সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
ভোর ভোর রওনা দিয়ে দেওয়ান বাড়ি ফিরে এসেছে ঈশান -তিতির। তিতির কে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে সোজা অফিসে চলে গিয়েছে ঈশান। বেলা সবে বারোটা বাজে। গোটা বাড়ি প্রায় ফাঁকা। ছেলেমেয়েরা সবাই স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে। কর্তারাও অফিসে। চন্দ্রা দেওয়ান তো আশ্রমেই থেকে গেলেন। ফিরবেন আরও দিন দশেক বাদে। হালকা পাতলা নাস্তা শেষে নিজের রুমে চলে এসেছে তিতির।
নিশির ঘর থেকে তার টিয়া পাখির খাঁচাখানা নিয়ে এসেছে সবেই। বেলকনিতে ঝুলিয়ে দানা-পানি দিচ্ছে সেটায়। ঘরদোর একদম গোছানো। ঈশান ফেরার আগেই পাখিজোড়া আবার তিতিরের আগের ঘরে রেখে আসবে। ঈশানের পছন্দ নয় পাখিজোড়া ঘরের মধ্যে ডাকাডাকি করুক।
বেলকনিতে দাঁড়াতেই চোখে পরলো তাদের বাড়ির সামনের বাগানটার দিকে। এই ভর দুপুরে রোদ মাথায় বাগানে বসে আছে নূরি। আশ্চর্যই হলো তিতির। তার জানা মতে ভার্সিটিতে গিয়েছিলো মেয়েটা। অবশ্য সেটা তার আন্দাজ। কারণ নিশি বাড়িতে নেই। নূরিকে দেখা মাত্রই মনে পরে গেলো ঈশানের বলা কথাগুলো। হু হু করে উঠলো বুকের ভিতরটায়। বেতের চেয়ারে হেলনা দিয়ে বই পড়ছে সম্ভবত। এই দুপুরে রোদের মধ্যে ওখানে মেয়েটা কি করে আছে ভাবতেই অস্থির লাগলো যেনো তার। যদিও বাগানের ওদিকটায় লম্বা লম্বা আম কাঁঠালের গাছ তাদের। তারই ছায়া তে বসে নূরি।
বিছানার ওপর থেকে ওড়না খানা গায়ে জড়িয়ে ঝটপট নেমে এলো বাগানের দিকে। ওদিক থেকে হেঁটে আসা তিতিরকে দেখলো নূরি। মেয়েটা খুঁড়িয়ে হাঁটছে কি! তিতির এসে একগাল হেসে বসতেই নূরি ব্যাস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
—’ব্যাথা পেয়েছিস তুই ? খোঁড়াচ্ছিস কেনো?’
থতমত খেয়ে বসে তিতির। লজ্জা পেলো আনমনেই। আমতা আমতা করে জবাব দিলো,
—’সেরকম কিছু নয়। আসার সময় খানিকটা টান লেগেছে পায়ে।’
হাতের বইটা টেবিলে নামিয়ে নিশ্চিত হলো যেনো নূরি। তিতির খেয়াল করলো সত্যি এদিকটা বেশ ঠান্ডা। ঝিরিঝিরি বাতাস, যতটা গরম মনে হয় –ততটা মোটেই নয়। আরামই লাগছে।
—’ ভার্সিটি যাও নি?’
নাথা নাড়লো নূরি। যায়নি, বাড়িতে বলা হয়েছে ক্লাস নেই। সত্যিটা আদতে তা নয়। ইচ্ছে করেই আজকাল যায়না ভার্সিটিতে। ইয়াজের ভয়ে অনেকটা।৷ মুখে বললো,
—’ক্লাস ছিলো না।’
—’ওহ্।’
—’শরীর ঠিকঠাক তোর? দিদা কেমন আছে?’
—’ভালো আছে। ‘
—’ফিরবে কবে?’
—’সামনে সপ্তাহে সম্ভবত। ‘
—’দিদা বললো ক্যাম্পিং করেছিলি তোরা। কেমন এনজয় করলি বৃষ্টির মধ্যে ক্যাম্পিং?’
থমকায় তিতির। কেমন এনজয় করেছিলো! রাতটার কথা মনে পরতেই স্বাভাবিক মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে এলো। লাজেরা এসে ভির জমালো। তিরতির করে কম্পন ধরলো ঠোঁটের ভাজে। শুকনো ঢোক গিলে, নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
—’ভালোই। তোমাদের মিস করেছি।’
বাঁকা হাসলো নূরি। বাঁকা কন্ঠে বললো,
—’ মিস করার সুযোগ দিয়েছে আমার ভাই?’
—’হ্যা?’
