নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫১
নাজনীন নেছা নাবিলা
ইকরার ঝাঁকুনিতে নীলা যখন সামনে তাকাল, তার চোখ দুটো গিয়ে স্থির হলো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মিহালের ওপর। মিহালের সেই চেনা চোখে আজ কোনো কাঠিন্য ছিল না, ছিল এক বুক অপরাধবোধ আর তীব্র যন্ত্রণা। মিহালকে দেখামাত্রই নীলা যেন এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল। মিহাল নিজের ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই নীলা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। ফিসফিসিয়ে, অথচ এক অনড় আকুতি নিয়ে নীলা বলল,
“প্লিজ, এখানে কিচ্ছু বলবেন না। যা হবার হয়ে গেছে। আপনি এখনই নিজের কেবিনে চলে যান। এই ইউনিভার্সিটিতে আমরা কেবলই একজন স্টুডেন্ট আর একজন প্রফেসর। এর বাইরে কিচ্ছু না। প্লিজ চলে যান মিহাল স্যার।”
মিহালের বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে অত্যন্ত আহত কণ্ঠে, নিচু স্বরে বলল,
“তোমাকে এই নরকের মধ্যে একা ফেলে আমি কোথাও যাব ভাবলে কী করে নীলাঞ্জনা? বিশেষ করে এমন একটা পরিস্থিতিতে, যেখানে চারপাশের মানুষ তোমার নামে এত বড় মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছে! তোমার পবিত্র চরিত্র নিয়ে নোংরা আঙুল তুলছে।”
মিহালের মুখে নিজের জন্য এই আকুলতা দেখে নীলার চোখের বাঁধ ভেঙে যেতে চাইল। নোনা জল চোখের কোণ বেয়ে নামতে নিলেই সে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে তা আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। সে তো ভালো করেই জানে, মিহাল মুখ খুললেই তার চাকরিটা হারাতে হবে। এদিকে দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে লিসা গভীর মনোযোগ দিয়ে দুজনের এই কথোপকথন লক্ষ করছিল। মিহালের কথা শুনে তার খটকা লাগল,মিহাল কি তবে সব চুক্তি ভুলে এই মেয়েটাকে আগলে নিতে চাইছে? না, লিসা কিছুতেই এই ভালোবাসার জয় হতে দিতে পারে না। ঠিক তখনই মোক্ষম সুযোগের মতো ক্লাসের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন লিসার বাবা, অর্থাৎ ইউনিভার্সিটির প্রিন্সিপাল এবং তার পেছনের আরও কয়েকজন সিনিয়র প্রফেসর। লিসার চোখ দুটো হিংস্র আনন্দে চকচক করে উঠল। এই মোক্ষম সুযোগের সদ্ব্যবহার যে তাকে করতেই হবে!
লিসা ভালো করেই জানত, সাধারণ ভাষায় বললে মিহাল তাকে থামিয়ে দেবে। তাই সে উপস্থিত সিনিয়র প্রফেসরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সরাসরি ফরাসি ভাষায় বিষ উগরে দিয়ে বলল,
“এই মেয়েটা প্রফেসর মিহালকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেছে। এই মেয়েকে কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত। লিসার মুখে ফরাসি ভাষায় এমন মারাত্মক অভিযোগ শুনে উপস্থিত প্রফেসররা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসরুমে নীলাকে নিয়ে ‘ছি ছি’ রব উঠে গেল। চারপাশের এই নোংরা গুঞ্জন মিহালের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও এক নিমেষে ভেঙে চুরমার করে দিল। সে নীলার দিকে ফিরে তপ্ত লোহা-কঠিন স্বরে বলল,
“তোমার সব কথা মাথা পেতে নিলেও, তোমার বিরুদ্ধে এই নোংরা অপবাদ আমি কোনোদিন মুখ বুজে সইব না নীলাঞ্জনা। এখন সময় এসেছে সবাইকে আসল সত্যটা জানানোর জন্য।”
