সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬১
জাবিন ফোরকান
আজ সাবিন বাড়িতে ফিরলো তুলনামূলক জলদিই। সন্ধ্যা নেমেছে জগতে। হাতে বয়ে নিয়ে আসা ব্রিফকেস ক্যাবিনেটের উপর রেখে সে যখন পায়ের বুট জুতা জোড়া খুলে নিতে ব্যস্ত, তখনি কানে পৌঁছালো সুরেলা কণ্ঠ দুটো।
“রেলগাড়ি রেলগাড়ি চলে এঁকে বেঁকে, বাঁশি বাজায় জোরে জোরে একটু থেকে থেকে…”
“লেলগালি লেলগালি তলে একে বেকে, বাতি বাদায় দোলে দোলে একতু তেকে তেকে…”
“রেলগাড়ি।”
“লেলগালি!”
“হাহাহা!”
সাবিন উত্তেজিত হয়ে পড়লো সহসাই, অপেক্ষা করতে পারলোনা আর। কোনমতে পরনের কোট খুলে ছুঁড়ে ফেলে দৌঁড়ে চলে এলো এন্ট্রেস পেরিয়ে হলঘরের ভেতর। যেটা ভেবেছিল সেটাই। মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানারকম খেলনা। কফি টেবিলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছেন সাবিনা। হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখছেন নাতনী জারিনকে। যে এই মুহূর্তে রেলগাড়ির ভঙ্গিতে তাকে ঘিরে কফি টেবিলের চারপাশে ঘুরছে আর স্বর্ণের চুড়ি পড়া হাত দুটো একত্র করে তালি দিতে দিতে ডেকে উঠছে,
“লেলগালি! জিক জিক জিক! লেলগালি!”
দৃশ্যটা সাবিনের অন্তরকে উষ্ণতায় পরিণত করে ফেললো। দুহাত বাড়িয়ে ছুটে গেলো সে বাচ্চাদের মতন, নিজের জননীর উদ্দেশ্যে।
“আম্মু!”
সাবিনা উঠে দাঁড়াতেই সাবিন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকে। নিজের সন্তানকে আগলে নিলেন তিনি অতি স্নেহে। অপরদিকে নিজের জন্মদাত্রীকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে খেলা ছেড়ে ছুটে এলো জারিনও। ছোট্ট হাত দুখানা বাড়িয়ে সাবিনের একটি পা জড়িয়ে ধরলো।
“মাম্মাম!”
তিন প্রজন্মের রমণীগণ আজ একত্রিত, এক ছাদের নিচে। সাবিন নিজের মায়ের বুকে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে মুখ গুঁজে শুধালো,
“তুমি আজ আসবে আমাকে আগে বলো নি কেন?”
“তোমারে সারপ্রাইজ দিলাম আম্মাজান, পছন্দ হয়নাই?”
“খুব পছন্দ হয়েছে। থ্যাংক ইউ।”
পায়ে জারিনের আঙুলের স্পর্শ টের পেয়ে অবশেষে নিজের মাকে ছাড়লো সাবিন। নিচে তাকালো। ডাগর ডাগর বাদামী আঁখি মেলে চেয়ে আছে তার অংশ। এবার তার নিজের মায়ের দায়িত্ব পালন করার পালা। ঝুঁকে ছোট্ট মেয়েকে কোলে তুলে নিলো সে। গালে চুমু খেয়ে বললো,
“কেমন আছে আমার সোনাটা? নানুমণির সঙ্গে খেলছ তুমি, হুম?”
“উ! নালুমলি আল জা-ইন কেলচে!”
সাবিন সাবিনার দিকে তাকালো,
“তোমাকে জ্বালিয়ে মেরেছে এতক্ষণ, তাইনা?”
“জ্বালানো? আমি আসিই শুধু আমার ছোট্ট রাজকন্যাটার সাথে খেলতে, আর তুমি এইটারে জ্বালানো বলো আম্মা?”
“রাজকন্যা? তাই বুঝি? এখন আমি তোমার কেউ না?”
ঠোঁট ফোলালো সাবিন। তাতে সাবিনা হেসে নিজের মেয়ের থুতনি চেপে তার গালে স্নেহের চুমু দিয়ে বললো,
“আপনি তো আমার আম্মাজান! আম্মার জানের ভেতর আপনি থাকেন, জানেন না?”
“ইয়ে! মাম্মাম নালুমলির দান! দান দান!”
“ওরে পাকনা বুড়ি রে আমার!”
জারিনের নাক টেনে দিলেন সাবিনা। ছোট্ট শিশুটির কথায় উভয় প্রাপ্তবয়স্ক রমণী হেসে উঠলো আপনমনে। জারিনকে সাবিনার কোলে দিয়ে সাবিন বললো,
“আচ্ছা আম্মু, তুমি বসো। আমি ফ্রেশ হয়ে ঝটপট কিচেনে গিয়ে রাতের খাবারটা ঠিকঠাক করে ফেলি। আজ না খাইয়ে তোমাকে ছাড়ছি না, কোনো কথা শুনবো না আমি।”
“আম্মা, তোমার কিচ্ছু করতে হইব না, বুঝছো? তুমি যাও, মুখ হাত ধুইয়া আসো। আমি আইসাই সব রান্না কইরা রাখছি।”
“তুমি এত কষ্ট করতে গেলে কেন?”
