Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৫০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫০

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫০
সুমাইয়া ইসলাম নূর

অফিসের বিশাল মিটিং রুমে তখন পিনপতন নীরবতা।সবাই বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে মিটিং রুমের পরিবেশ ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠল।সবাই নিজেদের সিটে বসে পড়েছে।
বিশাল স্ক্রিনে কোম্পানির বিভিন্ন রিপোর্ট, গ্রাফ আর ফিনান্সিয়াল ডাটা ভেসে উঠছে।
লিখন চৌধুরী টেবিলের উপর রাখা ফাইল বন্ধ করে বললেন তাহলে আজকের মিটিং শুরু করা যাক।
সঙ্গে সঙ্গে পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কোম্পানির ফাইন্যান্স হেড উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
গত তিন মাসে আমাদের ইউরোপিয়ান মার্কেটে ১৮% গ্রোথ হয়েছে। বিশেষ করে লন্ডন, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসে আমাদের প্রোডাক্টের ডিমান্ড আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।স্ক্রিনে বিভিন্ন গ্রাফ দেখানো হলো।তারপর মার্কেটিং হেড বললেন

— নতুন ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের কারণে কোম্পানির অনলাইন এনগেজমেন্ট ৩২% বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে এশিয়ান মার্কেটে আরও আগ্রাসীভাবে কাজ করতে হবে।
একজন সিনিয়র ম্যানেজার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
আমরা যদি আগামী ছয় মাসের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে নতুন শাখা চালু করতে পারি, তাহলে কোম্পানির রেভিনিউ অন্তত ২৫% বাড়বে।
সবার মধ্যে আলোচনা চলতে লাগল।
এদিকে ইনায়া আর পিয়াসা মনোযোগ দিয়ে সব নোট করছে।
হঠাৎ একজন সিনিয়র স্টাফ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন মিস ইনায়া, একটা প্রশ্ন করতে পারি?
ইনায়া আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল—

— অবশ্যই স্যার।লোকটি বললেন
ধরুন আপনি কোম্পানির বিজনেস স্ট্র্যাটেজি টিমে আছেন। একটি প্রোডাক্ট দেশীয় বাজারে খুব সফল।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেমন সাড়া পাচ্ছে না।
সেক্ষেত্রে আপনার প্রথম পদক্ষেপ কী হবে?
পুরো রুমের সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ইনায়ার উপর।
তিয়ার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।সে ভেবেছে হয়তো ইনায়া উত্তর দিতে পারবে না।কিন্তু ইনায়া একটুও বিচলিত হলো না।কয়েক সেকেন্ড ভেবে শান্ত গলায় বললো প্রথমে আমি মার্কেট রিসার্চ করব।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোডাক্টটা কেন সফল হচ্ছে না, সেই কারণ খুঁজে বের করব। সমস্যাটা কি প্রাইসিংয়ে?নাকি মার্কেটিংয়ে?নাকি ভোক্তাদের চাহিদা দেশভেদে ভিন্ন? কারণ কোনো সমস্যার সমাধান করার আগে সমস্যার মূল কারণ জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তারপর আমি স্থানীয় বাজার অনুযায়ী প্রোডাক্ট এবং মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি কাস্টমাইজ করব।
একই কৌশল সব দেশে কাজ করে না। প্রতিটি দেশের সংস্কৃতি, চাহিদা এবং ক্রয়ক্ষমতা আলাদা।
কথা শেষ হতেই কয়েকজন সিনিয়র অফিসার প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে তাকালেন।
লোকটি মুচকি হেসে বললেন—

