শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৭
অনামিকা তাহসিন রোজা
শ্রাবণের বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে লাগল। মাথার যন্ত্রণা যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সে বিছানা থেকে নেমে এদিক-ওদিক হাঁটতে শুরু করল। এলোমেলো চুলে হাত চালিয়ে বারবার মনে করার চেষ্টা করল রাতের ঘটনা। কিন্তু যতই ভাবছে, ততই ভয় বাড়ছে। তার স্পষ্ট মনে আছে, সে নেশা করেছিল। খুব বেশি। তারপর? তারপর কী হলো? আর এই একটা মেয়ে কোথ থেকে এলো। ঝাপসা স্মৃতিতে শ্রাবণ একটা মেয়েকেও আবিষ্কার করতে পারছে, কিন্তু কে সেই মেয়ে? দেখতে কেমন কিছুই মনে করতে পারছে না। হ্যাঁ, একটা মেয়ের সাথে কথা বলেছে সে। মেয়েটার কণ্ঠ খুব নরম ছিল। আর সে…সে কি সত্যিই জড়িয়ে ধরেছিল মেয়েটাকে? শ্রাবণের গা শিউরে উঠল। এত বড় একটা অশোভনীয় কাজ সে কীভাবে করতে পারে?
—” না না না…আমি এসব কী করেছি!”
নিজের কাছেই নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা কাজ করতে লাগল শ্রাবণের। সে জীবনে মেয়েদের সাথে সীমা ছাড়িয়ে চলেনি কখনো। রাগী, বদমেজাজি সব ভাব আছে তার মধ্যে, কিন্তু চরিত্রহীন না। অথচ গতরাতে সে কী করেছে কে জানে! হঠাৎই মাথায় আরেকটা চিন্তা আসতেই সে থমকে গেল।
—” মেয়ে টার সাথে ওমন করে… আমি কেনো করেছি? নেশা করলেও তো এমন করার কথা না। আর মেয়েটা-ই কি আমাকে বাড়িতে এনে দিয়েছে?”
তারপরই কপালে হাত ঠেকাল শ্রাবণ। বিড়বিড় করল,
—” ধুর শালা! যদি বাড়ি পর্যন্ত এনে থাকে, তাহলে তো কেও না কেও দেখার কথা। যদি কোনো ঝামেলা হয়?”
আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না সে। দ্রুত বিছানার পাশে পড়ে থাকা ফোনটা তুলে জিহানকে কল দিল। টেনশনে গা ছমছম করছে। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে শ্রাবণের। হতে পারে এটা কোনো বড় বিষয় না। কিন্তু একটা আগন্তুক মেয়েকে সে জড়িয়ে ধরেছে এটা সে নিজেই কোনোভাবে মানতে পারছে না।
ওপাশে তিনবার রিং হতেই ঘুমজড়ানো গলায় জিহান বলল, —”হ্যালো…!”
শ্রাবণ একদম ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো গলায় বলল,
—”এই শালা, হারামির জাত! কাল রাতে কী হয়েছিল?”
জিহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। বড় করে হাই তুলে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
—” কোন পার্টের কথা শুনতে চাইছিস? কাল তো ধারাবাহিক নাটক দেখেছি।”
—” ফাজলামি করবি না। আমি বাড়ি এলাম কীভাবে?”
জিহান এবার ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল। চোখের সামনে ভেসে উঠল গতরাতে রাস্তার মাঝে শ্রাবণকে ফেলে দেয়ার দৃশ্য। জিহান সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” তোর মনে নেই?”
শ্রাবণ ফট করে জবাব দিল,
—” থাকলে কি তোর মত বলদকে জিজ্ঞেস করতাম?”
জিহান এবারে মনে মনে শয়তানি হাসি দিল। – আব আয়া উট পাহাড় কে নিচে। হি হি হি। জিহান এবারে শোয়া থেকে উঠে বসে মুখে গম্ভীর ভাব এনে বলল,
—” ওহহ…সেটা। হুমম। কীভাবে যে বলি।”
শ্রাবণের বুক ধক করে উঠল,
—” কী সেটা? আবে বল।”
জিহান নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল, দুঃখী কন্ঠে বলল,
—” দোস্ত তুই এমনটা না করলেও পারতিস। আমার কথাটা একবার শুনলে…কি আর বলব। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তবে তোর কাছে এটা আশা করিনি।”
শ্রাবণ একদম জমে গেল, কাঁপা গলায় বলল,
—” মানে?”
