Home নূর এ সাহাবাদ নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৪

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৪

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৪
জান্নাতুল ফেরদৌ

সকালের কুয়াশা এখন আবছা আবছা পড়ে। বৈশাখ এসে গেছে যে। দুর্গের উঠানে সারি সারি সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। সবাই বের হওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছে। বর্ম পরছে, তরবারির ধার পরীক্ষা করছে, ঘোড়ার জিন বাঁধছে। কামাররা শেষ কয়েকটা অস্ত্র মেরামত করে দিচ্ছে। রান্নাঘরে বড় বড় হাঁড়িতে সৈন্যদের জন্য খাবার রান্না হচ্ছে।
মিশরের সৈন্যরা সংখ্যায় এত বেশি যে পুরো দুর্গ আর আশেপাশের মাঠ ভরে গেছে। সাহাবাদের বেঁচে থাকা সৈন্যদের বল হয়েছে মিশরীয় দের পাশে পেয়ে। এতদিন তারা নিজের রাজ্যকে শত্রুর হাতে দেখে বুকের ভিতর আগুন নিয়ে বেঁচেছে। আজ সেই আগুনের জবাব দেওয়ার দিন। বাইজিদ দুর্গের উঁচু প্রাচীরে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পাশে মেহেরুন্নেসা। মেহেরুন্নেসার মুখে চিন্তার ছাপ।
তবে মিশরের বিশাল বাহিনী দেখে তার বুকের পাথরটা কিছুটা নেমেছে। নিচে রাজকুমারী জাহরা নিজের ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মিশরের সৈন্যদের পোশাক সাহাবাদের সৈন্যদের থেকে আলাদা। তাদের মাথায় ধাতব টুপি। বুকে সোনালি নকশা করা বর্ম।
অনেকের হাতে লম্বা বর্শা। অনেকের হাতে বাঁকা মিশরীয় তরবারি। বাইজিদ নিচে নেমে জাহরার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

“তোমার সাহায্য না পেলে আমরা হয়তো আর কখনো সাহাবাদ ফিরে পেতাম না। কি বলে যে ধন্যবাদ দিই তোমায়”
জাহরা হালকা হেসে বললেন,
“ধন্যবাদ পরে দিও। আগে রাজ্যটা উদ্ধার করি।”
বাইজিদও মৃদু হাসলো। মেহেরুন্নেসা চোখ সরু করে তাকায় তাদের তুমি তুমি বলা দেখে। তাছাড়াও রাজকুমারী কেমন ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকায় মেহের এর দিকে। এসেছে পর থেকে একবার আলাপও করেনিন। মেহের আগ বাড়িয়ে দু-একটা বলেছে তেমন পাত্তা দেয়নি।
চন্দ্রা আসলো সবার জন্য শরবত দিয়ে। বড় বড় ঝাড়ি পূর্ণ করে শরবত আনলো। এটা খেয়ে সবাই রওনা হবে। বাইজিদ এর মাথা থেকে বেড়িয়েই গেছিলো। চন্দ্রার বুদ্ধিমত্তায় খুশি হয় খুব। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় বোনের।
তারপর যুদ্ধযাত্রা শুরু হলো। সামনে অশ্বারোহী বাহিনী। তারপর পদাতিক সৈন্য আর রসদবাহী গাড়ি। সবশেষে চিকিৎসক আর সহায়ক দল।
হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মাটি কাঁপছে।
ঘোড়ার খুরের শব্দে চারদিক মুখর। পতাকাগুলো বাতাসে উড়ছে। মেহেরুন্নেসা, সুনেহেরা, চন্দ্রা এবং অন্যান্য নারীরাও পিছনের অংশে থাকলো।

যদিও তারা সরাসরি যুদ্ধে নামবে না, তবুও আহতদের সেবা এবং অন্যান্য কাজে প্রস্তুত থাকবে। দুপুরের দিকে তারা সাহাবাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে প্রাসাদের মিনার। দেখা যাচ্ছে সেই পরিচিত রাজপ্রাসাদ। যেখানে তাদের সুখের নীড়। আজ সেটার ওপর শত্রুর দখল। বাইজিদের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সাহাবাদের বাইরের প্রহরীরা প্রথমে এত বড় বাহিনী দেখে ভয়ে হতভম্ব হয়ে গেল।
তারপর দ্রুত ভেতরে খবর পাঠালো। অঙ্কুর প্রাসাদের সভাকক্ষে বসেছিল। এক সৈনিক দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিল,

