Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎“ঝিমার সাথে ঝামেলা হয়েছিল আজ?”
‎ইখতিয়ারের প্রশ্নে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল মুগ্ধা। লোকটা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে জামাকাপড়। মুখে এখনো সেই ক্লান্তি ভাব। সাথে বরাবরের মতোই কোনো ভাবান্তর নেই, এমন মুখশ্রী। যেন খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন করেছে।
‎মুগ্ধা চোখ নামিয়ে ফেলল। অল্প আওয়াজে বলল,
‎“না।”
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে।
‎“ইশতিয়াক চিৎকার করছিল কেন?”
‎“ও তো এমনেই করে।”
‎“হুম।”
‎এরপর আর কিছু বলল না সে। ওয়াশরুমে ঢুকে গেল ইখতিয়ার।
‎মুগ্ধা ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত লাগছে। এই মানুষটাকে বোঝা ভীষণ কঠিন। কখনো মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উদাসীন মানুষ, আবার হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন করে বসে যেন সব খেয়াল রাখে।
‎ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। মুগ্ধা চুপচাপ বিছানায় বসে আয়নায় নিজেকে দেখল। চোখদুটো একটু ফুলে আছে। সে দ্রুত ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিল।
‎কারো সামনে কান্নাকাটি তার খুব একটা পছন্দ না। ছোটবেলা থেকেই না। এতে দূর্বলতা প্রকাশ পায়। মুগ্ধা তো দুর্বল না। কখনোই না।

‎নিচতলায় রাতের খাবারের আয়োজন চলছে।
‎ইন্তিয়া পারভীন গরম ভাত নামাচ্ছেন। রাফেয়া সালাদের প্লেট সাজাচ্ছে। ইসরায়েল শেখ খবর দেখছেন টিভিতে।
‎শুধু ইশতিয়াক সোফায় লম্বা হয়ে পড়ে আছে। হাতে ফোন। মুখে বিরক্তি।
‎মুগ্ধা নিচে নামল । চোখেমুখে দুঃখ না থাকলেও সুখের ছিটেফোটা নেই। মুগ্ধাকে দেখে সোজা হয়ে বসল ইশতিয়াক। সে নাটকীয়ভাবে বলল,
‎“এই যে আমাদের দুঃখী ভাবি!”
‎মুগ্ধা চোখ কুঁচকালো। বলল,
‎“আবার কি?”
‎“তোরে দেখলে মনে হয় বাংলা সিরিয়ালের অত্যাচারিত বউ।”
‎“তুই চুপ কর।”

‎সোফায় আরাম করে হেলান দিয়ে বসল ইশতিয়াক। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‎“না করলে?”
‎মুগ্ধা শান্ত গলায় বলল,
‎“তোর ফোনটা পানিতে ফেলে দিব।”
‎ইশতিয়াক সাথে সাথে ফোন বুকের কাছে চেপে ধরল।
‎“আস্তাগফিরুল্লাহ! এত খারাপ কেন তুই?”
‎ইন্তিয়া হেসে ফেললেন।
‎“তোদের দুইজনের ঝগড়া শুনলেই মাথা ধরে।”
‎মুগ্ধা মৃদু হাসল। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামল ইখতিয়ার।
‎সাদা টি-শার্ট, কালো ট্রাউজার। ভেজা চুল এলোমেলো কপালে পড়ে আছে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ উধাও। একটা হাত ট্রাউজারের পকেটে। আরেক হাতে ফোন। ফোনের দিকে তাকিয়েই সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামল।
‎মুগ্ধা তাকালো । তার চোখ এক সেকেন্ডের জন্য আটকে গেল যেন। তারপর দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল সে।
‎ইশতিয়াক সেটা খেয়াল করে ফিসফিস করল,
‎“এই ছেড়ি, এভাবে তাকায়ো গিলে খাস ক্যা? নজর লাগব তো আমার ভাইয়ার।”
‎মুগ্ধা ট্যাংরা চোখে তাকাল। বলল,
‎আ সোয়ামীরে আমি দেখব তোর কি?”
‎ইশতিয়াক মুখ ব্যাকালো। বলল,
‎”ঢঙ”
‎মুগ্ধা নিচু স্বরে বলল,
‎“মুখ বন্ধ রাখ।”