—’বললাম, মিস করার জন্য তো সময় পেতে হয়। আমি ভাবলাম ওরকম ওয়েদার, বৃষ্টি, রোমান্টিক মোমেন্ট একদম। হানিমুন সেরে ফিরবি একেবারে। ‘
মুখে কিছু বলতে হলো না তিতিরের। মেয়েটার রক্তিম হয়ে আসা মুখটা জানান দিলো অনেক কিছুই। তিতির কথা ঘুরিয়ে ফেললো। এ কথা, সে কথায় ব্যাস্ত হওয়ার চিন্তা আরকি।নূরি প্রায় পলকহীন দেখে যাচ্ছে ছোট বোনটাকে। আজকাল তিতিরের দিকে তাকাতে পারে না সে। ইয়াজের মুখটা ভেসে ওঠে। ওই হাসি, ওই বাঁকা, ধূর্ত চাহনি। এসব ভেসে ওঠে তিতিরকে দেখলেই। আচ্ছা, ইয়াজ যদি কখনো তিতিরকে না দেখতো ইয়াজ কি তাহলে নূরিকেই ভালোবেসে যেতো? তিন বছরের সম্পর্কের শেষে এটা যদি জানতে হয়, নিজের ভালোবাসার মানুষ বাজে ভাবে আসক্ত তার-ই বোনের ওপর। তাহলে! জীবন একটা মানুষের প্রতি ঠিক কতটা নির্দয় হতে পারে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নূরি। তার সামনে বসে অনবরত মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে যাচ্ছে যে মেয়েটা সে তার নিজের বোন। অথচ! এখন আরও কতগুলো পরিচয় এই মেয়ের। তার বড় ভাইয়ের বউ, এই দেওয়ান বাড়ির বড় বউ। যাকে কোনো এককালে তার নিজের ভাই, নয়ন ভালোবেসে ছিলো। অথচ ভাগ্য সহায় ছিলো ঈশানের। তারপর! আরও অনাকাঙ্ক্ষিত একটা পরিচয় তৈরি হলো এই মেয়েটার সাথে। সে যাকে মনপ্রাণ উজার করে ভালোবেসে গেলো, সেই প্রেমিক পুরুষের অভিসারী এই মেয়েটা। সবদিক থেকে নূরি হেরে গেলো। তাই নয় কি! মানুষ চিনতে একবার ভুল হলে গোটা জীবনটাই ভুলের তৈরি হয়ে যায়। তিতির সাতপাঁচ কিসের গল্প করে যাচ্ছে সম্ভবত খেয়ালই করছে না নূরি। সে তো ওই মেয়েটার ভাগ্য পরিমাপ করতে ব্যাস্ত। কোনো মেয়ের ভাগ্য হোক, তবে তিতিরের মতো হোক। ওকে কি গড ফেবারিট বলা যেতো পারে? সম্ভবত বলা যেতেই পারে। তাছাড়া সবার ভালোবাসায় মোড়া হয় কি করে একটা মানুষ!
—’ তোর মতে ভালোবাসা কি, তিতির?’
তিতির ব্যাস্ত ছিলো চন্দ্রা দেওয়ানের আশ্রমের গল্পে। নূরিও মন দিয়ে শুনছিলো তার কথা। এটাই ধারনা ছিলো তার। আচমকা এই প্রশ্নে কথায় ছেদ পরে মেয়েটার কথায়। উল্টো প্রশ্ন করে বসে তৎক্ষণাৎ।
—’কি বললে?’
সোজা হয়ে বসলো নূরি। বাঁ পায়ের ওপর ডান পা টা তুলে খানিকটা ঝুঁকে এসে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’ ভালোবাসা কি বলতো?
—’ভালোবাসা?’
—’হু? ‘
চুপচাপ দু সেকেন্ড কিছু একটা ভাবলো তিতির। খোপা করা চুলগুলো ঢিলে হয়ে এসেছে বুঝি! ওদিকটায় নয়নতারার গাছ। সেখান থেকে ফুল এনে চুলে গুঁজলে বোধহয় ভালোই লাগবে। তিতির সেদিকে তাকিয়ে পরমুহূর্তেই মুচকি হেসে বললো,
—’ জানি না। ভালোবাসার কোনো কাব্যিক বা আভিধানিক অর্থ হয় কি-না সেটা আমার জানা নেই। হয় বোধহয়। তবে তোমার প্রশ্ন শোনা মাত্র আমার মাথায় কি এলো জানো? তোমার ভাইয়ের মুখটা চোখে ভেসে উঠলো। আর কোনো অর্থ কিভাবে বোঝাই বলো? আমার কাছে কয়েকটা শব্দ এক করে একটা লাইন ব্যাক্ত করার থেকে একটা মানুষকে দেখিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো, আমার ভালোবাসার অর্থ বোঝাতে। ঈশান আরশাদ গোটা মানুষটাই আমার জন্য ভালোবাসা। সেই আমার ভালোবাসার সূত্র, সঙ্গা।’
স্থির হয়ে তিতিরের কথাগুলো শুনে গেলো নূরি। দোতলার দিকে তাকাতেই চোখে পরলো নয়নের বারান্দায় ঝুলছে একটা আকাশরঙা শার্ট। নয়নের ঘরটাও আকাশরঙা। ওর ঘরে ঢুকলে প্রায় সব কিছুর রঙই এটা। তার কারণ আছে কি? নয়নের প্রিয় রং সম্ভবত সবুজ। এই রঙের প্রতি তাহলে এতো কিসের অবসেসন তার! হাসলো নূরি। নরম কন্ঠে বললো,
—’ তোদের ভালোবাসা ভালো থাকুক…’
—’ হঠাৎ এ প্রশ্ন কেনো করলে?’
নূরি এ প্রশ্নের জবাব দিলো না। তার দৃষ্টি এখনো নয়নের ঘরের দিকে। তিতির ঘাড় বাঁকিয়ে দেখলো একবার নিজেও।নূরি উত্তর না দিয়ে প্রশ্নের পিঠে আরেকটা প্রশ্ন ছুড়লো,
—’নয়ন ভাইয়ার রুমের সব আকাশ রঙা, খেয়াল করেছিস কখনো?’
মাথা ঝাকালো তিতির। খেয়াল করবে না কেনো। ঘরে এ-ই রঙ করা নিয়ে তার মেজো মামনীর সাথে নয়নের এক প্রস্তর ঝামেলা বেধে ছিলো বছর চারেক আগে। বেশ মনে পরে তার। রিক্তা কিছুতেই ছেলের ঘরের রঙ এটা দিতেই দেবেন না। অথচ নয়ন একগুয়ের মতো এই রঙই করবে।
—’হু।’
—’ভাইয়ার প্রিয় রঙ সবুজ।’
—’জানি তো।’
—’বড় ভাইয়ার প্রিয় রঙ?’
