এই অবেলায় পর্ব ৪৪
সুমনা সাথী
শপিং মল থেকে বাড়িতে আসার পর থেকেই পুরো দিনটা নবনীর মুখভার। গোধূলির পেরিয়ে রাত নেমে এলো। অথচ সে কিছুতেই দিব্যর সাথে একটা কথাও বলছে না। দিব্য অনেকবার যেচে কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ম্যাডামের মনে অদ্ভুত রাগ জমে বসেছে। শোবার ঘরের বিশাল আলমারিটা খুলে ভেতরের সমস্ত জামাকাপড় বের করে বিছানার ওপর জড়ো করেছে নবনী। যেন দুনিয়ার সমস্ত জরুরি কাজ এখন এই কাপড়গুলো ভাঁজ করার মাঝেই লুকিয়ে আছে। একেকটা শাড়ি, একেকটা জামা সে অদ্ভুত এক ক্ষোভ নিয়ে ঝাড়ছে। কয়েকবার করে ভাঁজ করছে। আবার মনঃপূত না হলে পুরোটাই খুলে নতুন করে ভাঁজ করতে বসছে। আর সাথে চলছে ঠোঁট নেড়ে একা একা অবিরত বিড়বিড় করা। দিব্য ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে সোফায় বসেছে ঠিকই কিন্তু কিছুতেই স্ক্রিনের লেখায় মনোযোগ দিতে পারছে না। ওঁর সমস্ত ধ্যানের কেন্দ্রবিন্দু তখন বিছানায় বসে থাকা ওই মানসী। ঘরের মেঝেতে ছোট্ট একটা টেবিল পেতে বসেছে দিয়া। তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আর্টের খাতা আর রঙিন পেন্সিল। সে নিজের মনে রঙের খেলায় মেতে আছে। দিব্য একটা হালকা গলা খাঁকারি দিল। তারপর একটু চড়া সুরে বলল,
“দিয়ার পাপ্পার বোধহয় এই মুহূর্তে এক কাপ গরম কফি লাগবে। দিয়ার মাম্মা কি আজ দয়া করে তা দিতে পারবে না?”
নবনী কাপড়ের স্তূপ থেকে একবার তপ্ত চোখে মুখ তুলে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই এক ঝটকায় চোখ সরিয়ে নিল অন্য দিকে। ভারী গলায় বলল,
“দিয়া, তোমার পাপ্পাকে বলে দাও। সে যাতে নিজের কফিটা নিজেই ম্যানেজ করে নেয়। নয়তো উনার জীবনে অনেক বিশ্বস্ত লোক আছে। তাদের কাউকেই বলতে বলো। তবে হ্যাঁ, দেখো। পরে যেন তারা আবার কফিতে বিষ-টিশ মিশিয়ে না দেয়!”
দিয়া অবশ্য মায়ের এই গূঢ় কথার কিছুই শুনল না। বোঝার বয়সও তার হয়নি। সে একমনে খাতায় লাল-নীল দাগ কাটতে কাটতে পুরো দুনিয়ার বাইরে নিজের এক কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছে। তবে যার কানে কথাটি পৌঁছানোর, সে ঠিকই শুনল। দিব্য মৃদু হাসল। ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে শান্ত গলায় বলল,
“সামান্য একটু কফি খাওয়ার জন্য এখন কি বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে নিয়ে আসতে হবে? আর বিষ দেওয়ার কথা যদি বলো! তবে বিষ দিলে তুমিই দাও না। আমি বিন্দুমাত্র দ্বিরুক্তি না করে হাসি মুখে তা খেয়ে নেব।”
নবনীর হাতের গতি থমকে গেল কিন্তু নিজের নির্লিপ্ত ভাবটা সে বজায় রাখল। নিস্পৃহ গলায় আবারও বলল,
“দিয়া, তোমার পাপ্পাকে সাফ সাফ বলে দাও। সে এসব মিষ্টি কথায় ভোলানোর বিদ্যায় বড্ড কাঁচা। তাকে দিয়ে এসব হবে না। শুধু অন্যের ওপর ধমকটাই ঠিকঠাক দিতে পারেন তিনি। তার এই মেকি কথায় কিন্তু চিঁড়ে ভিজবে না।”
দিয়া খাতা থেকে মুখ তুলে একবার বাবার আর একবার মায়ের পানে চাইল। দুইজনের এই অদ্ভুত বাকযুদ্ধ তার ছোট্ট মাথায় ঠিক খেলল না। সে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মাম্মা, তুমি কি দিয়াকে কিছু বলছো?”
