Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৯

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৯

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৯
জাবিন ফোরকান

জায়দান এবং সাবিনকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালো মিসির। ঢুকতে না ঢুকতেই স্ট্রেচার নিয়ে এগিয়ে এলো আগে থেকে প্রস্তুত হয়ে থাকা ওয়ার্ডবয়।
“ইমারজেন্সি, প্লীজ!”
মিসিরের সমস্ত মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, চোখে ঝাপসা দেখছে সে আতঙ্কে। তারা ঢুকতেই সমস্ত হাসপাতালে যেন হইহই রইরই পড়ে গেলো। মিসির আগেই ফোন করে ডাক্তারকে জানিয়ে রেখেছিল। রীতিমত ছুটতে ছুটতে স্ট্রেচারের কাছে এলো দুজন ডাক্তার। একজন সাবিনকে দেখার সাথে সাথে একজন নার্সের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,

“ওনার ফার্স্ট এইড ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করুন।”
“না! আমি যাবো না! জায়দানকে রেখে কোত্থাও যাবো না আমি!”
কিন্তু দুজন নার্স সাবিনকে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে গেলো। মিসিরের সামনেই ডাক্তার দ্রুত জায়দানের পালস চেক করলেন। বললেন,
“ফাস্ট! পালস ডেঞ্জারাসলি লো! এক্ষুণি ইমারজেন্সিতে নিতে হবে।”
ওয়ার্ড বয় দৌঁড়ে নিয়ে গেলো স্ট্রেচার। সঙ্গে ডাক্তার দুজনও রীতিমত দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে গিয়ে ঢুকলেন ইমারজেন্সি রুমের ভেতর। মিসির ঢুকতে পারলোনা। দরজায় তাকে আটকে দেয়া হলো। কাঁচের দেয়াল থেকে সে ভেতরের দৃশ্য স্পষ্টত দেখতে পেলো। জায়দানকে স্ট্রেচার থেকে তুলে বিছানায় রাখা হচ্ছে। মিসির নিজের মাথা চেপে ধরে পিছিয়ে এলো পায়ে পায়ে। তার ভেতরটা ভেঙেচুরে গিয়েছে সম্পূর্ণ। চোখ দুটো ক্ষণে ক্ষণে ভিজে উঠতে আবেগের তাড়নায়। মিসির পিছিয়ে আসতে আসতেই দেখলো আরেকজন ডাক্তার করিডোর বেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে ইমারজেন্সি রুমের ভেতরে ঢুকে গেলেন। নিজের হাতের দিকে তাকালো মিসির। সেখানে এখনো জায়দানের শরীরের রক্ত লেগে আছে। হাত দুটো ভয়ানকভাবে কাঁপতে শুরু করলো তার। টপটপ করে অশ্রু গড়াতে লাগলো সেই হাতের উপরে।

“দোস্ত, ফিরে আয়! ডোন্ট ইউ ডেয়ার ডাইং অন মি ব্রো!”
মিসির জানেনা কতখানি সময় পেরিয়েছে। সে শুধু বিহ্বল চোখে হাসপাতালের ব্যস্ততা দেখে যাচ্ছে। ঠিক এমন মুহূর্তেই পিছন থেকে জোরালো ডাকটা শুনল সে।
“মিসির!”
ফিরে তাকালো সে। ছুটে আসতে দেখলো জাফরকে। তবে তিনি একা নন। তার ঠিক কয়েক কদম দূরেই দ্রুত পদক্ষেপে হেঁটে আসছেন জেসমিন। মহিলাকে কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে। উষ্কখুষ্ক চুলগুলো কোনমতে খোপা বেঁধে বাড়িতে পরে থাকা শাড়িতেই চলে এসেছেন। দ্রুত হাঁটার কারণে আঁচলের দিকটা অগোছালো হয়ে গিয়েছে, অথচ কোনো খেয়ালই নেই তার। মিসিরের কাছাকাছি পৌঁছে জাফর উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“আমার ছেলে?”
মিসির মুখে কোনো উত্তর করতে পারলোনা। কাঁপা কাঁপা হাত তুলে ইমারজেন্সি রুমের দিকে দেখিয়ে দিলো। কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া করার আগেই জেসমিন হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন ভেতরের দৃশ্য।
“পেশেন্ট ইয নট রেসপন্ডিং, ইনক্রিয়েজ দ্যা প্রেশার!”
ডাক্তার এবং নার্সদের উত্তেজিত কন্ঠস্বর এবং শশব্যস্ত কার্যক্রমে হাসপাতালের ইমারজেন্সি রুম যেন সাক্ষাৎ এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একজন বিছানার উপর উঠে ক্রমাগত জায়দানের বুকে হাত চেপে সি পি আর দিয়ে চলেছে। নার্সরা হন্যে হয়ে ছোটাছুটি করছে এদিক সেদিক। কেউ ছুটে ডিফ্রিবিলেটর মেশিন নিয়ে এলো, কেউ বা রক্তের ব্যাগ, কেউ আবার ইনজেকশন।
স্বচ্ছ দেয়ালের বাইরে থেকে সবটাই দেখে যাচ্ছে সকলে। হার্টবিট মনিটরের সাইন এত দ্রুত উঁচু নিচু হচ্ছে যে ডাক্তাররাও আতঙ্কিত বোধ করছে।

