শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৬
অনামিকা তাহসিন রোজা
ধারার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই মাতাল মানুষটাকে নিয়ে সে কীভাবে বাড়ি যাবে সেই চিন্তা করতে করতেই অস্থির হয়েছে মেয়েটা। শ্রাবণ রীতিমতো হেলতে দুলতে কোনোমতে দাঁড়িয়ে উল্টাবাল্টা বকছে। মাঝে মাঝে ধারাকে অচেনা মেয়ে ভেবে দুরে সরিয়ে দিচ্ছে। আবার গাছের সাথে চেপকে থাকছে। ধারা চোখ পিটপিট করে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে রইলো। দেখতে থাকল লোকটার আজব কর্মকাণ্ড। এরপর জোরপূর্বক শ্রাবণের বাহু আঁকড়ে ধরল। বলল,
—” প্লিজ আপনি শান্ত হোন। স্থির হয়ে দাঁড়ান একটু। আমার সাথে আসুন। বাড়িতে যেতে হবে।”
শ্রাবণ এক ধাক্কায় ধারার হাতটা সরিয়ে দিল। রীতিমতো ধারার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে কঠোর কন্ঠে বলল,
—” টাচ করবি না। দূরে যা নির্লজ্জ মহিলা। আমার বন্ধু টা কোথায়? কোথায় ওই বলদ টা? ইডিয়টটা আমাকে রেখে গেল কোথায়?”
—” আরে বাবা, আমি তো ধারা। চিনতে পারছেন না?’
ধারা শুনলো না শ্রাবণের কথা। আবারও সে শ্রাবণের বাহু আঁকড়ে ধরতে আসলে শ্রাবণ এবার নিজে থেকে অনেকটা দূরে ছিটকে সরে চিৎকার বলল,
—” এই মহিলা, আমার বউ আছে। সর সামনে থেকে। রাস্তা ছাড়। ”
রীতিমতো চমকে থমকে স্তব্ধ নয়নে শ্রাবণের দিকে তাকানো ধারা মুখ ফসকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,
—” এহ? কীহ?”
শ্রাবণ কিছু বলল না। সে নিজের মতো করে হেলতে দুলতে বিড়বিড় করতে থাকলো। আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে থাকলো জিহান নামক বলদটাকে। কেনো যে এতগুলো খেতে গেল সে। নেশা হয়ে যাবে বুঝতে পারেনি। ধারা স্তব্ধ নয়নে যখন দাঁড়িয়ে রইলো লোকটার দিকে, তখন শ্রাবণ নিজের মত করে হেলেদুলে উল্টো রাস্তা দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। আর বিড়বিড় করে গান ধরল-
—” একা একেলা মন
কোথায় করব এই রাত যাপন।
জিহানের বাচ্চা বলদটা গেল কোথায়?
আমি এখন কীভাবে ঘুমাব এই মাথা ব্যাথায়?”
উল্টোবাল্টা গাইতে গাইতে শ্রাবণ হেলেদুলে যেতে থাকল। কিছুক্ষণ চোখে অজস্র পানি নিয়ে ধারা তাকিয়ে রইল শ্রাবণের যাওয়ার দিকে। একটু আগে কি শ্রাবণ বউ আছে- এই অযুহাতে ধারাকে ধাক্কা দিয়ে সরাল? এটা কেমন সমীকরণ? শ্রাবণের বউ আরো আছে নাকি? ধারা অত বোকাও নয়। শ্রাবণ যে নেশায় তাকেই অন্য নারী ভাবছে তা বুঝলো সে। আর এক মুহুর্তের জন্য মনে ভালো লাগাও বয়ে গেল তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেয়েটা। এর পরে চোখের পানি মুছে আবারো নিজেও দৌড় দিল শ্রাবণের পিছু পিছু। কোনো কথা না বলেই তার পিছু পিছু হাঁটতে থাকল। সেও দেখতে চায় এই লোক এই অবস্থায় কতদূর হাঁটতে পারে, কতদূর যেতে পারে। কোথায় যেতে চায় সে?
