Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৫

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৫

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৫
অনামিকা তাহসিন রোজা

—” হ্যালো আসসালামু আলাইকুম জিহান ভাইয়া।”
মিষ্টি সুরেলা কন্ঠ শুনে চোখ পিটপিট করে নিজের ফোনের দিকে তাকাল জিহান। সালমা বেগমের নাম্বার থেকে কল এসেছে, তাহলে এই মিষ্টি কন্ঠওয়ালি মেয়েটা কে বুঝতে পারল না সে। মাথা চুলকে বোকার মত বলল,
—” জ্বি, কে আপনি?”
ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করে ফোনটা শক্ত করে ধরে বলল,
—” আমি…আমি ধারা। আপনি কি জিহান ভাইয়া বলছেন?”
তটস্থ হয়ে স্তম্ভিত জিহান একদম সটান হয়ে দাঁড়াল। একবার টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হেসে বলল,

—” হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই জিহান। ভালো আছেন ভাবি? সব ঠিক তো?”
এত বড় একজন লোকের কাছে ভাবি ডাক শুনে একটু অস্বস্থি অনুভব করল ধারা। তবে ভালোও লাগলো এক মুহুর্তের জন্য। শুকনো ঢোক গিলে এবার৷ জিজ্ঞেস করল,
—” ভা-ভাইয়া, উনি কি..আপনার সাথে আছেন? আপনি কি জানেন উনি কোথায়?”
জিহানের মন চাইলো গড়গড় করে সত্যি কথা বলে দিতে,—” জ্বি অবশ্যই। সেই মহারাজ আমার সাথেই রয়েছে। বর্তমানে তিনি হালকার উপর ঝাপসা করে গরম গরম ছ্যাঁকার অনুভূতি পাওয়ায় অতি বিষাক্ত তরল পদার্থ গিলে জ্ঞান হারিয়েছেন।”
কিন্তু সেটা বলতে না পেরে জিহান আফসোস করল। এবং কিছু একটা বানিয়ে বানিয়ে বলতে চাইলে হুট করে জিহানের মাথার বুদ্ধির হলদে বাতি টং করে জ্বলে ওঠে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটা জবরদোস্ত পরিকল্পনা শেষে জিহান খুব দুঃখী মনে বলে,
—” আসলে কী হয়ে বলুন তো ভাবি। একটা ঝামেলা হয়ে গেছে।”
ধারার কলিজা কেঁপে উঠল বোধহয়। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ফোনটা শক্ত করে ধরল সে,

—” কী-কী হয়েছে ভাইয়া? উনি ঠিক আছেন তো?”
—” না মানে, আসলে কীভাবে যে বলি…
—” প্লিজ বলুন না ভাইয়া। আমি অনুরোধ করছি। উনি কোথায়? ঠিক আছেন তো? কীসের ঝামেলা?”
জিহান এবারে নাটকীয় ভঙ্গিতে জ্ঞান হারানো শ্রাবণের পিঠে চাটি মেরে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দুঃখী মনে বলল,
—” আসলে ভাবি, ও আমার কাছে এসেছিল। তো, আমি বললাম ঠিক আছে, আজকের রাতটা আমার সাথে থেকে যা। কিন্তু ও শুনলো না। ওর একটা বাজে বন্ধু আছে, নাম হলো উম…যাক হবে কিছু একটা। খুব জঘন্য ছেলে ও। নেশাপানি করে সারাদিন। আমার কথা না শুনে, শ্রাবণ সেই বন্ধুর হাত ধরে ছাইপাঁশ গিলতে চলে গেল।”
ধারা আঁতকে উঠে মুখে হাত রাখল,
—” হায় আল্লাহ! আপনি যেতে দিলেন কেনো? এখন কী হবে?”
জিহান এবার এমন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ তার কাঁধে এসে পড়েছে। পাশে মাথা টেবিলে ঠেকিয়ে আধমরা হয়ে পড়ে থাকা শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, —” মাফ করিস দোস্ত। তোর সংসার টিকানোর জন্য আমাকে আজ মহান অভিনেতা হতে হবে।”
এরপর গলা নামিয়ে ভীষণ গম্ভীর স্বরে বলল,

