Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৪)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৪)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৪)
রুপান্জলি

আজ আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল। প্রিপারেশন আহামরি ভালো ছিল না। এটা আমার মতামত না, এটা আমার বাবা, বড়ো বোন আর ছোট্ট অহমিকার ধারণা। তাদের মতে, আমি যেহেতু সারাদিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াই, পড়তে-টড়তে বসি না, সেহেতু আমার পরীক্ষার প্রিপারেশন ভালো হওয়ার কথা না। সেই সাথে এক্সামও ভালো হওয়ার কথা না। আমিও তাই বিশ্বাস করি। কিন্তু দিন শেষে কিভাবে কিভাবে যেন আমার রেজাল্ট একটু বেশিই ভালো হয়ে যায়। সেসব কথা বাদ। আজ একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টা মজার নয়, বরং বড্ড প্যারার। আজ একটা মেয়েকে মনে ধরলো। যাকে বলে ওয়ান সাইড লাভ।

নাহ, লাভ না, ক্রাশ? নাকি লাভ? ধুর, জানি না। কী অবস্থা! মেয়েটাকে দেখার পর আমিও মেয়েটার মতো বোকা হয়ে গেলাম নাকি? হতেও পারে। মেয়েটা কেমন আমার মন মস্তিষ্ক দখল করে বসে আছে,, কোনো মতেই তাকে ভুলার যো নেই। মেয়েটা বড্ড বোকা সোকা, দেখতে অসম্ভব সুন্দর, একদম চাঁদের মতো। তাকে দেখার সাথে সাথেই আমার ঠোঁট ফুরে শুধু একটি শব্দই বেড়িয়ে এসেছে” চাঁদ” আমার চাঁদ। আগে ছোটবেলায় দাদু বলতো, আমি যেহেতু খুব সুন্দর, তাই আমার কপালে একটা চাঁদের মতো বউ জুটবে। যদিও বউ কথাটা আমার বয়সের সাথে যায় না। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বউ নিয়ে ভাবছি জানলে আমার বাবা আমায় জুতা-পেটা করবে। আর আমার মা খুন্তি নিয়ে তেড়ে আসবে। অনাহিতা তো আমায় পচিয়ে পচিয়ে কালা শুটকি বানিয়ে ফেলবে, অহমিকাও সাথ দেবে তাতে।
১২-০৫-২০২৩
পরীক্ষা শুরু হতে আরও ৩০-৩৫ মিনিটের ব্যবধান। স্যার-ম্যামরা হয়তো কিছুক্ষণের মাঝেই ঢুকবে। ছন্নছাড়া পল্লব মাত্রই এসেছে। পুরো ক্লাসে গিজগিজ করতে থাকা পরীক্ষার্থীদের দেখে বিরক্তিকর নিশ্বাস ফেললো কিশোর। নিজের সিট খুঁজে খুঁজে বেঞ্চে বসে হাত-পা টান দিয়ে বড়ো একটা হাই তুললো। তখনই একটা নাজুক, ছিমছাম গড়নের মেয়ে ক্লাসে ঢুকলো। হাত টান দিয়ে হাই দিতে থাকা পল্লব সেভাবেই থমকে গিয়ে মেয়েটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অজান্তেই তার মনে ছোট্ট একটা গানের কলি বেজে উঠলো—

,,, নেমে এলো চাঁদ আকাশ থেকে বোরিং ক্লাসে,
রংচটা দিন করলো রঙিন, স্বপ্নের তুলিতে।,,,
১৯ বছরের জীবনে কোনো মেয়ের দিকে অন্য নজরে না তাকানো পল্লবটা হুট করেই এক চাঁদের পানে তাকিয়ে হারিয়ে গেল। একা পল্লব নয়, বরং ক্লাসের ম্যাক্সিমাম ছেলেই মেয়েটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। এতটা সুন্দর মেয়ে বাংলাদেশে সচরাচর দেখা যায় না। দেখা গেলেও খুব কম। তবে মেয়েটাকে দেখে বড্ড বোকাসোকা মনে হচ্ছে। মেয়েটা কেমন বোকা বোকা চাহনি দিয়ে ধীরে ধীরে পল্লবের পিছনের বেঞ্চটাতে বসলো। দেখে মনে হচ্ছিল ভীষণ নার্ভাস। নিশ্চয়ই পরীক্ষা নিয়ে? পল্লব ব্যতীত হলে থাকা প্রত্যেকটা স্টুডেন্টই নার্ভাস। পল্লবের চান্স পাওয়া নিয়ে অত টেনশন নেই। হলে হবে, না হলে নাই। সে আবার অত ভার্সিটি-টার্সিটিকে খুব একটা গোনে না। ভার্সিটি গোনবে কী? তার তো পড়ালেখা করতেই ভালো লাগে না। এই যে সব ছেলেরা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে, এতে যেনো মেয়েটার কোনো হুঁশ নেই। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে জায়গা পরিমাপ করছে। পল্লব চোখ ছোট ছোট করে মেয়েটার হাবভাব পর্যবেক্ষণ করলো। বেশ খানিকক্ষণ পরখ করার পর বুঝলো, মেয়েটা দেখে লেখার পাঁয়তারা করছে। মনে মনে কিছুটা হাসলো পল্লব। লোকে বলে, সুন্দরী মেয়েরা গোবর-ঠাসা হয়, আই মিন ব্রেইন হাঁটুতে থাকে।

মেয়েটা বোধহয় সেই কোয়ালিটিরই। পরখ করা কালীন হুট করেই মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল পল্লবের। মেয়েটা কেমন অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। পল্লব দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো। এর মধ্যেই স্যার-ম্যামরা চলে এসেছে। পরীক্ষার সময় শুরু হতেই সবার হাতে হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দেওয়া হলো। পল্লবের এমসিকিউ-এর সেট নং খ, আর তার পাশের জনের গ। পল্লব উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে বোকা মেয়েটার এমসিকিউ-এর সেট নম্বরটা দেখে নিলো। ঘ নম্বর সেট পড়েছে। মেয়েটা কেমন মুখ-চোখ চুন করে প্রশ্নপত্রের দিকে তাকিয়ে। নিশ্চয়ই কিছু পারে না? পল্লবের বেশ মায়া হলো। সাথে আরও একটা কথা খেলে গেল তার মাথায়। যদি পল্লব আর মেয়েটার এমসিকিউ-এর সেট মিলে যায়, তাহলে পাশাপাশি থাকার দরুন নিশ্চয়ই মেয়েটা পল্লবের দিকে তাকাবে? পুরোটা সময় দেখে লেখার জন্য হলেও ওর দিকেই নজর স্থির রাখবে।

