ে জানালো,
“যদি ভেবে থাকো আমার কাঁধে দায়ভার চাপিয়ে নিশ্চিন্তে দিনযাপন করবে, তবে দুঃসংবাদ। তোমাদের নিশ্চিন্ত জীবন এবং আমার দায় মাথা পেতে নেয়ার সমাপ্তি এখানেই।”
পিতা এবং পুত্রের মাঝে নিগূঢ় অব্যক্ত চাহুনির বিনিময় হলো। যেন কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। ঠিক তখনি করিডোরের প্রান্ত থেকে ভেসে আসা দ্রুত পদক্ষেপধ্বনি সকলের মনোযোগ কেড়ে নিলো। মাথা কাত করে ঘুরে তাকাল জায়দান। থমকে পড়ল।
ওপাশ থেকে ছোট ছোট পদক্ষেপে রীতিমত দৌঁড়ে আসছে সাবিন। পরনে একটা টি শার্ট, এর উপর চেইন খোলা জ্যাকেট। ট্রাউজার এবং পায়ে স্নিকার্স। চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে খবর পেয়েই যেমন অবস্থায় ছিল ছুটে এসে পড়েছে। কিন্তু খবরটা তাকে দিলো কে?
হুট করে মিসিরের দিকে অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে তাকাল জায়দান। সঙ্গে সঙ্গে মিসির চোখ ঘুরিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে ছোট্ট করে উচ্চারণ করল,
“সরি।”

যদি না নিজে থেকে মিসিরের সঙ্গে যোগাযোগ করতাম তাহলে আমার প্রাক্তন শ্বাশুড়ি যে স্ট্রোক করেছেন, এই খবরটা জানতেই পারতাম না। অবশ্য, এখন আমার জেনেও কোনো কাজ নেই। আর না আছে কোনো উদ্দেশ্য হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার। তবুও আমি এসেছি। ঠিক কেন এসেছি, সেই সম্পর্কে নিজেও নিশ্চিত নই। পুরাতন চেনাশোনার কারণে? নাকি ভিন্ন কোনো লক্ষ্য আছে আমার অন্তরের?
করিডোরের ওপাশে দাঁড়ানো প্রাক্তনকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মনের উদ্দেশ্য টের পেলাম। হয়তবা আমি তার জন্যই এখানে এসেছি। মা জেসমিনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা কেমন খুব ভালো করেই জানি আমি। বিবাহিত থাকাকালীন একবার শুধু উচ্চজ্বর হয়েছিল শ্বাশুড়ির। সেই সময়টায় জায়দান কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। যে মানুষ কখনো ভার্সিটি মিস করেনা, পারিবারিক জীবনের আগে কর্মজীবনকে প্রাধান্য দেয়, সেই মানুষটাই টানা তিনদিন ছুটি নিয়ে মায়ের শিয়রে বসেছিল। জলপট্টি দেয়া থেকে শুরু করে মাথায় পানি ঢালা, শরীর মুছে দেয়া, নিয়মমতো তাপমাত্রা মাপা, জ্বর বেড়ে গেলে বোঝার জন্য বিছানার কাছেই আরামকেদারা পেতে বসে থাকার মতন কাজ ছিল তার তখনকার রুটিন। তাকে হাজার চেয়েও সেই সময়ে দুই গ্রাস পেট ভরে খাবার খাওয়াতে পারিনি আমি। জ্বরের ঘোরে সেসব কাহিনী হয়ত টের পাননি শ্বাশুড়ি। তিনি শুধু মগ্ন ছিলেন তার ছোট ছেলে আয়দানের নাম জপতে। ঘুমের ঘোরে, ওষুধের প্রভাবে গুঙিয়ে যেতেন শুধু একটি নাম—আয়দান। সেই ছোট ছেলে তখন বিদেশ। তাই বড় ছেলেই ডাকের জবাব দিত, “হ্যাঁ আম্মু, আমি তোমার কাছেই আছি।”