বেশিদুর যায়নি শ্রাবণ। তার মস্তিষ্কের মতে অচেনা ভদ্রমহিলার থেকে দুরে যেতে কয়েক ফুট পেরিয়ে একটা সময় সে রাস্তার পাশে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। নেশার ঘোরে হুঁশ হারিয়ে পেছনের দিকে মাথা এলিয়ে দিল। সাথে সাথে পাশেই থাকা ল্যাম্পপোস্টের তীব্র আলো শ্রাবণের চোখে পড়ল। বিড়বিড় করে গালি দিয়ে সে দুই হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরল। কিন্তু সোজা হয়ে বসল না। শরীর আর কুলোচ্ছে না তার।
আশেপাশে পুরো অন্ধকার, স্তব্ধ নগরী। বেঞ্চের একপাশে শ্রাবণ এভাবে ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়লে ধারা একটু একটু করে এগিয়ে এসে বেঞ্চের পাশেই বসে। অনেকটা দূরত্ব নিয়ে নেয় শ্রাবণের থেকে। পাশে কেও বসেছে তা অনুভব করে শ্রাবণ আধবোঁজা ও বিরক্তিকর নয়নে তাকালো ধারার দিকে। চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্ত নিয়ে বলল,
—” এই বেয়াদব? কমনসেন্স নেই তোর? দুর হ এখান থেকে। ”
ধারা সহজ সরল কন্ঠে জবাব দিল,
—” কিন্তু আমি তো আপনাকে নিতে এসেছি।”
শ্রাবণ ত্যাড়া কন্ঠে জবাব দিল,
—” কেন রে? তুই কি আমার শাশুড়ি, যে তুই আমায় নিতে এসেছিস? দুরে থাকবি বলে দিলাম। এই রাত বেরাতে তুই বেডিমানুষ বাইরে কী করোস? বাপ ভাই নাই বাড়িতে?”
ধারা মুচকি হেসে দুদিকে মাথা নাড়াল,
—” আসলেই নেই। তবে..একটা মাত্র স্বামী আছে।”
শ্রাবণ মুখ কুঁচকে অনাগ্রহ নিয়ে অস্ফুটস্বরে বলল,
—” তো এখানে আমার সাথে চেপকে আছিস কেনো? তোর স্বামীর ঘাড়ে উঠে বসে থাক, যা ভাগ!”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকাল। বলতে চাইলো আপনার ঘাড়ে উঠে বসব কীভাবে? কিন্তু শ্রাবণ যে এসব সজ্ঞানে বলছে না তা তো সে জানে। তাই সেসবের আর জবাব দিল না। বরং হাসলো। বলল,
—” আমার স্বামী তাল গাছের মত লম্বা। তার ঘাড়ে বসতে পারবনা।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষন ভেবে বলল,
—” তোর জন্য সমবেদনার মালা দিলাম। এবার যা ভাগ এখান থেকে।”
ধারা আবারো দুদিকে মাথা নাড়ল,
—” আপনাকে না নিয়ে যাব না তো।”
শ্রাবণ মাথা এলিয়ে দিয়েই নিরেট স্বরে বলল,
—” তুই আমাকে নিয়ে যাওয়ার কে হ্যাঁ?”
ধারা চুপচাপ তাকিয়ে রইল। সে কখনোই বলবে না, সে কে? শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরক্তিতে চ শব্দ করে আবারো মাথা এলিয়ে দিল। এরপর সেভাবেই কয়েক সেকন্ড পর ধারাকে একইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” এত নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে কী দেখছিস? জীবনে হ্যান্ডসাম ছেলে দেখিস নাই?”
ধারা না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেলল। এটা মুখে বলল না, হ্যাঁ আসলেই দেখিনি। শুধু হাসল। শ্রাবণ মুখ কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ধারার হাসির দিকে। এরপরে খুব সতর্কতার সাথে একটু এগিয়ে এসে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” তোকে কোথায় যেন দেখেছি, চেনা চেনা লাগছে।”
ধারা মুচকি হেসে বলল,
—” হয়তো আপনার বাড়িতে দেখেছেন। ”
—” তুই আমার বাড়িতে কোন দুঃখে থাকবি? পরনারী আমার বাড়িতে থাকেনা। তোর মত কিডন্যাপার কেনো থাকবে?”
ধারা চোখ পিটপিট করল,
—’ আমি কিডন্যাপার?”