মিহালের এই বজ্রকঠিন ঘোষণা শুনে নীলা আর লিসা দুজনেই একসঙ্গে আতঙ্কে শিউরে উঠল। নীলা চায় না মিহাল সত্য বলে নিজের এত কষ্টের চাকরিটা এভাবে হারিয়ে ফেলুক। আর লিসা চায় না মিহাল সত্য প্রকাশ করে নীলার গায়ে লাগা কলঙ্কের দাগটা ধুয়ে দিক। মিহালকে আটকাতে নীলা এবার মরিয়া হয়ে উঠল। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে এক কৃত্রিম রাগের শাসন এনে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভুলেও এই সিদ্ধান্ত নেবেন না! এতে আপনার চাকরিটা নিমেষেই চলে যাবে। প্রয়োজনে আমি এই ইউনিভার্সিটি ছেড়ে অন্য কোথাও ট্রান্সফার হয়ে যাব, তবুও এমনটা করবেন না। নয়তো আমি কিন্তু জীবনেও আর কোনোদিন আপনার সাথে কথা বলব না।”
নীলার এই শেষ অস্ত্র মিহালকে বাইরে থেকে স্তব্ধ করে দিলেও, তার ভেতরের সিদ্ধান্তকে নাড়াতে পারল না। সে মুখে আর টু শব্দটিও করল না, শুধু এক পলক নীলার দিকে তাকিয়ে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। এরপর কী ঘটতে চলেছে, তার ভয়াবহ পরিণতির জন্য নিজেকে মানসিকভাবে পুরোপুরি তৈরি করে নিল সে।
হঠাৎ মিহাল সবার সামনে এক ঝটকায় নীলার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। কোনো বাধা, কোনো লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে সে নীলাকে টেনে নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে গেল। তার গন্তব্য ক্যাম্পাসের মাঠের মাঝখানে থাকা সেই বিশাল অ্যানাউন্সমেন্ট স্টেজ। নীলা দিশাহারা হয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু মিহালের সেই লোহার মতো কঠিন হাতের বাঁধন আলগা হলো না। প্রতিবারই সে ব্যর্থ হলো। মিহাল এত শক্ত করে তার কবজি চেপে ধরেছে যে নীলা বেশ ব্যথা পাচ্ছিল, সেই সাথে এক অজানা ভীতি তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। মিহালের মাথায় এখন কী চলছে সে জানে না, তবে এটুকু খুব ভালো করেই বুঝে গেছে তার সম্মান রক্ষা করতে মিহাল আজ যেকোনো চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মিহালের এই আকস্মিক ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ দেখে পুরো ক্যাম্পাসে শোরগোল পড়ে গেল। তাদের পেছন পেছন কৌতূহলী স্টুডেন্ট, স্তম্ভিত প্রফেসর আর ক্রুদ্ধ প্রিন্সিপাল সবাই মাঠের দিকে ছুটে এলেন। মিহাল নীলাকে প্রায় টেনেই অ্যানাউন্সমেন্ট স্টেজের ওপর নিয়ে দাঁড় করাল। নীলা তখন পুরোপুরি কাণ্ডজ্ঞানহীন, উন্মত্তের মতো মিহালকে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মিহাল যেন এক অনড় পাহাড়। কোনো উপায় না পেয়ে নীলা কান্নায় ভেঙে পড়ে মিহালের হাতের বাহুতে, বুকে এলোপাথাড়ি কিল-থাপ্পড় মারতে লাগল। মিহাল কী করতে চলেছে, তা সে পুরোপুরি আন্দাজ করতে পেরেছে। সে কোনোভাবেই চায় না মিহাল তার জন্য নিজের এত বছরের তিল তিল করে গড়া ক্যারিয়ারটা এভাবে ধ্বংস করে দিক। ছোটবেলা থেকেই মিহালের স্বপ্ন ছিল একজন আদর্শ প্রফেসর হওয়া। আর এই নামকরা ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেওয়া ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। মিহালের মা, মিনা মির্জা নীলাকে কতবার গল্পের ছলে মিহালের এই স্বপ্নের কথা বলেছেন। ভালোবাসার মানুষের সেই আজন্ম লালিত স্বপ্ন এভাবে চোখের সামনে ধুলোয় মিশে যাবে, তা নীলা সইবে কী করে? তাই তো সে অবুঝের মতো মিহালকে আঘাত করে থামানোর চেষ্টা করছে, বুক ফাটা আর্তনাদ করছে। কিন্তু মিহাল আজ বধির, তার সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে তখন শুধুই তার নীলাঞ্জনার সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার জেদ।
