প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৯
insia isha chowdhury
সূচনা ঠোঁট উল্টে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। এমন একটা ভাব যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়টা আজ তার সাথেই হয়েছে। কতদিন ধরে সে মনে মনে কত পরিকল্পনা করেছে! কোথায় কোথায় যাবে, কী করবে, প্রণয়ের সাথে কত সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত কাটাবে। এসব ভেবেই তো সে ছোট্ট একটা তালিকা বানিয়েছিল। অথচ প্রণয় তার সব স্বপ্নের ওপর এক বালতি ঠান্ডা পানি ঢেলে দিল। ধীরে ধীরে সূচনার মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। পেছন ঘুরে ভ্রু কুঁচকে রাগী চোখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রণয় বুঝতে পারল, তার কথায় সূচনা রেগে গেছে। তবে ব্যাপারটা বুঝেও সে একটুও বিচলিত হলো না। বরং মেয়েটাকে আরও একটু উস্কে দিতে ইচ্ছে করল তার। আসলে সে তো সূচনাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেই। শুধু তার আগে একটা জিনিস খুব জরুরি—সূচনার পরীক্ষা। মেয়েটা এমনভাবে ঘোরাঘুরির স্বপ্নে ডুবে আছে যেন পরীক্ষার অস্তিত্বই পৃথিবী থেকে মুছে গেছে! প্রণয় জানে সূচনা পড়াশোনা একদম পছন্দ করে না। বইয়ের নাম শুনলেই ওর মুখ ভার হয়ে যায়। কিন্তু তবুও পড়াশোনা তো প্রয়োজন। জীবনের এমন একটা সম্পদ, যার মূল্য অনেক সময় মানুষ তখন বুঝতে পারে না, কিন্তু সময় চলে গেলে আফসোস করতেই হয়। আর প্রণয় কোনোভাবেই চায় না ভবিষ্যতে তার স্ত্রী কোনোদিন আফসোস করুক। ভাবুক—“ইশ! যদি তখন আরেকটু পড়তাম!”
এই আফসোসটা প্রণয় সূচনার জীবনে দেখতে চায় না। তাই গ্রীবা সামান্য ঝুঁকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“কী ব্যাপার? আমার বউটা কি রেগে আছে?”
কথাটা শুনেই সূচনার মেজাজ আরও চড়ে গেল।
ভ্রু দুটো এমনভাবে কুঁচকে গেল যেন এক্ষুনি যুদ্ধ ঘোষণা করবে। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। ফর্সা গাল দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। চোয়াল শক্ত করে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই লোকটা কিনা তাকে জিজ্ঞেস করছে সে রেগে আছে কি না! সূচনা কটমট করে তাকিয়ে বলল,
“না, রেগে থাকব কেন? এখন তো আমার খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে। দেখবেন?”
প্রণয়ের কুঁচকানো চোখ দুটো প্রসারিত করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সে কল্পনা করল, সূচনা যদি সত্যিই নাচে তাহলে তাকে কেমন লাগবে? নিশ্চয়ই অপ্সরার মতো। ভাবতেই তার বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। সে আচমকাই এক পা এগিয়ে এল। সূচনা অবাক হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। প্রণয় আবার এগোল। সূচনা আবার পিছোল। এভাবে পিছোতে পিছোতে একসময় তার পিঠ গিয়ে ঠেকল দেয়ালে। আর প্রণয়? সে এক হাত তুলে সূচনার মাথার পাশে দেয়ালে ভর দিল।
মুহূর্তেই দুজনের মাঝের দূরত্বটুকু হারিয়ে গেল।
এতটাই কাছে যে একজনের নিঃশ্বাস আরেকজনের গালে এসে লাগছে। সূচনা কিছু বলার আগেই প্রণয় গম্ভীর মুখে বলল,
“দেখাও।”
সূচনার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“কী দেখাব?”
“নাচ।”
“আশ্চর্য! আপনি এসব কী বলছেন?”
প্রণয় নির্বিকার গলায় বলল,
“একটু আগে তুমিই তো বললে তোমার খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে। তাই বলছি, দেখাও। এখন আমারও তোমার নাচ দেখতে ইচ্ছে করছে।”
কথাটা শুনে সূচনার রাগ যেন সপ্তম আকাশে উঠে গেল। সে ঝটকা দিয়ে প্রণয়কে ধাক্কা দিল। কিন্তু প্রণয় একচুলও নড়ল না। বরং আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল। সূচনা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“শখ কত আপনার! আমি কেন আমার নাচ আপনাকে দেখাব?”
তারপর অভিমানী কণ্ঠে বলল,
“আপনি নিজে আমার ইচ্ছার দাম দিয়েছেন যে আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করব?”
