Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১ (২)
jannatul firdaus mithila

“ আমি একচ্ছত্র আধিপত্যে বিশ্বাসী বান্দীর মেয়ে। যার ওপর একবার আমার নজর পড়বে , সে আমৃত্যু শুধু আমারই অধীনস্হ থাকতে বাধ্য! তার ওপর সকল অধিকার কেবল আমার হবে। ইভেন নো ওয়ান ক্যান ডেয়ার টু লুক অন দ্যাম। তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস বান্দীর মেয়ে — তুই আমার শিকার! তোর ধ্যান- জ্ঞান সবটায় কেবল আমার, এই শ্যাডো মনস্টারের আধিপত্য থাকবে। থাকবে মানে থাকবেই! সেটা তুই চাস বা না চাস, আই ডোন্ট কেয়ার! তোর দৃষ্টিতে আমি বাদে অন্য যেকোনো কিছু প্রাধান্য পেলে তার অস্তিত্ব আমি এভাবেই মিটিয়ে ফেলব! ধ্বংস করে ফেলব সবকিছু। জাস্ট মার্ক মা’ই ওয়ার্ডস বান্দীর মেয়ে!”

থামল রূঢ় মানবের কর্কশ কন্ঠ! পাদু’টোর গতি এখনো সচল তার। রুক্ষ পায়ের শক্ত পাটাতনে নির্বিকারে দেবে যাচ্ছে একের পর এক তীক্ষ্ণ সীসার টুকরো। যুবকের মুখাবয়বে সে-কি আধিপত্য বিস্তারের আগুন! সপ্তদশী ভড়কায় ভীষণ। হরিণী চোখদুটোয় নামিয়েছে এক পশলা বৃষ্টি। ক্ষুদ্রকায় দেহখানি কাঁপছে তার, পাদু’টো জমে গিয়েছে বরফের ন্যায়। ভঙ্গুর হৃদয়ের সপ্তদশী তখন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কেবল আওড়াল,
“ আমি কোনো খেলনা নই মিঃ বিস্ট, যার ওপর কেবল আপনারই আধিপত্য থাকবে। না আমি কোনো পুতুল, যে কি-না শুধুমাত্র আপনার ইশারায় ওঠবস করবে। আমি একজন রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তাই কান খুলে শুনে রাখুন — আপনার মতো বিস্টের বাধ্য হতে আমি মোটেও বাধ্য নই।”

সহসা মাথাভর্তি উত্তপ্ত আগুনে এক কৌটো ঘি পড়ল মাফিয়া মনস্টারের। শক্ত মুখখানায় লেপ্টে গেল দু’ধাপ বাড়তি আগুন। কঠোর হলো দৃঢ় চোয়াল! দাঁতকপাটির একে-অপরের রুষ্ট চাপায় শব্দ হচ্ছে কটমট। বাদামী চোখদুটো রঙ ধরেছে ক্রুরতার। যুবক তক্ষুনি ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে আচানক হিং স্র থাবায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠা! হাতে সে-কি জোর রূঢ় মানবের! জোরের তালে উঁচিয়ে দিচ্ছে সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদনখানি। মার্বেলের শীতল মেঝে হতে ক্রমশ আলগা হচ্ছে সপ্তদশীর নরম পদযুগল। দেহখানি ভাব ধরেছে দোদুল্যমান! কন্ঠায় চাপ বেড়েছে বহুগুণ। মাহি কাশছে! অনবরত পা ছোটাচ্ছে এদিক-ওদিক। দু’হাতে ঠেলে দিচ্ছে রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত রুক্ষ হাতের মুঠো। অথচ বালাইষাট! ওমন পাহাড়সম বলিষ্ঠবান একটা মানুষের জোরের সঙ্গে তার মতো একটা চুনোপুঁটি আদৌও পারে? রূঢ় মানব কটমট করছে দাঁত!দোদুল্যমান সপ্তদশীর পানে ক্রুর দৃষ্টিযুগল নিষ্পলক ভঙ্গিতে আঁটকে রেখে হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,