মিহাল স্টেজের মাইক অন করল। নীলা তখনও মরিয়া হয়ে মিহালের সেই লোহার মতো শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। মিহাল এক পলক নীলার অশ্রুসজল মুখের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই হাতের বাঁধনটা আলগা করে দিল সে, তবে নীলাকে মুক্ত করার জন্য নয়। চোখের পলকে নিজের শক্ত এক জোড়া হাত নীলার কোমরে জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। স্টেজের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী সবাই এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ, বাক্যহারা। যারা এতক্ষণ মাঠের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল, তারাও কৌতূহলের জোয়ারে ভেসে পিলপিল করে স্টেজের কাছে জড়ো হতে লাগল। নীলা পলকহীন দৃষ্টিতে মিহালের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তার অবাধ্য মাথাটা অনবরত নেড়ে মিহালকে এক বুক আকুতি নিয়ে নিষেধ করে যাচ্ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত ভয়ে আর কান্নায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হচ্ছিল না। চোখ দুটো নোনা জলে টইটম্বুর। নীলা অসহায়ের মতো চোখ দুটো বন্ধ করতেই চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দুই ফোঁটা তপ্ত জল। মিহাল আর একটা সেকেন্ডও দেরি করল না। সবার সামনে মাথা নিচু করে নীলার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া সেই জল নিজের ঠোঁট দিয়ে পরম যত্নে শুষে নিল। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। লিসার তো রাগে আর অপমানে মাথা ঘুরতে লাগল, পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে তার। অন্যদিকে ইকরা আড়ালে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে পুরো ঘটনাটি নিজের ফোনে ভিডিও করে রাখছিল। শুধু ইকরাই নয়, ভিড়ের মাঝখান থেকে আরও অনেক স্টুডেন্ট এই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের ভিডিও করা শুরু করে দিল। চারপাশ থেকে কেউ কেউ রোমাঞ্চে হাততালি দিয়ে উঠল, আবার কেউ কেউ জোরে শিস বাজিয়ে মাঠ কাঁপিয়ে তুলল। নীলার চোখের জল মুছে দিয়ে মিহাল পরম ভালোবাসায় আর গভীর আশ্বাসে তার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এরপর সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর ভীতি ঝেড়ে ফেলে সে সরাসরি স্টেজের সামনে থাকা মাইকটার দিকে মুখ বাড়াল। গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করল,
“আই’ম প্রফেসর মিহাল খান, দ্য হাজব্যান্ড অফ নীলা মির্জা। দিস ইজ মাই অ্যাকচুয়াল আইডেন্টিটি। মাই সেকেন্ড ইন্ট্রোডাকশন ইজ দ্যাট আই অ্যাম আ প্রফেসর অ্যাট দিস ইউনিভার্সিটি। অ্যান্ড ইয়েস, মিসেস নীলা ইজ মাইন। সো, নো ওয়ান উইল সে এনিথিং ডিসরেসপেক্টফুল অ্যাবাউট হার। আই ডোন’ট লাইক অ্যানিওয়ান কমেন্টিং অন হোয়াট বিলংস টু মি।”
এইটা কোনো বক্তব্য ছিল না বরং ছিল জানান দেওয়া। মিহালের কথার ধরনে অধিকার ছিল। ছিল পজেসিভনেস। নীলা নিষ্পলক ভাবে তাকিয়ে আছে মিহালের দিকে। মিহাল এইবার নীলার দিকে তাকালো তারপর আবার সবার সামনেই নীলার কপালে চুমু খেয়ে মাইকের দিকে মুখ করে বলল,
