নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫০
নাজনীন নেছা নাবিলা
সময় যে কখন কোন স্রোতে ভেসে পার হয়ে যায়, তা আসলেই কেউ টের পায় না। এই যেমন, দেখতে দেখতে আজ নীলা আর মিহালের বিয়ের তিনটে দিন পার হতে চলল। এত দ্রুত যে জীবনের এই নতুন অধ্যায়ের তিন-তিনটি দিন কেটে যাবে, তা কে-ই বা জানত। মাঝখানে একদিন নন্দিনী এসে তার ফোন নিয়ে গিয়েছিল। এবং নীলা তাকে সব ঘটনা খুলে বলেছিল। ইকরাও এখন এই বাসাতেই ওদের সাথে আছে। অবশ্য গতকাল সকালে সবাই মিলে ওদের পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল। সেখান থেকে নিজেদের দরকারি জামাকাপড়, পড়াশোনার বইখাতা আর সেই সাথে নীলার পিঠা বানানোর সব সামগ্রী একবারে নিয়ে আসা হয়েছে। আবার সন্ধ্যা বেলায় পিঠা বিক্রি করতেও যায় তারা। নীলা ফুফু কিংবা মিহাল কেউই বাঁধা দেয় না। আজ তারা সবাই যার যার মতো তৈরি হচ্ছে ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য।
বিয়ের ব্যস্ততায় গত দুই-তিন দিন যাবত ওদের ক্যাম্পাসে যাওয়া হয়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে তৈরি হতে হতে ওরা কি কেউ জানত যে আজ ইউনিভার্সিটিতে ওদের জন্য ঠিক কী অপেক্ষা করছে? যদি সেই বিপদের আভাসটুকুও আগে থেকে পেত, তবে হয়তো তারা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিয়েই বের হতো।
অবশ্য নীলাঞ্জনা এত কাঁচা খেলোয়াড় নয়। মিহালকে যে বা যারাই কিডন্যাপ করানোর সাহস দেখিয়েছে, তাদের উপযুক্ত শিক্ষা তো তাকে দিতেই হবে। আর সেই উদ্দেশ্যেই সে নিজের মোবাইল ফোনটি ফুল চার্জ দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে নিল। কারণ এই ফোনেই জমা আছে লিসার করা সমস্ত কুকীর্তি আর ষড়যন্ত্রের অকাট্য প্রমাণ। আজকে লিসাকে সে কেবল মুখে থ্রেড বা হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেবে না, বরং তাকে তার পাপের চরম শাস্তি পাইয়েই ছাড়বে।
নীলা নিজের সুন্দর জামাটির ওপর একটা মার্জিত বোরকা আর হিজাব সুন্দর করে জড়িয়ে নিল। তারপর ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। সকালের খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চটপট শেষ করে অবশেষে তিনজন মিলে একসাথে বাড়ির বাইরে বের হলো। নীলা আর ইকরা চেয়েছিল নিজেরা আলাদা কোনো গাড়িতে ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হতে। কিন্তু মিহাল পাশে থাকতে কি আর তা কখনো সম্ভব? নিজের বউ আর বোনের মতোন ইকরা কে সে এভাবে একা ছাড়তেই রাজি নয়। শেষ পর্যন্ত মিহালের জেদ আর ভালোবাসার কাছে বাধ্য হয়ে ওদের দুজনকে মিহালের গাড়িতেই গিয়ে উঠতে হলো। মিহালের গাড়ি তখন তীব্র গতিতে ছুটে চলল ইউনিভার্সিটির দিকে, যেখানে পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করছে এক নতুন ঝড়।
গাড়ি এসে থামলো ইউনিভার্সিটি পার্কিং হলে। গাড়ি থামাতেই নীলা এবং ইকরা চট করে গাড়ি থেকে নেমে পরল। ইকরা এগিয়ে যেতে লাগলো। নীলা যেই না সামনের দিকে অগ্রসর হবে তখনই মিহাল তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। নীলা থমকে দাঁড়াল এবং মিহালের দিকে তাকালো। মিহাল তার দিকে নেশা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিহাল নীলার হাত ধরে ধীরে ধীরে নীলাকে নিজের কাছে টনলো। নীলা কিছুটা ঘাবড়ে গেল। মিহাল নীলার কোমর ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“আমার পাওনা কিন্তু এখনো বাকি আছে।”