—” চেহারা দেখে তো তাই মনে হয়।”
ধারা কষ্ট পেল না, বরং মুচকি হাসলো। বলল,
—” কি করবেন বলুন। শুনেছি দারিদ্রতা নাকি চেহারাতেই ফুটে আসে। ছোট থেকেই…আসলে অনেক গরিব তো। সেজন্যই বোধহয় চেহারাতে গরীবী ভাবটা ফুটে উঠেছে।”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে বলল, —” হতে পারে।”
ধারা হেসে সামনের দিকে তাকালো। দু তিনটে কুকুর ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। একটা শান্তি কাজ করল তার মধ্যে। চুপচাপ বসে রইল সে। রাতটা কেমন অদ্ভুত শান্ত। দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে আধাআধি পড়েছে শ্রাবণের মুখে। চোখ দুটো আধবোজা, চুলগুলো এলোমেলো, শার্টের বোতামও একটা উল্টো লাগানো। এই মানুষটাকে দিনের বেলায় যতটা ভয়ংকর লাগে, এখন ঠিক ততটাই অসহায় লাগছে। ধারার বুকের ভেতর কেমন নরম একটা অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।
স্বাভাবিক অবস্থায় শ্রাবণ তো তার সাথে এভাবে বসেই না। কথা বলা তো দূরের কথা, ঠিকমতো তাকিয়েও দেখে না। অথচ আজ, এই নির্জন রাত, ফাঁকা রাস্তা, কুকুরের দূরের ডাক আর বেঞ্চের এক কোণায় বসে থাকা এই মাতাল মানুষটা, সবকিছু মিলিয়ে কেমন অন্যরকম লাগছে।
ধারা চুপচাপ শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, যদি সময়টা এখানেই থেমে যেত! যদি মানুষটা এভাবেই শান্ত হয়ে তার পাশে বসে থাকত। এই প্রথমবার তার মনে হলো—শ্রাবণ শেখ হয়তো মুখে যতটা কঠিন, ভেতরে ততটা না। খুব সম্ভবত মানুষটা নিজেও জানে না, সে কেমন অনুভব করে।
হঠাৎ শ্রাবণ আবারো চোখ কুঁচকে তাকাল তার দিকে। কিছুক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল। তারপর সন্দিহান গলায় বলল,
—” তুই…আসলে কে বল তো?”
ধারা ঠোঁট চেপে হাসল,
—” একজন মানুষ।”
—” না না…এত সহজ না। তুই অনেক সন্দেহজনক।”
—” তাই নাকি?”
—” হুম। তুই আমার পেছনে পেছনে ঘুরছিস কেনো? আমার কিডনি নিবি?”
ধারা এবার হেসেই ফেলল। চাপা হাসিতে কাঁধ কেঁপে উঠল তার। —” আপনার কিডনি নিয়ে আমি কী করব?”
শ্রাবণ গম্ভীর হয়ে বলল,
—” বিক্রি করবি। তারপর টাকা দিয়ে বিরিয়ানি খাবি।”
ধারা এবার মুখে হাত চাপা দিল। এত কান্নার মাঝেও হাসি পেয়ে গেল তার। কী অদ্ভুত মানুষ! কিছুক্ষণ আগেও এই মানুষটার কথায় বুক ফেটে যাচ্ছিল, আর এখন সেই মানুষটাই বসে বসে কিডনি চোরের গল্প করছে। শ্রাবণ আবারো বিড়বিড় করল,
—” তবে তুই দেখতে কিডনি চোরের মতো না।”
—” তাহলে কেমন?”
শ্রাবণ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, —” বাচ্চা বাচ্চা লাগে।”
ধারা এবার সত্যিই হেসে ফেলল। শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ রইলো আবার। বাতাসে তার শরীর থেকে হালকা নেশার গন্ধ ভেসে আসছে। তারপর আচমকাই সে খুব গম্ভীর হয়ে বলল,
—” শোন। তোর যদি স্বামী থাকে, তাহলে তার কাছে যা। আমি বিবাহিত। এখানে কিছু পাবিনা।”
ধারার হাসিটা একটু থেমে গেল। ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—” যদি স্বামী রাগ করে দূরে চলে যায়?”
শ্রাবণ চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দিল,
—” তাহলে কান ধরে টেনে নিয়ে আয়।”
ধারার বুকটা কেমন ধক করে উঠল। তবুও হাসল। বলল,
—” যদি কান ধরাতে রাগ করে?”
—” কেন করবে? পাগল নাকি?”
ধারা সন্দেহজনক মনে জিজ্ঞেস করল,
—” আপনার বউ আপনার কান ধরলে আপনি রাগ করবেন না?”
