Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৭

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৭

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৭
জান্নাতুল ফেরদৌ

প্রহরীটা দ্রুত পায়ে করিডোর পেরিয়ে এসে মাথা নত করলো।
“শাহজাদা।”
বাইজিদ তাকালো।
“কী হয়েছে?”
প্রহরীর মুখে অস্বস্তি। ভয়ে ভয়ে বলল
“বন্দি চন্দ্রপ্রভা অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। চিৎকার করছেন, নিজের মাথা দেয়ালে ঠুকছেন। হাসছে, কাঁদছে কি কি সব বলছে। বারবার বলছেন অরণ্য শাহ্ তাকে ডাকছে।”
মেহেরুন্নেসা আর বাইজিদ দুজনেই মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে। বাইজিদ ঠান্ডা গলায় বললো,

“কারাগারের দরজা বন্ধ করে রাখো। এসব নিয়ে হুলুস্থুল বাঁধাবে না। পাত্তা দেওয়ার দরকারও নেই”
“জি শাহজাদা।”
“পাহারা দ্বিগুণ করো। কেউ তার কাছে যাবে না।”
প্রহরী ইতস্তত করলো।
“যদি….”
বাইজিদ তাকে থামিয়ে দিল।
“সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো। সকালে দেখা যাবে।”
প্রহরী মাথা নত করে চলে গেল। মেহেরুন্নেসা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। রাতের আকাশ পরিষ্কার। অসংখ্য তারা ঝিকমিক করছে। বাইজিদ মেহেরুন্নেসার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বললো,
“মানুষের কর্মফল মানুষকে ভোগ করতেই হয়।

মেহেরুন্নেসা কোনো উত্তর দিল না। চন্দ্রার জন্য তার মায়া হচ্ছে না। আবার পুরোপুরি ঘৃণাও করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত মেয়েটা নিজের জীবনটা নিজেই ধ্বংস করেছে। কিছুক্ষণ পর তারা নিজেদের কক্ষে ফিরে এলো। জান্নাত, সাহারা আর শাখা তিনজনই তখন ঘুমিয়ে। সারাদিনের ভয় আর ক্লান্তিতে বাচ্চাগুলো একেবারে অবসন্ন। সাহারা ঘুমের মধ্যেও মেহেরুন্নেসার ওড়না আঁকড়ে ধরে আছে। মেহেরুন্নেসার বুকটা ভারি হয়ে গেল। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বাইজিদ একে একে তিনজনের গায়ে চাদর টেনে দিল। তারপর জান্নাতের কপালে চুমু খেল। যুদ্ধের ময়দানে হাজার সৈন্যের সামনে যে মানুষটা পাথরের মত কঠিন হয়ে দাড়ায়, সেই মানুষটার চোখে এই তিনটি মেয়ের জন্য কত্ত কোমলতা।
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখলো।নঅল্প সময়ের মধ্যেই তিনটি শিশুর মাঝখানে শুয়ে পড়লো বাইজিদ। সারাদিনের যুদ্ধ, কয়েক রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি। চোখ বন্ধ হতেই ঘুম তাকে গ্রাস করে ফেললো। কক্ষে প্রদীপের ক্ষীণ আলো জ্বলছে।

মেহেরুন্নেসা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।
তারওর আলগোছে শুয়ে পড়লো মেয়েদের পাশে। রাত তখন মধ্য। ঘুম ভাঙলো মেহেরুন্নেসার। কক্ষে আলো বলতে ছোট দুইটা প্রদীপ। ফের ঘুমানোর চেষ্টা করার আগে মেয়েদের দিকে তাকালো। কিন্তু বাইজিদ নেই বিছানায়। মেহেরুন্নেসা চট করে উঠে বসে। গোটা কক্ষে কোথাও দেখা যা না বাইজিদ কে। তাহলে সে যা সন্দেহ করছে তা ঠিক না তো?
মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। রাত আরও গভীর হয়েছে। প্রাসাদের অধিকাংশ প্রদীপ নিভে গেছে। দূরে পাহারারত সৈন্যদের ছায়া দেখা যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা কাউকে কিছু না বলে আস্তাবলের দিকে হাঁটলো।
আস্তাবলে ঢুকতেই একটা বাদামি ঘোড়া মাথা তুলে তাকালো।বসে আলতো করে ঘোড়াটার গলা চাপড়ে দিল। তারপর নিজেই জিন কষে নিল।
একজন ঘুমজড়ানো প্রহরী অবাক হয়ে বললো,