“ শুধু তুই কেনো বান্দীর মেয়ে? তোর চৌদ্দগোষ্ঠীসহ আমার বাধ্য হতে বাধ্য। ডু ইউ্য গ্যাট মি?”
নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে মাহি’র। ছুটন্ত পদযুগল তার, দূর্বল হচ্ছে ক্রমশ! ক্ষুদ্র মুখখানায় জমে গিয়েছে র-ক্ত। হরিণা চোখদুটো যেন এক্ষুণি বেরিয়ে আসবে কোটর ছেড়ে। নির্দয় মানবের মন গলল কি-না কে জানে! সে কেমন আচমকা হাতের বাঁধন ঢিলে করল। সহসা সপ্তদশীর দোদুল্যমান ক্ষুদ্র বদনখানি ছিটকে পড়ল মেঝেতে। হুট করে নিশ্বাস নিতে পারার স্বস্তিতে পা গ লের ন্যায় হাঁপাচ্ছে মাহি। একহাতে কন্ঠা আঁকড়ে, মুখ হা করে বাতাস টানছে ফুসফুস ভরে। সপ্তদশীর বেগতিক দশা। রূঢ় মানব কেমন সংকুচিত দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার পানে। সপ্তদশীর নরম তুলতুলে পদযুগল হতে খানিকটা দূরে অসংখ্য ভাঙা সীসার টুকরো। ক্ষুদ্র বদনের তাল সামান্য নড়লেই নরম তুলতুলে পায়ের ত্বকে রুষ্টতার স্পর্শে বিঁধে যাবে তীক্ষ্ণ টুকরোগুলো। নির্দয় মানব দাঁত কিড়মিড় করছে তখনো। শক্ত মুখাবয়বে ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে ক্রুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বেহাল অবস্থায় ডুবে থাকা ফ্লোরের পানে। অদূরেই এলোমেলো ভঙ্গিতে পড়ে আছে সপ্তদশীর জুতোজোড়া। নির্দয় মানব গম্ভীর মুখে পা বাড়ায় সেথায়। কাঁচের টুকরো গুলোর ওপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটে হেঁটে অবশেষে জুতোজোড়ার সম্মুখে এসে, ডান পায়ের রুষ্ট আঘাতে নির্জীব জুতোজোড়াকে একটানে ঠেলে দেয় সপ্তদশীর নিকট। এদিকে এখনো কন্ঠা আঁকড়ে হাঁপাচ্ছে মাহি, চোখদুটো নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু। নিজেকে সামালানোর প্রয়াসে মত্ত থাকা সপ্তদশী, হুট করে পায়ের সন্নিকটে কিছু একটা ছিটকে আসায় মনোযোগ টানল সেথায়। ঘাড়ের পেশি সামান্য কুঁচকে নজর নামালো পায়ের কাছে। ওমনি তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো রূঢ় মানবের গম্ভীর অথচ চিড়বিড় করা রুষ্ট কন্ঠ,

“ এগুলো সাজিয়ে রাখার জন্য দেয়া হয়নি তোকে বান্দীর মেয়ে। বাই দ্য হেল, কাঁচের ওপর একবার পা পড়লে, সে-ই পা কিন্তু ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলব আমি।”
সহসা আঁতকে উঠে মাহি। তড়িঘড়ি করে দোদুল্যমান ক্ষুদ্র দেহটা সামান্য নাড়িয়ে চাড়িয়ে পাদু’টো আলগোছে ঢোকালো জুতোজোড়ার মধ্যিখানে। নাকের পাটা বড্ড ফুলেছে তার। চোখদুটোয় লেপ্টেছে লালাভ আবরণ। চার হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব হিসহিসিয়ে যাচ্ছে একাধারে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নতমুখী সপ্তদশীর পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কটমট কন্ঠে আওড়াল,
“ আজ যা যা বললাম, সবটা ঘটে ঢুকিয়ে নে বান্দীর মেয়ে। নেক্সট টাইম আমার অবাধ্য হবার চেষ্টা করে দেখিস শুধু, প্যালেসের ছাঁদ থেকে এক লাথি দিয়ে নিচে ছুঁড়ে ফেলব। মাইন্ড ইট জানোয়ারের বাচ্চা।”
নাক টানছে মাহি। যুবকের এহেন বেয়াদবি কথায় কুঁচকেছে তার মুখ। চিরায়ত স্বভাবের বশিভূত হতে খুব একটা সময় লাগেনি বোকা মানবীর। ফের ঘাড়ত্যাড়ামির সুরে কাঠকাঠ কন্ঠে আওড়াল,
“ কেনো? কোন জায়গার তিসমার খাঁ আপনি? যার কথা আমার মানতেই হবে! রাশিয়ার একজন সো-কলড ক্ষমতাবান হয়েছেন বলে মাথা কিনে নিয়েছেন আমার? আপনি আমার এমন কে, যার প্রতি আমার বাধ্যতা প্রকাশ করতে হবে?”