“হুজুর, হুজুর বিশাল এক বাহিনী আসছে! বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছে মিশরের সৈন্য”
অঙ্কুর হো হো করে হেসে উঠলো।
“সব সৈন্যকে প্রস্তুত আছে। এক কাজ করো, ফটক বন্ধ করো। প্রাচীরে ধনুর্ধর মোতায়েন করো।”
সঙ্গে সঙ্গে মহলের ভেতর যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। বাইজিদ তার সৈন্যদের কয়েকভাগে ভাগ করে দিল। মিরান থাকবে ডানদিকে। আবিদ থাকবে বামদিকে। মিশরের প্রধান বাহিনী মাঝখান দিয়ে আঘাত করবে। পড়ন্ত দুপুরে যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথমে দুই পক্ষের ধনুর্ধররা তীর ছুড়তে শুরু করলো। আকাশ কালো হয়ে গেল।
হাজার হাজার তীর একসাথে উড়ছে। অনেক সৈন্য মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। অনেকের ঢালে তীর গেঁথে যাচ্ছে।
বাইজিদ এর বাহিনী ধ্বনি দিল

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!”
শুরু হলো সামনাসামনি লড়াই। মিশরের অশ্বারোহী বাহিনী ভয়ংকর বেগে ধেয়ে এলো।
তাদের ঘোড়াগুলো বিশাল। সৈন্যরা প্রশিক্ষিত।
অঙ্কুরের সামনের সারি বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। মুহূর্তেই তাদের প্রতিরক্ষা ভেঙে গেল। বাইজিদ নিজে সামনে থেকে যুদ্ধ করছে। বহুদিন পর সে আবার নিজের রাজ্যের মাটিতে তরবারি চালাচ্ছে। তার লক্ষ্য সাহাবাদকে মুক্ত করা।
মিরানও একের পর এক শত্রুকে পরাস্ত করছে।
আবিদ সৈন্যদের নেতৃত্ব দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। বাইজিদের বাহিনী ফের ধ্বনি দিলো
“নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”

এই ধ্বনিতে মিশরীয় সৈন্যদের মনোবল আরও বেড়ে গেল। যুদ্ধ ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতে লাগলো।
প্রাসাদের বাইরের প্রথম দেয়াল দখল হয়ে গেল।
তারপর দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা বলয়ও ভেঙে গেল।
অঙ্কুরের সৈন্যরা একের পর এক পিছিয়ে যেতে লাগলো। অনেকেই আত্মসমর্পণ করলো। অনেকেই পালিয়ে গেল। সন্ধ্যা নামার সময় যুদ্ধ এসে পৌঁছালো প্রাসাদের মূল ফটকে।
সাহাবাদের বিশাল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ। তার বর্মে ধুলো লেগেছে। হাতে রক্তমাখা তরবারি। তার পাশে মিরান, আবিদ,জাহরা আর হাজার হাজার সৈন্য।
প্রাসাদের বিশাল ফটকের অন্যপ্রান্তে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অঙ্কুরের বাহিনী। তাদের হাতে ঢাল, বর্শা, তলোয়ার। প্রাচীরের ওপর ধনুর্ধর সৈন্যরা প্রস্তুত। গরম বাতাসে পতাকাগুলো ফটফট করে উড়ছে। মানে বাহিরের যা ছিল সব লোক দেখানো। ভিতরে কঠিন পরিকল্পনা এঁটে রেখেছে অঙ্কুর।
মিশরের অশ্বারোহী দল সামনে অবস্থান নিয়েছে।
সাহাবাদের সৈন্যরা দুই পাশে ছড়িয়ে পড়েছে।

