তুই আমার বিশ্বাস ছিলি শেষ পর্ব
জান্নাতি আক্তার জারা
___” একা একা কী করছেন?
তাকবীর পাশে তাকিয়ে দেখল আরাত প্রশ্নভরা চাহনিতে চেয়ে আছে, তাকবীর একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাহিরের পরিবেশ দেখছিল, হটাৎ সেখানে আরাতের আগমন ঘটে, তাকবীর পুনরায় সামনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর নিশ্বাস ফেলে ছোট করে বলল,
___” সময় কত দ্রুত চলে যায়, তাই-না?
আরাত তাকবীর কে উদাসীন মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল,তারপর তাকবীরের চোখ অনুসরণ করে বাহিরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— ” সময় সবসময় নিজের গতিতেই চলে, বদলে যাই আমরা, আমাদের চারপাশের মানুষগুলো আর পরিস্থিতি, তাই একসময় মনে হয়, সবকিছু খুব দ্রুত পাল্টে গেছে সময়ের গতিতে।
তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিয়ে পুনরায় অন্যদিকে তাকাল, আরাতের মন খারাপ হয়ে এলো, এর আগে আরাত শাড়ি পড়লে তাকবীর চোখ ফিরাতো না, আর আজকে তাকবীর সেভাবে একটিবার আরাত কে খেয়াল পর্যন্ত করল না, আরাত মন খারাপ করে গাল ফুলিয়ে বলল,
___” আপনার কী হয়েছে?
___” কই, কিছুনা তো।
আরাত এবার হাতে হাত ভাজ করে গাল ফুলিয়ে বলল,
___ “আগে তো আমি শাড়ি পরলে আপনি চোখ সরাতে পারতে না, আর আজকে, একবারও ঠিকঠাক ভাবে তাকালে না পর্যন্ত, ও বুঝতে পেয়েছি আমাকে এখন আর ভালো লাগে না তাইতো?
তাকবীর এবার আরাতের মাথা থেকে পা উপধি পরক করল,আরাত শাড়ি পড়েছে, শাড়ি টা অনেক পুরনো, তাকবীর এক দেখায় চিনতে পারলো,লাল পারের সাদা শাড়ি, এই শাড়িটা পড়ে আরাত ফুলবাগানে আহিন আলভী কে সাথে নিয়ে ছবি উঠিয়েছিল, সেদিন ছিল চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া,আর আজকে লাল স্কাপ করা, তাকবীর এতক্ষণ উদাসীন ছিল দেখে সত্যিই আরাত কে সেভাবে খেয়াল করেনি, আরাত কে গাল ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তাকবীর মুচকি হাসলো, এই মেয়ের একটু তেই গাল ফুলানোর অভ্যাস আর যাবে না, আজকে একটু খেয়াল করেনি দেখে কত কী ভেবে ফেলসে, তাকবীর নাকি তাকে আর পছন্দ করে না, অথচ এই তাকবীর, এই মেয়েটা কে পাগলের মতো ভালোবাসে, তাকবীর এবার মুখটা স্বাভাবিক করে আরাত কে এক টানে নিজের দু’হাতের মাঝে বন্দী করে নিয়ে বলল,
___” মাইয়া মানুষ সবসময় দু’লাইন বেশি বুঝে।
আরাত তাকবীরের কথায় পিছে কিছু বলতে নেবে, তার আগেই তাকবীর আরাত কে কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে বলল,
___” এই এটা তো, তুমি প্রথম যেদিন শাড়ি পরেছিলে, সেই দিনের শাড়ি,এখনো রেখে দিয়েছো?
তাকবীর অবাক হলো, সাথে কিছুক্ষণ আগে তাকবীরের বলা কথাটা ভুলে গেল,অবাক কন্ঠে বলল,
___” আপনি কিভাবে জানলেন, আমি এই শাড়ি পড়েছিলাম, আপনি তো সেদিন অফিসে ছিলেন?
___” কেউ একজন প্রথমবার শাড়ি পড়ে খিলখিলিয়ে হেসে ছবি তুলছিল, তার কি অন্যদিকে ধ্যান ছিল, তাকে কেউ দূর থেকে মুগ্ধ চোখে দেখছিল।
আরাতের অবিশ্বাস্য চাওনি বাড়ছে বাই কমছে না,
___” তার মানে আপনি ?
তাকবীর আরাত কে আরো শক্ত করে জরিয়ে ধরে বলল,
___” হ্যাঁ ম্যাম আমি, মনে পড়ে ওইদিন হাবীব আশিক রা আমাদের বাড়িতে আসার কথা ছিল?
আরাতের খেয়াল হলো, রাবেয়া তালুকদার হানিয়া কে ইনভাইট করেছিল, আরাত মাথা ঝাকালো,
___” হ্যাঁ।
___” আমরা বেলকনিতে ছিলাম।
___” তারমানে আপনি আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলেন?
___” তা ছাড়া কেনো উপায় ছিলো না, তখন তোমাকে দেখার বৈধতা কার্ড ছিল না, বৈধতার কাঠ থাকলে সামনে বসিয়ে রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম।
তাকবীর বোধহয় লজ্জা পেলো, লাজুক হেঁসে মাথা নিচু করল,তাকবীর মুগ্ধ হয়ে দেখলো তার বউয়ের লাজুক মাখা হাসি, এভাবেই কেটে গেলো কিছু মুহূর্ত, তাকবীর ভয়েসটা স্লো করে ডেকে উঠলো,
___” রাত?
আরাত চোখ তুলে তাকাল, মুখ থেকে লাজুক হাসি উঠিয়ে গিয়ে প্রশ্নভরা চাহনি ফুটে উঠল,
___” হুম?
তাকবীর আগের ন্যায় ভয়েস স্লো রেখে বলল,
___” ভালোবেসো ?
আরাতের চোখমুখে শয়তানি খেলা করছে,
___” জানি না তো।
তাকবীর মলিন কন্ঠে বলল,
___” তাই?
___” হ্যাঁ।
___” ও।
তাকবীর কে মলিন মুখে শুধু ‘ও’ বলতে দেখে আরাত বলল,
___” কী ও?
___” কিছুনা।
___” কি কিছু না?
তাকবীরও আরাতের মতো জবাব দিল,
___” জানি না তো।
আরাত বুঝলো তাকবীর অভিমান করেছে, আরাত মুচকি হেসে কয়েক সেকেন্ড তাকবীর কে নিশ্চুপে দেখল,
___” চোখ বন্ধ করেন।
তাকবীর ছোট করে বলল,
___” কেনো?
আরাত বাহানা ধরে বলল,
___” চোখ বন্ধ করতে বলছি করুন।
___” বাট কেনো?
___” আরে করুন না প্লিজ?
___” ওকে ডান।
তাকবীর চোখ বন্ধ করতেই আরাত ধীরে ধীরে শাড়ির আঁচলে মোড়ানো ছোট্ট অংশটা খুলল, ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রুপালি একটা ব্রেসলেট,আরাতের ঠোঁটে নরম হাসি ফুটে উঠল, খুব যত্ন করে সে তাকবীরের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ব্রেসলেট টা পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
___” ভালোবাসি, ভালোবাসি, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি, উত্তল সমুদ্রের বেঁচে থাকা মাছের মতো ভালোবাসি, সমুদ্র যেমন শুকিয়ে গেলে মাছের মৃত্যু নিশ্চিত, ঠিক তেমনি আপনাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব অর্থহীন।
তাকবীর অবাক হলো, ভড়কালো, ধীরে ধীরে অবিশ্বাস্য চোখ মেলে তাকালো, আরাত হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তাকবীর একবার নিজের হাত তো আরেকবার ব্রেসলেটের দিকে তাকাচ্ছে, তাকবীরের চোখে অবিশ্বাস্য কাটছে না, আরাত বলে উঠল,
___” আরিশা আপুর বিয়ের শপিং করতে গিয়ে হঠাৎই ব্রেসলেটটা চোখে পড়ে, সেদিন আমার কেন জানি মনে হয়েছিল, ব্রেসলেটটা যেন আপনার হাতের জন্যই বানানো হয়েছে, আপনার হাতেই সবচেয়ে মানাবে, সঙ্গে সঙ্গে সবার আড়ালে নিজের জমানো টাকা নিয়ে কিনেছিলাম, তখন সাহস হয়ে উঠেনি আপনাকে দেওয়ার, তাই শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলাম,সেদিন হঠাৎ কাপড় গোছাতে গিয়ে আবার সেটা খুঁজে পেয়েছি।
তাকবীর নিজের হাতের দিকে তাকালো, সত্যিই ব্রেসলেট টা তাকবীরের ফর্সা লোমশ হতে দারুণ মানিয়েছে, আরাত মুচকি হেসে সময় নিয়ে আরাতের কাঁপালে গভীর ভাবে চুমু রেখে দিল, আরাত সাথে সাথে চোখ বুঝে নিয়েছে, তাকবীর এবার একটু উচ্চস্বরে আরাতের বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
___”আমার তাহাজ্জুদের চাওয়া তুমি যা আমি প্রতিদিন চেয়ে থাকি, আমার মোনাজাতের প্রিয় অংশ তুমি যা আমার নিত্যদিনের সঙ্গী, এই জীবনে পাওয়া শত উপহারের মাঝে তুমিই সবচেয়ে দামী ‘রাব্বাতুল বাইত’ আমার ঘরের রানী,আমার হৃদয়ের প্রশান্তি, আমার রবের পক্ষ থেকে পাঠানো সবচেয়ে যত্নে রাখা আমানত, আমার দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি, এই জমিনের তৃপ্তি যা আমার রব খুব যত্ন সহকারে আমার জীবনে পাঠিয়েছে,আলহামদুলিল্লাহ, তোমাকে পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি।