— Excellent Answer.
তিয়ার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
আর ইউভি?সে চুপচাপ বসে থাকলেও চোখের গভীরে স্পষ্ট গর্ব। মনে মনে বললো বউ টা বিয়াদোব হলে ও বুদ্ধিমান আছে।
ঠিক তখনই লিখন চৌধুরী বললেন ইউভি, এখন তুমি প্রেজেন্টেশন শুরু করো।মুহূর্তেই পুরো রুমের পরিবেশ বদলে গেল।ইউভি ধীরে ধীরে নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।কালো স্যুটে তাকে আজ অন্যরকম লাগছে।গম্ভীর,আত্মবিশ্বাসী,কর্তৃত্বপূর্ণ।
সে স্ক্রিনের সামনে গিয়ে রিমোটটা হাতে নিল।
রুমের সব আলো কিছুটা ম্লান হয়ে গেল।
বড় স্ক্রিনে ভেসে উঠল
“ফিউচার এক্সপ্যানশন স্ট্র্যাটেজি – চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কোম্পানি”
ইউভির গভীর গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে উঠলো
লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন…
বিজনেস ইজ়ন্ট অ্যাবাউট টুডে।
বিজনেস ইজ় অ্যাবাউট প্রিপেয়ারিং ফর টুমরো।
মুহূর্তেই পুরো রুম তার কথার মধ্যে ডুবে গেল।ইউভি
স্ক্রিনে নতুন স্লাইড আনল। আগামী পাঁচ বছরে আমরা শুধু বাংলাদেশ নয়. আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করব। আমাদের লক্ষ্য শুধু লাভ করা নয়। একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্র্যান্ড তৈরি করা একটার পর একটা গ্রাফ।

একটার পর একটা বিশ্লেষণ কোথায় বিনিয়োগ হবে।কোথায় নতুন শাখা খোলা হবে।কোন সেক্টরে কোম্পানি প্রবেশ করবে।সবকিছু এমন নিখুঁতভাবে বুঝিয়ে বলছে যেন পুরো পরিকল্পনাটা তার মাথার ভেতর আগে থেকেই তৈরি।ইনায়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ইউভির দিকে।
তার চোখ বারবার ইউভির দিকে চলে যাচ্ছে।
সে যেন নতুন করে মানুষটাকে দেখছে।
বাড়ির সেই দুষ্টু, রাগী, ইউভি আর এই অফিসের ইউভি সম্পূর্ণ আলাদা।এখানে সে একজন নেতা।
যার কথা সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনে।যার সিদ্ধান্তে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালিত হয়।
পাশ থেকে পিয়াসা আস্তে করে ফিসফিস করে বললো বেবি…
— জামাই বাবুকে আজকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে পিয়াসার হাতে কলম দিয়ে খোঁচা মেরে বলল—
— চুপ নিলজ্জ ওই টা তোর বড় ভাই।
পিয়াসা মুখ চেপে হাসল।
ঠিক তখনই ইউভির কণ্ঠ আবার ভেসে এলো—

— Miss Piyasa Jannat Chowdhury…
— Miss Inaya Noor Chowdhury…
আপনারা দয়া করে সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নোট করে রাখবেন।
হঠাৎ নিজের নাম শুনে দুজনই সোজা হয়ে বসল।
একসাথে ইউভি
একদম পেশাদার ভঙ্গিতে নিজের প্রেজেন্টেশন চালিয়ে যেতে লাগলো।
ইউভির প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পর মিটিং রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বিরাজ করল।
এরপর লিখন চৌধুরী সামনে রাখা ফাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন তাহলে এবার এলএলবি কোম্পানির সাথে আমাদের চলমান প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে নতুন একটি স্লাইড ভেসে উঠল।
“LLB Company & Chowdhury Industry and Company – Strategic Partnership Project”

লিখন চৌধুরী বললেন গত কয়েক মাস ধরে এলএলবি কোম্পানির সাথে আমাদের আলোচনা চলছিল।অবশেষে তারা আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। আর খুব শীঘ্রই দুই কোম্পানির মধ্যে আনুষ্ঠানিক বিজনেস ডিল স্বাক্ষরিত হবে।
কথাটা শুনে উপস্থিত সিনিয়র কর্মকর্তাদের মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল।এরপর এলএলবি কোম্পানির প্রতিনিধি রাইহান চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন আমরা চৌধুরী ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড কোম্পানির সাথে কাজ করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।
বিশেষ করে এই প্রজেক্টের প্রাথমিক সমন্বয় এবং পরিকল্পনায় যারা কাজ করেছেন, তাদের আমরা ধন্যবাদ জানাতে চাই।
এর পর রেদোয়ান দারিয়ে।মৃদু হেসে রাইহান চৌধুরী এবং তিয়ার দিকে তাকালেন। মিস্টার রাইহান চৌধুরী। মিস তিয়া চৌধুরী।আপনাদের অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।আপনাদের পরিকল্পনা এবং প্রজেক্ট বিশ্লেষণ আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।রাইহান চৌধুরী ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বললেন থ্যাংক ইউ।তিয়া মুখে বিনয়ী হাসি রাখলেও ভেতরে ভেতরে বেশ খুশি হয়ে গেল।

