Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৩
ফাহিমা ইসলাম

“জেলাস হচ্ছেন?”
রূপা তূর্যের দিকে রক্তিম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ না হচ্ছি না।”
“ ওকে দ্যা আমিও কথা বলবো। যেহেতু আপনার কোনো সমস্যা নেই।”
রূপা এবার শব্দ করে কেঁদে ফেললো। এই লোকটা সত্যিই কি তাকে বুঝতে চায় না নাকি তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য সর্বদা এমন করে। রূপা রাগে-দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“ আমি সত্যি আর আপনার সঙ্গে থাকবো না। আপনি মানুষটা ভীষণ বাজে!”
“ আই নো আমি যে বাজে, নতুন কিছু বলুন।”
রূপা নিজেকে ছাড়িয়ে হনহনিয়ে রুমে চলে যায়। তূর্য সেদিকে তাকিয়ে তপ্ত নিশ্বাস ছাড়ে। কালকে তার বাবা-মা আসবে, বাসায় সে আর রূপা ছাড়া কেউ নেই। সে নিজেও সারাদিন রূপার সঙ্গে চাইলেও থাকতে পারে না। এই সময়টাতে তার খেয়াল রাখার জন্যই তারা আসচ্ছে, এই সময় যত পারে হাসি-খুশি থাকার দরকার। যেটা রূপা একা থাকতে কোনোদিনও সম্ভব নয়।

রজনীর নিস্তব্ধতার সঙ্গে সঙ্গে সারা কক্ষেও নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বহুদিন পর আজ তূর্ণার হৃদয় অদ্ভুত এক আলোড়নে কাঁপছে। এমন নয় যে সে কখনো সুখী হয়নি। ররং রৌদ্রিক নামক মানুষটার আগমনের পর তার ভাঙাচোরা জীবন ধীরে ধীরে পূর্ণতা লাভ করেছে। যে মস্তিষ্ক একসময় অন্ধকার গহ্বরে বন্দী ছিল, যে আত্মা অসংখ্য বিভীষিকার কাছে পরাজিত হয়েছিল, সেই আত্মাকেই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে একজন মানুষ। রৌদ্রিক, তার একমাত্র আশ্রয়! তার একমাত্র নিরাপত্তা। তার সমস্ত বিশৃঙ্খলার মাঝে একমাত্র প্রশান্তির নাম। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে কাঁপা হাতে ছোট্ট একটি খাম স্পর্শ করছে তূর্ণা। তার ঠোঁটের কোণে অনবরত হাসি ফুটে উঠছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন পূর্বে হাসপাতালের সাদা দেয়ালঘেরা কক্ষে বসে যখন চিকিৎসক মৃদু হেসে বলা কথাগুলো তার কর্ণকুহরে বেজে উঠছে।

“অভিনন্দন, আপনি মা হতে চলেছেন।”
তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য পৃথিবীটা যেন থেমে গিয়েছিল। সে মা হতে চলেছে! তার শরীরের ভেতর আরেকটি প্রাণ বেড়ে উঠছে। তাদের ভালোবাসার একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। রৌদ্রিক বরাবরই তার স্বাস্থ্যের জন্য বেবি নিতে দেয়নি, তূর্ণা তার বরের কথা রেখেছে। বারাবাড়ি করেনি, সঠিক সময়েই সে এতবড় পদক্ষেপ নিয়েছে রৌদ্রিকে না জানিয়ে। আজ সত্যিই সে রৌদ্রিককে সেই সংবাদ দিতে চলেছে। তূর্ণা জানে রৌদ্রিক এখানে আসবে, আর হলোও তাই কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো রৌদ্রিক। দরজা খুলে কেউ দিগুণ বেগে তার দিকে ছুটে এলো, তূর্ণা চুপটি করে বসে রয়েছে।
“ তূর্ণা সত্যিই কি…!!”
তূর্ণা ধীরে ধীরে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। কোনো বাক্য উচ্চারণ করলো না, অতঃপর এগিয়ে এসে তার সামনে ছোট্ট একটি উপহারের বাক্স বাড়িয়ে দিলো।