—” আসলে ভাবি সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। আপনি তো জানেন না, এসব জায়গা কেমন হয়। আমি অনেক আটকেছি। কিন্তু শ্রাবণ একদম শুনলো না। ওর ওই বন্ধুটা বলল—’একদিন খেলে কিছু হয় না।’ ব্যাস! তারপর থেকেই সর্বনাশ। আমাকেও সাথে নিয়ে এলো!”
ধারার হাত ঠান্ডা হয়ে এলো। সে সোফার এক কোণ শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল,
—” উনি…উনি কি ঠিক আছেন এখন?”
জিহান চোখ পাকিয়ে টেবিলে ছড়িয়ে থাকা গ্লাসগুলোর দিকে তাকাল। তারপর নাটকীয় কন্ঠে বলল,
—” মানে…হুম…একভাবে ঠিকই আছে। তবে একটু আগে কী হলো জানেন? শ্রাবণ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল—’আমি উড়তে পারি।’ তারপর সোজা গিয়ে দরজার সাথে ধাক্কা খেল।”
ধারা আতঙ্কে হাঁ করে ফেলল,
—” ইন্না লিল্লাহ! মাথায় লেগেছে নাকি?”
জিহান ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে ধরে কষ্টের অভিনয় করে বলল, —” আল্লাহর রহমত যে দেয়ালটা শক্ত ছিল। নাহলে দেয়ালটাই ভেঙে যেত।”
ধারা প্রায় কেঁদেই ফেলল,

—” ভাইয়া আপনি হাসছেন কেনো? উনি পড়ে গেলে যদি কিছু হয়ে যেত! আঘাত পেলেও তো সমস্যা।”
—” আরে না না, আমি হাসছি না ভাবি। আসলে আমি নিজেই টেনশনে আছি। একটু আগে তো সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেও শুরু করেছিল।”
ধারার বুক ধক করে উঠল, —” কাঁদছিলেন?”
—” জ্বি। বলছিল ‘আমার জীবন শেষ। পৃথিবী নিষ্ঠুর। সবাই আমায় ছেড়ে চলে যাবে।’ তারপর আবার পাঁচ মিনিট পর বলল ‘আমি সিংহ।’ এরপর একটা ওয়েটারকে দেখে বলল ‘এই যে পেঙ্গুইন ভাই, পানি দেন।”
এবার সত্যিই ধারার চোখে পানি চলে এলো। বেচারির মাথাও কাজ করলো না। সব কিছু গুরুতর পরিস্থিতি ভেবে অসহায় গলায় বলল,
—” ভাইয়া প্লিজ, উনাকে বাড়ি নিয়ে আসুন না।”
জিহান এবার আরো দুঃখী গলায় বলল,
—” সেখানেই তো সমস্যা ভাবি। আমি তো আনতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই বদমাশ বন্ধুটা বলল—’আমি ওকে পৌঁছে দিচ্ছি।’ তারপর জোর করে শ্রাবণকে নিয়ে বের হয়ে গেল।”
ধারা আতঙ্কে হাঁপিয়ে উঠল, —” তারপর?”
জিহান টেবিলে আঙুল ঠুকল। মুখে এমন ভাব আনল যেন ভয়ংকর ট্র্যাজেডি ঘটেছে,

—” তারপর আধ ঘন্টা পর আমি খবর পেলাম…ওই লোকটা নাকি শ্রাবণকে রাস্তার পাশে নামিয়ে দিয়েই চলে গেছে।”
—” কীইই?”
ধারার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে তড়িঘড়ি দুহাতে ফোন চেপে ধরল। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে,
—” রাস্তার পাশে রেখে গেছে মানে? উনি একা এখন?”
জিহান চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল,
—” হুম। আর শ্রাবণের তো এখন ঠিকমতো হাঁটারও অবস্থা নেই। আমি যতদূর আন্দাজ করতে পারছি বেচারা হয় ফুটপাতেই পড়ে আছে, আর নইলে এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে উষ্ঠা খেয়েছে।”
ধারার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসল। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কেউ পাথর চেপে ধরেছে। কাঁপা গলায় বলল, —” এই রাতে? একা একা…এ অবস্থায়? উনি…উনি যদি পড়ে যান? যদি গাড়ির সামনে চলে যান? যদি—”

