Home ডাক্টার ইশতিহার ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১০

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১০

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১০
অনামিকা আহমেদ

গাড়ির ব্যকসিটে বসে ইশতিহার নিজের ফোনে তোলা রূপের ঘুমন্ত নিস্পাপ মুখের ছবিগুলো একমনে দেখে যাচ্ছে। কাল রাতে তার বুকের ওপর যখন রূপ গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছিল সেই সুযোগেই এই কাজটা সেরেছে সে। রূপকে বেশ নাজুক আর পবিত্র লাগছে, চেহারায় মাতৃত্বের ছোঁয়া লেগেছে ভীষণ। এরূপ প্রতিটা সূক্ষ্ম বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে করতে অজান্তেই যে নিজের ঠোঁটের আগায় হাসি ফুটে গেছে ইশতিহার এর সেদিকে খেয়াল নেই। আজকাল রূপ কে ছাড়া এক মুহূর্ত কাটানো ও তার জন্য দুষ্কর হয়ে গেছে, তার এখন ভাবতেই অবাক লাগে ছয়টা বছর সে কীভাবে রূপ তে ছাড়া বিদেশে কাটিয়েছিল।

হঠাৎই গাড়ির নিরবতা ভেঙে ইশতিহার এর ফোন বেজে উঠে, আদনান কল করেছে। এত সকালে তো আদনানের কল করার কথা না, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে ভেবে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসা আদনানের অসহায়ত্ব ভরা কন্ঠ ইশতিহার এর চোয়াল কে শক্ত করে দেয়।
” ইশতিহার তুই তাড়াতাড়ি সেন্ট্রাল হাসপাতালে আয়। ভাবি কে আমরা ওখানেই নিয়ে যাচ্ছি।”
কথাটা কানে যেতেই ইশতিহার এর শান্ত শরীরটা বিচলিত হতে এক মুহুর্ত ও সময় নেয় না। সামনের সিটটায় সজোরে ঘুষি মারে ইশতিহার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
” কি হয়েছে আমার রূপের?”
” ভাবি সিঁড়ি থেকে -”

আদনান বাক্য শেষ করার ফুরসৎ পায়না, তার আগেই কল টা কেটে যায়। হাতের ফোন আর স্টেথোস্কোপ গাড়িতে ফেলেই ইশতিহার দরজা খুলে রাস্তায় নেমে যায়। গাড়ি তখন বিশাল জেমে আটকা, জেম ছুটার জন্য অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে বিধায় ইশতিহার নিজের পা দুটো কে সম্বল করেই রওয়ানা দেয়। রাস্তার হাজারো যানবাহন আর ফুটপাতের অজস্র মানুষ ডিঙিয়ে ইশতিহার ছুটে চলেছে। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে দৌড়ানোর সময় তার মনে থাকে না যে হাসপাতালে তার ডিউটি আছে, এমনকি ব্যস্ত রাস্তার মাঝখান দিয়ে পাগ*লের মত ছুটে যাওয়ার সময় একবারের জন্য সে নিজের জীবনের পরোয়া করে না। তবে বার বার অসহায় চোখে আকাশের দিকে ইশতিহার মনে মনে বলে,
” আমার স্ত্রী সন্তানের যেনো কিছু না হয়। ওরাই আমার জীবন, আজ ওদের মধ্যে আমাকে যদি কাউকে হারাতে হয় তবে তার চেয়ে আমার মৃত্যু*ই শ্রেয়।”

রূপ কে হাসপাতালে এডমিট করা হয়েছে, সাথে এসেছে আদনান, সুলেখা আর আমির মির্জা। যেখানে রূপের নিজের বাবাই আসেনি সেখানে আমির চাচা হয়ে কেনো আসলো সেটা বোঝা দায়, হয়তো নিজের বংশধরের প্রতি নুন্যতম দায়িত্ববোধ তিনি ঘাড় থেকে একেবারে ঝেড়ে ফেলতে পারেননি।
ওটির করিডোরের পাশের সিট গুলোতে সুলেখা আর আমির বসে আছেন। আর অনতিদূরে পায়চারি করছে আদনান, মুখটা তার দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে এসেছে। সুলেখা শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাদলেও আমির সাহেব একদম চুপ করে বসে আছেন, যেনো এক গভীর চিন্তা তার জেঁকে ধরেছে।
হঠাৎই তাদের কানে শোরগোলের শব্দ ভেসে আসে। হাসপাতালের নিচে রিসিপসনে শোরগোল বেঁধেছে বোধয়, অন্তত শব্দ শুনে তাই মনে হচ্ছে। তবে কারো একজনের পরিচিত কন্ঠ শুনে সুলেখা তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে শোনার চেষ্টা করে।তারপর কিছু একটা উপলব্ধি করে শাড়ির আঁচলটা বুকে চেপে তিনি আদনানের দিকে তাকিয়ে বলেন,