___” পালানোর অভ্যাস টা ঠিক এখনো যায়নি, না?
হটাৎ খুব পরিচিত কন্ঠ শুনে পার্থের পা দুটো থমকে গেলো, হকচকিয়ে উঠা মুখে, স্টেজের উপরে বসা মিম থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাল, কাঁধে একখান ব্যাগ, সামনে দিকে আহত চোখে চেয়ে ব্যাকটা কাঁধে শক্ত করে ধরল, রশ্মি এতক্ষণ হাতে হাত ভাজ করে পার্থর থেকে কিছু দূরে প্রশ্নভর্তি চাওনিতে চেয়ে ছিল, পার্থ কে শূন্য চোখে তাকাতে দেখে রশ্মির মুখে তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে উঠল, এক পা দু পা করে পার্থর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ল,
___” সেই পুরনো অভ্যাস?
পার্থ এবার চোখ লুকালো, রশ্মির চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নিচু করে ফেলল, কী উওর দিবে, সত্যিই তো পালাচ্ছে সে, একপক্ষীক ভালবাসা থেকে বাঁচতে পালাচ্ছে, যেভাবে একদিন রশ্মির থেকে পালিয়েছিল, যে রূপবতী কে ভুলে যেতে এক মায়াবী মেয়ের সঙ্গ নিয়েছিল, আর আজ সেই মায়াবী মেয়ের মায়া থেকে পালাতে রুপবতীর মুখোমুখি হতে হচ্ছে, এই মুহূর্তে এর চেয়ে অসহায়ত্ব আর কী হতে পারে তার জীবনে, কিভাবে সামনের মেয়েটার চোখে চোখ মিলাবে, সামনের মেয়েটার তো কোনো দোষ ছিল না, তার জন্য বাড়ি ছেড়েছিল, পরিবার ছেড়েছিল, আপন বোনের মতো বেস্টফ্রেন্ড কে ছেড়েছিল, শুধু মাএ তার কারণে, অথচ সে ভালোবাসার মূল্য দিতে পারেনি, তাহলে আজ কিভাবে পারবে সেসবের জবাব দিতে, কিভাবে পারবে সামনের মেয়েটার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে, না পারবে না, পার্থ তো সেদিন চাইলেই মেয়েটার সঙ্গে সংসার করতে পারতো, ভালোবাসা দিয়ে আগলে নিয়ে নিজের অপরাধ শিকার করতে পারতো, রশ্মি নিশ্চয়ই পার্থর দিকটা বুঝতো, কিন্তু পার্থ করেনি, না নিয়েছে মেয়েটাকে আগলে, না তার সাথে সংসার পেতেছে, উল্টো সে পালিয়েছে, তার কারণে রশ্মি আরাতের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, তার মতোই একজন কে ভুলতে আরেক জনের সঙ্গ নিয়েছে, তবে তাদের দুজনের মধ্যে পার্থক্য শুধু একটাই, রশ্মি যার সঙ্গ নিয়েছে, সে রশ্মি কে পাগলের মতো ভালোবাসে, আর পার্থ যার সঙ্গ নিয়েছে, সে মায়াবী কন্যার মনে আগে থেকেই অন্য কেউ ছিল, রশ্মি দেখতে পেল পার্থের চোখমুখে স্পষ্ট অপরাধের ছাপ, রশ্মি বিদ্রূপের সুরে পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ল,
___” কি বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেন?
আপনার চেহারায় ঠিক বিভ্রান্তি মানায় না।
হতভাগা পার্থ শুধু আহত চোখ তুলে তাকাল, কেনো উওর দিতে পারল না, পার্থের নিরবতা ঠিক রশ্মির হজম হচ্ছে না, হটাৎই কন্ঠে কঠিন্ত্ব এনে তাচ্ছিল্য করে বলল,
___”কী বলেন তো, আপনি আসলে জানেনই না , কিভাবে ভালোবাসা ধরে রাখতে হয়, ভালোবাসা কী আপনি বুঝেন না?
পার্থ শুধু নিঃশব্দে রশ্মির দিকে তাকিয়ে রইল,আহত ব্যথাতূর চোখদুটো যেন অনেক কথা বলতে চেয়েও মাঝপথে থেমে গেল , সে ভালোবাসা বুঝে, কাউকে হারানোর ভয়, তার জন্য রাত জেগে থাকা, নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রাখা, এসব কিছুই সে বুঝে, শুধু সব অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করতে পারে না বলে সবাই ভাবে সে ভালোবাসতে জানে না, পার্থর ঠোঁট কাঁপল সামান্য, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না, রশ্মির তাচ্ছিল্যের প্রতিটা শব্দ যেন নীরবে গায়ে মাখল সে, ঠিক যেন নিজের ভেতরের ভাঙাচোরা অনুভূতিগুলো লুকানোর শেষ চেষ্টা মাত্র , রশ্মি হয়তো পার্থর না বলা কথাগুলো চোখ দেখেই বুঝতে পারলো, তাইতো নির্দ্বিধায় পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
___” তাহলে কেনো প্রকাশ করছেন না?
পার্থ ক্ষণিকের জন্য মাথা নামিয়ে নিল, ঠোঁটের কোণে এক টুকরো ক্লান্ত হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, কন্ঠে নিস্তেজ, তবুও হাজারো নীরবতা ভেঙ্গে ভাঙা স্বরে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরর,
___” কারণ সে আমাকে তোমার মতো চায় না।
চারপাশ হঠাৎই অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে উঠল,কথাটা বলেই পার্থ আবার চুপ হয়ে গেল, যেন এই কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতেই বুকের ভেতর জমে থাকা না বলা অনুভূতিগুলো বুক টাকে ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে দিচ্ছে, শরীর টা হটাৎ ছটফট করতে লাগল, রশ্মির দৃষ্টিতে ফুটে উঠল তীব্র হতাশা, কিছুক্ষণ স্থির চোখে পার্থের দিকে তাকিয়ে রইল সে, যেন মানুষটাকে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে ব্যর্থ হলো
___ ” তাই বলে এভাবে চুপ করে থাকবেন, অন্তত একবার ভালোবাসা বলার সাহস তো থাকা উচিত ছিল, পার্থ?
শেষের লাইন টাই যেন রশ্মি প্রশ্ন ছুড়ে দিলো, পার্থ মৃদু হাসল, সেই হাসিতে না ছিল আনন্দ, না ছিল স্বস্তি, ছিল শুধু নিঃশব্দে ভেঙে পড়া এক ক্লান্ত স্বীকারোক্তি,
___ ” সব ভালোবাসার ভাগ্যে কী আর প্রকাশ জোটে, কিছু ভালোবাসা শুধু নীরবেই সুন্দর থাকে।
রশ্মির কন্ঠে তীব্র তাচ্ছিল্য,
___” আপনি ব্যর্থ প্রেমিক, পার্থ, আপনি ভালোবাসা ধরে রাখতে ব্যর্থ।
পার্থ মলিন হেসে চোখ নামিয়ে নিল,
___” দোয়া করো, তোমাকে কষ্ট দেওয়ার অপরাধে যেন এই ব্যর্থতা আমায় সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
___” আপনার উপরে আমার কোনো অভিযোগ নেই, পার্থ, অভিযোগ থাকত, যদি দেখতাম আপনি অন্য কাউকে নিয়ে সত্যিই সুখী আছেন।
পার্থ আফসোসের সুরে বলল,
___ ” যদি অভিযোগ থাকত।
একটু থেমে ভাড়ী এক নিশ্বাস ফেলে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” তুমি যদি আমার উপর চিৎকার করে অভিযোগ করতে, তাহলে হয়তো একটু তৃপ্তি পেতাম,অন্তত মনে হতো, এত বছর পরে তোমার কষ্টের বোঝাটা কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছি, কিন্তু তোমার এই নির্লিপ্ত স্বীকারোক্তি আমাকে আরও বেশি অপরাধী করে দিচ্ছে।
রশ্মির কণ্ঠটা এবার শান্ত, অথচ ভীষণ দৃঢ়টা নিয়ে বলে উঠলো,
___” ক্ষমা, সবকিছুর কী ক্ষমা পাওয়া যায়, এই যে হটাৎ হটাৎ দীর্ঘশ্বাস বের হওয়া, হটাৎ হটাৎ চোখে পানি চলে আসা, এসব কি শুধু আপনার অপরাধবোধের ফল, নাকি আমার ভাঙা বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি, পার্থ?