—” আসলে তোর অনেক নেশা হয়ে গেছিল। ভাবলাম তোকে বাড়িতে দিয়ে আসব। কিন্তু আমি তোকে সামলাতে পারছিলাম না। তারপর তুই জেদ ধরে বের হয়ে গেলি। এরপর…
ইচ্ছে করেই থেমে গেল জিহান। শ্রাবণ প্রায় চিৎকার করল, —” এরপর কী!”
জিহান মাথা চুলকে দুঃখী সুরে বলল,
—” ক্লাবে একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে খুব ভাব জমে গিয়েছিল তোর।”
শ্রাবণের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম। নাকমুখ কুঁচকে সে চেঁচিয়ে উঠলো,
—” WHAT!”
জিহান এবার ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাতে মরিয়া হলো। কোনোমতে আরো মলিন হয়ে বলল,
—” আরে দোস্ত, নেশা করলে মানুষ কত কিছুই তো করে। কোনো ব্যাপার না। আমি কাওকে বলব না। ভাবিকে ওহ সরি সরি, তুই তো ভাবি ডাকতে মানা করেছিস, তোর ওই হয়েও না হওয়া বউকেও বলবনা যে গতরাতে তুই একটা অন্য মেয়ের সাথে লটকালটকি করেছিস, ছ্যাঁহ!”
শ্রাবণ স্থির হয়ে কিছুক্ষণের জন্য বোঝার চেষ্টা করল কথাগুলো সত্যি কিনা। আসলেই সে এসব করেছে.?এটা কি সম্ভব। অপরাধবোধে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল শ্রাবণের। তবুও বলল,
—” জিহান তোর মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি কি জীবনে এসব করেছি?”
—” না মানে..কাল নেশার ঘোরে কন্ট্রোল হয়নি হয়তো। তাই আর কি!”
শ্রাবণ ধমক দিয়ে উঠল,
—” মানে টা কী?”
—” ইয়ে মানে…
—” আমি কী করেছি স্পষ্ট বল! আরো খারাপ কিছু তো করিনি রাইট?”
—” তেমন কিছু না। মানে..প্রথমে মেয়েটাকে কফিডেট অফার করেছিলি, ও প্রপোজ করলে এক্সসেপ্টও করেছিস। পরে আবার…
শ্রাবণের বুক শুকিয়ে গেল। সে কোনোভাবেই এসব বিশ্বাস করবে না। মরে গেলেও না। অবিশ্বাস্যের মাত্রা চূড়ায় পৌঁছানোর আগেই বাকি প্রাণটুকু নিয়ে খেলে শ্রাবণ অস্ফুটস্বরে জানতে চাইল,
—” পরে আবার কী?”
জিহান ভীষণ কষ্ট করে হাসি চেপে বলল,
—” খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলি তো। ইয়ে মানে..একটু লুতুপুতু করেছিস। খুব অল্প।”
—” জিহান! হোয়াট দ্য…
—” জড়িয়ে ধরছিলি বোধহয়।”
শ্রাবণ স্তব্ধ হলো। একদম নিস্তব্ধ। তারপর ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ল। মুখ শুকিয়ে গেছে পুরো তার। সে কোনোভাবেই এসব বিশ্বাস করবেনা। এটা কীভাবে সম্ভব। এত জঘন্য কাজ সে কীভাবে করল? জিহানের কথা এত সহজে বিশ্বাস করতো না শ্রাবণ। কিন্তু তার নিজেরই মনে আছে কোনো এক মেয়েকে নে জড়িয়ে ধরেছিল, যার ঘ্রাণ এখনো তার শার্টে ভাসছে। কিন্তু মেয়েটা কে? কে? সেই ক্লাবে তো শ’খানেক মেয়ে আছেই।
—” আমি…আমি একটা অপরিচিত মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছি?”