তার চোখ একবার ঘুরে গিয়ে ইনায়ার উপর স্থির হলো।
যেন বলতে চাইছে—দেখে নে আমারও গুরুত্ব আছে।”কিন্তু ইনায়া কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
সে শান্তভাবে নিজের নোটবুকে কিছু লিখে চলেছে।
ওদিকে ইউভি, রেদওয়ান, লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী এবং রবিউল চৌধুরী সম্পূর্ণ পেশাদার ভঙ্গিতে পরবর্তী আলোচনায় মন দিলেন।
কারণ তাদের কাছে ব্যক্তিগত জীবন এর চেয়ে কোম্পানির সফলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লিখন চৌধুরী আবার বললেন এই ডিল সম্পন্ন হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে কোম্পানির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই আমাদের প্রত্যেককে আরও দায়িত্বশীল হতে
দীর্ঘ আলোচনা, পরিকল্পনা আর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথাবার্তার পর অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত বিজনেস ডিলটি চূড়ান্ত হলো।
এরপর চুক্তিপত্রগুলো টেবিলের মাঝখানে এনে রাখা হলো।লিখন চৌধুরী চারদিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন এই ডিল শুধু আজকের জন্য নয়।

আগামী দিনের জন্য।ভবিষ্যতে এই প্রজন্মই এই অংশীদারিত্বকে আরও দূরে নিয়ে যাবে।
কথাটা বলে তিনি চুক্তিপত্রটা ইউভির দিকে এগিয়ে দিলেন।মুহূর্তেই পুরো রুমের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ইউভির উপর।ইউভি ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।তারপর কলমটা হাতে নিয়ে শেষবারের মতো পুরো চুক্তিপত্রটা দেখে নিল।গম্ভীর অথচ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে নিজের স্বাক্ষর করে দিল—
ইউভি চৌধুরী।স্বাক্ষর শেষ করে সে কয়েক সেকেন্ড চুক্তিপত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেদওয়ানের দিকে কলমটা বাড়িয়ে দিল।রেদওয়ান কলমটা নিল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে দুই ভাইয়ের চোখে চোখ পড়ল।কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনের ঠোঁটের কোণে একইরকম রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
রুমে উপস্থিত অনেকেই সেই হাসির অর্থ বুঝতে পারল না।রেদওয়ান এরপর নিজের স্বাক্ষর করল—
রেদওয়ান চৌধুরী স্বাক্ষর শেষ হতেই করতালির শব্দ আবার বেজে উঠল।এরপর এলএলবি কোম্পানির পক্ষ থেকে রাইহান চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি চুক্তিপত্র হাতে নিয়ে স্বাক্ষর করলেন।
তারপর কলমটা তিয়া চৌধুরীর হাতে তুলে দিলেন।
তিয়া মুহূর্তের জন্য সবার দিকে তাকাল।
তারপর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে নিজের নাম লিখে দিল—

তিয়া চৌধুরী
শেষ স্বাক্ষর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মিটিং রুম করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।চারজনের সামনে রাখা চুক্তিপত্রগুলো এখন আনুষ্ঠানিকভাবে দুই প্রতিষ্ঠানের নতুন যাত্রার সাক্ষী।
আর দূরে বসে থাকা ইনায়া আর পিয়াসা একে অপরের দিকে তাকাল।
এদিকে ইনায়া সবকিছু নীরবে দেখছিল।
তার চোখ একবার গিয়ে থামল তিয়ার উপর।
পরের মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।মনে মনে বললো আমাকে আঘাত করার জন্য তুমি আরও কী কী করতে পারো…
আমিও দেখতে চাই।খেলা যদি শুরু করে থাকো…
তাহলে শেষটাও দেখে নিও, তিয়া চৌধুরী।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস।
মিটিং শেষ হওয়ার আগেই ইউভি নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।রেদওয়ানও উঠে দাঁড়াল তার সঙ্গে।দুজনেই উপস্থিত সবাইকে সম্মান জানিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বের হওয়ার অনুমতি নিল।
সিনিয়র কর্মকর্তারাও সম্মানসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে।করিডোর দিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রেদওয়ান নিচু গলায় বলল—