“ইশ! করব না কেন? আমার আম্মা আর আমার রাজকন্যাটা আমার হাতের বিরিয়ানী কত্ত পছন্দ করে!”
“বিলানী! ইয়ে ইয়ে!”
সাবিনার কোলে শরীর দুলিয়ে নেচে উঠলো জারিন, আনন্দে। তার এমন উত্তেজনায় আরেক দফা হাসলো সকলে। সাবিন দ্রুতই চলে গেলো নিজের রুমে। ফ্রেশ হয়ে একটা ফ্রক পরে ভেজা চুল কোনমতে মুছেই নিচে নেমে এলো সে। ততক্ষণে খাবারের টেবিল সাজিয়ে ফেলেছেন সাবিনা। জারিনকে তার উঁচু বিশেষ চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছেন। বিরিয়ানীর দানা মুঠো করে দলিত মথিত করে ফেলে খাচ্ছে জারিন। ইতোমধ্যে মুখে অনেকখানি মেখে ফেলেছে। খানিকটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছে বেবি প্লেটের চারপাশে। এরপরেও হাল ছাড়ছেনা সে। পরে যাওয়া দানাগুলো গুছিয়ে নিজে নিজেই আবার প্লেটে রাখছে নয়ত মুখে দিচ্ছে জারিন। খাওয়াটা প্রায় আয়ত্ত্বে এনে ফেলেছে প্রফেসরের কন্যা সন্তান। সাবিন আসতেই সাবিনা নিজের মেয়েকে প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন। তবে নিজে খেতে নারাজ সে।
“না! তুমি খাইয়ে দাও!”
চোখ উল্টালেন সাবিনা। তিনি এলেই সাবিন কেমন যেন বাচ্চাটি হয়ে যায়। এই মেয়ের নিজেরও একটা বাচ্চা আছে কে বলবে? তবে সাবিনের এমন স্বভাবটাই যে ভীষণ আদুরে! সাবিনা মেয়েকে গ্রাস মাখিয়ে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন,
“তোমার নিজের মেয়ে কি সুন্দর নিজে নিজে খাচ্ছে, আর তুমি আমার হাতে খাওয়ার বায়না ধরো এখনো। লজ্জা নেই?”
“না নেই। আমি নির্লজ্জ আজকে জানলে?”
দাঁত কেলিয়ে হাসলো সাবিন। মুহূর্তটা অত্যন্ত আনন্দময়। সাবিনা মেয়েকে বেশ কয়েক গ্রাস খাইয়ে শুধালেন,
“শুনছি, ছোট আরেফিন সাহেব নাকি ছাড়া পাইতেসে?”
জারিনের সঙ্গে খুনসুঁটিতে মেতে থাকা সাবিন মাথা দোলালো। খাবারটুকু গিলে জানালো,
“হুম। এইতো, সামনের মাসের ৭ তারিখ।”
“যাক। আল্লাহ্ তাইলে রহম করছেন ছেলেটার উপর।”
সাবিন নিষ্পলক চেয়ে রইলো সাবিনার দিকে। নিজের মাকে অবধি সাবিন আজ অবধি সত্যিটা বলেনি। কোনোদিন হয়ত বলতেও পারবেনা। কারণ আয়দানের কাছে সে ওয়াদা করেছে, চরম সত্যিটা কেউ কোনোদিন জানতে পারবেনা। তবে সাবিনা তো মা, উনি আন্দাজ করতে পারেন? করলেও, তিনি কোনোদিন এই নিয়ে সাবিনকে জিজ্ঞেস করেননি। নীরবে দূর থেকে একটি ছায়া হয়ে মেয়ের পাশে থেকেছেন তিনি এই কয়েক বছর। সাবিনকে ভাবনায় ডুবে যেতে দেখে সাবিনা একটি হাত বাড়িয়ে মেয়ের কাঁধে রাখলেন,
“পরিবারটা অসম্পূর্ণ লাগতেছে, তাইনা?”
কেঁপে উঠলো সাবিন। চোখ পিটপিট করে জন্মদাত্রীকে দেখলো। মোলায়েম এক হাসি ঠোঁটে মেখে সাবিনা মেয়ের মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দিয়ে জানালেন,
“রহমতের বর্ষণ কেবল শুরু হইলো। ধৈর্য্য ধরছো এতগুলা দিন, আর কিছুদিন ধরো। আমার বিশ্বাস, আব্বাজান আর তোমার সাথে ভালো কিছুই হবে। আব্বাজানের তো এখন একটা প্রাণভোমরাও চলে আসছে পৃথিবীতে, উনি না আইসা পারবে?”