জিহান এবার আরো আগুনে ঘি ঢালল,
—” শুধু জড়িয়েছিস বললে কম বলা হয়।”
—” ডোন্ট টেল মি কিস করেছি।”
—” উম…ইয়াপ কাছাকাছি। আমি বাবা গরিব মানুষ, ওসব বুঝিনা।”
শ্রাবণ বেঁচে থাকার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলল। নিজের প্রতিও ঘৃনা এলো প্রচুর। —” আমি ম’রলাম না কেনো?”
জিহান এবার আর না পেরে কল মিউট করে কয়েক সেকেন্ড হেসে নিল। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বলল,
—” দোস্ত, একটা কথা বলি? মেয়েটা কিন্তু তোকে বেশ সামলাচ্ছিল। মেবি খুব পছন্দ করেছে তোকে। ইয়ে মানে, তোর তো ঘরের টাকে পছন্দ না, একবার লাইন লাগানোর ট্রাই করব বাইরের টার সাথে? আমি মেয়েটার ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছি।”
শ্রাবণ ফট করে মুখ কুঁচকে ইংরেজিতে বিখ্যাত কিছু গালি ছুঁড়ে দিল। ভদ্রতার খাতিরে বলতে পারল না- নম্বর টা এখন নিজের পশ্চাৎদেশে রেখে দে। এরপর কিছুক্ষণ যেতেই হতভম্ব গলায় বলল,
—” আচ্ছা, কে ছিল মেয়েটা?”
জিহান ভান করা চিন্তিত গলায় বলল,
—” সেটাই তো সমস্যা। অন্ধকারে মুখ ঠিকমতো দেখিনি..”
শ্রাবণ চোখ সরু করে ফোনের দিকে তাকাল
—” তুই না মাত্র বললি ফোন নম্বর নিয়ে রেখেছিস। না দেখে নম্বর নিলি কীভাবে?”
জিহান এবারে নেটওয়ার্ক, কানেকশন দুর্বল হওয়ার অভিনয় করে – হ্যালো হ্যালো করতে করতে কল কেটে দিল। শ্রাবণ মুখ কুঁচকে ফোনের দিকে তাকিয়ে এবারে খাঁটি বাংলায় গালি দিল। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে সত্যি সত্যিই মাথা চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য কাজটা সে গতরাতে করেছে। ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল। খুব ধীরে, সতর্কভাবে। শ্রাবণ সাথে সাথে দরজার দিকে তাকাল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি কাজ করছে।
এক মুহুর্তের জন্য ধীর পায়ের আওয়াজ শুনে শ্রাবণ মনে মনে ভেবে নিয়েছিল হয়তো ধারা আসছে। কিন্তু সালমা বেগম কে ঘরে ঢুকতে দেখে শ্রাবণ সতর্কও হলো, একই সাথে অবাক হলো এ-ই ভেবে যে সে কেনো ধারাকে আশা করল? সালমা বেগম ঘরে ঢুকেই ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকালেন। বিছানার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলা শার্ট, উল্টে থাকা বালিশ, আর মাঝখানে মাথা চেপে বসে থাকা তার ছেলে। তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
—” আলহামদুলিল্লাহ। মহারাজের ঘুম ভেঙেছে তাহলে। ঘর তো দেখি আরো মাশা-আল্লাহ! ”
শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিল। মাথা এখনো ঝিমঝিম করছে তার। কোনোমতে বোঝানো যাবে না সালমা বেগম কে যে সে নেশা করেছে। এই মুহুর্তে ফট করে শ্রাবণ উপলব্ধি করল তার হাতের ঘড়ি খোলা পড়ে আছে, পায়ের মোজাও খোলা। এসব তো সে করেনি রাতে। একা বাড়িতে ফিরলেও এভাবে সব ঠিকঠাক করে শুয়ে পড়ার তো কথা নয় তার। তার থেকেও বড় কথা শরীর থেকে আসা অ্যালকোহলের ঘ্রানটাও নেই। বরং বেলি ফুলের ঘ্রান টের পায় সে। এটা কীভাবে সম্ভব?