সেখানে আজ যখন জেসমিন সত্যিই স্ট্রোক করেছেন, তখন কি আমার ভালোবাসাটা ঠিক থাকবে? হ্যাঁ, থাকবে, জগতের সামনে তো সে নির্বিকার। কিন্তু তার ভেতরটা? চুরমার হয়ে যাবে না? এমন আতঙ্ক থেকেই আমি ছুটে এসেছি আজ এখানে।
কাছাকাছি পৌঁছে বুঝলাম আমার উপস্থিতি মোটামুটি সকলকেই বিস্মিত করেছে। আমাকে দেখেই অন্য পথে পা বাড়ালেন জাফর। আড়াল হয়ে গেলেন দৃষ্টিসীমার। আমি ঘুরে তাকালাম মিসিরের দিকে।
“এখন কেমন আছেন, উনি?”
আড়চোখে জায়দানকে নিরীক্ষণ করলাম। আপাতদৃষ্টিতে তাকে অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। আমার দিকে তাকাচ্ছেনা। বরং ভিন্ন কোনো দিকে তাকিয়ে আছে শূন্য চোখে। মিসির মাথা দুলিয়ে জানালো,
“স্ট্যাবল, তবে আশঙ্কামুক্ত নয়। আমরা এখনো দেখতে পারিনি। নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছে।”
“ওহ।”
এরপর আসলে কি বলব, কি জিজ্ঞেস করব বুঝতে পারলাম না। দৃষ্টি লুকিয়ে বারংবার দেখলাম জায়দানকে যে মাত্রই আবার ওয়েটিং চেয়ারে বসে পড়েছে। মিসির বোধ হয় আমাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বটুকু টের পেলো। তাই নরম কন্ঠে বলে উঠল,

“আমি একটু, দেখে আসছি। থাকো তুমি।”
কি দেখতে যাচ্ছে তা অবশ্য স্পষ্ট করলোনা বান্দা। চুপচাপ উল্টো ঘুরে চলে গেলো, আমাদের একা ছেড়ে।
পিনপতন নীরবতা ভর করতেই একটি নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। ঔষধি ঘ্রাণে ম ম করতে থাকা হাসপাতালের শক্ত দেয়ালের ভেন্টিলেটর বেয়ে ভোরের মৃদু আভা চুঁইয়ে পড়ছে। আস্তে করে জায়দানের ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লাম। নড়চড় হলোনা বান্দার মাঝে কোন। এক হাতের আঙুলে অপর হাতের আঙুলগুলো গলিয়ে নির্লিপ্ত চেয়ে আছে সে। অবশেষে মুখ খুললাম আমি।
“বেশি চিন্তিত হয়োনা। আম্মু…না মানে আন্টি ঠিক হয়ে যাবেন।”
—শয়তানেরা সহজে মরেনা।
বলার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও প্রথমবারের মতন নিজের আবেগ সামলে বিবেক দিয়ে চিন্তা করে নিজেকে আটকে ফেললাম।
জায়দান কোনো উত্তর করলনা। না তো আমাকে একবারো ফিরে দেখল। শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলাম। অতঃপর ইতস্তত করে কাঁপা কাঁপা একটি হাত বাড়িয়ে তার গুচ্ছ পাকিয়ে রাখা হাট দুটোর উপর রাখলাম। হালকা চেপে বললাম,

“জায়দান। আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি ঐভাবে তোমাকে সন্দেহ করতে চাইনি। পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে…! আমার মাথা গরম ছিল জায়দান! তুমি তো জানো, মীরা আমার কাছে কি! তাই আমি নিজেকে হাজার চেয়েও ঠান্ডা রাখতে পারিনি। তবে ট্রাস্ট মি, যদি তুমি একটাবার আমাকে মুখ ফুটে আগেভাগে বলে দিতে যে….”
“হাত ছাড়ো।”
“জায়দান?”
“আমার হাত ছাড়ো, সাবিন!”
ঘড়ঘড় করে উঠল জায়দানের কন্ঠস্বর। কেঁপে উঠলাম। সহসাই নিজের হাতটা দূরে সরিয়ে নিলাম। কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া আর করলনা জায়দান। নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুতহাতে কিছু মেসেজ নোটিফিকেশন চেক করল। দেখতে না চাইলেও এস এম এসে আসা মেসেজটি স্পষ্ট চোখে পড়ল আমার।
আরওয়া: ওহ মাই গড! আন্টির এত বড় একটা নিউজ আমাকে জানালেন না কেন? আমার মম খুব চিন্তা করছে। আমরা এক্ষুণি হাসপাতালে আসছি!
জায়দানকে কোনো রিপ্লাই করতে দেখলাম না। চুপচাপ নিজের পকেটে ফোনটা আবার ভরে ফেললো সে। বুকের ভেতরটা খামচে ধরলো কেউ যেন। এস এম এস? আরওয়ার কাছে জায়দানের ই মেইল নয়, বরং নাম্বার আছে? বৃহৎ অগ্রগতি!

