Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭১

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭১

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭১
সুমি চৌধুরী

কেটে গেছে দুদিন, আজ শুভ্রার গায়ে হলুদ। সারা বাড়ি জুড়ে উৎসবের আমেজ, চারিদিকে নানা রঙের আলো আর ফুলের সাজসজ্জা। লাউডস্পিকারে বাজছে বিয়ের গান, আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীদের কোলাহলে পুরো চৌধুরী বাড়ি মুখরিত।কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও রিদি যেন নিজের মাঝে নেই। শুভ্রার বিয়ে হয়ে যাচ্ছেএই সত্যিটা সে যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। একটা অজানা আশঙ্কা আর ঘোরের মধ্যে সে সারা বাড়ি জুড়ে একা একা ঘোরাফেরা করছে। শুভ্র সকাল সকালই একটা দরকারি কাজে বাড়ির বাইরে গিয়েছে, তাই রিদির মনটা আরও বেশি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

দুপুর ঠিক ২:০০ টার দিকে রিদি ধীর পায়ে শুভ্রার রুমের সামনে আসে। দরজাটা একটু খোলাই ছিল, সে ভেতরে পা রাখতেই তার চোখ চড়কগাছ! সাউন্ডবক্সের গানের আওয়াজ ছাপিয়ে শুভ্রার রুম থেকে কান্নার শব্দ আসছে। রিদি তাকিয়ে দেখে, শুভ্রা বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।রিদি এক মুহূর্তও দেরি না করে দৌড়ে এসে শুভ্রার পাশে বিছানায় বসল। সে চরম অস্থির হয়ে শুভ্রার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে শুভ্রা? তুই এভাবে কাঁদছিস কেন?”
রিদির চেনা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই শুভ্রা কান্না থামিয়ে বিছানা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার চোখ-মুখ একদম লাল হয়ে গেছে, চোখের কাজল লেপ্টে একাকার। সামনে রিদিকে দেখে সে নিজেকে আর কোনোভাবেই সামলাতে পারল না। এক ঝটকায় রিদিকে জড়িয়ে ধরে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।রিদি এবার অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। যার গায়ে হলুদ, সে এভাবে পাগলের মতো কাঁদছে কেন, কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। সে শুভ্রার পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল,
“কী হয়েছে বলবি তো? তুই এভাবে কাঁদলে আমি কী বুঝব? কী হয়েছে আমায় খুলে বল!”
শুভ্রা রিদির বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই মরিয়া হয়ে বলল,
“আমি এই বিয়ে করতে পারব না রে রিদি! যেভাবে হোক, তুই প্লিজ এই বিয়েটা আটকা! আমি মরে যাব”
শুভ্রার কথা শুনে রিদির মাথায় যেন এক মুহূর্তের জন্য আকাশ ভেঙে পড়ল। সে শুভ্রাকে নিজের থেকে একটু সরিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল।

“মানে? কী বলছিস তুই এসব? আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর তোর গায়ে হলুদ, কাল বিয়ে! এখন এসব কী পাগলামি করছিস?”
শুভ্রা রিদির হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ফেলতে ফেলতে বলল,
“আমি কোনো পাগলামি করছি না, আমি সত্যি বলছি। আমি পারব না অন্য কারো গলায় মালা দিতে। কারণ…”
রিদি এবার গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে শুভ্রার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে শুধাল,
“কারণ কী? স্পষ্ট করে বল!”
শুভ্রা আর কোনো লুকোছাপা করতে পারল না। ভেতরের সব জমানো আর্তনাদ একবারে বের করে দিয়ে সে রিদিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তারপর ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলে উঠল,
“কারণ… কারণ আমি ঈশানকে ভালোবাসি!”