সাবিনের চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। হাত বাড়িয়ে নিজের মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে মুখ ডুবিয়ে ফেললো সে। তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন সাবিনা।
খাওয়ার পর্ব শেষে সাবিনের বেডরুমে পৌঁছালো সকলে। বিছানার হেডবার্ডে হেলান দিয়ে বসেছেন সাবিনা, তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে সাবিন এবং সাবিনের বুকের উপর গুটিশুটি দিয়ে শুয়েছে ছোট্ট জারিন। ইতোমধ্যে ঘুমের দেশে হারিয়ে গিয়েছে বাচ্চাটি, সাবিন অতি আদর ভরা স্পর্শ ছুঁয়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মেয়ের সারা শরীরে। অপরদিকে সাবিনা যত্ন নিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছেন সাবিনের খোলা চুলে। দৃশ্যটি অপূর্ব। মায়ের কোলে তার সন্তান এবং সেই সন্তানের কোলে তার সন্তান। পৃথিবীতে এর চাইতে আবেগী দৃশ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
দীর্ঘ আরামদায়ক এক নীরবতা ভেঙে সাবিন একদম মৃদু গলায় হঠাৎ এক প্রশ্ন তুলল,
“আম্মু?”
“হুম?”
“তুমি সত্যিই জানো না জেসমিন শিকদার এখন কোথায়?”
সাবিনা ক্ষণিকের জন্য থমকে পড়লেন। কয়েক সেকেন্ড বাদেই তিনি স্বাভাবিকভাবে যেভাবে বিলি কাটছিলেন, তেমনটা করতে লাগলেন। ঠোঁটের হাসিটি বিস্তৃত হলো তার।
“তোমার কেন এমন মনে হয় উনি কোথায় আছে সেইটা আমি জানি? শুধু একবার ওনার সাথে দেখা করতে গেছিলাম বইলা?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো সাবিন। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
জেসমিন শিকদার— নামক মানুষটা রীতিমত কর্পূরের মতন উবে গিয়েছেন প্রত্যেকের জীবন থেকে। সেদিন সাবিনকে একটা চিঠি দিয়ে এবং কথাগুলো বলে চলে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার তাকে দেখা যায়নি। তিনি না নিজের বাড়িতে ফিরেছেন, না তো কোনো পরিচিতজনের কাছে গিয়েছেন। কেউই জানেনা তার গন্তব্যের হদিস। কোথায় গিয়েছেন, কেন গিয়েছেন, আদৌ কোনোদিন ফিরে আসবেন কিনা, এইসব প্রশ্নের উত্তর এতগুলো বছরে খুঁজে পায়নি সাবিন। তিনি এই পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে এখনো বেঁচে আছেন নাকি পরকালের যাত্রী হয়েছেন তা সম্পূর্ণ অজানা। যে জেসমিন এতগুলো মানুষের জীবন ধ্বংসের অন্যতম কারিগর, সেই জেসমিনই নিজেকে মানুষগুলোর কাছে সবথেকে বড় রহস্য বানিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।
“আত্মগ্লানি বড়ই ভয়ংকর আম্মা, ভেতর থেইকা পুরা নিঃশেষ কইরা দেয়, মরার আগেই জিন্দালা*শ বানাইয়া ফেলে।”
সাবিনার কন্ঠে বাস্তবে ফিরে এলো সাবিন। তিনি ঝুঁকে মেয়ের কপালে চুমু এঁকে ফিসফিস করে বললেন,
“মাঝে মাঝে যেই শান্তি তোমারে এই পৃথিবী দিতে পারেনা, সেইটা দেয় একাকীত্ব। এই একাকীত্ব অভিশাপ, আবার একাকীত্ব প্রায়শ্চিত্ত।”
চোখ বুঁজে ফেললো সাবিন। জন্মদাত্রীর কোমল কন্ঠ শুনতে শুনতে নিজের বুকে ঘুমিয়ে থাকা যক্ষের ধনকে আগলে রাখলো। একটা সময় সে নিজেও ঘুমের জগতে পাড়ি জমালো। জেগে থাকলেন শুধু সাবিনা, যিনি প্রাণভরে তার সন্তান এবং নাতনীকে পরম শান্তিতে ঘুমাতে দেখলেন।
৭ ই নভেম্বর।
কিছুক্ষণ আগেই নিজের সব জিনিসপত্র ফেরত পেয়েছে আয়দান। বহুদিন বাদে জেলের পোশাকের বদলে সাধারণ একটা ফ্লানেলের শার্ট আর প্যান্ট শোভা পাচ্ছে তার শরীরে। মাথায় একটা ক্যাপ, ছোটখাট জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে। সে যে ওয়ার্ডে ছিলো, তাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়া হয়ে গিয়েছে। অনেকেই এসেছে তাকে গেট অবধি এগিয়ে দিতে। জেল সুপার, কর্মচারী এমনকি বাগানের মালি; এমন কোনো মানুষ বাকি নেই যে আয়দানের প্রতি সহানুভূতিশীল নয় কিংবা তার জেলমুক্তিতে খুশি নয়। মানুষটাই যে এমন! তার সাহায্যের হাত পেয়েছে প্রায় সকলে। তাকে না ভালোবেসে থাকা যায়?