“আমরা কি কিছুক্ষণ, আলাদাভাবে কথা বলতে পারি?”
সামান্য অস্থির হয়ে উঠলাম আমি। দ্রুত যুক্ত করলাম,
“কথা দিচ্ছি, তোমার সাথে কথা বলেই আমি চলে যাব।”
নিশ্চুপ জায়দান কিছুক্ষণ শূন্যের উদ্দেশ্যে চেয়ে রইল। তারপর কোনো কথা না বলেই চুপচাপ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। কেন দাঁড়িয়েছে সেটা না বুঝলেও আমি তাকে বিনা বাক্যে অনুসরণ করলাম। করিডোর বেয়ে এগোতে লাগলো সে লম্বা পা ফেলে, পিছু নিলাম আমি।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাইরের পথে এসে নামলাম। গেটের সামনে দুই ধার ঘেঁষে চলে গিয়েছে প্রশস্ত ফুটপাথ। একদম ভোরের সময় হওয়ায় সড়কে কোনো যানবাহন নেই। শুধু দূরে একটা দুটো আবছায়া মানুষের মতন অবয়ব চোখে পড়ছে। ডান পাশের ফুটপাথের একদম মাঝ বরাবর মধ্যম আকৃতির এক বটগাছ। চারপাশে সিমেন্টের দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে খানিকটা বসার জায়গার মতন করে। জায়দান হেঁটে গিয়ে সেই বটগাছের নিচেই থামলো। ভোরের স্বর্ণালী আভা পাতার ফাঁক গলে বেয়ে পড়ল তার সুদীর্ঘ অবয়বে। আমার দিকে প্রথমবারের মতন সরাসরি তাকাল এবার সে। মুখে কিছু না বললেও তার চাহুনি সবটাই আমার কাছে ঘোষণা করে দিল।
চারপাশে কনকনে শীত। অথচ শুধুমাত্র একটা ফুল হাতা টি শার্ট গায়ে থাকলেও কোনোপ্রকার হেলদোল নেই জায়দানের। বিপরীতে আমি জ্যাকেটের ভেতরেও শিরশির করে কাঁপছি। এর কারণ শুধু শীত নয়, বরং ভিন্ন কিছু। একটি শক্ত ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করতে চাইলাম। অতঃপর জিজ্ঞেস করলাম,

“তুমি ঠিক আছো?”
জায়দানের অভিব্যক্তির পরিবর্তন ঘটলনা। বুকের উপর দুবাহু ভাঁজ করে সে বলল,
“অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নে সময় নষ্ট করোনা। যেটা বলতে চেয়েছ সেটাই বলো।”
হাত দুটো কম্পিত হতে থাকলো আমার। বুকের ভেতর সবটা তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে যেন। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে বললাম,
“আমি সরি।”
নির্লিপ্ত জায়দান।
“জানি, সরি বললেই সবকিছু ঠিক হয়ে যায়না। তবুও আমি চাইছি তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
নিরুত্তর প্রাক্তন। তার বাদামী দৃষ্টি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আমায় পর্যবেক্ষণ করছে টের পেলাম ভালোভাবেই। মাথা তুলে ওই দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি মেলালাম। গভীর প্রশ্বাস টেনে বললাম,

“আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অর্ধেক কথা মনে রেখে অর্ধেক কথা বানিয়ে গড়িয়ে বলতে পারিনা। তাই যা বলার সরাসরি বলছি। আমি জানি আমি ভুল করেছি। আর আমি শুধু গতকালের ভুলের কথাটা বলছিনা। আমি আমাদের বিবাহিত জীবনের কথাও বলছি। আমার অনেক ভুল ছিল। সব ভুল আজ আমি মাথা পেতে তোমার কাছে স্বীকার করছি। আমি অহংকারী, রগচটা। খুব বেশি ভাবনা চিন্তা না করেই বিচার করে ফেলি। আমি চাই নিজেকে ঠান্ডা রাখতে। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে ঠান্ডা থাকতে দেয়না। এটা হয়ত আমারই দোষ। তোমাকে আমি খুব কষ্ট দিয়েছি। অনেকভাবে ভেঙেছি, আঘাত করেছি, অন্য মানুষের সাথে তুলনা করেছি। তোমার খারাপ লেগেছে আমি জানি। সেই সবকিছুর জন্য আমাকে আজ ক্ষমা করে দাও, জায়দান।”

এবারেও কোনো উত্তর নেই। পাথরের ভাস্কর্য যেন দন্ডায়মান আমার সামনে। কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে তার একটি হাত নিজের দুহাতের মাঝে অতি যত্নে তুলে নিলাম, অতঃপর সেটি চেপে ধরলাম নিজের গালে। আমার ঝোড়ো দৃষ্টি হন্যে হয়ে খুঁজলো একটুখানি আশ্রয় ওই বাদামী সমুদ্রে।
“আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি। আমার ভালোবাসাটা মিথ্যা না। আমি তোমার মায়ায় এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছি যে তোমাকে হারানোর কথা স্মরণে এলেও আমার বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয় এই জীবনটা বুঝি অনর্থক, এর থেকে মৃ*ত্যু শ্রেয়। তুমি একবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ। তবুও বেহায়া হয়ে আরেকবার করজোড়ে মিনতি জানাই, ফিরে আসো জায়দান। আমি তোমাকে খুব করে ফিরে পেতে চাই। আর এবার, সাবিন নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করবে।”
চোখ ছলছল করে উঠল আমার। ঝাপসা দেখতে শুরু করলাম। জায়দানের হিমশীতল বরফের মতন হাতটা নিজের ঠোঁটে চেপে কান্নাজড়িত গলায় ফিসফিস করলাম,
“তুমি যদি বলো, তাহলে আমি তোমার আম্মুর সাথেও নিজেকে মানিয়ে নেবো! আমি তার কাছেও ক্ষমা চাইবো, শুধু তোমার জন্য! আই প্রমিজ, আই উইল বি বেটার, আই উইল ট্রিট ইউ বেটার। শুধু আমার থেকে দূরে যেওনা, আমাকে একলা ঠেলে দিওনা। আমি নিজেকে শুধরে নেব। আমার রাগ, ঔদ্ধত্যে সমস্যা তাইনা? বেয়াদবিতে সমস্যা? হুম? আমি সেগুলোও আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসব। শুধু তুমি আমার পাশে থাকো প্লীজ। আমাকে একটুখানি ভালোবাসো?”

“আমি তোমাকে ভালোবাসি না।”
শুষ্ক একটি বাক্য। আমার অন্তরাত্মাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। হতবাক টলটলে নয়নে তাকালাম জায়দানের দিকে। নির্বিকার চেয়ে আছে সে আমার মুখপানে।
“অনুভূতিহীন রোবটের মাঝে অনুভূতি খোঁজা অর্থহীন।”
কেঁপে উঠলাম। আঁকড়ে ধরতে চাইলাম প্রিয়তমকে। হাহাকার করে উঠলাম,
“জায়দান, প্লীজ! এভাবে বলো না। আমার প্রতি তোমার অনেক অভিমান তাইনা? একদমই স্বাভাবিক সেটা। তোমার জায়গায় আমি থাকলে হয়ত আরো ভয়ঙ্করভাবে নিজেকে গুঁড়িয়ে দিতাম। কিন্তু তোমার জন্য তো আমার অন্তরটা উৎসর্গ করা হয়ে গিয়েছে। আমি কিভাবে তোমাকে ছাড়া বাঁচি? রাগ করো, অভিমান করো, যা খুশি হয় আমাকে বলো। তবুও দূরে ঠেলে দিওনা। আমি যে তোমার আশ্রয়ে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছি।”
“ভালোবাসা বলে কোনো অনুভূতি না কোনোদিন আমি অনুভব করেছি, আর না কোনোদিন করব। বিশেষ করে, তোমার উদ্দেশ্যে নয়।”