—ভাইয়া…শান্ত হও।
ইউভির মুখের গম্ভীর ভাব একটুও বদলাল না।
সে সামনের দিকে তাকিয়েই বলল—
— তুই শান্ত হতে পারছিস, রেদওয়ান?
কথাটা শুনে রেদওয়ান মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেলো
দুই ভাই আর কোনো কথা না বলে সামনে এগিয়ে চলল।আর তাদের পেছনে রয়ে গেল এক অদ্ভুত নীরবতা..যেন সামনে আরও বড় কিছু ঘটার অপেক্ষা করছে।

মিটিং শেষ হওয়ার পরও অফিসের করিডোরে যেন আলোচনা থামার নাম নেই।ইনায়া আর পিয়াসা দুজনেই নিজেদের ফাইল হাতে নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে করিডোর দিয়ে হাঁটছে। মুখে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী ভাব। যেন আশেপাশে কী হচ্ছে, কে তাকিয়ে আছে—এসব নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথাই নেই।আর সেটাই যেন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।করিডোরের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক স্টাফই কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।কেউ ফিসফিস করে বলছে—
ওরাই কি চৌধুরী ভিলার মেয়েরা?দেখতে তো একদম মডেলের মতো! ইনায়া আর পিয়াসা অবশ্য এসবের কিছুই শুনছে না দুজনে হেঁটে চলেছে।
পিয়াসা ফোনে কিছু একটা দেখছে।আর ইনায়া ফাইল উল্টেপাল্টে দেখছে।তাদের ঠিক পেছনেই হাঁটছেন লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী, রাইহান চৌধুরী আর তিয়া চৌধুরী।
কিন্তু মজার বিষয় হলো—
স্টাফদের কারও দৃষ্টি সেদিকে নেই।
সবাই শুধু ইনায়া আর পিয়াসার দিকেই তাকিয়ে আছে।বিষয়টা তিয়ার চোখ এড়াল না।তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলতে লাগল সে।মনে মনে বললো।যেখানেই যায়, সবাই শুধু ওদেরই দেখে কেন ঠিক তখনই লিখন চৌধুরী হালকা করে কাশলেন।
মুহূর্তেই সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
লিখন চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন সবাই নিজের নিজের কাজে মন দাও। অফিসে কাজ করতে এসেছো, গল্প করতে না।সবাই মাথা নিচু করে ফেলল।তিনি আবার বললেন—
আর হ্যাঁ, ওরা চৌধুরী পরিবারের মেয়ে। কিন্তু সেই পরিচয়ের কারণে কেউ বাড়তি গুরুত্ব পাবে না।
আজ থেকে ওরা এই কোম্পানিতে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করবে। ঠিক তোমাদের মতোই শেখার জন্য এসেছে। তাই কেউ অযথা বাড়তি খাতির করবে না।
আর কেউ অবহেলাও করবে না।
কাজের ক্ষেত্রে সবাই সমান।
করিডোর জুড়ে সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর পরিবেশ নেমে এলো।সবাই একসাথে বলল জি স্যার।
লিখন চৌধুরী সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেলেন
বেশ কিছু সময় পর…