—’সাদা, কালো।’
—’স্বামীর সব পছন্দের খোঁজ পেয়েছিস?’
—’সম্ভবত সবের সন্ধান এখনও পাইনি। পেয়ে যাবো। ‘
অমায়িক হাসলো নূরি। শান্ত সুরে বললো,
—’খেয়াল রাখিস। ভালোবাসার খেয়াল রাখতে হয়, যত্ন নিতে হয়। ভালোবাসার মানুষের পছন্দের খেয়াল রাখাও একটা বড় বিষয় কিন্তু। ‘
—’রাখবো।’
নূরি চুপ করে থাকে। তিতির খানিকটা ঘনিয়ে এসে বসলো বোনের দিকে। আদুরে কন্ঠে বললো,
—’ ভালোবাসা বুঝতে না পারা টা একটা চরম ব্যার্থতা আমাদের। তাই না বলো, আপু?’
—’কেনো বলছিস এই কথাটা?’
তিতিরের মাথায় তখন ঘোরাঘুরি করছে ইয়াজ আর নূরির বিষয়টা। নূরির মন কেমন জানা আছে তার। নরম মনের একটা মেয়ে। এতোগুলো দিনের ভালোবাসা! সেখানে বিট্রেইট থেকেই যে এর আগে আ’ত্ম’ হ’ত্যার মতো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েছিলো এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে তিতির। তবে নূরির এই মলিন মুখ দেখে তিতিরের হুট করেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের কথা মনে পরে গেলো। নাহ্ অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। বেশিই কাঙ্ক্ষিত। নাঈম ভাইয়া! ওই লোকের চোখেমুখে নূরির জন্য তীব্র ভালোবাসা, মায়া দেখেছিলো সে। শুধু সে-ই নয়, সম্ভবত সবাই খেয়াল করে। তিতির বরাবরই আফসোস করতো নাঈমের জন্য, কারণ নূরি ভালোবাসতো অন্য কাউকে। কিন্তু বর্তমানটা আলাদা৷ ইয়াজের মতো মানুষ ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য নয়। তিতির শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
—’নাঈম ভাইয়া তোমাকে পছন্দ করে। জানো আপু?’
মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হলো না নূরির। ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,
—’খেয়াল করিনি কখনো।’
তিতির যেনো হতাশই হলো। হতাশ কন্ঠে সাদা মনে বললো,
—’কেউ একজন তোমাকে এতো ভালোবাসে, তোমার পছন্দ অপছন্দের খোঁজ রাখে। আর তার ভালোবাসা তুমি খেয়াল করোনি। এটা কেমন কথা!’
নূরি খানিক চুপ করে রইলো। কি ভাবলো কে জানে। তবে মুখের আদল আর স্বাভাবিক নেই এখন। চোখজোড়া কেমন রক্তিম আভা ধারন করেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। তিতির অবশ্য খেয়াল করলো না এতো গভীরে। নূরির দৃষ্টি এখনো নয়নের রুমের বেলকনিতে। আচমকা প্রশ্ন করে বসলো,
—’তোর পছন্দের রঙ কি?’
—’আসমানী আর সাদা।’
—’আকাশ পছন্দ তাই?’
—’হু।’
—’ভালোবাসার মানুষের জন্য নিজের পছন্দের পরিবর্তন কে কিভাবে দেখিস তুই? আই মিন, কারোর যদি সবুজ পছন্দ হয় ব্যাক্তিগত ভাবে। অথচ তার জীবনে আকাশরঙার প্রভাব বেশি দেখা যায়। তাহলে? সেটার যুক্তি কি? তোর সেন্স কি বলে এ ক্ষেত্রে। ‘
—’ভালোবাসা…’
কথাটা প্রশ্ন হিসেবেই জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলো বোধহয় মেয়েটা। তবে শব্দটা উচ্চারন করা মাত্রই থেমে গেলো সে। থমকে গেলো মেয়েটা। সহসা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো নয়নের রুমের বেলকনির দিকে। এখনো বাতাসে আসমানী রঙের শার্টখানা ওড়াউড়ি করছে। ধক করে উঠলো বুক, শ্বাস আটকে তাকালো নূরির দিকে। নূরি নির্বিকার তখনো। তবে নির্বিকার মুখের আদল সম্ভবত বলে দিচ্ছে অনেক কিছুই।
তিতির আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। থমকে অবিশ্বাস চোখে নিয়ে তাকিয়ে থাকে নূরির দিকে।
নূরি মৃদু স্বরে বললো,
—’ভালোবাসা বুঝতে না পারা আমাদের সবার রোগ, তাইনা বল? ভুল আমরা একা করি না। মাঝেমধ্যে অতি ভাগ্যবতী, বুদ্ধিমতিরাও করে। একজনকে সুখি করতে গিয়ে অন্যকে দুঃখি করে ফেলি আমরা। এটায় পাপ পূন্যের হিসাব কিভাবে করেন খোদা? জানা আছে তোর?’