সবার থেকে বিদায় শেষে আয়দান যখন জেলের গেট পেরিয়ে বাইরে পা রাখলো, তখন মৃদু সূর্যরশ্মি তার সমস্ত শরীরকে মায়াবী এক উষ্ণতায় ছেয়ে ফেললো। ঝরঝরে বাতাস ঝাঁপটা দিয়ে গেলো তার গায়ে, যেন তার মুক্তিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে স্বয়ং প্রকৃতি। বুক ভরে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করলো আয়দান। তারপর সামনের দৃশ্যটি নজরে এলো।
সড়কের ধারে দাঁড়ানো দুটি গাড়ি। একটি রেঞ্জ রোভার, আরেকটি ফেরারি। গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাবিন, মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হলেও গভীর দৃষ্টি খেলা করছে মেয়েটার চোখজুড়ে। তার পাশে মিসির, ঠোঁটে মোলায়েম এক হাসি। তাদের ঠিক সামনেই রীতিমত স্প্রিংয়ের মতন লাফাতে থাকা ছোট্ট জারিন। গোলাপী ফ্রক পরনে, স্ট্রবেরীর প্রিন্ট আঁকা। কানে চকচকে স্বর্ণের দুল। মাথায় মসৃণ চুল দুটো তালগাছের মতন ঝুঁটি করে রাখা। একদম টুকটুকে একটি পুতুল মনে হচ্ছে তাকে।
“তাত্তু!”
আয়দানকে দেখেই দিগ্বিদিক ভুলে দুহাত বাড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে ছুটে গেলো জারিন। আয়দানও দৌঁড় দিলো। সামনে এসেই হাঁটু মুড়ে বসে জারিনকে কোলে তুলে নিজের বুকে চেপে ফেললো।
“আমার মা।”
“তাত্তু! তাত্তু! তাত্তু বাতায় দাবে, জা-ইনের সাতে তাকবে!”
“হ্যাঁ। চাচ্চু এখন থেকে সবসময় আমার মায়ের সাথে থাকবে।”
“ইয়ে, কি মজা। ওক্কাম, তাত্তু!”
জারিন নিজের মুঠো করে রাখা হাত মেলে ধরলো আয়দানের মুখের সামনে, তাতে একটি নাট চকলেট। আয়দান গভীর নয়নে দেখলো, তার চেহারা অসীম আবেগে ভেসে উঠলো। ঝুঁকে চকলেট টা হাতে নিয়ে জারিনের হাতে চুমু এঁকে দিলো আয়দান।
“থ্যাংক ইউ মাই সুইটহার্ট, চাচ্চু লাভ্স ইউ সো মাচ।”
জারিন আয়দানের গলা জড়িয়ে ধরে রইলো। তাকে কোলে নিয়েই হেঁটে সামনে এলো আয়দান। মিসির হেসে এগিয়ে পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে উঠলো,
“ওয়েলকাম ম্যান, ফাইনালি!”
“মিসির ভাইয়া, ভালো আছো?”
“অসাধারণ আছি। তোকে বাসায় তুলতে পারলে এখন শান্তি। আমার দায়িত্ব কিছুটা হলেও শেষ হবে।”
“তোমাকে যত ধন্যবাদ দিই না কেন কম হয়ে যাবে, মিসির ভাইয়া। আমার অবর্তমানে পরিবারটার খেয়াল রাখার জন্য আমি তোমার কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ।”
“ওকে ওকে, বাকি গল্প আমরা পরেও করতে পারবো। এখন গাড়িতে ওঠ।”
একটাও কথা না বলে সাবিন নিজের রেঞ্জ রোভারের দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে চেপে বসলো। আয়দান একনজর মিসিরের দিকে তাকালো। ইশারায় উভয় পুরুষের বাক্য বিনিময় হলো। মিসির নিজের ফেরারিতে চাপলো, আয়দান সাবিনের পাশে প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসলো জারিনকে নিয়ে।
সাবিন গাড়ি চালানো শুরু করলো। পিছনে মিসিরের গাড়ি তাদের অনুসরণ করে আসছে। প্রথমটায় নীরব থাকলো সবকিছু। শুধু জারিন আর আয়দানের খুনসুঁটি সেই নীরবতা ভঙ্গ করলো। শেষমেষ সাবিন স্টিয়ারিং চেপে ধরে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলো,
“তুই এর মধ্যেই আরেফিন কোম্পানির চেয়ারে বসার পাঁয়তারা শুরু করেছিস কোন সাহসে? তোর কি মনে হয়? আমি অযোগ্য? তোর মতন কাউকে নিজের বাড়িতে রেখে দুটো দিন খাওয়ানোর মতন মুরোদ নেই আমার?”
আয়দানকে খানিকটা বিরক্ত দেখালো। জারিন তার কব্জিতে থাকা পুরাতন হাতঘড়ি নিয়ে মেতে আছে। ভাতিজিকে ওভাবেই আগলে রেখে সে ভ্রু কুঁচকে সাবিনের দিকে তাকালো,
“সাধে কি বলি তুই মাথামোটা? গরুর ঘাস খেয়ে বড় হয়েছিস বোধ হয়।”
“একটা ধাক্কা দিয়ে তোকে গাড়ির বাইরে ফেলে দেবো বেয়াদব! সম্পর্কে আমি তোর ভাবী লাগি!”