পল্লব মনে মনে কুটিল হাসলো। নিজের বুদ্ধিমত্তার জন্য নিজেকেই বাহবা দিলো। এরপর আবারও উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে খুঁজে বের করলো কার কাছে ঘ নম্বর সেট আছে। পল্লবের বেঞ্চের সামনের বেঞ্চের পরের বেঞ্চের বাম পাশে যে ছেলেটা বসেছে, তার সেট পড়েছে ঘ। পল্লব বহু অনুনয়-বিনয় করে প্রশ্ন এক্সচেঞ্জ করলো। কিছুক্ষণ সময় পেরুতেই ক্লাস যখন একদম শান্ত হয়ে গেল, তখনই মেয়েটা উঁকি-ঝুঁকি দেওয়া শুরু করলো। পল্লব স্বেচ্ছায় সলভ করা উত্তরগুলো প্রশ্নপত্রে টিক দিয়ে এমন একটা জায়গায় রাখলো, যেন মেয়েটা সহজেই দেখতে পায়। পল্লবের ভাবনা মাফিক মেয়েটা সত্যিই বোকা। পল্লব যে ওর জন্য এতকিছু করলো, তা যেন বুঝতেই পারলো না। সে নিজের মতো দেখে দেখে লিখে যাচ্ছে। যেন লেখা ব্যতীত বর্তমানে তার কোনো কাজ নেই। শুধু পল্লব যখন প্রশ্ন সলভ করার জন্য প্রশ্নপত্রটা সরিয়ে নেয়, তখনই মেয়েটা কেমন অসহায় দৃষ্টিতে পল্লবের দিকে তাকিয়ে থাকে, নখ কামড়ায়, সামনে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দেয়, আঙুল ফোটায়। পল্লব শুধু সেকেন্ডের গতিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মেয়েটার হাবভাব দেখে আবারও চোখ ফিরিয়ে নেয়। এক্সাম টাইম বলে কথা। এই মুহূর্তে সময় নষ্ট করা অনুচিত।

সিকিউ-এর বেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে। পল্লব স্বেচ্ছায় একটু বাঁকা হয়ে লিখেছে, যেন মেয়েটার দেখে লিখতে সুবিধা হয়। এভাবেই এক্সাম শেষ হলো। এক্সাম শেষ হতেই সব স্টুডেন্টরা কেমন হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল। সেই ফাঁকে মেয়েটাও যে কোথায় হারিয়ে গেল, পল্লব বুঝতেই পারলো না। মেয়েটার সাথে কথা হলো না, নাম জানা হলো না, কোথায় থাকে সেটাও জানা হলো না। এমনকি ভবিষ্যতে তার সাথে দেখা হবে কিনা, তাও জানা নেই পল্লবের। সে শুধু এটুকুই জানে, মেয়েটাকে সে ভুলতে পারছে না। মেয়েটার বোকা বোকা চাহনি পল্লবকে কাবু করে দিয়েছে। ছন্নছাড়া, অগোছালো, বাদরের মতো লাফালাফি করা ছেলেটা আজ নামাজ পড়বে বলে ঠিক করলো। শুধু আজ নয়, আজ থেকে নামাজ পড়া শুরু করবে আর থামবে না।পল্লবের দাদু বলতেন””” যা তোমার সাধ্যের বাইরে, যা তোমার পক্ষে পাওয়া অসম্ভব, তুমি সেটাও জয় করতে পারবে শুধু একটা মাধ্যমে। সেটা হলো আল্লাহর ইবাদাত। তুমি আল্লাহর নিকট মন দিয়ে কিছু চাইলে আল্লাহ তোমায় কখনো ফিরাবেন না! “” দাদুর কথানুযায়ী পল্লব যদি নামাজ পড়ে মোনাজাতে চাঁদকে চায়, তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ফিরাবেন না? চাঁদকে তার করে দেবেন? ভেবেই পল্লব নামাজ পড়লো। মোনাজাতে বারবার চাইলো যেন চাঁদ ঢাবিতে চান্স পায়। সে না পেলেও সমস্যা নেই, কিন্তু চাঁদ যেন পায়। ও চান্স পেলেই ঢাবিতে ভর্তি হবে, তারপর যেভাবেই হোক চাঁদকে খুঁজে বের করবে পল্লব। এরপর সবসময় নিজের সাথে সাথে রেখে দেবে। যখন সে আর চাঁদ বড়ো হয়ে যাবে, একদম বিয়ে করার মতো বড়ো, তখন চাঁদকে বউ বানাবে সে। চাঁদ হবে পল্লবের দাদুর বলা সেই চাঁদের মতো বউ।

,, এরপর থেকে প্রতিটি মোনাজাতে আরও একবার চাঁদকে দেখার আরজি জানানো যেনো ছেলেটার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাথে আরও একটা বদঅভ্যাস যুক্ত হয়েছে। পল্লব যেহেতু মনে মনে বোকা মেয়েটার নাম চাঁদ রেখেছে, তাই ইদানীং হুটহাট ছাদে চলে যায় ছেলেটা। আকাশে থাকা চাঁদের মাঝেই খুঁজে নেয় তার ব্যক্তিগত চাঁদকে। কিশোর পল্লব। তার মনে তখন ভালোবাসার প্রথম হাওয়া বইছে। জীবনটা রঙিন লাগে। সেই রং-জৌলুশ থেকেই হয়তো আকাশে উদয়মান চাঁদের দিকে তাকালেই ঐ বোকা মেয়েটার মুখশ্রী ভেসে ওঠে। নয়তো চাঁদে মুখ ভেসে ওঠার কোনো বৈজ্ঞানিক কিংবা আধ্যাত্মিক মাধ্যম তো কোনো কালেই প্রকাশ পায়নি।

পল্লবের ঢাবিতে চান্স হয়েছে। সাথে অরুণ আর ইরারও হয়েছে। এতে বেশ খুশি হয়েছে তিনজন। তারা কলেজেও একসাথে ছিল, আর ভার্সিটিতে এসেও একসাথে থাকবে। এমন ভাবনা নিয়েই ভার্সিটিতে প্রথমবার পা রেখেছিল তিনজন। তখনই এক আধপাগল এসে যুক্ত হলো তাদের জীবনে। মেয়েটার নাম অর্পনা। চরম ঘাড়ত্যাড়া আর একরোখা। বন্ধুমহলে মেয়েটা অ্যাড হওয়ার পর তাদের দিনকাল বেশ ভালো যাচ্ছিল। তবে পল্লবের মনে এখনো চাঁদ বিরাজমান। ছেলেটা চাঁদকে ভুলতেই পারছে না। যখনই ভার্সিটিতে যায়, এদিক-ওদিক তাকিয়ে শুধু চাঁদকেই খোঁজে। মেয়েটা কি চান্স পায়নি? সে যা যা লিখেছিল, মেয়েটাও তো তাই তাই লিখেছে। তাহলে সে পেলে মেয়েটা কেন পাবে না? তাহলে কি অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টে হয়েছে? যদি হয় ও তাহলে ভার্সিটির কোথাও না কোথাও তো মেয়েটার দেখা পাওয়া যাবেই।

,,,,এর মাসখানেক পর কার্জন হলের এক কোণায় চাঁদের দেখা পেল পল্লব। ছেলেটা কী যে খুশি হয়েছে! আল্লাহ তবে তার দোয়া কবুল করেছেন। মেয়েটার নাম সুহাসিনী রাত, ডাকনাম রাত্রি। কো-ইনসিডেন্টালি তার নাম সত্যি সত্যিই চাঁদ, মানে চাঁদনি। পল্লব এটা ভেবে বেশ আনন্দ পাচ্ছে যে, সে মনে মনে মেয়েটাকে যে নাম দিয়েছে, ওটা সত্যি সত্যিই মেয়েটার নাম। চাঁদের সাথে দেখাটা কেমন হুটহাট হয়ে গেল। তারা চারজন কার্জন হলের এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। মেয়েটা সেখানে দাঁড়িয়ে বোধহয় মুড়ি খাচ্ছিল। খাওয়া শেষ হতেই কাগজটা ছুড়ে মারতেই দুর্ভাগ্যবশত ঠোঙাটা অরুণের মাথায় এসে পড়ে। প্রথম দিন মেয়েটাকে বোকা লাগলেও আজ মেয়েটার আচরণ দেখে ভড়কে গেল পল্লব। মেয়েটা বোকা, কিন্তু চরম ঝগড়াটে। অরুণের সাথে কোমর বেঁধে ঝগড়া করলো। এরপর অর্পনার কথায় চাঁদ ও যুক্ত হলো তাদের বন্ধুমহলে।
পল্লব বোধহয় এতটাও আশা করেনি। আল্লাহ যে তার প্রতি এতটা প্রসন্ন হবেন, সেটা তো পল্লবের কল্পনাতীত ছিল।