স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার হাত থেকে জায়দানের হাতটা খসে পড়ল। অশ্রু নিয়ে দেখলাম প্রাক্তনকে। অত্যন্ত আবেগে উপচে পড়ল ভেতরটা। জায়দান গভীর নয়নে তাকালো আমার নয়ন বরাবর।
“ভুল? ক্ষমা? কতকিছুকে আর কতবার আমি ক্ষমা করব, ভুলে যাব সাবিন? নিজেকে শোধরাবে তুমি? আমার আম্মুর কাছে অবধি ক্ষমা চাইবে? কেন? কিসের আশা করছ তুমি? তোমার মনে হয় সবকিছু ভুলে যাওয়া এতই সহজ? ক্লাস থ্রির অংকের নোটবুকে লুকিয়ে আমি কতটা এক্সপেরিমেন্টের টেকনিক লিখেছিলাম তাও আমার মস্তিষ্ক ভুলতে পারেনি, আর তোমার মনে হয় তোমার আচরণ ভোলা এতই সহজ?”

এক পা অগ্রসর হলো জায়দান আমার দিকে। জীবনে এই প্রথম তাকে সম্পূর্ণরূপে সৎ হতে দেখলাম।
“সাবিন। তুমি আমার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছ। প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে তোমার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা করে গিয়েছ। কোনোদিন আমাকে আদও স্বামী হিসাবে ভেবেছিলে তুমি? যদি তাই ভাবতে, তবে রাত বিরাতে ইচ্ছামত বাসা থেকে বেরিয়ে ওই ছেলের সঙ্গে কিভাবে লং ড্রাইভ – ক্লাবে যেতে তুমি? আমি মানছি, তুমি বিয়েটা শুরু থেকে মানতে পারোনি। তোমার কষ্ট হয়েছে। কিন্তু তুমি কি আদও কোনোদিন চেষ্টা করেছ নিজেকে মানিয়ে নেয়ার? তুমি বিবাহিত থাকাকালীন যেটা পারোনি, সেটা আজ কিভাবে পারবে? যখন তুমি স্বামী থাকা অবস্থায় তার মূল্য দাওনি, তখন সমাপ্তির ওপাড়ে এসে কিভাবে পারবে মূল্য দিতে? তোমার শিক্ষা হয়েছে? সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে? যদি হয়েই থাকতো, তবে সেদিন আমাকে ঐ অবস্থায় দেখে কিছু চিন্তা করার আগে দুইবার ভাবতে তুমি! দুইবার তো দূরে থাক তুমি চিন্তা অবধি করনি। এরপরও তোমার মনে হয় আমার মতন কারো তোমাকে ভালোবাসা সম্ভব?”

প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা ভর করল আমাদের মাঝে। অস্থির চেয়ে রইলাম জায়দানের দিকে। জীবনে প্রথমবারের মতন আমার সামনে মুখ খুলেছে সে! সত্যিই তো! আমি তো তাকে মূল্য দেইনি কোনোদিন! সবসময় আহানের সঙ্গে তুলনা করে গিয়েছি। তার ছোট ছোট সকল আবেদন- নিবেদন তখন আমার কাছে ছিল অদেখা। হ্যাঁ, আমাদের সুখস্মৃতির কমতি নেই। কিন্ত দুঃসহ স্মৃতিরও কি কমতি আছি? যদি আমি কোনোদিন তার জীবনে না যেতাম, তাহলে হয়ত সে আজও একই রকমভাবে নিজের পরিবারের সঙ্গে ভালো থাকতো। এতটা ঝড় ঝাঁপটার মধ্য দিয়ে তাকে কোনোদিন যেতেই হতো না!
মীরা, জেসমিন, আয়দান এবং সবশেষে জায়দান। এই সবগুলো মানুষের জীবনটাই যেন আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কারো জীবনে আমি সৃষ্টি করেছি ক্রোধ এবং প্রতিশোধ বাসনা। আবার কারো জীবনকে করে ফেলেছি ধ্বংস। সবকিছুর মূলে কি তবে আমিই?
সাবিন কি আদতে এক অলিখিত অভিশাপ?
কে অশ্রু গড়াতে এতক্ষণ যাবৎ ভীষণ বাঁধা পাচ্ছিল তা এবার গড়িয়ে নামলো নিঃশব্দে। চোখ তুলে দেখলাম জায়দানকে। ঝাপসা নয়নে ঠাওর করতে পারলাম না কিছুই স্বাভাবিকভাবে। রীতিমত ফিসফিস করে বললাম,