হেসে ফেললো আয়দান। পরক্ষণেই মুখে হাতচাপা দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বললো,
“উপস, সরি, মাই মিস্টেক।”
“তোর মিস্টেক তোর পিছনে ভরে রাখ, ঠিক আছে? আমায় যতদিন না বলবি তোর প্ল্যান কি, ততদিন কিন্তু আমি সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেবো না। জেল থেকে বেরিয়েই টাকা উড়ানোর ধান্দা?”
আয়দানকে খানিক ভাবুক দেখালো। তারপর খিলখিল করে হেসে সে বললো,
“সোজা বাংলায় স্বীকার করে নিলেই হয় তুই চাচ্ছিস এত বছর জেল খাটার পর আমি কয়েক মাস শুয়ে বসে সময় কাটাই। এত রাগ দেখিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বললেও হয়, চিল গার্ল চিল!”
সাবিন রীতিমত স্টিয়ারিং চাপড়ে লাফিয়ে উঠলো। অগ্নিদৃষ্টি ভর করল চোখ দুটোয়। সে খেঁকিয়ে উঠলো,
“ইশ! শখ কত! আমি দোয়া করেছিলাম ছয় বছরের বদলে যদি তোর একশো বছর সাজা করানো যেতো, তাহলেই বরং আমার লাভ হতো। বাঁধা গন্ডারটা ছুটে গিয়েছে, আমার আরামের জীবনটা নষ্ট হলো বলে।”
“ওহ। তাই নাকি? এজন্যই প্রতি বছর মানত করে মসজিদে, এতিমখানায় তোর দান করা হতো তাইনা? যেন আমি তোর জীবনে ফিরে না আসি?”
সাবিনের মুখ চুপসে গেলো। অসহনীয় এক তীক্ষ্ণতা ভর করলো তাতে। আয়দান মুচকি মুচকি হাসছে। এই মেয়েকে বাগে পাওয়া গেলে তার আত্মিক তৃপ্তি অনুভূত হয়।
“ওই মিসিরটা নিজের মুখ বন্ধ রাখতে পারেনা, তাইনা?”
সাবিন রীতিমত বিপদজনকভাবে বাঁক কেটে গাড়ি ঘুরিয়ে মাঝরাস্তায় জানালা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়ালো। চেঁচিয়ে উঠলো,
“মিসির তোমার মুখ যদি আমি সুই সুতা দিয়ে সেলাই না করেছি, পেট পাতলা তালমিছরি কোথাকার!”
মিসিরের ফেরারি গাড়িটা ক্ষণিকের জন্য গতি কমিয়ে ফেললো, বোধ হয় সেই বান্দা নিজেও এমন আগ্রাসনে অবাক। গাড়ির ভেতরে থাকা আয়দান সাবিনের বাহু চেপে ধরে তাকে জোর করে ফিরিয়ে আনলো ভেতরে।
“আরে বেটি তোর মাথায় গন্ডগোল নাকি? একসাথে পরপারে যাওয়ার শখ হয়েছে? আমায় ক্ষমা কর, পৃথিবীতেই তোর অত্যাচারে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছিনা, পরকাল অবধি তাড়া করলে আমি কিন্তু কেঁদে ফেলবো!”
“অ্যাই চুপ! তোর মাথায় গন্ডগোল, তোর চোদ্দ গুষ্টির মাথায় গন্ডগোল! অত্যাচার আমি তোকে করি নাকি তুই আমাকে করিস?”
“অবশ্যই লেডিস ফার্স্ট।”
“তোর লেডিস ফার্স্টের মায়রে বা…”
“হিহিহি! মাম্মাম আল তাত্তু দগলা কত্তে!”
জারিনের হঠাৎ মন্তব্যে দুজনই নিজেদের উত্তেজিত বাকবিতন্ডায় ক্ষান্ত দিলো। সাবিন স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিতে দিতে পাশের সিটের দিকে তাকালো। আয়দানকে জারিনকে নিজের উরুর উপর দাঁড় করিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে বললো,
“একদম। দেখেছ মা, তোমার মাম্মাম কি ঝগড়ুটে!”
“মাম্মাম পতা না, মাম্মাম লাবিউ।”
“ওহ? আর চাচ্চু? তাহলে কি চাচ্চু পঁচা?”
