সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৪
জাবিন ফোরকান
পেটে ভীষণ ক্ষুধা। অথচ খাওয়ার মানসিকতা গায়েব। শরীরে জ্বালা, অন্তরে বরফ। নিজের রুমে আরামকেদারায় দুলছেন জেসমিন। কত সময় পেরিয়েছে তার হিসাবে নেই। চুলগুলো খোলা, উষ্কখুষ্ক ঝার পাকিয়ে তা নেমে গিয়েছে মেঝের দিকে। পরনের শাড়ীটাও খানিক এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। আঁচল ঝুলে আছে। অথচ জেসমিনের কোনো খেয়াল নেই। চোখদুটো কেমন যেন ফাঁপা তার। নিরেট গোলা, অনুভূতিহীন। এক অশরীরী যেন। রোজিনা নিজের মালকিনকে এর আগে কোনোদিনও এমন রূপে দেখেনি।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে চেয়ে দেখলো জেসমিনকে নিঃশব্দে। বেশ খানিকটা সময় পর অদ্ভুতুড়ে এক নিষ্প্রাণ গলায় জেসমিন বললেন,
“সবাই তো চলে গিয়েছে আমায় একলা রেখে। তুই আর থেকে গেলি কেন?”
রোজিনা ডুকরে কেঁদে উঠলো। তবে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে জোরপূর্বক শব্দ নিবারণ করে সে বললো,
“আপনার নুন খাইসি, যাই কেমনে?”
জেসমিন কোনো জবাব দিলেন না। না তো ঘুরে তাকালেন মেয়েটার দিকে। ওই একইভাবে তিনি দুলে যাচ্ছেন আরামকেদারায়। তার কোলের উপর রাখা একটা ছোট বাবুদের শার্ট। পুরাতন, ছিঁড়ে গিয়েছে খানিকটা। ছেঁড়া অংশে সুন্দর করে সুতা দিয়ে এমব্রয়ডারি করা হয়েছে। জেসমিন নিজেই করেছেন। সেটি আঁকড়ে ধরে বসে আছেন তিনি। এই ছোট্ট শার্টে জড়ানো তার অংশের শরীরের ঘ্রাণ। এটা জড়িয়ে ধরলে মনে হয়, যেন সে তার কাছেই আছে, একদম তার বুকের মাঝে। রোজিনা জিজ্ঞেস করলোনা, শার্টটা কার। তবে সে এটুকু নিশ্চিত, ওটা আয়দানের নয়।
রোজিনা চলে গেলো। জানে, জোর করে মালকিনকে খাওয়ানো যাবেনা। গত ২০ ঘণ্টা যাবৎ তিনি এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলেননি।
জেসমিন জানেন না, ঠিক কত ঘন্টা পেরিয়েছে। মনে হলো, এখন বুঝি মাঝরাত। কে জানে? রোজিনা এলো আবারো। তবে তাকে খাওয়ার অনুরোধ করতে নয়।
“আপনার লগে একজন দেখা করবার আইছে, ম্যাডাম।”
জেসমিন মাথা হেলিয়ে নির্বিকার তাকালেন, রোবটের মতন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ? তার স্বামী, ছেলে কেউই নয় তিনি নিশ্চিত। অল্প একটু মলিন হেসে তিনি উত্তর করলেন,
“নিয়ে আয় তাকে আমার রুমে।”
রোজিনা অবাক হলো। নিজের রুমে আমন্ত্রণ জানানোর মানুষ জেসমিন নন। খানিকটা ইতস্ততও করলো সে। তবে শেষমেষ আজ্ঞা পালন করে চলে গেলো। মিনিট কয়েক বাদে ঘ্রাণটা নাকে এলো জেসমিনের। বেলী ফুলের মাতোয়ারা করা সুবাস। সঙ্গে পায়েলের মৃদু ঝংকার। না চাইতেও কৌতূহলবশত মুখ তুলে তাকালেন তিনি। আঁধার কেটে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন ঝকঝকে হলুদ বর্ণের শাড়ী পরিহিতা এক রমণী। পরিপাটি করে লম্বা বেণী পাকানো ঘন চুল, চোখের নিচে গাঢ় কাজল আর কপালে ছোট্ট কালো টিপ। বয়স কত? আন্দাজ করা ভীষণ কঠিন, এতটাই লাস্যময়ী গড়ন। জেসমিন নিজের স্থানে জমে গেলেন। রমণীকে খুব চেনা চেনা লাগছে।
“আসসালামু আলাইকুম, জেসমিন সাহেবা। আমি সাবিনের আম্মু, সাবিনা।”