বলেই নীলার ঠোঁটের দিকে অবসর হতে লাগলো এবং হাত উঠিয়ে নীলার মুখের মাস্ক খুলতে লাগলো। তখনই নীলা মিহালের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আমরা এখন ইউনিভার্সিটিতে। আপনি আমার প্রফেসর এবং আমি আপনার স্টুডেন্ট। বিহেভ ইউরসেলফ, প্রফেসর।”
মিহাল নিজের ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল এবং অবশেষে নীলাকে নিজের বাহুডোর থেকে ছেড়ে দিল। মুক্তি পেতেই নীলা এক দৌড়ে পার্কিং লট থেকে বের হয়ে সোজা হলের দিকে চলে গেল। কিন্তু মনের সুখে পথ চলতে থাকা এই যুগল বিন্দুমাত্র টের পেল না যে, একটু আগেই তাদের সেই নিভৃত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কিছু ছবি গোপনে ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে। আর সেই ছবিগুলো খুব শীঘ্রই তাদেরই বিরুদ্ধে এক মস্ত বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, এই জঘন্য কাজটি অন্য কেউ নয়,স্বয়ং লিসা নিজে করেছে।
সেই দিনটিতে যখন লিসা নিজের ঘরে বসে ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের গ্লানিতে চরম ডিপ্রেশনে ভুগছিল, ঠিক তখনই তার এক বান্ধবী তাকে কিছু অপ্রত্যাশিত ছবি মেসেজ করে পাঠায়। ছবিগুলো ছিল মিহাল আর নীলার অতি গোপনের সেই আকস্মিক বিয়ের। কাকতালীয়ভাবে, লিসার সেই বান্ধবীর আপন ভাই ছিল মিহালের সেই বিশ্বস্ত বন্ধু যে মিহাল আর নীলার বিয়ের জন্য ইমাম সাহেবকে ডেকে এনেছিল। ভাইয়ের ফোনে যখন সেই বান্ধবীটি তাদের ইউনিভার্সিটির সম্মানিত প্রফেসর মিহালের সাথে নতুন আসা ছাত্রী নীলার বিয়ের ছবিগুলো দেখে, সে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। ভাইয়ের অজান্তেই সে ছবিগুলো নিজের ফোনে ট্রান্সফার করে নেয় এবং পরক্ষণেই লিসার ফোনে ফরোয়ার্ড করে দেয়। সাথে এই বিস্ফোরক খবরটিও দেয় যে, মিহাল অলরেডি অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। এই ছবি আর বিয়ের খবরটি পাওয়া মাত্রই লিসা যেমন একদিকে চরম অবাক আর রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক অন্যদিকে তার শয়তান মগজে খেলে গিয়েছিল এক নতুন চাল। তার মনে হয়েছিল, এই ছবিগুলোই হতে পারে মিহালকে নীলার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চিরকালের জন্য নিজের করে পাওয়ার এক মোক্ষম হাতিয়ার। আর সেই নোংরা ধান্দা নিয়েই সে আজ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে নিজের জাল বিছিয়ে ওত পেতে বসে আছে।
আসলে প্রথম যেদিন মিহাল এই ইউনিভার্সিটিতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল, সেদিন প্রথম দেখাতেই লিসা তার ওপর পুরোপুরি ক্রাশ খেয়েছিল। মিহাল তখন লিসার বাবার কেবিনেই বসে ছিল। টেবিলে রাখা সিভিতে মিহালের ছবি আর ব্যক্তিত্ব দেখে লিসা এতটাই মুগ্ধ হয় যে, সে তখনই নিজের বাবার কাছে একটি অদ্ভুত আবদার করে বসে। সে তার বাবাকে জোরাজুরি করে বলে মিহালকে প্রফেসরের পদে নিয়োগ দেওয়ার সময় মূল চুক্তিপত্রের সাথে যেন অতিরিক্ত একটি বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। আর সেই শর্তটি ছিল, প্রফেসর পদে যোগ দেওয়ার পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সে কোনোভাবেই বিয়ে করতে পারবে না, আর যদি করতেই হয় তবে ইউনিভার্সিটির বিশেষ পারমিশন নিয়ে করতে হবে। যদি এই সময়ের মাঝে সে কোনো পারমিশন ছাড়াই বিয়ে করে ফেলে, তবে তৎক্ষণাৎ তার এই সম্মানজনক চাকরিটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। মিহালও তখন কোনো কিছু না ভেবেই সেই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে দিয়েছিল।