—’কি বললে বুঝলাম না।’
—’না বোঝার মতো কিছু বলেছি কি? তুই বললি ভালোবাসা বুঝতে না পারা অন্যায়। আমিও সেটাই বললাম। কেউ তোকে বা আমাকে ভালোবাসে। আমাদের পছন্দ মতো নিজেরদের পছন্দ তৈরি করে ফেলে। অথচ আমরা সে-সব খেয়াল না করে, অন্যের জন্য তরপাই। এটা অন্যায়, খুব অন্যায়।’
টেবিলের ওপর থেকে বইখানা হাতে তুলে উঠে দাঁড়ায় নূরি। আকাশের দিকে ভ্রু জোড়া কুঁচকে তাকিয়ে রোদ পরখ করে। তৎক্ষনাৎ তিতিরকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
—’যোহরের আজান পরবে এখন। গোসল দিবো। ঘরে গেলাম। এখানে রোদ চলে আসবে। বসিস না বেশিক্ষণ। চলে আয়। গরমের মধ্যে থাকার দরকার নেই।’
গটগট করে চলে গেলো নূরি। তিতির তখনো নির্বাক। কিছু একটা বুঝিয়ে গেলো নূরি। যা অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিলো কি তার! নাকি স্বাভাবিক ভাবেই বলে গেলো কথাগুলো। সে-ই এলোমেলো ভাবছে?
চন্দ্রকাননে বাড়ির ছেলে-মেয়েদের আড্ডায় আজ মুখরিত। সবকটা ছেলেমেয়ে এতদিন পর একসাথে বাড়িতে। রাতের খাবার খেতে ডায়নিং এ বসেছে সকলে। জমজমাট আড্ডা চলছে একপ্রকার। বাড়ির কর্তারা ফিরেছে, ঈশান, নয়নও ফিরেছে একসাথেই।
বাবা, চাচার সাথে অফিশিয়াল কোনো আলোচনা চলছে সম্ভবত ঈশানের। ওদিকে নয়ন মন দিয়েছে খাওয়ার দিকে। খেতে বসে স্বামী, ছেলের এরকম ব্যাবসা সংক্রান্ত আলাপে বিরক্ত হলেন রাহেলা। এ বাড়িতে খেতে বসে কথা বলা পছন্দ নয় রাইসুল দেওয়ানের। অথচ আজ নিজেই সে-সব ভুলে সোজা বাইরের আলাপ এনে তুলেছেন খাওয়ার মধ্যে। বাকিরাও এই সুযোগে ফিসফিস করছে যদিও। সবারই নিদারুণ কৌতুহল ঈশান-তিতিরের মিনি ট্যুর সম্পর্কে। ভাইবোনদের ভাষায় মিনি হানিমুন। শুরুতে ভীষন আগ্রহ নিয়ে গল্প করতে বসলেও নয়ন এসে বসা মাত্র হাসি মিলিয়ে এসেছে তিতিরের মুখে। বরাবরের মতো নূরি নির্বিকার। নিশির সাথে মাঝেমধ্যে দু একটা শব্দ হয়তো বা উচ্চারণ করছে। তাছাড়া সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না তার।
রিশা, রোশনি, রাফির আবদারে তবুও গল্প শুনিয়ে যেতেই হচ্ছে তিতিরের। ঈশান শুরুতে তিতিরের বাঁ পাশে বসলেও, রাইসুল দেওয়ানের ডাকে উঠে গিয়ে টেবিলটার অন্য পাশে বসতে হয়েছে। দূর্ভাগ্যবশতঃ নয়ন বসা তিতিরের বাম পাশেই। এই প্রথম সম্ভবত নয়নকে ইতস্তত করছে তিতির।
তিন গিন্নি পরপর খাবার সার্ভ করে যাচ্ছে সকলকে। তিতির চেষ্টা করছে নয়নকে এড়িয়ে ডানে বসা নিশির সাথে আলাপে মগ্ন থাকতে।
বাপ ছেলেদের আড্ডা আপাতত থামাতে হয়েছে গিন্নিদের বাঁধায়। খাবার সময় কেনো ব্যাবসা নিয়ে আলোচনা চলবে না। অগত্যা চুপ করতে হয়েছে তাদের। খাবার পাতে হাত দিতেই ঈশানের খেয়াল হলো কিছু একটা। তিতির তার পাশে নয়। এবং অভিজ্ঞ দৃষ্টি এড়ালো না আরও অনেক কিছুই। নয়ন বসা মেয়েটার পাশে। তিতির খাচ্ছে না কিছুই। প্লেটে হাত ঘোরাচ্ছে। খিদে নেই কি মেয়েটার!