রশ্মি এক মুহূর্ত থামল, দৃষ্টি শীতল হয়ে এলো, অথচ ব্যাথাটা ঠিক আগের মতোই তরতাজা, আসলে কি ভালোবাসাকে ভুলা সম্ভব, হয়তো অসম্ভব বলেও কিছু নেই, সঠিক মানুষ টা জীবনে এলে সবকিছুই সম্ভব, তবে প্রথম ভালো লাগা, প্রথম ভালোবাসা, সেটা থেকে যায় মস্তিষ্কের এক কোণে, যেখানে নতুন মানুষটা এলেও তার ছায়াটা মুছে ফেলা যায় না,
___” আপনি খুব ভালো করেই জানেন, মায়া কতটা ভয়ংকর, মাহির আমাকে আপনার সেই ভয়ংকর মায়া থেকে কাটিয়ে তুলছে,ওর মাঝে আপনার থেকেও বেশি ভালোবাসা খুঁজে পাই।
পার্থ দীর্ঘক্ষণ পর একটা মুচকি হাসি উপহার দিল, যেন বুক থেকে একটা বোঝা নেমে গেল, যাক মেয়েটা অন্তত তার পরিবার আর বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পরও জীবনে একটা সঠিক মানুষ পেয়েছে, সবার বিরুদ্ধে গিয়ে মাহির কে বিয়ে করে কম কথা তো শুনতে হয়নি তাকে, আজ রশ্মি সবার চোখে বেইমান, সে বেইমান হোক তবুও সে সুখী আজ, মাহির অন্য কারো কাছে ধোঁকাবাজ হলেও নিজের স্ত্রীকে যত্নে রাখা,ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখার বেলায় সঠিক সে, পার্থের অপরাধ বোধ বোধহয় একটু কমে এলো, এবার রশ্মির সঙ্গে নিঃসংকোচে কথা বলতে পারছে, রশ্মি কে একনজর দেখে নিয়ে দূরে স্টেজে বসা মিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” এত বছর পর যখন তুমি আমার সামনে পড়লে, আমার এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আজও তোমাকেই ভালোবাসি, কিন্তু না, ধীরে ধীরে আমি অনুভব করলাম, আমি আমার মনের অজান্তেই লেডি গুগুল কে ভালোবেসে ফেলেছি,লেডি গুগুলের আশেপাশে আরশ কে দেখলে আমার ভীষণ রাগ হতো, তখন মনে হতো, আমি আমার লেডি গুগুল কে নিয়ে ওই আরশের থেকে অনেক দূরে চলে যাব, কিন্তু..
পার্থ দূরে স্টেজের দিকে তাকিয়ে কথার মাঝপথেই থেমে গেল, মিম আরশ পাশাপাশি বসে আছে, তাদের পাশেই আশিক আর রাফি কীসব বলছে, আর কিছুক্ষণ পরপর সবাই শব্দ করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে, রশ্মিও সেদিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
___” কিন্তু, সেও তো আপনার হলো না?
রশ্মির কথাটা শুনে পার্থর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, তবুও সে মুখে মলিন এক হাসি ফুটিয়ে রাখল, একটা ক্লান্ত, পরাজিত হাসি, অথচ বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়ে চলছে, খানিকক্ষণ চুপ থেকে খুব নিচু স্বরে, ঠোঁট সামান্য নেড়ে বিরবির করল,
___” সেই আফসোস আমার কোনোদিন ফুরাবে না।
রশ্মি কথাটা ঠিক বুঝতে না পেয়ে অবাক চোখে পার্থর দিকে তাকাল,
___” কিছু বললেন?
পার্থ চমকে উঠার মতো চোখ তুলে তাকাল,
___” হু, তুমি সত্যি বলছো আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক, যার কনো আশাবাদ থাকতে নেই।
রশ্মি আর কিছু বলল না, শুধু নীরব চোখে পার্থ কে পরক করতে লাগল, পার্থর চোখ নতুন বউ রুপে তার লেডি গুগুলের দিকে, চোখের চাহনিতে ছিল, না পাওয়া আকুতি, দূর থেকে পার্থের চোখে মিমের চোখ একবার পড়লো কী পড়লো না ঠিক জানা নেই, অথচ বোকা পার্থ মুগ্ধ চোখে সেদিকে অপলক চেয়ে রইলো, বুকে তীব্র ব্যাথা কিন্তু মুখের তৃপ্তির হাসি বলে দিচ্ছে, যাক সে পূর্ণতা না পেল, তার ভালোবাসার মানুষ টা তো পূর্ণতা পেয়েছে, এটাই তো সে চেয়েছিল, সে ভালো থাকুক, কিছুক্ষণ নীরবতা চলল সময় টা, হটাৎ তিথির ডাকে নিস্তব্ধ পরিবেশ টা ঝনঝন শব্দে তুলে উঠলো,
___” মাম্মা……মাম্মা?
তিথির ডাকে রশ্মি মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল, সঙ্গে সঙ্গেই তার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল,হাসিমুখেই দুহাত উজাড় করে বাড়িয়ে দিল, এদিকে এতক্ষণ তিথি মাহিরের কোলেই ছিল, মাহির ইচ্ছাকৃত ভাবেই তিথি কে নিয়ে একটু দূরে ছিল,যেন রশ্মি কেনো রকম দ্বিধা ছাড়াই মন খুলে কথা বলতে পারে, রশ্মির প্রতি মাহিরের বিশ্বাস টা প্রখর, আগে যা ছিল, সব আজ অতীতের তলহীন কুয়োয় চাপা পড়ে গেছে, যা আর কেনোদিন পুনর্জন্ম হবে না, মাহির তিথিকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই তিথি দৌড়ে এসে রশ্মির কোলে উঠল, মাহির এক পা,দুই পা করে রশ্মির পাশে এসে দাঁড়াল, দুজন কে দেখতে দেখতে পকেটে হাত গুঁজে বলল,
___” তাহলে!
ভারী এক নিশ্বাস ফেলে পুনরায় বলল,
___” তোমাদের কথা বলা শেষ?
পার্থ বরাবরের মতো চুপ,রশ্মি তিথির গালে চুমু রেখে দিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ, থ্যাঙ্কস,আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
___” ওয়েলকাম, এবার চলো ওইদিকে যাওয়া যাক।
___” হ্যাঁ চলো।
রশ্মি পুনরায় পার্থের দিকে তাকিয়ে একটা দৈর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
___” হয়তো এই জীবনে, আর দেখা হবে না, পারলে বাংলাদেশ নামে সব স্মৃতি জীবন থেকে মুছে ফেলে জীবনটা নতুন করে উপভোগ করবেন, চললাম ভালো থাকবেন।
ভালো থাকবেন, কি মিষ্টি এক বানী তাইনা, সত্যি কী ভালো থাকা যায়, রশ্মি আর মাহির তিথি কে নিয়ে খুনসুটি করতে করতে স্টেজের দিকে পা বাড়াল, পার্থ সেদিকে তাকিয়ে রইল, একদিন এই মেয়েটা কে নিয়ে কতশত সপ্ন বুনেছিল সে, মেয়েটাকে আশা দিয়েছিল পার্থ চৌধুরীর বউ বানাবে, আর আজ সেই মেয়েটাই অন্য কারও স্ত্রী , তাদের একটা সংসার আছে, একটা ফুটফুটে কন্যাও আছে, অথচ পার্থ আজও শূন্য, ভালোবাসা হীন এক জীবন কাটাচ্ছে, পার্থ হটাৎই চিৎকার দিয়ে ডেকে উঠল,