কারণ সে নিশ্চিত ছিল যে আগামী তিন বছরের মধ্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কোনো পরিকল্পনাই তার নেই, তা ছাড়া তখন বিয়ের প্রতি তার বিন্দুমাত্র কোনো আগ্রহও ছিল না। ওদিকে লিসা মনে মনে এক গোপন জাল বুনেছিল তার মতো এমন সুন্দরী ও আধুনিক মেয়ে এই প্রফেসরকে বড়জোর এক সপ্তাহের মধ্যে পটিয়ে নিজের প্রেমের ফাঁদে বন্দি করে ফেলবে। অথচ দেখতে দেখতে দুটি বছর পার হয়ে গেল, লিসা আজও মিহালকে বশ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। আর আজ যখন সে জানতে পেরেছে মিহাল অলরেডি চুক্তির খেলাপ করে বিয়ে করে ফেলেছে, তখন তার শয়তান মগজে নতুন এক নোংরা চাল খেলে গেল। সে মনে মনে মিহালকে এক কঠিন শর্ত দেওয়ার ছক কষল মিহাল যদি নিজের চাকরি আর সম্মান বাঁচাতে চায়, তবে তাকে এখনই নীলাকে ডিভোর্স দিয়ে লিসাকে বিয়ে করতে হবে। অন্যথায় তার ক্যারিয়ার সে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। এসব কুটিল চিন্তাভাবনা করে লিসা নিজের ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, শয়তানি হাসি হাসল। এরপর সে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে, একটু আগে পার্কিং লটে তোলা নীলা আর মিহালের সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবিগুলো ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল স্টুডেন্ট গ্রুপে আপলোড করে দিল। কারণ লিসা খুব ভালো করেই জানে মিহাল আর নীলার আইনি বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু ইউনিভার্সিটির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী বা অন্য কোনো স্টাফ তো আর এই সত্যটি জানে না। লিসার ধারণা অনুসারে, চাকরি বাঁচানোর তাগিদে মিহাল সবার সামনে নীলাকে নিজের বিবাহিত স্ত্রী বলে স্বীকার করার সাহস পাবে না, আর সে যদি চুপ থাকে বা অস্বীকার করে, তবে গোটা ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসরের সাথে ছাত্রীর চরিত্র নিয়ে এক কলঙ্কজনক অপবাদ রটে যাবে, যাতে নীলার মুখ দেখানোর আর কোনো পথ থাকবে না।
নীলা ইউনিভার্সিটির গেইটের কাছে যেতেই দেখল সবাই তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারোর চোখে কৌতুক তো কারোর চোখে হিংসা। নীলা সবার দৃষ্টির মানে বুঝতে ব্যর্থ হলো। তাই বেশি কিছু না ভেবে নিজের ক্লাসে চলে গেল। কিন্তু ক্লাসে গিয়েও তাকে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো। সবাই তার দিকে তাকিয়ে কি যেন ফিসফিস করছে। নীলা চুপচাপ নিজের ব্যাগ বেঞ্চে রেখে ব্যাগ থেকে ফোন এবং বই বের করল। ফোন অন করতেই দেখল গ্রুপের নোটিফিকেশন এসেছে। ভাবলো হয়তো কিছু জরুরী তাই ফোনের লক খুলে নোটিফিকেশনে ক্লিক করলে। কিন্তু নোটিফিকেশনটি ওপেন হতেই তার হাত কেটে উঠলো। সেখানে তার আর মিহালের কিছুক্ষণের আগের কাছাকাছি আসার ছবি এবং উপরে ফরাসি ভাষায় ক্যাপশন দেওয়া,
“বাংলাদেশ থেকে আসা পর্দাশীল মেয়ে ইকোনমিকে ভাল মার্কস পাওয়ার জন্য প্রফেসর কে সিডিউস করার চেষ্টা করছে।”