মিরান, আবিদ, জাহরা সকলেই নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত। হঠাৎ যুদ্ধের শিঙ্গা বেজে উঠলো অঙ্কুরের দিক থেকে। মুহূর্তের মধ্যেই দুই বাহিনী একে অপরের দিকে ধেয়ে এলো। চারদিক কেঁপে উঠলো ঘোড়ার খুরের শব্দে। ঢালের সঙ্গে ঢালের সংঘর্ষে ঝনঝন শব্দ উঠতে লাগলো। মিশরের অশ্বারোহীরা প্রথম আঘাত হানলো। বর্শা নামিয়ে তারা সোজা শত্রুর মাঝখানে ঢুকে পড়লো।
অনেক সৈন্য ছিটকে পড়ে গেল। সামনের সারি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠলো।
কিন্তু অঙ্কুরের বাহিনীও সহজে ভাঙার নয়। তারা দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করলো। যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে শুধু ধুলো আর চিৎকার।
বাইজিদ নিজের সৈন্যদের নিয়ে মাঝখান দিয়ে পথ তৈরি করতে লাগলো।
তার লক্ষ্য প্রাসাদের ভেতরে ঢোকা।
ঠিক তখনই দূরে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হলো। সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল। একটি কালো অশ্ব দ্রুতবেগে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ছুটে আসছে। ঘোড়ার পিঠে বসা মানুষটির গলায় মোটা কাপড় বাঁধা। মুখে বর্মের আংশিক আবরণ। কাছাকাছি আসতেই সুনেহেরার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

“মাহাদি।”
সুনেহেরা দূর থেকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। মাহাদির গলার ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। কাপড়ের ফাঁক দিয়ে রক্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবু সে এসেছে। আর আসার সঙ্গে সঙ্গেই সরাসরি বাইজিদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইজিদ তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
“দেরি করলে?”
মাহাদিও হালকা হাসলো।
“মরতে একটু সময় লেগে গেল?”
কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন সৈন্যও হেসে উঠলো। পরের মুহূর্তেই মাহাদি ঘোড়া ঘুরিয়ে শত্রুপক্ষের দিকে ধেয়ে গেল। তার আগমন যেন সাহাবাদের সৈন্যদের নতুন প্রাণ দিল। যেখানে সৈন্যরা পিছিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে আবার এগোতে শুরু করলো। মাহাদি সামনে। বাইজিদ তার পাশে। মিরান ডানদিকে। জাহরা বামদিকে। বিজয় তাদের সন্নিকটে। অঙ্কুরের সব সৈন্য শেষ। বিজয়ের আনন্দ যখন পুলকিত করছে সবাইকে
তখনই ঘটলো সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা।
অঙ্কুরের বাহিনীর পেছনের অংশ হঠাৎ খুলে গেল।
সেখানে আগে থেকে লুকিয়ে রাখা ছিল আরও কয়েক হাজার সৈন্য। নতুন বাহিনী মুহূর্তেই যুদ্ধে নেমে পড়লো। বাইজিদ থমকে গেল।
মেহেরুন্নেসার চোখ সরু হয়ে এলো। এত প্রস্তুতি?
এত সৈন্য আগে থেকে প্রস্তুত ছিল? তারা যে আজ আক্রমণ করবে, সেই খবর অঙ্কুর আগে থেকেই জানলো কীভাবে?
প্রশ্নটা কারও বুঝে আসছে না। ঠিক তখনই শত্রুপক্ষের মাঝখান থেকে একটি অশ্ব সামনে এগিয়ে এলো। মাথার কাপড় সরিয়ে দিল সে। সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