ঠোঁট ফোলালো আয়দান। তাতে জারিন মহা মুসিবতে পরে গিয়ে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে জানালো,
“উন্নো! তাত্তুও লাবিউ। জা-ইন তবাইকে লাবিউ।”
“অও, মাই সুইটহার্ট গট স্কেয়ার্ড? ওলে বাবা লে, আমার মা টা।”
নিজের বুকে পুনরায় জারিনকে আগলে নিলো আয়দান। আড়চোখে দৃশ্যটা দেখলো সাবিন। আনমনেই তার ঠোঁটে একটি পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।
কিছুক্ষণ বাদে একটা অচেনা স্থানে গাড়ি থামালো সাবিন। আয়দান অবাক হয়ে আশেপাশে তাকালো। না, ঠিক অচেনা জায়গা নয়, বহু বছর বাদে এসেছে বিধায় অচেনা লাগছিলো। স্যাভেজ সাবিন পিৎজা স্টেশন ক্যাফেটা। যেখান থেকে ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়েছিল সাবিন এবং মীরার। এই জায়গার আরেকটা মাহাত্ম্য রয়েছে। একই স্থানে প্রথম উপলব্ধির সূচনা হয়েছিল আয়দানেরও। সাবিন এখানে গাড়ি থামনোয় আয়দান অবাক হলো।
“তোকে দেখতে না যাওয়ার বহু কারণ জমে আছে অভিমানীনির কাছে।”
বলতে বলতে ঝুঁকে এসে জারিনকে নিজের কোলে নিয়ে আয়দানের পাশের দরজাটার লক খুলে দিলো সাবিন। মোলায়েম গলায় শেষমেষ বললো,
“যা, অভিমানীনির অভিমান ভেঙে নিয়ে আয়।”
আয়দান দীর্ঘ একটা মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে সাবিনের দিকে চেয়ে রইলো। পরক্ষণেই সূক্ষ্ম হেসে সিটবেল্ট খুলে গাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে হেঁটে সে আড়াল হয়ে গেলো ক্যাফের ভেতরে। সাবিন গাড়ির ভেতর বসে মোহনীয় নয়নে দেখলো দৃশ্যটি। পরে জারিনের মাথার চুলগুলো গুছিয়ে একপাশে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“চলো সোনা, আমরা বাসায় যাই, আপ্পা ইয ওয়েটিং। চাচ্চু খালামণিকে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসবে।”
ক্যাফের ভেতরে মীরাকে পাওয়া গেলোনা। স্টাফ জানালো, সে ক্যাফের পিছনে সদ্য করা ফুলের বাগানে গিয়েছে। আয়দান সময় খরচ না করেই দ্রুতপায়ে পৌঁছালো সেখানে। ছোট্ট একটুখানি জায়গা। তাতে বিরাট একটা জলপাই গাছ আছে। সেই জলপাই গাছের সামনের দিকটায় মাটি খুঁড়ে হরেক রকমের ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। বেশিরভাগই দেশী ফুল। সেগুলোর সুঘ্রাণে বাতাস কেমন সুমিষ্ট হয়ে উঠেছে।
মীরা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক জলপাই গাছের গুঁড়ির কাছে। হেলান দিয়ে দুহাতে ধরে রাখা একটি আরবী কিতাব পড়ছে। সাদা পোশাক, গোলাপী রঙের হিজাবে তাকে বেশ স্নিগ্ধ দেখতে লাগছে। পবিত্রতম হুরের মতন। আয়দান নিঃশব্দে এগোলো। মেয়েটা বুঝি তার শরীরের সুঘ্রাণও টের পায়। আয়দান কাছে আসতেই মাথা তুলে তাকালো সে। বিস্তৃত আঁখি মেলে দেখলো সামনে দন্ডায়মান পুরুষটিকে।
“হাজার ফুলের ভেতরেও তোমাতে চোখ জুড়োয়, খোদার কত কুদরতে গড়া তুমি!”
আয়দানের গভীর কন্ঠস্বরে শোনা বাক্যটা মীরার মাঝে শিহরণ খেলিয়ে দিলো বুঝি। হাতের কিতাবটি বন্ধ করে সে একপাশের কাঠের পাটাতনের উপর রেখে দিলো। না চাইতেও পুরুষটির দিকে কয়েক নজর তাকাতে বাধ্য হলো সে। ছ ফুটের বেশি লম্বা চওড়া গড়নের এক সৌম্যদর্শন সুপুরুষ। মাথায় ক্যাপ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি এবং চোখজুড়ে বাদামী মায়াবী দৃষ্টি। মীরার হাজারো স্বপ্ন তাড়া করে বেরিয়েছে এই পুরুষ। তবে আজ যখন সে সত্যিই সামনে দন্ডায়মান, তখন মীরা নিজের ভেতরের সকল কথা গুলিয়ে ফেললো।
“ভালো আছো?”