শ্রাবণের এমন হঠাৎ উপলব্ধির মাঝেই সালমা বেগম এবার দুই হাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
—” রাতে কখন ফিরেছিস?”
শ্রাবণ একটু থেমে তাকাল। চোখ পিটপিট করে বলল,
—” তুমিই জানো।”
—”আমি জানি মানে। আমি জানব কীভাবে? আমি কি ছিলাম নাকি?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাল,
—” মানে তুমি দেখো নি আমি ফিরেছি?”
সালমা বেগম নির্বিকার গলায় বললেন,
—” না। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
তারপর কটমট করে তাকিয়ে যোগ করলেন,
—” কিন্তু ধারা জেগেছিল তো।!
শ্রাবণ স্থির হয়ে গেল। সালমা বেগম বিছানার পাশে এসে বসে আবার বললেন,
—” আমার আর সেই বয়স নেই নিজের ছেলের পিছু ছোটার বুঝেছিস? আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রাতে। ধারা তো অপেক্ষা করেছে। দরজা ও-ই তো খোলার কথা। ”
শ্রাবণের বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল। তাহলে, ধারা জানে? গতরাতে সে কী অবস্থায় ছিল, কী কী বলেছে, কীভাবে বাড়িতে এসেছে, একা এসেছে, কোনো মেয়ে সাথে ছিল কি না, সব? মাথার ভেতর আবার অস্পষ্ট কিছু দৃশ্য ঝলকে উঠল। রাস্তা। কারো কাঁধ। নরম গলার আওয়াজ। তারপর, সে কি সত্যিই অন্য এক মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছিল? শ্রাবণের মুখ শুকিয়ে গেল। ধারা আবার ওসব কিছু দেখেনি তো? সে কেমন অস্বস্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” ও.. তোমাকে কিছু বলেছে?”
সালমা বেগম এবার সন্দেহের চোখে তাকালেন,
—” কী বলবে?”
—” না মানে..আমি কীভাবে এসেছি?”
—” না তো। আমি শুনিনি। সেটা তো ধারাই ভালো বলতে পারবে। তুই যখন এসেছিস তখন আমি ঘুমে। সকালে উঠে দেখি তুই নিজের ঘরে গন্ডারের মতো পড়ে আছিস।”
শ্রাবণ চুপ করে গেল। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছে। মানে, কোনোভাবে বা রহস্যজনক ভাবেও যদি সে বাড়ির গেট পর্যন্ত এসে পৌঁছায়, তাহলে ঘরে ঢোকার পর সব কিছু তো ধারা দেখেছে। তাহলে কি তাকে ধারা-ই ঘরে শুইয়ে দিয়ে গিয়েছে? তার জুতো-ঘড়ি খুলে দিয়েছে? কিন্তু কীভাবে? সে তো ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিল না। তাহলে মেয়েটা একা এত রাতে তাকে সামলেছে? শ্রাবণ ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। আরেকটা চিন্তা হঠাৎ মাথায় আসতেই কপাল কুঁচকে গেল তার। যদি..যদি সেই অনাকাঙ্খিত অপরিচিত মেয়েটাকে ধারা তার সাথে দেখে? পুরো শরীর কেমন থমকে গেল শ্রাবণের। কি আশ্চর্য! ধারা তাকে অন্য মেয়ের সাথে দেখলেও বা তার কী? তার এত ভয় লাগছে কেনো? সে ধারাকে ভয় পায়? নিজের অনুভূতিতে নিজেই অবাক হয়ে থমকে রইলো শ্রাবণ।
দ্রুত হাতে নাস্তা তৈরী করছে ধারা। বেশি সময় নেই। নীল আজকে নিজের কাজে বাইরে যাবে। দুপুরের আগে আর আসবে না৷ তাই তার জন্য ভারি নাস্তা তৈরী করছে ধারা। সালমা বেগম সাহায্য করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু বউমার জোরাজুরিতে বসে বসে তাকে টিভি দেখতে হয়েছে। ধারা একের পর এক প্লেট টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। গরম গরম পরোটা থেকে ধোঁয়া উঠছে। পাশে ডিমভাজি, সবজি, আর নীলের পছন্দের চিকেন সসেজও রেখেছে সে। রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে আবার জুসের গ্লাস রাখল টেবিলে। সকাল থেকেই একদম ব্যস্ত হয়ে আছে মেয়েটা।
ড্রয়িংরুমে টিভির শব্দ ভেসে আসছে। সালমা বেগম চশমা পরে খুব মনোযোগ দিয়ে সকালের সিরিয়াল দেখছেন। মাঝেমধ্যে নিজেই বিরক্ত হয়ে চরিত্রদের বকছেনও। এই ফাঁকে নীল ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। আজ বেশ পরিপাটি লাগছে তাকে। হালকা ধূসর শার্ট, কালো ঘড়ি, হাতে কিছু সরঞ্জাম আর ছোট ব্যাগ। নিচে নেমেই টেবিলের দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলল।
—” ওয়াও। এত আয়োজন?”
