উন্মাদনা পর্ব ৩৩
কায়নাত খান কবিতা
‘কেমন লাগছে আমাকে?’
‘’ চুত’মারানি!”
হুট করে পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই চমকে ওঠে আনন্দী। হাসিটা ঠোঁটেই থেমে যায় তার। ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকাতেই বুক ধক করে ওঠে।
কাঠফাটা রোদের মধ্যে অভী দাঁড়িয়ে আছে।চোখে কালো চশমা, কোমরে দুই হাত, ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি। বরাবরের মতোই গলায় ঝুলে থাকা মোটা সোনার চেইনটা রোদের আলোয় চিকচিক করছে। এতটাই উজ্জ্বল যে চোখে লাগে।
কাল রাতের কথা সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় আনন্দীর। বেলকনি থেকে ময়লা পানি ঢেলে দেওয়ার পর অভী বলেছিল “দেইখা নিমু তোরে।”
তাহলে আজ?আজ সেই হিসাব মেটাতে এসেছে?
কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই আনন্দীর চোখ চলে যায় অভীর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দিকে। নোবেল, ডিজে শহিদুল, কবি।সবার হাতেই বড় বড় বালতি।শুধু বালতি না।কালচে নোংরা পানিতে ভর্তি বালতি।দেখতে ঠিক ড্রেনের পানির মতো।মুহূর্তেই আনন্দীর গলা শুকিয়ে যায়। শুকনো ঢোক গিলে আবার তাকায় অভীর দিকে।
অভী ধীরে ধীরে চোখ থেকে চশমাটা খুলে পকেটে রাখে। তারপর খুব আরাম করে পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে বলে,
“তোমারে জন্মের মতো গোসল করামু সোনামণি।”
কথাটা শুনে আনন্দীর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
অভী এবার এগিয়ে আসে। একদম সামনে এসে দাঁড়ায় তার। এতটাই কাছে যে আনন্দী তার শরীরের সিগারের গন্ধটাও টের পায়।অভী নিচু হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কই তোমার রেহমান ডাকাত কই?”
তারপর চারপাশে তাকানোর ভান করে আবার বলে,
“প্রটেকশন দিলো না?ওহহহ… আমি তো কয়দিন ছিলাম না। তাই চলে গেছে নাহ?”
আনন্দী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে অভীর দিকে।তার মানে এই কয়দিনের ভালো ব্যবহার?মিষ্টি কথা?ফোনে শান্ত গলা?সবটাই অভিনয় ছিল?শুধু রেহমানকে ভুল বুঝানোর জন্য?
আনন্দীর মুখের ভাব দেখেই হেসে ওঠে অভী। সেই হাসিতে বিদ্রুপ মিশে ছিল স্পষ্ট।
“আহারে…”
মাথা দুলিয়ে বলে সে,
“বেচারি ভাবছিল হেতিরে আমি ইশক করি।”
পাশ থেকে নোবেল আর শহিদুল হেসে ওঠে।
অভী আবারও আনন্দীর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকায়।
“চো চ্যাড!”
আনন্দী কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশের হাসাহাসি, গরম রোদ, নোংরা পানির গন্ধ—সব মিলিয়ে বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠছিল তার।
সে ধীরে ধীরে অভীর দিকে তাকায়।চোখে আর আগের সেই ভয়টা নেই। বরং জমে থাকা রাগ।তারপর গটগট করে বলে ওঠে,
“মানুষের চামড়া গায়ে দিলেই পশু মানুষ হয় না!”