নিজের ব্যপারে এমন বাজে মন্তব্য পড়ে নীলা একদম ভেঙে পরেছে। পোস্টের নিচে অনেকেই অনেক বিশ্রী কমেন্ট করছে। নীলার এইসব দেখার সাহস হলো না। ব্যাগের ভেতর ফোন এবং বই ঢুকিয়ে ফেলল। এখন তাকে মিহালের কাছে যেতে হবে। নীলা বসা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তার চারপাশের ফিসফাস, কৌতুহলী চোখ কিংবা অবজ্ঞার চাউনি কোনোকিছুর দিকেই সে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না। চারপাশটা যেন আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। এখন তার একটাই গন্তব্য মিহাল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজের কম্পিত পা দুটোকে টেনে টেনে সে ক্লাসরুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু নিয়তি বোধহয় আজ তার ধৈর্যের শেষ পরীক্ষা নিতেই ওত পেতে ছিল। ঠিক দরজার মুখে পৌঁছাতেই একজোড়া চেনা অবয়ব পথ আগলে দাঁড়ালো। লিসা! নীলার এই বিধ্বস্ত রূপ, চোখের কোণে জমে থাকা কান্নার মেঘ আর ভেঙে পড়ার উপক্রম দেখে লিসার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। শিকারকে ফাঁদে পড়তে দেখলে শিকারী যেভাবে উল্লাস করে, লিসার চোখে-মুখে ঠিক সেই হিংস্র তৃপ্তি। নীলা নিজের শুষ্ক ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই লিসা এক পাশবিক বাঁকা হাসি হেসে আস্তিনে লুকিয়ে রাখা বিষাক্ত তীরের মতো শব্দগুলো ছুঁড়ে দিল।
“তোমার প্রফেসরের কাছে যাচ্ছো বুঝি? কি ভাবছো, সে তোমাকে সবার সামনে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করবে?”
লিসা এক কদম এগিয়ে এসে গলার স্বর আরও নিচু আর ধারালো করল,
“কখনোই না! কারণ সে আমার বাবা, এই ইউনিভার্সিটির প্রিন্সিপালের কাছে চুক্তিবদ্ধ। চাকরি পাওয়ার পর থেকে তিন বছরের ভেতর সে কোনোভাবেই বিয়ে করতে পারবে না। অথচ দুই বছর যেতে না যেতেই সে গোপনে তোমাকে বিয়ে করে ফেলেছে।”
লিসার প্রতিটি শব্দ নীলার বুকে তীরের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। লিসা থামল না, আরও একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এখন তো তার সাধের চাকরিটাই চলে যাবে। তুমি কি সত্যিই চাও তোমার জন্য তোমার প্রাণপ্রিয় স্বামীর প্রফেসরের চাকরিটা চলে যাক? তাই পা বাড়ানোর আগে যা করবে, একটু বুঝে শুনে কোরো।”
মুহূর্তেই নীলার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। এই প্রথমবার এক তীব্র, হিমশীতল ভয় গ্রাস করল তাকে। এই ভয় নিজের অপমানের জন্য নয়, নিজের লাঞ্ছনার জন্যও নয়, এই ভয় তার মিহালের জন্য। একটু আগে যে মেয়েটি নিজের চরিত্র নিয়ে ওঠা নোংরা গুজবে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল, এখন সেই ক্ষতকেও তার আর বড় মনে হলো না। তাকে তীব্রভাবে ভাবিয়ে তুলল মিহালের ভবিষ্যৎ। মিহাল তার শিক্ষকতা, তার এই চাকরিটাকে কতটা ভালোবাসে, তা নীলার চেয়ে ভালো আর কে জানে। নিজের ভালোবাসার অজুহাতে সে মিহালের এত বড় স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে না। ধীরে ধীরে অবশ হয়ে আসা পা দুটোকে সে ক্লাসের বাইরে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে গুটিয়ে নিল। দরজার চৌকাঠের এপাশেই পাথর মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। বুকের ভেতর তখন এক অদৃশ্য ঝড় সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে। ঠিক তখনই, করিডোর দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে আসার শব্দ পাওয়া গেল। একটু আগেই সোশ্যাল মিডিয়ার সেই পোস্টটি নজরে পড়েছিল ইকরার। নিজের ক্লাস ফেলে সে হন্যে হয়ে খুঁজছিল নীলাকে। দরজায় লিসাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর ভেতরে নীলার সেই পাংশুটে মুখ দেখেই সে আসল সত্যিটা আঁচ করতে পারল। ইকরা লিসাকে একপাশে ঠেলে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এক ছুটে নীলাকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল,