অফিসের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে ইনায়া আর পিয়াসা গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেল মন্টু চাচার চায়ের দোকানের সামনে।কিন্তু সেখানে পৌঁছেই দুজনের চোখে পড়ল অদ্ভুত একটা দৃশ্য।মন্টু চাচা তখনও ভাঙা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন।তার চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ছোট্ট দোকানটা আর নেই।চারদিকে ইট, কাঠ, টিন আর ভাঙা বেঞ্চের স্তূপ। ঠিক তখনি ইনায়া আর পিয়াসা হাজির হলো মন্টু চাচার কাছে পিয়াসা ও দূরে দারিয়ে ছিলো সে ও এসে উপস্থিত হলো মন্টু চাচা ওদের কে দেখে তিনি কাঁপা গলায় বললেন—
সব শেষ হয়ে গেল মা…আমার সব শেষ…
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসল।ইনায়া হাততালি দিয়ে বলল— আচ্ছা আচ্ছা, এবার সবাই কাজে লেগে পড়ো! সময় খুব কম! কি অবস্থা দোকান টার
মন্টু চাচা কিছুই বুঝতে পারলেন না।এরপর শুরু হলো আসল কাজ।পুরোনো টিনের দোকানের জায়গায় তৈরি করা হলো আধুনিক ডিজাইনের একটি সুন্দর দোকান।সামনের পুরো অংশ কাঁচ দিয়ে ঘেরা।উপরে কাঠ আর কালো স্টিলের সমন্বয়ে তৈরি আকর্ষণীয় ডিজাইন।দোকানের ভেতরে চকচকে সাদা টাইলস।একপাশে সুন্দর কাঠের কাউন্টার।কাউন্টারের পিছনে বিভিন্ন ফ্লেভারের আইসক্রিম সাজানো বিশাল ফ্রিজার।পাশেই আধুনিক কফি মেশিন।দেয়ালে ঝুলছে উষ্ণ হলুদ আলো।চারপাশে ছোট ছোট টবের গাছ।
বসার জন্য আরামদায়ক কাঠের চেয়ার আর গোল টেবিল।
দেয়ালের একপাশে বড় করে লেখা—

“মন্টু চাচার আড্ডাঘর”
“চায়ের কাপে গল্প, আইসক্রিমে আনন্দ”
সবকিছু এত সুন্দর লাগছে যে দূর থেকে দেখলে ছোটখাটো কোনো ক্যাফে মনে হয়।
সব কাজ শেষ হওয়ার পর ইনায়া নিজের হাতে দোকানের চাবিটা তুলে দিল মন্টু চাচার হাতে।
মন্টু চাচা অবিশ্বাসের চোখে কখনো চাবির দিকে, কখনো দোকানের দিকে তাকাচ্ছেন।
তার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
— মা… এগুলো…
— সব তোমার চা
মন্টু চাচা অবাক হয়ে বললো আমার
পিয়াসা হাসতে হাসতে বললো না, পাশের গ্রামের চেয়ারম্যানের!তুবা সঙ্গে সঙ্গে বললো আরে চাচা, অবশ্যই আপনার! নতুন দোকান, নতুন শুরু!
মন্টু চাচা আবেগে কিছুই বলতে পারলেন না।
শুধু তিনজনের মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে লাগলেন।ঠিক তখনই ইনায়া দুই হাত কোমড়ে রেখে গম্ভীর মুখে বলল আচ্ছা, আবেগী পর্ব শেষ?

এবার কাজে যান।মন্টু চাচা চোখ মুছতে মুছতে বললেন কী কাজ মা?ইনায়া চাবিটা তার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো যান মন্টু চা!তাড়াতাড়ি দোকান খুলুন।
আর আমাদের জন্য গরম গরম তিন কাপ চা নিয়ে আসুন।পিয়াসা হাত তুলে বলল আর তিনটা আইসক্রিম!মন্টু চাচা অবাক হয়ে তিনজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর হঠাৎ করেই হেসে ফেললেন।অনেকদিন পর এমন প্রাণ খুলে হাসলেন তিনি। ঠিক আছে মা! এখনই আনছি!
কয়েক মিনিট পর…নতুন দোকানের সামনে তিনজন পাশাপাশি বসে আছে।এক হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।অন্য হাতে আইসক্রিম।আইসক্রিম চায়ের মধ্যে ডুবিয়ে খেতে খেতে তিনজন হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।আর কাউন্টারের ভেতরে দাঁড়িয়ে মন্টু চাচা তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন।
তার চোখে এখনও জল আছে।
তবে সেই জল আজ কষ্টের নয়…অগাধ সুখের।

