Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৫

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৫

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৫
জান্নাতুল ফেরদৌ

বিশ্বাসঘাতকতা কে পাল বানিয়ে পরাজয় এর নৌকা এসে ভিড়লো সাহাবাদ এর ময়দানে। যুদ্ধ ক্ষেত্র কে মনে হচ্ছে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা একটা জনশূন্য প্রান্তর। ধুলোয় আকাশ ধূসর হয়ে গেছে। আহত ঘোড়ার করুণ ডাক, সৈন্যদের কাতর গোঙানি তে গুলিয়ে উঠছে মেহেরুন্নেসার দেহ। নিজেও বিন্দু মাত্র শক্তি পাচ্ছে না। বাইজিদ এক হাঁটু মাটিতে ঠেকিয়ে বসে আছে। হাতে এখনও তরবারি, কিন্তু সেটা তোলার শক্তি নেই। মিরানের অবস্থাও একই। জাহরা নিজের ঘোড়ার কেশর আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। এক এক করে সবাই শক্তিহীন হয়ে পড়ছে।
চন্দ্রা আবিদের সামনে এসে বসে পড়লো। কুটিল হাসি টেনে বলল

“গর্ভে সন্তান ধরিয়ে দিয়ে আমায় আটকাতে পারবে ভেবেছিলে নায়েব? মনে রেখো আমি চন্দ্রপ্রভা। আমি পরিত্যক্ত অমানিশা, কলঙ্কিনী চাঁদ। আমাকে সম্পর্কের শিকলে বাধা অসম্ভব। আমি কেবল এই পরিবারে ঢুকতে এবং ভিনদেশী চিকিৎসক দের রত্নার অজুহাতে এদেশে আনবো বলে অসংখ্য খু”ন করেছি। কিন্তু শেষ মূহুর্তে তুমি আর মেহে….ওওওও দুঃখিত দুঃখিত, সম্রাজ্ঞী। তুমি আর তোমার ওই ভিখিরি সম্রাজ্ঞী মিলে আমায় অঙ্কুরের থেকে দূরে করতে চাইলে। ধরে বেধে বিয়ে দিয়ে দিলে।”
আবিদের গাল চেপে ধরে চন্দ্রা।
“মরার আগে শুনে রাখ নায়েব। চন্দ্রা আজীবন অঙ্কুরের। সে অঙ্কুরের ই থাকবে।”
আবিদ আহত অবস্থা তেও ফিচেল হাসে। টেনে টেনে বলে
“কি নিদারুণ অংক শেখালে, নিজেকে অন্যের সাথে যোগ করে নিলে। আমাকে বিয়োগ করে ফলাফল শূন্য দেখালে”
মেহেরুন্নেসার সইছে না এ দৃশ্য। কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালো। শরীরও কাঁপছে। তবুও সে চন্দ্রার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“চন্দ্রা…”

চন্দ্রা মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। মেহেরুন্নেসার গলায় কান্না আটকে আসছে।
“তোমাকে আর আপা বলতে ইচ্ছা করছে না। সব ভুল আমার। সেদিন যদি ভাইজান তোমায় মেরে ফেলতো, তাহলে আর আজ এই দিন দেখতে হতো না সাহাবাদ এর। ভুল আমার ই। কেন বাঁচিয়েছি তোমায়? তোমার মত বেইমান কে কেন বাঁচালাম আমি?
চন্দ্রার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। মেহেরুন্নেসা আবার বললো,
“এদের দিকে তাকাও, দেখো। এরা সবাই তোমার পরিচিত মানুষ, তোমার আপন মানুষ। তুমি আমাদেরই একজন। ভুলে গেছো?
কিন্তু চন্দ্রার চোখের দৃষ্টি নরম হলো না একটুও।
বরং সে বললো,
“অনেক দেরি হয়ে গেছে, মেহেরুন্নেসা। আমি অনেক দিন হলো তোমাদের একজন সেজে ছিলাম, কিন্তু তোমাদের ছিলাম না।”