” এটা ইশতিহার এর কন্ঠ। ইশতিহার এসে গেছে, আদনান বাবা তুমি একটু গিয়ে ছেলেটাকে এখানে নিয়ে এসো।।এমনিতেই ছেলেটার মাথা গরম, তার ওপর এমন একটা কাণ্ডে – না জানি ও আজ কাউকে খু*ন না করে বসে।”
এবার আদনানের বুকেও ভয় জমতে থাকে। সুলেখার দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে সে দ্রুত ছুটে যায় রিসিপশনের দিকে। কিছুক্ষন পর আদনান ইশতিহার কে এক প্রকার জাপটে ধরেই নিয়ে আসে। ছেলের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে সুলেখা তো কেঁদেই কুল পাচ্ছে না, আর আমির সাহেব তো হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে নিজের ছেলেকে পরখ করছেন। তিনি ভাবতেও পারেননি ইশতিহার রূপ কে ঠিক এতটা ভালবাসে।
ইশতিহার এর অবস্থা আসলেই বেগতিক। চুল এলোমেলো, শার্টের উপরের বোতামগুলো ছেঁড়া, চোখ মুখ দিয়ে রাগের লাল আভা বের হচ্ছে। আদনান সর্বশক্তি দিয়ে ও তাকে আটকে রাখতে পারছে না, মনে হচ্ছে ইশতিহার পারলে এক্ষুনি দরজা ভেঙে ওটির ভেতরে চলে যাবে।
সুলেখা কাছে গিয়ে ইশতিহার কে শান্ত করতে চাইলে ইশতিহার তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে উঁচু গলায় বলতে থাকে,

” আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম আম্মা, ভেবেছিলাম আর যাই হোক আপনি থাকতে আমার স্ত্রী সন্তানের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু এই বিশ্বাসের কি মর্যাদা দিলেন আপনি? আজ আমার স্ত্রী অপরেশন রুমে, আমার সন্তান বাঁচবে কিনা আমি জানি না। কিসের প্রতিশোধ তুললেন আমার ওপর? জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আপনার আদেশ মানি নি এমন তো কখনও হয়নি, তবুও আপনার আমার প্রতি এত রাগ যে যেচে অরুণার সাথে আপনি রূপ তে যেতে দিলেন? আপনি কি জানতেন না অরুণা আর ছোটচাচি রূপ কে ঠিক কী চোখে দেখে?”
সুলেখা দমে যায়। তার বুক টা ফেটে যাচ্ছে ইশতিহার এর কথা শুনে। আসলেই তো এতকিছু হতই না, যদি না সে রূপ তে অরুণার সাথে যেতে না বলতো। আত্মগ্লানীর বোঝা সইতে না পেরে সুলেখা এক কোণে সরে যায়। আদনান ইশতিহার কে বসিয়ে তার মাথাটা নিজের কাঁধে চেপে ধরে। বোঝায় যাচ্ছে, ইশতিহার এর প্রেসার হাই হয়ে গেছে, এমন চলতে থাকলে যেকোনো সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
আদনান বারবার ইশতিহার এর মাথায় হাত বুলাচ্ছে, যেনো একটু হলেও ইশতিহার শান্ত হয়। তাতে একটু কাজ হয়, ইশতিহার এর রাগ এবার কষ্টে পরিণত হয়। আদনান কে জড়িয়ে ধরে সে হাউমাউ করে কাদতে থাকে।