তড়িৎ খেলে গেলো জেসমিনের শরীরে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো হৃদয়, অথচ তিনি চেয়ার ছাড়লেন না। শুধু স্থির চেয়ে রইলেন। অন্য সময় হলে হয়ত এই মহিলা তার রুমে প্রবেশের আগেই জেসমিন সব তছনছ করে ফেলতেন। তবে আজ, জীবনের কঠিন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতরের অহংকার, দেমাগ এবং আত্মমর্যাদার অনুভূতি তিনি আর খুঁজে পেলেন না। এর বদলে সেথায় শুধুই শূন্যতা।
সাবিনা জেসমিনের অনুমতির পরোয়া করলেন না। সাবধানে ভেতরে ঢুকে বিছানার এক কোণায় জেসমিনের মুখোমুখি বসলেন। একবারের জন্যও দৃষ্টি ফেরালেন না বেয়াইনের উপর থেকে। দীর্ঘ সময় নীরবতা। তারপর একটি নিঃশ্বাস ফেলে মুখ খুললেন সাবিনা।
“মা, অনেক কঠিন একটা শব্দ তাইনা? সন্তান যখন নাড়ি ছিঁড়া বাইর হয়, তখন মনে হয় বুঝি এর চাইতে মরণও সহজ। অথচ আবার যখন ওই নাড়ি ছিঁড়া ধনটাকে বুকে তুইলা দেয়, তখন মনে হয় এই নাজুক প্রাণটার জন্য মরতেও পারি, মারতেও পারি!”
জেসমিন কোনো কথা বললেন না। নীরবে শুনে গেলেন। হাত দুটো শার্টের মাঝে আরো খামচে বসেছে তার। সাবিনা কাজল চোখে তার প্রতিক্রিয়া খেয়াল করছেন।
“সাবিনটা যখন আমার বুকে আসলো, তখন আমি ভুইলা গেছিলাম কি আমার অতীত, কি আমার ভবিষ্যত। আমার চোখের সামনে আছিলো শুধু আমার বর্তমান, আমার আম্মাজান। এক মুহূর্তের জন্য মনে হইছিলো, আমি আমার স্বামী ছাড়া বাঁইচা থাকবো, কিন্তু আমার বাচ্চা ছাড়া আমার কোনো গতি নাই, পরিচয় নাই। অভাবের তাড়নায় আমার বাপ মায়ে আমারে বেঁইচা দিসিলো কেমনে সেই হিসাব আমি আর মিলাইতে পারতাম না। কারণ আমার সামনে পুরা পৃথিবী একদিকে, আরেকদিকে আমার বাচ্চা।”
সরাসরি জেসমিনের চোখের দিকে তাকালেন সাবিনা। মোলায়েম কণ্ঠে শুধালেন,
“আপনারও এমন লাগছিলো, তাইনা? মিথ্যা বইলেন না। আমি জানি, এমনটাই অনুভব হইসিলো। মা তো মাই। সেই মা মানুষ হোক কি জানোয়ার। কালসাপও তার বাচ্চার গায়ে হাত দিলে আপনারে কামড়াইতে দুই সেকেন্ড চিন্তা করবেনা।”
জেসমিনের চোখ হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে গেলো। তিনি এই নারীর নয়নমাঝে তাকাতে পারলেন না। হুট করেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। সাবিনা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ধীরগতিতে এগোলেন জেসমিনের দিকে। দরদ মাখা গলায় বললেন,
“আমার সেই বাচ্চার সংসারের টানও আমারে আপনার দুয়ারে আইনা দাঁড় করাইতে পারেনাই। কিন্তু আজকে আমি আসলাম। কারো সংসার বাঁচাইতে আসিনাই, না তো আসছি কারো জীবন বাঁচাইতে। আমি আসছি, একটা মা-কে বাঁচাইতে। যে এই কুত্তার মতন পাষাণ জগতের রোষানলে ভুইলাই গেছে সবকিছুর আগে সে একজন মা। নিজের গর্ভে সে দুই দুইটা সন্তান ধারণ করছে। কাপুরুষ স্বামীর স্ত্রী হওয়ার আগে সে দুইটা জানের ধারক।”
জেসমিনের শরীর কাঁপতে লাগলো এবার। শার্টটা বুকে আঁকড়ে ধরলেন তিনি। সাবিনা কাছে সরে ঝুঁকলেন। যেমন করে ভয়ার্ত প্রাণীকে আদর করে মানুষ আগলে নেয়, তেমন করেই তিনি জেসমিনের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া হাত দুটো আলতো করে ধরলেন, শার্টটা তিনি কেড়ে নিলেন না, জেসমিনকে বুকে রাখতে দিয়েই ছলছলে নয়নে বললেন,
“বাচ্চাটারে খুব ভালোবাসেন, তাইনা?”