___” ওই রশ্মিরাণী?
রশ্মি আর মাহির দুজনেই পিছনে ফিরল, দুজনের হাসি মুখে প্রশ্ন খেলা করছে, এক নিমেষেই জন্য রশ্মির কেন যেন মনে হলো, রশ্মিরাণী ডাকটা যেন এখন শুধু মাহিরের মুখেই ভালো মানায়, পার্থ দুজনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে হাত ওপরে তুলে ইশারা করে বলল,
___” সারাজীবন এভাবেই হ্যাপি থাকো,
মাহির আর রশ্মি পার্থকে মৃদু একটা হাসি উপহার দিল, তারপর পুনরায় তারা তিথিকে নিয়ে স্টেজের দিকে পা বাড়াল,পার্থ নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তার দৃষ্টি গিয়ে থামল স্টেজের দিকে, মিম আর আরশ পাশাপাশি বসা, কী দারুণ মানিয়েছেন তাদের, যেন পাশাপাশি বসার জন্যই তাদের সৃষ্টি, অথচ এই বোকা মেয়েটাই কয়েক ঘণ্টা আগেও তার ‘ডাফার’ এর কাছে এসে কত পাগলামিই না করেছিল, পার্থের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল, একতরফা ভালোবাসা এমনই, যেখানে আমি তোমাকে দেখি, অথচ তুমি জানোও না,
আমি তোমাকে অনুভব করি, অথচ তুমি বুঝতেও পারো না,তোমার একটুখানি হাসি আমার পুরো দিন বদলে দেয়, অথচ আমার নীরব ভালোবাসা তোমার চোখেই পড়ে না, এভাবেই হাজারো না-বলা অনুভূতি বুকের গভীরে নদীর মতো জমে থাকে, বাইরে সব শান্ত স্বাভাবিক, অথচ গভীরে অবিরাম স্রোত বয়ে চলে, ভাঙন তো আছেই, কিছু ভালোবাসা কখনো প্রকাশ পায় না, দাবি করতে শেখে না, গন্তব্য পায় না, শুধু দূর থেকে নিঃশব্দে একজন মানুষকে নিজের পৃথিবী বানিয়ে নেয়, তবুও তারা নিঃশব্দে ভালোবেসে যেতে জানে, হয়তো একতরফা ভালোবাসার সবচেয়ে বড় কষ্ট এখানেই, ভালোবাসাটা সত্যি হয়, অনুভূতিগুলোও সত্যি হয়, শুধু সম্পর্কটা আর কখনো সত্যি হয়ে ওঠে না।
মিম আরশের বিয়ে পড়ানো হচ্ছে, সবার মধ্যে তাকবীর ও দাঁড়িয়ে আছে, শুধু তাকবীর না, মিম আরশের পূর্ণতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বন্ধুবান্ধব থেকে কাজিন মহল, আত্মীয়-স্বজন থেকে গ্রামের মানুষজন, সবার মুখে হাসি, শুধু দুটো মানুষের মধ্যে আনমনে চোখাচোখি হচ্ছে, পুনরায় চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, আরাত মিমের থেকে কিছু দূরে দাড়িয়ে আছে, অন্যপাশে আরশের পিছনে মাহির রশ্মি দাড়িয়ে আছে, রশ্মি আরাত সামনাসামনি হওয়ায় মন না চাইলেও বারবার দুজনের চোখে চোখ পরছে,
___” যখন কারো আচরণ তোমাকে প্রায় মেরে ফেলে, তবুও তোমার হৃদয় তাকে ঘৃণা করতে পারে না, তখন কী দরকার মিথ্যা অভিনয় করার, সবকিছু সাইটে রেখে কথা বলো, সবকিছু ঠিক করে নেও, সম্পর্ক টা এত কঠিন করে তুলছো কেনো?
আরাত হটাৎ তাকবীরের কথায় অবাক চোখে নিজের পাশে দাঁড়ানো তাকবীরের দিকে তাকাল, পরমুহূর্তে মুখটা স্বাভাবিক হয়ে এলো,পুনরায় সামনে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
___” দুনিয়াতে কঠিন বলতে কিছু হয় না, কাল যাকে হারিয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল, আজ তার ছায়া মারাতেও আমার বিন্দু পরিমান ইচ্ছা করে না।
___” এটা কি আদোও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছিল?
আরাত এবার সরাসরি তাকবীরের মুখের দিকে তাকাল, তাকবীর প্রশ্নভরা চোখে চেয়ে আছে, আরাত চোখে চোখ রেখে বলল,
___” ভালোবাসা বলতে পৃথিবীতে কিছু নেই সব মোহ, মোহ কাটিয়ে উঠতে পারলে আপনি মুক্ত পাখি।
___” সব মোহ কী কাটিয়ে ওঠা যায়?
চারপাশে মানুষের শব্দ থাকলেও সেই মুহূর্তে যেন সবকিছু অদ্ভুত নীরব লাগছিল, তাকবীর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রশ্মির দিকে একবার তাকিয়ে পুনরায় আরাতের চোখে চোখ রাখল,
___” সব মোহ কাটিয়ে ওঠা যায় না রাত,
কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো রক্তের না হয়েও শ্বাসের সাথে আটকে থাকে, ছোটবেলার সেই বিকেলগুলোর কথা মনে পড়ে ?
আরাত শীতল চোখে চাইলো, তাকবীর আরাত কে প্রশ্ন করে উওরের আশায় না থেকে পুনরায় বলতে শুরু করল,
___” একসাথে মাঠে দৌড়ানো, বৃষ্টিতে ভেজা, কারণ ছাড়া রাগ করা, আবার পাঁচ মিনিট পরই একসাথে হাসতে হাসতে ঘুরে বেড়ানো, সময় অসময়ে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে নাম ধরে ডাকতে থাকা, যার সাথে ছোটবেলার অর্ধেক জীবন কেটে যায়, যাকে ঘিরে একটা পুরো শৈশব জুড়ে থাকে, তাকে কি এত সহজে ‘মোহ’ বলে ভুলে যাওয়া যায়?
তাকবীরের কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো,
___” রশ্মি শুধু তোমার বন্ধু ছিল না রাত,ও তোমার সেই বয়সটার অংশ, যেখানে কোনো অভিনয় ছিল না,রাগ করলে কেঁদে ফেলতে, অভিমান হলে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে, তোমাদের সম্পর্কটা হয়তো ভেঙেছে,কিন্তু স্মৃতিগুলো,স্মৃতিগুলো আজও আগের মতোই তরতাজা হয়ে আছে,একবার চোখ বন্ধ করে শৈশবটা স্মৃতিচারণ করে দেখো,বিকেলের সেই একসাথে ঘুরে বেড়ানো,হুটহাট আইসক্রিম খেতে চলে যাওয়া, একজন না থাকলে আরেকজনের খেলাই জমত না,এসব কি সত্যিই মানুষ ভুলে যেতে পারে?
আরাত নিশ্চুপ, তাকবীর কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার ভেজা চোখের দিকে, তারপর বুঝানোর ন্যায় পুনরায় মৃদু স্বরে বলে উঠল,
___” দেখো না, এত বছর পরও তোমরা কেউ কারো সাথে কথা বলছ না, অথচ দুজনেই দূর থেকে ঠিকই একে অপরকে দেখছ, একবার ভেবে দেখছ, মানুষ সবসময় ফিরে আসতে পারে না,যার সাথে তোমার সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো জড়িয়ে আছে, তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেললে আর ফিরে পাবে না, তখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে তো?