“ডোন্ট মেস উইথ হার। অ্যান্ড রেসপেক্ট মাই লাভলি ওয়াইফ। আই লাভ হার সো মাচ। ইফ এনিওয়ান ট্রাই টু হ্যারাস হার, আই উইল মেক শিউর হিজ অর হার লাইফ বিকামস আ লিভিং হেল।”
মিহালের কথা শেষ হতে না হতে ইউনিভার্সিটি তালির শব্দে মেতে উঠলো। ছেলে মেয়েরা তো সিটি বাজাচ্ছে। এমনকি অন্যান্য প্রফেসর এবং প্রিন্সিপাল সয়ং নিজেও। যা দেখে লিসা সহ্য করতে পারলো না।
লিসা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের বাবার হাত ধরে ভিড় ঠেলে এক কোণে চলে এল। মাঠের এক কোণে এসে ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“বাবা! তুমি কী করে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছো? ভুলে যেও না, প্রফেসর মিহাল তোমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। কন্টাক্ট পেপারে পরিষ্কার লেখা ছিল, চাকরি পাওয়ার পর প্রথম তিন বছরের ভেতর সে বিয়ে করতে পারবে না। অথচ দুই বছর পার হতে না হতেই সে বিয়ে করে বসে আছে।”
প্রিন্সিপাল মেয়ের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন। মিহালের মতো একজন যোগ্য প্রফেসরকে হারানো ইউনিভার্সিটির জন্য বড় ক্ষতি। তিনি নরম গলায় বললেন,
“কিন্তু লিসা, মিহালকে দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল সে মেয়েটিকে কতটা ভালোবাসে। এটা নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। আমি জানি তুমি মিহালকে পছন্দ করতে। কিন্তু প্রিন্সেস, তুমি নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস করো, এর চেয়ে অনেক ভালো ছেলে পাবে।”
বাবার মুখে এমন সান্ত্বনা শুনে লিসার পিত্তি জ্বলে গেল। সে চরম বিরক্ত হয়ে পা ঠুকে বলল,
“উফ ডেড, বি প্রফেশনাল! ভুলে যেও না, সে নিজ হাতে ওই চুক্তিতে সই করেছিল। তুমি একজন প্রিন্সিপাল হয়ে নিজের প্রফেশনাল নীতি কী করে ভুলে যাচ্ছো? তোমার এখনই এর একটা শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত!”
লিসা দমবার পাত্রী নয়। সে বিভিন্নভাবে, নানারকম যুক্তি আর আবেগের জাল বুনে তার বাবাকে ম্যানিপুলেট করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেল। অবশেষে তার সেই বিষাক্ত চাতুর্য কাজ করল। প্রিন্সিপালেরও মনে হলো লিসার কথাই ঠিক, আইন সবার জন্য সমান, মিহাল চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তিনি গম্ভীর মুখে সিদ্ধান্ত নিলেন, মিহালকে চাকরি থেকে ডিসমিসড করা হবে। নিজের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা মেয়েকে জানিয়ে প্রিন্সিপাল আবার ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়লেন। কিন্তু লিসার মুখে জয়ের হাসির বদলে এক চরম হতাশা নেমে এলো। তার পুরো প্ল্যানটাই উল্টো ঘুরে ফ্লপ হয়ে গেল। সে চেয়েছিল বাবার ক্ষমতার জোর খাটিয়ে নীলার চরিত্রহনন করে মিহালের সাথে তার বিয়েটা ভেঙে দিতে, যাতে মিহালকে সে নিজে পেতে পারে। কিন্তু তার বাবা তো উল্টো নিয়ম কানুনের দোহাই দিয়ে মিহালকে চাকরি থেকে তাড়িয়ে তাকে ক্যাম্পাস থেকেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে! চাকরি হারালে মিহাল তো নীলাকে নিয়ে চিরতরে চলে যাবে। নিজের এমন বোকামিতে এখন নিজের ওপরই লিসার চরম রাগ হতে লাগল।
