প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৯ (২)
বন্যা সিকদার
মৌ’য়ের ওড়নার আঁচলে কামড় দিয়ে তার পিছু পিছু পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে উজান। পুরো চৌধুরী বাড়ি তন্নতন্ন করে চক্কর দেওয়া শেষ হয়ে গেছে তবুও উজান কোনোমতেই মৌ’য়ের আঁচল ছাড়ল না। মৌ প্রায় বিগত তিন-তিনটি দিন ধরে উজানে’র সাথে না একটা কোনো কথা বলেছে‚ না তার সাথে দেখা করেছে‚ আর না ভুল করেও তার মুখোমুখি হয়েছে। এই তিনটা দিন মৌ নিজের মনের তীব্র অভিমানে গাল ফুলিয়ে উজান’কে ছাড়া দিব্যি থাকতে পারলেও উজান এদিকে বিরহে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার কাছে এই সামান্য তিনটে দিন যেন তিন-তিনটি যুগের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক লেগেছে। সে এখন নিজের মনের অবচেতনে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে‚ সে এই পৃথিবীর সবকিছু এক পলকে ছেড়ে দিতে পারলেও। মৌ নামের এই পুঁচকে অবাধ্য মেয়েটিকে ছাড়া তার পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। মৌ রাগ দেখিয়ে দৌড়ে এদিক থেকে ওদিক ছুটে গেল‚ উজানও একগুঁয়ে উম্মাদের মতো তার পিছু পিছু ছুটে চলল।
চৌধুরী বাড়ির ছোট-বড় সকলেই লিভিং রুমে বসে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। তারা সকলে উজান আর মৌ’য়ের এমন অভাবনীয় কাণ্ডকারখানা দেখে পুরো হাঁ হয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গম্ভীর‚ পাথুরে আর বদমেজাজি ছেলেটার ভেতরে হুট করে এমন আকাশ-পাতাল পরিবর্তন এসেছে তা বাড়ির কেউ সহজে মেনে নিতে পারছে না। তবে এই দৃশ্য দেখে দূর থেকে ইফাত মনে মনে বেজায় খুশি হলো। যাক‚ এবার অন্তত তার এই ক্ষ্যাপাটে ও বেপরোয়া ভাইটা নিজের ইগো বিসর্জন দিয়ে মেয়েটাকে নিজের করে নেবে‚ তাকে বুক ফুলিয়ে ভালোবাসবে। মৌ ওভাবে সারাবাড়ি ছোটাছুটি করতে করতে একপর্যায়ে হাপিয়ে উঠে শাশুড়ি মৌসুমি চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং অতি দ্রুত তাঁর পেছনে নিজের শরীরটা লুকিয়ে ফেলল। তারপর শাশুড়ির কাঁধের আড়াল থেকে উজানে’র দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে চরম তেজ দেখিয়ে বলল‚
”শাশুড়ি আম্মা তোমার এই বেহায়া ছেলেকে একটু বলো আমার কাছ থেকে দূরে সরতে। এই লোকটা এখন আমার কাছে কেন আসছে‚ হ্যাঁ? আমাকে যতই পাম দিক আর তেল মারুক‚ আমি আর একটা মুহূর্তও এই বাড়িতে থাকব না। আমি কাল সকালেই সোজা নিজের বাপের বাড়ি চলে যাব।
মৌ’য়ের মুখে ‘চলে যাব’ শব্দটা শোনা মাত্রই উজান মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল‚ “অ্যাঁহ ওনি নাকি চলে যেতে চাইলেই যেন আমি ওনাকে বিদায় দেওয়ার জন্য খুশিতে নাচতে নাচতে হাততালি দেব। জাস্ট একটা পা এই বাড়ির সীমানার বাইরে বের করে দেখোই না। সেদিন তো রাগের মাথায় শুধু একটা থাপ্পড় দিয়েছিলাম আর এবার যদি অবাধ্যতা করছো তবে সোজা হাত-পা ভেঙে বিছানায় বসিয়ে রেখে দেব‚ যাতে সারা জীবন শুধু আমার সামনেই বসে থাকো।
”আমি যাবই যাব‚ কী করবেন আপনি শুনি? মারবেন? মারুন তবুও যাবো।
মৌ শাশুড়ির পেছন থেকে মুখ উঁচিয়ে বলল। উজান আবারও তড়িৎ গতিতে মৌ’য়ের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ছেলের এমন বেপরোয়া আচরণ দেখে মৌসুমি চৌধুরী নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে রাঙিয়ে তাকালেন। মায়ের সেই অগ্নিদৃষ্টি দেখে উজান এবার খানিকটা দমে গেল; তবে তার এই দমে যাওয়াটা যে সাময়িক‚ তা তার চোখের দিকে তাকালেই খুব ভালো করে বোঝা যাচ্ছিল।
এর মাঝেই মৌসুমি চৌধুরী নিজের দাঁতে দাঁত চেপে ছেলের ওপর গর্জে উঠলেন। “সমস্যাটা কী তোর উজান? তুই সকাল থেকে এইটুকু একটা মেয়েকে ওভাবে সারাবাড়ি তাড়িয়ে তাড়িয়ে কেন জ্বালানো শুরু করেছিস?