তাকবীর আরাতের দুই কাঁধে হাত রাখল, আরাত ভেজা চোখে তাকবীরের দিকে চাইলো, চোখে অশ্রু টলটল করছে, কখন বুঝি নোনাপানি গুলো গাল বেয়ে গড়িয়ে পরবে,তাকবীর সেদিকে তাকিয়ে গালে হাত রেখে ব্যাকুল কন্ঠে বলল,
___” এই পাগল, কান্না করছো কেনো, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, এই দেখো পাগল মেয়ে, সবাই দেখছে, এই রাত কান্না করো না প্লিজ।
চারপাশে সবাই আরশ মিমের বিয়ে পাড়ানোতে মগ্ন, গুটিকয়েক মানুষ তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বিয়ে দেখতে মগ্ন হয়ে যাচ্ছে, আরাত এবার নিজেকে সামলে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
___” কী বলেন তো, আমার জীবন আমাকে চরম সত্য শিখিয়েছে, সম্পর্ক যতোই ঘনিষ্ঠ হোক না কেনো, মানুষ যেকোনো মূহুর্তের বদলে যেতে পারে।
কথাটা বলে আরাত দূরে দাঁড়ানো রশ্মির দিকে তাকালো, কন্ঠে ক্ষোপ মিশিয়ে বলল,
___” আর যে নিজের আচরণের মধ্যে কেনো দোষ খুঁজে পায় না, তাকে আপনি কখনোই পরিবর্তন করতে পারবে না, সে হোক না কেন শৈশবে সবচেয়ে ভালো সময় কাটানোর সেই সঙ্গী,সেসব মানুষ যতই প্রিয় হোক, তাদের থেকে দূরে থাকায় উত্তম।
আরাত আর সেখানে দাঁড়াল না, দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল, তাকবীর আরাতের পেছনে যেতে নিয়েও থেমে গেল, আরাতকে একা ছেড়ে দিল, কথায় আছে, কিছু মানুষকে খুব ভালোবেসেও দূরে সরে আসতে হয়, কারণ সব সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য শুধু স্মৃতি যথেষ্ট না, সম্মান আর বোঝাপড়াও লাগে,
আরাত আর রশ্মির মধ্যে সেই সম্পর্ক সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে,যে মানুষ নিজের ভুলগুলো কখনো বুঝতেই চায় না, নিজের আচরণের মধ্যে একটুও দোষ খুঁজে পায় না, তাকে বদলানোর চেষ্টা করাটা শুধু নিজেকে ক্লান্ত করা ছাড়া আর কিছু না, আরাত এসে ওয়াশরুমে ঢুকল, ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অবনত মুখে পানির ছিটা দিতে লাগল, একটা সময় ক্লান্ত হয়ে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
___” তুই আমার সবচেয়ে আপন ছিলি,তুই আমার বিশ্বাস ছিলি, তুই আমার বিশ্বাস ছিলি রশ্মি, শুনতে পাচ্ছিস, তুই আমার বিশ্বাস ছিলি,কিন্তু তুই আমার সেই বিশ্বাস টাই ভেঙেচুরে চুরমার করে দিয়েছিস, আমার বিশ্বাস কে ভুল প্রমান করে দিয়েছিস, আমি ভেবেছিলাম তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড, বাট আমি ভুল ছিলাম।
আরাত দু’হাত ওয়াশবেসিনের উপর রেখে মাথা নিচু করে নিঃশ্বাস ফেলল,চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, চোখটা ঝাপসা লাগছে, হালকা জ্বালায় করছে,
___” আমি বড্ড বোকা ছিলাম, যে এখনো পুরোনো দিনগুলো আঁকড়ে ধরে আছি, একটা সময় ভাবতাম, পৃথিবী বদলে গেলেও তুই কখনো বদলে যাবি না, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম, সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোই একসময় এমন অচেনা হয়ে যায়, যে তাদের বদলে যাওয়া টা মেনে নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়ে, কিন্তু কী বল তো, মজার ব্যাপার কী জানিস,
যে মানুষটার সাথে ছোটবেলার অর্ধেক স্মৃতি জড়িয়ে,
আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে অপরিচিতের মতো চুপ করে থাকতে হয়, মজার না?
আরাত আয়নার দিকে তাকিয়ে লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো দেখে তাচ্ছিল্য হেসে কথাগুলো বলল, সেই হাসির মাঝেও কষ্ট স্পষ্ট,
___”হয়তো কিছু সম্পর্ক সত্যিই শেষ হয়ে যায়,
শুধু মানুষগুলো না, তাদের সাথে জড়িয়ে থাকা সব স্মৃতি একটা সময় ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়,যেমন তোর আর আমার বন্ধুত্ব, আমি শুধু এতটুকুই চাইবো, সবাই সবার জীবন নিয়ে সুখে থাকুক, কারো জন্য জীবন থেমে থাকে না, সেটা ভালোবাসা হোক কিংবা বন্ধুত্ব, বাকি থাকে শুধু হঠাৎ হঠাৎ মনের অজান্তেই বুকের ভেতর থেকে একরাশ দীর্ঘশ্বাস বের হওয়া, এতটুকুই, তবে আমি এই দীর্ঘশ্বাসকেই বেশি ভালোবাসি।
বেশ কিছুক্ষণ পর বাহিরে থেকে আরাতের ডাক পরল, আইরা ডাকছে, মিমের বিদায়ের পালা, আরাত ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এলো, মাথায় স্কাপটা পুনরায় সুন্দর করে পড়ে ধীরপায়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, আদনান তালুকদার গুরুজন হিসাবে মিম কে আরশের আব্বু আম্মুর হাতে তুলে দিলেন, সাথে আরশও ছিলো, অনেক বরপক্ষ খাওয়া দাওয়া করে আগেই চলে গিয়েছে, বাকি ছিল বর বউ, আর আর কাছের আত্মীয় স্বজনরা, তারা-ও সবাই গাড়িতে ওঠে পরছে, নতুন বর বউ যাবে বাইকে, আর তাদের কোম্পানি দিতে, আশিক মায়া, হাবীব সন্ধ্যা, আদিল হানিয়া, রাফি মিরা, মাহির রশ্মি, হানিফ আলভী আহিন, সবাই বাইক নিয়ে গ্রাম থেকে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে শহরে রওনা দেবে, নূরফিহা নূরপ্রিয়া, দুই বোন গাড়িতে যাবে, তাদের সঙ্গে প্রেগনেন্ট তিশা ও গাড়িতে যাবে, যদিও মেয়ে পক্ষ হিসেবে আশিক হাবীব দের আগামীকাল যাওয়ার কথা, কিন্তু আরশ হানিফ তাদের ছাড়লো না, তবে তাকবীর আরাত, আনাস আইরা, পরিবারের সাথে আগামীকাল আরশ দের বাড়িতে যাবে , সেখান থেকেই যে যারযার মতো বাড়িতে ফিরবে, সবাই বাইকে উঠে পড়ছে,তখন মিম চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,
___” ডাফার, ডাফার কই?
মিমের কথায় সবার মধ্যে পার্থ কে খোঁজার ব্যাস্ততা দেখা গেলো, সবাই কে উপস্থিত দেখা গেলেও পার্থ কে দেখা যাচ্ছে না, রশ্মি কিছুই বলল না, যদি বলে পার্থ কে খোজে লাভ নেই, পার্থ বাড়িতে নেই, এতক্ষণে সে এয়ারপোর্টে পৌঁছেছে, তাহলে রশ্মি কে নতুন করে সবার প্রশ্নে জবাবদিহি করতে হবে, এরচেয়ে চুপ থাকায় উত্তম, আদিবা তালুকদার বললেন,
___” হয়তো রুমেই আছে, দাঁড়াও আমি দেখে আসি।
আরশ কিছু একটা ভেবে বলল,
___” আন্টি আমি দেখছি।
আদিবা তালুকদার বারণ করতে গিয়েও করতে পারলো না, আরশ দ্রুত পায়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল, পুরো বাড়ি ফাঁকা, নিস্তব্ধ ভর করছে যেন, সবাই বাড়ির বাহিরে, আরশ ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠল, পার্থর জন্য বরাদ্দ রুমটায় ঢুকে চারপাশে চোখ বুলালো, পার্থর দেখা রুমেও পেল না, আরশ দুই ঠোঁট নেড়ে পার্থ কে ডাকতে যাবে, তখন চোখ পরল, বিছানার পাশে বেড সাইডের উপর ছোট একটা কাগজে, আরশ কপাল কুঁচকে সেদিকে এগিয়ে গেল,বেড সাইড এর উপর থেকে কাগজ টা তুলে নিলো, ছোট কাগজের টুকরোয় ছোট ছোট অক্ষরের ইংরেজিতে লেখা,
____” দোয়া রইল, তোর নতুন জীবনে সুখী হ, আমার খোঁজ করতে হবে না, আমি চলে যাচ্ছি, সন্ধ্যা ছয়টাই আমার ফ্লাইট।
আরশের কুঁচকানো কপাল সোজা হয়ে এলো, পার্থ যে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে এটা এতক্ষণে আরশের বুঝা শেষ, কাগজের নিচে একটা ডাইরি ছিল, ডাইরিটা সম্পূর্ণ নতুন, আরশ আনমনে ডাইরিটা হাতে তুলে নিলো, ডাইরিটা উল্টেপাল্টে এপাশ-ওপাশ দেখে প্রথম পাতাটা খুলল,প্রথম পাতা খুলতেই ডাইরির মাঝখানে বড় বড় অক্ষরের লেখা চোখে পড়ল,
“লেডি গুগুল,
চিঠি টা তোর জন্য,
জানিনা আমার কাঁপা কাঁপা হাতে কতটুকু অনুভূতি তুলে ধরতে পারবো, তোর সামনে আমার অনুভূতি প্রকাশ করার সাহস নেই, এজন্য ছোট একটা পাতায় তুলে ধরলাম, হয়তো তোর সামনে অনুভূতি তুলে ধরলে নিজেকে সামলাতে পারতাম না, এই ভয়ে তোর সামনাসামনি হওয়ায় সাহসটুকু হারিয়ে ফেলছি, জানিস তো আমার এখন কেমন লাগছে, বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে, ঠোঁট কাপছে, মনের অনুভূতি গুলো অক্ষর হয়ে পাতায় নামানোর সময় হাত পর্যন্ত কেঁপে উঠছে, তুই হয়তো খুব এক্সসাইটেড হয়ে আছিস, আমার হটাৎ চলে যাওয়া, এই অবেলায় অনুভূতি গুলো কাগজে লেখতে বসার কারণ জানতে, তোকে আর অপেক্ষা করাবো না, দ্বিতীয় পাতাটা উল্টে দেখ, সেখানে আমার হৃদয়ের সব না বলা অনুভূতি লুকিয়ে আছে, আরে ভয় পাচ্ছিস কেনো,
আরে ভয় পাচ্ছিস কেনো, আমি তো শুধু আমার অনুভূতি তোর হাতে তুলে দিচ্ছি, আমাকে না,
শেষ লাইনটায় এসে আরশের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল, সাহস হচ্ছে না দ্বিতীয় পাতা উল্টে দেখার, সে কিভাবে সহ্য করবে তার বউয়ের প্রতি অন্য এক ছেলের হৃদয় ভাঙা অনুভূতি, আরশ দ্বিধায় পড়ে গেল, কী করবে ভেবে, এভাবে চুপিচুপি অন্য কারো প্রকাশ করা অনুভূতি পরা ঠিক না, তবুও মন মানছে না, কারণ টা তার বউ, চিঠি টা তার বউয়ের নামে লেখা, আরশ নিজেকে শক্ত করে কাঁপা হাতে দ্বিতীয় পাতাটা উল্টালো,
“আমার সর্বনাশ হয়েছে রে, তোকে ভালোবেসে আমার বড্ড সর্বনাশ হয়েছে, অবাক হচ্ছিস তো, ভালোবাসা? হ্যাঁ, ভালোবাসা, আমি তোকে মনের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছি, কবে যে তোকে মন দিয়ে ভালোবসে ফেলছি জানি না, আমি হয়তো তোকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম, ভুলেই গিয়েছিলাম, তোর প্রতি আমার কোনো অধিকার নেই, আজকের পর থেকে আমি চাইলেই তোর আশেপাশে ঘেঁষতে পারব না, জানি না কিভাবে তোর মায়ায় পড়ে গেলাম, জানিস তো, আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছা করে, কোথায় গেলে পাওয়া যাবে সেই ভাগ্য, যে ভাগ্য তোকে আমার করে দেবে, তুই জানিস?