‎ইখতিয়ার চুপচাপ এসে চেয়ার টেনে বসলো। কারও দিকে বিশেষ তাকাল না।
‎খাওয়ার মাঝখানে ইসরায়েল শেখ বললেন,
‎“আজকে খুব গরম পড়ছে।”
‎“হুম।”
‎ছোট্ট উত্তর ইখতিয়ারের। ইশতিয়াক বিরক্ত মুখে বলল
‎“আব্বু, ভাইয়রে স্বরবর্ণ, ব্যাঞ্জনবর্ণ কম পড়িয়েছিলে?।”
‎ইতিয়া জিজ্ঞেস করল,
‎”কেন?”
‎”তাই শব্দ কম ব্যবহার করে,যাতে শব্দ ফুরিয়ে না !”
‎কথাটা বলে নাক কোচকালো ইশতিয়াক।

‎ইখতিয়ার পানি খেল। কোনো উত্তর দিল না।
‎মুগ্ধার হাসি পেয়ে গেল। খুব কষ্টে ঠোঁট চেপে রাখল সে।
‎ইশতিয়াক এবার মুগ্ধার দিকে তাকালো।
‎“তুই হাসলি?”
‎“না তো।”
‎“আমি দেখছি।”
‎“তোর চোখের সমস্যা।”
‎ইশতিয়াক নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল।
‎“ভাই! তোমার বউ আমারে অপমান করতাছে।”
‎ইখতিয়ার ভাত মাখতে মাখতেই বলল,
‎“তুই ঐটাই ডিজার্ভ করিস।”
‎পুরো টেবিল হাসল উচ্চস্বরে।
‎ইশতিয়াক মুখ হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
‎“ভাই… তুমি আমার বিরুদ্ধে?”
‎ইখতিয়ার শান্ত স্বরে বলল,
‎“খাবার খা।”
‎মুগ্ধা এবার সত্যি সত্যি হেসে ফেলল।
‎ইখতিয়ার এক ঝলক তাকালো তার দিকে। তারপর আবার নিচের দিকে চোখ নামিয়ে নিল। মুগ্ধা বেজায় খুশি। তবে? ইশতিয়াকের মুখ বেজার হয়ে রইল। তার আপন ভাই তার সাথে এমন করতে পারল? হয় হয় এমন হয়, ভাইয়া বিয়ে করে বৌয়ের দলেই যায়। ইশতিয়াক তবু খুশি হলো।

‎রাত এগারোটা।
‎কারেন্ট চলে গেছে। পুরো বাড়ি আধো অন্ধকার।
‎মুগ্ধা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বই। কিন্তু পড়ায় মন বসছে না। গরমে বিরক্ত লাগছে।
‎হঠাৎ পাশের বারান্দা থেকে ইশতিয়াক ডাকল,
‎“ভাবি।”
‎“কি?”
‎“একটা কথা বলি?”
‎“না।”
‎“আচ্ছা, তাও বলি।”
‎মুগ্ধা বিরক্ত হয়ে তাকালো। ইশতিয়াক রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‎“ভাই কিন্তু তোর খবর নিছে।”
‎মুগ্ধা ভ্রু কুঁচকালো।
‎“মানে?”
‎“তুই কাঁদছিলি কিনা জিজ্ঞেস করছিল।”
‎মুগ্ধা থমকে গেল।
‎“কি?”
‎“হুম,একদম সত্যি কথা,আমি স্বপ্ন দেখেছি।”