নবনী মেয়ের এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে ভেবে পাওয়ার আগেই ইভান গুটিগুটি পায়ে ঘরের ভেতর এসে ঢুকল। সে সোজা গিয়ে দাঁড়াল দিব্যর সোফার সামনে। দিব্য ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তাকে দেখে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,
“আরে, ইভান বাবু যে! কী হয়েছে? কোনো দরকার আছে?”
ইভান হাত দুটো সামনে গুটিয়ে বলল, “দাদি আপনাকে ডাকছেন বড় চাচ্চু। ওনার নাকি কিছু খুব জরুরি কথা আছে আপনার সাথে। উনি বলেছেন আপনাকে এখনই ওনার ঘরে গিয়ে দেখা করতে।”
দিব্য সংক্ষেপে মাথা নাড়ল, “আচ্ছা। আমি আসছি।”
ইভান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেঝের কার্পেটে দিয়ার পাশে বসল। দিয়া ওকে পাশে পেয়েই একগাল হেসে নিজের খাতাটা ওঁর চোখের সামনে তুলে ধরল,
“ইভান দেখ, আমি কী সুন্দর একটা আপেল এঁকেছি।”
ইভানের খুদে ভ্রু জোড়া মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“এটা তো মোটেই আপেল হয়নি দিয়া। আপেল কখনো এমন পারফেক্ট সার্কেল হয় নাকি?”
দিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে চিল্লে উঠল, “তুই কিছুই জানিস না! এটা পারফেক্ট আপেল। একদম পারফেক্ট গোল হয়েছে। তুই কেন বলছিস এটা সুন্দর না? ইহান আমাকে শিখিয়েছে।”
ইভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সুন্দর হয়েছে কিন্তু আপেল দেখতে এমন গোল হয় না। খাতাটা আমাকে দে। আমি তোকে এঁকে দিচ্ছি।”
দিয়া অগত্যা মাথা নাড়ল। ইভান ওর হাত থেকে পেনসিল আর খাতাটা টেনে নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আপেলের খাঁজগুলো ফুটিয়ে তুলতে লাগল। দিব্য সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে বিছানার দিকে তাকিয়ে নবনীকে আর একবার দেখার চেষ্টা করল সে। নবনী তখনো কাপড় ভাঁজ করার অযুহাতে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। দিব্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ও চলে যাওয়ার পরপরই টেবিলের ওপর রাখা নবনীর ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে আনিকার নাম।
দিব্য এসে থামল অলেখাদের ঘরের সদর দরজার সামনে। ঘরের ভেতরের খাটে আধশোয়া হয়ে আছেন আরশাদ তালুকদার। উনার শরীরের অবস্থা ইদানীং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। মাথার কাছে শান্ত মুখে বসে আছেন অলেখা। এক হাতে তখনো তসবিহ। সবেমাত্র এশার নামাজ শেষ করেছেন তিনি। ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত গম্ভীর নীরবতা। দিব্য দরজার পাল্লায় মৃদু নক করল,
“আম্মু, আসব?”
অলেখা মাথা উঁচিয়ে ছেলের দিকে চাইলেন, “এসো দিব্য।”
দিব্য ধীর পায়ে ঘরের ভেতর এগিয়ে এসে দাঁড়াল। আরশাদ তালুকদার হাতটা সামান্য উঁচিয়ে ইশারায় ওকে বসতে বললেন। দিব্য বাবার খাটের পাশে, অলেখার ঠিক মুখোমুখি বসল। ঘরে কিছুক্ষণ এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করল। অতঃপর অলেখা ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখলেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“শুনলাম তুমি নাকি নবনীকে আবার পড়াশোনা কন্টিনিউ করতে দিচ্ছো? সামনের যে পরীক্ষাটা আছে ও নাকি সেটারও প্রিপারেশন নিচ্ছে আর তুমিই নাকি ওকে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছ?”