নিজের প্রথম ইনকামের টাকায় দুইটা শাড়ি কিনেছে পল্লব। একটা পাতা রঙা, আরেকটা নীল। পাতা রঙাটা মায়ের জন্য, আর নীল রঙাটা চাঁদের। এগুলোকে বোধহয় তাতের শাড়ি বলে। আহামরি দাম না, মাত্র ৫২০ টাকা করে। তবুও পল্লবের কাছে এগুলোর দাম কোনো মণি-মাণিক্যের চেয়েও কম না। প্রথমত, এটা তার প্রথম ইনকাম। টানা ৯ দিন ধরে বাবার অফিসের কিছু কাজ করে দেওয়ায় বাবা তাকে হাজার টাকা বেতন দিয়েছে। আর দ্বিতীয়ত, সে যাদের জন্য শাড়িগুলো কিনেছে, তারা বহুমূল্যবান। পল্লব বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে মায়ের শাড়িটা ধরিয়ে দিয়ে নিজের বউয়ের জন্য কেনা শাড়িটা নিয়ে রুমে এলো। উদ্দেশ্য, শাড়িটা কোনো প্রাইভেট জায়গায় লুকিয়ে রাখা। কিন্তু রুমে এসে ভাবনায় পড়ে গেল ছেলেটা। ছেলেদের আবার প্রাইভেট কোনো লকার থাকে নাকি? একদমই না। সবচেয়ে বড়ো কথা, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে প্রাইভেট বলতে কোনো শব্দ নেই। যে যেখানে পারছে, ঠেসে-ঠুসে নিজের জামাকাপড় রেখে দিচ্ছে। পল্লবের রুম সার্চ করলে তার জামার থেকেও বেশি পাওয়া যাবে অনাহিতা ঢঙ্গির গাদা গাদা জামাকাপড়।

অগত্যা নিজের প্রাইভেট কোনো লকার কিংবা স্পেস খুঁজে না পেয়ে ছেলেটা নিজের বিছানার তোশকের নিচে শাড়িটা রেখে দিল। এখানে নিশ্চয়ই কেউ হাত দেবে না? এটুকু প্রাইভেসি নিশ্চয়ই পল্লব ডিজার্ভ করে?””কিসের মধ্যে কী! শাকের মধ্যে ঘি”” টাইপ একটা প্রবাদ আছে না? পল্লবের রুমের সাথে এই প্রবাদটা একেবারে খাপে খাপ, ময়নার বাপ। এর মাসখানেক বাদে পল্লবের মা সংসার চালিয়ে বেঁচে যাওয়া টাকা নিয়ে পল্লবের রুমে এলো। কোথায় রাখবে, কোথায় রাখবে ভাবতে ভাবতে পল্লবের বিছানার তোশকের কোণা উপরে তুললো। যেদিক দিয়ে তোশক তুলেছে, মাশাআল্লাহ দিলে ওইখানেই শাড়িটা রেখেছিল পল্লব। এরপর আর কী? যা হওয়ার তাই। মা আর বোন মিলে আটক করলো তাকে। পল্লবের মা তো কেঁদে-কেটে অস্থির। ছেলে উচ্ছন্নে চলে যাচ্ছে, কদিন পর আরও উচ্ছন্নে যাবে। এজন্যই পড়ালেখা হচ্ছে না,, সারাদিন মেয়ের পিছনে সময় কাটায়। অনাহিতা আর অহমিকাটা আরও বেয়াদব। দুটো মিলে পল্লবের মাকে আরও উসকানি দিচ্ছিল।

এরপর না চাইলেও পল্লবকে সব স্বীকার করতে হলো। আর ওয়াদা করতে হলো, পড়ালেখা শেষ হওয়ার আগে চাঁদের নিকট পল্লব তার ভালোবাসা প্রকাশ করবে না, প্রেম করা তো দূরের কথা। আর পল্লবের মা কথা দিলেন, পল্লব যদি ভালো রেজাল্ট করতে পারে, তাহলে তিনি নিজে পল্লবের বাবাকে রাজি করিয়ে ঐ মেয়েকে বিয়ে করিয়ে বাড়িতে বউ করে আনবেন।
ছেলেটা কী যে খুশি হলো! বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে উঠলো চাঁদকে পাওয়ার খুশিতে। মনে মনে ঠিক করে নিল, এই নীল শাড়িটা বিয়ের পরের দিন চাঁদকে পরতে দেবে। সেদিন চাঁদ রূপার মতো নীল শাড়ি পরে নিজেকে রাঙাবে, আর পল্লব হিমুর মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরে চাঁদকে অসম্ভব ভালোবাসায় মুড়িয়ে দেবে।
,,, ইদানীং চাঁদ আর পল্লবের বেশ ভালোই বন্ডিং তৈরি হয়েছে। মেয়েটা সারাক্ষণ পল্লবের পিছু পিছু ঘুরে শুধু একটা কথা জানার আশায়, পল্লব কয়টা প্রেম করেছে জীবনে? এখন কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা? চাঁদের মতে, পল্লব এত সুন্দর, সুদর্শন; তার মতো ছেলে নিশ্চয়ই সিঙ্গেল থাকবে না। পল্লবের চেহারায় নাকি কেমন প্লেবয়-প্লেবয় টাইপ একটা ব্যাপার আছে। যদি নাও হয়, তবুও পল্লবের ১৭-১৮টা এক্স রয়েছে, যেগুলোকে সে ওদের কাছে হাইড করে রাখতে চাচ্ছে।

পল্লব কিছু বলে না। খোলাসা করে বললে যদি চাঁদ ওর পিছু পিছু ঘোরা বন্ধ করে দেয়? ঘুরুক না এভাবে। হাজারটা প্রশ্ন করুক। পল্লবকে বিরক্ত করতে করতে মেরে ফেলুক।এভাবে বিরক্ত করতে করতে যেদিন চাঁদ পল্লবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে, সেদিন আর মনের কথা চাপিয়ে রাখবে না সে। মন খুলে মনে জমে থাকা ভালোবাসাটুকু উন্মুক্ত করে দেবে মেয়েটার কাছে।
,,,ইদানীং হুটহাট চাঁদদের ফ্ল্যাটের সামনে চলে আসে পল্লব। মেয়েটার একটা বদঅভ্যাস আছে। রাত দশটার পর সে বারান্দায় আসবে, আসবে মানে আসবেই। এই সময়টাকেই কাজে লাগায় ছেলেটা। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে চাঁদ নাম প্রাপ্ত রমনিকে। কিছুদিন আগেই চাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছে পল্লব। মেয়েটার বাবা নেই, মানে বাবার পরিচয় নেই। মা সিঙ্গেল মাদার, বর্তমানে কলেজে জব করে। বহু স্ট্রাগলের শেষে মেয়েকে নিয়ে এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন রমনি। আপাতত পিতৃপরিচয় ব্যতীত চাঁদের জীবনে আর কোনো আক্ষেপ নেই।
সাথে আরও অনেক কিছুই জেনেছে, যা জানা উচিত ছিল না। অনুচিত কোনো কিছু জানার পরেও চাঁদের প্রতি এক বিন্দু ভালোবাসা কমেনি, বরং তা বেড়ে কয়েক গুণ হয়েছে। পল্লব মনে মনে ঠিক করেছে, রাত্রিকে সে কখনো কাঁদতে দেবে না। ওকে খুশি রাখতে যদি নিজের জীবনটাও বিলিয়ে দিতে হয়, সে নির্দ্বিধায় দিয়ে দেবে।