শুভ্রার মুখ থেকে এই চরম সত্যিটা শোনার পর জাস্ট থ হয়ে গেল রিদি। তার মুখের ভাষা যেন নিমেষেই হারিয়ে গেছে, কী বলবে বা কী করা উচিত তার কিছুই সে ভেবে পাচ্ছে না। সে হাবার মতো হা করে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন চোখের সামনে সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য আর অসম্ভব কোনো কিছু দেখেছে।রিদির এই নীরবতা দেখে শুভ্রা তার দুই হাত চেপে ধরে আবার আকুল হয়ে বলল,
“রিদি, তুই তো ভালোবাসার গভীরতা বুঝিস, তুই তো জানিস নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারো জন্য ত্যাগ করা কতটা কঠিন, কতটা যন্ত্রণার! আমি যে আর পারছি না রে। আজ দুদিন ধরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে আমি এখনই মরে যাবো। বুকটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে আমার!”
শুভ্রার এই পাগলামি দেখে রিদি আর চুপ থাকতে পারল না। সে শুভ্রার চোখের জল মোছাতে মোছাতে তার গাল দুটো নিজের দুহাতে শক্ত করে ধরে শাসন করার সুরে বলল।
“শুভ্রা, তুই কি পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিস? তুই নিজের মুখে কী বলছিস, তার জ্ঞান কি তোর আছে? ঈশান হিন্দু! আর তুই একজন মুসলিম হয়ে একটা হিন্দু ছেলেকে ভালোবাসিস? এটা এই সমাজে কোনোদিনও সম্ভব নয় শুভ্রা।”
শুভ্রা রিদির হাত দুটো নিজের গাল থেকে সরিয়ে দিয়ে জেদি অথচ ভাঙা গলায় বলল,
“হিন্দু হয়েছে তো কী হয়েছে? হিন্দুদের কি মন নেই? হিন্দুদের কি ভালোবাসতে নেই? আমি তো ঈশানের ধর্ম দেখে তাকে ভালোবাসিনি , আমি ভালোবেসেছি মানুষ ঈশানকে! আমার এই মন তো কোনো জাত ধর্মের নিয়ম মেনে তার প্রেমে পড়েনি!”

রিদি আর কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না সে শুভ্রাকে কীভাবে বোঝাবে। শুভ্রার ওই জলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, শুভ্রা শুধু ঈশানের প্রতি সামান্য দুর্বল নয়, বরং সে ঈশানের ভালোবাসায় একদম অন্ধ হয়ে গেছে। সে শুভ্রার দুই গাল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আকুল হয়ে আবার বলল।
“শুভ্রা, মানছি ভালোবাসা কোনো জাত-ধর্মের নিয়ম মেনে হয় না। কিন্তু আমাদের ধর্মের বাইরে গিয়ে অন্য ধর্মে ভালোবাসার পূর্ণতা পাওয়াও তো সম্ভব না রে! ঈশান যদি হিন্দু না হতো, তাহলে এই রিদি তোকে প্রমিস করছে আমি নিজে শুভ্র ভাইয়া আর মামাকে সব কিছু খুলে বলতাম। তোর ভালোবাসাকে তোর নিজের করে দেওয়ার জন্য আমি তোর পাশে সবসময় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কিন্তু ঈশান হিন্দু, এই একটা জায়গায় এসে সব কিছু আটকে যাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই সম্ভব না, তুই প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা কর শুভ্রা!”
রিদির এই বাস্তবমুখী কথাগুলো শুভ্রার কানে তীরের মতো বিঁধল। সে তীব্র ক্ষোভে আর যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতেই রিদিকে জোরে একটা ধাক্কা মারল। আচমকা ধাক্কা সামলাতে না পেরে রিদি ছিটকে গিয়ে শক্ত ফ্লোরের ওপর পড়ে গেল। শুভ্রা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লাল লাল চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল।
“চলে যা এখান থেকে তুই! লাগবে না আমার তোর বা অন্য কারো সাহায্য! আমি একাই লড়ব আমার ভালোবাসার জন্য, শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ব। আমি কোনো সমাজ, কোনো নিয়ম-কানুন মানি না। আমার শুধু ঈশানকে চাই! ওর ধর্ম দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই, আমার জীবনে শুধু ওই মানুষটা থাকলেই হবে!”
রিদি ফ্লোরে পড়ে গিয়ে কোমরে বেশ ভালোই চোট পেল, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সে মুখ চেপে ধরে ধীরে ধীরে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। শুভ্রার এই রুদ্রমূর্তি দেখে সে ভয় পেল না, বরং আরও এক বুক মায়া নিয়ে এগিয়ে এসে শুভ্রার ঠিক পাশে বসল। তারপর জোর করে শুভ্রার কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল। শুভ্রা তীব্র অভিমানে আর রাগে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু রিদি এবার আরও শক্ত করে ধরে রেখে নরম গলায় বলল।