অবশেষে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন করলো আয়দান। এবারেও মীরার পক্ষ থেকে জবাব এলোনা। রমণীর নিরাপত্তা দেয়াল ভেদ করলোনা আয়দান, কয়েক হাত দূরেই সে দাঁড়িয়েছে, যেন তার ছায়াটুকু অবধি মীরার অঙ্গ ছুঁয়ে যেতে না পারে।
“অভিমান করেছ? করাই উচিত। অধম আমি, খোদার এক পথভ্রষ্ট বান্দা আমি। আমার অশেষ পাপের ফর্দতে যদি তোমার অভিমানটুকু যুক্ত হয়, তবে তাতে খেদ নেই।”
নিশ্চুপ মীরা। শনশনে একটি হাওয়া খেলে গেলো। মীরা দুবাহু জড়িয়ে ফেললো নিজের মাঝেই। আয়দান তার দিকে সরাসরি তাকাচ্ছেনা। চেয়ে আছে সামনের মাটিতে গজিয়ে ওঠা ফুলগাছে ফুটন্ত একটি কলির দিকে।
“তবে সত্যিটা জানো কি? যদি আবারও আমাকে সুযোগ দেয়া হয় নিজের ভাগ্য নির্ধারণের, তবে হয়ত আমি একই ভাগ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাবো। তোমার অভিমানের ভার নতুন করে বইতে পারবো আমি, এতটুকু শক্ত হয়েছে এই বান্দার কাঁধজোড়া। আমি জানি আমি সঠিক ছিলাম, আর সঠিক পথ নির্বাচনে আমার কোনো ভয় নেই, নেই কোনো পিছুটান।”
“তোমার আমার জন্য একটুও মায়া হয়নি?”
বাতাসের সঙ্গে ভেসে এলো মীরার অভিমানী কন্ঠস্বর। আয়দান মৃদু হাসলো।
“মায়াই তো বান্দার সবথেকে বড় শত্রু। জগতের মায়া, অর্থের মায়া, পরিবারের মায়া, প্রাণের মায়া, ভালোবাসার মায়া। অথচ মায়া ছাড়িয়েও জীবনের প্রকৃত অর্থটা ব্যাপক, সেটা আমাদের স্বল্প জ্ঞানের মস্তিষ্ক ধরতে পারেনা। আমার মায়া হয়েছে, কিন্তু সেই মায়াটা চাপা দেয়ার মতন হিম্মতও জন্মেছে। এই ইহজগত সবকিছু নয়, সকল পাওয়া না পাওয়ার হিসাব অপেক্ষা করছে পরজগতে।”
“তোমার আধ্যাত্মিক কথাবার্তার মান দিনদিন বেড়েই চলেছে।”
“কেন? সহ্য হচ্ছেনা তোমার? অভিনয় করো না, আমি জানি তুমি আমার কথা শুনতে পছন্দ করো।”
মীরা হুট করে উল্টো ঘুরে গেলো, বুঝি নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে ফেললো ধরা পড়ার ভয়ে। এবার সামান্য শব্দ করে হাসলো আয়দান,
“দেখেছ, কীভাবে নিজেকে লুকিয়ে নিলে আমার গারাম? প্রকৃত মায়া কাকে বলে জানো? হয়ত সেটাই, যেটা আমি তোমার জন্য অনুভব করি। আমি বলতে পারবো না তোমার জন্য আমি গোটা বিশ্বজগৎ জয় করে ফেলব, কিংবা এটাও বলতে পারবোনা আমার হাতটা ধরলে সবকিছু ছেড়ে আমি শুধু তোমার মাঝে নিজেকে বিলীন করব। সেটা সম্ভব না। যারা এমন কথা বলে, তারা হয় মিথ্যা বলে, নাহয় নিজেরাই সেই মিথ্যাটা বিশ্বাস করে।”
“তবে সত্যিটা কি?”
“সত্যি এটাই যে আমার জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য হলো অমোঘ এক শান্তির খোঁজ করা। পরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক যে আদতে কতটা সহজ, এবং সেটাকে কত কঠিনভাবে পৃথিবীতে উপস্থাপন করা হয়, সেই রহস্যের খেলাটা খুঁজে বের করা। এর আগে আমি থামবনা, হয়ত এর পরেও থামবনা। নতুন কোনো উদ্দেশ্য আসবে আমার জীবনে। এই কথার অর্থ হলো, কারো জন্য কারো জীবন কখনোই থেমে থাকে না মীরা। যেমন তোমার থাকেনি, আমার থাকেনি। কিন্তু আমরা সেটা বিশ্বাস করতে পছন্দ করি, আর এর নাম দেই অকৃত্রিম ভালোবাসা। আমি তোমাকে তেমনভাবে ভালোবাসতে পারবনা গারাম। অথচ, আমি কোনোদিন তোমায় ভুলতে পারবো না, না তো পারবো আমার হৃদয়ের সিংহাসনে তোমার জায়গাটা অন্য কাউকে দিতে।”
নিস্তব্ধতা। আকাশে একদল পাখি উড়ে গেলো, কিচির মিচির ধ্বনি তুলে। আয়দান একটি নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার কোলাটেরাল ড্যামেজ, অথচ আমার রব সেখানে তৈরি রেখেছিলেন নূরের পথ। সেই পথ আজ আমায় কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে দেখো! আজ আমার নিজেকে নিয়ে কোনো হীনমন্যতা নেই। তবে একটা অপূর্ণ আশা রয়ে গিয়েছে। সেটা হলো, তোমার ক্ষমা পাওয়ার আশা। যতদিন হায়াত আছে, ততদিন আমি প্রতি প্রার্থনায় তোমার ক্ষমা চাইবো, তবে তোমায় চাইবো না। কারণ, তোমার প্রার্থনায় আমার স্থান নাও থাকতে পারে। যদি তোমার অন্তরে আমায় নিয়ে এক অণু পরিমাণও দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে থাকে, তবে আমি রবের কাছে আজ চাইছি, তুমি যেন কোনোদিন আমার না হও। তুমি আমার গারাম হয়েই থেকে যেও, আমার অফুরন্ত প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ।”
আর দাঁড়াতে পারলোনা আয়দান। তার গলা কাঁপতে শুরু করেছে। সে উল্টো ঘুরল চলে আসার জন্য। তবে নমনীয় কন্ঠস্বরটি ভেসে এসে তাকে মুহূর্তেই জমিয়ে দিলো নিজের জায়গায়।
“যেখানে স্বয়ং রব তোমায় গ্রহণ করে নিয়েছেন, সেখানে আমি কোন তুচ্ছ?”
