Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৮

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৮

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৮
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’শুতে আসছেন না কেনো? ভালো লাগছে না আমার।’
প্রিয়ার দূর্বল ,মিনমিনে কন্ঠে ল্যাপটপ বন্ধ করে তাকালো আকাশ। টেবিল ল্যাম্পের আলো একদম কমিয়ে দিলো। প্রিয়া ঘুমায়নি এখনো? অথচ সে তো ভেবেছে ঘুমিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। আকাশ টি শার্ট টা টেনে ঠিক করতে করতে এগিয়ে এসে বসলো প্রিয়ার পাশে। চাদর গলিয়ে হাত ভিতরে দিয়ে মেয়েটার তলপেটের কাছে দেওয়া হট ব্যাগ টা চেক করলো। পানি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। নরম স্বরে বললো,
—’পেট ব্যাথা কমেনি? পানি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে বলো নি কেনো?’
প্রিয়ার চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে। আহ্লাদী কন্ঠে জবাব দেয়,
—’কোমড়, পা, পেট সব ব্যাথা করছে। একটুও কমেনি।’
আকাশ সময় দেখে। কতবার যে গরম পানি করে এনে দিলো! ওষুধ খায়িয়ে দিলো। সারারাত জেগে বসে আছে– মেয়েটার কখন কি প্রয়োজন হয়! অথচ মেয়েটা শান্তিতে ঘুমাতেই পারছে না।
আকাশ পেটের কাছ থেকে ঠান্ডা হয়ে আসা ব্যাগটা সরিয়ে নিতে নিতে বললো,

—’আবার নিয়ে আসছি। শুয়ে পরো কেমন? নড়াচড়া করবে না। যাবো আর আসবো।’
ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আকাশ সোজা নিচে গেলো না। মেয়েদের এ সময় কি প্রয়োজন হয়, বা প্রিয়ারই বা কি করলে ব্যাথা করে আইডিয়া নেই তার। একসাথে এক ঘরে থাকে এতগুলো মাস। প্রিয়ার এমন অবস্থা আগে হয়নি। খানিক ইতস্তত করলো আকাশ। শিয়ার শরীরটাও ভালো নেই। এই অবস্থায় সারাদিন অফিস করে এসে ঘুমায় একটু। দূর্বল, ক্লান্ত শরীরে এতো রাতে ডেকে তুলবে!
সাত পাঁচ ভেবে মাথায় কিছু আসতে চায়না তার। মা কে ফোন করবে একবার? সেটাও কেমন দেখায়।
পানি গরম বসিয়ে শেষমেশ কল করেই বসে মা কে। আকাশের মা বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলো। ছেলের ফোন পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠলেন প্রায়। শিয়ার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায় সর্বদা। ডক্টর বলেছে বাড়িতেই থাকতে, অথচ মেয়েটা অফিসে ছোটাছুটি করে। আমেনা চৌধুরী ফোন ধরেই চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন। আকাশ ভরসা দিলো সবাই ঠিক আছে, সিরিয়াস কিছু নয়৷ ভদ্রমহিলা হাফ ছাড়লেন যেনো। শান্ত কন্ঠে বললো,

—’তুমি,প্রিয়া ঠিক আছো?’
—’প্রিয়া অসুস্থ একটু।’
—’কি হয়েছে।’
মা তার বেস্ট ফ্রেন্ড বলা যায়। তাছাড়া বিপদের সময় লুকিয়ে লাভ কি! আকাশ খুলে বলে প্রিয়ার সমস্যা টা। ছেলের চিন্তায় হাসলেন তিনি। যা যা করতে হবে জানিয়ে দিলেন ছেলেকে।
একহাতে হট ব্যাগ অন্য হাতে কুসুম গরম তেলের পাত্র এনে নামিয়ে রাখলো টেবিলে। মেয়েটা মোচড়ামুচড়ি করছে গোটা বিছানা জুড়ে। বালিশগুলো পরে আছে মেঝেতে। আকাশের চোখমুখ শুকিয়ে আসে। বুকটা হু হু করে ওঠে। দ্রুত হাতে সে-সব তুলে রাখে বিছানার একপাশে। গরম তেল হাতে রাব করে আলতো করে ছোঁয়ায় মেয়েটার পেটে। শিথিল হয় শরীর, ছটফট কমে আসে। আশ্চর্য হলো প্রিয়া। এরকম সময় গরম তেল মালিশের কথা আকাশ জানলো কিভাবে! ভ্রু জোড়া তুলে প্রশ্ন করলো,