তক্ষুনি সুদর্শনের কপালের চামড়ায় দেখা গেল রাগের ছাপ। ললাটপটের রগগুলো ফুলে উঠেছে দপদপ করে। চোয়াল হলো শক্ত! মাফিয়া মনস্টার নামক ক্ষ্যাপাটে ষাঁড় ক্ষেপেছে ফের। সে তৎক্ষনাৎ জোরালো পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মাহি’র সন্নিকটে। অতঃপর নিজ রুক্ষ হাতের হিং স্র থাবায় আচানক পিষ্ট করল সপ্তদশীর নরম তুলতুলে বাম গালটা। এহেন জোরালো চাপড়ের তাল সামলাতে না পেরে মুহুর্তেই গাল বাকিয়ে হেলে পড়ে বেচারি। তার দৃষ্টি হয়েছে ঝাপ্সা! মাথাটা ঘুরছে ভনভন করে। গালটা যা জ্বলছে না! এদিকে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবের রাগ বাড়ছে তরতর করে। মাথার তালুতে জ্বলছে আগুন! রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব তক্ষুনি বগল থাবায় চেপে ধরে সপ্তদশীর নরম ঘাড়। সেথায় নিজ রুক্ষ হাতের চাপ বাড়িয়ে আচানক উঁচিয়ে তোলে মাহি’র ক্ষুদ্র মুখখানা। সপ্তদশী কুঁচকে রেখেছে দু-চোখ। তার নরম ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান একটুখানি লোহু। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই থমকায় রূঢ় মানব। এক অদ্ভুত ঝংকারে কেঁপে ওঠে তার পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহখানা। হাতের বাঁধনে নামল প্রশমণ! যুবকের এক আকাশসম রাগভর্তী মুখাবয়বে তক্ষুনি নামল উদ্বিগ্নতার ভার। সে কেমন অদ্ভুতভাবে বিচলিত হলো সপ্তদশীর লোহু দেখে। বুকটা কাঁপছে তার। আশ্চর্য! তার মতো নির্দয় মানবের হুটহাট বুক কাঁপার তো কথা না। তবে এখন কেন কাঁপছে? যুবক অস্থির! তক্ষুনি মাহি’র ঘাড় ছেড়ে দিয়ে তর্জনী ছোঁয়ালো মেয়েটার নরম ঠোঁটের কোণে। সেথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে লোহুটুকু মুছতে ব্যস্ত রূঢ় মানব। মুখে রা নেই তার! চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটেছে অপরাধীত্ব। সপ্তদশী হতবাক তার এহেন কান্ডে। হতবাক কন্ঠ ফুঁড়ে কিছু বলতেই যাবে ওমনি শোনা গেল রূঢ় মানবের অতি শান্ত অথচ নিরেট কন্ঠ!