“আমি জানি শুভ্রা, ভালোবাসার মানুষকে নিজের হাত থেকে চিরতরে ছেড়ে দেওয়াটা কতটা কষ্টের, কতটা যন্ত্রণার। আমিও চাই না তুই তোর এই পবিত্র ভালোবাসাকে এভাবে ত্যাগ করিস। কিন্তু এই নিষ্ঠুর সমাজটার কথা ভেবে আমার বড্ড ভয় হয়! সমাজটা বড্ড নোংরা, এরা জাত-ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে ছিঁড়ে খায়। তুই বল, আদৌ কি এই সমাজ তোদের এই ভালোবাসা কোনোদিন মেনে নেবে?”
শুভ্রা রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে একগুঁয়ের মতো জেদি গলায় বলল,
“আমি বলেছি না রিদি, আমি কোনো সমাজ মানি না! আমার কিচ্ছু যায় আসে না এই দুনিয়া কী ভাবল!”
রিদি একটু সময় নিয়ে শুভ্রার চোখের দিকে তাকাল, তারপর একটা বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ দিয়ে বলল,
“এক কাজ কর, বিষয়টা শুভ্র ভাইয়াকে বলে দে। যদি শুভ্র ভাইয়া এই পরিস্থিতির কোনো একটা সমাধান করতে পারে।”

‘শুভ্র ভাইয়া’র নামটা শোনামাত্র শুভ্রা যেন এক নিমেষে একদম নরম হয়ে গেল। তার ভেতরের জেদ আর রাগটা ধপ করে নিভে গেল। সে একটা অবুঝ বাচ্চার মতো রিদির দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু গলায় বলল,
“ভাইয়াকে বললে যদি ভাইয়া ভীষণ রাগ করে? যদি আমার ওপর খেপে যায়?”
রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তো আর কী করবি? মামাকে বলবি? তোর কী মনে হয়, মামা এই কথা শুনলে মেনে নেবে? তোকে মেরেই ফেলবে জানলে! নয়তো ঈশানের ওপর গিয়ে চড়াও হবে, ওর সাথে চরম রাগারাগি করবে। তখন পরিস্থিতি আরও হাতের বাইরে চলে যাবে।”
বলেই রিদি বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিল। তারপর শুভ্রার গাল দুটো পরম মমতায় ধরে নরম সুরে বলল,
“আমার কথা শুন শুভ্রা, তুই মাথা ঠাণ্ডা কর। এই পুরো বিষয়টা তুই শুভ্র ভাইয়াকে খুলে বল। যদি তিনি কোনো একটা পথ বের করতে পারেন, একমাত্র তিনিই তোকে এই বিপদ থেকে বাঁচাতে পারবেন।”

দুপুরের কড়া রোদে একদম ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরল শুভ্র। এই মুহূর্তে একটা ঠান্ডা পানির শাওয়ার না নিলে সে যেন বাঁচবেই না। সে রুমে ঢুকেই গায়ের শার্টটা খুলে ওয়াশড্রোবে রাখল, তারপর আলনা থেকে একটা তোয়ালে টেনে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।শুভ্র ওয়াশরুমে যাওয়ার ঠিক পর পরই রুমে প্রবেশ করে রিদি। তার হাত-পা যেন কাঁপছে, মুখটা একদম কাঁচুমাচু। শুভ্র কখন বের হবে আর কীভাবে কথাটা শুরু করবে, সেই চিন্তায় সে ঘরের মধ্যে ছটফট করতে লাগল।প্রায় ২০ মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে শুভ্র বের হয়ে এলো। তার পরনে তখন শুধু কোমরে পেঁচানো একটা সাদা তোয়ালে। মাথার ছোট ছোট চুলগুলো থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে চওড়া বুকে, আর সেই পানির ফোঁটাগুলো তার সুগঠিত শরীর বেয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। শুভ্রকে এই অবস্থায় দেখে রিদি থতমত খেয়ে চট করে নিজের চোখ দুটো অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। শুভ্র রিদিকে রুমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও মুখে কিছু বলল না। সে চুপচাপ আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তোয়ালে দিয়ে নিজের চুল মুছতে লাগল।রিদি কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের ভেতরের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ধীর পায়ে শুভ্রের ঠিক পেছনে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে হালকা কাশি দিয়ে বলল,