—’এটা কোত্থেকে জানলেন?’
আকাশ মুখ তোলে না ফর্শা উদর থেকে। হাতের কাজ অব্যহত রেখো শান্ত কন্ঠে জবাব দেয়,
—’তোমার শাশুড়ী টিপস দিলো।’
আখিজোড়া বড় হয়ে আসে প্রিয়ার। তলপেটে হাত চেপে উঠে বসতে চায়। আকাশ দেয় না সেটা করতে। গম্ভীর কন্ঠে বলে,
—’ নড়াচড়ায় ব্যাথা বাড়ে। এতো ছটফট করছো কেনো? দেখছো না কাজ করছি।’
—’আপনি তাই বলে মাকে জানাবেন এই কথা? এতো রাতে কল করে?’
—’আরাম পাচ্ছো?’
আকাশের উষ্ণ হাত বিচরন করছে তার পেটের নিম্নভাগে। শিরশির করছে গোটা শরীর। লাজুক মুখে বললো,
—’প-পাচ্ছি।’
—’তাহলে? মা কে না জিজ্ঞেস করলে জানতাম কি করে?’
প্রিয়া আকাশের কবজিখানা চেপে ধরে। মিহি কন্ঠে বললো,
—’সারারাত করবে এ ব্যাথা। রাত তো কম হলো না। কাল অফিস আছে আপনার। ঘুমিয়ে পরুন। ‘
আকাশ তেলের বাটিখানা বিছানা থেকে সরিয়ে রাখলো। টিস্যুতে হাতের অবশিষ্ট তেল খানা মুছে, নিজের হাতটা মেয়েটার জামা গলিয়ে ভিতরে দিয়ে কোমড় স্পর্শ করে বললো,

—’তুমি তো শুয়েও থাকতে পারছো না…পাশে সারারাত ব্যাথায় ছটফট করবে আর আমি ঘুমাবো?’
প্রিয়ার জবাবের অপেক্ষা আকাশ করে না। বিছানা থেকে নেমে আচমকা দু হাতে শূন্যে তুলে ফেলে মেয়েটাকে। হতভম্ব প্রিয়ার পা দু খানা অজান্তেই জড়িয়ে ধরলো আকাশের কোমড়। আকাশের এক হাত প্রিয়ার কোমড়ে, অন্য হাতটা পিঠের ওপর। কাছে টেনে বুকের ওপর চেপে ধরে বললো,
—’ ঘুমাও।’
নিজের অবস্থান টের পেয়ে চক্ষুজোড়া কপালে উঠলো যেনো প্রিয়ার! ঘুমাও মানে? সে কি বাচ্চা? আকাশ ধীরেসুস্থে পায়চারি করা শুরু করেছে ঘরজুড়ে। ছেলেটার শক্ত হাতটা কেমন যাদুর কায়দায় চেপে রাখা প্রিয়ার কোমড়ে। মেয়েটা খেয়াল করলো যেখানে এতক্ষণ খিঁচুনি হচ্ছিলো, সেটা বেশ কম টের পাচ্ছে। দু হাতে জড়িয়ে নিলো আকাশের গ্রীবাদেশ। ঘাড়ে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করলো। ফিসফিস করে বললো,