দিব্য শান্তভাবে মাথা নাড়ল। অলেখা ছেলের নীরবতা দেখে তপ্ত একটা নিশ্বাস ফেলে পুনরায় বললেন,
“দিব্য, তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিজ্ঞান সম্পন্ন। তোমাকে আমার নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। চারপাশের পরিস্থিতি দেখে সংসারটা যে আস্তে আস্তে উচ্ছন্নে যাচ্ছে। তা কি তুমি বুঝতে পারছো না? একটা কথা সবসময় মনে রাখবে…!”
অলেখার কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল কলরব। ঘরে ভাইকে গম্ভীর মুখে বসে থাকতে দেখে সে কিছুটা চুপসে গিয়ে দরজার কাছেই থমকে দাঁড়াল। আরশাদ তালুকদার ছেলের এমন অসদাচরণ দেখে বিছানাতেই একটু তেঁতে উঠলেন,
“কমনসেন্স বলতে কি তোর ভেতরে বিন্দুমাত্র কিছু নেই কলরব? এইভাবে বড়দের ঘরে কে ঢোকে হুট করে? দরজা নক করতে কি তোকে নতুন করে শেখাতে হবে?”
কলরব কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না। অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাবার এই কড়া ধমকে মেজাজটা তার পুরোপুরি চটে গেল। অলেখা বললেন,
“তুমি চুপ করো তো একটু। কলরব তুই যখন এসেই পড়েছিস ভালোই হয়েছে। এখানে ভাইয়ার পাশে এসে বোস।”
কলরব গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে দিব্যর পাশে বসল।
দিব্য মায়ের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির গলায় বলল,
“দেখো আম্মু, নবনীর পড়াশোনার জন্য তোমার এই ভরা সংসারের কোনো কাজে বিন্দুমাত্র সমস্যা হবে না। এ ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। আমি আগেও বলেছি। আজও বলছি। আমি তোমার আশঙ্কার কথা বুঝতে পারছি আম্মু কিন্তু আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে আমিই বা কী করতে পারি বলো? ওর বয়সটাই বা কতটুকু? আমার মতো একটা এক বাচ্চার সংসারী মানুষকে সে নির্দ্বিধায় বিয়ে করেছে। নিজের অনেক ভালোলাগা বিসর্জন দিয়ে আমার মেয়েকে একেবারে নিজের সন্তানের মতো আগলে বড় করছে। সারাক্ষণ ওর দেখাশোনা করছে। বিনিময়ে এই পরিবার বা আমার কাছে ও কী চেয়েছে বলো? জাস্ট নিজের পড়াশোনাটুকুই তো! আর ও যে ভবিষ্যতে বাইরে গিয়ে চাকরি-বাকরি করবে এমনটাও নয়। জাস্ট গ্র্যাজুয়েট হওয়াটাই ওর জীবনের একটা ছোট্ট স্বপ্ন। আর ওঁর স্বামী হয়ে আমি যদি ওর জন্য এই সামান্যতম আবদারটুকুও পূরণ না করতে পারি। তবে আমার এই পুরুষত্বের কী মূল্য রইল?”