“কুইক! শক!”
ডিফ্রিবিলেটর চাপা হলো কয়েকবার, জায়দানের শরীরটা ঝটকা দিয়ে উঠলো পুতুলের মতন। তারপরই সবকিছু স্থির। হার্টবিট মনিটরের লাইনটা হঠাৎ করেই সরলরেখায় পরিণত হয়ে গেলো। সঙ্গে অশুভ এক ধ্বনি।
বিইইইইপ!
“আল্লাহ!”
নার্সদের মধ্যে বুঝি কেউ আঁতকে উঠল। ঠিক এমন একটা মুহূর্তেই আর অপেক্ষা করতে পারলেন না জেসমিন। দরজা ঠেলে হাসপাতালের সকল নিয়ম ভেঙে তিনি হুট করে ঢুকে গেলেন ইমারজেন্সি রুমের ভিতর। দুজন নার্স তাকে আটকানোর চেষ্টা করলো,
“এক্সকিউজ মি! আপনি এভাবে ইমারজেন্সি রুমে ঢুকতে পারেন না!”
নার্স দুজনকে রীতিমত আগ্রাসীভাবে ধাক্কা দিয়ে হটিয়ে হনহন করে হেঁটে বিছানার কাছে গেলেন জেসমিন। হার্টবিট তখনো সরলরেখায় আছে। ডাক্তারদের বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি হঠাৎ করে জায়দানের রক্তাক্ত ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে ধরলেন। সেটি নিজের গাল বরাবর ছুঁয়ে টলটলে অশ্রুমাখা নয়নে বলে উঠলেন,

“আব্বু! আব্বু ওঠো, দেখো, তোমার আম্মু এসেছে, উঠবেনা তুমি?”
বিইইইপ!
একই ধরনের শব্দ করে যাচ্ছে হার্টবিট মনিটর। বাইরে দাঁড়ানো জাফর হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে স্ত্রীকে আটকাতে চাইলেন। তবে মিসির তার কাঁধে হাত চেপে থামিয়ে ফেললো। ইশারায় বারণ করলো। ডাক্তাররা প্রথম কয়েক সেকেন্ড জেসমিনের হঠাৎ উপস্থিতিতে অবাক হলেও তাদের থেমে থাকার সময় নেই। ডিফ্রিবিলেটর নিয়ে এগোলেন একজন, জায়দানের বুকে চাপলেন, থরথর করে কেঁপে উঠলো জায়দানের সমস্ত শরীর। এমনভাবে ধনুকের মতন বাঁকা হয়ে বিছানা থেকে উঠে গেলো তার শরীর, যেন বুক থেকে প্রাণপাখিটা বেরিয়ে যাচ্ছে তার।
জেসমিন ছেলের হাতটা ছাড়লেন না। এবার সেটা তিনি শক্তভাবে ধরে নিজের ঠোঁটে চাপলেন। এমন ভয়ানক দৃশ্য তার মাঝে ভাঙচুর করে দিচ্ছে যেন।