মেহেরুন্নেসা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো। আবিদ এর গোঙানি ক্রমশ কমে আসছে।
মেহেরুন্নেসা হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো আবিদের সামনে। কাতর কন্ঠে বলল
“আবিদ! আবিদ উঠুন। আবিদ শুনতে পাচ্ছেন? আপনি চোখ বন্ধ করবেন না খবরদার। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। আপনাকে আমিই বিবাহ দিয়েছি এই ঘাতকিনীর সাথে। আপনি হার মানবেন না আবিদ। উঠুন”
উন্মাদ এর মত চিৎকার করে ডাকতে থাকে মেহেরুন্নেসা। আবিদ এর ওঠার শক্তি নেই।শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। শেষ শক্তিটুকু খাটিয়ে কাঁপা গলায় বলল
“চরম বিশ্বস্ত সেজে ঘাতকতা করা ঘাতক গুলোর, অপঘাতে মৃত্যু হোক”
পেছন থেকে ধীর পায়ের শব্দ শোনা গেল।
মারজান এগিয়ে এলো এমন ভঙ্গিতে, যেন বহুদিনের প্রতীক্ষিত বিজয় অবশেষে তার হাতে ধরা দিয়েছে। তার মুখে অদ্ভুত হাসি।
“খুব সুন্দর দৃশ্য।”
চারপাশে তাকালো সে।
“সাহাবাদের বীরেরা মাটিতে পড়ে আছে। এমন দৃশ্য দেখার জন্যই তো এত আয়োজন। কি বলো চন্দ্র?”
চন্দ্রা হাসলো। মারজান চন্দ্রার থুতনি স্পর্শ করে সেই হাত এনে চুমু খেলো।
“লক্ষী মেয়ে। শোনো চন্দ্র”
“জি আম্মা”

“আমি শোবার ঘরে যাচ্ছি। এগুলোকে তারাতাড়ি শেষ করে আমার কাছে এসো সোনা। একসাথে খাবো।”
বাইজিদের চোখে জ্বলে উঠলো ক্রোধে। মারজান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। হঠাৎ দূরে কোথাও অশ্বের ক্ষিপ্র খুরের শব্দ ভেসে এলো। সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল পূর্ব দিগন্তের দিকে। ধুলো উড়ছে।
প্রচুর ধুলো। অঙ্কুরও তাকালো। মারজানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। ধুলোর পর্দা ভেদ করে ধীরে ধীরে কয়েকটা অশ্বারোহীর অবয়ব দেখা গেল।
কিন্তু এরা কারা?বতাদের পোশাক অদ্ভুত। কালচে ধূসর বর্ম। দীর্ঘ চাদর। মুখের অর্ধেক ঢেকে রাখা ধাতব মুখোশ। কারও কোমরে বাঁকা ছুরি, কারও পিঠে অচেনা অস্ত্র। সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তাদের পতাকা। সাহাবাদের নয়, মিশরেরও নয়। এ তো অঙ্কুরেরও নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত কেউ সেই পতাকা আগে দেখেনি।
ধীরে ধীরে দলটা কাছে আসতে লাগলো। অঙ্কুরের সৈন্যরাও অস্থির হয়ে উঠলো। বাইজিদ, সুনেহেরা মেহেরুন্নেসা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো সেই রহস্যময় অশ্বারোহী দলের দিকে।
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। লাল আলো পড়ে আছে যুদ্ধক্ষেত্রজুড়ে। সেই বাহিনী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই বোঝা গেল এরা যোদ্ধা নয়। তাদের গায়ে অদ্ভুত লম্বা পোশাক। হাতে চামড়ার থলে।নপিঠে কাঠের বাক্স। আর কেউ না চিনলেও জাহরা প্রথমেই চিনে ফেললেন। উৎফুল্ল হয়ে বলল
“বাইজিদ দেখো, এরা মিশরের চিকিৎসক দল!”

বাইজিদের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। মিশরের বাহিনীর সঙ্গে যে বিশেষ চিকিৎসক দল এসেছিল, যুদ্ধের শুরুতে তারা অনেক পেছনে অবস্থান করছিল। এতক্ষণে তারা পৌঁছেছে। চিকিৎসকদের নেতা ঘোড়া থেকে নেমেই চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলো। মাটিতে পড়ে থাকা সৈন্যদের দেখলো। কয়েকজনের নাড়ি পরীক্ষা করলো। তারপর চোখ সরু করে অঙ্কুরদের দিকে তাকালো।
তারা থলের ভেতর থেকে গোলাকার কয়েকটি বস্তু বের করলো। অঙ্কুরের সৈন্যরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেগুলো ছুড়ে মারা হলো তাদের মাঝখানে। মাটিতে পড়েই বস্তুগুলো ফেটে গেল।
তারপর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো ঘন হালকা নীলচে ধোঁয়া। চোখ জ্বালা করতে শুরু করলো। অঙ্কুরের সৈন্যরা চিৎকার করে উঠলো।
এ এক প্রকার বিস্ফোরক। যা তে মেশানো ছিলো আরও কিছু রাসায়নিক দ্রব্য যাতে তাদের চোখের পীড়া শুরু হয়। অনেকেই চোখ চেপে ধরে বসে পড়লো।