,,,প্রতিনিয়ত পল্লবের নিকট নানান ধরনের মেয়েদের থেকে আসা প্রেমপত্রের ভিত্তিতে চাঁদ এই পর্যায়ে এসে একটা স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পল্লব সত্যি সত্যি ই প্লেবয়। প্লেবয় না হলে অবশ্যই এত এত মেয়েদের প্রপোজাল পেত না। সেই সাথে পল্লবের মেসেঞ্জারেও বহু মেয়ের আইডি পেয়েছে মেয়েটা। কার সাথে কী কথা হয়েছে, সেটা অবশ্য দেখতে পারেনি। কিন্তু এটুকু দেখেছে, ওখানে অনেক মেয়ের আইডি রয়েছে।চাঁদের এই স্থির সিদ্ধান্তে আসাটাই বোধহয় পল্লবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। ইদানীং চাঁদ কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। পল্লবের বিষয়ে এখন আর তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তার সকল আগ্রহ এবার ট্রান্সফার হয়ে অরুণের কাছে চলে গিয়েছে। এতে অবশ্য চাঁদের কোনো দোষ নেই। অরুণটাই ওর সাথে কেমন যেন আচরণ করে। এই তো কয়েকদিন আগে চাঁদকে একটা ছেলে প্রপোজ করার পর চাঁদ অনেকটা সময় নিয়ে সেই ছেলের সাথে কথা বলেছে। কী বলেছে জানা নেই, তবে এই কথা বলাটাকে কেন্দ্র করে অরুণ চাঁদের সাথে টানা চারদিন কথা বলেনি। পল্লবদের পঞ্চমূর্তির বন্ধুত্বে একটা বিশেষ ব্যাপার আছে। কেউ কাউকে সামান্য বন্ধুর নজরে দেখে না। সবাই সবাইকে নিজের পরিবার মনে করে। ভালোবাসাটাও একটু বেশি। সেদিক থেকে অরুণ কথা না বলায় কিছুটা মনমরা ছিল চাঁদ। যেহেতু তাদের মাঝে ঝগড়ার সম্পর্ক ব্যতীত কিছুই নেই, তাই বারবার অরুণকে খোঁচামূলক কথা বলছিল। অরুণ তার বিপরীতে ছিল অভিমানী। যেন চাঁদের সাথে তার বহুদিনের অভিমান জমা আছে। অরুণের হাবভাবে বেশ ভয় হচ্ছিল পল্লবের। তার সাজানো জীবন আর সুন্দর ভালোবাসাটা হারিয়ে যাবে না তো?

,, তার দিন দুয়েক পর অরুণ আর চাঁদকে লাইব্রেরিতে বড্ড কাছাকাছি অবস্থায় দেখা গেল। চাঁদকে দেয়ালের সাথে আটকে রেখেছে অরুণ। কী নিয়ে যেন শাসাচ্ছে। চাঁদের চোখে পানি। পল্লব একবার ভাবলো এগিয়ে যাবে, জিজ্ঞেস করবে কী হয়েছে। কিন্তু সে ঢুকতেই অরুণ ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে চোখের ইশারায় অনুরোধ জানালো যেন পল্লব না এগোয়।এরপর আর কী করবে সে? যা বোঝার তো বোঝা হয়েই গিয়েছে।অগত্যা সম্পূর্ণ ক্লাস না করেই চলে এলো বাড়িতে। সেদিন পল্লবের বাবার কী কারণে যেন অফিস ছুটি ছিল। ভদ্রলোক বড্ড বিচক্ষণ এবং স্ট্রিক্ট মানুষ। ছেলে-মেয়ের পড়ালেখার বিষয়ে সবরকম খবরাখবর রাখেন। ছেলেকে সম্পূর্ণ ক্লাস না করে বাড়ি ফিরতে দেখে টানা দেড় ঘণ্টা ঝাড়লেন। পল্লবের তাতে মন নেই। এসব রেগুলার ব্যাপার। তার ধ্যান-জ্ঞান সব চাঁদ আর অরুণের কাছে। চোখের সামনে বারবার লাইব্রেরির দৃশ্যটি ভাসছিল। ধীরে ধীরে মাথাটা কেমন করতে থাকে। নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছিল। তাই মায়ের ঘরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে ঘুমের ট্যাবলেট নিয়ে দুটো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো
সারাদিন, সারারাত ঘুমিয়ে পল্লবের ঘুম ভাঙলো পরের দিন বেলা বারোটায়।

চোখ মেলতেই মায়ের কান্নার স্বর শুনতে পেল। অফিসে যাওয়ার আগে নাকি বাবা তার জন্য মাকে অনেক ঝেড়েছেন। ততক্ষণে বন্ধু-বান্ধবেরও বেশ খানিকটা কল এসেছে। সাথে অর্পনার নম্বর থেকে আসা ৯টা কল দেখে নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না পল্লব। এই মেয়ে কল দিয়েছে মানে তাকে আজকে ভার্সিটিতে যেতেই হবে। না গেলে কপালে শনির দশা আছে। অগত্যা মাকে শান্ত করে ঐ বেলাতেই ভার্সিটিতে পৌঁছালো। ক্যাম্পাসের মাঠে বসেছিল চারজন। পল্লব যেতেই সবাই মিলে হামলে পড়লো তার উপর। আজকে তাদের মিরপুর যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পল্লবের জন্য যাওয়া হয়নি। সবাই মিলে মারলো কতক্ষণ। মানুষ মার খেয়ে ব্যথিত হয়, সম্পর্ক নষ্ট হয়। আর তাদের বন্ধুমহলের নিয়মটা আলাদা। এখানে মারের মাধ্যমে ভালোবাসা লেখা হয়।