“ আমি যে তোর কে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তোর মতো অবোধের গোটা একটা জনম লেগে যাবে বান্দীর মেয়ে! তবুও আমি নিশ্চিত জনম ফুরালে তুই বলবি — আপনি আমার কে?”
অবোধের ছাপ ফুটল মাহি’র মুখাবয়বে। সেই সঙ্গে মনের কোণে জন্মালো একরাশ ঘৃণা! ছলছল চোখদুটো আরেকবার দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা পুরো ঘরময় পরিক্রমা চালাতেই বুকটা কেমন ভার হয়ে গেল মানবীর। এক অদৃশ্য দহনে পুড়তে লাগল হৃদয়টা। মুখভঙ্গিতে একরাশ ঘৃণা ফুটিয়ে, সপ্তদশী তক্ষুনি দু’হাতে ঠেলে দিলো রূঢ় মানবের প্রশস্ত বুক। ঘটনার আকস্মিকতায় এক-কদম সরে গেল রূঢ় মানব। মুখাবয়বে ফোটালো হতভম্বতার ছাপ। মাহি কাঁদছে এবার। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে মায়াবিনী। প্রিয় শখকে নিজ চোখের সম্মুখে ধূলিসাৎ হতে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। সে কেমন চিৎকার দিয়ে রূঢ় মানবকে বলে বসল,
“ আপনার মনে কি একটুও মায়া নেই বিস্ট? একবারও আপনার হাত কাঁপল না এসব করতে? বইগুলো কি এমন ক্ষতি করেছিল আপনার? ওরা তো বোবা, প্রাণহীন! বই তো কারো শত্রু হতে পারে না। আপনি ওদের না পুড়িয়ে অন্য কোথাও রেখে দিতেন, অন্তত ওরা অক্ষত থাকত কিন্তু নাহ! আপনি তো নির্দয়। সবসময় নিজের পাষাণ কর্মকাণ্ড না দেখালে আপনার চলে না তাই না? আর কতভাবে ভাঙবেন আমায়? ঠিক আর কতভাবে? আমার শখ, সুখ, শান্তি সব কেঁড়ে নিয়েছেন আপনি। আর কি কি কেঁড়ে নেয়া বাকি আছে আপনার? আই জাস্ট কান্ট ইমেজিন, একটা মানুষ এতো খারাপ কি করে হয়?”

মুখ ফসকে কথাটা বের হবার পরমুহূর্তেই হিং স্র মনস্টারের আগ্রাসী থাবা এসে আচানক আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর রাজহংসীর ন্যায় সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠা! হাতের জোরে বেচারিকে ঠেলে নিয়ে গেল পেছনের দেয়ালের কাছে। সপ্তদশীর শীরঁদাড়া দেয়াল ছুঁয়েছে, মনস্টারের হাতের জোরে মাথা ঠেকেছে পেছনে। তবে কান্ড দেখো! মাহি মোটেও ভড়কায়নি এবার। উল্টো অগ্নিদৃষ্টে ঠায় তাকিয়ে রইল রূঢ় মানবের কটমট দৃষ্টিতে। মুগ্ধ সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে। কন্ঠে ছুঁড়েছে বিকট হুংকার! বাহাতে সপ্তদশীর কন্ঠা চেপে রেখে, ডানহাতের রুক্ষ মুঠোর একের পর এক শক্তপোক্ত পাঞ্চ বসাচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি’র ঠিক পাশের দেয়ালে। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মানব, যার জোরালো পাঞ্চের আঘাতে থেঁতলে যাচ্ছে তারই রুক্ষ হাতের চামড়া। ফিনকি দিয়ে বেরুচ্ছে লোহু। অথচ নির্দয় মানব কেমন হিং স্র কন্ঠে গর্জন তুলে আওড়াল,