কথাটা বলে সে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই প্রণয়ের শক্ত দুটো বাহু তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। সূচনা থমকে গেল। প্রণয় মুখটা তার কানের কাছে নিয়ে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি একবারও বলেছি তোমার ইচ্ছা পূরণ করব না? তুমি যে লিস্টে যতগুলো জায়গার নাম লিখেছ, আমি তোমাকে সবগুলো জায়গায় নিয়ে যাব। একটাও বাদ যাবে না। শুধু চাই, আগে তোমার পরীক্ষাটা ভালোভাবে শেষ হোক।”
সূচনার অভিমান যদিও পুরোপুরি গলেনি। সে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বলল,
“আপনি পরে এই কথা ভুলে যাবেন না তার কোনো গ্যারান্টি আছে?”
প্রণয় আলতো করে সূচনাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। এক হাত তুলে সূচনার তুলতুলে নরম গালে রাখল। তারপর গভীর দৃষ্টিতে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আবরার প্রণয় মির্জা যখন কোনো ওয়াদা করে, তখন সেটা রাখার জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেয়। আমি আমার কথা সহজে ভুলি না। আর তুমি তো অন্য কেউ নও, তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। তোমার কথা আমি কীভাবে ফেলতে পারি বলো?”
কথাগুলো শুনে সূচনার রাগ অনেকটাই কমে এল।
তবে পুরোপুরি নয়। সে হঠাৎ নিজের কনিষ্ঠ আঙুলটা সামনে বাড়িয়ে দিল।
“তাহলে আমার সাথে পিংকি প্রমিস করুন।”
প্রণয় কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। সে ভেবেছিল এতক্ষণ ধরে বলা তার রোমান্টিক কথাগুলো শুনে সূচনা হয়তো লজ্জা পাবে, হয়তো আবেগে ভেসে যাবে। কিন্তু না এই মেয়ে সবশেষে এসে তার সঙ্গে পিংকি প্রমিস করতে চায়! সত্যিই, বাচ্চা একটা মেয়েকে বিয়ে করার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বোধহয় এটাই। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রণয় শেষমেশ নিজের কনিষ্ঠ আঙুলটা সূচনার আঙুলের সঙ্গে জড়িয়ে দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
“ঠিক আছে, পিংকি প্রমিস। আমি তোমাকে অবশ্যই ঘুরতে নিয়ে যাব।”
মুহূর্তেই সূচনার মুখে ফুটে উঠল এক তৃপ্ত হাসি।
প্রণয়ের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট একটি মখমলি বক্স বের করল। বক্সটা দেখেই সূচনার কৌতূহলী চোখ দুটো আরও বড় হয়ে উঠল। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রণয়ের হাতে ধরা ছোট্ট জিনিসটার দিকে।
প্রণয় ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে ধীরে ধীরে বক্সটা খুলল। মুহূর্তেই ভেতর থেকে ঝলমল করে উঠল এক অপূর্ব সুন্দর হীরের আংটি। আলোর স্পর্শে ছোট্ট পাথরটা এমনভাবে ঝিকমিক করে উঠল যেন একফোঁটা তারার আলো বন্দি হয়ে আছে তার ভেতরে। সূচনা বিস্ময়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। প্রণয় আংটিটা সাবধানে বের করে নিজের হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল। আর বলল,“হাতটা দাও।”
সূচনার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সে কোনো কথা না বলে নিজের হাতটা প্রণয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল। প্রণয় অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তার আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দিল। আংটিটার মাপ একদম নিখুঁত হয়েছে। সূচনার আঙুলে এমনভাবে বসে গেল যেন শুরু থেকেই ওটার জায়গা ছিল সেখানে।
মুগ্ধ হয়ে আংটিটার দিকে তাকিয়ে সূচনা আস্তে করে বলল, “এটা কিসের জন্য?”
প্রণয় উত্তর দেওয়ার আগে আলতো করে সূচনার হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“এটা তোমার ওয়েডিং নাইটের গিফট। কিছু কারণে সেদিন দেওয়া হয়েছিল না।”
সূচনার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,
“কিন্তু ওয়েডিং নাইট তো অনেক আগেই চলে গেছে।”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব আস্তে করে বিড়বিড় করল,
“আফসোস… ওয়েডিং নাইট গেছে, কিন্তু বাসরটা এখনো হলো না।”
কথাটা এতটাই আস্তে বলা হয়েছে যে প্রণয়ের ধারণা ছিল সূচনা শুনতে পাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সূচনার কান ঠিকই সেটা ধরে ফেলল।
সে মনে মনে বলল,
“খচ্চর বেটা! খালি নিজের ধান্দায় থাকে!”