“উহুম উহুম শুনছেন?”
শুভ্র আয়নায় রিদির প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে চুল মুছতে মুছতেই শান্ত গলায় বলল,
“হুম।”
রিদি মনে মনে হাজারটা কথা সাজাচ্ছিল, কিন্তু শুভ্রের সামনে আসতেই সব গুলিয়ে গেল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না কোন দিক দিয়ে কথাটা শুরু করবে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কোনো রকমে একটা আমতা আমতা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“কখন এসেছেন?”
শুভ্র চুল মোছা বন্ধ না করেই জবাব দিল,
“২৫ মিনিট আগে।”
“ওহ”
রিদি আর কিছু বলতে পারল না, চুপচাপ বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল।শুভ্র তোয়ালেটা রেখে আলমারি থেকে একটা ক্যাজুয়াল প্যান্ট আর কালো রঙের শার্ট বের করে চটপট পরে ফেলল। তারপর শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করতে করতে আয়নার দিকে তাকিয়ে রিদির চোখের ওপর চোখ রাখল। তার গম্ভীর কন্ঠে এবার একটু নরম সুর এনে বলল,

“কিছু বলবি?”
রিদি এবার আরও বেশি ভড়কে গেল। শুভ্রার এত বড় একটা সত্যি সে হুট করে কীভাবে বলবে? সে আমতা আমতা করে চোখ নামিয়ে বলল।
“না মানে, পরে বলব, এখন না। আপনার চুলগুলো তো এখনো ভিজে আছে।”
শুভ্র রিদির এই অদ্ভুত আচরণ দেখে মনে মনে একটু হাসল। সে রিদির দিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়ে তার সেই চেনা ভুবন ভোলানো হাসিটা দিয়ে বলল,
“শুকিয়ে দে।”
রিদি আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে হেয়ার ড্রায়ার মেশিনটা বের করে আনল। শুভ্র একটা আরামদায়ক চেয়ার টেনে নিয়ে বসল এবং নিজের ফোনটা বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে লাগল।রিদি প্লাগটা বোর্ডে লাগিয়ে শুভ্রের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। সে ড্রায়ারটা চালু করে একহাতে শুভ্রের নরম চুলগুলোর ভেতর নিজের আঙুল গলিয়ে দিল, আর অন্যহাতে মেশিনটা ধরে হালকা গরম বাতাসে চুলগুলো শুকাতে লাগল। শুভ্রের মাথার চুলগুলো ওভাবে ঝাড়তে ঝাড়তে রিদির খুব কাছ থেকে তার চেনা সুবাসটা পাচ্ছে।
হঠাৎ শুভ্র আয়নার দিকে ফোনের ক্যামেরাটা তাক করে ভিডিও অন করে ফেলল। তারপর ভিডিও করতে করতে খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল।

“কত সৌভাগ্যবান পুরুষ আমি রে ভাই,
যার এমন রূপবতী বউয়ের হাতের ছোঁয়া পাই!
বউ আমার পরম আদরে চুল শুকিয়ে দেয়,
এই মধুর মুহূর্ত যদি ভিডিও না করে রাখা হয়।
তবে তো আমার এই রূপালী জীবনটাই বৃথা হয়ে যায়!”
শুভ্রের এই অদ্ভুত কবি কবি ভাব আর রসিকতা দেখে রিদি ড্রায়ারটা একহাতে ধরে অন্যহাতে ভ্রু কুঁচকে আয়নার দিকে তাকাল। শুভ্র আয়নাতেই রিদির দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটা চোখ মারল। শুভ্রের এই রোমান্টিক আর দুষ্টুমিভরা চাহনি দেখে রিদি লজ্জায় আর থাকতে পারল না। সে চট করে চোখ নামিয়ে নিয়ে ড্রায়ারের শব্দের মাঝেই মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,