অঙ্কুর নিজেও চোখ মেলতে পারছে না। চন্দ্রা কাশতে কাশতে পিছিয়ে গেল। ওদিকে চিকিৎসকরা দ্রুত নিজেদের সৈন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লো। তারা ছোট ছোট ধাতব পাত্র বের করলো। সেই পাত্রে থাকা তিক্ত গন্ধের তরল একে একে সবাইকে খাওয়াতে লাগলো। বাইজিদ কেও খাওয়ালো। মাথার ভার কমতে শুরু করলো।
জাহরা গভীর শ্বাস নিলেন। অনেক সৈন্য আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
শরীর এখনও দুর্বল। কিন্তু আগের মতো নয়।
মেহেরুন্নেসার চোখে আশার আলো ফুটলো।
এদিকে ধোঁয়াও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগলো। অঙ্কুরের সৈন্যরা বিশৃঙ্খল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রা দ্রুত অঙ্কুরের কাছে ছুটে গেল।
“ভয় নেই। আমি আছি তো। আবার আক্রমণ করলে আমরা…
কথা শেষ করতে পারলো না চন্দ্রা। অঙ্কুর কষে একটা চড় মারলো তার বাম গালে।
“তুই আছিস মানে? অঙ্কুরের এত খারাপ দিন কখনোই আসবে না যে তোর মত পতি”তা নারীর সাহায্য নিতে হবে।”

চন্দ্রা বিষ্ময়ে বড় বড় করে তাকালো। অঙ্কুর হাসলো।
“তোর আর প্রয়োজন নেই আমাদের। যাহহ, বিদেয় হ”
চন্দ্রার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো।
“আমি তো তোমার জন্য…”
অঙ্কুর হেসে উঠলো। তাচ্ছিল্যের হাসি
“আমার জন্য? তুই এতকাল যা করেছিস কেবল নিজের নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিস। আজ সাহাবাদ এর পিঠে ছুড়ি মেরেছিস। কাল আমাকে মারবি না ভরসা কি? আর তুই সত্যিই ভেবেছিলি আমি তোকে ভালোবাসি?”
চন্দ্রার ঠোঁট কেঁপে উঠলো।
“অঙ্কুর…”

“আরে আমি শুধু ব্যবহার করেছি তোকে। তুই ছিলে একটা উপায়। সাহাবাদের ভেতরে ঢোকার রাস্তা।”
চন্দ্রার চোখ ভিজে উঠলো। অঙ্কুর নির্মম স্বরে বলেই চললো,
“আজ যদি অন্য কাউকে ব্যবহার করতে সুবিধা হতো, তাকে ব্যবহার করতাম। তুই তো বিশেষ কেউ ছিলি না।”
চারপাশের শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেল। চন্দ্রা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এত বছরের বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র এত বছরের অপেক্ষা সবকিছুর শেষে সে জানতে পারলো, যার জন্য সে সব হারিয়েছে, সেই মানুষটার কাছে তার মূল্য ছিল কেবল একটা হাতিয়ার। একটা ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র। তার বেশি কিছু নয়।
মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো। সেই মুহূর্তে চন্দ্রার জন্য একফোঁটা করুণাও জন্ম নিল।বকারণ যে মানুষ অন্যের সুখ ধ্বংস করতে গিয়ে নিজের জীবনটাকেই ধ্বংস করে ফেলে, তার পরিণতি এর চেয়ে ভয়াবহ আর কী-ই বা হতে পারে?