রাতের আকাশটা আজ ভীষণ সুন্দর।
চৌধুরী ভিলার বিশাল ছাদ জুড়ে ছড়িয়ে আছে নরম চাঁদের আলো।দূরে শহরের অসংখ্য আলোর ঝলকানি যেন আকাশের তারাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।ছাদের এক কোণে দোলনায় বসে গল্প করছিল ইনায়া আর পিয়াসা।
দুজনের হাতেই কফির মগ।পিয়াসা হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
একটা মেসেজ এসেছে।মেসেজটা পড়ে তার চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল।
মেসেজে লেখা—”বোনু, রুমে যা
পিয়াসা উত্তর দিলো কেন ভাইয়া
-তোর ভাবির সাথে আমার কিছু কথা আছে।
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে টাইপ করল “আচ্ছা ভাইয়া, তুমি আসো। আমি যাচ্ছি।কিন্তু পরের মেসেজটা আসতেই সে প্রায় চিৎকার করে উঠল।
— “আমি এখানেই আছি, বোনু।”
পিয়াসা চোখ বড় বড় করে ফিসফিস করল—
— কিহহহহ!
ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ ভেসে উঠল।

— “বোনু…”
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে তাকাল।
তারপর ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল।
ওহহ…বুঝছি!ইনায়া সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল কী হয়েছে বেবি? এমন ভূত দেখার মতো মুখ করেছিস কেন?পিয়াসা দ্রুত ফোন লুকিয়ে ফেলল।
কিছু না! হঠাৎ মনে পড়েছে একটা কাজ আছে।
আমি নিচে যাচ্ছি।ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
— কোথায় যাচ্ছিস বাল?
তুই বস, আমি আসছি।কথা শেষ করেই প্রায় দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল সে।ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত মেয়ে একটা…
নিশ্চয়ই কিছু লুকাচ্ছে।চারপাশে আবার নীরবতা নেমে এলো।ছাদের উপর এখন একা বসে আছে ইনায়া।হালকা বাতাসে তার লালচে চুলগুলো উড়ছে।সে রেলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল।
হঠাৎ…পেছন থেকে কারও পদশব্দ ভেসে এলো।
ইনায়া ভেবে নিল পিয়াসা ফিরে এসেছে।
তাই না তাকিয়েই বলল—
কী রে বেবি? এত তাড়াতাড়ি ফিরে—
কথা শেষ হওয়ার আগেই…
এক জোড়া শক্ত হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল।
ইনায়া মুহূর্তেই জমে গেল।চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল ভয়ে।সে ছটফট করতে করতে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠল—

— ম্মম…! কে… কে আপনি? ছাড়ুন…!
তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বেড়ে গেল।
আর ঠিক তখনই তার কানের পাশে ভেসে এলো এক পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ—
— এত ভয় পাও কেন, মিসেস চৌধুরী…?
ইনায়ার ভয়ার্ত মুখটা দেখে ইউভির ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
তারপর নিচু গলায় বললো
— খেয়ে ফেলব না, মিসেস চৌধুরী
— আপনি যে আমার ভীষণ শখের… খুব প্রিয় একটা খাবার।
— একবারে খেয়ে ফেলার মতো ভুল আমি করব না।
— আপনাকে তো আমি ধীরে ধীরে উপভোগ করে খেতে চাই। আমি আবার অতটা লোভীও না, কী বলেন?
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে আমতা আমতা করে বললো ক-কখন আসছেন?
ইউভি একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল—
তোমরা ছাদে আসার ঠিক তেতাল্লিশ মিনিট পঞ্চান্ন সেকেন্ড আগে।ইনায়া অবাক হয়ে গেল।
এতক্ষণ ধরে ছিলেন?ইউভি শুধু মুচকি হাসল।
আর সেই হাসিটাই ইনায়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা স্রোত বইয়ে দিল।সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল—
ইনায়া: ইউভি ভাইয়া এইভাবে তাকাবেন না প্লিজ।

ইউভি : কেন মিসেস চৌধুরী?
ইনায়া: কেন জানি না তবে কেমন যেন লাগে।
ইউভি ভ্রু তুলল।
কেমন লাগে, মিসেস চৌধুরী?
কথাটা বলেই সে এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো।ইনায়াও অজান্তেই এক পা এক পা করে পিছোতে লাগল।
ইনায়া: এইদিকে আসছেন কেন?
কী হয়েছে আপনার?
চোখ দুটো এত লাল কেন?
শরীর ঠিক আছে তো?
ইউভি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
মিসেস চৌধুরী… আমি আপনার কে হই?
ইনায়া এক সেকেন্ডও সময় নিল না।
মুখ ফসকে বলে ফেলল—
আমার বালের শেহেজাদা…
কথাটা বের হতেই সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল।