“অসভ্য একটা!”
শুভ্র রিদির ওমন কিউট রাগ দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। সে সামনের ড্রেসিং টেবিলের ওপর দুই হাত ভর দিয়ে, ফোনের ক্যামেরাটা আরেকটু ভালো করে দুজনের সামনে ধরল। তারপর নিজের ফোনের দিকে তাকিয়ে রিদিকে শুনিয়ে শুনিয়ে হাসতে হাসতে বেশ কায়দা করে গেয়ে উঠল—
“~Kuch soch ke bola hoga tumne~
~Ye pyaar bhi tola hoga tumne~
~Ab na hai toh phir na sahi dilbar~
~Iss dil ko ye samjha liya humne~”
গানটা গাইতে গাইতেই শুভ্র আয়নায় দেখল রিদি মিষ্টি একটা মুখভঙ্গি করে ড্রায়ার চালাচ্ছে। ঠিক তখনই আচমকা শুভ্র তার একটা হাত পেছনের দিকে বাড়িয়ে রিদির হাতটা ধরে টান দিল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাতটা টেনে একদম নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। ফোনের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে গেয়ে উঠল।
“~Isme tera ghata~
~Mera kuch nahi jata~
~Zyada pyaar ho jata~
~Toh main seh nahi pata~”

শুভ্রের এমন হুট করে হাত টেনে বুকে নেওয়া আর গানের লাইন শুনে রিদি লজ্জায় আর রাগে একদম লাল হয়ে গেল। হাতটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল। মুখটা ফুলিয়ে ধড়ফড় করে ড্রায়ারটা অন করে বিড়বিড় করতে করতে শুভ্রের চুল শুকাতে লাগল, আয়নায় রিদির এই মিষ্টি রাগী মুখটা দেখে ফোনের ভিডিওটা বন্ধ করতে করতে মনের আনন্দে হেসে চলল শুভ্র।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে শুভ্রা এসে হাজির হলো। রিদি ততক্ষণে শুভ্রের চুলগুলো ভালোমতো শুকিয়ে দিয়ে হেয়ার ড্রায়ারটা ড্রয়ারের ভেতরে গুছিয়ে রেখে দিয়েছে। শুভ্র তখনো চুপচাপ চেয়ারে বসে আপনমনে ফোনে স্ক্রল করে যাচ্ছে।
দরজার কাছে শুভ্রাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিদি চোখের ইশারায় তাকে ভেতরে ডাকল। শুভ্রা ভয়ে ভয়ে টিপটিপ পায়ে এগিয়ে এসে একদম শুভ্রের চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল। রিদি পাশ থেকে হাত নেড়ে ইশারায় বলল,
“এবার বলেই ফেল।” কিন্তু শুভ্রার হাত-পা তখন ভয়ে কাঁপছে। রিদি তখন চোখের পলকে আর ইশারায় শুভ্রাকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝাল, “আরে ভয় পাচ্ছিস কেন? কিছু হবে না, আমি তো আছি তোর পাশে।”
অনেক কষ্টে শুভ্রা নিজেকে কোনো রকমে শক্ত করল। তারপর মাথাটা একদম নিচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“ভাইয়া… একটা কথা বলার ছিল?”
শুভ্রার গলার আওয়াজ আর ভয়ার্ত সুরটা শুনে শুভ্র ফোনের স্ক্রিন থেকে এক পলক শুভ্রার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চেনা ধারালো চাউনি দেখে শুভ্রা আরও কুঁকড়ে গেল। শুভ্র ফের ফোনের স্ক্রিনে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ক্যাজুয়াল গলায় বলল,

“হুম, বল?”
শুভ্রা এবার সত্যি সত্যি তোতলাতে লাগল,
“ভাইয়া… আমি… আমি… আসলে…”
শুভ্র ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,
“তোতলাচ্ছিস কেন এত? কী বলবি একদম স্পষ্ট করে বল।”
শুভ্রা এবার সব ভয় আর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে শেষবারের মতো সাহস সঞ্চয় করল। সে শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল, তারপর বুক ভরে একটা বড় শ্বাস নিয়ে এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে বলে দিল,
“ভাইয়া, আমি ঈশানকে ভালোবাসি!”
কথাটা বলেই শুভ্রা চট করে নিজের গালে হাত দিয়ে ফেলল। তার মনে হলো—এই বুঝি তার রাগী ভাইয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে ঠুসঠাস করে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দেবে তার গালে! কিন্তু তাকে আকাশ থেকে ফেলে দিয়ে শুভ্র ফোনের স্ক্রিনে একইভাবে চোখ রেখে একদম শান্ত, নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“তারপর?”
শুভ্রর এমন অদ্ভুত রকমের শান্ত কণ্ঠস্বর শুনে শুভ্রা যেন ভেতরে ভেতরে একটু সাহস খুঁজে পেল। সে এবার চোখের পাতা মেলে বলল,