চারপাশ মুহূর্তেই চুপ হয়ে যায়।আনন্দী এবার আরও এক পা এগিয়ে আসে। চোখে চোখ রেখে বলে,
“আর ধর্ষ’ক কখনো প্রেমিক পুরুষ হয় না! প্রমাণের অভাবে বাইরে ঘুরছেন। নাহলে এতোদিনে জেলের ভাত খেতেন।’
কথাটা শুনে অভীর ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নোবেল, শহিদুল, কবিরাও একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। যেন হঠাৎ করেই পরিবেশটা বদলে গেছে।অভী কয়েক সেকেন্ড কিছু বলে না। শুধু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকে আনন্দীর দিকে।তার চোখের ভেতর তখন অদ্ভুত এক আগুন জ্বলছিল।
আনন্দীর কথা শেষ হতেই কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে আসে চারপাশে।তারপর হুট করেই হো হো করে হেসে ওঠে অভী আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা।
এমনভাবে হাসতে থাকে তারা, যেন আগে থেকেই জানত আনন্দী ঠিক এই কথাগুলোই বলবে। যেন পুরো ব্যাপারটাই তাদের কাছে পুরোনো কোনো নাটকের মুখস্থ সংলাপ।
আনন্দী দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। তার মনে হতে থাকে , এই সাহসটা আসলে তার নিজের না। এই সাহস দিয়েছে রেহমান। সেই মানুষটা তাকে বারবার বুঝিয়েছে।ভয় পেলেই শেষ।কিন্তু একটা জিনিস অভী খুব ভালো করেই জানে।সাহস ভাঙতে হয় কীভাবে।কারণ মানুষের শরীর ভাঙার চেয়ে মনের ভিত ভাঙা অনেক সহজ। আর অভীর মতো মানুষগুলো সেই কাজটাই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে পারে।
অভীর বিকৃত হাসিটা ধীরে ধীরে আরও চওড়া হতে থাকে। আর সেটা দেখে আনন্দীর ভেতরটা ঘৃণায় ভরে ওঠে। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। চোখ-মুখ শক্ত করে গটগট করে হাঁটতে শুরু করে সে। শাড়ির আঁচল বাতাসে হালকা দুলছিল, আর তার দ্রুত পায়ের শব্দে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রাগে, অপমানে, ঘৃণায় ভেতরটা জ্বলছে তার।অভী পিছন থেকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।তারপর হঠাৎ করেই হাত বাড়িয়ে আনন্দীর শাড়ির আঁচল ধরে টান দেয়
টানটা এতটাই আকস্মিক আর শক্ত ছিল যে আনন্দীর শরীর সামনের দিকে কেঁপে ওঠে। আঁচল কাঁধ থেকে সরে গিয়ে প্রায় খুলে যাওয়ার উপক্রম হয়। মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতর ধক করে ওঠে আনন্দীর। এক হাতে তড়িঘড়ি করে নিজের শাড়ি আঁকড়ে ধরে সে।রাস্তায় মানুষ ছিল, গাড়ি চলছিল, দূরে হকার ডাকছিল, তবু সেই মুহূর্তে আনন্দীর কাছে মনে হলো পুরো পৃথিবী থেমে গেছে।অপমানটা যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে তার শরীর জুড়ে।ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকায় সে।অভী তখনও তার আঁচলটা ধরে দাঁড়িয়ে।চোখে সেই চেনা উদ্ধত দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। যেন সে ইচ্ছা করেই আনন্দীর সীমা পরীক্ষা করছে।দুজনের চোখ কয়েক সেকেন্ড আটকে থাকে।পরের মুহূর্তেই কোনো কথা না বলে সজোরে চড় বসায় আনন্দী।চড়ের শব্দটা আশপাশের কোলাহলের মাঝেও স্পষ্ট শোনা যায়।অভীর মুখ একপাশে ঘুরে যায় খানিকটা।কিন্তু আনন্দী থামে না।হাঁপাতে হাঁপাতে সরাসরি তার মুখের উপর থুথু ছুড়ে মারে।
চারপাশের মানুষ কেউ খেয়াল করেনি। রাস্তার পাশে বসে থাকা বৃদ্ধ ফুলওয়ালা ছাড়া পুরো দৃশ্যটা আর কেউ দেখেনি। লোকটা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিল। যেন বুঝতেই পারছিলো না ফুল নেওয়া থেকে গা’লি তারপর এতো কিছু কীভাবে হলো!
আর অভী? সে ধীরে ধীরে মুখ সোজা করে।গালের লালচে দাগটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিলো তখন।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে রাগেনি।বরং কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে জিভ দিয়ে ঠোঁটের কোণে জমে থাকা রক্ত ছুঁয়ে দেখে।তারপর খুব আস্তে হাসে।সেই হাসি দেখে আনন্দীর বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে ওঠে।
“ তোর কী অবস্থা করমু আমি। কোনো ধারণা নাই তোর শেখের বেটি।”
“ সেটা তো তখন হবে না, যখন আপনি বাইরে থাকবেন। একজন ধ’র্ষণ কারীর শাস্তি ফাঁসি ছাড়া অন্য কিছু নয়!”