—” ভাবি আমি তো সেই ভয়টাই পাচ্ছি। এই শহর ভালো না। তার উপর ওর ফোনও বন্ধ। মাতাল মানুষ আবার কখন কী করে বলা যায় না। একটু আগে তো একটা কুকুরকে দেখে বলছিল—’এই জিহান, তোর দাড়ি কবে গজালো?”
ধারা এবার সত্যিই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল,
—” ভাইয়া কিছু একটা করুন না! প্লিজ! আপনি গিয়ে খুঁজুন উনাকে।”
জিহান মনে মনে বলল, —” ব্যাস! মাছ টোপ গিলেছে।”
কিন্তু বাইরে থেকে গভীর চিন্তিত স্বরে বলল,
—” আমি তো খুঁজতেই বের হতাম ভাবি। কিন্তু আমি এখন শহরের একদম অন্য পাশে। পৌঁছাতে অনেক দেরি হবে। ”
ধারা কাঁদতে কাঁদতেই বলল,

—” তাহলে এখন কী হবে?”
জিহান ঠোঁট চেপে হাসি সামলে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, —” একটা উপায় আছে অবশ্য…”
ধারা নিঃশ্বাস আটকে বলল, —” কী উপায়?”
জিহান ধীরে ধীরে শ্রাবণের দিকে তাকাল। তারপর নাটকীয় বিরতি নিয়ে বলল,
—” যদি কোনোভাবে শ্রাবণ নিজে থেকে বাড়ি ফিরতে চায়…তাহলে হয়তো ফিরবে। কারণ নেশার ঘোরেও মানুষ শেষ পর্যন্ত সেই জায়গাতেই ফিরে যেতে চায়, যেটাকে নিজের আশ্রয় মনে হয়।”
ধারা কিছু বুঝলো না। বলল,
—” উনি যদি সত্যিই হুঁশে না থাকেন তাহলে কখনোই ফিরতে পারবে না একা একা। হায় আল্লাহ! কোথায় আছে এখন কে জানে? কীভাবে খুঁজব?”
জিহান আবারো তড়িঘড়ি করে বলল,
—” ভাবি, সে কিন্তু বাড়ির অনেক কাছেই। ওই বদমাশ ছেলেটা যেই রাস্তায় ওকে নামিয়ে দিয়েছে, সেটা আপনাদের বাড়ির পাশেই তো। ওইযে মুদির দোকানটা আছে না? ওটার বামে যেই রাস্তা, সেটা। ”
ধারা চোখের পানি মুছে সতর্ক হলো। একটু ভেবে বলল,
—” ওইযে রামু কাকার মুদির দোকানের পাশে?”
জিহান মাথা নেড়ে বলে,

—” জ্বি ভাবি। ”
ধারা একটুখানি ভেবে উপরের ঘরগুলোর দিকে তাকাল। সালমা বেগম ঘুমিয়ে গিয়েছেন৷ নীলও নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে। কাওকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করল না ধারার। সে ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভেবে শেষে বলেই ফেলল,
—” আচ্ছা আমি তাহলে সেই রাস্তার দিকে যাই। যেহেতু পাশেই। আমি একা পারব মনে হয়।”
ধারার কথাটা শুনে জিহানের চোখ চকচক করে উঠল। মনে মনে সে এমন একটা বিজয়ী হাসি দিল, যেন বিশ্বযুদ্ধ জিতে ফেলেছে। কিন্তু বাইরে থেকে গলা কাঁপিয়ে ভীষণ চিন্তিত স্বরে বলল,
—” না না ভাবি! আপনি একা বের হবেন? এই রাত বারোটায়? এটা কি ঠিক হবে?”
এদিকে এক হাতে ফোন কানে চেপে ধরে অন্য হাতে আধবেহুঁশ শ্রাবণকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে জিহান। কিন্তু শ্রাবণ শেখ নামক ছয় ফুটের পাহাড়টা নড়ছেই না। বরং শ্রাবণ টেবিল আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে বলল, —” অভদ্র মেয়ে..লবণ ঠিকই ছিল…”
জিহান চোখ কপালে তুলে ফিসফিস করে বলল,