“ আই নো আমি খারাপ! ভীষণ খারাপ। আই নো আ’ম আ ব্লা’ডি বিস্ট। বাট দিস ইজ আ ফা’কিং ট্রুথ দ্যাট ইউ্য আর দ্য অনলি বিউটি হু বিলংস টু মি। নো ওয়ান ক্যান ডেয়ার টু টাচ ইউ্য, নট ইভেন সামওয়ান ক্যান ডেয়ার টু লুক এট ইউ! এন্ড ইউ্য নো হোয়াট? ইভেন তুইও তাকাতে পারবিনা কারোর দিকে। আমি ছাড়া তোর ঐ দৃষ্টিতে যা যা উঠবে, হোক সেটা মানুষ কিংবা কোনো জড়বস্তু, তাদের এভাবেই ধ্বংস করে ফেলব আমি। আই রিপিট, পুরো দুনিয়া থেকে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মিটিয়ে ফেলব আমি। ডু ইউ্য গেট দ্যাট বি’চ?”
সপ্তদশীর চোখেমুখে হতবাকতার ছাপ স্পষ্ট। যুবকের এহেন আগ্রাসী কন্ঠের আধিপত্যের ঘোষণা বোধহয় কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে তার সর্বাঙ্গে। মাহি তক্ষুনি চোখ খিচঁল। রুক্ষ দাঁতের রুষ্ট স্পর্শ নিম্নাংশের নরম তুলতুলে অধরখানায় বসাতেই আচানক টের পেল — তার ওষ্ঠপুটে আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে দুটো সিক্ত আঙুল। চট করে চোখ খুলল মাহি। সম্মুখে তাকাতেই ভড়কায় সে। বিস্ময়ে চোখ ছুঁয়েছে কপাল। রূঢ় মানব কেমন কপাল গুছিয়ে তাকিয়ে আছে তার পানে। লোকটার চোখেমুখে বিরাট অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট। থেঁতলে যাওয়া হাতখানার দু’টো আঙুল কেমন রুষ্টতার সঙ্গে স্পর্শ করেছে সপ্তদশীর ঠোঁট। কন্ঠে একরাশ বিরক্তি লেপ্টে যুবক কেমন কটমটিয়ে বলে ওঠে,

“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে এ্যাই! খবরদার এই কাজ আর কোনোদিন করবিনা। নাহলে একদম টেনে ছিড়েঁ ফেলব কিন্তু! আমি আমার অধিকারে অন্য কারো হস্তক্ষেপ সহ্য করতে পারিনা তুই জানিস না?”
বোকা মেয়ে কেবল হা করে চেয়ে আছে সম্মুখে। কন্ঠে নেমেছে বাকরূদ্ধতা। ওদিকে মুগ্ধ কেমন হিংসাত্মক মনোভাবে আলগোছে সপ্তদশীর রুষ্ট দাতেঁর চাপা থেকে ঠোঁটখানা আলগা করল। অতঃপর হতভম্বতায় ডুবে থাকা মাহি’র পানে একপলক খেয়ে ফেলার মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তক্ষুনি পা ঘোরালো উল্টোপথে। গটগটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মাফিয়া বিস্ট। একটিবার ঘাড় বাকিয়ে তাকালেনও না পেছনে। তাকালে হয়তো ঠিক দেখতে পেতেন — একজোড়া সন্দিগ্ধ দৃষ্টি কেমন নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার পানে।
মাহি নজর ঝোঁকায়নি। মাফিয়া বিস্ট অক্ষিপুটের আড়াল হতেই তার কাঁপা কাঁপা হাতখানা অজান্তে উঠে এলো সিক্ত অধরজোড়ার পানে। সেথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে আঙুল ক’টা দৃষ্টিপটের সম্মুখে এনে দাড়ঁ করাতেই দেখল— তার আঙুলের ডগা লেপ্টে গিয়েছে মাফিয়া বিস্টের তাজা লহুতে। তক্ষুনি কপাল গোছায় মাহি। বুকভর্তি রাগে-ঘৃণায় হাতের উল্টোপিঠে অনবরত ডলতে থাকে নিজ অধরযুগল। মুছতে থাকে — মাফিয়া বিস্টের ঘৃণিত ছোঁয়াচে লোহু!