ধারা মুখ তুলে হালকা হাসল,
—” আপনি তো দুপুরের আগে ফিরবেন না। তাই ভাবলাম ভারি কিছু বানাই।”
নীল কিছু বলল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে রইল ধারার দিকে। আজ মেয়েটাকে কেমন অন্যরকম লাগছে। চোখদুটো একটু ফুলে আছে। ঘুম কম হয়েছে বুঝাই যাচ্ছে। অথচ মুখে জোর করে স্বাভাবিক ভাব ধরে রেখেছে। গতরাতে যা হয়েছে তা নিয়ে নীল বেশ সন্দিহান হয়ে রয়েছে। সেই সময় গাড়ি নিয়ে নীল ধারা আর বেঁহুশ শ্রাবণকে আনতে গিয়েছিল। বাড়িতে আসা পর্যন্ত পুরোটা সময় গতরাতে ধারাকে লক্ষ্য করেছে নীল। তার সন্দেহ জোরালো হয়েছে তখনই যখন দেখে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধারা শ্রাবণকে ঘরে গিয়ে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। রাতে আর প্রশ্ন করেনি নীল। নিজেও ঘুমে কাবু ছিল বলে কথা না বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সকালে বিষয়টা নিয়ে আরো ভেবেছে সে এবং অবাকও হয়েছে।
নীল ধীরে ধীরে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল। নিচু গলায় বলল,
—” ভাইয়া কি ঘুম থেকে উঠেছে?”
ধারার হাত থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, —” আমি কীভাবে জানব? হয়তো উঠেছেন।”
নীল ভ্রু কুঁচকাল,
—” ওও। বুঝলাম। কিন্তু আমার তো মনে হয় তোমারই জানার কথা।”
ধারা এবার একটু অপ্রস্তুত হলো। নীল আস্তে করে চেয়ার টেনে বসল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
—” আমি সব দেখিনি, সব জানিও না, তবে কিছুটা বুঝেছি।”
ধারার বুক ধক করে উঠল। অজান্তেই ওড়নার কোণা চেপে ধরল সে। নীল এবার ধীরে ধীরে বলল,
—” আসলে এভাবে বলার অনেক কারন রয়েছে। এই প্রথম কোনো মেয়েকে দেখেছি এত সাবলীলভাবে দ্বিধাহীন হয়ে কোনো পরপুরুষের জন্য এতকিছু করতে।”
ধারা দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল। চোয়াল শক্ত হলো একটু। ওড়নার কোণার জোর আরো কঠিন হলো। কে পরপুরুষ?শ্রাবণ শেখ? উহু। এটা তো সম্ভব না। কথাটা ভালো লাগল না ধারার। তবে ভেতরে ভেতরে ভয়ও পেল যদি সত্যি সত্যি নীল সব জানতে পেরে যায়। নীল কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে এবার আরো নরম স্বরে বলল,
—” একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
ধারা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইলো। নীল প্লেট এগিয়ে নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
—” ভাইয়া আর তুমি….তোমাদের দুজনের সম্পর্কটা আসলে কী?”