—” ইয়া আল্লাহ! নেশার মধ্যেও লবণ মনে আছে!”
ধারা ফোনের ওপাশ থেকে আতঙ্কিত স্বরে বলল,
—” ভাইয়া? কিছু বললেন?”
—” না না ভাবি! আমি বলছিলাম, সাবধানে যাবেন। মানে…রাস্তা কিন্তু অন্ধকার।”
বলতে বলতেই কোনোমতে শ্রাবণের এক হাত নিজের কাঁধে তুলে নিল জিহান। সঙ্গে সঙ্গে নিজের কোমড়ে টান খেয়ে মুখ বিকৃত হয়ে গেল তার,
—” উফফ! এই শালা ব্যাটা মানুষ নাকি আলমারি!”
—” জ্বি? কী বললেন ভাইয়া?”
—” না মানে…আমি বলছিলাম, আল্লাহ ভরসা।”
ধারা এদিকে তাড়াহুড়ো করে ওড়না মাথায় টেনে নিল। কাঁপা গলায় বলল,
—” আমি দ্রুত দেখে আসছি। যদি উনাকে পাই…”
জিহান এবার কষ্ট করে শ্রাবণকে আধা টেনে আধা কাঁধে নিয়ে ক্লাবের বাইরে বের হতে বের হতে বলল, —” ভাবি, একটা কথা শুনুন।”

—” জ্বি?”
—” আপনার অতি সম্মানীয় পতি যদি একটু উল্টাপাল্টা কথা বলে, ভয় পাবেন না। নেশার মধ্যে মানুষ অনেক কিছুই বলে। একটু আগে আমাকে দেখে বলছিল—’তুই দেখতে দুইয়ের মত কেনো?”
ধারা কিছুই বুঝল না, —” দুইয়ের মত মানে?”
জিহান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—” আমিও বুঝিনি ভাবি।”
পার্কিং লটে পৌঁছে কোনোমতে গাড়ির দরজা খুলল সে। তারপর ঠাস করে শ্রাবণকে সিটে ফেলে দিয়ে হাঁপাতে লাগল। শ্রাবণ চোখ না খুলেই বিড়বিড় করল, —” আমি ডিভোর্স দেবো না…”
জিহান স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে দুই সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর চাপা হাসি দিয়ে বলল,
—” ব্যাস! এটাই তো শুনতে চেয়েছিলাম।”
ওপাশে ধারা উৎকণ্ঠায় বলল,
—” ভাইয়া? আপনি কিছু বললেন?”
জিহান তড়িঘড়ি ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে বলল,
—” না না, ও কিছু না। আপনি বরং বের হওয়ার আগে দরজা ভালো করে লাগিয়ে যান। আর ফোনটা কানে রাখবেন। ওই শালাকে দেখলে আমায় জানাবেন, যেহেতু একা যাচ্ছেন, আমার কল কাটবেন না।”
ধারা মাথা নেড়ে বলল, —” আচ্ছা।”
এরপর এক বুক সাহস নিয়ে ধীরে ধীরে সদর দরজার ছিটকিনি খুলল ধারা। সত্যি, মানুষ কত কী-ই বা করতে পারে? প্রেমে পড়লে, ভালোবাসলে মানুষের কত কিছুরই পরিবর্তন হয়। নইলে এত রাতে কি ধারা একা বেরোনোর সাহস করতো? রাতের নিস্তব্ধতা যেন হুহু করে ঢুকে পড়ল বুকের ভেতর। বাইরে নির্জন রাস্তা। দূরে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। এদিকে জিহান দ্রুতবেগে গাড়ি চালাতে চালাতে এক হাতে ফোন ধরে রেখেছে। আরেক দিকে শ্রাবণ সিটে এলিয়ে পড়ে বিড়বিড় করছে,