নয়ন আচমকা নিজের পাতের মাংসের পিস তিতিরের পাতে তুলে দিতেই থমকালো বেশ কয়েকজন। ঈশান, নূরি,তিতির এবং রিক্তা। নয়নও খানিকটা বিব্রত হয়েছে বইকি। বহুদিনের অভ্যাস এসব। তিতিরের পাশেই খেতে বসতো বরাবর। মেয়েটা যা খেতে পারতো না, আলগোছে তুলে নিতো নিজের পাতে। আর যেটা পছন্দ করতো নিজ পাত থেকে সেটা তুলে দিতো মেয়েটাকে। বিগত অনেকদিন পাশাপাশি বসা হয়নি। আচমকা আজ বসাতে এলোমেলো হয়ে গেলো বুঝি! নিজের হটকারিতায় নিজেকেই মনে মনে গালি দিলো নয়ন। অজান্তেই করে ফেলা কাজটি কে কিভাবে নেবে বোঝার আগেই প্লেট ছেড়ে দাঁড়িয়ে পরলো তিতির। নয়নের দিকে দৃষ্টি না দিয়েই নরম কন্ঠে ইতস্তত করে বললো,
—’ দুপুরের খাবার বিকেল করে খেয়েছিলাম। এখন একদম খিদে নেই। খেতেই পারছিনা। জ্বর জ্বর মুখে রুচি পাচ্ছিনা৷ পরে খাবো ‘
খাবার প্লেটে হাত থমকে আছে ঈশানেরও। তিতিরের প্রতি নয়নের দূর্বলতার দিকটি অজানা নেই তার অভিজ্ঞ চোখে। তবে বরাবরই শুধরেই থেকেছে নয়ন। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে আলাদা আলোচনার প্রয়োজন পরেনি। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে, আজকের বিষয়টিও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবুও পছন্দ হলো না ঈশানের।
তিতির হাত ধুয়ে রাফি, রোশনিদের নিয়ে ওপরে চলে গিয়েছে। বাকিরা কথা বাড়ায় না। নয়ন আলগোছে খেয়ে উঠে গেলো টেবিল থেকে। বাকিরাও তাই।
অনলাইন শপ থেকে অর্ডার করা ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারের বইগুলো সব এসে পৌছেছে আজকেই। সে-সবই আন-প্যাক করতে ব্যাস্ত তিতির। মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে বইগুলো চেক করে নিতে মগ্ন। ওদিকে ভার্সিটির ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। ঈশানকে বলেও পারমিশন পাওয়া যায়নি হোস্টেলে চলে যাওয়ার। তার নিজেরও অবশ্য মন সায় দেবে না ঈশানকে ছেড়ে যেতে। তবুও, বিয়ে হয়েছে বলেই বাকি সব ভুকে বসে থাকবে সে-ও তো হয়না।
অন্তত বাড়িতে পড়াশোনা তো শুরু করতে হবে! ঈশানের ফোন ঘরে রেখে যাওয়া। সেখানে অনবরত কিছু আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসতে ব্যাস্ত। বিরক্ত হয় তিতির। রুষা ছাড়া আর কার এতো ধৈর্য। নিঃসন্দেহে ওই মেয়েটাই। আজকাল ইচ্ছে হয় সামনাসামনি দেখা করে চরম একটা বেয়াদবি করে আসতে। অন্যের স্বামীর পিছনে পরে থাকে, এগুলো কোন জাতের নারী!
খাবার ট্রে হাতে ঈশান যখন ঘরে আসলো তখন রাত আরও একটু ঘনিয়ে এসেছে। বাবার সাথে বাদ বাকি আলোচনা গুলো সেরে তিতিরের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে এসেছে সে। ওষুধ খাচ্ছে কড়া পাওয়ারের। এমন সময় খাওয়াদাওয়া অনিয়মিত হলে চলবে! ওদিক সিঁড়ির মাথায় দাড়িয়েই শুনতে পেলো নিজের সেলফোনের কর্কশ শব্দ। ক্রমাগত বেজে যাচ্ছে ফোন। পায়ের গতি দ্রুত করে ঘরে ঢুকলো ঈশান। ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো। মেঝেতে বসে উপুর হয়ে বইয়ের পাতা উলটাচ্ছে মেয়েটা। টেবিল চেয়ার আছে কি করতে! একহাতে দরজা আটকে খাবারগুলো টেবিলে রাখলো সে।
গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’তখন থেকে শুনছি ফোন বাজছে, ধরছিস না কেনো?’
তিতির ঘুরলো না। ওভাবেই জবাব দিলো,
—’ফোনটা কি আমার?’
—’ আমার -তোমার আবার কি জিনিস! যা আমার তাই তোর!’
ঠোঁট উল্টালো তিতির। বাঁকা গলায় বললো,
—’রুষা নিশ্চয় আমার সাথে প্রেমালাপ করতে ফোন করে না? যা আপনার তা আমার হয় কি করে তাহলে?’
ঈশান ভীষন বিরক্ত হলো ফোনের দিকে তাকিয়ে। মেয়েটা আবার বিরক্ত করছে ফোন করে! তবে নাম্বার চেক করতেই সস্তির শ্বাস ফেললো। রুষা নয়। অমিতের ফোনকল। তিতিরের দিকে হতাশ দৃষ্টি দিয়ে কল ব্যাক করলো ঈশান। ঈশানের ‘হ্যালো’ শব্দটা শোনা মাত্রই আড়চোখে, কানখাড়া করে তাকালো তিতির। ঈশান ফোনটা লাউড স্পিকারে দিয়ে উচ্চস্বরে বললো,
—’অমিত?’
—’বস, একটা ইম্পরট্যান্ট কথা ছিলো। ব্যাস্ত?’
—’বিবাহিত মানুষ যেটুকু ব্যাস্ত থাকে আরকি। বলো।’
কথাটা বলে ঈশান সম্ভবত ইশারা করলো অমিতকে। তিতির পাশে আছে সেটা বোঝাতে চাইলো। তবে সে অবিবাহিত, চিরকুমার ছেলে, সে ইশারা ক্ষুনাক্ষরেও টের পেলো না। উল্টো আগুনে এক কৌটো ঘি ঢেলে দিলো। উহু, ঘি না। ঈশানের মনে হলো অমিত আগুনে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন সব ঢেলে দিলো একটা বাক্যে। সে বেচারা বড্ড তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,
—’বস, রুষমিতা মির্জা ফোন করে বিরক্ত করে ফেললো। আপনি কাল রাতে কি করছিলেন? কথা হয়েছে ওনার সাথে? সে মহিলা পাগলামি করে মরছে আপনি কল না ধরায়৷ দয়া করে ধরবেন?’