এই নিয়মটা অর্পনার তৈরি করা। মেয়েটা মুখে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না বলে সবাইকে মেরে-মুড়ে নিজের মনমতো বানিয়ে নেয়। নিয়মটা অর্পনার তৈরি করা হলেও সেই নিয়ম এখন তাদের মাঝেও বিরাজমান। সবাই মেরে-মুড়ে যখন শান্ত হলো, তখন পল্লব একটা ব্যাপার লক্ষ করলো। চাঁদ অরুণের সাথে চোখাচোখি হতেই কেমন লজ্জা পাচ্ছে। পল্লব একবার বেহায়ার মতো জিজ্ঞেস করেছিল, ও অরুণকে দেখে এরকম লজ্জা পাচ্ছে কেন? বিনিময়ে চাঁদ জায়গা ছেড়ে উঠে গিয়েছিল। অরুণের ঠোঁটে তৎক্ষণাৎ দেখা গিয়েছিল বক্র হাসির রেখা। অরুণের হাসি আর চাঁদের লজ্জা দেখে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল পল্লব, সবকিছু এখন তার নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। তার সাজানো-গোছানো ভালোবাসা এখন অন্যের আয়ত্তে।
সন্ধ্যার আগমুহূর্ত। পল্লব কাছেই একটা ব্রিজের উপর বসে আছে। বুকভর্তি যন্ত্রণা আর মাথাভর্তি অস্থিরতা।
এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে দিয়াশলাই। এই প্রথমবারের মতো সিগারেট হাতে নিলো ছেলেটা। তবে ঠোঁটে ছোঁয়ানো হয়নি। হাত-পা কেমন কাঁপছে, অথচ মাথার যন্ত্রণা কমাতে এটা প্রয়োজন। অনেক ভাবনাচিন্তার পর কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট ধরালো পল্লব। প্রথমত ঠোঁটে ছোঁয়াতে দ্বিধাবোধ হলেও যখন অরুণ আর রাতের সেই মুহূর্তগুলো মানসপটে ভেসে উঠলো, তৎক্ষণাৎ সব দ্বিধা কাটিয়ে সিগারেটে প্রথম টান দিলো। সাথে সাথে খুকখুক করে কেশে উঠলো।

প্রথমবারের মতো গলায় সিগারেটের গরম ধোঁয়া প্রবেশ করতেই এমন অনুভূত হলো যেন গলার ভেতরটা ঝলসে গিয়েছে। আগুনের তাপে ভেতরের মাংসল জায়গাটা কামড়ে ধরলো বোধহয়। এই তাপ সহ্য করতে না পেরে পল্লব গলায় অনবরত হাত বুলাতে লাগলো। কিছু সময় পেরুতেই আবারও চোখে ভেসে উঠলো রাতের লজ্জা পাওয়া মুখটা। কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও আবার সিগারেটে টান বসালো। এই পর্যায়ে গলার জ্বালায় পল্লবের চোখ লাল হয়ে পানি জমলো।( কেউ আবার ভেবে বসো না যে আমিও সিগারেট খেয়েছি) তৃতীয় টান দিতেই ফুঁপিয়ে উঠলো ছেলেটা। ব্রিজ থেকে নেমে রাস্তায় বসে পড়লো। পিঠ ঠেকালো ব্রিজের রেলিংয়ে।বাচ্চাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করলো। আল্লাহ যাকে মনে প্রবেশ পারমিশন দেন, তাকে কেন ভাগ্যে রাখেন না? মনটা কেন এত বেপরোয়া? ভাগ্যটাই বা এত ছন্নছাড়া কেন?
অনেকটা সময় পর গলার জ্বালা কমে আসতেই চোখ মুছে আবারও সিগারেটে টান বসালো। এবার আর বেশি জ্বালা হলো না। ধীরে ধীরে একটার পর একটা, একটার পর একটা, কদিন পর পর, কদিন পর পর, এরপর এই সিগারেট হয়ে উঠলো প্রতিদিনকার অভ্যাস।সারাদিনে ৬-৮টা না হলে চলে না। ভার্সিটি থেকে ফেরার কালে কম করে হলেও ৩টা প্রয়োজন।নয়তো মন-মস্তিষ্ক ঠিক থাকে না।ইদানীং পল্লবের মাথায় মাঝে মাঝে একটা গল্প এসে হানা দেয়।

গল্পটা এরকম,, জঙ্গলের ছোট্ট একটা কুঠুরিতে একজন ভ্রামন বাস করতো। সে সন্ধ্যা হলেই রোজ চাঁদের পানে তাকিয়ে থাকতো। মনে মনে হিসাব কষতো, কত টাকা হলে সেই চাঁদে পৌঁছানো যাবে? চাঁদকে ছোঁয়া যাবে? একদিন হিসাব কষে দেখলো, ঐ চাঁদ ছোঁয়ার জন্য যত টাকা প্রয়োজন, তা সে নিজেকে বিক্রি করেও লাভ করতে পারবে না। অতঃপর সে চাঁদে যাওয়ার আশা ছেড়ে দিল। সে আর চাঁদ ছুঁতে চায় না।
২৭-০৪-২০২৪

,,, আমার চাঁদ অরুনকে ভালোবাসে,, মারাত্মক পরিমাণের ভালোবাসা যাকে বলে। অরুনরা বংশপরম্পরায়ই বেশ বড়োলোক। সেই সাথে অরুন তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার চাঁদের লাক খুব ভালো,, খুব বড়ো ঘরে বিয়ে হবে তার। আমার মতো মধ্যবিত্তের ঘরে নয়। আমার আগে কখনো অরুনকে দেখে হিংসা হয়নি, ইদানীং হয়। আমি যদি বড়ো ঘরের কিংবা অরুনদের কাছাকাছি ঘরে জন্ম নিতাম, তাহলে জোর করেও হলেও রাতকে নিজের করে নিতাম। আমার ভিতরে তৈরি হওয়া ভালোবাসার পরিমাণটা বোঝানোর চেষ্টা করতাম। হয়তো শুরুতে চাঁদ বুঝত না, অরুনের জন্য কষ্ট পেত; কিন্তু একদিন না একদিন সে ঠিকই আমার ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করত। আমাদের একটা সুন্দর সংসার হতো। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব,, আমার মতো করে ওকে কেউ ভালোবাসতে পারবে না। চাঁদ যদি অরুনের সাথে হাজার বছরও সংসার করে, তবুও অরুন ওকে ততোটুকু চিনতে পারবে না, যতটা আমি চিনি।

ততটা বুঝতে পারবে না, যতটা আমি বুঝি। আমার মতো করে ওকে কেউ আগলে রাখতে পারবে না। তবুও আমি আজকের পর চাঁদের আশা ছেড়ে দিলাম। ও ভালো থাকুক,, একটা লাক্সারিয়াস লাইফ লিড করুক। জীবন তো আর ভালোবাসায় চলে না,, ভালোবাসা মন ভরাতে পারলেও পেট ভরাতে পারে না। অরুন চাঁদকে একদিনে যা দিতে পারবে, তা আমি আগামী দশ বছর রোজগার করেও দিতে পারব কিনা সন্দেহ। আর রোজগার করবই বা কী দিয়ে? পড়ালেখাই তো শেষ হলো না। চাকরি পাব কবে? আদৌ পাব কি না সন্দেহ। এত ব্যর্থতা, সামর্থ্যহীন জীবন নিয়ে কোন যুক্তিতে চাঁদকে চাইব? আমি কেন চাঁদের ভাগ্যটা খারাপ করব? ওর মতো সুন্দর, স্নিগ্ধ চাঁদ অরুনের মতো বড়ো অট্টালিকার উপরেই জ্বলজ্বল করবে। আমার মতো দুই পয়সার পল্লবের ঘরে চাঁদ মানায় না। এই ঘরে চাঁদ এলে অচিরেই তার উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আজকের পর মোনাজাতে চাঁদ চাওয়া বারণ। পল্লব আর কোনোদিন, একদিন, এক মুহূর্তের জন্যও চাঁদকে চাইবে না। রাত্রি পল্লবের চাঁদ নয়, বরং অরুনের রাত হয়ে থাকুক।