“ তোর কোন বাপে আমারে ফাঁ’সি দিবো ওইটাই দেখমু।”
চড় আর অপমানের পরেও অভীর চোখের দৃষ্টি বদলায় না। বরং আরও অদ্ভুত শান্ত হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে আনন্দীর দিকে এগিয়ে আসে। তারপর আচমকা তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে।এতটাই শক্ত যে আনন্দীর কবজি প্রায় ব্যথায় অবশ হয়ে আসে।আনন্দী আঁতকে উঠে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। অভীর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে।তার মাথার ভেতর ভয়ংকর কিছু ঘুরছে।আজ হয়তো সে সহজে ছাড়বে না।অভী একটু ঝুঁকে আসে আনন্দীর দিকে। তার গরম নিশ্বাস এসে লাগে আনন্দীর মুখে।
“তোর সাহস দিন দিন বাড়তাছে বান্দী…”
কথার সঙ্গে সঙ্গে হাতের চাপও বাড়ায় সে।আনন্দীর বুক ধড়ফড় করতে থাকে। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে তার।ঠিক তখনই দূর থেকে পুলিশের গাড়ির হর্ন ভেসে আসে।একটা না।দুইটা।তারপর আরও কয়েকটা।রাস্তার পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায়।অভী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে তাকায়। দূরে পুলিশের লাল-নীল আলো ঝলকাতে শুরু করেছে।পরের মুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
“নাম না নিতেই শয়তান হাজির!আজকে না হয় বাঁচলি। কিন্তু কতদিন বাঁচবি?”
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর এখনো ধুকপুক করছে, কিন্তু মুখ শক্ত করে রাখে সে।অভী কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দেয়।কারণ সে জানে, এখন ঝামেলা বাড়ানো যাবে না।
এখন সিস ফায়ার চলছে। এই সময় জেলে গেলে কৃষ্ণ দাসের নাম খারাপ হবে। আর কৃষ্ণ দাসের নামের সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে অভী কখনো ভুল করে না। লোকটা রক্তের বাবা না হলেও, এই অন্ধকার দুনিয়ায় তার পরিচয়ের বড় অংশ।তাই রাগ গিলে নেয় সে।চুপচাপ গাড়ির দিকে হেঁটে যায়।নোবেল তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেয়। অভী গাড়িতে উঠে বসার আগে শেষবারের মতো আনন্দীর দিকে তাকায়।তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে মিডেল ফিঙ্গার তুলে দেখায় তাকে।অশ্লীল, অবজ্ঞাভরা সেই ভঙ্গিটা যেন শেষ হুমকি।গাড়ির দরজা বন্ধ হয়।পরের মুহূর্তেই গাড়িটা ধোঁয়া তুলে রাস্তা ছেড়ে চলে যায়।আর আনন্দী দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার মাঝখানে।দূর থেকে পুলিশের সাইরেন তখন আরও কাছে আসছে।
অভী সোজা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায় আস্তানার দিকে। রাত গভীর হওয়ার আগেই পৌঁছাতে হবে। আজ সাধারণ কোনো আড্ডা না। আজ বৈঠক আছে।কৃষ্ণ দাস নিজে বসবে সেখানে।তবে বৈঠকটা শুধু বাইক রেস নিয়ে না। আজ আরও বড় খেলা রয়েছে টেবিলের ওপরে। শহরের এক প্রভাবশালী এমপি নিজের কালো টাকার পাহাড় সাদা করতে চায়। নির্বাচনের আগে টাকা পরিষ্কার না করলে বিপদ। কিন্তু কোটি কোটি টাকা তো আর হাওয়া হয়ে যায় না। তার জন্য লাগে পথ। লাগে লোক। লাগে এমন একটা অন্ধকার নেটওয়ার্ক, যারা দিনের আলোতেও ছায়ার মতো বেঁচে থাকতে পারে।আর পুরান ঢাকার সিন্ডিকেট ঠিক সেটাই।
