ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৯
অনামিকা আহমেদ
আদনান এর চোখে তখন ও ভাবনার মুখটা দৃশ্যমান হয়নি। এমনকি তার সামনে যে এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আদনান সেটাও পুরোপুরিভাবে বিশ্বাস করতে পারছে না। ভাবনা কে অশ*রীরী ছায়ামূর্তি ঠাওরে সে আবারও চিৎকার করতেই যাবে ঠিক তখনই ভাবনা তার কাছে এসে আদনান কে শক্ত করে জাপটে ধরে। তারপর গলা ছেড়ে হাকডাক পারতে থাকে,
” কে কোথায় আছো, বাড়িতে চোর ঢুকেছে। চোর, চোর এসেছে। সবাই তাড়াতাড়ি ছাদে আসো। আমি একা এই ষাঁড়ের মত পেল্লায় লোকটা কে ধরে রাখতে পারছি না।”
ভুতে তাকে চোর ডাকে!!! এর চেয়ে অপমানের বিষয় হয়তো এই দুনিয়ায় আর একটি নেই। আদনান মেজাজ গরম করে ঝাড়া মেরে ভাবনা কে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে,
” পে*ত্নীর ঘরের পে*ত্নী, তোর সাহস কি করে হলো আমাকে চোর বলার? নিজে তো মরা*র পর ও অন্যের বাসায় ফ্রি তে থাকিস। তুই জানিস আমি কে ? আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকার আমাউন্ট জানিস? আরেকবার আমাকে চোর বলে ডাক তোর থোতা মুখ আমি ভোতা করে দিব।”
” চোরের আবার সিনাজুড়ি!! আজকালকার চোর গুলো কি হাই ক্লাস থেকে বিলং করছে যে চোর কে চোর বলার যাবে না? আর আপনি চোর নাহলে এই রাত বিরাতে অন্যের বাড়ির ছাদে কি করছেন? তারওপর আমাকে পে*ত্নী ডাকা হচ্ছে? দাঁড়ান আপনার মজা দেখাচ্ছি।”
এই বলে ছাদের এক পাশে রাখা বাঁশের এক ফালি হাতে নেয় ভাবনা। কিছুদিন আগে আঁখির জন্মদিনের অনুষ্ঠান করার কাজে এই বাঁশ না হয়েছিল, ভাবনা ভাবতেও পারে নি এগুলো তার একদিন এভাবে কাজে আসবে।
এদিকে অন্ধকারের মাঝে ছায়ামূর্তি কে বাঁশ হাতে এগিয়ে আসতে দেখে আদনানের তো দেহ থেকে আ*ত্মা বের হয়ে যায়। এতদিন সে শুনে এসেছিল পেত্নী রা নাকি বাঁশ বাগানে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে যে তারা বাঁশ হাতে পেছনে তাড়া করে এমনটা কখনও শুনেনি সে। ভাবনা আরেকটু কাছে আসতেই আদনান প্রাণপণে ছুটতে শুরু করে। ভাবনাও কম কিসে, পাতলা শরীর তার। সেও আদনানের পেছন পেছন ছুটতে শুরু করে ।
” দাড়া বলছি, আজকে এই তেলতেলে বাঁশের বাড়ি মেরে তোর চুরি করা ছুটাচ্ছি। আর কারো বাসা পেলি না, শেষে কিনা আমার বাসার দিকেই তোর নজর গেলো? দাড়া, দাড়া বলছি চোর।”
হাঁপাতে হাঁপাতে কথাগুলো বললেও ভাবনার গলার তেজ কমে না বরং সময়ের সাথে আরও জোরালো হয়। কথাগুলো কানে আসতেই আদনান চিৎকার করে বলতে শুরু করে,
” পে*ত্নী মা, আমি চোর না আমি ডাক্টার আদনান আলী। আর এটা আমার বন্ধুর বাড়ি, বেড়াতে এসেছিলাম। কিন্তু আপনি এখানে ডেরা গেড়েছেন সেটা জানলে কখনও আসতাম না।”
আদনানের নামটা শুনতেই ভাবনা দাঁড়িয়ে যায়। নামটা পরিচিত, ইশতিহার এর মুখে হয়তো বারংবার নামটা শুনেছে সে। বাশ হাত থেকে ফেলে দিয়ে ভাবনা চোখ বুজে বিষয়টা আরেকটু নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আদনান তার আগেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার ওপর এসে ধপাস করে পরে যায়। আসলে ভাবনা কে এভাবে হুট করে থেকে গেছে আদনান সেটা দেখেনি, তাই দৌড়ানোর সময় নিজেকে থামাতে না পেরে সে সোজা ভাবনার শরীরের ওপর গিয়ে পরে।