— না মানে…
— আমার শেহেজাদা…
ইউভির চোখে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু ঝিলিক খেলে গেল।
পরের মুহূর্তেই সে ইনায়াকে হেঁচকা টানে নিজের কাছে এনে কোমরে আলতো করে চিমটি কেটে বলল মিসেস চৌধুরী…
— আমার কী আর কোনো পরিচয় আছে?
ইনায়া মুখ ফুলিয়ে বলল—
— আছে তো।
— কী বলো?
— আপনি আমার বড় চাচ্চুর একমাত্র ছেলে।
ইউভি হেসে মাথা নেড়ে বলল—
— আর?
— আর কী, মিস চৌধুরী?
ইনায়া এবার মাথা নিচু করে ফেলল।
ইউভি আরও কাছে ঝুঁকে এল।
— বলো…
— আমি তোমার কী?
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ইনায়া আস্তে করে বলল—
— আপনি…
— আমার হাসব্যান্ড, মিস্টার চৌধুরী।
কথাটা শুনে ইউভির ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।সে আলতো করে ইনায়াকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল।তারপর কপালে খুব নরম করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল—

— গুড…
— আমার বউ।
“আমার বউ” কথাটা শুনে ইনায়া একদম থমকে গেল।
তার হৃদস্পন্দন যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল।
সে মাথা তুলে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল—
আর একবার বলুন না…
ইউভি মুচকি হেসে তার কপালে টোকা দিল।
— আমার বউ।
— আমার বেয়াদব বউ।
— যে আমাকে একটুও কেয়ার করে না।
— সারাদিন শুধু দুষ্টুমি করে বেড়ায়।
— আমাকে খেয়ালই করে না।
— সবসময় তার বাদোর দুইটা বেবি আছে…
তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। একদম বেয়াদব…
ফাজিল বউ একটা।ইনায়া এবার মুখ ফুলিয়ে বলল—
— মিথ্যা কথা! আমি আপনাকে খেয়াল করি না?
ইউভি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—

না। একদম না। আমি সারাদিনে কী খেলাম, না খেলাম… সময়মতো ঘুমালাম কি না…
সেগুলো জানার কোনো আগ্রহই নেই তোমার।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বললো আমি সব খেয়াল করি!
ইউভি মুচকি হেসে বললো তাই নাকি?
তাহলে কাল সকালে আমার কফি তুমি বানাবে।
আর কোনো অজুহাত চলবে না।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল ঠিক আছে।
বানিয়ে দেব। বাট কয় চামচ চিনি দিবো বলে দেন।
ইউভি সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নেড়ে আবার বলল—
— এই তো এই ভাবে খেয়াল রাখো
আমার ভালো বউ।
ইনায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। না মানে এখন থেকে জেনে নিবো
ছাদের উপর বয়ে যাওয়া রাতের নরম বাতাসে দুজনের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।এর পর ইউভি আবার বলল,মিসেস চৌধুরী, দ্রুত চুলের যত্ন নিন। আর হ্যাঁ, আমার দিকেও একটু খেয়াল কইরেন, বড্ড দূরে দূরে থাকছেন।”ইনায়া পাল্টা উত্তর দিল,

— “একটু কাছে টেনে নিয়ে দেখেন দূরে যাওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। “ইউভির বুকে হাত রেখে আকিবুকি করতে করতে ইনায়া বলল,সবার সামনে যতই শক্ত থাকার চেষ্টা করি না কেন, আমি এই আপনি নামক মানুষটার সামনে শক্ত থাকতে পারি না।
ইউ কি কোন দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিলো ভালোবাসি যে, বউ… বড্ড ভালোবাসি তোমাকে।”
ইউভির এমন কথা শুনে ইনায়া যেন থমকে গেল। আর ইনায়া অবাক হয়ে আমতা আমতা করে বলল,
ইউভি ভাইয়া, কী হয়েছে আপনার? এমন লাগছে কেন? ইউভি ইনায়াকে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “তোকে হারাতে চাই না, আদর। আর কতটা যত্ন করলে তোকে কেউ আঘাত করতে পারবে না বল তো? হঠাৎ মাথায় এত বিজনেসের ভূত চাপালি কেন? চারপাশে আমার শত্রুর অভাব ছিল না, তার মধ্যে আবার তোরও এত শত্রু যোগ হয়েছে। ঠিক কোথায় লুকিয়ে রাখব তোকে?”
ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
— “কী হয়েছে বলুন না?”
ইউভি মাথা নেড়ে বলল,