তবে মুখে আর কিছু বলল না। বরং নিজের হাতটা তুলে আবার আংটির দিকে তাকাল। চোখেমুখে স্পষ্ট আনন্দ। আংটিটার প্রশংসা করে বলল,
“আংটিটা খুব সুন্দর হয়েছে।”
প্রণয়ও আংটির দিকে তাকাল। তবে তার চোখে আংটির সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি ধরা পড়ল সূচনার হাতের সৌন্দর্য। মনে হলো, আংটিটা সুন্দর নয়, বরং সূচনার হাতেই ওটা এত সুন্দর দেখাচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে প্রণয় বলল,
“আচ্ছা, আমার গিফট কোথায়?”
সূচনা অবাক হয়ে বলল,
“গিফট? কিসের গিফট?”
“আমি তোমাকে উপহার দিলাম, আর তুমি আমার জন্য কিছুই কিনলে না?”
প্রণয় ইচ্ছে করেই কথাগুলো বলছিল। সে নিজেও জানে, সূচনার মাথায় এসব পরিকল্পনা আসার সম্ভাবনা খুবই কম। আর ঠিক সেটাই হলো।
সূচনা একেবারে নিরীহ মুখ করে বলল,
“সত্যি বলতে এসব তো আমার মাথায়ই আসেনি। তাই আপনার জন্য কোনো গিফট নেই।”
প্রণয় নাটকীয় ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর চোখ বন্ধ করে নিজের মুখটা সূচনার দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, সমস্যা নেই। অন্য কিছু দিলেও চলবে।”
সূচনা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বুঝতেই পারল না কী করতে হবে। তারপর হঠাৎ কী মনে করে নিজের হাতটা তুলে প্রণয়ের মাথায় আলতো করে বুলিয়ে দিল। খুব যত্ন করে, খুব আদর করে। আর মিষ্টি কণ্ঠে বলল,
“আপনি যেন সবসময় এমনই থাকেন। সবসময় যআমাকে ভালো রাখুন। সবসময় যেন আমার কথাই ভাবেন। আপনার মাথায় যেন অন্য কোনো মেয়ের নাম বা চিন্তাও না আসে। সবসময় যেন শুধু আমাকেই ভালোবাসেন।”
প্রণয় চোখ খুলল। তারপর বিস্মিত মুখে তাকিয়ে বলল,
“সব ঠিক আছে… কিন্তু এটা কী ছিল?”
সূচনা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
“ওটা? ওটা আপনাকে আদর করে দিলাম।”
“এটা আবার কেমন আদর?”
“স্নেহের আদর।”
প্রণয় ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সূচনা আরও গম্ভীর মুখ করে বলল,
“আপনি তো এখন মুরুব্বি হয়ে গেছেন। তাই…”
কথাটা বলেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না সূচনা। খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই কয়েক কদম দূরে সরে গেল।প্রণয় মাথা নেড়ে হেসে ফেলল। তারপর চোখ সরু করে বলল,
“আচ্ছা! আমি এখন মুরুব্বি হয়ে গেছি?”
ধীরে ধীরে সূচনার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“দাঁড়াও… আজ তোমাকে ধরতে পারলে বুঝিয়ে দেব আমি মুরুব্বি নাকি অন্য কিছু!”
কথা শেষ হতেই সূচনা চমকে উঠে উল্টো দিকে দৌড় দিল। একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো।
হাসতে হাসতে, লুকাতে লুকাতে, পালাতে পালাতে।
আর প্রণয় তার পেছনে। তবে শেষ পর্যন্ত সূচনার পালিয়ে বাঁচার উপায় হলো না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রণয় তাকে ধরে ফেলল। নিজের বাহুর বেষ্টনীতে আটকে নিল শক্ত করে। হাসতে হাসতেই সূচনা বলল,
“আরে! কী করছেন? আমাকে ছেড়ে দিন!”
প্রণয় তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
তারপর খুব ধীরে, ভীষণ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“সেটা তো হবে না।”
এক হাত দিয়ে সূচনাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো আমি তোমার জীবনে আসিনি।
সূচনার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে আবার বলল,
“আমি কখনোই তোমাকে ছাড়ব না, সূচনা।
না… তাই ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।”
প্রণয়ের কথা শুনে সূচনার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে মিটিমিটি হেসে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎই প্রণয় কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“সূচনা, তোমার কোন কাজটা করতে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে?”