ছাদে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় কেও কারো মুখ দেখতে পারছে না। তানাহলে কবে আদনান চোখের সামনে তার সেই অপরিচিতা মোহিনী কে দেখে বেঁহুশ হয়ে পড়ত কে জানে। তবুও কিছুটা আবছা আলো এসে পড়ছে ভাবনার তীক্ষ্ণ নাক মুখের ওপর। আদনান যেনো এক মুহূর্তের জন্য হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। দুজনের মধ্যে যতটুকু দুরত্ব ছিল আদনান একটু একটু করে সেটা কমিয়ে ফেলতে থাকে। কিছু একটার আকর্ষণ তাকে এতটাই বিমোহিত করছে যে সে ঠিক এখন কি করতে চলেছে সেটা সে নিজেও জানে না। এদিকে ভাবনার বুক ঢিপঢিপ করছে। জীবনে কোনো ছেলেকে সে এত কাছ থেকে উপলব্ধি করছে, তার ছোঁয়া তার সারা শরীর জুড়ে লেপ্টে যাচ্ছে। সে চাইছে আদনান কে নিজের কাছ থেকে ঠেলে ফেলে দিতে কিন্তু কিছু একটার জোরে পুরোপুরি পেরে উঠছে না।
ঠিক এমন সময় কালো সিল্কের নাইট ড্রেস পরে হাতে মোবাইলের ফ্লেশ লাইট জ্বালিয়ে ইশতিহার ছাদে আসে। আশেপাশে মানুষের উপস্থিতি পেতেই ঘোর ভেঙে আদনান তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যায় ভাবনার ওপর থেকে। ভাবনা কিছু বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে কিন্তু পরক্ষণেই ইশতিহার কে ছাদে প্রবেশ করতে দেখে সেও কিছু টা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি করে গায়ের ওড়না টা ঠিক করে দাঁড়াতেই যাবে ঠিক তখনই ইশতিহার এক গম্ভীর কণ্ঠ তার কানে ছুটে আসে।
” কি রে রাত বিরাতে দুইটা কি শুরু করেছিস?”
কথাটা বলতে বলতে ইশতিহার ছাদের সাথে লাগোয়া পানির ট্যাংক এর পাশের লাইটটা জ্বালায়। সাথে সাথেই ছাদের অন্ধকারের সাথে সাথে আদনানের মনের অন্ধকার ও দুর হয়। চোখের সামনে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সেই নারী সৌন্দর্য কে খুঁজে পায় সে। যতটা ভেবেছিল ভাবনা তার চেয়েও সুশ্রী, এরূপ মায়া আদনান এর আগে দেখেনি। বস্তুত সৌন্দর্যের পাল্লায় ভাবনা রূপের চেয়েও এগিয়ে। কিন্তু তার এই সৌন্দর্য কে কোণঠাসা করে রাখা হয় বলে কারো চোখে পড়ে না।
” ভাইয়া উনি হুট করে এভাবে ছাদে চলে এসেছেন যে আমি মনে করেছিলাম উনি চোর। তুমি বলো, এই অন্ধকারে কি কেও রুম থেকে বের হয় চোর ছাড়া?”
ভাবনার গলায় অপরাধবোধ স্পষ্ট। ইশতিহার একবার বাকা চোখে আদনানের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবনা কে বকা দিয়ে বলে,
” তা তুই কেনো বেড়িয়েছিস? তুই ও কি চোর?”
ভাবনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ায়।
” তাহলে এখনও দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ?রুমে যা।”
ইশতিহার এর খাঁকারি শুনে ভাবনা দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে আসে। তবে যাওয়ার আগে একবার ফিরে আদনান কে দেখেছিল। সুঠাম সুদর্শন পুরুষ কে নিজের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার বুক টা কেমন নড়ে উঠে। কিন্তু ইশতিহার সেখানে থাকায় সে চলে যেতে বাধ্য হয়।
” এভাবে নি*র্লজ্জের মত তাকিয়ে আছিস কেনো আমার বোনের দিকে? আমার বোন তো তোর ও বোন, তাই না? নজর নামা শা*লা? ”
” ও আমার বোন না হবু বউ। তোর বোন দেখে যে আমারও বোন হতে হবে এটা কোন সংবিধানে লেখা আছে? আমার ওকে চাই ইশতিহার, চাই মানে চাই।”