“বেগম সাহেবা?”
মেহেরুন্নেসা শুধু বললো,
“দরজা খোলো।”
প্রহরী দ্বিধায় পড়লেও আদেশ মানলো। ভারী ফটক ধীরে ধীরে খুলে গেল। পরমুহূর্তেই ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসল মেহেরুন্নেসা। চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা সাহাবাদের রাস্তায় ঘোড়াটা ছুটে চললো। কোথায় যাচ্ছে সে? সেটা শুধু মেহেরুন্নেসাই জানে। তার মনে জেগে ওঠা অদ্ভুত প্রশ্নটার উত্তর আজ রাতেই তাকে খুঁজে বের করতে হবে।
রাত তখন অনেক গভীর। মশাল আর দূরের পাহারার শব্দ জানান দিচ্ছে যে রাজ্য এখনও জেগে আছে।নবাইজিদ যেন কিছু একটা লুকিয়েছে। অনেক বড় কিছু। এই অনুভূতিটা তাকে ছাড়ছে না। ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরে সে জঙ্গলের পথ ধরলো। রাতের জঙ্গল দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। উঁচু উঁচু গাছের ছায়া মাটিতে অদ্ভুত সব আকৃতি এঁকে রেখেছে।

ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দূরে কোনো বন্য প্রাণীর গর্জন। আর মাঝেমধ্যে শুকনো পাতার ওপর ঘোড়ার খুরের শব্দ। মেহেরুন্নেসার গা ছমছম করছিল। তবুও সে থামলো না।
একসময় উত্তরের সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদটা চোখে পড়লো। চাঁদের আলোয় বিশাল অট্টালিকাটাকে যেন আরও রহস্যময় লাগছে। প্রাসাদের দেয়ালজুড়ে লতাপাতা। অনেক জানালা ভাঙা।
কোথাও কোথাও ছাদ ধসে পড়েছে। মেহেরুন্নেসা ঘোড়াটা বাইরে বেঁধে ভেতরে ঢুকলো। দরজা ঠেলতেই কড়কড় শব্দ হলো। মনে হলো বহু বছর কেউ এখানে প্রবেশ করেনি। ভেতরে ধুলোর আস্তরণ। মাকড়সার জাল, পুরনো আসবাব। প্রদীপ জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো সে।
একটার পর আরেকটা ঘর দেখতে লাগলো। হঠাৎ একটা দেয়ালে চোখ আটকে গেল। সেখানে ঝুলছে একটা বিশাল প্রতিকৃতি।

“অরণ্য শাহ্।”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
ছবির মানুষটার চোখ যেন জীবন্ত। সেই চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি জেগে উঠলো। সে আরও এগিয়ে গেল। প্রাসাদের একেবারে ভেতরের দিকে ছোট্ট একটা কক্ষ। কক্ষটা অন্যগুলোর মতো নয়।
মনে হচ্ছে কেউ কখনো এখানে আসত। এক কোণে একটা পুরনো কাঠের সিন্দুক। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে ঢাকনাটা তুললো। ভেতরে কয়েকটা পুরনো দলিল। কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফুল। আর একটা কাপড়ে মোড়ানো বস্তু। কৌতূহলী হয়ে কাপড়টা সরাতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। একটা আঁকা ছবি। কিন্তু এটা কোনো রাজকীয় প্রতিকৃতি নয়। এটা যেন তাড়াহুড়ো করে আঁকা। একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে। মুখে দাড়ি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। মেহেরুন্নেসার হাত কেঁপে উঠলো। ছবিটা অবিকল সেই লোকটার মতো…যে নিজেকে অরণ্য শাহ্ বলে পরিচয় দিয়েছিল।
আরও অদ্ভুত ব্যাপার ছবির নিচে খুব ছোট করে কিছু লেখা।বকিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখাগুলো প্রায় মুছে গেছে। মেহেরুন্নেসা আর দেরি করলো না। ছবিটা কাপড়ে মুড়ে নিজের কাছে রাখলো।
তার মনে হচ্ছিল, এই ছবির মধ্যেই হয়তো কোনো উত্তর লুকিয়ে আছে। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো মানুষের কণ্ঠস্বর। মেহেরুন্নেসা মুহূর্তেই সজাগ হয়ে উঠলো। এত রাতে এখানে কে? কণ্ঠগুলো ক্রমশ কাছে আসছে। একজন নয় কয়েকজন। সে দ্রুত প্রদীপ নিভিয়ে দিল। তারপর ঘরের পাশের ভাঙা দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে কয়েকটা মশালের আলো করিডোরে ভেসে উঠলো। চারজন লোক। সবাই কালো চাদরে মোড়া। তাদের একজন বললো,