মুগ্ধের ধুপধাপ পায়ের জোরালো শব্দে মুখরিত নিরব করিডর। বেপরোয়া ছন্নছাড়া যুবকের প্রতিটি কদমে লেপ্টে আছে তাজা লহুর ছাপ। থেঁতলে যাওয়া হাতখানা থেকে ফোটাঁয় ফোটাঁয় চুইয়ে পড়ছে লহু। যুবক নির্বিকার! ব্যথার লেশমাত্রও নেই তার মুখাবয়বে। চোয়াল ফুটে আছে ব্লেডের ন্যায়। তিনতলার করিডর পেরিয়ে এলিভেটরের পানে এগোতেই হঠাৎ মুগ্ধের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে আটকালো — অদূরে মাথানত করে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মেইডের পানে। তাদের সম্মুখে খাবার ট্রলি। বেচারি দু’টো মনস্টারের ভয়ে কাঁপছে রীতিমতো। মুগ্ধ দাঁড়ায় একমুহূর্ত। কপালের চামড়া গুটিয়ে কন্ঠে রূঢ়ভাব ঢেলে গর্জন তুলে শুধালো,
“ খাবার এনেছিস কার জন্য?”
শুকনো ফাঁকা ঢোক গিললেন মেইড দু’জন। নতমুখে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টে মেঝেতে নজর বুলালেন বারকয়েক। এরইমধ্যে ফের কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের হুংকার,
“ কথা কানে যায়নি তোদের? ম’রতে ইচ্ছে করছে খুব?”
আঁতকে ওঠেন মেইড দু’জন। তড়িঘড়ি করে মাঝে থেকে একজন বলে বসলেন,

“ মে-মে-মেয়েটার জন্য!”
তৎক্ষনাৎ কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো রূঢ় মানবের। নাকের পাটা ফুললো ভীষণ। তিতিবিরক্ত মেজাজে সে কেমন হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,
“ নিয়ে যা সব! দিতে হবে না ঐ বান্দীর মেয়েকে খাবার। খেয়ে খেয়ে গলায় তেজ বাড়াবে, আর গলাবাজি করবে আমার সাথে! বেয়াদবের বাচ্চা একটা। নিয়ে যা সব।”
মনস্টারের হুকুম তামিল করতে মরিয়া মেইড দু’জন। তক্ষুনি খাবার ট্রলির কাঁধ ধরে, লেজ গুটিয়ে পালালেন উল্টো পথে। মুগ্ধ মহাশয় তখনো গজগজ করছেন। এলিভেটরে পা রেখে সুইচ টিপতে টিপতে বিড়বিড়িয়ে বললেন,
“ ঘাড়ত্যাড়ার ঘরে ঘাড়ত্যাড়া একটা! শিক্ষা-দীক্ষার কতো অভাব। নিজের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী মুরুব্বির সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটাও জানেনা, অসভ্য মেয়েছেলে কোথাকার!”
রাগের বশে কথাটা জিভ খসে বেরিয়েছে সেকেন্ড ত্রিশেক হবে বোধহয়, ওমনি মহাশয়ের টনক নড়ল বুঝি। তৎক্ষনাৎ কুঁচকান দৃষ্টে সম্মুখের কাচেঁর দরজায় নিজ প্রতিবিম্বকে আপাদমস্তক পরোখ করে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ হোয়াট দ্য ফা’ক আ’ম সেয়িং? হু ইজ মুরুব্বি? মুরুব্বি হবে ঐ বান্দীর মেয়ে’র বাপ, ভাই, দুশমন! আমার মতো হ্যান্ডসাম কোন দুঃখে মুরুব্বি হতে যাবে? হুহ্!”

তীব্র ঘূর্ণনে ঘুরছে হেলিকপ্টারের পাখা, তুলছে বিকট গর্জন! হেলিপ্যাড হতে বেশ কয়েক হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন এলেক্স এবং এডউইন। দু-গম্ভীর পুরুষ তাকিয়ে আছে একে-অপরের বিপরীত, করছে মনস্তারের আগমনের অপেক্ষা। সাউথ কোরিয়ার উদ্দেশ্যে মনস্টারের রওয়ানা হবার কথা ছিল আরও ঘন্টা দুয়েক আগে, অথচ মনস্টারের এখনো কোনো খোঁজ নেই। গম্ভীর মুখো এডউইন কব্জি উল্টায় এবার। ঘড়ির কাঁটার পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই পেছন থেকে ভেসে এলো দু’জন গার্ডের ত্রস্ত কন্ঠ!
“ মনস্তার ইজ কামিং এভরিওয়ান। পুট ইউ্যর হেড’স ডাউন।”