—’আরাম পাচ্ছি।’
আকাশ হাসে। মা বলেছিলো খানিক সময়ের জন্য হালকা ভাড়ি কিছু দিয়ে ব্যাথায় জায়গাটা রাব করে দিতে। এই বুদ্ধিটা আকাশেরই বের করা। কাজে দিয়েছে তাহলে!
প্রিয়ার ছোট্ট দেহ খানা আকাশের বলিষ্ঠ শরীরে লেপটে আছে। আকাশ হাস্কিস্বরে বললো,
—’আমি অন্য রকম আরাম পাচ্ছি,পাখি। এই আরামে তোমাকেও সেই অন্য রকম আদরটা দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। আফসোস সেটা এখন পাপ।’
আকাশের কথাটা ঠিক কি ইঙ্গিত করলো বুঝতেই প্রিয়ার তলপেটে সুড়সুড়ি দিলো যেনো কেউ। পায়ের আঙুল ভাজ করে ফেললো। হাতের বাধন দৃঢ় করে নাকমুখ ঘষলো আকাশের কাধে।

—’ শাস্তি এটা আপনার…’
—’কি করেছি আমি?’
—’এতদিন কাছে না আসার শাস্তি। ‘
—’যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর?’
—’আমার মন টা চুরি করে, এরকম পালিয়ে বেরাচ্ছেন। ধরা দিচ্ছেন না দিনের পর দিন। শাস্তি পাওয়া উচিত নয় কি?’
আকাশ হাঁটতে হাঁটতে এসে দাড়ালো বারান্দার দরজা খুলে। আকাশ ভরা জ্যোৎস্না। চাঁদ নেই আজ। সন্ধ্যার দিকেই ডুব দিয়েছে। এলেমেলো বেণি টায় আলতো টান দিয়ে বললো,

—’শুধু মন? আর যা যা চুরি করেছি তার হিসাবপত্রও কি দেখাবেন এখন?’
—’ মন চুরি করেছেন বলেই তো বাকিসব স্ব ইচ্ছেতে দিয়েছি।’
—’এখন কি চাচ্ছেন?’
—’চাইলেই দিতে পারছেন কোথায়? ‘
—’এতো উতলা? আগে তো টের পাইনি। ‘
—’পেলে কি এই একমাস দূরে দূরে থাকতেন না?’
—’উহু, একদমই না।’
প্রিয়া শুকনো চুমু আঁকলো আকাশের কাঁধে। নরম কন্ঠে বললো,
—’এরকম কখনো দূরে থাকবেন না। অশান্তি লাগে।’
—’তাহলে আজ থেকে তুমি করে ডাকতে হবে কেমন?’
—’আপনি তে কি সমস্যা? ‘
—’ তুমি তে কি সমস্যা? ‘
প্রিয়া মিহি কন্ঠে বললো,
—’ নাম ধরে ডেকেছি, এখন তুমি ডাকতে বলছেন। লজ্জা পাবো না?’
আকাশ বাঁকা হাসে।

—’তোমার লজ্জা ভাঙতে মরিয়া আমি। বিশ্বাস করো। কত কষ্টে যে বুকে পাথর চেপে আছি। আজ সবে ফার্স্ট দিন। সাতদিনে আমি দেয়ালে কপাল খুটতে শুরু না করে দেই।’
ব্যাথার মাঝেও খিলখিল করে হেসে ফেললো প্রিয়া। বাঁকা কন্ঠে বললো,
—’ এক মাস পেরেছেন, বাকি সাতদিনও পারবেন। এ আর এমন কি! বউ ভালো না লাগলে দূরে থাকাই যায়।’
মেয়েটার কাঁধে শক্ত কামড় বসালো আকাশ। তাকে জ্বালাতে বলা হচ্ছে কথাগুলো! তার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া হচ্ছে? হাস্কিস্বরে বললো,
—’ আমাকে ক্ষেপিয়ো না, পাখি। কিছু করতে পারবো না এ কয়দিন। তাই বলে ভেবো না যেভাবে খুশি জ্বালাবে। আমিও জ্বালাতে পারি। অন্য ভাবে। তখন? নিজেও আমাকে কাছে পেতে পাগল হবে, অথচ সেটা তে সম্ভবই না। কি করবে হুম হুম? করবো পাগল?’
আকাশের হাত মেয়েটার পিঠের চেনে হাত দিতেই একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠলো প্রিয়া। লোকটার সংস্পর্শে এসে এমনিতেই গা শিউরে উঠছে। আরও কিছু করলে সর্বনাশ হবে এখব। পাগল তে হয়েই আছে। আরও পাগল হবে! আতঙ্কিত কন্ঠে বললো,