—” ওই বেয়াদব কেনো তালাকের কথা বলল?”
ঘুম ছুটেছে, কিন্তু নেশা কাটেনি। জিহান চোখ ঘুরিয়ে বলল, —” কারণ তুই একটা গাধা বন্ধু।”
তারপর আবার ফোনে নরম গলায় বলল,
—” ভাবি, আপনি এখন কোথায়?”
ধারা বলল,—” বেরিয়েছি। মেইন গেইট পার হলাম।”
জিহান দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল রাস্তার দিকে। রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে। আশেপাশে মানুষজন নেই বললেই চলে। স্ট্রিটলাইটের হলদেটে আলোয় নির্জন রাস্তাটা আরো ফাঁকা লাগছে। দূরে একটা কুকুর ডাস্টবিন ঘাঁটছে। গাড়ির স্পিড আরো বাড়িয়ে দিল জিহান। ফোন কানে চেপে বলল,
—” ভাবি ভয় পাবেন না। রাস্তার বাম পাশ দিয়ে হাঁটবেন।”
ধারা এদিকে বুক ধড়ফড় নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে। ওড়না শক্ত করে জড়িয়ে নিয়েছে গায়ে। চারপাশে এত নীরবতা যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছে সে। জিহান হালকা বাঁক নিয়ে গাড়িটা ঢুকিয়ে দিল সেই পরিচিত রাস্তায়। সামনেই রামু কাকার মুদির দোকান। দোকান বন্ধ। টিনের শাটার নামানো। তার একটু পরেই রাস্তার পাশে বড় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। জিহানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।

—” পারফেক্ট।”
সে দ্রুত গাড়িটা গাছটার পাশে থামাল। তারপর পেছনে ঘুরে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ আধখোলা চোখে জিহানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে,
—” শালা তুই কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমায়? আমি কিন্তু খারাপ মানুষ না!”
জিহান নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” জানি দোস্ত। কিন্তু তুই একটা ভয়ংকর বোকা।”
এরপর কোনোমতে দরজা খুলে শ্রাবণকে নিজের কাঁধে টেনে নামাল সে।
সঙ্গে সঙ্গে কঁকিয়ে উঠল,
—” উফফ! এটা মানুষ না, সিমেন্টের বস্তা! শালা তুই কি ছোটবেলায় হরলিক্সের বোতলগুলোও খেয়েছিস?”
শ্রাবণ দাঁড়াতেই পারছে না। পুরো শরীরের ভর জিহানের উপর ছেড়ে দিয়েছে। এক পর্যায়ে প্রায় টেনেহিঁচড়ে তাকে গাছটার নিচে এনে ফুটপাতের উপর বসিয়ে দিল জিহান। শ্রাবণ মাথা হেলিয়ে গাছের গুঁড়িতে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল। চুল এলোমেলো। শার্টের বোতাম দুটো খুলে গেছে। ঘেমে গেছে কিছুটা। তাকে দেখে সত্যিই মনে হচ্ছে কোনো বিপর্যস্ত মাতাল পথ হারিয়ে বসে আছে।
জিহান দুই হাত কোমড়ে রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বন্ধুর দিকে। তারপর নিচু হয়ে শ্রাবণের গালে চাপড় মেরে বলল,

—” এই শালা শুন, তোর বউ আসছে। এখন বাকি কাজ তোর।”
শ্রাবণ চোখ না খুলেই অস্পষ্ট স্বরে বলল,
—” শালা বেইমান! তুই আমায় এখানে নিয়ে এলি কেনো? আমাকে কোথায় ফেলে রেখে যাস ইডিয়ট!”
জিহান আরেকটা চাপড় মেরে বলল,
—” সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো আমাকে যেসব অশ্লীল কথা বলেছিস, ওসব আবার বলবি ঠিক আছে? ভদ্র বাচ্চার মত সব উগলে দিস, কেমন? বেস্ট অফ লাক। নেশা কাটলে সকালে কল দিস।”
জিহান মিটিমিটি হেসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর দ্রুত গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। যাওয়ার আগে আবার ফোনে বলল, —” ভাবি, আপনি কি ওই রাস্তার কাছাকাছি চলে এসেছেন?”
ধারা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—” জ্বি… আমি প্রায় চলে এসেছি।”
জিহান গাড়ি ধীরে ধীরে অন্ধকার গলির দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল, —” ভালো করে দেখবেন। হয়তো রাস্তার পাশেই কোথাও আছে।”
তারপর গাড়িটা নিয়ে আড়ালে মিলিয়ে গেল সে। কিন্তু যাওয়ার সময়ও নিজের হাসি থামাতে পারল না।
—” আহ্ জিহান, তুই জিনিয়াস!”