আর সহ্য করতে পারলেন না জেসমিন। এতটা সময় ধরে যে ঝড় বুকে দানা বেঁধে উঠেছিল, তা এবার টর্নেডো হয়ে ধ্বংসযজ্ঞ আরম্ভ করলো। যে নারীর অপবিত্র পরিচয়ের কারণে একটা সময় জেসমিন নিজের পুত্রবধূকে অপমান করেছিলেন, আজ সেই নারীর বুকেই আশ্রয় খোঁজা শিশুর মতন ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন তিনি। রুমের বাইরে দাঁড়ানো রোজিনা মুখে ওড়না চেপে জেসমিনের আকাশ বাতাস কাঁপানো আর্তনাদ দেখলো।
“ওকে ফিরে আসতে বলুন! আমার মতন পাপীর কথা আল্লাহ শুনবে না, আপনি বলুন আল্লাহকে! আমার প্রাণটা নিয়ে যাক, ওর প্রাণটা ছেড়ে দিক! আমার মতন জালিম ওই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কি করবে? ওর মতন ফুলটাকে আল্লাহ ফেলে যাক! বলুন না! একটু বলুন না আল্লাহকে!”
জেসমিনের অশ্রুজলে সাবিনার শাড়ী ভিজে উঠলো। অথচ তিনি ছাড়লেন না তাকে। বুকে শক্তভাবে আগলে রাখলেন। তার মাঝে ভয়ানকভাবে কাঁপতে কাঁপতে জেসমিন আহাজারি করলেন,
“আমি অপরাধী। আমি খু*নী! আমি আমার সন্তানের খু*নী! এই পৃথিবী আমাকে কোনোদিন মাফ করবেনা। কিন্তু আমার অংশটাকে যেন আল্লাহ মাফ করে। একটুখানি, ওকে একটুখানি সুখে বাঁচতে দিক। বিনিময়ে আমার ধ্বংস হোক! জগতের সবথেকে যন্ত্রণাদায়ক মৃ*ত্যুটা আমার কপালে লিখা হোক, তবুও আমার বাচ্চাটা বেঁচে উঠুক….”