—’সরি সরি, কিচ্ছু বলিনি আমি। অমন করবেন না এখন। ঘুমাবো।’
আকাশ মুচকি হেঁসে হাতখানা সরিয়ে নিলো। মেয়েটার সত্যিই ঘুম প্রয়োজন। মিনিট দশেকের মাথায় কি সব বিরবির করতে করতে ঘুমিয়েও পরলো প্রিয়া। আকাশের বুদ্ধি কাজে দিয়েছে তাহলে। আরাম পাচ্ছে মেয়েটা। আকাশ দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে পায়চারি করছে গোটা ঘর। দু একবার হাত আলগা করলেই নড়েচড়ে উঠছে মেয়েটা। ঘুমের ঘোরেও চোখমুখ কুঁচকে ফেলছে ব্যাথায়। আকাশ আর শুয়িয়ে দেওয়ার পায়তারা করে না। এমনিতেই শেষরাত এখন। আজ আর ঘুম হচ্ছে না তার! তার থেকে বউটা তার শান্তিতে ঘুমাক।
ভোরের আলো ফুটে গিয়েছে। প্রিয়া পিটপিট করে যখন চোখ খুললো তখন বাহিরের খড়খড়ে আলো এসে প্রবেশ করেছে ঘরের ভিতরে। রাতে জানালা গুলোর পর্দা টেনে দেওয়া ছিলো না। সকাল হওয়া মাত্র আলোয় আলোয় পূর্ণ। প্রিয়া নড়েচড়ে উঠতেই অস্বাভাবিক কিছু খেয়াল করলো। ঝট করে মুখ তুলে তাকাতেই আকাশ গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’গুড মর্নিং। ‘

হতভম্ব হলো মেয়েটা। একটা রকিং চেয়ারে দুলছে তারা। বিড়াল ছানার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে সে পরে আছে আকাশের বুকের ওপর। গায়ের ওপর পাতাল একটা চাদর টেনে দেওয়া। প্রিয়া সোজা হয়ে বসলো। আকাশ কোমড় চেপে সোজা করে ফেললো মেয়েটাকে। সদ্য ঘুম ভাঙা ফুলো মুখটা দেখেই আকাশের ইচ্ছে হলো জাপটে ধরে চুমু খেতে। করলোও তাই, মনের কথা ফেললো না। প্রিয়ার গাল চেপে কাছে এনে টুপ করে চুমু খেলো মেয়েটার নাকের ডগায়। প্রিয়া ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো,
—’বিছানায় যান নি কেনো? সারারাত এভাবে কোলে নিয়ে ঘুরেছেন নাকি?’
প্রিয়ার এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর থেকে সরিয়ে কাঁধের নেমে যাওয়া জামাটা ঠিকঠাক করে দিয়ে বললো,
—’ ছোট বাচ্চাদের মতো একটু শুয়িয়ে দিতে গেলে বা বসতে গেলেই তো গাইগুই করে উঠছিলে। বসেছি তো মিনিট পাঁচেক হলো। বসে সারতেও পারলাম না,উঠে গেলে।’
প্রিয়া অপরাধি মুখে বললো,