তাদের ব্যবসা শুধু ড্রাগ বা অস্ত্রে সীমাবদ্ধ না। মানি লন্ডারিং, জাহাজের ভুয়া কাগজ, পুরোনো গুদামের নামে ফেক আমদানি, এমনকি এতিমখানার ডোনেশন পর্যন্ত।সব জায়গাতেই তাদের অদৃশ্য হাত রয়েছে।তাই আজকের রাতের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু তারপরও, আস্তানার ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়।আজকের মূল আকর্ষণ অন্য কিছু।নাইট রান।
পুরান ঢাকার কিংবদন্তি বাইক রেস।এই শহরের কিছু জিনিস সময়ের সঙ্গে বদলায় না। যেমন শত বছরের পুরোনো গলি। মসজিদের আজান। শাঁখারীবাজারের আলো। ঠিক তেমনই বদলায় না এই রেসের ঐতিহ্যও।প্রতি বছর এপ্রিলের ১২ তারিখ।রাত ১টা ০২ মিনিট।ঘড়ির কাঁটা এই সময় ছুঁলেই শুরু হয় রেস।
কেন ১টা ০২?পুরান ঢাকায় এই প্রশ্নের উত্তর কেউ স্পষ্ট জানে না। কেউ বলে, উসমান সাহেব প্রথম চালান সফল করেছিলেন এই সময়ে। কেউ বলে, তার মৃত্যুর সময় ছিল এটা। আবার অনেকে বিশ্বাস করে।এই সময়টাতে শহরের উপর নজর কম থাকে। পুলিশ, রাজনীতি, আইন।সব যেন কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে।উসমান সাহেব বেঁচে থাকতে এই রেস ছিল ক্ষমতা মাপার খেলা। তখন পুরান ঢাকা এত ভাগে ভাগ হয়নি। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছিল না। সিন্ডিকেটও ছিল এক ছাতার নিচে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর শহর ভাগ হতে থাকে। রক্ত ঝরে। গলি দখল হয়। গুদাম ভাগ হয়। আর সেই ভাগের সঙ্গে সঙ্গে রেসও হয়ে ওঠে আধিপত্যের প্রতীক।কারণ এই রেসে জেতা মানে শুধু ট্রফি জেতা না।জেতা মানে হলো এক বছরের জন্য হাফ গোডাউন।
ড্রাগের রুট, অস্ত্রের চালান, ডলারের লেনদেন, বন্দর থেকে হারিয়ে যাওয়া কনটেইনার।সবকিছুর অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিজয়ীর হাতে। পুরো এক বছর।তাই এই রেসে কেউ শুধু গতি নিয়ে নামে না।নামে রাগ নিয়ে।
এবারের রেসেও চারজন নামবে। অভী চাঁদ! কৃষ্ণ দাসের সবচেয়ে ভয়ংকর চাল। জুলফিকার অর্থাত প্রিন্স ব্রো! চন্দ্র দাসের দাবার সব থেকে দামি ঘুটি। আর কালু মাস্তান।বাতাসি বেগমের দলের মূল রাইডার। জাতে মাতাল, তালে ঠিক।এবং সবার শেষে সুফি হাওলাদার। আবুল বাশারের পুরোনো সৈনিক। পুরান ঢাকার পুরোনো দৌড়বিদদের শেষ জীবন্ত কিংবদন্তিদের একজন।রাত যত গভীর হয়, তত মানুষ জড়ো হতে থাকে।গুদামের ছাদে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে অস্ত্রধারীরা। নিচে বাইকের ইঞ্জিন গরম হয়। কেউ টাকা ধরে বাজি লাগায়। কেউ সিগারেট টানে। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু রাইডারদের দেখে।কারণ সবাই জানে,আজকের রাতের পর পুরান ঢাকার অন্ধকার জগতে আবার নতুন করে ক্ষমতার হিসাব লেখা হবে।
রাত তখন ১২টা ৫৬।
কেরানীগঞ্জের পুরোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনটা যেন অন্য এক দুনিয়ায় পরিণত হয়েছে। দিনের বেলায় যেখানে ভাঙা ট্রাক, মরিচা ধরা কনটেইনার আর পরিত্যক্ত গুদাম পড়ে থাকে, রাত গভীর হতেই জায়গাটা বদলে যায় অন্ধকার সাম্রাজ্যের ময়দানে।চারপাশে অসংখ্য বাইকের হেডলাইট জ্বলতে থাকে । ধোঁয়া, সিগারেটের গন্ধ আর পেট্রোলের ঝাঁঝালো বাতাস মিশে পুরো পরিবেশ ভারী হতে শুরু করে। দূরে নদীর কালো পানিতে আলো কাঁপতে থাকে। আর মাঝখানে ফাঁকা রাস্তাটার উপর তৈরি হয়েছে রেসিং প্রতিযোগিতা।