শ্রাবণ এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছে। তারপর মাতাল কণ্ঠেই খুব নিচু কিন্তু হতাশ স্বরে বলল,
—” ওই বান্দি তো এখন আমার কাছেই আসবে না। একবার কাছে এসে দেখুক। কান, নাক, চোখ, কিডনী, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড যা আছে- সব ওর নামে লিখে দিব।”
ধারা ফট করে অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। বোকা বোকা মনটা মানতেই চাইল না কথাটা। বরং সরল মনে ভাবলো আসলেই বোধহয় শ্রাবণের অন্য বউ আছে। কিন্তু সত্যি টা তো ধারাও জানে। এদিকে কথাটা বলেই হুট করে মাথায় কিছু একটা আসলো শ্রাবণের। সে দ্রুত এবারে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ে কোনোমতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
ধারা সাথে সাথে দাঁড়িয়ে শ্রাবণের বাহু আঁকড়ে ধরল। তড়িঘড়ি করে সামলানোর চেষ্টা করল,
—’ আরে আস্তে। পড়ে যাবেন তো।”
শ্রাবণ খিটখিটে মেজাজে ওকে দুরে সরিয়ে দিয়ে বলল,
—” আবে ধুর। পড়ে যাই আর মরে যাই, তোর তাতে কী আসে যায়? যার যাওয়া-আসার কথা তাকে দেখতে পাচ্ছি না আর আরেকজন এসেছে দরদ দেখাতে! শালার ফাটা কপাল আমার! সর, দুর হ।”
ধারার আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে থেকে এবার খুব জোরেই আঁকড়ে ধরতে গেল। কিন্তু তার আগেই শ্রাবণ আবার টাল সামলাতে না পেরে সামনে হোঁচট খেল। ধারা আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি করে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ফেলল। শ্রাবণ সাথে সাথে স্থির হয়ে গেল। দুজন খুব কাছাকাছি। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর নেশাভরা ঝাপসা চোখে ধারার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বিড়বিড় করল,
—” ধারা….?”
ধারা শ্রাবণের দিকে তাকাল। অবাক হয়ে বলল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ। চিনতে পেরেছেন?”
শ্রাবণ কিছু বলল না। কেমন যেন পাগলের মত চোখ বন্ধ করে হাসল। এরপর বেঘোরে থেকেই ধারার নাকে আঙুলের ডগা দিয়ে ছুঁয়ে কি যেন নিশ্চিতকরণ করল। এরপর আবারো হেসে তার গাল দুটো নিজের দুহাতে নিয়ে নিল। কাছে এসে বলল,
—” আমি…তোমার…
নেশায় আর টিকতে পারল না শ্রাবণ। ভরসাযোগ্য মানুষকে চিনতে পেরে নিজেকে আর ধরে রাখলোও না। কিছু একটা বলতে চাইল বোধহয়। কিন্তু আর না পেরে শেষে বিড়বিড় করতে করতেই হেলে পড়ল ধারার দিকে। হুঁশ হারিয়ে ধারার ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে দিল। এত বড় মানুষটাকে মেয়েটা সামলাতে পারল না। শ্রাবণ শরীরের পুরো ভার ছেড়ে দিলে ধারা নিতে না পেরে দুজন একসাথেই রাস্তায় বসে পড়ল।
ধারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাগ্যিস ফোনটা সাথে ছিল। ধারা প্রথমে ভাবল জিহানকে কল করবে, কেননা এত বড় গন্ডার সাইজের লোককে সে একা নিয়ে যেতে পারবেনা। কিন্তু পরে ভাবল, ঠিক হবেনা। তাই আর কোনো কিছু না ভেবেই নীলকে কল করল সে। এদিকে ধারার ঘাড়ে মাথা ঠেকিয়ে রাখা শ্রাবণ আরেকটু নড়েচড়ে ধারাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। অজান্তেই এমনটা হওয়ায় ধারাও শিউরে উঠল, চোখ পিটপিট করে শূন্যে দৃষ্টি রেখে শুকনো ঢোক গিলল। এ কি ঝামেলা। চেষ্টা করে লোকটাকে নড়াতেও পারল না মেয়েটা। বরং একটু ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করলে শ্রাবণ বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে নিয়ে আরেকটু গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরছে। গলায় মুখ গুঁজে আবেশে শ্বাস টানছে। শেষে ধারা হাল ছেড়ে দিলে শ্রাবণ ধারার গলার কাছে মুখ ঘষে বিড়বিড় করে বলে,