“তোমার মতন পারফেক্ট মানুষেরা আমার মতন ইম্পার্ফেক্ট মানুষগুলোকে ভালোবাসে না কেন, জায়দান?”
কয়েক মুহূর্তের নৈঃশব্দ্য। অতঃপর ভেসে এলো জবাব।
“আগুনের তাপে বরফ গলে যায়, নিজেকে বাঁচাতে বরফ তাই দূরে রয়।”
“বরফ কি বোঝে না কভূ? বিরহে আগুন নিজেকে কতটা জ্বালায়?”
এবার নিশ্চুপ জায়দান। তাকে নিজের হাত দুটো শক্তভাবে মুঠি পাকিয়ে ফেলতে লক্ষ্য করলাম। কনকনে বায়ু ঝাঁপটা দিয়ে গেলো গায়ে। নিজের পায়ে বুঝি আর জোর পেলাম না। উবু হয়ে বসে পড়লাম ফুটপাতে। চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় গড়াচ্ছে অশ্রু। আহত গলায় আর্তনাদ করে উঠলাম,
“ভালোবাসা এত স্বার্থপর কেন, জায়দান? কেন একটা মানুষ আরেকটা মানুষের ভালোটাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার খারাপটাকে ভালোবাসে না?”
প্রথমবারের মতন জায়দানের দৃষ্টি খানিকটা বিস্ময় এবং উপলব্ধিতে প্রসারিত হতে দেখলাম। তীর্যক হাসলাম আমি, হাহাকারের হাসি।

“ভালোকে ভালোবাসি খারাপকে বর্জন করি। এর নাম তবে ভালোবাসা কিভাবে হয়? কোনো মানুষ কি আদও ১০০ শতাংশ পারফেক্ট হয়? আমি তো তোমাকে কোনো কারণ ছাড়াই ভালোবাসি জায়দান। আমি তোমার সুপুরুষতাকে ভালোবাসি, ঠিক তেমনি তোমার নির্লিপ্ততাকেও ভালোবাসি। কিন্তু তুমি আমার ভুলটাকে ভালোবাসতে পারলেনা? আমার খারাপটাকে গ্রহণ করতে পারলেনা!”
“চুপ করো সাবিন! প্লীজ!”
“কেন চুপ করব? সত্যি কথা বলছি বলে? আঘাত কি আমি একাই করেছি তোমাকে? তুমি কিছুই করনি? সরাসরি করনি বলে কি আমি কিছুই অনুভব করিনি? তোমার নির্বিকারতা আমাকে পোঁড়ায়নি? তুমি আদর্শ সন্তান ছিলে, অথচ আদর্শ স্বামী হতে পেরেছ কি? তুমি আমার কোনো চাহিদা কোনোদিন অপূর্ন রাখোনি। কিন্তু কোনোদিন আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলে যখন তোমার পরিবারের মানুষগুলো আমাকে হায়েনার মতো ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল? আমি তো সেসব নিয়ে অভিযোগ করিনি! আমি তো সেসব কষ্ট বুকে চেপে তোমায় বরণ করতে চেয়েছি! কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি! আর ভালোবাসা ভালো – খারাপ দেখে হয়না! এটা জাস্ট হয়ে যায়! তুমি যেমন, তোমার গুণ, তোমার দোষ সবটুকু আমি আগলে নিতে চেয়েছি! আর তুমি….”