২৭-০৮-২০২৬
ভাবছি নীল শাড়িটা জ্বালিয়ে দেব। এর তো আর কোনো কাজ নেই। রেখে কী হবে? যার জন্য কিনেছিলাম, সেই তো অন্য কারোর। সেই অন্য কারোর আবার মেলা টাকা। সেই টাকার ভিড়-বাট্টায় তাতের ৫০০ টাকার শাড়ি বড্ড মূল্যহীন।
০২-০৯-২০২৬
তারে আমি আমার মনে করলাম, অথচ সে আমার না।
সে আমারে প্রেম চিনাইলো, প্রেম বুঝাইলো,
অথচ তার প্রেমের মালিক আমি না।
আমি তারে ভালোবাসি,, আকাশ যতখানি ভালোবাইসা চাঁদরে যতন কইরা বুকের মাঝে আগলাইয়া রাখে,
তারে আমি ঠিক ততখানি ভালোবাসি।

,, ৩৭তম পাতাটা শেষ হতেই জানালার ফাঁক গলিয়ে বাইরে তাকালো রাত্রি। এখনো পর্যন্ত চারবার পড়া হয়েছে ডায়েরিটা। সকাল হয়ে গিয়েছে, কিছুক্ষণ বাদেই আলো আরও গাঢ় হবে। কানে বাজছে ট্রেনের ঝকঝকাঝক শব্দ। অনেকক্ষণ যাবৎ শোনার দরুন সেই শব্দে মন নেই রাত্রির। তার চোখ ছাপিয়ে পানি গড়ালো। মোছার প্রয়াস চালালো না মেয়েটা। গা হেলিয়ে দিল সিটে। বর্তমানে তার গন্তব্য চট্টগ্রামে। কমলাপুর রেলস্টেশনে থাকা অন্তঃকরণ ট্রেনের শেষ টিকিটটা রাত্রির নামে লেখা হয়েছিল। ট্রেনটি ছেড়েছিল রাত ঠিক চারটায়। এখন বাজে ভোর সাড়ে পাঁচটা। চট্টগ্রাম পৌঁছাতে আরও ৫-৬ ঘণ্টার ব্যাপার।
সেখানেই কয়েকটা মাস থাকবে রাত্রি। এরপর রেজাল্ট দিলে ভিসা প্রসেসিং কমপ্লিট হলেই মাস্টার্স করার জন্য সাউথ কোরিয়া চলে যাবে। কবে ফিরবে তা জানা নেই। হয়তো ফিরবে, নয়তো না। মূলত সে পালিয়ে যাচ্ছে। এই শহর, আপন জায়গা, বন্ধু-বান্ধব, পরিবারসব রেখে পালাচ্ছে একপ্রকার। এই শহরে রাতের একটা সংসার হওয়ার কথা ছিল। সেই না-হওয়া সংসারটাকেও ছেড়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু মানুষের সুখে থাকা বারণ। সুখ শব্দটা তাদের সাথে এক্সিস্ট করে না। আর সেই মানুষগুলোর কাতারেই পড়ে রাত্রি। নয়তো ভাগ্য কেন বারবার তার এত পরীক্ষা নেয়? কেন তাকে এই পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করালো? জীবনের এতগুলো বছর লাঞ্ছনা পাওয়ার পরেও তার দুঃখ কেন ফুরালো না? তার বোধহয় একটুখানি সুখ পাওয়ার কথা ছিল, তবে ভাগ্য তাকে তা পেতে দেয়নি। ট্রেনের লাস্ট টিকিট হওয়ায় কেবিনে জায়গা হয়নি রাত্রির। অগত্যাই এভারেজ সিট নিতে হলো। আশপাশে বহু লোক ঘুমিয়ে আছে, যার ফলস্বরূপ শব্দ করে কাঁদতে পারছে না মেয়েটা। অনেক ভাবাভাবির পর রাত্রি ব্যাগ হাতড়ে একটা কলম বের করলো। পল্লবের লেখা ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরির পরের পাতা, মানে ৩৮ নম্বর পাতায় গুটি গুটি অক্ষর সাজিয়ে লিখলো—

,,, প্রতিটি থ্রি অ্যাঙ্গেল লাভে তৃতীয় ব্যক্তির ভালোবাসাকে পায়ের তলায় পিষে দিয়ে দুজন মানুষ ভালোবেসে জিতে যায়। আমাদের ক্ষেত্রে এবার ব্যতিক্রম কিছু হোক। একজনকে সুখী করতে গিয়ে অন্যজনকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, তাই আমি নিজেই দূরে সরে গেলাম। বিনিময়ে নাহয় তিনজনেই কষ্ট পেলাম। এই কষ্টটা সুখকর। জীবনের সাথে বোঝাপড়া করার কালে কোনো আফসোস থাকবে না। আমি দোয়া করি, খুব শিগগিরই তোরা আমাকে ভুলে যা আর তোদের জীবনে এমন কেউ আসুক, যারা একান্তই তোদের হবে। আর কোনো থ্রি অ্যাঙ্গেল লাভ তৈরি না হোক।
,,, লিখেই থামলো রাত্রি। শ্রাবণের ধারার ন্যায় চোখ বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। বুকের ভিতর অসহ্য যন্ত্রণা। মাথাটাও কেমন ভার হয়ে আছে। অরুনকে ছেড়ে যেতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে একপ্রকার। মনে হচ্ছে এখনই মরে যাবে। অরুন তো কিছুই জানে না। বেচারা নির্দোষ। কত আশা নিয়ে বসে আছে তাদের বিয়ে হবে, একটা সুন্দর সংসার হবে। অথচ রাত্রি কী করছে? অরুন আর অরুনের ভালোবাসাকে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে। অরুন কি তাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে? করাটা কি সম্ভব? রাত্রি কী মনে করে যেন আরও একটা পাতা উল্টালো। ৩৯ নম্বর পাতায় আবারও গুটি গুটি অক্ষরে লিখলো—

,,, প্রিয় অরুন, আমার ভালোবাসা, আমার অবুঝ প্রেমিক। আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি। তোর প্রতি আমার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই, আর না তোর দেওয়া ভালোবাসাতে আমার কোনো অভিযোগ আছে। তুই আমাকে যতটা ভালোবেসেছিস, বাসিস এমন করে খুব কম মানুষই ভালোবাসতে পারে। আমাদের একটা পবিত্র সংসার হতে পারতো, কিন্তু আমি নিরুপায়। তুই আমাকে ভালোবাসিস, আমি তোকে ভালোবাসি, আর পল্লব আমাকে ভালোবাসে। কী গোলমেলে না ব্যাপারটা? এই তৃতীয় ব্যক্তিটা পল্লব ছাড়া অন্য কেউ হতে পারতো। অন্য কেউ হলে আমি কখনোই তাকে পরোয়া করতাম না। তোকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বাকিটা জীবন সুখে সংসার করতাম। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তিটা পল্লব। আমাদের বন্ধু। খুব কাছের আর প্রিয় বন্ধু। সেই সাথে আমার বিশ্বাস, ভরসা আর নির্ভরতার একটা জায়গা। কেউ যদি শুধায়” তোমার মায়ের পর কে সবচেয়ে বেশি তোমায় আগলে রাখে? ” আমাকে পল্লবের নাম বলতে হবে। তাই পল্লবকে কষ্টে রেখে আমি কোনোদিন তোর সাথে সুখী হতে পারবো না।