কপাল চাপড়াতে মন চাইলো ঈশানের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন। ছেলেটাকে ঠিক কি ভাষায় গালি দেওয়া উচিত বুঝলো না সে। রুষার নাম শোনা মাত্রই শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো তিতির। ঈশান সেদিকে একনজর দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’তোমাকে একটা বিয়ে করাবো,অমিত।’
এখানে তার বিয়ের কথা কোত্থেকে এলো বুঝলো না অমিত। হতাশ কন্ঠে বললো,
—’ আপনার মতো কি আর আমার জনপ্রিয়তা, বস? আপনি তো এক চোখ মারলে একশ জনের লাইন লাগিয়ে দেয়। আমার তো তা নয়। আমি আপনার মতো এতো সুন্দরী মেয়ে কোথায় পাবো? মাহির কথা মনে আছে স্যার? মেয়েটা তো বিয়ের আসর ছেড়ে সেদিন পালিয়েছে আপনার শোকে। আমার কি আর অতো জনপ্রিয়তা? ওরকম মেয়ে আমি কোথায় পাবো?’
—’আসমান থেকে টপকাবে।’
—’ আমার বিয়ের কথা থাকুক, বস। রুষমিতা মির্জা যে আপনার শোকে পাগল হলো। তাকে বরং সামলান।’
তিতির হাতের বইখাতা নিয়ে উঠলো। গটগট করে সে-সব ঈশানের কাগজপত্রের ওপর শব্দ করে রাখতে রাখতে মুখ ভেঙিয়ে বললো,
—’সামলান! কোলে নিয়ে ওলে লে লে করে সামলান। অসহ্যকর।’
চাপা গলায় বলা কথাটাও ঈশানের কানে এলো স্পষ্ট। এমনিতেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে মেয়েটা। ঈশান ধমুকে স্বরে বললো,
—’ওকে তোমার সাথে বিয়ে দেবো, বে আক্কেল কোথাকার।’
তীব্র প্রতিবাদ করে বসলো অমিত। ব্যাস্ত কন্ঠে গলা উচিয়ে বললো,
—’যে মেয়ে আপনাকে ছল করে রুম অবধি টেনে নিয়ে যায়, সে তো আমাকে স্যার– হালকাপাতলা টেস্ট করে, আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার করে পঙ্গু করে বেঁচে দেবে। ও মেয়ে আপনারই থাকুক।’
এবার আর ইশারা ইঙ্গিত করলো না ঈশান। ছেলেটা এতো গাধা বোঝেনি কেনো এতদিন! ঈশান রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
—’ আমি বিবাহিত গর্দভ। বউ আছে আমার একটা। এতো রাতে ফোন করে ওইরকম একটা মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিতে চাইছো? বউ নগদে আমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে হাতে ধরিয়ে দেবে। তোমাকে চাকরি থেকে ফায়ার করবো আমি, অমিত।’
অমিতের এবারে বোধহয় হুশ হলো। মাথার চুল খামচে ধরলো বেচারা। তার ব্যাচেলর বস যে আর ব্যাচলর নেই। সুখি বিবাহিত পুরুষ। সেটা তো রীতিমতো ভুলে বসে ছিলো সে। কপাল চাপড়ে মিনমিন করে বললো,
—’তিতির ম্যাডাম কি পাশে, স্যার?’
—’ গর্দভ। ফোন রাখো।’
বিয়ে করলে বাঘও বেড়াল হয়ে যায়, তার চাক্ষুষ
প্রমান হিসেবে ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে দেখিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। অমিতের ফোন কেটে রীতিমতো ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো ঈশান। মেয়েটার চোখমুখ স্বাভাবিক। একটু বেশিই স্বাভাবিক, আর শান্ত। দীর্ঘশ্বাস ফেললো ঈশান। ঝড়ের আগে প্রকৃতি এমন শান্তই থাকে। তিতির হাতের কাজগুলো শেষ করলো দ্রুত হাতে। বইগুলো গুছিয়ে বিছানা করলো ঝটপট। বাথরুমে হাতমুখ ধুয়ে পোষাক পাল্টে নিলো। ড্রেসিং এর সামনে বসে মুখে কি সব লাগাচ্ছে এখন। ঈশান খুকখুক শব্দ করে কাছাকাছি গিয়ে বসলো। নরম কন্ঠে বললো,
—’ অমিত যে মেয়েটার কথা বললো না? ওই যে মাহি? মেয়েটা আমাকে ভাইয়া ডাকতো। ছোট বোনের মতো ছিলো একদম।’
তিতির গালে সিরাম লাগাতে লাগাতে ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,
—’ভাইয়া থেকে সাইয়্যা! বেশিক্ষণ লাগে না। ছোট বোনের মতোওওওও! সে তো আমিও ছিলাম ছোট বোন। মতো তো আর ছিলাম না৷ তাকে যখন ফুফাতো বোন থেকে বউ করতে পেরেছেন। ওইসব ‘বোনের মতো’ থেকে ঘরে তুলে নিয়ে আসতে কতক্ষণ! তাছাড়া আপনার রুষা তো আছেই। পাগলা,উন্মাদ প্রেমিকা। বউয়ের সাথে শুচ্ছেন, সেসব ব্যাক্তিগত আলাপ শোনার পরও পিছু ছাড়ে না। আপনার জনপ্রিয়তা আছে। মানতেই হবে!’
বউ যে বহু খেপেছে সেটা বুঝতে বাকি নেই ঈশানের। বিবাহিত জীবন ঘেটে ঘ হয়ে বসে আছে। কোথায় ভাবলো বাসর একবার করে ফেলতে পারলে বউ স্বামী সোহাগি হবে। তা নয়! উল্টো ঘটলো। সে হয়ে গেলো বউ পাগল, আর বউ হয়ে গেলো জল্লাদ! আজব ব্যাপার ঘটে সব তার সাথেই!