মায়ের ধমক শুনে উজান এক পলকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে একবার ভয়ার্ত চোখে মায়ের দিকে তাকাল‚ তো আরেকবার মায়ের পেছনে লুকিয়ে থাকা নিজের পুঁচকে বউয়ের দিকে তাকাল। আর একবার সোফায় বসে থাকা বাড়ির বাকি সবার দিকে চোখ বোলাল। তারপর সে নিজের মায়ের দিকে খানিকটা ঝুঁকে মৌ’য়ের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে অত্যন্ত রহস্যময় কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“আচ্ছা আম্মু আমার প্রশ্নের উত্তর দাও তো‚ তুমি এই শয়তান বিড়ালের বাচ্চার ঠিক কী হও?
উজানের এমন অদ্ভুত কথা শুনে মৌসুমি চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্য পুরো থমথমে খেয়ে গেলেন। ভর সন্ধা বেলা ছেলে হঠাৎ কেন তাকে এমন বোকা বোকা প্রশ্ন করছে তা তিনি কিছুতেই বুঝতে পারলেন না। তবুও নিজের কণ্ঠ স্বাভাবিক রেখে বললেন। “কেন? আমি ওর আইনত শাশুড়ি হই।
“গুড! তাহলে ড্যাড ওর কী হয়?
”কেন শ্বশুর হয়।
“তাহলে এবার বলো আমি কী হই ওর?
মৌসুমি চৌধুরী এবার রেগে গিয়ে বললেন‚ “তোর নিজের বিবেক কি জানে না তুই মেয়েটার ঠিক কী হোস‚ হ্যাঁ?
“আম্মু যা জিজ্ঞেস করছি দয়া করে সেটার একটু ক্লিয়ার উত্তর দাও না প্লিজ।
”তুই ওর বিবাহিত হাসবেন্ড হোস। এবার হয়েছে তো তোর?
“তাহলে আমরা দুজন একে অপরের সম্পর্কে কী হই আম্মু?
”কেন, হাসবেন্ড-ওয়াইফ।
মায়ের মুখ থেকে কাঙ্ক্ষিত উত্তরটা শোনা মাত্রই উজানে’র ঠোঁটের কোণে এক মস্ত বড় বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে পুরো লিভিং রুম কাঁপিয়ে কড়া গলায় আওড়াল‚ “রাইট! আমরা দুজন হলাম লিগ্যাল বর-বউ। আর যেহেতু এই চিলড্রেন বিড়ালের বাচ্চাটা আমার নিজের বিবাহিত বউ‚ সেই হিসেবে ওকে শুধু এই সন্ধা বেলা জ্বালানোই নয়‚ সারাজীবন ওর শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে ওর পিছু পিছু ঘুরে বেড়ানোর পূর্ণ রাইট বা অধিকার এই উজান চৌধুরীর আছে বুঝলে?