“খুলে দেখুন!”
রৌদ্রিক মৃদু বিস্ময়ে বাক্সটি গ্রহণ করলো। তারপর ধীরে ধীরে ঢাকনা সরালো। পরমুহূর্তেই সময় থমকে গেল। ভেতরে রাখা একটি ক্ষুদ্র সাদা রঙের বোনা মোজা, সঙ্গে সাদা ক্ষুদ্র জুতা। এগুলো শিশুদের জন্য।
এবং তার নিচে ভাঁজ করে রাখা রিপোর্ট। রৌদ্রিকের চোখ স্থির হয়ে গেল। সে প্রথমে মোজা আর জুতা জোড়ার দিকে তাকালো। তারপর রিপোর্টের দিকে। অতঃপর তূর্ণার দিকে। আবার রিপোর্ট, আবার তূর্ণা। যেন মস্তিষ্ক বিশ্বাস করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
তার ঠোঁট কেঁপে উঠলো।
“তূর্ণা…!!”
শব্দটা এতটাই ক্ষীণ ছিল যে শুনতে কষ্ট হচ্ছিল। তূর্ণা অশ্রুসিক্ত হাসি নিয়ে মাথা নাড়লো।
“হুম।”
“মানে সত্যি…!!”

রৌদ্রিক বাকিটা বলতে পারলো না। তার কণ্ঠ আটকে গেলো, মনে হচ্ছে তার শব্দভাণ্ডার হারিয়ে গেছে কোথাও। চাইলেও কোনো বাক্য উচ্চারণ করতে পারছে না। একজন মানুষ জীবনে অনেক কিছু অর্জন করে।ক্ষমতা,প্রতিপত্তি,সাফল্য,সম্পদ। কিন্তু কিছু অনুভূতি আছে যা সমস্ত অর্জনকে তুচ্ছ করে দেয়। এই মুহূর্তটি ঠিক তেমন।
“আ..আমি… বাবা হতে চলেছি?”
তূর্ণার চোখ বেয়ে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়লো। সে ফিসফিস করে বললো-
“হ্যাঁ, রোদের পাপা। পাশের বাড়ির ছানা-পোনা গুলো আমার কাছে এখন…”
বাকিটা আর বলা হলো না। কারণ পরমুহূর্তেই রৌদ্রিক তাকে নিজের বুকে টেনে নিল। এমনভাবে। যেন পৃথিবীর সমস্ত মূল্যবান সম্পদ তার বাহুবন্ধনে বন্দী। তূর্ণা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে, রৌদ্রিকের হৃদপিণ্ড দ্রুত গতিতে চলাচল করছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস অস্থির। কিছু সময় বাদে তূর্ণা অনুভব করলো মানুষটা কাঁদছে।
নিঃশব্দে, আবেগের ভারে। তার কপালে, চোখে, গালে একের পর এক স্নেহমাখা চুম্বন এঁকে দিতে দিতে রৌদ্রিক ফিসফিস করে বললো-

“ধন্যবাদ।”
তূর্ণা হেসে কেঁদে ফেললো।
“আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন?”
রৌদ্রিক দুহাতে তার মুখশ্রী আগলে নিল। তার দৃষ্টিতে তখন এমন এক কোমলতা, যা ভাষার সীমারেখা অতিক্রম করে যায়।
“কারণ তুমি আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়টা দিতে চলেছো দ্বিতীয়বারের মতো।”
“বাবা।”
শব্দটা উচ্চারণ করতেই তার কণ্ঠ পুনরায় ভারী হয়ে এলো। ধীরে ধীরে সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো তূর্ণার সামনে। অতঃপর অত্যন্ত যত্নে নিজের হাত রাখলো তূর্ণার উদরের উপর। যেখানে এখন তার ক্ষুদ্র, অদৃশ্য এক প্রাণ স্পন্দিত হচ্ছে। রৌদ্রিক মৃদু হেসে বললো-