এমন রোমান্টিক মুহূর্তে আকস্মিকভাবে এই প্রশ্ন শুনে সূচনা খানিকটা বিরক্ত হলো। ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“কাজ জিনিসটাই আমার একদম পছন্দ না। তবে খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।”
প্রণয়ের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। সে আবার জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, আর কী করতে ভালো লাগে?”
সূচনা কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“আমার সারাদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটাতে অনেক ভালো লাগে।”
তার উত্তর শুনে প্রণয় অসহায়ের মতো মাথা নাড়ল। মনে হচ্ছিল, সে যেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানার চেষ্টা করছে, আর সূচনা প্রতিবারই তাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। অবশেষে একটু এগিয়ে এসে প্রণয় নরম স্বরে বলল,
“আর… আমাকে কেমন লাগে?”
প্রশ্নটা শুনতেই সূচনার গাল লালচে আভায় রাঙা হয়ে উঠল। লজ্জায় সে দ্রুত দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। তারপর মৃদু কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“না… বলব না আমার লজ্জা করে।”
উত্তর না পেয়ে প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল মৃদু হতাশা আর ভালোবাসামাখা অসহায়ত্ব। মনে মনে সে বিড়বিড় করে বলল,
“আশ্চর্য মেয়ে একটা! এমনিতে তো সারাদিন মুখ কাঁচির মতো চলে। একবার কথা শুরু করলে থামার নামই থাকে না। অথচ সবচেয়ে জরুরি কথাটাই যখন শুনতে চাই, তখনই মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও বের হয় না! এ আমার কোন মেয়ের সাথে বিয়ে হলো? এই মেয়ে তো দেখছি কিছুই বোঝে না! কবে যে আমাকে বুঝতে শিখবে?”
সূচনা লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে আছে। প্রণয়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যস্ততায় সে প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু তাড়াহুড়োর সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল বিপত্তি। সামনে থাকা বুকশেলফটির দিকে খেয়াল না করেই সজোরে গিয়ে ধাক্কা খেল সে। “আহ্!” ব্যথায় হালকা আর্তনাদ করে উঠল সূচনা। ধাক্কার অভিঘাতে বুকশেলফ কেঁপে উঠল, আর তার ভেতর থেকে কয়েকটি বই একের পর এক মেঝেতে ছিটকে পড়ল। ভারসাম্য হারিয়ে সূচনাও মেঝেতে বসে পড়ল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে প্রণয় প্রথমে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। তারপরই উদ্বিগ্ন হয়ে দ্রুত সূচনার কাছে এগিয়ে এল। মেয়েটার চোখে তখন ব্যথার জল চিকচিক করছে। পড়ে গিয়ে হাতের বাহুতে আর পায়ে হালকা আঘাত লেগেছে। তাছাড়া কোমরেও বেশ ব্যথা পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
প্রণয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। কোনো কথা না বলে সে সাবধানে সূচনাকে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ কোলে উঠে আসতেই সূচনা বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাল। প্রণয় মৃদু বিরক্তির ভঙ্গিতে বলল,
“এত বড় হয়ে গেছো, অথচ তোমার বাচ্চামোটা এখনো গেল না!”
সূচনা কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট ফুলিয়ে যেন বলতে চাইছে, সব দোষ কি শুধু তারই? প্রণয় তাকে খুব যত্ন করে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। তারপর নিচু হয়ে ওর পা পরীক্ষা করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
“ফার্স্ট এইড বক্স কোথায়?”
সূচনা আস্তে করে ড্রয়ারের দিকে ইশারা করল।
“ওখানে।”
প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়ার খুলে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে আনল। এরপর সূচনার পায়ের গোড়ালিতে যেখানে আঘাত লেগেছে, সেখানে খুব সতর্ক হাতে অয়েন্টমেন্ট লাগাতে শুরু করল। সূচনা চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। ব্যথার মাঝেও বুকের ভেতর এক মিষ্টি উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অয়েন্টমেন্ট লাগানো শেষ করে প্রণয় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ চলে গেল মেঝের দিকে। ধাক্কায় বুকশেলফ থেকে পড়ে যাওয়া বইগুলো এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। প্রণয় উঠে দাঁড়াল। একে একে বইগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আবার শেলফে গুছিয়ে রাখতে লাগল। হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল একটি বড়সড় প্যাড খাতার ওপর। খাতাটা অন্য বইগুলোর চেয়ে একটু আলাদা। কৌতূহলী হয়ে সে সেটি হাতে তুলে নিল। আর ঠিক তখনই বিছানা থেকে সূচনার উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ ভেসে এল,
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ১৮
“কী করছেন?”
প্রণয় ভ্রু তুলে তার দিকে তাকাল। সূচনা তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“ওইটা… ওখানেই রেখে দিন!”