“চন্দ্রা?”
আবিদের মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।
“চন্দ্রা…”
চন্দ্রার চোখে কোনো দ্বিধা নেই,কোনো অনুশোচনা নেই। তরবারি কোষ থেকে নিজের তলোয়ার বের করলো। তারপর উচ্চস্বরে বললো
“নাসিরাবাদ জয় হোক”
শত্রুপক্ষের সৈন্যরা গর্জে উঠলো। সাহাবাদের সৈন্যরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। বাইজিদের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মিরান দাঁত চেপে ধরলো।
আবিদ শুধু নির্বাক চোখে দেখছে নিজের স্ত্রী কে।
চন্দ্রা নিজের বাহিনী নিয়ে সরাসরি সাহাবাদের সৈন্যদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দিল। যুদ্ধক্ষেত্র আবার নতুন করে জ্বলে উঠলো।
চরম বিশ্বাস ঘাতকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে সাহাবাদ। চন্দ্রার মুখোশ খুলে যাওয়ার পর সকলেই খেই হারিয়েছে। সাহাবাদের লোকজনের চোখ তখন একজনের দিকেই। আবিদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। যে নারী এতদিন তাদের সঙ্গে ছিল, একই ছাদের নিচে থেকেছে, তাদের সুখ-দুঃখের অংশ হয়েছে, সেই মানুষটাই শত্রুপক্ষের হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইজিদের চোখে তখন শুধু ঘৃণা। প্রচণ্ড ঘৃণা। আর বহু বছরের জমে থাকা আক্রোশ। সে ঘোড়া কয়েক কদম সামনে নিয়ে এলো।

“তুই…?”
চন্দ্রা চুপ।
“এতদিন তুই…..?
তার কণ্ঠ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠলো। শক্ত পোক্ত পুরুষটাও কাঁদতে চাইছে
“সাহাবাদের প্রতিটা গোপন খবর তাহলে তুই পাঠাতি?”
চন্দ্রা মাথা উঁচু করলো।
“হ্যাঁ।”
কথাটা বাইজিদের বুকে গিয়ে আঘাত করলো।
মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। সুনেহেরা অবিশ্বাসে মাথা নাড়লো। বাইজিদ তিক্ত হাসলো।
“তাহলে অঙ্কুরের হাতে বারবার আমাদের খবর পৌঁছাত কীভাবে, আজ বুঝলাম।”
তার চোখ লাল হয়ে উঠছে।
“তোকে কখনো চন্দ্রা ভাবিই নি। আমি রত্না ভাবতাম তোকে রত্না। শুনেছিস? হ্যা রে, নিজের ভাই এর এত বড় ক্ষতি করতে বুক কাপলো না তোর? মেহের বলেছিল অরণ্য কে তুই হত্যা করেছিস। বিশ্বাস করিনি আমি। আজ বুঝতে পারলাম”
চন্দ্রা কোনো প্রতিবাদ করলো না। বাইজিদ আবার বললো,
“বাকের শাহ্ বন্দি হওয়ার নাটকটাও তোর ই পরিকল্পণা ছিল। আমরা উত্তর মহলে আশ্রয় নেওয়ার খবর ও তুই ই দিয়েছিলি চন্দ্রা।এমনকি আজকের আক্রমণের খবরও….”
কন্ঠ ভেঙে আসে বাইজিদ এর। চোখ মুছে বাইজিদ বললো
“আমরা ভাবতাম শত্রু খুব বুদ্ধিমান। তাই আমাদের পরিকল্পনা জেনে যায়। আসলে শত্রু আমাদের ঘরের ভেতরেই ছিল।”

চন্দ্রার মুখে তখনও বিশেষ পরিবর্তন নেই।
সে শুধু বললো,
“আমি যা করেছি, নিজের ইচ্ছায় করেছি, বেশ করেছি”
“কেন? কী পেয়েছিস এসব করে?”
চন্দ্রা বেহায়ার মত হেসে বললো,
“ক্ষমতা আর নিজের ভাগ্য নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগ।
বাইজিদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।
“ভাগ্য? না চন্দ্রা। এটা ভাগ্য নয়। তুই যেটা করলি এটা বিশ্বাসঘাতকতা।”
সে চারপাশে তাকালো।
“এই মানুষগুলো তোকে আপন ভেবেছিল। মেহেরুন্নেসা তোকে বোনের মতো দেখেছে। এই যে আবিদ, আবিদ তোকে বিশ্বাস করেছে। সাহাবাদ তোকে আশ্রয় দিয়েছে।”
চন্দ্রার চোখে চোখ রেখে বললো,
“আর তুই তাদের পিঠে ছুরি মেরেছিস”