—’ আমাকে এভাবে কোলে নিয়ে এতক্ষণ ছিলেন? ‘
আকাশ সে প্রশ্নের জবাব দেয় না। আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
—’ব্যাথা আছে? ‘
দু’দিকে মাথা নেড়ে “না” বোঝলো প্রিয়া। মুখে বললো,
—’ উহু, একদম না।’
—’ঘুম ভালো হয়েছে?’
—’খুউব।’
—’এখন নামাবো কি কোল থেকে? নাকি এভাবে বসে আমাকে উন্মাদ করে বিষয়টা এনজয় করছো? ‘
—’ইশশশ, নাআ। নামান।’
লাজুক মুখে হুড়মুড়িয়ে নেমে এলো প্রিয়া। এলোমেলো পোষাকের অবস্থা। বিছানা থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়িয়ে ছুটলো বাথরুমে। আকাশ প্রায় শব্দ করেই হেসে ফেললো।

রবিবার সন্ধ্যা। আকাশদের কটেজে আজকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে সকলেই অফিস থেকে জলদি ফিরে এসেছে। তার কারণ আছে বইকি। আজ দুপুরেই শিয়া -প্রিয়ার বাবা মা ফোন করে জানিয়েছে দু মাস পর ফিরছে তারা। সংবাদ টা সারপ্রাইজিং হলেও খুশির ধুম পরে গিয়েছে যেনো। আনিসুল সাহেবের কাজ দু বছরের মেয়াদে থাকলেও তিনি সেটা নিজ গরজে এক বছর মেয়াদি করে ফিরে আসছেন সস্ত্রীক। একে আদরের বড় মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা। বিয়ের সময়ও কোনোমতে বিয়েটা দিয়ে বিদেয় হয়েছিলেন, তারওপর এমন বিশেষ মূহুর্তে বাবা মা হয়েও যদি কাছে থাকতে না পারে তাহলে অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে যাবেন তারা। তাছাড়া আকাশ আর প্রিয়াকে নিয়ে কিছুটা বিষয় তো আছেই।
বসার ঘরে জম্পেশ আড্ডা বসেছে। রাকা আর তুশি এসেছে আজ সকালে। শীতের ছুটি চলছে ওদের সম্ভবত। আপাতত একগাদা স্ন্যাকস্ নিয়ে বসে টিভি ছেড়ে বকবক হচ্ছে ছেলেমেয়ে গুলোর মধ্যে। অয়ন বসা শিয়ার পাশে। শিয়া মা হবে খবর টা পাওয়ার পর থেকে আঠার মতো লেপটে থাকে ছেলেটা। মানুষজন মানে না, বউয়ের জন্য জান দিতে প্রস্তুত। এই যে এখন যেমন! ঘরভর্তি ছোট ভাইবোনেরা সব বসে আছে। তারমধ্যেও বউয়ের হাতপায়ের আঙুল গুলো টেনে টেনে দিচ্ছে ছেলেটা। শিয়ার চোখ রাঙানিতেও সরে বসছে না। রাতুল রা দিব্যি হাসাহাসি করছে এসব নিয়ে। সেদিকে হুশই নেই ছেলেটার। প্রিয়া ঘেষে বসা আকাশের সাথে। আকাশের হাতে ব্ল্যাক কফি, সে ভাজাপোড়া থোরাই খাবে! প্রিয়া ফিসফিস করে বললো,

—’ আপু অনেকটা গুলুমুলু হয়ে গিয়েছে,তাইনা?’
—’হু।’
—’আমি কি খুব শুকনা?’
—’নাহ।’
আকাশ আদৌ তার দিকে তাকায়নি এখন। একহাতে কফি, অন্য হাতে ফোন। প্রিয়া বিরক্ত কন্ঠে বললো,
—’তাকালেনই তো না। বুঝলেন কি করে?’
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার থেকে ভালো এই মেয়েটাকে আর কে চেনে! মেয়েটা নিজেও নিজের সর্বাঙ্গ এতো ভালো ভাবে দেখেনি, যতটা আকাশ দেখেছে। বোকার মতো ঝট করে একটা প্রশ্ন করে বসে। আকাশ কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললো,
—’ বিয়ের তো কম দিন হলো না…ছয় ছয়টা মাস! বিগত ছয়মাস হলো সব ভাবে দেখেছি,পাখি। তোমার শরীরের প্রতিটা অঙ্গের পারফেক্ট মাপ বলে দিতে পারি আমি। একমাস নিজ হাতে আনবক্সিং করে দেখিনি বলে চোখের অভিজ্ঞতা ভুল বলবে, এটা কি করে ভাবতে পারলে? ‘
লাজে মিয়িয়ে গেলো খানিকটা। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো, কেউ আবার তাদের কথা শুনে নিলো কি-না। কেউ শোনেনি। সবাই ওদিকে অয়ন শিয়ার কে নিয়ে হাসাহাসি তে ব্যাস্ত। প্রিয়া আলতো থাপ্পড় মারলো আকাশের উরুতে। নিচু গলায় বললো,