সাবিনা কোনো উত্তর করতে পারলেন না। তার কাছে কিছুই করার নেই শুধু জেসমিনকে ধরে রাখা ছাড়া। আজ ভোলা ঘরে ফিরে এসেছে, কিন্তু সেই ঘরে যে বহুকাল আগেই আঁধার নেমে গিয়েছে! সময় ফুরালে হয়না সাধন। নিয়তির কাছে সকলেই অসহায় তখন।
॥ আমার মৃ*ত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি নিজেই এক মহাখু*নী। আমি নিজের হাতে নিজের সুখের সংসারটাকে গলা টি*পে হ*ত্যা করেছি। নালায়েক, কাপুরুষ আমি। নিজের পরিবার ধ্বংসের কারিগর আমি। সমাজের ব্যাধি পরকীয়ার দাস আমি। আমার পরিণতি যেন ভয়ানক হয়। আমার বাচ্চাটার ধ্বংসের সাথে সাথে যেন ধ্বংস হই আমি। হে পৃথিবী, আমার মতন পৌরষহীন জানোয়ারগুলোকে তুমি ক্ষমা করোনা। কোনোদিন না।
এই কীটের সমাপ্তির কারিগর কীট নিজেই।
—জাফর আরেফিন॥
নোটটা লিখা শেষ হলে সুন্দর করে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দিয়ে রাখলেন জাফর। অফিস কেবিন তার অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু একটা টিমটিমে টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সেই আলোতেই ড্রয়ার খুলে চকচকে কালো জিনিসটা হাতে নিলেন তিনি। লাইসেন্স করিয়েছেন কয়েক মাস আগেই। একদম নতুন জিনিস। বু*লে*টের নিশানায় কোনো হেরফের হবেনা।
আজকেই ডাক্তার প্রাথমিকভাবে তার অতীত রেকর্ড দেখে জানিয়ে দিয়েছেন, যদিও বা জায়দানের সঙ্গে তার টিস্যু হাফ ম্যাচ হয়, তার স্টেম সেল ব্যবহার করা খুবই রিস্কি। একই কথা শুনেছে আয়দানও। পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এমনিতেও ছেলেটার শরীর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বেশ। অন্য কাউকে ডোনেট করলে তার নিজের শরীরে এবং অন্য মানুষটার শরীরে যে বাজে প্রভাব পড়বে তা অনেকটাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়। যদিও ডাক্তার দুজনেরই এইচ এল এ টাইপিং করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন, তবে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল আসার আগে আশা রাখতে বারণ করে দিয়েছেন। ডাক্তারের কথা শোনার পর থেকে জাফর আর শান্তি পাচ্ছেন না।
নিজের কাঁধে সন্তানের লাশ বহনের আগে তিনি স্বয়ং লাশ হয়ে কাপুরুষতা দেখাবেন নাহয়। তার মতন একটা নিকৃষ্ট জীবের পতন হলে এই পৃথিবীর বিরাট পাপীদের ফর্দে একটা হলেও নাম কমে যাবে।
চোখ বুঁজে কপালে শীতল নল ঠেকিয়ে তিনি ট্রিগারে আঙুল চাপতেই যাচ্ছিলেন, তবে শেষমেষ পারলেন না। অসময়ে বেজে উঠল তার ফোন। জীবনের শেষ একটা ফোনকল রিসিভ করলেন তিনি।
“হ্যালো?”
তাহাজ্জুদে মাথা ঠেকিয়ে পরে আছে আয়দান। মসজিদের এক কোণায় তসবি জপতে জপতে চেয়ে আছেন ইমাম সাহেব। আজকে ছেলেটা দুপুরের ওয়াক্তে মসজিদে এসেছে। এর মাঝে আর বের হয়নি। ইমাম সাহেব প্রত্যেক ওয়াক্তে এসে দেখেছেন সেজদায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে সে। কখনো বা দীর্ঘক্ষণ দুহাত তুলে একান্তে প্রার্থনা করছে। এতটা অস্থির হতে আয়দানকে আর কখনোই দেখেননি ইমাম সাহেব।
সালাম ফিরানোর পর ইমাম প্রশ্ন না করে আর থাকতে পারলেন না।
“রহমানুর রহিমের কাছে এত করে কাউকে কিছু চাইতে দেখিনি কোনোদিন।”
আয়দান ঘুরে তাকালো। তার বাদামী চোখে লালচে টলটলে রেখা।
“চোখের পানির দামে কি জান কেনা যায়, হুজুর?”