আবিদ মাথা নিচু করে ফেললো। তার চোখ ভর্তি কষ্ট বাইজিদের কণ্ঠ আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তুই না বলতি ভাইজান আমি তেমার ঢাল?”
চন্দ্রা এবার তলোয়ার শক্ত করে ধরলো।
“কথা শেষ?”
বাইজিদও নিজের তলোয়ার তুলে ধরলো।
“না। কথা শেষ হবে যুদ্ধ শেষ হলে।ন আর আজ সাহাবাদ সিদ্ধান্ত নেবে, বিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে কোনটা বেঁচে থাকবে।”
পরের মুহূর্তেই দুই পক্ষ নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লো। যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। তলোয়ারের ঝনঝন শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। মিশরের অশ্বারোহীরা এখনও লড়ছে। সাহাবাদের সৈন্যরাও প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাইজিদ এর দুর্বল লাগছে নিজেদের। সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন সৈন্য ঢলে পড়লে। পরক্ষণেই আরও কয়েকজন হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।বতারপর আরও। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি একে একে সবাইকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মিরান যুদ্ধ করতে করতে থমকে গেল। তার হাত থেকে প্রায় তরবারি পড়ে যাচ্ছিল।

“এ কী হচ্ছে?”
আবিদও বুক ভরে শ্বাস নিতে গিয়ে কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করলো। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। অন্যদিকে মিশরের কয়েকজন সৈন্যও অদ্ভুতভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। কেউ বসে পড়ছে। কেউ দাঁড়াতেই পারছে না। বাইজিদ নিজের তরবারি শক্ত করে ধরলো। তার মাথার ভেতর যেন ঘূর্ণি দিয়ে উঠলো। চারপাশটা কেমন দুলে উঠলো। কপালে হাত দিল।
“না…”
কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার সামনে থাকা দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা দূর থেকে সেটা দেখে ভয় পেয়ে গেল।
“শাহজাদা!”
বাইজিদ উত্তর দেওয়ার আগেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। তার পাশে মিরানও প্রায় পড়ে যাচ্ছে।
আবিদ কোনো রকমে ঘোড়ার জিন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জাহরার মুখেও বিস্ময়। তিনি বুঝতেই পারছেন না কী ঘটছে। অঙ্কুরের সৈন্যরা পিছিয়ে গিয়ে জায়গা ছাড়তে শুরু করলো। আর সেই ফাঁক দিয়ে এগিয়ে এলো চন্দ্রা। তার মুখে অদ্ভুত হাসি। যেন বহুদিনের পরিকল্পনা সফল হয়েছে।
বাইজিদ দাঁত চেপে বললো,

“কী… করেছিস?”
চন্দ্রা ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এলো। কন্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে বলল
“ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই হেরে বসে আছো। আর এখন চাইছো রাজ্য জয় করতে?”
মেহেরুন্নেসা কষ্ট করে মাথা তুললো।
“কী বলছো এসব আপা?”
চন্দ্রা হেসে উঠলো।
“আসার সম কত আপ্যায়ণ করে শরবত খাওয়ালাম মনে নেই?
বাইজিদের বুক ধক করে উঠলো। সত্যিই তো। মিশরের বাহিনী সহ সবাইকে আসার সময় শরবত খাওয়ানো হয়েছিল। তখন তো কেউ সন্দেহও করেনি। চন্দ্রা বললো,
“সেই শরবতের সঙ্গে মেশানো ছিল বিশেষ এক ওষুধ। শরীরকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। শক্তি কমিয়ে দেয়। শরীর দুর্বল থাকলে মারাও যাবে”

বাইজিদ চারদিকে তাকালো। সাহাবাদের সৈন্যরা একে একে মাটিতে বসে পড়ছে। কেউ অস্ত্র ধরে রাখতে পারছে না, দাঁড়াতেই পারছে না। চন্দ্রার চোখে বিজয়ের ঝিলিক।
“হাহহ ভাইজান! যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তোমাদের পরাজয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল আরকি”
বাইজিদের চোখে রক্ত চড়ে গেল। সে কোনো রকমে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু শরীর আর সাড়া দিচ্ছে না। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দ্রাকে তখন যেন দূরের কোনো অবয়ব মনে হচ্ছে। চন্দ্রার কথাটা শুনেই মেহেরুন্নেসার ও বুক কাঁপছে। নারী এত ভয়ংকর হয়? চন্দ্রা আবিদের সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল
“আর হ্যা। শাখাকেও বিষ খাইয়ে এসেছি।”
মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কী বললে?”
চন্দ্রার ঠোটে কুটিল হাসি ফুটলো।