— “তোমার জানা লাগবে না, বউ। তুমি শুধু আমার উপর ফোকাস করো। বাকি সব দেখার জন্য আমি আর তোমার ভাই তো আছিই।”
এরপর ইউভি ইনায়াকে কোলে তুলে নিল।
— “কোথায় যাচ্ছেন?” অবাক হয়ে বলল ইনায়া। “রুমে পড়ে যাব কিন্তু! আপনার সাথে একটু সময় কাটাতে চাই, ইউভি ভাইয়া।”
ইউভি কোনো কথা না বলে ইনায়াকে দোলনায় বসিয়ে দিল। তারপর নিজেও ছাদের মেঝেতে বসে পড়ল। আলতো করে ইনায়ার হাত দুটো নিজের চুলের মাঝে ডুবিয়ে দিয়ে বলল,
— “মিসেস চৌধুরী, শুধু বিজনেস সামলালে হবে না, আমার জীবনটাকেও গুছিয়ে দিতে হবে।”
আকাশের চাঁদের আলো এসে পড়েছে ইনায়ার মুখে। ইউভি মাঝেমাঝে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখছে তাকে।
অন্যদিকে ডাইনিং টেবিলে সবাই খাবারের জন্য উপস্থিত হয়েছে, শুধু ইনায়া, ইউভি আর তিয়া বাদে। তিয়া ফোন দেখতে দেখতে নিচে নামছিল। এমন সময় রেশমা চৌধুরী বললেন,
“তিয়া, মা, ইউভি আর ইনায়াকে একটু ডেকে নিয়ে আসবি?”
ভদ্রতার খাতিরে তিয়া বলল,

বলছি, বড় মা।।কিন্তু মনে মনে হাজারটা গালি দিল সে।ঠিক তখনই পিয়াসা বলল,
— “ওদের রুমে পাবে না। ছাদে আছে।
ফাজিল পিয়াসা এই কথা টা না বললে ও পারতো
যাই হোক গল্পে ফিরি।।
“ইনায়া তখনও ইউভির কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। চারপাশে নীরব রাত, আকাশভরা তারা আর চাঁদের স্নিগ্ধ আলো।
হালকা বাতাসে ইনায়ার চুলগুলো বারবার উড়ে এসে ইউভির মুখে লাগছে। ইউভি আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে ইনায়ার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে তার পরিচিত সুবাসটা অনুভব করল।
এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে রইল সে।
ইনায়া লজ্জায় হালকা কেঁপে উঠে বলল,

— “ইউভি ভাইয়া… কী করছেন?”
ইউভি মৃদু হেসে বলল,
— “তোমার এই পরিচিত গন্ধটা আমার খুব প্রিয়, বউ। সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।”
কথাটা শুনে ইনায়ার গাল লাল হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে ইউভির বুকে হেলান দিল।
অন্যদিকে ছাদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল তিয়া।
দুজনের ভালোবাসা, যত্ন আর একে অপরকে ঘিরে থাকা সেই প্রশান্তি দেখে তার বুকের ভেতরটা হিংসায় জ্বলে উঠল। মুঠো করে ফেলল নিজের হাত।
মনে মনে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

শেহেজাদার আদর পর্ব ৪৯

— “কেন সবসময় ইনায়ার ভাগ্যই এত ভালো হয়?”
আজকের এই অবস্থার জন্য তুমি দায়ী রোবার্ট।
কিন্তু তিয়ার সেই রাগ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজানা ইউভি আর ইনায়া তখন নিজেদের ছোট্ট জগতে হারিয়ে গেছে।
চাঁদের নরম আলোয়, শীতল বাতাসের ছোঁয়ায়, দুজন মানুষ একে অপরের উপস্থিতিতেই খুঁজে নিচ্ছিল শান্তি

শেহেজাদার আদর পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here