ধারার হাত থেকে চামচটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে দ্রুত সামলে নিল। ওপাশে টিভির দিকে তাকিয়ে সালমা বেগম হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, —” এই মহিলাটাকে কেউ থাপ্পড় দে! স্বামীর সাথে এভাবে কথা বলে নাকি! ফালতু নাটক। কালকে থেকে আর দেখবই না এই সিরিয়াল।”
ধারা আর নীল দুজনেই এক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর নীল আবার নিচু গলায় বলল,
—” আমি অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি। ভাইয়া তোমাকে নিয়ে অদ্ভুত রকম মাইন্ডসেট রাখে। আবার তুমি তার জন্য…স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভাবো। সমীকরণ ঠিক মিলছে না। আকাশ পাতাল অবস্থা। গতরাতে তুমি আবার ভাইয়াকে ওই অবস্থায় পেলে!”
ধারার গলা শুকিয়ে গেল। নীল এবার সোজাসুজি তাকাল তার দিকে,
—” কাল রাতে তুমি যেভাবে ভয় পেয়েছিলে, ওটা এমনি এমনি ছিল না ধারা। এমন অস্থিরতা আপন কারো জন্য আসে। ”
ধারা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। তার মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে, এখন কী বলবে সে? শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে সামলালো ধারা। কথা পাল্টে বলল,
—” আপনাকে একটা অনুরোধ করব নীল ভাই?”
নীল মাথা নেড়ে বলল,
—” হুম। করো।”
—” আমি..কাল যে মিস্টার শেখকে আমি বাড়িতে এনেছি, ওনার ঘরে গিয়েছি, এসব যেন উনি জানতে না পারেন। আমায় ভুল বুঝবে, বকাবকি করবেন। জানেনই তো পছন্দ করে না আমাকে।”
নীল বুঝবার ভঙ্গিতে মাথা নাড়াতেই উপরের সিঁড়ি থেকে ধীর পায়ের শব্দ ভেসে এলো। দুজনের মাঝেই অদৃশ্যভাবে একটা নীরবতা নেমে এলো যেন। শ্রাবণ ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। এলোমেলো চুল, কুঁচকে যাওয়া টি-শার্ট, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। মুখটা কেমন মলিন আর বিরক্তি মাখানো মন। মাথা এখনো ভয়ানক ধরে রয়েছে। কিন্তু সিঁড়ির মাঝামাঝি এসে নিচের দৃশ্যটা দেখতেই তার পা থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। নীল আর ধারা পাশাপাশি হয়ে নিচু গলায় কথা বলছে। ধারার মুখে চাপা অস্বস্তি। নীল তাকিয়ে আছে গভীর মনোযোগ নিয়ে।
অজান্তেই শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হাতের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত জ্বালা শুরু হলো। মাথা এমনিতেই গরম, তার উপর এই দৃশ্য! কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করল সে। মুখে নির্লিপ্ত ভাব এনে ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। যেন কিছুই দেখেনি। কিছুই যায় আসে না তার। তারপর ঠাস করে চেয়ার টেনে ডাইনিং টেবিলের অন্য পাশে বসে পড়ল। শব্দটা একটু বেশিই জোরে হলো। ধারা সাথে সাথে চমকে তাকাল। নীলও চোখ তুলল। শ্রাবণ কারো দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর মুখে টেবিলের উপর কনুই রাখল। চোখদুটো ক্লান্ত। তবুও ভেতরের বিরক্তিটা চাপা দিতে পারছে না সে।
ধারা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেল। অকারণেই বুক ধুকপুক করছে তার। প্লেটটা টেনে নিয়ে দ্রুত খাবার তুলে দিতে দিতে আস্তে বলল, —” নাস্তা দিচ্ছি।”
শ্রাবণ কোনো জবাব দিল না। ধারা পরোটা তুলে দিল। ডিম দিল। পাশে চায়ের কাপ রাখল। তারপর খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,
—” মাথা…ব্যাথা করছে?”