বিশ্বাস কর, আমার পক্ষে যদি সম্ভব হতো, তাহলে নিজেকে মাঝখান থেকে কেটে দুটো ভাগ করে তোদের দিয়ে দিতাম। কিন্তু সেই ক্ষমতা আমার নেই। আমি কখনোই তোর কাছে ক্ষমা চাইবো না, কারণ সব অন্যায়ের ক্ষমা হয় না। তোর খুব শখ ছিল না আমার মুখে “তুমি” শোনার?
,,, আমি তোমাকে ভালোবাসি, অরুন। অসম্ভবের পরেও যদি কোনো শব্দ থেকে থাকে, তার থেকেও বেশি ভালোবাসি তোমায়।
,,, এই পর্যায়ে রাত্রির কান্নার তীব্রতা বাড়লো। তার পরনে নীল শাড়ি। পল্লবের কিনে দেওয়া শাড়িটাই গায়ে জড়িয়েছে। পল্লব বলেছিলো এই তাতের দাম চাঁদ কোনোদিন দিবেনা কারন চাঁদ একদিন বিলাশ বহুল জীবনে অভ্যস্ত হবে। শুধু পল্লবকে ভুল প্রমান করতেই শাড়িটা গায়ে জড়িয়েছে সে। কারোর বউ হয়ে নয় বরং মুক্তির পাখি হয়ে। এই শাড়িতেই আজ মুক্তি হোক রাত্রির। সব সম্পর্ক, আবেগ বিচ্ছিন্ন করে পালিয়ে বেচে যাক একেবারে। পরনের শাড়ির আঁচল টেনে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। কিছু সময় পর পাশে বসা বৃদ্ধ লোকটা চোখ মেলে তাকিয়ে ধমক দিতেই আবারও চুপ করে গেলো। বৃদ্ধ লোকটা আবার চোখ বুঝতেই রাত্রি নাক টেনে ৪০তম পাতায় লিখলো—

,,, অর্পন! আমার বোন। আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি। কথা ছিল একসাথে থাকার, কখনো ছেড়ে না যাওয়ার। অথচ আমি সেই কথা রাখতে অপারগ। তোর কাছেও আমি ক্ষমা চাইব না। আমাকে তোরা ক্ষমা করিস না প্লিজ। ক্ষমা করা মানে ভুলে যাওয়া,, আমি তদের অস্তিত্বে মিশে থাকতে চাই। কখনো যোগাযোগ হবে কিনা জানিনা তবুও আমায় রেখে দিস তর মনের এক কোনে,, আমায় কখনো ভুলে যাস না।
৪১তম পাতায় এসে ইরাদের নাম লিখতে গিয়েও কী মনে করে আগে পল্লবকে কিছু বলতে ইচ্ছে করলো। রাত্রি থেমে গেল। ইরাদের জন্য ৪১তম পাতাটা খালি রেখে ৪২তম পাতায় লিখলো—

,,, অপ্রিয় পল্লব, তোকে কী বলে ডাকি বলতো? তুই আমার কে? বন্ধু? না তো! সেই সম্পর্কটার মান তো তুই রাখলি না। তাহলে তোকে কী ডাকবো? অপ্রেমিক? তুই তো মারাত্মক প্রেমিক পুরুষ, কিন্তু আমি তোর প্রেমিকা না, আর না তুই আমার প্রেমিক। সেই ক্ষেত্রে তোর সাথে অপ্রেমিক কথাটা বড্ড যায়। অপ্রিয় অপ্রেমিক পল্লব, তুই আমাকে কেন ভালোবাসলি বলতো? আমার জীবনটা কেন এতটা কমপ্লিকেটেড করে,,
লিখতে লিখতেই হুট করেই কেঁপে উঠল রাত্রি। সাথে ট্রেনের বগিটাও কেমন দুলে উঠল। বাইরে থেকে চিড়চিড় শব্দ আসছে, যেন কোনো কিছু ভেঙে পড়ার প্রয়াস চালাচ্ছে কোথাও। এই পর্যায়ে বগিটাও কেমন থরথর করে কাঁপতে লাগল। ধীরে ধীরে তার কাঁপুনি বাড়ছে। শেষ রাতের ট্রেন হওয়ায় বগিতে থাকা সকলেই ঘুমে বিভোর ছিল। ট্রেনের অস্বাভাবিক কাঁপুনিতে হুড়মুড়িয়ে লাফিয়ে উঠল সবাই। আতঙ্কে এদিক-ওদিক তাকাতেই বগির কাঁপুনি আরও বাড়ল। সাথে সাথে নিজেদের সিট শক্ত করে চেপে ধরে সবাই সমানে চেঁচিয়ে উঠল। কাতর কণ্ঠে বাঁচার আহাজারি করতে লাগল সবাই। ট্রেনের অস্বাভাবিক কাঁপুনিতে রাত্রি আতঙ্কে উঠে দাঁড়াল। তখনই হাত ফসকে ডায়েরি আর কলমটা ছিটকে পড়ল দূরে। রাত্রি নিজেও ভীতস্তব্ধ হয়ে নিজের সিটের সামনের অংশটা চেপে ধরল, তবে সবার মতো চিৎকার করতে পারছে না। আতঙ্কে তার সারা গা কেমন হিম হয়ে আসছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি বিকট ধাতব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। রাত্রি ভয়ে চোখ খিঁচে, কান চেপে ধরে চিৎকার করে ডাকল — মাহ!! ওমাহ!!

,,অপর পাশের বগি থেকেও চেঁচামেচির শব্দ আসছে। সবাই যেন বাঁচার আকুতিতে বিভোর। তখনই পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত কাপলারটি ভেঙে যাওয়ায় ট্রেনের পেছনের কয়েকটি বগি মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সামনের ইঞ্জিন ও বগিগুলো কিছু দূর এগিয়ে গেলেও পেছনের বিচ্ছিন্ন বগিগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুলতে শুরু করল। ভেজা রেললাইনে প্রচণ্ড দুলুনির এক পর্যায়ে একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পাশের দিকে কাত হয়ে গেল। তার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পরের বগিটিও লাইন থেকে ছিটকে পড়ল। মুহূর্তেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বগিগুলোর ভেতর অন্ধকার নেমে এল। বগি উল্টে পড়ার কারণে প্রতিটি যাত্রী এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ছে। রাত্রি ছিটকে গিয়ে বগির উপরের অংশে বাড়ি খেল। মাথায় আঘাত পাওয়ার সাথে সাথে পিঠে কী যেন একটা বিধল। কী বিধেছে সেটা দেখার সময় পেল না রাত্রি। পিঠ ও মাথার অসম্ভব ব্যথায় আবারো ঠোট ফুরে বেড়োলো — আল্লাহ!! মাগো!!