—’আপনি একটা ফালতু।’
—’আচ্ছা। ‘
আকাশের নির্বিকার উত্তরে আরেক দফা চটলো প্রিয়া।
—’আচ্ছা মানে কি? ‘
—’মানে আমি ফালতু। মেনে নিলাম।’
—’বিরক্ত। ‘
—’ওকেই।’
প্রিয়া চূড়ান্ত বিরক্ত হচ্ছে এখন। রেগে যাচ্ছে,কিন্তু সবার সামনে কিছু বলতে পারছে না।
—’যেটা বললাম সেটার উত্তর না দিয়ে কথা পেঁচাচ্ছেন কেনো?’
আকাশ এবার হাতের ফোন আর কাপ টা রেখে গভীর দৃষ্টি দিলো প্রিয়ার দিকে। হাস্কিস্বরে বললো,
—’ঘরে চলো, দেখে বলছি কতটা শুকনো। জামাকাপড়ের ওপর দিয়ে দেখে বললে আবার বিশ্বাস হবে না তোমার। খুলে,ছুঁয়ে অনূভব করে করে বলি।’
প্রিয়া ঠোঁট উল্টায়। অন্য দিক ফিরে বসে। লোকটার সাথে কথা বারিয়ে লাভ নেই। রাগ করতে চাচ্ছে না সে। মহাখুশি কি-না! বাবা মা ফিরবে। মাত্র দু মাস পরই। আরও বছর দেড়েক অপেক্ষা করতে হবে না। সেটা উপলক্ষেই আজ সবাই ফিরেছে দ্রুত৷ রাগ করার মানেই হয়না…

এরইমধ্যে কেটে গিয়েছে তিন তিনতে দিন। প্রিয়ার ভার্সিটি খোলা আজকে। উঠতে হয়েছে সকাল সকালই। যদিও এলার্মের বেশ খানিকক্ষণ আগেই ঘুমটা ভেঙেছে। কনকনে শীত পরেছে এদিকটায়। রুম হিটার বন্ধ করে দেওয়া! শীত এ কারণেই বেশি লাগছে। প্রিয়া হাত বাড়িয়ে রুম হিটার চালু করে দিলো। আকাশ ঘুমিয়ে আছে পাশেই। প্রিয়ার দিকে কাত হয়ে মাথাত নিচে হাত রেখে গভীর ঘুমে মগ্ন। মিনিট পনেরো বাদেই নড়েচড়ে উঠলো সে। প্রিয়া মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিলো স্বামীর দিকে। আকাশ উঠেছে টের পেতেই ব্যাস্ত গলায় বহু আগ্রহ নিয়ে বললো,
—’ শুনছেন, আমার না মনে হচ্ছে আমি প্রেগন্যান্ট। ‘
সবেই ঘুমটা ভেঙেছে আকাশের। ছোটখাটো একটা ঝটকাই লাগলো। সরু চোখে তাকাতেই দেখলো প্রিয়ার তার ওপরে রীতিমতো ঝুঁকে আছে। আকাশ হাতের উল্টো পিঠে ডললো চোখটা। গতকাল টি শার্ট জড়িয়ে ঘুমিয়েছিলো কি! গরম লাগছে।, রুম হিটার এর উষ্ণতা, সাথে গায়ের ওপর একগাদা কম্বল দিয়েছে বোধহয় প্রিয়া।সে-সব সরিয়ে টি শার্ট আলগা করলো হাতে টেনে। প্রিয়ার দিকে গভীর চোখে তাকালো।
প্রিয়া যা বলছে তা সম্ভব নয়। এতো বেখেয়ালি তো হওয়া হয়নি। তাছাড়া লাস্ট একটা মাস পুরো রেস্ট্রিকশনে আছে সে। কাছেও যায়নি সেভাবে। প্রিয়া বোধহয় আকাশের অন্য রিঅ্যাকশন আশা করেছিলো। কিন্তু আকাশের মুখ নির্বিকার। কেনো রা নেই মুখে। হৈ হল্লা করবে, তা নয়! প্রিয়া গম্ভীর মুখে বললো,