আরশ ডাইরি টা বন্ধ করে জিভ দ্বারা ঠোঁট ভিজে নিল, কয়েক সেকেন্ড শূন্য চোখে তাকিয়ে পুনরায় ডাইরির তৃতীয় পাতা উল্টানো,
“জানলে কী আর বলবি, বলবি না,
কারণ তোর তো আরশকে চাই,তোর শহরের পন্ডিত মশাইকে চাই, আমার তোকে ভালোবাসার মতো চরম সৌভাগ্য হয়েছিল ঠিকই, শুধু ধরে রাখার সাধ্য হলো না, একটা সময় যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, সে আমার জীবনে এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করেছিল যা আজও এক ধরনের অদৃশ্য আঁকিবুকি হয়ে রয়ে গেছে, তাহলে তোকে ভুলে য়াবো কিভাবে, চোখ বন্ধ
করলেই তো তোর মায়ারী মুখটা চোখের সামনে ভেঁসে ওঠে, তোর হাসি, তোর গলার স্বর শুনতে পাই, আমি যদি বুঝতে পারতাম এমন কিছু হবে, তাহলে আমি তোর থেকে দূরে থাকতাম, এমন যদি হতো আমার মনে তোর জন্য কেনো ফিলিংসই জন্মাত না, আর না আমি তোর থেকে দূরে যাওয়ার কষ্ট পেতাম না , তোকে ভালোবাসার আপরাধে আজ আমি তোর থেকে দূরে যাওয়ার শাস্তি পাচ্ছি, তুই তো সব বুঝতে পারিস, তাহলে আমার মনের অনুভূতি গুলো কেনো বুঝতে পারলি না রে, লেডি গুগুল, আমাকে কেনো ভালোবাসলি না, যদি ভালোই না বাসবি তাহলে তোর মায়ায় কেনো বাঁধলি আমাকেে?
লাইন গুলো পড়ার সময় আরশের গলা ধরে আরছিল, যেন সে নিজেই কথাগুলো লেখতে বসেছে, আরশ পুনরায় চতুর্থ পাতা উল্টালো,
” এরপর আর দেখা হবে না, আমার শহরে হাজারো মানুষ চোখের সামনে থাকবে অথচ, তোর প্রিয় মুখটাই সেখানে আর থাকবে না, সুন্দর সৃতি হতে থাকা জায়গা গুলোতে আবারো যাওয়া হবে, কিন্তু তুই আর সঙ্গে থাকবি না, দীর্ঘনিঃশ্বাস এসে ভর করবে, কিন্তু তোকে আর জানানো হবে না, সবকিছু থেকেও খালি খালি লাগবে, কারণ, কারণ তুই আর আমার শহরে থাকবি না, চলে যাচ্ছি, তোর সুখের জন্য আমি তোর শহর ছেড়ে বহুদূরে চলে যাচ্ছি, আর দেখা হবে না, বলতে পারিস এটা তোর জন্য আমার দেওয়া শেষ উপহার, ভালো থাকবি, আর আরশ কে ভালোবাসা দিয়ে আগলিয়ে রাখবি।
আরশ ডাইরিটা শব্দ করে বন্ধ করে ফেলল,চোখ দুটো বন্ধ করে একটা ঢোক গিলল, আরশ আগে থেকেই জানতো পার্থ মিম কে ভালোবাসে, আরশের বুকটা ভারী হয়ে আরসে, কিন্তু কিছু করার নেই,
___” ডাফার, আরশ ডাফার কই?
মিমের কন্ঠে আরশ ঝট করে চোখ মেলে তাকালো, দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, মিম প্রশ্নভরা চাহনি নিয়ে রুমে ঢুকে আশেপাশে তাকিয়ে পার্থ কে খুজতেছে, আরশ মিম কে দেখেই হাতের ডাইরি টা হুট করে বিছানার চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলল,এত তাড়াহুড়ায় চাদরটা একটু কুঁচকে গেল,মিম সেটা খেয়াল করল কিনা বোঝা গেল না, আরশের নিচে যেতে দেরি হচ্ছে বিধায় মিম বাড়ির ভিতরে নিজেই তাদের ডাকতে এসেছে, কয়েক পা এগিয়ে এসে আরশ কে প্রশ্ন করতে করতে চারপাশে তাকাল,
___” কই, ডাফার কই, আপনি তো ডাফার কে ডাকতে এসেছেন, কই ও?
আরশ নিঃশব্দে মিমের দিকে তাকিয়ে রইল, মেয়েটা আজ থেকে আরশের বউ, আজ থেকে এই মেয়েটার প্রতি শুরু মাএ একমাত্র তার অধিকার, আর কারো না, বুকে অদ্ভুত এক ব্যাথা অনুভব করল সে, ঠোঁটে জোর করে স্বাভাবিক ভাব এনে ধীরে বলল,
___” পার্থ, চলে গেছে।
মিম ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
___” মানে?
আরশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বলল,
___” বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে।
কথাটা শোনার সাথে সাথে মিমের চোখের দৃষ্টি কেমন থেমে গেল, যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে ঠিক বুঝতেই পারল না, কী শুনল, মিমের অবিশ্বাস্য চাহনি দেখে আরশ হাতে থাকা ছোট কাগজের টুকরো টা মিমের দিকে বাড়িয়ে দিল, মিম কপাল কুঁচকে আরশ কে দেখতে দেখতে আরশের হাত থেকে কাগজটা হাতে নিয়ে চোখ বুলালো, গুটিগুটি অক্ষরের ইংরেজি শব্দ গুলো বিরবির করে কাগজ থেকে চোখ তুলে আরশের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” এভাবে হঠাৎ আমাকে না জানিয়ে কেন গেল ও?