উজানের মুখে এমন প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি শুনে সোফায় বসে থাকা বাড়ির ছোট-বড় সবাই পুরো স্তব্ধ হয়ে এক পলকে তাকিয়ে রইল। সবার মাথায় যেন আচমকা এক বিশাল আকাশ ভেঙে পড়েছে। গম্ভীর প্রফেসর ছেলেটার হঠাৎ কী এমন মানসিক রোগ হলো‚ সবাই মনে মনে সেটাই ভাবছিল।
ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে আরিয়ান সোফা থেকে হালকা হেসে বলে উঠল‚
“ভাই তুই ঠিকঠাক আছিস তো?
উজান মুহূর্তের মধ্যে আরিয়ানে’র দিকে তাকিয়ে নিজের দাঁত কিড়মিড় করে উঠল‚ “কাছে আসো আমার প্যান্ট চেক করে দেখে যাও আমি ঠিকঠাক আছি কিনা।
আরিয়ান উজানে’র এমন কড়া জবাব আর রসিকতা শোনা মাত্রই এক নিমেষে চুপসে গিয়ে মুখ বন্ধ করে ফেলল। উজানে’র মুখ থেকে এমন খোলামেলা কথাবার্তা সে কোনোদিন হজম করতে পারবে না। এর মাঝেই উজান নিজের মুখটা একটু বাঁকিয়ে চারপাশের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল‚ “ইফাতে’র মতো যদি তোমরা সবাই মিলে আমাকে একটু আগে সুবুদ্ধি দিতা। তাহলে আজকে আমি ঠিকঠাক আছি কি না সেটা আর তোমাদের কষ্ট করে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে হতো না। এতদিনে তোমরা হাতে-কলমে তার প্রমাণ পেয়ে যেতে। ছিঃ ছিঃ এতদিন কী ভুলটাই না করেছি আমি।
উজানের কথার ভেতরের আসল গুঢ় অর্থ বাড়ির বাকি সবার মাথার ওপর দিয়ে ৫জি গতিতে চলে গেলেও। এক কোণে বসে থাকা ইফাত কিন্তু ঠিকই পুরোটা বুঝতে পারল। তাই সে নিজের হাসির বেগ লুকাতে ঠোঁট কামড়ে চেপে ধরে আড়ালে হাসতে লাগল। ততক্ষণে উজান আর কাউকে কোনো সুযোগ না দিয়ে‚ এক ঝটকায় মায়ের পেছন থেকে মৌ’য়ের হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে টেনে এক টানে নিজের চওড়া বুকের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে নিল। তারপর মৌ’য়ের কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত আদুরে ও উদগ্রীব কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত করল।
“হেই মাই লিটল সুইট পিচ্চি। অনেক রাত হচ্ছে এবার শান্ত মেয়ের মতো রুমে চলো দেখি।
মৌ উজানে’র বুকে পিষ্ট হতে হতে ছটফট করতে লাগলো। “যাব না আমি আপনার সাথে। ছাড়ুন আমাকে।
“একদম ওমন পঁচা কথা বলবে না পিচ্চি। তাড়াতাড়ি রুমে চলো বলছি। এই তিনটে দিন তোমাকে ছাড়া শান্তি মতো ঘুম আসেনি।
মৌ নিজের মুখখানা চরম অভিমানে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। একে তো সে সেই রাতের ওই অন্যায় থাপ্পড়ের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি‚ তার ওপর এই লোকটা এখন সবার সামনে কোন মুখে এত বড় বড় অধিকার দেখাচ্ছে? মৌ’য়ের এই প্রকাশ্য এভয়েড করাটা উজান নিজের পুরুষালি ইগোতে আর নিতে পারল না। সে এক এক করে লিভিং রুমে উপস্থিত বাড়ির সবার দিকে তাকালো। তারপর হুট করেই কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে মৌ’য়ের নরম গালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল। উজান শুধু একটা চুমু খেয়েই ক্ষান্ত হলো না‚ এরপর সে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত উম্মাদের মতো ধীর পায়ে মৌ’য়ের সারা মুখমণ্ডল‚ কপাল আর চোখে অজস্র আদুরে চুমুতে ভরিয়ে তুলল। বাসার সবার সামনে উজানে’র এমন আচমকা কাণ্ড দেখে মৌ মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় ও আতঙ্কে বরফের মতো জমে নিথর হয়ে গেল। চারপাশের সবার ওমন হাঁ করা দৃষ্টি দেখে মৌ’য়ের মনে হচ্ছিল যদি এই মুহূর্তে মেঝের মাটি দু-ভাগ হয়ে যেত‚ তবে সে লজ্জায় মাটির তলে ঢুকে যেত। সে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত নিচু স্বরে গজগজ করে বলতে লাগল।
“বেহায়া লোক বউ মানেন না অথচ বাপ-মায়ের সামনে চুম্মাচুম্মি করতে লজ্জা করে না। যাব না আমি আপনার সঙ্গে‚ ছাড়ুন আমায়।
উজান এবার নিজের মুখটা আরও বেশি বাঁকিয়ে উওর দিলো। “বউ মানি আর না-ই মানি‚ তবে লজ্জা-টজ্জা আমার করে না। বেশি ছটফট করলে রুমে ঢোকার আগেই বাকি কাজ এখানেই সেরে ফেলব মাইন্ড ইড।
ছেলের মুখে এমন কথা শোনা মাত্রই আরিফুল চৌধুরীসহ বাড়ির বয়স্ক বড়রা সবাই কাশতে কাশতে এক প্রকার বাধ্য হয়েই দ্রুত ড্রয়িং রুম ত্যাগ করে চলে গেলেন। গম্ভীর ছেলেটা যে আচমকা এমন রোমান্টিক কাণ্ড করে বসবে তা বাড়ির কোনো সদস্য স্বপ্নেও ভাবেনি। বড়রা চলে যেতেই আরিয়ান সোফায় শুয়ে হাসতে হাসতে বলে উঠল‚
“বাহ্ রে ভাই বাহ্। এই তোর বউ না মানার আসল নমুনা‚ হ্যাঁ? দিনদুপুরে সবার সামনে বউয়ের সাথে ‘কিছু-মিছু’ করে বেড়াস আর আমাদের সামনে ভাব দেখাস তুই নাকি বউ মানিস না। হায় আল্লাহ‚ দিনের বেলাতেই যদি তোর এই অবস্থা হয় তবে রাতে রুমের দরজা বন্ধ করে না জানি তোরা দুজন কী কী করিস।
আরিয়ানে’র এই ফাজলামির মাঝেই হুট করে উজান এক ঝটকায় মৌ’কে নিজের দুই বাহুর মাঝে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। আচমকা শূন্যে ভেসে ওঠায় মৌ তীব্র ভয়ে নিজের চোখ-মুখ একদম খিঁচে বন্ধ করে ফেলল এবং বাঁচার তাগিদে উজানে’র শার্টের কলারটা নিজের ছোট ছোট হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল। বউয়ের এমন ভয়ার্ত ও আদুরে রূপ দেখে উজান নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে মৌ’কে কোলে নিয়েই ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের বেডরুমের দিকে উঠতে উঠতে আরিয়ানের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠলো।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ১৯
“সরি টু সে ভাইয়া। এখন কিন্তু মোটেও দিনদুপুর নয়‚ এখন চারপাশ পুরো নিঝুম রাত। তাছাড়া বিয়ে যখন করেই ফেলেছি তখন বউয়ের মন রক্ষা করতে গেলে এমন টুকটাক কিছু-মিছু তো করতেই হবে তাই না? এটা নিয়ে তোমরা এত রিয়্যাক্ট কেন করছো? এর জন্য তোমরা আবার আমাকে ভুল বুঝো না ভাই। জাস্ট বউয়ের মন রক্ষার খাতিরে যা হবে‚ আমি নিজে থেকে কিছু করবো না ট্রাস্ট মি। আমি এইটুকু ইনোসেন্ট বাচ্চা ছেলে‚ আমার দ্বারা কি এই পঁচা কাজ পসিবল।
উজান মৌ’কে কোলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই পেছনে লিভিং রুমে বসে থাকা ইফাত‚ আরিয়ান আর তুব একসাথে উচ্চস্বরে হেসে কুটি কুটি হতে লাগল।