“ আজও যদি না পাওয়া যায় তাহলে খবর পাঠাতে হবে।”
আরেকজন ফিসফিস করে উত্তর দিল,
“ধৈর্য ধরো। এত বছর অপেক্ষা করেছি। আর কয়েকদিনও পারবো।”
মেহেরুন্নেসার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো।
লোকগুলো সেই ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে।
একজন মশাল উঁচু করলো। তারপর বললো,
“কতগুলো লাশ হবে রে? চারজনে নিতে পারবো তো?”
আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে গেল। লোকগুলোর নেতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললো
“চল দেখি। না হয় আরেক বার আসতে হবে। দুইবারে নিতে হবে”
চাঁদের আলো ভাঙা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে লাগলো। লোকগুলো চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই সে নিজেকে আরও ভালো করে আড়াল নিল।

অপেক্ষা করলো অল্প সময়। তারপর নিঃশব্দে তাদের পিছু নিল। উত্তরের প্রাসাদের পেছনে একটা সরু পথ আছে। দিনের আলোতেও যেখানে খুব কম মানুষ যায়। রাতের অন্ধকারে পথটা আরও ভয়ংকর লাগছে। চারজন লোকের হাতে মশাল। তাদের পেছনে আরও কয়েকজন যোগ দিয়েছে। মেহেরুন্নেসা দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে চললো। একবারও সাহস করলো না খুব কাছে যেতে। কিছুদূর গিয়ে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। জঙ্গলের গভীরে, ঝোপঝাড়ের আড়ালে সারি সারি পাথরের কবরের মতো কিছু দেখা যাচ্ছে। লোকগুলো সেদিকেই যাচ্ছে।
একজন নিচু হয়ে মাটি সরাতে লাগলো। আরেকজন ভারী একটা ঢাকনা তুললো। মেহেরুন্নেসার গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। ওগুলো কবর নয়? মাটির নিচে লুকানো ছিল লা”শ। একের পর এক মৃতদেহ বের করতে লাগলো তারা। কোনোটা বহুদিনের পুরোনো। কোনোটা তুলনামূলক নতুন। সাদা কাপড়ে মোড়ানো দেহগুলো কাঁধে তুলে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলো লোকগুলো। মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ। মাথার ভেতর হাজার প্রশ্ন। এত লাশ কার? এগুলো এখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কেন? আর এখন হঠাৎ সরানো হচ্ছে কেন? ভয় আর কৌতূহল তাকে আরও সামনে টেনে নিয়ে গেল।
জঙ্গল শেষ হতে না হতেই দূরে নদীর গর্জন শোনা গেল। লোক গুলোর পিছনে মেহেরুন্নেসা ও। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল জাহাজ। চাঁদের আলোয় কালো অবয়বটা যেন অন্ধকারেরই অংশ। মেহেরুন্নেসা জাহাজটাকে চিনতে পারলো। এই জাহাজ। এই অদ্ভুত জাহাজটাই তো সে বহু বছর আগে দেখেছিল।
যে জাহাজে সব দলিলপত্র পেয়েছিল, বন্দি চিকিৎসকদের দেখেছিল। তার বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল। লোকগুলো একে একে লাশগুলো জাহাজে তুলতে লাগলো। কেউ কোনো কথা বলছে না। সবকিছু হচ্ছে নিঃশব্দে।

ঠিক তখনই জাহাজের ওপর একটা অবয়ব দেখা গেল। মেহেরুন্নেসা চোখ কুঁচকে তাকালো। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। যে যুবককে বাইজিদ সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, অরণ্যের ছদ্মবেশে এতদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। সেই যুবক।
সে জাহাজের লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
চাঁদের আলোয় তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
লোকগুলো তাকে দেখেই মাথা নত করলো।
যুবকটি নিচে তাকিয়ে কিছু নির্দেশ দিল।
তার কণ্ঠস্বর মেহেরুন্নেসার কানে স্পষ্ট পৌঁছালো না। কিন্তু এতটুকু বোঝা গেল এখানে তার যথেষ্ট কর্তৃত্ব আছে। মেহেরুন্নেসার কপালে ঘাম জমলো।
বাইজিদ কি তাহলে আবারও কিছু লুকিয়েছে?
এই জাহাজ এখনও চলছে কেন? এই লাশগুলো কোথা থেকে এলো? আর সেই বিদেশি যুবক এর সঙ্গে এসবের সম্পর্ক কী? প্রশ্নের পর প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে। ঠিক তখনই জাহাজের ডেক থেকে যুবকটি হঠাৎ নদীর পাড়ের দিকে তাকালো। মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো। মনে হলো সে যেন সরাসরি তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