“ঈশানকে ছাড়া আমি বাঁচব না।”
শুভ্র আগের মতোই ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তারপর?”
“ঈশানকে ছাড়া আমি আর কাউকেই বিয়ে করব না।”
“হুম, তারপর?”
শুভ্রা এবার আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে হাত পা নেড়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী তারপর তারপর করছ ভাইয়া? আমি কি এখানে তোমার সাথে কোনো ইয়ার্কি করছি? আমি কোনো মজা করছি না! আমি সত্যি সত্যিই ঈশানকে ভালোবাসি। আই লাভ ঈশান!”
এবার শুভ্র ফোনটা লক করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর চোখ তুলে সোজা শুভ্রার চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এডিয়ট! আমি কখন বললাম তুই মজা করছিস? আমি তো খুব মন দিয়েই শুনছি তোর এই মহান প্রেম কাহিনী।”
শুভ্রর এই অতিমানবীয় শান্ত রূপ দেখে শুভ্রার মনটা আরও খচখচ করে উঠল। তার মনে হলো ঝড়ের আগের আকাশ যেমন থমথমে থাকে, তার ভাইয়াও ঠিক তেমনি কথা পেটানোর জন্য অর্থাৎ ভেতরের সব খবর বের করার জন্য এভাবে শান্ত সেজে নাটক করছে! সব কিছু জানা শেষ হলেই সে একদম রক্তচোষা বাঘের মতো গর্জে উঠবে। এই ভেবে শুভ্রা প্রচণ্ড মন খারাপ করে মুখটা গোমড়া করে একদম চুপ হয়ে গেল, আর একটা শব্দও তার মুখ থেকে বের হলো না।
শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,

“ঈশান হিন্দু।”
ভাইয়ার মুখে এই কথাটা শুনে শুভ্রা ভেতরে ভেতরে চরম কেঁপে উঠল। কিন্তু সে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়ল না। মাথা নিচু রেখেই খুব দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তাতে কোনো সমস্যা নেই আমার। ঈশান তার ধর্ম পালন করবে, আর আমি আমার ধর্ম পালন করব। কারণ প্রতিটা মানুষের কাছেই তার নিজের ধর্ম সম্মানের। তাই আমি চাই না আমরা কেউ কারো জন্য নিজের ধর্ম চেঞ্জ করি।”
শুভ্র চোখের পলক না ফেলে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“সমাজ মানবে না।”
শুভ্রা এবার মুখ তুলে একদম সোজাসুজি তাকিয়ে বলল, “পরোয়া করি না!”
শুভ্র এক ভ্রু উঁচিয়ে আবার শুধাল,
“আর ইউ শিওর?”

“হাজার বার শিওর! ঈশানের হাত ধরে এই সমাজ কেন, পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করতে রাজি আছি আমি।”
শুভ্র এবার একটা বাঁকা হাসি দিল। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল,
“এত যে বড় বড় বয়ান দিচ্ছিস, ঈশান কি জানে যে তুই ওকে ভালোবাসিস?”
এই একটা প্রশ্নে মুহূর্তের মধ্যে শুভ্রার সেই আকাশচুম্বী সাহস যেন ধপ করে মাটিতে আছড়ে পড়ল। তার মুখটা একদম নিচু হয়ে এলো, গাল দুটো লজ্জায় আর সংকোচে লাল হয়ে গেল। সে চিবুকটা বুকের সাথে ঠেকিয়ে একদম আলতো করে ‘না’ সূচক মাথা নাড়াল।শুভ্র চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বেশ শান্ত গলায় বলল।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭০

“একটা সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্কে দুজনেরই মন থাকতে হয়, বুঝলি? আগে ঈশানের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বল যে তুই ওকে ভালোবাসিস, তারপর ওর মন থেকে জেনে নে সে তোকে ভালোবাসে কি না। তারপর এসে আমার সামনে এসব বড় বড় বয়ান দিস। এডিয়ট একটা।”
কথাটা শেষ করেই শুভ্র হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল, আর শুভ্রা ও রিদি দুজনই একদম বোকা বনে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here