হঠাৎ করে কি যেন হয়ে গেল আমার। বেহায়া হওয়ার সর্বোচ্চ স্তরটাও আজ আমি পার করে গেলাম। দুহাত বাড়িয়ে জায়দানের পা আঁকড়ে ধরলাম। অসহায় চেয়ে কেঁদে ফেললাম।
“প্লীজ জায়দান! শুধুমাত্র একটা সুযোগ! শেষ একটাবার আমাকে আপন করে নাও? কথা দিচ্ছি, আমি সবকিছু মানিয়ে নেব। তুমি আমার খারাপটা নিতে পারবে না? আচ্ছা ঠিক আছে। আমি শুধরে যাব। তুমি যা বলবে, যেমনভাবে আদেশ করবে আমি ঠিক তেমন করেই চলবে। তবুও আমার মাথার উপর থেকে তোমার হাতটা তুলে নিওনা। আমি যে বড্ড একা! তুমি ছাড়া আমাকে আর কে দেখবে? ড্যাডও পরপারে চলে গেছে আমায় একলা ফেলে। একটা তুমি ছাড়া আমি যে পথের ধূলিকণা! তোমার মতন করে কেউ কোনোদিন আমাকে আদর করেনি, আগলে রাখেনি আর রাখবেও না। জায়দান…একটাবার শুধু…!”

ধপাস করে আমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল জায়দান। অতি দ্রুত নিজের পা থেকে আমার হাতজোড়া ছাড়িয়ে নিলো। কান্না এবং অশ্রুর কারণে আমি কিছুই ঠিকমতো দেখতে পারছিনা, শুধু অনুভব করতে পারছি। জায়দান আমাকে নিজের উষ্ণতার বাহুডোরে জড়িয়ে নিলো। তার কম্পিত কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম নিজের কানে,
“নিজেকে কখনো কারো জন্য এতটা নিচে নামিও না।”
এক মুহূর্তের বিরতি, অতঃপর সেই কন্ঠস্বর বলে চলল,
“আমি আর তুমি অনেক আলাদা, ঠিক যেমন আলাদা আমাদের গোটা দুনিয়া। তোমার আমার মিলন ছিল জগতের একটা ভুল সিদ্ধান্ত। এবার সময় সেই ভুলটাকে সঠিক করার। নিজেদের জীবনে নিজেদের জন্য এগিয়ে যাওয়ার। আই অ্যাম সরি সাবিন, বাট দিস ইয ফর আওয়ার ওউন গুড।”
অভিমান হলো আমার। ভীষণ রকমের অভিমান। জায়দানের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলাম,
“তুমি জানো তো, জানো না জায়দান? আমি দ্বিতীয়বার আর কোনোদিন নিজেকে তোমার পদতলে নামিয়ে আনব না! পারবো না আমি! এই অন্তিম বার আমি তোমার কাছে ভিক্ষার দুহাত বাড়িয়েছি। তুমি নিশ্চিত, আর কখনো আফসোস করবেনা আমার জন্য?”

এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব এলোনা। শুধু নিজের কপালে জায়দানের ঠোঁটের ছোঁয়া পেলাম। মোলায়েম, স্নেহপূর্ণ। অব্যক্ত আবেগের গাঢ় নিবেদন। সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে খেলে গেল আমার।
“গুডবাই মাই ওয়াইফ, ফর বেটার ফিউচার, ফর…”
জায়দান উচ্চারণ করতে পারলনা। কেশে উঠল সামান্য। অশ্রু টলটলে নয়নে আমি বুঝতে পারলাম না ঠিক কি ঘটেছে। এর আগেই আমাকে হিমশীতল প্রবাহে ভাসিয়ে দূরে সরে গেলো জায়দান। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমাকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। ফুঁপিয়ে নীরবে আমি চেয়ে দেখলাম তার দূরে চলে যাওয়া অবয়বখানি।
—মাই ওয়াইফ?

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৪

আমার কানে বাজতে লাগল তার অন্তিম বাক্যটি। চোখের অশ্রু টপটপ করে পরে ফুটপাত ভিজিয়ে তুললো। যেটা জায়দান উচ্চারণ করতে পারেনি, সেটা হয়ত,
গুডবাই মাই ওয়াইফ….ফরএভার।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here