“আব্বু। এইযে, আম্মু এসেছি। চোখ খুলবে না? দেখবে না? আমার আদর চাই তোমার না? ফিরে আসো তুমি, আম্মু তোমায় খুব আদর করবে। আসবে না?”
একজন ডাক্তার জায়দানের পালস চেক করছেন এবং মনিটরের দিকে চেয়ে আছেন। অন্য দুজন তার বুকে শক দিয়ে হৃদপিন্ড সচল করতে ব্যস্ত। প্রত্যেকের চেহারায় মহা আতঙ্ক, ঘেমে নেয়ে একাকার একেকজন। এ যেন জীবন মৃত্যুর লড়াই। একটি প্রাণ বাঁচাতে যুদ্ধে নেমেছে বাকি সকল প্রাণ। জেসমিন ছেলের হাত ছাড়লেন না। বিছানার কাছেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। জায়দানের নিথর ঠান্ডা হাতটা নিজের কপালে ঠেকলেন তিনি।
“তোমার আম্মু একটা খু*নী আব্বু! তোমার আম্মু একটা রাক্ষসী। জীবন যদি যায়, তার যাক। তুমি কেন চলে যাচ্ছো, আব্বু? তোমার আম্মু কখনো নিজেও বুঝতে পারেনি, তোমাকে কতটা ভালোবাসে সে। যেদিন প্রথম তুমি আমার বুকে এসেছিলে, সেদিন মনে হয়েছিল তোমার জন্য আমি মরতে পারি, মারতেও পারি। আজ আবারও সেই একই অনুভূতি হচ্ছে। তোমার আম্মু ডাকছে! ফিরে এসো আব্বু, আম্মুর কোল ভরে ওঠার আগেই খালি করে দিওনা। অভিমান ভেঙে একটাবার ফিরে এসো!”
জেসমিনের হাহাকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো ইমারজেন্সি রুমের দেয়ালজুড়ে।

“ফিরে আয়! ফিরে আয় আমার মানিক! তোর নিষ্ঠুর আম্মুটাকে তোর লাশ দেখার মতন ভয়ংকর শাস্তি দিস না, দোহাই লাগে তোর! আঁচল বিছিয়ে বসে আছি আমি, আমার আব্বু, ফিরে আয় আমার বুকে, ফিরে আয়!”
বিপ! বিপ! বিপ!
এতক্ষণ যাবৎ রীতিমত পাগলপ্রায় হয়ে যাওয়া ডাক্তারগণ ফিরে তাকালেন মনিটরের দিকে। সরলরেখা ধীরে ধীরে উঁচুনিচু হতে শুরু করেছে আবার। অত্যন্ত ক্ষীণ, কিন্তু আছে। একই সময়ে নিজের হাতের মুঠোর মাঝে জায়দানের আঙুলগুলো নড়ে উঠতে অনুভব করলেন জেসমিন।
“হি ইয স্টিল হেয়ার, হি ইয ফাইটিং!”
একজন উচ্চকন্ঠে বললো। জেসমিন হতবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। তার নিথর হয়ে থাকা বুকটা অতি ক্ষীণভাবে উঠানামা করছে। ভেতরে কেমন অনুভব করলেন জেসমিন? বুঝতে পারলেন না। বাঁধভাঙা অশ্রু তার গাল পেরিয়ে বুক ভিজিয়ে তুললো। জায়দানের হাতের তালুজুড়ে তিনি ছোট ছোট অসংখ্য চুমু এঁকে দিলেন।
“আব্বু! আমার আব্বু! তুমি আমার কথা শুনেছ, আব্বু, তুমি কথা রেখেছ!”
এবার জেসমিন আর খুব বেশি সময় জায়দানের কাছে থাকতে পারলেন না। তাকে নার্স সরিয়ে নিলো।
“ওনাকে এক্ষুণি চেকআপ এবং সার্জারির জন্য নিয়ে যেতে হবে দরকার পড়লে, প্লীজ বাইরে অপেক্ষা করুন।”

প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই কোনমতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ছুটতে ছুটতে যখন ইমারজেন্সি রুমের কাছে এলাম আমি, তখন জায়দানকে ইতোমধ্যে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সার্জারি রুমের দিকে। দুজন নার্স রক্ত এবং স্যালাইনের ব্যাগ ধরে রাখতে রাখতে ডাক্তারদের পাশে ছুটে ছুটে যাচ্ছে।
আমার কোনোদিকে কোনো খেয়াল নেই। নিজেকে উন্মাদ লাগছে রীতিমত। শুধু মিসিরকে দেখতে পেলাম সামনে। খপ করে তার কাঁধ আঁকড়ে ধরলাম। মিসির ঘুরে তাকাতেই পাগলের মতন প্রলাপ বকতে লাগলাম,
“জায়দান, মাই লাভ! জায়দান আছে? প্লীজ, দোহাই লাগে! আমাকে মিথ্যা বলে হলেও শান্তনা দাও! জায়দান আছে তাইনা? তাইনা মিসির? আমাকে ছেড়ে ও যায়নি, যেতে পারেনা! মিসির, মিসির! প্লীজ! আল্লাহ, প্লীজ!”