মিমের কণ্ঠটা কেঁপে উঠল, চোখে মুখে স্পষ্ট অস্থিরতা,আরশ দৃষ্টি সরিয়ে নিল, বুকের ভেতর চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস জমে উঠছে, মিম কে বুঝতে না দিয়ে বলল,
___” আই ডোন্ট নো।
ছোট্ট উত্তরটা দিয়েই চুপ হয়ে গেল সে,মিম কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল, যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না, তারপর ধীরে ধীরে রুমটার দিকে তাকালো, বিছানা, টেবিল, ছড়িয়ে থাকা কিছু কাগজ,সবকিছুতেই এখনো পার্থর উপস্থিতি লেগে আছে, অথচ মানুষটাই নেই, কয়েক ঘন্টা আগেও ডাফার টা এই রুমে অবস্থান করছিল, মিম যখন বউ সেজে এই রুমে এসেছিল, তখন পার্থ এক টুকরো কাগজে তার ফিরে যাওয়ার নোটিশ লেখতে বসেছিল, মিম অভিমানী গলায় বলল,
___” একবারও, একবারও আমাকে জানানো প্রয়োজন মনে করল না?
মিমের গলাটা এবার অনেক নিচু, অভিমান মেশানো,
আরশের আঙুলগুলো চাদরের নিচে লুকিয়ে রাখা ডাইরিটার ওপর গেল, যেন সে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে ডাইরি টা লুকানোর চেষ্টা করছে,আরশ যানে কেনো পার্থ না জানিয়ে চলে যাচ্ছে, আর আরশ সেটা মিম কে বুঝতে দিতে চায় না, কারণ পার্থ মিমকে কখনো শুধু বন্ধু হিসেবে দেখেনি, তার চোখে মিম ছিল বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু, অথচ মিম বরাবরই পার্থকে নিজের খুব ভালো বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবেনি,মিম যদি জানতে পারে, হয়তো খারাপ লাগবে, মিমের মনে পার্থর জন্য অপরাধ বোধ হতে পারে, কী দরকার শুধু শুধু দুজন বন্ধুত্বের মধ্যে দ্বিধা বাড়ানোর, হয়তো মিম কখনো পার্থর সাথে কথা বললে বন্ধু হিসাবে মন খুলে কথা বলতে পারবে, যদি যানতে পারে পার্থর মনের অনুভূতি গুলো, তাহলে হয়তো কখনো আর মন খুলে কথা বলতে পারবে না, কিছু জিনিস না জানায় ভালো, এতে হয়তো সম্পর্ক গুলো সুন্দর থাকবে, আরশ মিমের থেকে চোখ নামিয়ে ছোট করে বলল,
___” হয়তো, বলার সাহস পায়নি।
মিম এবার তাকালো আরশের দিকে,আরশ চোখ তুলল না, কারণ সে ভয় পাচ্ছিল, মিম যদি জানতে পারে আরশ তার থেকে কিছু লুকাচ্ছে এই ভয়ে, মিম ব্যাথাতূর চোখে পার্থ কে প্রশ্ন করে উঠল,
___” আপনি কখনো আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো?
আরশ এবার চোখ তুলে তাকাল, কিছুক্ষণ চুপচাপ মিমের দিকে তাকিয়ে রইল সে, সেই চাহনিতে ছিল মায়া, ছিল গভীর কোমলতা, মুখে একটা শান্ত হাসি ফুটে উঠল,আরশ আলতো করে মিমের এক হাত নিজের হাতে নিয়ে আঙুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে নরম সুরে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলল,
___” উঁহু, প্রশ্নই আসে না।
মিমের মলিন মুখে হাসি ফুটে উঠল, আরশ মিমের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে মিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
___” এই যে ধরলাম হাত, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছাড়ব না,তুমি বিরক্ত হবে, রাগ করবে, আমার সাথে কথা বন্ধ করে দেবে তবুও না, তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে দেয় নি।
মিমের চোখ খুশিতে ভিজে উঠল, যেন অনেকদিন পর সে ভরসা করার মতো একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছে,পর মুহূর্তেই কোনো কথা না বলে হুট করে আরশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আরশ প্রথমে একটু থমকে গেল, তারপর সেও চোখ বন্ধ করে হাসি মুখে মিমকে নিজের বাহুর মাঝে আগলে নিল,মিমের কাঁপা নিঃশ্বাস বুকের কাছে স্পষ্ট অনুভব হচ্ছিল,
আরশ কে জরিয়ে ধরেই পুনরায় বলল,
___” এভাবেই পাশে থাকবেন, কখনো ছেড়ে যাবেন না, প্লিজ।
আরশ মাথাটা আলতো করে মিমের চুলের ওপর ঠেকাল, বুকের ভেতরটা অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠছে তার,
___” হুম, কোথাও যাব না।
দু’টি মনের অনুভূতি গুলো পুরোঘর ছড়িয়ে পরল,
বিছানার চাদরের নিচে লুকিয়ে থাকা ডাইরিটা নিশ্চুপ পড়ে রইল,একটা অসমাপ্ত ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে, মেয়েটার আর জানা হলো না, কেউ একজন তারজন্য লেখতে বসেছিল, তাকে তার মনে জায়গা দিয়েছিল, তার জন্য দ্বিতীয় বার মন ভেঙেছিল, সময় চলে আপন গতিতে, সময় কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না,মানুষ চাইলেও কিছু মুহূর্ত ধরে রাখতে পারে না, কারণ সময়ের হাতটা খুব নিঃশব্দে সব বদলে দেয়,একসময় যে মানুষগুলো প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল, সময়ই তাদের দূরে সরিয়ে দেয়,যে কষ্ট আজ বুক ভেঙে দেয়, সময়ই একদিন সেটাকে স্মৃতিতে পরিণত করে, জীবন আসলে সময়ের সাথেই হাঁটা শেখায়, কখনো হাসি নিয়ে, কখনো চোখের পানি নিয়ে,তবুও মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ সময় থেমে না থাকলেও আশা নামের একটা জিনিস সবসময় সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়, সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনও চলমান গাড়ির মতো, থেমে থাকলে পিছিয়ে যেতে হয়,আর চলতে থাকলে নতুন পথের দেখা মেলে,জীবনের রাস্তায় কখনো সুখের আলো আসে,কখনো দুঃখের অন্ধকার নেমে আসে, তাই বলে কী মানুষ থেমে থাকে, উঁহু কখনো না, মানুষ থেমে থাকে না, থেমে থাকে মানুষের সৃতি, মানুষ এগিয়ে যায়, কারণ সময় কাউকে থামতে শেখায় না,কিছু মানুষ মাঝপথে নেমে যায়,কিছু স্মৃতি জানালার পাশে বসে থাকে,আর কিছু অনুভূতি আজীবন নীরব যাত্রী হয়ে পাশে চলে, শেষে বুঝা যায় জীবন আসলে গন্তব্যের চেয়ে পথচলার গল্পটাই বেশি সুন্দর।
___” এক্সকিউজ মি? দিস ইজ মাই সিট!
পার্থর গম্ভীর গলায় মেয়েটা চমকে ওঠলো, চমকে উঠার সাথে সাথে হাতে থাকা পপকর্ন গুলো সিটকে নিজের কোলে পরলো, আর মেয়েটা জিহ্বায় কামড় বসিয়ে পার্থর সিট থেকে উঠে নিজের সিটে যেতে যেতে বলল,
___” সরি সরি, আই এম সো সরি, সিটটা ফাঁকা দেখে বসে ছিলাম।
মেয়েটা নিজের সিটে ঠিকঠাক হয়ে বসলো, পুনরায় পপকর্ন খেতে খেতে মুখ কাচুমাচু করে সামনের ছেলে অর্থাৎ পার্থের দিকে তাকালো, পার্থ কী ভাবছে দেখার জন্য, সামনে তাকিয়ে মেয়েটা হা হয়ে গেলো, হাতের পপকর্ন হাতেই রয়ে গেলো তা আর মুখে গেলো না, পার্থের ফর্সা গায়ের রঙে কালো ফুল-স্লিভ শার্ট, হাতা একটু গোটানো, সাথে কালো প্যান্ট, পুরোটা মিলিয়ে মিনিমাল লুক, শার্টটা ফিটিং হওয়ায় তার গঠনটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এক হাতে ঘড়ি আর অন্য হাতে ব্রেসলেট আছে, পার্থ হাত উঁচিয়ে ওভারহেড বিন এর নিজের কাঁধব্যাগ রাখছে, মেয়েটা এখনো ঠিকঠাক মতো পার্থর মুখ দেখতে পারেনি, শুধু লোমহীন আধখোলা ফর্সা বুক-গলা এবং থুতনি দেখা যাচ্ছে, পার্থ ব্যাগ রেখে নিচু হতেই মেয়েটার চোখে চোখ পরল, মেয়েটা এখনো পপকর্ন হাতে নিয়ে পার্থর দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে,দেখা টা অস্বাভাবিক কিছু না, বাংলাদেশ থেকে এমন বিদেশি টাইপের ছেলে আমেরিকান বিমানে, মেয়েটা অবাক হয়ে পার্থ কে পর্যবেক্ষণ করছে পার্থ আদোও বাঙালি নাকি ভীনদেশী যুবক, মেয়েটার হাতে পপকর্ন দেখে পার্থর কপাল কুঁচকে এলো, মনে মনে ভাবলো, জার্নি করতে না মুভি দেখতে এসেছে পাগল ছাগল কোথাকার, মুখে কিছু বলল না শুধু সিটে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, মেয়েটা আগের মতো তাকিয়ে আছে বুঝতে পেয়ে পার্থ অস্বস্তিবোধ করতে লাগলো, বেশ কিছুক্ষণ পর মেয়েটা পার্থ কে দেখা শেষ করে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” হাই আই’ম নাতাশা অ্যান্ড ইউ?