তৎক্ষনাৎ ঘাড় নোয়ালেন সকলে। এডউইন বেচারা আগে থেকেই নুইয়ে রেখেছে ঘাড়। আগ বাড়িয়ে পেছনে তাকানোর সাহস পেলো না কেন যেন। এদিকে মনস্টারের দাম্ভিক কদম ততক্ষণে অতিক্রম করেছে দু-গম্ভীর পুরুষকে। গটগটিয়ে হেলিকপ্টারের পানে এগোতেই হঠাৎ বা-পাশ থেকে ছুটে এলেন এক গার্ড। মহাশয় বড়ো বাধ্যতায় নতমুখে একহাঁটু গেঁড়ে বসলেন জমিনে, দু’হাতে একখানা রা-মের বোতল অতি ভদ্রতায় বাড়িয়ে দিলেন সম্মুখে। মুগ্ধ থামল! শক্ত চোয়ালে তৎক্ষনাৎ গার্ডের হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো এলকোহলপূর্ণ বোতলটা। অতঃপর ধারালো দাঁতকপাটির শক্ত ফাঁকে বোতলের ক্যাপ আঁটকে বসালো একটান। মুহুর্তেই খুলে গেল বোতলের মুখ। মাফিয়া মনস্টার তক্ষুনি ঠোঁট চাপলেন সেথায়। এক নিশ্বাসে গপগপিয়ে গিলে নিলেন অর্ধেকটা পানীয়, পরক্ষণে বাকি অর্ধেকটা দিয়ে আলগোছে ধুয়ে নিলেন নিজ আহত হাতখানা। আহত স্থানে এলকোহল এন্টিস্যাপ্টিকের ন্যায় কাজ করে, এ যেন বেশ জানা তার। পরিশেষে হাত ধোঁয়া শেষ হতেই নির্দয় মানব হাতে থাকা শূন্য বোতলটা আচানক ছুঁড়ে মা’রলেন পাকাঁ মেঝেতে। মুহুর্তেই ঝনঝনিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হলো অবহেলিত বোতলখানা। অপেক্ষায়িত পাইলট উড়ে যাবার প্রস্তুতিতে মত্ত! মনস্টার আর দেরি করলেন না। তক্ষুনি দাম্ভিক কদমে উঠে গেলেন হেলিকপ্টারে। গমগমে গলায় আদেশ ছুঁড়লেন,

“ টেক অফ!”
পাইলট মহাশয় বুঝি এ কথাটারই অপেক্ষায় ছিলেন। আদেশ পাওয়া মাত্রই মত্ত হলেন টেক-অফে। ভূ-ভাগ কাঁপিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে শ্যাডো মনস্টারের নাম লিখিত হেলিকপ্টারটা। ভেতরে বসে থাকা দাম্ভিক পুরুষ শক্ত চোয়ালে বসে আছে কেমন। তার অবচেতন মনটা কেমন অজানা কারণে আনচান করছে। মুগ্ধ জানে না সে কারণ! আগ বাড়িয়ে জানার প্রচেষ্টাও করেনি যুবক।

হিডেন প্যালেসের আকাশ সীমানা অতিক্রম করে বেশ কিছুটা দূরে চলে এসেছে হেলিকপ্টার। প্যালেস থেকে যত দুরত্ব বাড়ছে, ঠিক ততই অস্থিরতা বাড়ছে মুগ্ধের। বুকটা খা খা করছে কেমন। অবোধ মনটা বারবার বলছে,
“ চাশমিস কী সত্যি খাবার খায়নি? রাগ করলে তো না খেয়ে থাকার অভ্যেস আছে তার। তখন আবার থাপ্পড় দেয়াতে ঠোঁটটাও কেটে গেল! এখন কেমন আছে মেয়েটা? এখনো কি আগের মতো কাঁদছে?”
মনের কোণে উত্থাপিত হচ্ছে হাজারো অপ্রয়োজনীয় চিন্তা। কোনোটাই নিজ ইচ্ছেতে চিন্তা করছেন না মাফিয়া বস। বিচক্ষণ মস্তিষ্কের হুংকারে নিজেকে আঁটকে রেখেছেন শক্তভাবে। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজ সত্তায় থেকে বিড়বিড় করে বলছে,
“ খেলে খাক, না খেলে ম’রে যাক বান্দীর মেয়েটা। ম’রে গেলে অন্তত কিছুটা হলেও শান্তি পাব। বেঁচে থাকতেই যা জ্বালাচ্ছে ঐটুকুন একটা পিচ্চি!”
কথাটুকু আওড়ে আসনের সনে পিঠ হেলালেন মনস্টার। কপাল কুঁচকে চোখদুটো বুঁজলেন খানিক। ওমনি বন্ধ চোখের পাতায় দৃশ্যমান হলো — সপ্তদশীর ক্রন্দনরত নির্মল মুখখানা। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে একটুখানি লহু। সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতা বাড়ল মুগ্ধের। বুকে বাড়ল কম্পন! মস্তিষ্ক অচল হয়ে গেল একমুহূর্তের জন্য। ভুলে গেল নিজ বিচক্ষণী, রূঢ় সত্তা। যুবক নিজের অবস্থান ভুলে গিয়ে তক্ষুনি ব্যস্ত হলো। ব্যগ্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে পাইলটকে বলল,