“নীলা, তুই একদম ভেঙে পড়িস না রে,আমি আছি তো তোর সাথে। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ইকরার সেই সান্ত্বনার চাদরটুকু জড়িয়ে ধরে নীলা শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যার সীমানা পেরিয়ে কেবলই এক অনিশ্চিত অন্ধকার দানা বাঁধছিল।
কেবিনে পা রেখেই ক্লান্ত শরীরে চেয়ারটায় এলিয়ে পড়ল মিহাল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে চোখ রাখতেই স্তব্ধ হয়ে গেল সে। ঠিক একই পোস্ট, যা মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের চাবুক হয়ে ধরা দিল। সেখানে নীলাকে জড়িয়ে লেখা হয়েছে চরম কুৎসিত, নোংরা কিছু কথা। মুহূর্তেই পায়ের রক্ত মাথায় চড়ে উঠল মিহালের। অপমানে আর তীব্র আক্রোশে তার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। আর নয়, অনেক সহ্য করেছে সে। সমাজ আর লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে এখনই সময় নীলাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে সবার সামনে টেনে নেওয়ার। ভেতরের জ্বলন্ত ক্ষোভ বুকে চেপে আর একটা সেকেন্ডও অপচয় করল না সে। চেয়ার ছেড়ে ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন শুধু নীলার অভিমুখে।
করিডোর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছিল মিহাল। তার এলোমেলো চুল আর চোখে-মুখে ফুটে ওঠা তীব্র আক্রোশ দেখে ক্যাম্পাসের সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। অন্যান্য প্রফেসররা নিজেদের মধ্যে ইশারায় অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, শান্ত-ভদ্র মিহাল স্যারের আজ কী হয়েছে? কাকতালীয়ভাবে প্রিন্সিপাল নিজেই তখন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজের ইউনিভার্সিটির একজন নামকরা প্রফেসরকে এমন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে দেখে তিনি দমে গেলেন। অমঙ্গল কিছুর আশঙ্কা করে তিনিও পা বাড়ালেন মিহালের পেছন পেছন। মিহাল যখন নীলার ক্লাসরুমের দরজায় এসে পৌঁছাল, তখন ভেতরের দৃশ্যটা তার বুকে তপ্ত শেলের মতো বিঁধল।
ক্লাসের ঠিক মাঝখানে, চাতক পাখির মতো মাথা নিচু করে নিশ্চল বসে আছে তার নীলা। আর চারপাশের চেনা-অচেনা মানুষগুলো তাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিচ্ছে বিষাক্ত, নোংরা সব মন্তব্য। সহ্য হলো না মিহালের। নিজের চোখের সামনে তার ‘নীলাঞ্জনা’র এই অপমান সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। যে মেয়েটিকে সে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করে এনেছে, তার স্থান তো সবার ওপরে। সে তো সব সময় মাথা উঁচু করে বাঁচবে, হাসবে, ডানা মেলবে। তার চোখে জল বা কপালে কষ্টের ভাঁজ দেখার কথা তো ছিল না।
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪৯
অথচ আজ তার দেওয়া একটি গোপন সম্পর্কের কারণেই তার ভালোবাসার মানুষটি এভাবে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে আছে। এই চরম সত্যটা মিহালের ভেতরটাকে এক নিমেষে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। অপরাধবোধ আর ভালোবাসার এক তীব্র বিস্ফোরণ ঘটল তার বুকে। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে চাইল না।