এক এক করে চারজন রাইডার সামনে এসে দাঁড়ায়।প্রথমে জুলফিকার।কালো জ্যাকেট, হাতে গ্লাভস, চোখে ঠান্ডা স্থিরতা।তার পাশেই এসে দাঁড়ায় অভী।কালো টি-শার্টের উপর লেদার জ্যাকেট। মাথার ঝুঁটি শক্ত করে বাঁধা ।তারপর কালু মাস্তান।গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির।সবশেষে আসে সুফি হাওলাদার।বয়সের ছাপ মুখে স্পষ্ট। দাড়িতে পাক ধরেছে। তবু তার বাইকের শব্দ উঠতেই আশপাশের তরুণদের মুখ চুপসে যায়।
চারজন নিজেদের জায়গায় বাইক থামায়।কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলে না।শুধু ইঞ্জিনের গর্জন।তারপর ধীরে ধীরে সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।চোখে চোখ পড়ে।সেই দৃষ্টিতে রাগ আছে।পুরোনো হিসাব আছে।ক্ষমতার লড়াই আছে।
অভী ধীরে ধীরে হেলমেট তুলে মাথায় পরে। জুলফিকারও একই কাজ করে। কালু হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ইঞ্জিন রেভ করে। সুফি শুধু চুপচাপ সামনে তাকিয়ে থাকে।চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেটের লোকেরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে। কেউ নিজের দলের নাম নিচ্ছে, কেউ টাকা ধরে বাজি লাগাচ্ছে।
কৃষ্ণ দাস সিগার হাতে দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে। তার অপর পাশে চন্দ্র দাস। অন্যদিকে বাতাসি বেগম শাড়ির আঁচল কাঁধে ফেলে ঠোঁটে লাল পান চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে আছে রেস লাইনের দিকে। তাদের সবার থেকে দূরে আবুল বাশার। চোখে গাঢ় সুরমা। মাথায় সাদা টুপি। গলায় তাজবিহ। পরনে ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি। এক হাতে লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখলেই চারপাশ অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ হয়ে আসে।বয়স তার শরীরকে খানিকটা নুইয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু উপস্থিতি এখনো পাহাড়ের মতো ভারী।
একটু পর সামনে এগিয়ে আসে রেফারি।পুরোনো নিয়ম অনুযায়ী তার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। যাতে কেউ কখনো তার পরিচয় জানতে না পারে।তার হাতে একটা পুরোনো স্টপওয়াচ।লোকটা চারজনের দিকে একবার তাকায়।তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
“ওয়ান রান। নো ব্রেক। নো রুল। যে আগে ফিরবো, হাফ গোডাউন তার।”
রাত তখন ঠিক ১টা ০১।চারটা বাইকের ইঞ্জিন একসাথে গর্জে ওঠে।
জুলফিকার হেলমেটের ভিসার নামিয়ে ফেলে। অভী নিচু হয়ে হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে। কালু মাস্তানের বাইকের সাইলেন্সার থেকে আগুনের ফুলকি বের হয়। আর সুফি হাওলাদার স্থির চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিন্ডিকেটের সদস্যরা চিৎকার করতে শুরু করে। কেউ বাজি ধরছে, কেউ নিজের দলের নাম নিচ্ছে, কেউ আবার শুধু নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।
উন্মাদনা পর্ব ৩২
ঘড়ির কাঁটা ১টা ০২ ছোঁয়ামাত্র হাত নিচে নামে।পরের মুহূর্তেই চারটা বাইক আগুনের মতো ছুটে বেরিয়ে যায় অন্ধকার রাস্তা চিরে।পুরান ঢাকার অন্ধকার আকাশ কাঁপিয়ে বাইক গুলোর পাশাপাশি হঠাৎ সাউন্ড বক্সে গান বেজে ওঠে,
“ ইয়া আলি.. রেহেম আলি..ইয়া আলি..ইয়ার পে কুরবা হে সাবভী..! ইয়া আলি মাদাত আলি..ইয়া আলি..এ্যে মেরি জা এ্যে জিন্দেগী, ইশক পে হা..”