ধারা কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে চলেছে। চারপাশ এতটাই নির্জন যে নিজের স্যান্ডেলের শব্দও কানে বিঁধছে তার। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ হচ্ছে অবিরাম। এক হাতে ওড়না আঁকড়ে ধরেছে, আরেক হাতে ফোন। জিহান ওপাশ থেকে মাঝেমধ্যে বলছে,
—” ভাবি সাবধানে… সামনে দেখুন… রাস্তার পাশে ভালো করে খেয়াল করুন।”
ধারা দ্রুত চোখ বুলাতে বুলাতে হাঁটছে। হঠাৎ করেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল রাস্তার বাঁ পাশে বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে। কারো ছায়ামূর্তি। ধারার পা থেমে গেল। স্ট্রিটলাইটের ম্লান আলোয় এলোমেলো চুল, দেয়ালে হেলান দেয়া ক্লান্ত শরীর, অর্ধেক খোলা শার্ট… মাথা নিচু করে বসে আছে শ্রাবণ। মুহূর্তের মধ্যে বুক থেকে যেন বিশাল একটা পাথর নেমে গেল ধারার। চোখ ভিজে উঠল সাথে সাথেই।
—” ভাইয়া…!”
তার গলা কেঁপে উঠল।
জিহান তড়িঘড়ি করে বলল,
—” কী হয়েছে ভাবি?”
ধারা চোখ মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বলল,
—” পেয়েছি… উনি এখানে। গাছের নিচে বসে আছেন।”
জিহান মনে মনে বলল, —” আলহামদুলিল্লাহ। মিশন সফল।” কিন্তু বাইরে থেকে ভীষণ চিন্তিত স্বরে বলল,
—” আল্লাহর রহমত! সে ঠিক আছে তো?”

ধারা ধীরে ধীরে শ্রাবণের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, —” জানি না… কিন্তু এখানে আছেন।”
কাছে যেতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। শ্রাবণ শেখকে কখনো এভাবে দেখেনি ধারা। সবসময় শক্ত, গম্ভীর, অহংকারী মানুষটা আজ অসহায় হয়ে ফুটপাতে বসে আছে। মাথা এলিয়ে পড়েছে পাশে। চোখ বন্ধ। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। এতটা ভঙ্গুর অবস্থায় দেখে সহ্য করতে পারল না মেয়েটা। ধারার হঠাৎ ভীষণ মায়া লাগল। এত রাগ, এত অভিমান, এত কষ্ট, সবকিছু এক মুহূর্তে কেমন যেন গলে গেল। সে হাঁটু গেড়ে শ্রাবণের সামনে বসে পড়ল। কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে শ্রাবণের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল কপাল থেকে। নরম গলায় ডাকল,
—” শুনছেন…?”
শ্রাবণ চোখ খুলল না। নড়লও না। বেহুঁশ অবস্থায় কি এত নরম কন্ঠ কানে যায়? ধারার বুক কেঁপে উঠল। ওপাশে জিহান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, —” ভাবি?”
ধারা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তাড়াতাড়ি বলল,

—” জ্বি ভাইয়া…”
—” আপনি পারলে হারামি টাকে নিয়ে বাসায় চলে যান। মনে হচ্ছে এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি কল রাখছি তাহলে। কোনো সমস্যা হলে আবার ফোন দিবেন।”
ধারা মাথা নেড়ে বলল,
—” আচ্ছা ভাইয়া। অনেক ধন্যবাদ।”
জিহান হাসি চেপে গম্ভীর স্বরে বলল,
—” আরে না না, ধন্যবাদ কিসের। অপদার্থটা তো আমার বন্ধুও।”
তারপর কল কেটে দিল। কল কেটে যেতেই নির্জন রাতটা আরো নিঃশব্দ হয়ে গেল। ধারা ধীরে ধীরে শ্রাবণের পাশে বসে রইল। কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই থাকল তার দিকে। মনে হচ্ছিল এই মানুষটা যতই রাগী হোক, যতই কষ্ট দিক… তবুও এই মানুষটার কিছু হয়ে গেলে সে বাঁচতে পারবে না।
ধারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশেপাশে তাকাল। নাহ, কেও নেই। একদম নির্জন জায়গা। তবে এলাকাটা খারাপ নয় তাদের। চারিদিকে বেশ কৃত্রিম আলোর ছড়াছড়ি। ধারা ঠোঁট ভিজিয়ে ভাবল এই এত বড় মানুষটাকে কীভাবে নিয়ে যাবে। এরপর শ্রাবণের বাহু ঝাঁকায় সে,