মিশরীয় চিকিৎসকদের দেওয়া ওষুধ কাজ করতে শুরু করেছে। সৈন্যরা কিছুক্ষণ আগেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। আলহামদুলিল্লাহ তারা সুস্থ অনুভব করঋে। বাইজিদ সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
সুনেহেরা নিজের তরবারি প্রস্তত করলো।
জাহরা ঘোড়ার পিঠে উঠে সৈন্যদের পুনরায় সারিবদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন।
অঙ্কুরের বাহিনী সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল।নধোঁয়ার কারণে তাদের সারি ভেঙে গেছে। অনেকেই দিক হারিয়ে ফেলেছে। বাইজিদ তরবারি উঁচিয়ে গর্জে উঠলো,
“দল, আক্রমণ”
নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লো সবাই। বাইজিদ এর দল ডান দিক দিয়ে আঘাত করলো। জাহরার অশ্বারোহীরা বাম দিক ভেঙে দিল। মাঝখান দিয়ে মেহের নিজে সৈন্য নিয়ে এগিয়ে গেল। অল্প সময়ের মধ্যেই অঙ্কুরের বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়লো। একের পর এক সৈন্য অস্ত্র ফেলে দিল। হাঁটু গেড়ে বসে আত্মসমর্পণ করলো। সূর্য তখন প্রায় অস্ত গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ের দিক বদল হচ্ছে । অঙ্কুরকে ঘিরে ফেললো সাহাবাদের সৈন্যরা। তার হাতে আর অস্ত্র নেই। মুখে ধুলো চোখে আতঙ্ক। বাইজিদ ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চারিদিকে পালানোর পথ নেই। অঙ্কুর ভালো করেই জানতো যে বাইজিদ এর সাথে জেতা অসম্ভব। তাই ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলো। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। কেনল সৈন্য দল ভারি করলেই হয় না। তাদের প্রশিক্ষিত করতে হয়। অঙ্কুর আচমকা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।

“আমাকে ক্ষমা করে দে বাইজিদ। আমি ভুল করেছি! আমি…আ..আমি রাজ্য ছেড়ে চলে যাব!
আর কোনোদিন ফিরবো না। শুধু প্রাণটা দয়া করে রেখে দে”
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা ঘৃণাভরে তাকিয়ে রইলো। একটু আগেই নিজেকে বিজয়ী ভাবছিল,
এখন প্রাণভিক্ষা চাইছে। বাইজিদ নির্বিকার চোখে তাকিয়ে রইলো। তখনই অঙ্কুর হঠাৎ হাত তুলে চন্দ্রার দিকে ইশারা করলো।
“ সব আমার দোষ নয়! ওর কথায় করেছি সব বিশ্বাস কর। ও-ই পরিকল্পনা দিয়েছে! ও-ই খবর এনে দিয়েছে! ও বুদ্ধি দিয়েছে কীভাবে সাহাবাদকে ভাঙতে হবে! কারণ ওর রাজত্ব দরকার ছিল”
চন্দ্রা যেন বজ্রাহত হয়ে গেল।
“অঙ্কুর!”
অঙ্কুর মরিয়া হয়ে বললো,
“ আমি একা নই! শাস্তি দিতে হলে ওকে দে। সব নষ্ট করেছে ও! তোর মা কে দে শাস্তি। ও বড় অপরাধী। বাইজিদ… বাইজিদ শোন..”
বাইজিদ শীতল কন্ঠে বলল
“ মা পাবো কোথায়? মা কে ও তো তুই ই হত্যা করেছিস”
অঙ্কুর ছটফটে মুখে বলে উঠলো।
“এটাও চন্দ্রা করেছে। জিজ্ঞেস কর কে মেরেছে মাইমুনা শেখ কে। এখন এসব বলে লাভ নাই চন্দ্রা। স্বীকার কর সবটা”

অঙ্কুরের চোখে শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা।
চন্দ্রা হঠাৎ হেসে উঠলো। একটা ভাঙা, অসহায় হাসি দিয়ে বলল
“আমি কী বোকা ছিলাম। আমি মেহেরুন্নেসার সুখ দেখে হিংসা করেছি? নিজের জীবনটা নিজেই নষ্ট করেছি। আর যার জন্য সব করলাম….”
সে অঙ্কুরের দিকে তাকালো।
“সে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেনি। উল্টো আমি সব হারিয়েছি… সব…”
যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই মাথা নিচু করে ফেললো। চন্দ্রার অপরাধ কেউ ভুলতে পারবে না। কিন্তু তার পরিণতিও ছিল করুণ। অঙ্কুর তখনও নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইছে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে।চন্দ্রা দাঁড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ একা। বহু বছরের ভুল সিদ্ধান্ত, হিংসা আর প্রতিশোধের আগুন তাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তার পাশে আর কেউ নেই।
ঘোড়ার ধুপ ধুপ আওয়াজ চোনা যায় কয়েকজন সৈন্য পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ালো। সবার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেল। একটি কালো ঘোড়া ধীরগতিতে এগিয়ে আসছে। ঘোড়ার পিঠে বসে আছে এক যুবক। তাকে আগে কেউ এখানে দেখেনি। লম্বা দেহ প্রশস্ত কাঁধ গাঢ় রঙের বিদেশি পোশাক। কোমরে অদ্ভুত নকশার তরবারি। চোয়ালজুড়ে ঘন দাড়ি। চোখ দুটো গভীর ও তীক্ষ্ণ। যুবকটি ঘোড়া থামিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এলো। তাকে দেখেই অঙ্কুরের মুখের রং মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