“ এক্ষুণি প্যালেসের দিকে ব্যাক কর!”
ভড়কায় পাইলট মহাশয়। চলতি পথে মাঝ রাস্তায় হুট করে এরূপ কথা শুনবে, তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি। তবুও মনস্টারের আদেশ বলে কথা। মহাশয় চুপচাপ সাইক্লিকে টান বসালেন ফের। ওতো বড় একখানা বাহনকে ফের উল্টো পথে ঘোরালেন তিনি। ওদিকে মুগ্ধ কেমন হাসফাস করছে। অস্থিরতায় গা থেকে খুলে রেখেছে ওভারকোটটা। বুকের বাঁপাশটা জ্বলছে বিধায় সেথায় অনবরত হাত বোলাচ্ছে রূঢ় মানব। কাঁপা কাঁপা অন্যহাতে পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল লাগাল অতি-পরিচিত নম্বরে। সেকেন্ড ত্রিশেক যেতে না যেতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হলো কল। মুগ্ধ তখন গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুঁড়ে বলল,
“ লোকেশন ট্রেস করে বাইক রেডি কর। আ’ম কামিং!”
নিজ কথা শেষ করে আর অন্যের কথা শোনবার প্রয়োজন বোধ করেননা মাফিয়া মনস্টার, আজও হলো তাই। তক্ষুনি খট করে কল কেটে পাইলটকে বললেন,
“ আশেপাশের যেকোনো খালি জায়গায় ল্যান্ড কর। লাইব্রেরী যেতে হবে।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪১ 

মাথার ওপর ঝুমবৃষ্টি! বড়ো একখানা প্রকাশনা গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল দু’টো ট্রাক। ট্রাকভর্তি বই তুলেছে মাফিয়া মনস্টারের গার্ডস। ট্রাকে সব ধরনের বই তোলা শেষ হতেই দুয়ার আটকাল ট্রাকের। ধীরে ধীরে টানল গতি। ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছে ট্রাক দু’টো। গতি বড্ড জোরালো তাদের। এরইমধ্যে ট্রাক দু’টোর পেছন থেকে কাওয়াসাকি নিনজা এইচ২আর বাইকখানা ছুটে এলো ঝড়ের বেগে। সে-কি গতি বাইকটার! যেন বাতাসকেও হার মানাবার পায়তারায় মত্ত সে। কালো রঙা একখানা শার্ট পরিহিত বলিষ্ঠ পুরুষ বসে আছেন বাইকে, মাথায় কালো রঙা হেলমেট। তীব্র বেগে ছোটার দরুন বৃষ্টির দমকা ছিটেফোঁটাগুলো বুঝি দাম্ভিক পুরুষকে ছুঁতেও পারছেনা। যুবক সহসা গতি বাড়াল বাইকের। হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে সে। হেলমেটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাদামী চোখদুটো কেমন অস্থির হয়ে ছুটছে সম্মুখে। হৃদয়টা বোধহয় এক্ষুণি দেহ খাঁচা ছেড়ে ছুটে আসবে বাইরে। অবোধ মনটা কেবল বলছে,
“ আমার চাশমিস আদৌও খেয়েছে তো?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here