পার্থ ভ্রু কুঁচকে মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকাল, মেয়েটা হাত বাড়িয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে, পার্থ তাকানোর সাথে সাথে নাতাশা নামের মেয়েটা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
___” আমরা যেহেতু সিটমেট, সেই হিসেবে একটুআধটু পরিচিত হতেই পারি,কী বলেন?
পার্থের উদাসীন মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল, কথা না বাড়িয়ে সে পুনরায় সামনে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে ছোট করে বলল
___” পার্থ, পার্থ চৌধুরী।
মেয়েটা হাত গুটিয়ে নিলো, নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে অবশ্য খানিকটা অপমান বোধ করল, অপমানিত হয়ে পপকর্ন চিবাতে চিবাতে মলিন মুখে ছোট করে বলল,
___” নাইস নেম।
পার্থ কেনো জবাব দিলো না, নাতাশা পার্থ কে কিছু বলতে না দেখে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো, ধীরে ধীরে বিমান রানওয়েতে গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলছে, ইঞ্জিনের গর্জন ক্রমশ ভারী হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে, জানালার বাইরে রানওয়ের আলোগুলো একের পর এক পেছনে সরে যাচ্ছে, এক মুহূর্ত পরই বিমানটা হালকা কাঁপুনি দিয়ে মাটি ছেড়ে উঠল, নিচের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসতে লাগল, ঘরবাড়ি, রাস্তা, গাছপালা সবই যেন খেলনার মতো ছোট ছোট দেখাচ্ছে, মেঘের সাদা পরত ধীরে ধীরে কাছাকাছি চলে এলো, আর জানালার পাশে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ল, আসতে আসতে বাংলাদেশ টা নজরের বাহিরে চলে যাচ্ছে, আঁকড়ে ধরার মানুষ গুলোর থেকে দুরত্ব বেড়ে চলল, আর দেখা হবে না, এই কয়েকটা দিন পার্থ বাঙালী দের সাথে মিশে গিয়েছিল, বাঙালি দের এত মিল মমত্বময় মায়া পার্থর অভ্যাসের পরিনত হচ্ছিল, তাদের দেশে তো আর এত খুনসুটি নেই, নাতাশা জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পুরো বহন দেখতে লাগলো, বাকি যাত্রীরা কেউ চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার আসনের পেছনে হেলান দিয়ে বসে আছে, কেউ ফোন স্ক্রল করছে, তো কেউ পাশের সিটমেটের সাথে গল্প করছে, নাতাশা সবাই কে পরক করে নিজের পাশে ছেলেটার দিকে তাকালো, পার্থ কে এতটা উদাসীন মুখে চোখ বন্ধ রেখে পিছনে সিটে হেলান দিয়ে থাকতে দেখে চঞ্চল মেয়েটার মুখ খচখচ করতে লাগলো উদাসীনতার পিছনের কারণ জানার জন্য, তাইতো নিজের ইচ্ছা দমাতে না পেয়ে পার্থর ভাবনায় মধ্যে বা হাত ঢুকিয়ে দিলো,
___” আর ইউ ওকে?
পার্থ বিরক্ত হলো, কিন্তু চোখ খুললো না, না কিছু জবাবে বলল,মেয়েটা বুঝলো পার্থ জেগে আছে কিন্তু কথা বলতে অগ্রহ না, মেয়েটা পুনরায় ডেকে উঠলো,
___” এই যে শুনছেন, আপনি কী কিছু নিয়ে টেনশন করছেন, বাই এনি চান্স আপনার কী মুড অফ?
পার্থ আর নিতে পারলো না, চোখ খুলে তিরতির মেজাজে রেগে গিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে ধমক দিয়ে উঠলো,
___” আর ইউ ম্যাড ?
মেয়েটা হটাৎ পার্থ কে রেগে যেতে দেখে নিজের কৌতূহল দমিয়ে কাচুমাচু করতে লাগল ,
___” নো।
পার্থ আগের ন্যায় রাগী গলায় বলে উঠলো,
___” তাহলে জানা নেই, চেনা নেই, অচেনা এক ছেলেকে কেন বিরক্ত করছেন, আপনি কি বুঝতে পারছেন না, আমি ইন্টারেস্টেড না?
মেয়েটা কাচুমাচু মুখেই বলল,
___” আমি জাস্ট কথা বলতে চেয়েছিলাম, আমি বেশিক্ষণ চুপচাপ থাকতে পারি না, কথা না বললে দম আটকে আসে।
পার্থ বিরক্ত কন্ঠে,
___” তো আমি কী করবো?
মেয়েটা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
___” আমার সঙ্গে গল্প করবেন?
পার্থ রেগে গিয়েও রাগতে পারলো না, এক নিমেষেই তার লেডি গুগুলের কথা মনে পড়ে গেলো, এভাবেই তার লেডি গুগুল সবসময় বকবক করতো, যত ভুলে যেতে চাইছে, ততই যেন হৃদয়ের ব্যাথাটা তরতাজা হয়ে উঠছে, সবকিছু থেকে পালাতে চেয়েও পালাতে পারছে না, এটা এক ধরনের ব্যর্থতা পার্থর, এতক্ষণে হয়তো তার লেডি গুগুল আরশের বুকে মাথা রেখে সুখের সপ্ন বুনতে ব্যস্ত, ভুলে গেছে তার ডাফার কে, এভাবে হয়তো আস্তে আস্তে চিরতরের জন্য পার্থ নামে ডাফার টাকে ভুলে যাবে, হয়তো তার অস্তিত্ব রেখে দিবে কেনো এক নরম বিকালের এক কাফ গরম চায়ের দীর্ঘশ্বাসে, বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, আর দেখা হবে না, ছোট একটা লাইন, কিন্তু গভীরতা অনেক,
___” আপনি কি কাউকে ভালোবেসেছিলেন?
পার্থ কে আনমনে কিছু ভাবতে দেখে নাতাশা প্রশ্নটা পুনরায় করে বসলো, পার্থ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এই মেয়েকে ধমক দিয়েও কিছু হবে না, ব্যর্থ হয়ে নিশ্বাস ফেলে নিজের উপর তাচ্ছিল্য হেসে বিরবির করে উঠলো,
___” ভালোবাসি, কি এসে যায়।
নাতাশা মেয়েটা পার্থের কথা শুনতে না পেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পুনরায় বলে উঠলো,
___” বললেন না তো, আপনি কী কাউকে ভালোবেসে ছিলেন?
পার্থ এবার আর সত্যিই মেয়েটার কথা নিতে পারলো না, বিরক্ত হয়ে কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে সিটের সাথে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো, নাতাশা মেয়েটা পার্থ কে ব্লুটুথ কানে গুঁজতে দেখে আর বিরক্ত করলো না, আঁড়চোখে একবার পার্থ কে দেখে নিয়ে নিজেও চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো, কী আর করার ফেচফেচা রঙচটা জার্নির থেকে, ঘুমন্ত জার্নি ধের ভালো, তার পুরো জার্নি এখন চলবে ঘুম দিয়ে,পার্থ গানের লাইনের সাথে নিজেও হারিয়ে গেলো,
ব্লুটুথ কানে গান বাজছে)
“এ জীবন শেষ হয় না..
তোমায় ছাড়া ভাল্লাগে না
সবকিছু আন্ধার লাগে
বেচে থাকা কী যাতনা!
আমারে পড়লে মনে
তুমিও কাইন্দো গোপনে
সুখে থেকো প্রাণের প্রিয়
আমার ভালোবাসা নিয়ো..
আমি এক এমন পাখি
বুকেতে কষ্ট রাখি
মুখেতে দেখাই হাসি
যেন আমি সুখ নিবাসী
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৭০
কিছুক্ষণ পড়ে ভাঙ্গা হৃদয় থেকে আফসোসের ভারী এক নিশ্বাস বেরিয়ে এলো, গোলাপি ঠোঁট জোড়া খানিক কেঁপে ওঠলো, বন্ধ চোখের পাতা ভেদ করে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো গাল বেয়ে, ঠোঁট জোড়া থেকে অস্ফুটে স্বরে বেরিয়ে এলো এক বাণী,
___” তুই হীনা জীবনখাতা শুন্যই ওয়ে গেল রে।
সমাপ্ত