“না। না না না এটা অসম্ভব”
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। যুবকটি সামনে এগিয়ে এলো। তারপর বাইজিদের সামনে এসে মাথা নত করলো।
“ সালাম, বড় শাহজাদা।”
বাইজিদের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো।
“অনেক দেরি করলি।”
যুবকটিও হাসলো।
“সেনাপ্রধান কে বিদায় জানিয়ল তবেই এলাম”
মাহাদির বিষয়ে শুনতেই সুনেহেরার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। আসলেই তো। সেই যে সবাই ঢলে পড়লো তার পর থেকে তো মাহাদির খোঁজ ই নেই। এই লোকটা কোথায় ছেড়ে এসেছে মাহাদি কে? কি বলছে?
চারদিকে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে। কে এই লোক? অঙ্কুরের মুখে আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে। হঠাৎ মিরান বলে উঠলো,

“তাহলে এতদিন…”
বাইজিদ সবার দিকে তাকালো।
“পরিচয় করিয়ে দিই। রাত বিরেতে বিভিন্ন জায়গায় যারা অরণ্যের অবয়ব দেখতে। এই সেই মানব। যাকে আমিরাবাদ থেকে এনেছিলাম অরণ্যের মত দেহগঠন হওয়ায়”
মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মিরানেরও যেন কথা হারিয়ে গেছে। বাইজিদ শান্ত কণ্ঠে বলতে লাগলো,
“জাহাজে যে অরণ্যকে দেখা গিয়েছিল… রাতের অন্ধকারে যে চন্দ্রার সামনে এসেছিল দুর্গের আশেপাশে যে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত, সব জায়গায় ছিল এই মানুষটা।”
চন্দ্রা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। যুবকটি এবার নিজের মুখের একাংশে থাকা চামড়ার আবরণ খুললো।
“আমার নাম আরসালান। পশ্চিমের সমুদ্রতীরের রাজ্য আমিরাবাদ থেকে এসেছি। বহু বছর আগে শাহজাদা বাইজিদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।
সে অঙ্কুরের দিকে তাকালো।

“ তারপর তিনি আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন।”
সকলের কথা বলার ব্যাস্ততার মধ্যেই অঙ্কুর ঘটিয়ে ফেলল এক বড়সর অঘটন। মাটিতে পড়ে থাকা তলোয়ার তুলে মারআে গেল জাহরা কে। কিন্ত সামনে এসে দাড়ালো মিরান। তীক্ষ্ণ তলোয়ারে এফোর ওফড় হয়ে গেল মিরানের দেহ। সবাই চমকে সেদিকে তাকালো। সাথে সাথে সেই তলোয়ার বের করে এনে ঢুকিয়ে দিলো জাহরার উদরে। মরণ গোঙানি বেড়িয়ে এলো জাহরার গলা চিড়ে। সৈন্য রা সাথে সাথে গিয়ে ধরলো তাকে। আটকানো হলো অঙ্কুরকেও। রক্তে ভেসে যাচ্ছে প্রাসাদের আঙিনা। এ যে বাইজিদ এর চরম হার। দ্রুত গিয়ে আগলে নিলো জাহরা কে
“জাহরা? জাহরা চোখ খোলো জাহরা। ইয়া রব এ কি হলো? আমি সম্রাট কে কি জবাব দিব? জাহরা?”
জাহরা মৃদু হাসে। রক্তাক্ত হাত খানা দিয়ে বাইজিদ এর গাল স্পর্শ করে। ঘোলাটে চোখ জোড়া বাইজিদ কে চাতকের মতো দেখতে থাকে