—” শুনছেন? শুনতে পাচ্ছেন? উঠুন!”
ধারা আবারো একটু ঝুঁকে এসে শ্রাবণের কাঁধে হাত রাখল। নরম গলায় ডাকল,
—” শুনছেন? উঠুন… বাসায় যেতে হবে।”
কোনো সাড়া নেই। ধারা এবার একটু জোরে ঝাঁকাল,
—” শেখ সাহেব!”
ভ্রু কুঁচকে হালকা নড়ল শ্রাবণ। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল সামান্য। দৃষ্টি পুরো ঝাপসা। সামনে বসে থাকা মানুষটার অবয়বও ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না সে। ধারা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল,
—” আলহামদুলিল্লাহ! উঠুন, চলুন..
কিন্তু হঠাৎই শ্রাবণের চোখ বড় হয়ে গেল। সে যেন ভয় পেয়ে গেল আচমকা। এক ঝটকায় ধারার হাত সরিয়ে দিয়ে টলতে টলতে দাঁড়িয়ে পড়ল,

—” এই কে আপনি?!”
ধারা থমকে গেল।—” জি?”
শ্রাবণ পিছিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু নেশায় শরীরের ভারসাম্য নেই। গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলাল। কুঁচকে থাকা চোখে আবার তাকাল ধারার দিকে,
—” কে… কে আপনি? আমার কাছে আসবেন না!”
ধারা এবার পুরো আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল।
—” আমি… আমি ধারা।”
শ্রাবণ সাথে সাথে মাথা নাড়ল। বিশ্বাস করল না সে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করল চোখদুটো খুলে ভালো করে দেখার, কিন্তু সেটাও পারল না। তারপর কপালে হাত দিয়ে চোখ ছোট ছোট করে তাকানোর চেষ্টা করল,
—” এই মহিলা! কে রে তুই? দুরে থাক।”
ধারা হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। এরপর বিরক্ত হয়ে বলল,
—” হায় আল্লাহ! আমি ধারা!”
শ্রাবণ ভয়ার্ত চোখে আরো এক পা পিছিয়ে গেল,
—” মিথ্যা কথা! আপনি আমাকে অপহরণ করতে এসেছেন? দুরে যান অভদ্র বেলাজ মেয়েমানুষ!”
ধারার মুখ হাঁ হয়ে গেল।
—” কীইই?”
শ্রাবণ দেয়ালে হাত রেখে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রইল। মাথা দুলছে। চোখ আধবোজা। তবুও সন্দেহভরা গলায় বলল,

—” দূরে থাকুন। আমি ভদ্রলোক।”
ধারা এবার কপালে হাত ঠুকল। বিড়বিড় করল,
—” নেশা করলে আসলেই মানুষের মাথা ঠিক থাকে না।”
শ্রাবণ কষ্ট করে আঙুল তুলে বলল,
—” আপনি… আপনি বেশি কাছে আসবেন না। চার হাত দুরে থাকুন। দুরে। একদম দুরে। ওই রাস্তার ওপারে চলে যান। আমি চিনি না আপনাকে।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৪

ধারা রাগে আর হতাশায় ফুঁসে উঠে বলল। চেনে না মানে? অপমান অপদস্ত করার সময় তো ঠিকই চিনে। ধারা একটু এগিয়ে গিয়ে টলতে টলতে প্রায় পড়ে যেতে থাকা শ্রাবণের হাত ধরার চেষ্টা করতেই শ্রাবণ আবারো চেঁচাল,
—” এই মহিলা, সমস্যা কী তোর? বললাম না কাছে আসবি না। যা দুরে থাক। হুশ হুশ সর!”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here