“শুনছো ছোট্ট পাখি? তোমার পাপা অপেক্ষা করছে। খুব অপেক্ষা করছে।
তূর্ণার চোখ আবারও ভিজে উঠলো। সে আঙুল ডুবিয়ে দিলো রৌদ্রিকের ঘন চুলের ভেতর। রৌদ্রিক মাথা তুলে তাকালো তার দিকে। দুজনের দৃষ্টি একসূত্রে আবদ্ধ হয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে ছিল না কোনো শব্দ। ছিল না কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন। কারণ কিছু অনুভূতি শব্দের গণ্ডি অতিক্রম করে। এই রজনীর নিস্তব্ধতায়, চাঁদের রূপালি আলোয়, দুইটি মানব হৃদয়ে নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। একজন নারী, যে মাতৃত্বের অলৌকিক অভিযাত্রায় পা রাখতে চলেছে। আর অপরজন, দ্বিতীয়বারের মত বাবা হওয়ার মত অনুভূতির সঙ্গে আবারও সাক্ষাৎ করছে।

প্রভাত আজ যেন স্বর্গীয় কোনো শিল্পীর তুলির আঁচড়ে নির্মিত এক জীবন্ত ক্যানভাস। পূর্বদিগন্ত হতে উদীয়মান দিবাকর তার কোমল সুবর্ণ কিরণ বিস্তার করে সমগ্র প্রকৃতিকে স্নিগ্ধ আলোকবস্ত্রে আবৃত করেছে। মৃদুমন্দ সমীরণ বয়ে আনছে কদম ও শিউলির মাদকতাময় সৌরভ। আজকের সকালটা অন্যসব দিনের মতো নয়। আজ যেন আকাশও জানে,কোনো এক গৃহে নতুন প্রাণের আগমনী বার্তা পৌঁছেছে। সিকদার বাড়ির প্রতিটি কোণে আজ উচ্ছ্বাসে মুখরিত। বিশাল অট্টালিকার দেয়ালজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে হাসির শব্দ, আনন্দের কলরব, আর আবেগঘন বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এমন এক সংবাদ এসেছে, যা মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবারকে অনাবিল সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা। রুমা সিকদারের চোখদুটি বারবার ভিজে উঠছে। ঠোঁটে অবিরাম দোয়া।

“ আলহামদুলিল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ… আমাদের ছেলেমেয়েদের সুখটা আল্লাহ এভাবেই অটুট রাখুক।”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো আবেগে। রাশেদুল সিকদারের মতো গম্ভীর মানুষটিও আজ নিজের কঠোরতার আবরণ ধরে রাখতে পারছেন না। তার ঠোঁটের কোণে বিরল এক প্রশান্তির হাসি।
“ আমাদের নতুন ২ জন অতিথি আসছে।”
কথাটুকু বলার সময় তার কণ্ঠে যে গর্ব আর পরিতৃপ্তি ছিল, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে রিনি বাড়ির বাকিরাও একই খুশিতে উচ্ছ্বসিত। এই সমস্ত উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছে তূর্ণা। লাজুক মুখে সবার কথাবার্তা শুনছে। মাঝে মাঝেই তার হাত অবচেতনভাবে নিজের উদরের উপর গিয়ে থেমে যাচ্ছে। এখনও সেখানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি, অথচ তার সমগ্র সত্তা জুড়ে মাতৃত্বের কোমল স্পন্দন অনুভূত হচ্ছে। আর তার পাশেই বসে আছে রৌদ্রিক। অস্বাভাবিকভাবে নীরব সে। তবে তার সেই নীরবতার মাঝেও লুকিয়ে আছে সীমাহীন সুখ। মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি তূর্ণার উপর গিয়ে স্থির হয়ে পড়ছে। যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে ন সে আবারও বাবা হতে চলেছে।
হঠাৎ করেই ছোট্ট পায়ের টুপটাপ শব্দে সকলের দৃষ্টি সিঁড়ির দিকে ঘুরে গেল। রোদেলা, গোলাপি রঙের ফ্রক পরে, এলোমেলো চুলে, দুই হাতে নিজের প্রিয় পুতুল আঁকড়ে ধরে দৌড়ে নিচে নেমে এলো সে।