—’ খুশি হননি আপনি? অয়ন ভাইয়া যেমন লাফালো! আপনি তো রেসপন্সই করছেন না।’
আকাশ নিজের হাতটা মাথা নিচে দিয়ে খানিকটা উচু হয়ে শুলো। ভাবলেশহীন কন্ঠে শুধালো
—’ক্যানো মনে হলো তুমি প্রেগন্যান্ট? ‘
প্রিয়া ঠোঁট উল্টে জবাব দিলো,
—’’ বিয়ের ছয়-সাত মাস চলে। হবো না? ‘
দীর্ঘশ্বাস ফেললো আকাশ। মেয়েটা উল্টোপাল্টা যুক্তি দিচ্ছে। কারণ যানা নেই আকাশের। প্রিয়াকে টেনে নিজের বুকের ওপর রেখে, কমফোর্টারে দু’জনের শরীর ঢেকে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
—’ভুল ভাবছো। প্রটেকশন ফেইল হয়নি এখনো অবধি। ‘
—’’কি করে টের পেলেন?’
আকাশ বাকা হেসে বললো,
—’একটু মাথা খাটাতে হয়, পাখি। তোমার পিরিয়ডের আজ থার্ড দিন চলে না?’
মহা মুশকিল এ লোকটাকে নিয়ে। সে কি নিজে জানে না – যে পিরিয়ড চললো মা হওয়া যায়না। ইশারা ইঙ্গিত ও বোঝে না! প্রিয়ায় খুকখুক করে গলা পরিষ্কার করে বললো,

—’ সেটা তো মাথায় আছেই।’
—‘তাহলে?’
—‘পিরিয়ড কি মাসের পর মাস চলে?’
—‘কি বলতে চাও খুলে বলো।’
—‘আপুর যেমন একটা বাচ্চা…’
কথা শেষ হওয়ার আগেই নড়েচড়ে উঠলো আকাশ। মেয়েটা কি বলতে চাচ্ছে বুঝতে বাকি নেই। আকাশ উঠে বসতে বসতে বললো,
—‘ আমার জন্য খাবার টা ওপরে নিয়ে এসো। তাড়াহুড়ো আজকে।’
প্রিয়া হতাশ হলো খানিকটা, কি বলতে চাইলো। আর লোকটা কি কথা তুললো!

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৭

—‘আমার কথাটা শুনবেন না?’
আকাশ শব্দ করে চুমু খেলো প্রিয়ার পাতলা ঠোঁটের ওপর। চোখ টিপে হাস্কিস্বরে বললো,
—‘তুমি যে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছো, সেটার প্রসেস কি এখন করা সম্ভব? ফিট তুমি? না তো? তাহলে সুস্থ হও, তারপর প্র্যাকটিকালি কাজ করতে করতে ভাববো পরের স্টেপ কি করা উচিত। আমার বাচ্চা বউ কে আর একটা বাচ্চা ধরিয়ে দেওয়া যায় কি-না। সবই ডিপেন্ড করবে আমাকে কতটা সহ্য করতে পারো তুমি। ‘

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here