,,, তৎক্ষণাৎ আরও একটা ভাঙা কাচ এসে বিধল কোমরের মাংসল স্থানে, গলাগলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকলো। পেটের কাছে ছিটকে পড়ল একটা শিশু, মাথার কাছে ছিটকে পড়ল পাশে বসা বৃদ্ধ লোকটি। রাত্রি আবছা চোখে শিশুটিকে দেখল। বাচ্চাটির গলায় ভয়ঙ্করভাবে একটা কাচ বিধে আছে। সে হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে ছুঁতে চাইল, তখনই বগি আরও একবার উল্টে গেল। রাত্রি আবারও ছিটকে পরলো কোথাও,, মুহূর্তেই রাত্রির পেটের অংশে বড় একটা ধারালো অংশ চাপা পড়ল। রাত্রি জানে না এই অংশটার নাম কী, দেখতে কেমন আর কতটা ভারী। শুধু এটুকু জানে তীব্র ব্যাথার সাথে পেট থেকে পা পর্যন্ত সম্পূর্ণ অংশটা কাচের চাপে দুভাগ হয়ে গিয়েছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় তরপে উঠলো রমনি,, ঠোঁট ফুরিয়ে শেষ বারের মতো বেড়িয়ে এলো — মাহ!! মাগো,, মাম্মা!!

,,, এরপর আর কেউ এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল না। ট্রেনের বগিটাও উল্টে গিয়ে কেমন শান্ত হয়ে গেল। শুধু শান্ত হতে পারল না মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা রমণী। একটু আগে একপ্রকার যোকের বশেই সে বলেছিল,”” আমি যদি পারতাম, তাহলে নিজেকে দুই ভাগে বিভক্ত করে তোদের দুজনকে দিয়ে দিতাম।”” আল্লাহ কি তবে রাত্রির সেই দোয়া কবুল করলেন?
ভালোই হলো। এতটা টানাপোড়েন নিয়ে সবার থেকে দূরে থাকার চেয়ে একেবারে দূরে চলে যাওয়াই ভালো। মানুষ মরে গেলে তার কোনো দুঃখ থাকে না। সেই ক্ষেত্রে আজ কিছুক্ষণের মাঝেই রাত্রির সকল দুঃখের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। অরুনকে ছেড়ে যেতে আর কষ্ট হবে না,, অরুন অন্য কারোর সাথে সংসার করলেও তা বেচে থেকে দেখতে হবে না। নিজের অপরাধী চেহারাটা নিয়ে ভালোবাসায় উন্মাদ পল্লবের সামনে দাড়াতে হবে না। নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হবে না। এই প্রথম বোধয় নিজের ভাগ্যের উপর খুশি হলো রমনি।

মনের একপ্রান্তে মুক্তির জন্য আনন্দ থাকলেও দেহ যে তা বোঝে না। গলা-কাটা মুরগির ন্যায় ছটফট করতে লাগল রাত্রির ছোট্ট দেহখানি। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ফর্সা মুখটা কেমন লাল রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। মুহূর্তেই দাঁতে দাঁত পিষে চোখ উল্টে এল মেয়েটার। নাক মুখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো গরম তাজা রক্ত। গলার কাচটা কেমন অবরোধ হয়ে আসছে। নিশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই কষ্টের তীব্রতা বাড়ল। ভঙ্গুর হাতখানা কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার প্রয়াস চালাচ্ছে। তখনই ওর হাতখানা চেপে ধরল কেউ। এই চেপে ধরায় ভরসা পেল মেয়েটা। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মায়ের শুশ্রি মুখখানি। এই তো মা পাশে বসে আছে। কেমন নীরব চাহনিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, দেখো। রাত্রির ঠোঁটে হাসি ফুটলো,, মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে। রাত্রি ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে নেবে, তখনই তীব্র যন্ত্রণায় শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। এমন অনুভূত হলো যেনো কেউ শরীরের নরম চামড়াখানি টেনে টেনে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মায়ের হাত খানা শক্ত করে ধরলো রাত্রি,, বুক উঠা নামার মাধ্যমে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা চালালো তবে সফল হলো না। চোখের শিরা গুলো তরপাতে লাগলো, তরপাতে তরপাতে একপর্যায়ে সবকিছু কেমন শান্ত হয়ে গেল। মেয়েটার চোখ থেকে গড়িয়ে পরলো সর্বশেষ জমিয়ে রাখা পানিটুকু।

,,,,যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া রাত্রির ঠোঁটে দেখা গেল এক চিলতে মুক্তির হাসি।
সাইকোলজি বলে, “মানুষ মারা যাওয়ার পর পুরো সাত মিনিট তার মস্তিষ্ক সজাগ থাকে। আর সেই সময়টাতে মানুষের মানসপটে ভেসে ওঠে তার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই মুহূর্তগুলো, যা তাকে একসময় আনন্দ দিয়েছিল।” রাত্রির মানসপটে ভেসে উঠল অরুণের মুখখানি। এই তো সেদিন, যেদিন তাদের বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। ছেলেটা কোনো শাসন-বারণ না মেনেই সবার সামনে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। এ নিয়ে অরুণের মা অরুণকে কত বকাঝকা করলেন, কিন্তু ছেলেটার মুখে এক ফোঁটা অনুতপ্ততার রেশও দেখা গেল না। ওই তো ক্যাম্পাসের মাঠে বসে আছে পাঁচজন।

অর্পণটা কী যেন বলল, তা নিয়ে সবাই হেসে কুটিকুটি। ইরা আর অরুণটা কী নিয়ে যেন মারামারি করছে। কিছুটা দূরে দৃশ্য পরিবর্তন করে তারা সবাই মিলে কয়েকটা মেয়েকে র‍্যাগ দিচ্ছে। সেই চায়ের আড্ডা, ইরাদকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো, মায়ের আদর, ক্ষণিকের জন্য পাওয়া বাবার স্নেহ আর সর্বশেষ পল্লবের সেই কাতর চাহনি। এই চাহনির মানে আগে বুঝত না রাত। কেন বুঝত না, কে জানে? আল্লাহ তাকে এতটা বোকা না বানালেও পারতেন। অর্পনার মতো যদি মানুষের চোখ দেখে মনের কথা বোঝার ক্ষমতা থাকত, তাহলে আজ সবটা অন্যরকম হতো। কিছু না কিছু তো পরিবর্তিত হতই। পল্লবের নামে অনেক কথা জমা ছিলো রাত্রির,, যেগুলো বলা হয়নি,, লেখাও হয়ে উঠেনি। মেয়েটার মস্তিষ্ক তো সজাগ,, এই সজাগ মস্তিষ্কে কিছুটা আফসোস হলো কি? ছেলেটা কেনো তাকে ভালোবাসলো? এতটা ভালোবাসার কি খুব প্রয়োজন ছিল?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৩)

তাকেই কেন ভালোবাসতে হলো? ফ্রেন্ড সার্কেলে তো আরও দুজন মেয়ে ছিল। তাদের যদি বোনের নজরে দেখা যায়,,, রাত্রিকে কেন দুজন ভালোবাসার নজরে দেখল? কেন ঘটল এই অঘটনটা? সে সুন্দর বলে? তবে কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকি বলেছিলেন”” সৌন্দর্য সবসময় সৌভাগ্য নিয়ে আসে না,, কখনো কখনো দূর্ভাগ্য ও নিয়ে আসে”” যেমন করে বালির জীবন খানা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো আজ রাতের জীবনটাও এলোমেলো হয়ে গেলো। একদিক থেকে রাত্রি বেশ লাকি,, বালির তো মুক্তি মিলেনি, তার আবার মুক্তি মিলেছে।
সেই মুক্তির সাধ মিটাতে শো শো বাতাসের সাথে বোধয় মিশে এলো দুটো লাইন,,,
,,, এরা সূখের লাগি চাহে প্রেম,, প্রেম মিলে না,,
,, শুধু সুখ চলে যায়,, এমনি মায়ার ছলনা।,,

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৫)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here