—” আবার তালাক চাইলে এই মুখটা ভেঙে দেব বেয়াদব।”
ধারা থম মেরে বসে রইল। বুকের ভেতরটা যেন ধপধপ করে কাঁপছে। রাতের ঠান্ডা বাতাসের মাঝেও তার গাল গরম হয়ে উঠল। সে মোটেই তখন তালাকের কথা বলতে চায়নি। একটুও চায়নি। রাগে দুঃখে আর জেদে মুখ ফঁসকে বেরিয়ে গেছে। নইলে এই কথা সে ভাবতেও পারে না। এমনটা হলে কি আর সে বাঁচবে নাকি? কখনোই না। নিজের কথাটার জন্য ভীষণ অপরাধবোধ অনুভব করল ধারা। তবে এই কথা যে শ্রাবণও অপছন্দ করেছে তা এখন টের পেল সে। শ্রাবণের মাথাটা এখনো তার কাঁধে ঠেসানো। ভারী শরীরের চাপে ধারা নড়তেও পারছে না ঠিকমতো।
নীল কল ধরলে ধারা ফোনটা কানে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
—” হ্যালো…নীল ভাই?”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর নীলের ঘুমজড়ানো কন্ঠ ভেসে এলো,
—” কে? ধারা? এত রাতে? কী হয়েছে? সব ঠিক আছে?”
ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে অসহায় গলায় বলল,
—” আমি…একটু বাইরে আছি। আপনি কি…একটু আসতে পারবেন?”
নীল এবার পুরো সজাগ হয়ে গেল,
—” বাইরে মানে? কোথায় তুমি, এত রাতে?’
ধারা তাড়াতাড়ি জায়গাটা আর পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বলল। তারপর নিচু গলায় যোগ করল,
—” উনি…মানে মিস্টার শেখ তো একটু অসুস্থ। একা নিতে পারছি না।”
” অসুস্থ” শব্দটা শুনেই নীল আর প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, —” তুমি দাঁড়াও। আমি আসছি।” কল কেটে গেল। ধারা ধীরে ফোনটা নামিয়ে আবার শ্রাবণের দিকে তাকাল। মানুষটা একদম বাচ্চাদের মতো জড়িয়ে ধরে আছে তাকে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে।
ধারা আস্তে করে বলল,
—” একটু সোজা হয়ে বসুন তো…প্লিজ।”
শ্রাবণ কোনো উত্তর দিল না। বরং নেশার ঘোরেই মুখটা আরো গুঁজে দিল তার গলার কাছে। উষ্ণ নিঃশ্বাসে শিরদাঁড়া কেঁপে উঠল ধারার। এরপর আবার অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করল,
—” তুমি অনেক বেয়াদব…অনেক।”
ধারা এবার না চাইতেও মুচকি হাসল। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা হাতের পিঠে মুছে নিয়ে বলল,
—” আচ্ছা, আমি বেয়াদব। এখন ছাড়ুন তো একটু।”
শ্রাবণ যেন শুনতেই পেল না। আধো ঘুমে আবারো বলল, —” আমার সাথে ঝগড়া করবা না।”
ধারা চুপ করে গেল। কথাগুলো খুব সাধারণ। অথচ কেন যেন বুকের ভেতর গিয়ে লাগল। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে শ্রাবণের এলোমেলো চুলের দিকে তাকাল। এই মানুষটাই কিছু ঘন্টা আগে তাকে কাঁদিয়েছে, অপমান করেছে, তালাকের কথা শুনে রেগে বেরিয়ে গেছে। অথচ এখন সেই মানুষটাই নেশার ঘোরে তার কাছেই ফিরে এসেছে। তার কাছেই শান্ত হয়ে আছে। কি আশ্চর্য! এই প্রথমবার তারা এত কাছে, তাইনা? ধারার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন ধ্বক করে ওঠা একটা ব্যথা হলো। খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
—” আপনি জানেনই না…আমি আরো কতটা বেয়াদব হতে পারি।”
মিষ্টি হাসি খেলে গেল ধারার ঠোঁটে। কাল সকালে বেচারা শ্রাবণ শেখের অবস্থা কী হবে তা- মনে করে তার ভীষণ হাসি পেল।