” আজকে রূপ আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমিও নিজেকে শেষ করে দিব। আমার এই জীবনের কোনো মূল্য নেই রূপ তে ছাড়া।”
কান্নার শব্দ কে ভেদ করে ইশতিহার এর গোঙরানির শব্দ ভেসে আসতে থাকে।
সময় অতিবাহিত হয়, অপরেশন শেষ হলে ওটি থেকে ডাক্তাররা বের হয়। ইশতিহার সুযোগ বুঝে আদনান কে ছড়িয়ে দ্রুত উঠে গিয়ে ডাক্টার কে আকুল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
” স্যার আমার স্ত্রী সন্তান কেমন আছে? ওদের কিছু হয়নি তো? প্লীজ বলুন ডাক্টার, চুপ করে থাকবেন না।”
” আপনার স্ত্রী সন্তান দুজনেই ভালো আছে। আজ অনেক বড় বিপদ হতে পারত, প্রেগন্যান্সির প্রথম দিকটা খুবই রিস্কি হয় মেয়েদের জন্য। আপনাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক বিপদ কেটে গেছে, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।”
ডাক্তারের কথা শুনে সবাই যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে, আদনান খুশিতে ইশতিহার কে জড়িয়ে ধরে। ইশতিহার এবার বাজ পাখির দৃষ্টিতে নিজের বাবার দিকে তাকায়। আদনান কে ছড়িয়ে সে সোজা আমির সাহেবের সামনে দাঁড়ায়,
” আমি বলেছিলাম আমার স্ত্রীর কিছু হলে আমি আপনাদের ছেড়ে কথা বলব না। আজ আপনাদের গাফিলতির কারণে এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। আমাদের দুজন কে নিয়েই যখন আপনাদের এত সমস্যা তাহলে ঠিক আছে আমি আমার স্ত্রী কে নিয়ে আলাদা থাকবো। মির্জা পরিবারের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ থাকবে না। যা ইনকাম করি তাতে আমাদের দুজনের খুব ভালোভাবেই চলে যাবে। ভয় পাবেন না আপনার মুখাপেক্ষী আমরা কখনও হবো না।”

সন্ধ্যার দিকে রূপের জ্ঞান ফিরে, তাকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। চোখ মেলে তাকাতেই হাসপাতালের তীব্র আলোয় তার চোখ আবারো বুজে আসে। হালকা গোঙরানির শব্দ করে আবারও তাকালে নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করে রূপ অবাক হয়। তারপর ধীরে ধীরে তার সকালের স্মৃতি মনে হলে রূপ চকমিয়ে উঠে বসে নিজের তলপেটের ওপর হাত রাখে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনের সংশয় দুর করে তার মধ্যে বড় হতে থাকা ছোট্ট প্রাণটা নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। রূপ এবার একটু প্রশান্তি অনুভব করে, তার সন্তান নিরাপদে আছে এটা ভেবেই তার চোখ বেয়ে আনন্দ অশ্রু বের হয়।

কিন্তু পরক্ষণেই সামনে তাকালে সে ইশতিহার কে দেখতে পায়, দেওয়ালে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে তার দিকে ভয়ং*কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেনো এক্ষুনি তাকে খেয়ে ফেলবে। ইশতিহার এর এমন উপস্থিতি রূপের মনে ভয় জাগালেও সে মনে করেছিল ইশতিহার তাকে এসে জড়িয়ে ধরে তাকে ভালোবাসায় ডুবিয়ে দিবে। সে জন্যে রূপ একটু কাঁদো কাঁদো মুখ কর ইশতিহার এর দিকে দু হাত প্রসারিত করলে ইশতিহার তার ভাবনা কে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে সজোরে তার গালে এক থা*প্পড় বসিয়ে দেয়। রূপ বোকা বনে যায়। ইশতিহার থেমে থাকে না, রূপের চুলগুলো শক্ত করে টেনে তাকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করে বলে,

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৯

” কু*ত্তার বাচ্চা, এক বাচ্চার মা হতে যাচ্ছিস এখন এতটুকু জ্ঞান বুদ্ধি তোর হয়নি যে কার সাথে যাওয়া যায় আর কার সাথে না? তোর কপাল ভালো আমার বাচ্চা কিছু হয়নি, যদি কিছু একটা হতো তাহলে তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে আমি কুকুরদের খাওয়াতাম। ইশতিহার মির্জার সন্তানের প্রতি অবহেলার শাস্তি তুই হাড়ে হাড়ে টের পাবি রূপ।”

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here