সে ঝোপের আড়ালে নিচু হয়ে বসে পড়লো।
কিছু সময় এমনেই কেটে গেল।
নদীর বাতাস বইছে। আবার ভেসে এলো মানুষের পায়ের শব্দ। এখনকার শব্দটা জাহাজের দিক থেকে নয়, তার ঠিক পেছন থেকে আসছে। মনে হচ্ছে, কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে খুব কাছে।
এতটাই কাছে যে মেহেরুন্নেসা তার নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শুনতে পেল। শরীরটা ঝাকুনি দিয়ে কেঁপে উঠলো। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ। চাঁদের আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা কয়েক মুহূর্তের জন্য আহম্মক বনে গেল। তারপর ফিসফিস করে বললো,
“আপনি!”
বাইজিদ ফিচলে হাসলো।
“আর কাকে আশা করেছিলে?
মেহেরুন্নেসা আবার নদীর দিকে তাকালো। জাহাজটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ডেকের ওপর সেই যুবকটাও।
“আপনি আমাকে অনুসরণ করেছেন?”
“তুমি যখন মাঝরাতে একা ঘোড়া নিয়ে বের হও, তখন না অনুসরণ করে উপায় থাকে? তাছাড়া তুমি নিজেও তো আমদয় অনুসরণ করেই এখানে এসেছো”
মেহেরুন্নেসা এবার সরাসরি প্রশ্ন করলো

“সত্যি করে বলুন। ওটা কে? আর এই লাশগুলো কোথা থেকে এলো আর ওই ছেলেটা? ও কি সত্যিই অরণ্য নয়?”
বাইজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর মেহেরুন্নেসার কাঁধে হাত রাখলো।
“অযথা সন্দেহ করো না, মেহের। ও অরণ্য নয়।
আমি আগেও বলেছি। এখনও বলছি। ওদের চেহারার মিল আছে, এতটুকুই”
মেহেরুন্নেসা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাইজিদ তাকে থামিয়ে দিল।
“তুমি কিন্তু জানো আমি তোমার কাছে কিছু লুকাই না মেহের। চলো।
“কোথায়?”
“পাহাড়ে।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হলো।
“এত রাতে?”
বাইজিদ মুচকি হাসলো।
“চলো রাতটাকে সুন্দর করা যাক”
এরপর আর কোনো কথা বললো না সে। ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। মেহেরুন্নেসাও বাধ্য মেয়ের মতো তার পাশে হাঁটলো। বেশ অনেকক্ষণ পর তারা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালো।
চারদিকে বাতাস বইছে। নিচে নদী রুপালি ফিতার মতো বয়ে চলেছে। দূরের জঙ্গল কালো সমুদ্রের মতো বিস্তৃত। মাথার ওপরে পূর্ণিমার চাঁদ। পাহাড়ের কিনারায় পাশাপাশি বসলো তারা। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বললো না।
বাইজিদ ই আগে বললো,

“জানো মেহের…তোমাকে দেখার পর বুঝেছি, আগে কখনও সত্যিকারের বসন্তই দেখিনি”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ শুনতে লাগলো।
“গোটা জীবনের সমস্ত প্রেম তোমায় ঢেলে দিলেও তা কম পড়ে যাবে প্রিয়া।”
মেহের আলগোছে মাথা রাখলো বাইজিদ এর কাধে। পাহাড়ের চূড়ায় নরম বাতাস বইছে। নিচে নদীর কালো জল চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে। চারপাশ এত শান্ত যে দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বাইজিদের কাঁধে মাথা রেখে নানা চিন্তায় মগ্ন মেহের। মনটা শান্ত হচ্ছে না। অনেকক্ষণ ধরেই প্রশ্ন মাথায় ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু এই সুন্দর মুহূর্ত টা নষ্ট করা কি ঠিক হবে? অবশেষে সে মাথা তুলে তাকালো।
“একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“করো।”
“সত্যি করে উত্তর দিবেন?”
বাইজিদ মুচকি হাসলো।
“কখনও মিথ্যে দিয়েছি বুঝি?”
মেহেরুন্নেসা চোখ সরু করলো। এই হাসি সে চেনে। বাইজিদ যখন কোনো বিষয় এড়িয়ে যেতে চায় তখন এমনই হাসে।