খাবার টেবিলে সকলের সামনে এক হাঁটুর বয়সী ছেলের অপ*মানটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না আমরিন। তার কতদিনের আশা ছিল ছেলেটার সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার, কিন্তু রূপের জন্য আজ তার সবটা প্ল্যান ভেস্তে গেল। রা*গে গা জ্বলছে তার, সম্পূর্ণ রাগ টা এসে পড়ছে রূপ আর তার অনাগত সন্তানের ওপর। আমরিন যদি পারত তাহলে গলা টিপে এই দুটো মা বাচ্চার প্রাণ নিত। কিন্তু সকলের সামনে বিশেষ করে ইশতিহার থাকতে এটা করা তার পক্ষে সম্ভব না। তাই কাক ভোরেই নিজের মেয়েকে ডেকে শিখিয়ে দিয়েছে ইশতিহার হাসপাতালে চলে গেলে অরুণা যেনো রূপ কে কায়দা করে সকলের চোখের আড়ালে গিয়ে তাকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেয়। এতে তার পেটের আপদ তো বিদায় হবেই, কপাল ভালো থাকলে রূপ ও পটল তুলবে।
মায়ের এমন একটা পরিকল্পনা শুনে অরুণা বিন্দুমাত্র ঘাবড়ায় নি বরং মনে মনে খুশিই হয়েছে। তবে আপাতত ইশতিহার এর বউ সাজার ইচ্ছার বদলে আদনান এর বউ সাজার ইচ্ছা তার মনে জেগেছে। আদনান বাড়ির একমাত্র ছেলে, তার ওপর তার বাবার সম্পত্তি তাদের চেয়ে ঢের বেশি। এমন একটা সুযোগ সে হাতছাড়া কি করে করে। তবে মায়ের ঠেলা ধাক্কানি তে সে চিন্তা শিকায় তুলে সে রূপের সাথে ভাব জমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনোভাবে আদনানের ঘরে ঢুকে তার নামে বদনাম রটিয়ে কৌশলে তার গলায় ঝুলে পড়ার একটা চিন্তা অবশ্য অরুণার মাথায় ঘুরছিল। কারণ সহজভাবে আদনান কে ফাঁসানোর মত রূপ বা গুণ কোনোটাই তার মধ্যে ছিল না।
” আপু তুমি এই শরীর নিয়ে কাজ করছে কেনো? বেবীর ক্ষতি হতে পারে। তুমি ওপরে চলো, আমি রুমে এসি আছে। সেখানে ঠান্ডার মধ্যে বসে তোমার সাথে একটু গল্প করবো। এই গরমে থাকতে হবে না।”
রূপ প্রথমে যেতে না চাইলেও সুলেখা ও অরুণার সাথে তাল মেলায়।
” অরুণা তো ঠিক বলেছে, আমরা এখানকার কাজ সামলে নিবো তুই যা, অরুণার রুমে একটু এসি টা গিয়ে বস। এই সময়টা একটু শরীরের যত্ন নিতে হয় মা, গাফিলতি করলে তোর মধ্যে বড় হওয়া ছোট্ট প্রাণটারই কষ্ট হবে।”
সুলেখার কথায় রূপের উঠতে হয়। ইশতিহার বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে কিছুক্ষণ হলো। যাওয়ার আগে সুলেখা কে বলে দিয়ে গেছে যেনো রূপের কোনো রকম কষ্ট না হয় কিংবা তাকে যেনো কোনোভাবে কেও খোঁচা দিয়ে কথা না বলে। এসব চিন্তা করেই সুলেখা চেয়েছিল রূপ কে সবার থেকে একটু দূরে রাখার জন্য।
মাত্র কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই রূপের শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পা দুটো যেনো চলতেই চাচ্ছে না। অরুণা তাকে আরও জলদি উঠতে বললে সে উত্তরে বলে,
” আমি আর পারছি না বোন, তুই রুমে যা, আমি বরং সোফায় গিয়ে বসি। ”
কিন্তু অরুণা তার হাত ছাড়তে নারাজ। সে টেনে হিঁচড়ে হলেও রূপ কে সিঁড়ির শেষ প্রান্তে নিয়েই যাবে। ধস্তাধস্তির মাঝে একসময় পা পিছলে রূপ পড়ে যায়। পা মোচকানোর পাশাপাশি রেলিং টা মাথার সাথে লেগে চামড়া ফেটে র*ক্ত বের হতে লাগে। তবে কয়েক সিঁড়ি পড়ার আগেই রুপম পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ৮
রূপ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রুপম তাড়াতাড়ি করে রূপ তে নিজের বাহুডোরে নিয়ে নিচে এসে সোফায় শুয়ে দেয়। এসবে রূপের পেটে আঘাত লেগেছে কিনা সেটা বোঝা মুশকিল। লাগলে যে তার সন্তানের মৃ*ত্যু নিশ্চিত তাকে কোনো সন্দেহ নেই। রুপমের চিৎকার চেঁচামেচি তে সবাই ছুটে আসে সেখানে। আদনান তাড়াতাড়ি করে সকল কে পাশ কাটিয়ে এসে রূপ কে চেক করতে শুরু করে। কিছু একটা অনুমান করে আদনানের মুখ কালো হয়ে আসে। কাপা গলায় সে বলে উঠে,
” এক্ষুনি ভাবি কে হাসপাতালে এডমিট করতে হবে, নইলে হয়তো বাচ্চাটা বাঁচানো যাবে না।”