ঈশান আদুরে কন্ঠে বললো,
—’ ভদ্রলোকের এককথা। এক বিয়ে করেছি। একজনের ভাইয়া থেকে সাইয়্যা হয়েছি। ফুলস্টপ একদম। আর দরকার নেই। আমার বউ আমাকে পূর্ণ সুখ দিতে পারে সবভাবে।’
তিতির ভ্রু কুচকালো। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’আপনি ভদ্রলোক?’
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—’নই? ‘
—’মহা ভদ্র। নারীজাতির লাইন আপনার পিছনে। সে কারণেই বুঝি বউ পরিচয় দিতে এতো সমস্যা? লাইনে ভাটা পরবে?’
ঈশান মুখোমুখি এসে দাড়িয়ে হাস্কিস্বরে বললো,
—’রুষাও তো জানে আমি বিবাহিত। বিবাহিত জীবনে ফ্রি অডিও শোনালাম কাল। তারপরও পিছু না ছাড়লে আমার কি করার।’
দাতে দাঁত পিষলো তিতির। তেতে ওঠা কন্ঠে বললো,
—’তাহলেই ভাবুন। কি পরিমাণ মধু গিলিয়ে রেখেছেন! আপনার মধুর ভাগে পারমানেন্ট মালকিন এসেছে জানার পরও, মৌমাছি রা পিছু হটছে না।’
—’আসতাগফিরুল্লাহ। বউ ছাড়া কোনো নারী আমার চোখে পরে না। বিশ্বাস কর।’
বিরক্তসূ্চক শব্দ করলো তিতির। খিদেও পাচ্ছে ভীষন। তবে মেজাজ খারাপ হচ্ছে ঈশানের সামান্য আগের ফোনকল টায়। অসহ্য সব। একদিন স্বামীর আদর পেলো কি পেলো না। ঝামেলা গুলো নাচতে নাচতে এসে হাজির! তিতির আলগোছে বিছানার ওদিকটায় চলে এলো। চুলগুলো বেণি করতে করতে জানালা দরজা লক করলো। ঘুম দেবে টানা একটা৷
—’না খেয়ে ঘুমাবি না কিন্তু। ‘
—’খিদে নেই।’
—’মিথ্যা বলা শিখেছিস আজকাল।’
তিতিরের হাত টেনে চেয়ারে বসিয়ে খাবারের ঢাকনা তুলে দিতেই পেটে মোচড় দিলো মেয়েটার। মানা করলো না। ঈশান সম্ভবত নিজ হাতে খায়িয়ে দেওয়ার পায়তারা করছিলে। সেটার সুযোগও দিলো না।
ঈশান মৃদু হাসে৷ স্বামীর প্রতি এতো তীব্র অধিকারবোধ, অন্য নারীদের নিয়ে জেলাসী! ভীষনভাবে এনজয় করছে ঈশান। বউয়ের কাছে ভয় পাওয়া,বাধ্য পুরুষ হয়ে থাকার মধ্যেও আলাদা মজা আছে!
ঘরের ভিতর পিনপতন নিরবতা। ঘড়ির কাটা টিকটিক করছে। আর তিতিরের খাবার চিবুনোর শব্দ বাদে সব নিরব। টেবিলের এক কোনায় গালে হাত ঠেকিয়ে বউয়ের খাওয়া দেখে যাচ্ছে ঈশান। মেয়েটা এতো অভিমানী!
—’বুঝলি, তিতির। সিগারেট খাইনা অনেকদিন। কেমন অস্থির লাগছে। ক্রেভিং হচ্ছে আরকি।’
তিতির আড়চোখে দেখে ঈশানকে। হাতের গতি ধীর হয়ে আসে। ঈশান কোন ক্রেভিং এর কথা বলছে, সেটা না বোঝার মতো কিছু নেই। ঈশানের সিগারেটের ক্রভিং মানেই, তিতিরের ওষ্ঠজোড়া দখল করার পায়তারা৷ খাবার গলা দিয়ে নামতে চাইলো না তিতিরের। ঈশানের কন্ঠ অন্যরকম, দৃষ্টি ঘোলা। শুকনো ঢোক গিলে হাতের প্লেট টা আরেকটু নিজের দিকে টেবে নিতে নিতে বললো,
—’সিগারেট তো ড্রয়ারে রাখা আছে দেখেছিলাম। খেতে পারেন…’
—’ওটার ডেট এক্সপায়ার।’
—’দোকান থেকে নিয়ে আসুন।’
—’কথা দিয়ে কথা মানুষ কিভাবে ভুলে যায়! কেউ একজন কথা দিয়েছিলো। সিগারেট ছাড়ার শর্ত দিয়েছিলো। ভুলে গেলো কি?’
পায়ের তলা শিরশির করে ওঠে তিতিরের। জবাব দেয় না মেয়েটা। শব্দ করে চেয়ারখানা টেনে আর একটু ঘেঁষে এলো ঈশান। তিতির একপলক দেখলো ঈশানের শুকনো মুখটা। আচমকা কিছু একটা খেলে গেলো মাথায়। ঈশানকে জব্দ করার বুদ্ধি পেলো বোধহয় মেয়েটা!