“ মা! মা!”
তূর্ণা হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলো।
“ কি হয়েছে আমার পুতুলের?”
রোদেলা গম্ভীর মুখে চারপাশে তাকালো। অতঃপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘোষণা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো*
“ আমি বিগ তিত্তার হবো!”
মুহূর্তেই পুরো ঘরে হাসির বিস্ফোরণ ঘটলো। রোদেলা কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। বরং গর্বে তার ছোট্ট বুক ফুলে উঠেছে।
“ বেবি আতলে আমি ওকে গপ্প শোনাবো।”
“ তাই নাকি?”
“ হুম।”
“ আর কি করবে?”
রোদেলা কিছুক্ষণ ভেবে বললো-
“ কেউ বেবিকে বতা দিলে আমি রাত করবো।”
আবারও হাসির রোল। রৌদ্রিক এবার হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো।

“ তুমি তাহলে বেবির বডিগার্ড হবে?”
রোদেলা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়লো।
“ আমি সুপার বডিগাত হবো!”
“ ওহ আচ্ছা!”
“ আর রাতে বেবি কাঁতলে আমি ঘুমাবো না।”
“ তারপর?”
“ তারপর বেবির হাত ধলে ঘুমাবো।”
শিশুসুলভ সরল উত্তর শুনে তূর্ণার চোখ ভিজে উঠলো।
এতটুকু মেয়ের হৃদয়ে কতখানি ভালোবাসা লুকিয়ে থাকতে পারে! রোদেলা হঠাৎ নিজের পুতুলটা তূর্ণার কোলে রেখে দিলো।
“ এটা বেবির জন্য।”
“ কেন?”
“ কারণ আমি ভালো তিত্তাল।”
গর্বিত কণ্ঠে বলা কথাটুকু শুনে রিনি হেসে কুঁকড়ে গেল।
“ এত ভালো সিস্টার পৃথিবীতে আর একটাও আছে নাকি?”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
“ নাই।”

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে, বাড়ির সকলেই বিশাল বাগানে এখন সবাই একত্রিত। সুবর্ণ আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। রোদেলা ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে একবার তূর্ণার কাছে যাচ্ছে, একবার রৌদ্রিকের কাছে। কখনো বলছে,
“ বেবির নাম আমি রাখবো।”
কখনো বলছে,
“ বেবি আমার রুমে থাকবে।”
কখনো আবার তূর্ণার উদরের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলছে-
“ আমি তুমাল বিগ তিত্তাল। আনায় তুনতে পাচ্চো?”

এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয় অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। জীবন বড়ই বিচিত্র। কখনো তা মানুষকে শোকের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে, আবার কখনো সমস্ত অন্ধকার দূর করে এমন এক সুখের আলো উপহার দেয়, যার উজ্জ্বলতায় অতীতের সমস্ত ক্ষত মলিন হয়ে যায়।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪২ (২)

রোদেলা তূর্ণার পাশ ছাড়া হচ্ছেই না আজকে। মেয়েটা যখন থেকে জানতে পেরেছে সে আপু হবে,তখন থেকে সারা বাড়ি ঘুরেঘুরে সবাইকে আনন্দসহকারে বলছে সে বিগ সিস্টার হবে। একটু পর পর এসে তূর্ণার উদরে হাত রাখছে, বেবির সঙ্গে এটা-ওটা কথা বলছে। বাড়িতে আবারও নতুন অতিথির আগমনের বার্তা যেনো আরও সজীবতা ফিরিয়ে দিয়েছে সিকদার বাড়িতে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৪