ঝট করে মীরার দিকে ফিরে তাকালো আয়দান। মীরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। স্থির চেয়ে আছে সামনে। কয়েক পা এগোলো সে আয়দানের দিকে, দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে ফেললো।
“তুমি নিজেই বলেছিলে একদিন, আমি নাকি তোমার খুঁজে পাওয়া সেই নূরের পথ। অথচ আমি বলি, নূর আদতে তোমার ভেতরেই ছিল, নিভু নিভু। আমি সেই অঙ্গার যে তোমার ভেতরের নূরকে জাগিয়ে তুলেছে। আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। তোমার নূরের পাশে থাকতে হবে এই অঙ্গারকে, অন্যথায় যে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে।”
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো আয়দান। ক্ষণিকের জন্য সে নিজের কানকে বিশ্বাস না করতে পেরে শুধালো,
“তুমি আমাকে মাফ করতে পেরেছ, গারাম?”
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিলোনা মীরা। টানা টানা হরিণী চোখজোড়া মেলে বললো,
“গারামের তকমা ঘুচিয়ে আমি তোমার ইশকের কারণ হতে চাই।”
আয়দানের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত হানলো কথাটি। বাদামী চোখের মাঝে অশ্রু টলটল করে উঠলো। নিচের দিকে তাকালো সে, ঠোঁটের মাঝে অদ্ভূত এক হাসি ফুটলো তার।
“আমার প্রথম ইশক আমার রব এবং বিশ্বাস, পরে তুমি।”
“কবুল।”
নরম কন্ঠস্বরটি যেন কানে সুধা বর্ষণ করলো।
“আমার আব্বু আম্মু ছিলোনা। এতিম, নিঃস্ব বড় হয়েছি এই বিশাল সৃষ্টিজগতে। আল্লাহর কাছে আমার একটাই চাওয়া ছিলো। আমার জীবনে যেন এমন কেউ আসে, যে সবার আগে আমাকে নয়, আল্লাহকে ভালোবাসে। সৃষ্টিকর্তাকে যে ভালোবাসতে পারে, সে তাঁর সকল সৃষ্টিকে আগলে রাখতে পারে। এতদিন আমি ভাবতাম, হয়ত আমার প্রার্থনায় খুঁত ছিলো কোনো, তাই কবুল হয়নি। অথচ আজ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আমি বুঝলাম, আল্লাহ আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন।”
মীরার দিকে ঝলমলে আবেগী দৃষ্টিতে চাইলো আয়দান, মনে হচ্ছে সবকিছু প্রচন্ড সুখে ভেঙে আসছে তার। ঠোঁটে অকৃত্রিম এক বিস্তৃত হাসি নিয়ে সে হঠাৎ আশপাশের প্রকৃতিকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠলো,
“হে পৃথিবী, চেয়ে দেখো! কে বলেছে আমার আল্লাহ্ আমাকে শাস্তি দিয়েছেন? তিনি আমায় ইহজগতের সেরা কুদরতে মহিমান্বিত করেছেন, যার রহমত বিস্তৃত আমার পরকাল অবধি। আমার রব আমায় ত্যাগ করেননি, আমার রব আমায় আগলে নিয়েছেন….”
মীরার চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়লো টপটপ করে। মুগ্ধতাঘেরা নয়নে সে দেখে গেলো আয়দানের বাঁধনহারা সুখ উদযাপন। খানিক থেমে মীরার দিকে ফিরলো আয়দান, উভয়ের চোখের অশ্রুই হার মেনেছে। একটি হাত বাড়িয়ে সে মীরার ডান হাতটা তুলে নিজের কপালে ঠেকালো, তারপর অসীম অনুভূতি নিয়ে উচ্চারণ করলো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬০
“তুমি আর নও আমার নূর, আজকের পর থেকে তুমি আমার জান্নাতের হুর।”
মীরার অশ্রু উপচে পড়া গালে একটি আঙুল ছুঁয়ে মুছে দিয়ে বিরাট হাসি নিয়ে আয়দান বললো,
“নিকাহ্ করবে আমায়, যেন ইহকাল ছাপিয়ে পরকালেও খুঁজে পাই তোমায়?”