সকালের রোদ ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক গলে ঘরের ভেতর ঢুকছে। হালকা সোনালি আলো এসে পড়েছে এলোমেলো বিছানার উপর। বাইরে পাখির ডাক, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা থালাবাসনের শব্দ, আর দূরে কারো ঝাড়ু দেয়ার খসখস আওয়াজ। সব মিলিয়ে একদম সাধারণ একটা সকাল। শুধু শ্রাবণ শেখের মাথার ভেতরটা ছাড়া। বিছানার একপাশে কাত হয়ে পড়ে আছে সে। এখনো গতরাতের শার্ট গায়ে, হাতার বোতাম খোলা, চুল পুরো এলোমেলো। এক পা বিছানায়, আরেক পা প্রায় নিচে ঝুলে আছে। পাশে পড়ে থাকা বালিশটা মেঝেতে গড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কেউ রাতভর যুদ্ধ করে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
রোদের তীব্র আলোতে কপাল কুঁচকে ধীরে ধীরে চোখ খুলল শ্রাবণ। সাথে সাথেই তীব্র মাথাব্যথা কানের পাশ দিয়ে টনটন করে উঠল।
—” উফফ…” চোখ বন্ধ করেই কপালে হাত রাখল সে। গলা শুকিয়ে কাঠ। শরীরও অদ্ভুত ভারী লাগছে। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে শুয়ে থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসল। কিন্তু বসতেই ভ্রু আরো কুঁচকে গেল। সে এখানে..এভাবে? কীভাবে এলো? সে না জিহানের সাথে ছিল? চোখ ঘুরিয়ে পুরো ঘরটা দেখল শ্রাবণ। নিজের ঘর। নিজের বিছানা। কিন্তু…কখন এসেছে? মনে করার চেষ্টা করতেই মাথার ভেতর ঝাপসা ঝাপসা কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল। ক্লাব। জিহান। গ্লাস। তারপর…? এরপর আর কিছুই পরিষ্কার না।
শ্রাবণ বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতর যেন কুয়াশা জমে আছে। যতই মনে করতে চাইছে, সবকিছু আরো গুলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই তার নাকে হালকা একটা ঘ্রাণ এসে লাগল। মিষ্টি, খুব নরম একটা সুগন্ধ। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে নিজের শার্টের কলারের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে শার্টটা নাকের কাছে আনল। তারপরই মুখটা অদ্ভুতভাবে থেমে গেল। ঘ্রানটা সুন্দর তো। মেয়েলি ঘ্রান না? এক মুহূর্তে বুকের ভেতর কেমন ধাক্কা খেল সে।
সাথে সাথে মাথার মধ্যে খুব অস্পষ্টভাবে একটা দৃশ্য ঝলকে উঠল, কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। নরম একটা কণ্ঠ। আর সে যেন কারো ঘাড়ে মুখ গুঁজে ছিল। শ্রাবণ হঠাৎ তড়িঘড়ি করে চোখ মেলে সোজা হয়ে বসল।
—” What the…”
নিজের মাথায় নিজেই হাত বুলিয়ে অস্থির হয়ে গেল সে। কিছুই পরিষ্কার মনে পড়ছে না। শুধু মনে হচ্ছে গতরাতে ভয়ানক কিছু একটা করেছে সে। শুধু বারবার এটা মনে পড়ছে যে গতরাতে কোনো একটা মেয়ের সাথে সে কথা বলেছে। সেই মেয়েকে জড়িয়েও ধরেছে। ঘৃনায় গা গুলিয়ে এলো শ্রাবণের। পরনারীর স্পর্শ নিয়েছে সে? ছিহ! সাথে সাথে গায়ের শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলে সে নিজের চুল চেপে ধরল।
শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৫
—” শিট শিট শিট! কে ছিল মেয়েটা? কোন মেয়ের সাথে আমি এমন করেছি? হোয়াট দ্যা হেল! আমি কীভাবে…ওহ গড! ”
কিছু একটা ভেবে আবারো তটস্থ হলো শ্রাবণ। বিড়বিড় করল,
—” সবচেয়ে বড় কথা, আমি তো জিহানের সাথে ছিলাম। এখানে অন্য মেয়ে কীভাবে আসবে? আর আমাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে কে?”