ইমাম সাহেব মুচকি হাসলেন। তার ফর্সা নূরানী চেহারায় অদ্ভুতুড়ে এক আলোকচ্ছটা খেলে উঠলো বুঝি ক্ষণিকের জন্য। মসজিদের ছাদের দিকে মুখ করে চোখ বুঁজে ইমাম বললেন,
“আমাদের রব তোমায় দেখছেন। বিশ্বাস রাখো, তিনি দেখছেন তোমার অশ্রুফোঁটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রত্যেক লবণাক্ত অণু পরমাণুকেও। তাঁর কাছে দাম দিতে হয়না, তাঁর সবকিছুই বান্দার।”
কিছুক্ষণ বাদে মসজিদ থেকে বের হলো আয়দান। টয়লেট থেকে এসে সে পুনরায় ওযু করলো। শীতল একটা হাওয়া বইছে চারিদিকে। খানিকটা হেঁটে বিক্ষিপ্ত মনকে বাগে আনার তাড়নায় বাইরে বেরিয়ে এলো সে। শুনশান নীরবতা চারপাশ। পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে। দূরের একটা দুই তলা বিল্ডিংয়ের জানালায় আলো জ্বলছে। হয়ত কোনো পরীক্ষার্থী সাধনায় ব্যস্ত, নাহলে তারই মতো কেউ হন্যে হয়ে আশ্রয় খুঁজছে স্রষ্টার দুয়ারে। নিরিবিলি গলির প্রান্তে হাঁটু জড়িয়ে বসে থাকা এক ছায়া আয়দানের নজর কাড়লো। থেমে গেলো সে। ছায়ামূর্তি তার পদশব্দে সামান্য নড়ে উঠলো। মুখটা তুলে তাকাতেই হিজাবের আড়ালে টিমটিমে হলদে বাতির আলোয় ভেসে উঠলো মলিন মুখটি।
জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মীরা।
এত রাতে এই রমণীকে মসজিদের কাছের গলিতে এভাবে নির্ভয়ে বসে থাকতে দেখে আয়দান যতটা না অবাক হলো, তার চাইতেও বেশি অবাক বোধ করলো রমণীর চেহারার আর্তনাদ লক্ষ্য করে।
“কোথাও শান্তি পাচ্ছিনা। আমার সবটা কেমন উলোট পালট লাগছে। আমাদের রবকে বলো না, আমাদের একটুখানি শান্তি দিতে?”
আয়দান ইটের ইমারতের মতন ভেঙে পড়লো মীরার কথাগুলো শুনে। ওখানেই হাঁটু গেঁড়ে বসে গেলো সে। কাঁপা কাঁপা একটি হাত বাড়িয়ে মীরার হাতটা তুলে সে আঙুলগুলো নিজের কপালে ঠেকালো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আয়দানের অশ্রু টপটপ করে গড়াতে লাগলো মীরার পরনের পোশাকের কোলে। মীরা নিজের অশ্রু বহু কষ্টে সংবরণ করে দুহাত বাড়িয়ে আয়দানের মাথার দুপাশ চেপে ধরে রাখলো, প্রচন্ড কান্নার দমকে দুলছে ছেলেটা। মীরা তাকে ঐভাবে ছুঁয়ে শান্ত করতে চাইছে যেন। আয়দান কান্নার মাঝখানে ভাঙা গলায় বলে উঠলো,
“আমার রব আমাদের কবুল করবেন! তিনি আমাদের জানেন, বোঝেন, অনুভব করেন! কসম, তিনি আমায় ফেরাবেন না! তাইনা মীরা? তাইনা?”