শ্রাবণ এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলল। সোজা তাকাল ধারার দিকে। ধারা কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেল সেই দৃষ্টিতে। কারণ শ্রাবণের চোখদুটো আজ অন্যরকম। অদ্ভুত রকম গভীর। যেন কিছু খুঁজছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শ্রাবণ ধীর গলায় বলল,
—” একটা কথা ছিল..!”
ধারা তো চমকে তাকালোই, সাথে নীলও কৌতুহলী হয়ে তাকাল। শ্রাবণ ইতস্তত করল, বলল,
—” আমি রাতে…কখন এসেছি?”
ধারার হাত থেমে গেল। নীলও চুপচাপ দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। শুকনো ঢোক গিলে মেয়েটা বলল,
—” অনেক রাত হয়েছিল। মাঝরাতে এসেছিলেন।”
ভ্রু কুঁচকাল শ্রাবণ,
—” একা এসেছি?”
নীল খুব সাবধানে মুখ নিচু করে পানি খেতে লাগল, যেন সে কিছু শুনছেই না। ধারা ঠোঁট চেপে ভাবল কী বলবে। এরমধ্যে নীল চট করে বলল,
—”না ভাইয়া, একা আসোনি।”
ধারা আঁতকে উঠল। শ্রাবণ এবারে ধারার থেকে চোখ সরিয়ে নীলের দিকে তাকাল। এক মুহুর্তের জন্য ভয় পেল এই ভেবে নীল কোনোভাবে তাকে অন্য মেয়েটার সাথে দেখেছে কিনা। তবুও জিজ্ঞেস করল,
—” কে এনেছে?”
এইবার প্রশ্নটা শুনে ধারার বুক ধক করে উঠল। ধারা নীলের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বোঝালো না বলতে। নীল সেটা খেয়াল না করে নিজে থেকেই বলল,
—” আমি এনেছি ভাইয়া।”
কুঁচকানো ভ্রুজোড়া আরো কুঁচকে গেল শ্রাবণের।
—” তুই? তুই এনেছিস?”
—” হ্যাঁ ভাইয়া। আমি দাঁড়ি শেভ করার জন্য রেযার কিনতে গিয়েছিলাম সেসময়। ফেরার পথে তোমাকে পাশের রাস্তার ফুটপাতে হাঁটতে দেখি। তখন ওই অবস্থায় ছিলে..আমি ওখান থেকে তোমাকে নিয়ে এসেছি।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে নীলের কথা শুনলো। যদিও পছন্দ হলো না তার। শ্রাবণ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—” আচ্ছা। ”
শ্রাবণ আবারো তাকাল ধারার দিকে,
—” আমাকে ঘরে কে দিয়ে এসেছে? আমার জুতা, মোজা এসব কে খুলে দিয়েছে?”
ধারা চোখ পিটপিট করে ভাবল। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে আস্তে বলল,
—” নীল ভাই সব করেছে।”
শ্রাবণের চোখ আবারো ধীরে ধীরে নীলের দিকে গেল। নীল নিরীহ মুখ করে পরোটা ছিঁড়তে লাগল। এবারে তার মনে হলো সন্দেহজনক মনোনিবেশ করতে পারে শ্রাবণ শেখ। তবে শ্রাবণ কিছুই বলল না। ধারার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে খাবারের দিকে তাকাল। হঠাৎ থেমে গিয়ে নিচু গলায় বলল,
—” আমি…রাতে কিছু বলেছি কাওকে?”
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৬
প্রশ্নটা শুনে ধারা একেবারে স্থির হয়ে গেল। নীল তো বোকা বোকা দৃষ্টিতে দুদিকে মাথা নাড়াল। তবে ধারার মাথার মধ্যে ভেসে উঠল গতরাতে শ্রাবণের বলা সব আজগুবি কথাগুলো। আরেকটু হলেই মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল মেয়েটার। ধারা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল। বলল,
—” না তো।”
শ্রাবণ এবারে বিরক্তির শ্বাস ফেলে পুরোপুরি খাওয়াতে মনোযোগ দিল।