“সাবিন সাবিন সাবিন!”
জোর করে দুহাতে আমার মুখখানি চেপে ধরলো মিসির। ছলছলে দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বললো,
“জায়দান আছে। হি ইয আ ফাইটার! ও লড়াই করছে। ও যায়নি, ডু ইউ হেয়ার মি? আমাদের ছেড়ে ও কোত্থাও যায়নি!”
“খোদা!”
আমার মাঝে কি হলো বলতে পারবোনা আমি। সৃষ্টিকর্তার নামে একটি আর্তচিৎকার করে উঠলাম। তারপরই ধপাস করে হাসপাতালের করিডোরের মেঝেতেই সেজদায় লুটিয়ে পড়লাম। আমি জানিনা পশ্চিম কোনদিকে, কিংবা আমার শরীর আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার মতন পবিত্র কিনা, আমার সতর ঢাকা আছে কিনা। সেই সময়ে আমি কিচ্ছু ভাবিনি, কিচ্ছু মনে করতে পারিনি। ক্রন্দনের দমকে দমকে সেজদার মাঝে আমার শরীর কম্পমান হলো।
সকলে চেয়ে দেখলো এক হার না মানা রমণীকে, যার ভালোবাসা গভীরের চাইতেও গভীরভাবে প্রকাশিত হলো সৃষ্টিকর্তার দুয়ারে বান্দার এক শুকরিয়া জ্ঞাপনের সেজদার মাধ্যমে।

৮ মাস পর।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল—১, ঢাকা।
কোর্টরুমজুড়ে গাঢ় নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙছে মাথার উপরে ঘোরা ঘড়ঘড়ে পুরাতন ফ্যানের আওয়াজ এবং কাঠের পাটাতনের উপর বসে থাকা বিচারকের মামলার রায়ের পৃষ্ঠায় ঘষঘষ করে কিছু লিখে যাওয়ার শব্দে। সামনের একপাশে রাষ্ট্রপক্ষ, অন্যপাশে ডিফেন্স লয়ার। আমি বসে আছি পিছনের দর্শকসারিতে। আমার একপাশে মিসির, অন্যপাশে মীরা।
কাঠগড়ায় দন্ডায়মান আয়দান। আজ তার বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে, তেমন কোনো প্রভাব ছেলেটার চোখেমুখে নেই। একদম সুস্থির দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা খানিক ভেঙে গিয়েছে, চোখের নিচে হালকা কালি। সেসব বাদে তেমন কোনো দূর্বলতা দেখা যাচ্ছেনা ছেলেটার মাঝে।
তাকবীর হুসেইন এবং আহান হুসেইনের হ*ত্যা মামলা সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। ক্ষমতাবান মানুষগুলোর নাম জড়িয়ে থাকায় বেশ জরুরীভাবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই মামলার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। দেশের অন্যতম একটি জনপ্রিয় মামলা এটি, কোর্টের বাইরেই বহু উৎসুক জনগণ এবং নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে এসেছি আমি।
আয়দানের দিকে কেন যেন আমি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। যে ছেলেটাকে আমি রীতিমত দুই চোখে সহ্য করতে পারতাম না, সেই ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেই আমার কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসা। ভীষণ অপরাধবোধ জেঁকে বসে বুকের ভেতর। হাত দুটো শক্ত করে ফেললাম আমি, নিচের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম। নিদারুণ এক অস্বস্তি হচ্ছে। চোখের সামনে কীভাবে দেখবো আমি এই দৃশ্য? এতটা অসহায়ত্ব নিয়ে কিভাবে বাঁচবো?

“সাবিন? পানি দেবো?”
একপাশ থেকে মিসির ফিসফিস করে উঠতেই আমার ভাবনার রেশ কেটে গেলো। মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। মিসির খানিকটা উদ্বেগ নিয়ে চেয়ে আছে আমার মুখের দিকে। পরক্ষণেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আমার ফুলেফেঁপে ওঠা পেটের উপর। ঢোলা ম্যাক্সি ড্রেসের আড়ালে ঢেকে রাখলেও ফোলা ভাবটা বোঝা যাচ্ছে বেশ। মিসির একটি ঢোক গিলে শুধালো,
“খারাপ লাগছে? শুড আই টেইক ইউ হোম?”
আমি মাথা নাড়লাম। এরপর খানিকটা জোর করেই সামনের দিকে তাকালাম। মিনিটখানেক বাদে ধ্বনিত হলো বিচারকের কন্ঠস্বর। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলো আমার। প্রথমে গলা গলা পরিষ্কার করে বিচারক বলতে শুরু করলেন,
“এই মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করে আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে যে ঘটনাটি আকস্মিক সংঘর্ষের ফল। নিহত ব্যক্তিরা প্রথমে আক্রমণাত্মক আচরণ করে এবং সেই পরিস্থিতিতে আসামি তার গুরুতর আহত ভাই এবং ভাবীকে রক্ষা করার প্রয়াসে আঘাত হানে।”