“গোটা জীবনটা তোমায় উৎসর্গ করতে চেয়েছিলাম বাইজিদ। সৃষ্টি কর্তা শুনে ফেলেছে। এক না এক ভাবে…আ..আমার জীবন তোমাতেই উৎসর্গ হলো। কথা ছিল সুন্দর এক বিকেল কাটাবো একসাথে। অথচ কাটালাম জীবনের শেষ মুহূর্ত। পরবর্তী প্রজন্ম কে বলে দিও। সাহাবাদ রাজ্যের সবুজাভ চোখের সেই সুদর্শন শাহজাদা, মিশরের রাজকুমারীর আজীবনের নিদ্রা হরণ করেছিলো। অত…অতঃপর সে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে তার কোলে”
শেষ কথা গুলো বলে চোখ নিভে গেল জাহরার। সৈন্যরা সব আহাজারি করতে লাগলো। বাইজিদ এর থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে গেল দ্রুত। লা’শ নিয়ে যেতে দুদিন লাগবে। দেরি করলে ফুলে যাবে। এসেছিলো বিজয় নিয়ে ফিরবে বলে। কিন্তু ফিরতে হলো রাজ্যের মুকুটের নিথর দেহ নিয়ে। অঙ্কুরের কারাগার থেকে মুক্ত করা হলো সব গুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানী কে। পাঠানো হলো সৈন্য দের সাথে। বৈশাখ এর প্রথম বৃষ্টিতে ভিজলো সাহাবাদ এর আঙিনা। ভিজলো আবিদের লাশ। ভিজলো রাজ্যের জন্য৷ আজীবন লড়ে যাওয়া এক লড়াকু নারী সৈনিক মিরানের লাশ। আরেক লাশ দাঁড়িয়ে পাথরের নেয়। যে সব হারিয়ে নিঃশ্ব।
অঙ্কুর হো হো করে হাসতে লাগলো। বাইজিদ এর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। ঝুম বৃষ্টি সাহাবাদ প্রাঙ্গনে। সব ভিজে একাকার। বাইজিদ তলোয়ার হাতে এগিয়ে গেলো অঙ্কুের দিকে। অঙ্কুর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল

“না না না না। আমি তোর হাতে মরবোই না। যাকে আমি ভালোবাসি সেই আমাকে মারুক। তুই সর। সর না। নূর! মারো আমাকে। শেষ করে দাও এই নরপিশাচ কে। হা হা হা হা। মারো নূর।”
মেহেরুন্নেসা ঘৃণা ভরা দৃষ্টি তে তাকিয়ে অঙ্কুর এর দিকে। অঙ্কুর পাগলের মত হাসে।
“তুই সর বাইজিদ। আমি নূরের হাতেই মরবো। তুই আমাকে ছুবি না। আমি শুধু নূর কে ভালোবাসি”
“আমার নাম মুখে নিবি না শয়তান।”
হুংকার করে ওঠে মেহেরুন্নেসা। অঙ্কুর হাসি থামিয়ে বলে
“যা সম্ভব না তা চেও না নূর। আমার গোটা জীবন ছলনায় ভর, কেবল তুমি সত্য। তুমিও আমায় ভালোবাসলে না। কেউ আমায় ভালোবাসলো না। আমি কি…..”

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৪

ঘাড় অর্ধেক হয়ে হেলে পড়লো অঙ্কুরের। পিছনে রক্তা”ক্ত তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে চন্দ্রা। চোখ মুখ একদম স্বাভাবিক। বৃষ্টির পানিতে র’ক্ত ধুয়ে চুইয়ে পড়ছে তলোয়ার থেকে। বাইজিদ এর হাতের তলোয়ার খসে পড়লো। সুনেহেরা ওই লোকটার পিছু পিছু চলে গেছে মাহাদির খোঁজে। খোঁজ মিলবে কিনা নিশ্চয়তা নেই। মেহেরুন্নেসা বসে পড়লো ধপ করে। বাইজিদ টানটান হয়ে শুয়ে পঠলো যুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়া শরীর টা নিয়ে। মেহেরুন্নেসা চোখের পলক ফেলছে না। এক দৃষ্টে চেয়ে আছে আবিদের লা”শের দিকে। হঠাৎ বাইজিদ কে উদ্দেশ্য করে বলল
“কবুল বলার পরমুহূর্তেই হাতে তলোয়ার তুলে দিলেন। অথচ আমি পুষ্পপ্রেমী ছিলাম।”

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here