ঈশানের শুকনো মুখ দেখে –তিতির বেছে বেছে সব ঝাল খাবারগুলো পাতে তুলে নিয়ে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে যাচ্ছে। এক মূহুর্তের জন্য হতভম্ব হলো ঈশান। একটু সময়ের মধ্যেই চোখজোড়া লাল হয়ে এসেছে, পাতলা ঠোঁট জোড়ার অবস্থাও তাই৷ ঈশান ঝাল খায়না। মেয়েটা তাকে এভাবে দূরে রাখতে চায়? পারবে? এভাবে দূরে রেখে শাস্তি দিতে চায়? ঈশান এ যাত্রায় ফিচেল হাসলো। ঠোঁট টিপে হাসি আঁটকে গভীর মনোযোগে দেখে গেলো গোটা টা সময়। তিতির খাওয়া শেষ করে ছলছল চোখে বিছানায় গিয়ে আসতেই, ঈশান সময় নষ্ট করলো না আর। বিছানায় উঠে গিয়ে বিনা সংকেতে নিজের ওষ্ঠপুটের ভাজে পুরে নিলো মেয়েটার পাতলা অধরোষ্ঠ। ঝালের তীব্রতায় এখন ছটফট করে উঠলো মেয়েটা। ঈশান গভীর আশ্লেষী ভঙ্গিতে টেনে নিতে থাকলো ঝাল টুকু। ঝাল একটু কমলো কি? কমলো বোধহয়। হাতজোড়া ব্যাস্ত ভঙ্গিতে জড়িয়ে নিলো ঈশানের কাঁধ। বন্ধ চোখের কার্নিশ গড়িয়ে পরছে পানি। ঈশান তাকালো। মেয়েটার দূর্বিষহ অবস্থা দেখে একচোট হাসলো মনে মনে। তাকে শাস্তি দিতে গিয়ে নিজেই শাস্তি পাচ্ছে। এতো নরম আদর বুঝি এর আগে কখনো করেনি ঈশান। তিতিরের মুখের ঝাল টুকু অবলীলায় টেনে নিতে ব্যাস্ত৷ সে। মেয়েটার মুখের লালিমা কমে আসছে। হাতের বাধন আলগা হচ্ছে খানিকটা। দীর্ঘ সময়ের প্রনয় শেষে ঠোঁট সরালো ঈশান। তিতিরের চোখ বোজা। ঠোঁট গোল করে শ্বাস নিচ্ছে মেয়েটা। ঈশান জোরে জোরে শ্বাস টেনে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
—’ঝাল কমেছে? ‘
লাজে মাথা ঝুকিয়ে ফেললো তিতির। ঠোঁটের আশেপাশের রক্তিম আভা ছড়িয়েছে গোটা মুখে। দু হাত ঈশানের কাঁধ থেকে নামিয়ে গুটিয়ে নিলো নিজের কোলে।
—’হু।’
—’আমাকে শাস্তি দিতে এটা করলি?’
–’না।’
ঈশান তিতিরের নিচের ওষ্ঠখানা চেপে ধরলো বৃদ্ধাঙ্গুলিতে। হিসহিসিয়ে বললো,
—’ সিগারেটের ক্রেভিং বড্ড বিরক্ত করে আজকাল। প্রতি ক্ষনে ক্ষনে। উন্মাদ লাগে। ছাড়তে পারবো না এটা। এটার নেশা মাথায় চড়ে আছে পুরো।’
তিতির ঠোঁট কামড়ে মিনমিন করে বলে,
—’এটা সিগারেট? ‘
—’ উহু… বললাম তো। নেশা। তোর ঠোঁট আর শরীরের ঘ্রান আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেশা।’
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে তিতিরের। ঈশান নরম গলায় শুধায়,
—’আমাকে এখনো বিশ্বাস করা যায়নি?’
—’অবিশ্বাস করিনি আমি।’
—’ তাহলে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিস না কেনো? এক রাতের আদরে এতোটা কষ্ট দিয়ে ফেলেছি কি? আমাকে আর সহ্য হচ্ছে না?’
লোকটা আসলেই বেশি বোঝে। সেটা কখন বলেছে সে।
—’কোনো মেয়েই স্বামীর আশপাশে অন্য মেয়ের ছায়াও সহ্য করতে পারে না।’
—’জেলাসী?’
—’ আপনি আমার। শুধু আমার। আপনার নামের সাথে আমি কোনো নারীর নাম সহ্য করবো না। আগে কি ছিলো, না ছিলো সব শেষ ওসব। আমি আপনাতে নিজেকে সঁপেছি। আমার অধিকার আমি বুঝে নেবো। কাউকে ঘেঁষতে দেবো না আপনার ত্রিসীমানায়। এটা যদি জেলাসী মনে করেন। তবে তাই। কিন্তু স্বামীর ভাগ আমি দিতে রাজি নই। আপনার সবেতে শুধু আমার অধিকার থাকবে। থাকতেই হবে।’
ঈশান তিতিরের গালে হাত চেপে বিছানায় মিশিয়ে ফেললো আলতো করে। বাঁ হাতে তিতিরের দু হাত মাথার ওপর চেপে ঠোঁটে চেপে সরিয়ে ফেললো বুকের ওড়না। বুকের ভাজে মুখ ডুবিয়ে আদর আঁকতে আঁকতে বললো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৩
—’ তাহলে? কিসের রাগ দেখাচ্ছিস আমার ওপর? আমার কি দোষ? তোর পিছনেও যে এতো ছেলেপুলের লাইন। আমার জ্বলে না? হুম? হৃদপিণ্ড জ্বলে পুড়ে তামা তামা হয়ে যায়৷ বুঝিস সেটা?
একা আমার ওপর রাগ খাটাচ্ছিস। আমিও রেগে আছি। একরাতের আদর দিয়ে এমন মুখ ফিরিয়ে নিলে আমার কতটা কষ্ট হয় টের পাস? কাল ছেড়ে দিয়েছি তোর কষ্ট হবে বলে। আজ পারবনা ছাড়তে। রাগ ভাঙা আমার, আমাকেও ভাঙাতে দে তোর রাগ। আদর করবো এখন। রেসপন্স করবি। কেমন? আমার সাথে রেসপন্স করলে কষ্ট কম হবে। করি আদর?’