‎গ হাত দিয়ে বলল ইশতিয়াক। মুগ্ধা ইন্টারেস্ট নিয়ে শুনছিল। শেষের কথাটা শুনে মুখ বেঁকাল।
‎“তারপর?”
‎“তারপর আর কি! আমি বললাম, ‘ভাবিরে কষ্ট দিলে কিন্তু আমি তোমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করব।’”
‎মুগ্ধা চোখ ঘুরালো।
‎“ঢং কম কর।”
‎ইশতিয়াক হঠাৎ একটু সিরিয়াস হলো।
‎“আচ্ছা সত্যি করে বল, ভাইরে এতো পছন্দ কেন তোর?”
‎প্রশ্নটা শুনে চুপ করে গেল মুগ্ধা। চোখ কুঁচকে তাকালো ইশতিয়াকের দিকে,
‎”নিজের সোয়ামীরে পছন্দ করুম না তো কারে করুম? পরকীয়া করব নাকি!”
‎”ঐ কাঠখোট্টারে এত পছন্দ?”
‎রাতের বাতাসে মুগ্ধার খোলা চুল উড়ছে। গ্ৰীলে বাড়ি খাচ্ছে তা। দূরে কুকুর ডাকছে। বাতাসে সা সা শব্দ করছে।
‎মুগ্ধা অনেকক্ষণ পরে ধীরে বলল,

‎“সব পছন্দের কারণ থাকে না।”
‎ইশতিয়াক তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর হেসে ফেলল।
‎“উফ! কি ডায়লগ!”
‎মুগ্ধা বই দিয়ে মারতে গেল।
‎“যা এখান থেকে।”
‎ঠিক তখনই পিছন থেকে দরজা খোলার শব্দ এলো।
‎ইখতিয়ার বারান্দায় এসেছে। হাতে ফোন। সম্ভবত কারও সাথে কথা বলছিল।
‎মুগ্ধা তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল।
‎ইশতিয়াক দাঁত বের করে বলল,
‎“আমি যাই। তোরা চন্দ্রবিলাস কর,আমি সিঙ্গেলমানুষ এখানে থাকলে লজ্জা পাব। যাই গা”
‎“ইশতিয়াক”
‎“জি ভাবি?”
‎“দূর হবি?।”

‎ইশতিয়াক হাসতে হাসতে ভেতরে চলে গেল।
‎বারান্দায় অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
‎ইখতিয়ার রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ালো। চোখ সামনে।
‎মুগ্ধা বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগল, যদিও কিছুই পড়ছে না।
‎কয়েক মিনিট পর ইখতিয়ার বলল,
‎“পরীক্ষা কবে?”
‎মুগ্ধা অবাক হয়ে তাকালো।
‎“সামনের মাসে।”
‎“পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে?”
‎“চেষ্টা করছি।”
‎“হুম।”
‎আবার চুপ।
‎মুগ্ধা মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটা দুই লাইনের বেশি কথা বলতে পারে না নাকি!
‎হঠাৎ ইখতিয়ার বলল,
‎“দাদি যা বলেছে, ওসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই।”
‎মুগ্ধা তাকালো তার দিকে।
‎ইখতিয়ার এখনও সামনের দিকেই তাকিয়ে আছে। গলাটা শান্ত।

‎“ইশতিয়াক তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর সাথে তুমি স্বাভাবিক যেভাবে ছিলে সেভাবেই থাকবে।”
‎মুগ্ধার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
‎সে ধীরে বলল,
‎“আপনি… খারাপ ভাবেননি?”
‎ইখতিয়ার এবার তাকালো।
‎“কেন ভাবব?”
‎মুগ্ধা উত্তর দিতে পারল না।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১

‎ইখতিয়ার আর কিছু না বলে ভেতরে চলে গেল।
‎মুগ্ধা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট হাসি ফুটে উঠেছে। সে রাতটা মুগ্ধার আনন্দেই গেলো।
‎মনে প্রজাপতি বাসা বাঁধল তার। এই ছোট ছোট পাওয়া গুলো তার কাছে খুব কিছু।
‎”অনূভুতিরাও জট বাঁধায় অভিযোগে ভোগে,
‎প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে প্রিয়ানুভূতি জাগে।”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here