“ ঠিকই শুনেছো। তোমাদের আদরের শাখা। না মানে তাকে নিয়ে তো আর অঙ্কুর মেনে নেবে না আমায়”
মেহেরুন্নেসার চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। চন্দ্রা কণ্ঠে তীব্র বিদ্বেষ নিয়ে বলল
“তোমাদের সুখী মুখগুলো আমি আর সহ্য করতে পারলাম নাহহ”
মেহেরুন্নেসার সামনে এসে দাঁড়ালো।
“তুমি জানো, আমি কী ছিলাম? আমি শাজাদী ছিলাম রে শাহজাদী। অথচ তুই? ভিখিরির মেয়ে। সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও সাহাবাদের বেগম হয়ে গেলি। বাইজিদ এর ভালোবাসা পেয়ে গেলি। সবার ভালোবাসা পেলি, সম্মান পেলি, পরিবারও পেলি।”
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো।
“আর আমি? আমি রাজবংশের রক্ত নিয়ে জন্মেও কিছুই পেলাম না। হ্যা? সবাই আমাকে নিজেদের প্রয়োজনে কেন ব্যবহার করলো?”
মেহেরুন্নেসা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চন্দ্রা যেন বছরের পর বছর জমে থাকা বিষ উগরে দিতে লাগলো।
“যেখানে গেছি, সবাই তোর নাম জপেছে। তোর সৌভাগ্যের কথা বলেছে। তোর সুখের কথা বলেছে। কেউ কোনোদিন আমার দিকে তাকায়নি। কেন আমি কম কিছু করছি রে এই রাজ্যের জন্য হ্যা?”
চন্দ্রা চোখ মুছল।

“তাই আমি সবকিছু শেষ করে দিচ্ছি। এখন থেকে আমি রাজত্ব করবো আমি। তোদের পরিবার, তোদের রাজ্য, তোদের সুখ সব আমি কেড়ে নিলাম সব”
মেহেরুন্নেসার ভেজা চোখ নিয়ে বলল
“কারও সুখ কেড়ে নিয়ে কেউ সুখী হয় না, আপা”
চন্দ্রা তিক্ত হেসে উঠলো।
“আমি সুখী হতে আসিনি। আর না তোমাদের সুখী থাকতে দেবো। আমি রাজত্ব চাই রাজত্ব”
চারদিকে আহত সৈন্যদের গোঙানি। ধুলোয় আচ্ছন্ন যুদ্ধক্ষেত্র। দুর্বল হয়ে পড়া সাহাবাদের যোদ্ধারা। চন্দ্রা এগিয়ে এলো আবিদের দিকে।
বহুদিনের জমে থাকা সত্য, বিশ্বাসঘাতকতা আর হিংসা নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ালে স্বামী-স্ত্রী। আচমকা চন্দ্রা আবিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। সংঘর্ষের মধ্যে দুজনই মাটিতে পড়ে গেল। বাইজিদ দূর থেকে সব দেখছিল। কিন্তু দুর্বল শরীর নিয়ে এগোতে পারছিল না। চন্দ্রা আবিদের পেট এফোড় ওফোড় করে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিলো। চিৎকার দিল সুনেহেরা, সাথে মেহের ও। আবিদ ঢলে পড়লো। শেষ বারের মত স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৩

“জিদ কে জয়ী করতে আমায় দুঃখ দিলে প্রভা? দোয়া করি তোমার জীবনেও দুঃখ আসুক, সুখের ক্ষুধায় হাহাকার করুক তোমার বুক”
চন্দ্রা হো হো করে হাসে
“আমি সুখে ছিলাম ই বা কবে?”
আবিদ মাটিতে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো। বাইজিদের মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না আর। যেন পুরো পৃথিবী এক মুহূর্তে থেমে গেছে। সবাই হতবিহ্বল, চন্দ্রর এই রুপ মেনে নিতে পারছে না কেউ। আচমকা আরেক কোপ এসে লাগলো মেহেরুন্নেসার কাঁধ বরাবর……।

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here