মীরা কোনো জবাব দিতে পারলোনা। অশ্রু হার মেনেছে তারও। এমন সময় আয়দানের পকেটে থাকা মিউট করা ফোনটা হঠাৎ ভাইব্রেট করে উঠলো। মীরা দুহাত মাথায় চেপে রাখা অবস্থায়ই ঝুঁকে থেকে সে ফোনটা খুললো। ঝাপসা দৃষ্টিতে স্ক্রীনের দিকে তাকালো। কলার আইডিতে ভাসছে একটি নাম,
মিসির ভাইয়া।
ভোররাত প্রায়। জায়দানের বাইকের সামনে বসে তার বুকে লেপ্টে আছি আমি। কক্সবাজার থেকে সন্ধ্যার পরপর রওনা দিয়ে ঢাকায় ফিরছি আমরা। মাত্র একদিনে এত ধকল জায়দানকে নিতে দিতে চাইনি। অথচ বান্দা নাছোড়বান্দা। সে আজই ঢাকা ফিরবে। কারণ, তার কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়ে গিয়েছে। পথে ইতোমধ্যে দুবার বিরতি নিয়েছি। একবার চায়ের, আরেকবার রাতের খাবারের। আমার চোখ দুটো ঘুমে বুঁজে আসছে প্রায়। ঠান্ডা বাতাসে, স্বামীর বুকের মাঝে অতি আরামে ঘুমিয়েও হয়ত গিয়েছিলাম। হঠাৎ করেই নিজের পিঠে শক্ত হাতের উপস্থিতিতে নড়েচড়ে উঠলাম। হেলমেটের আড়াল থেকে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলাম, জায়দান আগের চাইতে কিছুটা বেশি গতিতে বাইক চালাচ্ছে।
চোখ মিটমিট করলাম। জড়ানো গলায় বললাম,
“আস্তে জায়দান। তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। আমরা শহরে ঢুকেই পড়েছি। শুধু আর একটু…”
আমার কন্ঠ মাঝপথে থেমে গেলো যখন খেয়াল করলাম পিছন থেকে একটি রেঞ্জ রোভার ধেয়ে আসছে। গুলশান, বনানীর মতন এলাকায় এই দৃশ্য খুব নতুন নয়। তবে, গাড়িটা রেঞ্জ রোভার বলেই আমার খটকা হলো। সেই খটকা বিশ্বাসে বদল নিতে একটুও সময় লাগলোনা।
“বাইক থামাও! এক্ষুণি বাইক থামাও, জায়দান!”
জায়দানের বুকে চাপড় দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠলাম। বিনিময়ে আমাকে শক্তভাবে চেপে আমার হেলমেট শুদ্ধ মাথাটা নিজের বুকে লুকিয়ে ফেলে জায়দান বললো,
“ওদের কাছে পি*স্তল আছে। আমি স্পিড বাড়াচ্ছি।”
বুকের ভেতর ভয়ানক কাঁপুনি ধরলো আমার। আঁকড়ে ধরলাম জায়দানকে। মাথা কাত করে গাড়িটাকে দেখলাম। ধেয়ে আসছে জান্তবের মতন। আমার কাঁপুনি খেয়াল করে একটি হাত হ্যান্ডেলে রেখে অন্য হাতটি হেলমেটের ভেতরে আমার গলায় চেপে জায়দান বাতাসের জোর কাটিয়ে গভীর গলায় বললো,
“আমি আছি। আমি ছিলাম, আমি থাকবো।”
“তোমার কথাগুলো বিদায়ের মতন কেন শোনাচ্ছে? এমনটা তো কথা ছিলনা! এমনটা হওয়ার কথা ছিলনা মাই লাভ!”
হাহাকার করে উঠলাম। আমার হাহাকার ছাপিয়ে জায়দানের গভীর কন্ঠস্বর ধ্বনিত হলো,
“ডু ইউ ট্রাস্ট মি?”
“উইথ অল মাই লাইফ!”