“মাহাদি কোথায়?”
বাইজিদের হাসিটা মিলিয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা এবার আরও কাছে সরে এলো।
“উত্তর দিন।”
“আমি কী করে জানবো?”
“এবার কিন্তু আপনি মিথ্যা বলছেন শাহজাদা”
একদম নির্লিপ্ত গলায় বললো মেহেরুন্নেসা।
বাইজিদ কপাল কুঁচকালো।
“মিথ্যা কেন হবে? আমি সত্যিই জানি না”
“কারণ গত পরশু আমি নিজে আপনাদের কে দেখেছি একসাথে।”
বাইজিদের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল মেহেরুন্নেসা, কথাটা ঠিক জায়গায় লেগেছে। বাইজিদ ইষৎ ভ্রু বাকিয়ে বলল
“কাদের?”
“আপনাদের। আপনি আর মাহাদি।”
বাইজিদের চোখে বিস্ময় খেলে গেল। চোখ সরু করে বলল
“কোথায়?”
“জঙ্গলের ভেতর। একটা তাবুর কাছে।”
এবার সত্যিই বাইজিদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। মেহেরুন্নেসা বিজয়ীর মতো বললো,

“এবার বলেন।”
বাইজিদ মুখ ফিরিয়ে নদীর দিকে তাকালো।
“আজকাল তুমি একটু বেশিই কিছু দেখো। এত বেশি দেখা উচিত না মেহের”
মেহেরুন্নেসা এবার দুই হাত গুটিয়ে বসল।
“আজ না বলে কোথাও যেতে পারবেন না।”
বাইজিদ সামান্য ধমকে উঠে
“মেহের…”
“লাভ নেই শাহজাদা। আজ আর আপনি এড়িয়ে যেতে পারছেন না। আমার অগোচরে মাঝরাতে জঙ্গলের মধ্যে মাহাদির সাথে নিশ্চই এমনি এমনি দেখা করতে যান নি? আর সেই তাবু কে ফেলেছিল শাহজাদা?”
তার জেদের সঙ্গে বাইজিদ বহু বছর ধরেই পরিচিত। একবার কোনো বিষয়ে আটকে গেলে তাকে সরানো প্রায় অসম্ভব। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বাইজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

“হ্যাঁ। দেখা হয়েছিল।”
মেহেরুন্নেসার চোখ চকচক করে উঠলো।
“আমি জানতাম! তার পর থেকে বলেন”
“এত খুশি হওয়ার কিছু নেই।”
“তারপর?”
“তারপর আর কি? কথা হয়েছে। তো আমরা মেয়েছেলে নাকি যে অন্য কিছু করবো?”
মেহের ঠোঁট টিপে হাসলো
“আচ্ছা। তা কী কথা হলো?”
“সব কথা তোমাকে বলা যাবে নাকি? পুরুষদের কত জরুরি আলাপ থাকে তুমি জানো?”
মেহেরুন্নেসা অসন্তুষ্ট মুখে তাকিয়ে রইলো।
“আপনারা দুজন কী বুদ্ধি করছেন? সত্যি করে বলুন”
বাইজিদ হালকা হেসে মাথা নাড়লো।
“তোমার ধারণা দেখছি আমাদের চেয়ে ভয়ংকর।”
“তাহলে বলেন নাআআ”
“মেহের আমি সত্যিই জানি না মাহাদি এখন কোথায়।”
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকালো। বাইজিদ পিছনে হাতে ভর করে হেলান দিয়ে বলল
“সেদিন দেখা হয়েছিল। তারপর সে চলে গেছে।”
“কোথায়?”

বাইজিদ বিরক্ত হয়ে বলল
“বলেনি। জানি না আমি। আর আমি জিজ্ঞেসও করিনি।”
মেহের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সাহসী কথা খানা বলেই ফেলল
“সে বেঁচে আছে?”
বাইজিদ সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালো।
চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো অদ্ভুত দীপ্তি ছড়াচ্ছে।

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৬

“তুমি খুব বেশি প্রশ্ন করো। চলো মেয়েরা একা আছে”
মেহেরুন্নেসার হাত ধরে নেমে যায় পাহাড়ের গা বেয়ে। হাত দিয়ে ইশারা করে কাওকে চলে যেতে। জাহাজ এর শিঙ্গার শব্দ পাওয়া যায়। বাইজিদ এক কুটিল হাসি দিয়ে মেহেরুন্নেসা কে জড়িয়ে ধরে……!

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here