পিনপতন নীরবতা। রীতিমত শ্বাস নিতেই ভুলে গেলাম আমি। অনুভব করলাম, আমার একটি হাতের মাঝে মীরার হাত শক্তভাবে চেপে বসেছে। এতটাই জোর যে আমার হাতে যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়েছে, তবুও মেয়েটার হাত ছাড়লাম না। বিচারক বলে যাচ্ছেন,
“তবে আদালত মনে করে যে আসামি আত্মরক্ষার সীমা অতিক্রম করেছে।”
ছোট্ট একটা গুঞ্জণ তৈরি হয়ে আবার মিলিয়ে গেলো। গলা টানটান করে উদগ্রীব হয়ে তাকালাম। মীরা প্রায় দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলো, তবে আমার হাতের টানে পুনরায় বসে পড়তে বাধ্য হলো।
“অতএব, পেনাল কোড, ১৮৬০–এর ৩০৪ ধারার অধীনে আসামিকে ছয় (৬) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হলো। বিচারাধীন অবস্থায় কারাভোগ করা সময় দণ্ডের সাথে সমন্বিত হবে। আসামিকে অবিলম্বে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হলো।”

আয়দানের মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। সে শুধু মাথাটা সামান্য নুয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যেন স্বস্তি পেয়েছে, শাস্তি নয়। তারপরই মাথা তুলে আয়দান হঠাৎ করে আশেপাশে কি যেন খুঁজলো। তার দৃষ্টি আপতিত হলো সরাসরি আমার উপর। কয়েক সেকেন্ড আমার ব্যথিত চেহারার দিকে চেয়ে রইলো সেজ তারপরই চোখ নামিয়ে দেখলো আমার ফোলা উদর। অতি সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটলো তার ঠোঁটে। পরক্ষণেই পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এলো। আয়দানকে ধরে ধীরে ধীরে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে দর্শক সারির পাশ বেয়ে নিয়ে যেতে লাগলো।
ক্ষণিকের জন্য থামলো আয়দান। ঠিক আমাদের বেঞ্চের পাশেই। মাথা কাত করে তাকালো। তবে এবার তার দৃষ্টি আমার দিকে নয়, বরং ভিন্ন এক রমণীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

স্তব্ধ হয়ে বসে আছে মীরা। হিজাবে ঘেরা মুখখানি কেমন শক্ত হয়ে আছে। টানা টানা হরিণী চোখ দুখানা টলটল করছে বিলের পানির মতন। কি অসীম মায়া তাতে, কি নিদারুণ আবেগ! এই মেয়েটার ভাগ্য আমি নষ্ট করেছি। এমন বোধ হতেই দৃশ্যটা আর দেখতে পারলাম না। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। অদূর থেকেও আয়দানের ফিসফিস করা একই বাক্য কিভাবে কানে এলো বুঝতে পারলাম না।
“গারাম আমার, সুস্থ থেকো, সুন্দর থেকো, অভিমানটুকু বুকে চেপে বেঁচে থেকো। তোমার বিরহ যদি আমার রবের ইচ্ছা হয়, তবে সেই ইচ্ছা এই বান্দার শিরোধার্য।”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৮

মীরা কেঁপে উঠলো স্পষ্টত। সহসাই মুখ ঘুরিয়ে ফেললো ভিন্নদিকে। টপটপ করে তার চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কোলের উপর। আয়দান আর দাঁড়াতে পারলোনা, মীরাও আর তাকাতে পারলোনা। পুলিশের দল আয়দানকে কোর্ট থেকে বের করে নিয়ে গেলো।
আজকের পর থেকে আমি এবং আয়দান বাদে কেউ কোনোদিন জানবে না সত্যিটা। না মিসির, না মীরা। যদি তারা জানতো, তবে কি আমার কাছের মানুষগুলো আমায় ভিন্ন নজরে দেখা শুরু করতো?
আমি জানিনা।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here