লিসার বাবা ভিড় ঠেলে একদম স্টেজে উঠে পড়লেন। মিহালের হাত থেকে মাইকটা প্রায় কেড়ে নিয়ে নিজের সামনে টেনে নিলেন তিনি। পুরো মাঠজুড়ে তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো, তিনি ফরাসি ভাষায় বললেন,
“প্রফেসর মিহালকে এই মুহূর্ত থেকে ইউনিভার্সিটি থেকে ডিসমিসড করা হলো। কারণ সে তাঁর চাকরির চুক্তি ভঙ্গ করেছে।”
ঘোষণাটি দিয়েই প্রিন্সিপাল আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না, স্টেজ থেকে নেমে গেলেন। এই আকস্মিক অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে পুরো মাঠজুড়ে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। নীলার চোখের বাঁধ ভেঙে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। তার আশঙ্কাই সত্যি হলো, নিজের ভালোবাসার মানুষের ক্যারিয়ারটা তার জন্যই আজ ধ্বংস হয়ে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, মিহালের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অথচ মিহালের ঠোঁটের কোণে তখন খেলা করছিল এক টুকরো শান্ত, তৃপ্তির হাসি। সে তো আগে থেকেই জানত এই সত্যিটা প্রকাশ পেলে তার চাকরিটা চলে যাবে। কিন্তু তার এই হাসির কারণ কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষগুলো তার নীলাঞ্জনাকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করছিল, আজ তারা সবাই আসল সত্যিটা জেনে গেছে। সবাই বুঝে গেছে তার নীলাঞ্জনা কতটা পবিত্র, কতটা নির্দোষ। স্ত্রীর সম্মান ফিরে পাওয়ার এই আনন্দের কাছে একটা চাকরি হারানো মিহালের কাছে তখন বড্ড তুচ্ছ। কিন্তু পরক্ষণেই যখন সে অনুভব করল তার বুকের মাঝে মিশে থাকা নীলাঞ্জনা তীব্র অপরাধবোধে কেঁদে চলেছে, তখন মিহালের ঠোঁটের সেই হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। নীলার এই কান্না সে সইতে পারে না। সে নীলাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে স্টেজ থেকে নেমে এলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইকরার হাতে নীলার ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“ব্যাগটা ওর ক্লাসে রেখে এসো। আমি ওকে নিয়ে আমার কেবিনে যাচ্ছি, কিছুক্ষণ পর শান্ত করে ক্লাসে পাঠিয়ে দেব।”
ইকরা সশ্রদ্ধ চোখে মাথা নেড়ে ব্যাগটা নিয়ে ক্লাসরুমের দিকে রওনা দিল। নীলা তখনও মিহালের বুকে মাথা গুঁজে অবিরাম কেঁদে চলেছে আর মনে মনে নিজেকেই এই সবকিছুর জন্য দায়ী করে যাচ্ছে। মিহাল নীলাকে আলতো করে আগলে নিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ থাকা সেই অফিশিয়াল কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। সে ভালো করেই জানে, আর কিছুক্ষণ পর এই কেবিনের ওপর তার কোনো অধিকার থাকবে না। কিন্তু ক্যাম্পাস ছাড়ার আগে তার নিজের সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে হবে, আর সবচেয়ে বড় কথা তার ভেঙে পড়া নীলাঞ্জনাকে মানসিকভাবে শক্ত করে তুলতে হবে। তারা যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, ক্যাম্পাসের প্রতিটি চোখ তখন তাদের দিকেই নিবদ্ধ ছিল। কিছু মেয়ে নীলার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছিল,
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৫০
“মেয়েটা কত লাকি! এমন একটা জীবনসঙ্গী পেয়েছে যে নিজের ক্যারিয়ার বাজি রেখে সবার সামনে স্ত্রীকে আপন করে নেয়।” আবার লিসার মতো কিছু হিংসুটে মেয়ে নীলার এই সৌভাগ্য দেখে ভেতরে ভেতরে ঈর্ষায় জ্বলে-পুড়ে মরছিল।