রেঞ্জ রোভার গাড়িটা এবার প্রায় বাইকের কাছাকাছি এসে পড়েছে। একপাশ থেকে চেপে ধাক্কা দিতে চাইছে। গাড়ির কাঁচ তুলে দেয়া থাকায় ড্রাইভারকে দেখা সম্ভব হচ্ছেনা। জায়দান আমাকে ছেড়ে দিয়ে দুহাতে হ্যান্ডেল চাপলো। বাইকের ঝোড়ো গতি রাতের নীরবতা চিঁরে ভয়ানক গর্জন তুললো।
“এক মুঠো স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থেকো তুমি, রাত্রির ঘুমে হাজির হয়ে সে স্বপ্নগুলো রাঙিয়ে দেব আমি।”
কানে গোত্তা খেলো শব্দগুলো। অতি আবেগ ভরা। আমার সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো এক ঝটকায়। তারপরই থপ করে একটা শব্দ। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে একটা হাত পি*স্তল তাক করে গু*লি ছুঁড়েছে। জায়দান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে বাইকটা বাঁক কাটিয়ে ফেললো। তবে পরপর তিনবার সে একইভাবে বু*লে*টকে ফাঁকি দিতে পারলোনা। প্রচন্ড ঘুরে সরে আসায় বাইকটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। টায়ারের কর্কশ আর্তনাদ উঠলো সড়কের পিচে। মনে হলো, পৃথিবীটা উপর নিচ হয়ে গেলো আমার। অনুভব করলাম বাইক থেকে ছিটকে রাস্তায় পরে গিয়েছি আমি। তবে সড়কের শক্ত পিচ আমার শরীর ছুঁতে পারলোনা। এর বদলে নিজেকে আবিষ্কার করলাম জায়দানের বুকের মাঝে। বাইকের সঙ্গে সঙ্গে বেশ খানিকটা পথ আমাদের শরীর দুটো আছাড় খেয়ে ছিটকে গেলো। ওই ক্ষীণ কতক মুহূর্ত আমায় কাছে টেনে নিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিজের শরীরের উপর ধরে রাখলো জায়দান। যতটুকু যা ধ্বংসযজ্ঞ গেলো, সবটুকু গেলো আমার স্বামীর শরীরের উপর দিয়েই, আমার গায়ে একফোঁটা আঁচ সে আসতে দিলোনা।
ভয়ংকর কিছু দানবিক শব্দ। ধাতব বাইক দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া, গাড়ির টায়ারের কর্কশ উচ্ছ্বাস, অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এরপর হঠাৎ করেই সবকিছু শান্ত। অতিরিক্ত শান্ত।
আতঙ্কে চোখ বুঁজেই ফেলেছিলাম। এই বুঝি সমাপ্তি নিশ্চিত। অথচ বুকের ভেতর লাফাতে থাকা হৃদপিন্ডের অস্তিত্ব আমায় জাগিয়ে তুলল। নিজের শরীরটা আবিষ্কার করলাম শক্ত পাথুরে প্রশস্ত এক বুকের উপর। নীরব, নির্ভার এবং নিশ্চল এক বুক! শরীরের সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা উপেক্ষা করে লাফিয়ে উঠলাম আমি। ধপাস করে পড়লাম সড়কের উপর। কোথায় গাড়ি, কোথায় বাইক, কোথায় বু*লেট? কোনোকিছুর পরোয়া আর নেই আমার মাঝে।
জায়দান চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। হেলমেটের একপাশ ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গিয়েছে তার। পরনের জ্যাকেট এবং শার্ট ধুলোয় মাখামাখি। একচুল নড়ছেনা সে। নিজের হেলমেটটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে লাফিয়ে পড়লাম আমি তার বুকের উপর।
“না! না না না!”
জপতে জপতে আমি ভূমিকম্প খেলে বেড়ানো দুহাতে জায়দানের হেলমেটটা খুলে নিলাম টান দিয়ে। তারপরই মাথাটা এলিয়ে পড়লো শক্ত সড়কের উপর। সঙ্গে ছিলকে উঠলো একদলা থকথকে র*ক্ত। জায়দানের চেহারাটা আমি রক্তাভ তরলের স্রোতে আর দেখতেই পেলাম না। লাল টকটকে দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমার সমস্ত অস্তিত্ব ফেঁড়ে রাতের নৈঃশব্দ্য ভেঙে চুরমার করে আর্তচিৎকার ধ্বনিত হলো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৩
“জায়দান….বেঈমান!!!!”
***
“জারিন?”
ডাকটা কানে যেতেই ছোট্ট দুখানা হাত অতি দ্রুত টেবিলের উপর খুলে রাখা ডায়েরীটা চাপ দিয়ে বন্ধ করে ফেললো। পরবর্তী পৃষ্ঠায় কি আছে, কিংবা আদৌ কিছু আছে কিনা সেটা দেখার আর সৌভাগ্য হলোনা তার। ডাকটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। লাফিয়ে উঁচু চেয়ারটার উপর থেকে নেমে পড়লো সে। তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দিতে দিতে গুটিগুটি পা ফেলে দৌঁড়ে গেলো,
“আততি মাম্মাম!”