“হ্যাঁ, ঠিকই তো! আমি ভাইয়ার সাথে একশো ভাগ সহমত।”
পাশে বসে থাকা কলরব হুট করে ফোঁড়ন কেটে উঠল। ওর মন্তব্যে ঘরের বাকি তিন জোড়া বিরক্ত চোখ মুহূর্তেই স্থির হলো তার ওপর। আরশাদ তালুকদার, অলেখা এমনকি খোদ দিব্যও ওর দিকে এমনভাবে চাইল যে কলরব থতমত খেয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে মুখটা নিচু করে নিল। অলেখা কলরবের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বিরক্তি মাখানো গলায় দিব্যকে বললেন,
“তুই তো শুধু নবনীর দিকটাই দেখছিস দিব্য। মৌনিতার কথাটা ভেবেছিস? এই বাড়ির বাকি সব বউ-মেয়েরা পড়াশোনা করবে, পরীক্ষা দেবে, আর ও ঘরে একা বসে থাকবে? ওর মনের ভেতরের পুরনো ক্ষতটা কি এতে করে নতুন করে তাজা হবে না? ওর ভেতরেও তো হিংসা আসবে, ক্ষোভ জমবে। আর একবার যদি মনে ক্ষোভ জন্মায়, তবে সংসারে রোজ ঝগড়াঝাটি শুরু হবে। শেষমেশ তিল তিল করে গড়ে তোলা আমাদের এই তালুকদার পরিবারটাই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। তখন কী হবে? সেই দায় কে নেবে?”
দিব্য মায়ের আশঙ্কার বিপরীতে শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল,
“মৌনিতার বিষয়টা সম্পূর্ণ আলাদা আম্মু। তাছাড়া ও যে পড়াশোনা ছেড়ে ঘরে বসে আছে, আমি আজও মনে মনে এটাতে চরম অখুশি। কাব্যর উচিত ছিল ওর পড়াশোনা বন্ধের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ওর পাশে কথা বলা। তাছাড়া আমি তো বললামই। নবনী শুধু ওর গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করবে। ও কোনো ক্যারিয়ার গড়তে যাচ্ছে না। আমার মনহয় এ নিয়ে মৌনিতা কোনোদিন কোনো ঝামেলা করবে না। ও সমঝদার আর অনেক ভালো একটা মেয়ে।”
কিছুক্ষণ চুপ রইলেন অলেখা। পরক্ষণেই তিনি বেশ চড়া গলায় তপ্ত দৃষ্টিতে কলরবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আর ছোটজন? তোমারও কি একই মত? তোমার বউয়ের বিষয়ে তোমার মতামতটা কী শুনি? সেই তো বাড়িতে আসার পর থেকে নতুন করে এই সবটা শুরু করেছে। তোমরা লায়েক হয়েছো। নিজেদের ভালো-মন্দ বোঝো। তাই তোমাদের মূল্যবান মতামত তো আমাদের নিতেই হবে!”
কলরব মুখ তুলে চাইল। তার মাথায় এসবের কিছুই ঢুকছে না। নিযানা পড়াশোনা করবে কি করবে না, তা নিয়ে সে জীবনে কোনোদিন এত জটিল কিছু ভেবেছে নাকি! এখন এই মুহূর্তে আম্মুর এমন কড়া প্রশ্নের মুখে সে কী বলবে? তাও বুঝে উঠতে পারছিল না। মূলত সে এসেছিল নিজের দরকারে বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিতে। কিন্তু এসে যে এমন বড় এক পারিবারিক বিপদে পড়ে যাবে। তা জানলে সে জীবনেও আজ এই ঘরের চৌকাঠ মাড়াতো না। ছেলের এমন বোকা বনে যাওয়া আর নীরবতা দেখে আরশাদ তালুকদার বিছানা থেকেই আবারও ধমকে উঠলেন,
“কী রে, চুপ করে আছিস কেন? তোর মুখে কি বোমা পড়েছে? গাধা কোথাকার! তোর নিজের মতিগতিও তো ইদানীং আমার ঠিক মাথায় ঢুকছে না।এক্সিডেন্টের পর এখন তো দিব্যি সুস্থ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। কাল সকাল থেকে ঠিকঠাক অফিস যাবি। এটা আমার শেষ কথা। আর হ্যাঁ, এখন থেকে মাস শেষে তোকে নির্দিষ্ট একটা বেতন দেওয়া হবে।”
বেতনের কথা শুনে কলরব অবাক বলল, “বেতন দেবে মানে? তার মানে কি? আমি আমার ইচ্ছামতো টাকা খরচ করতে পারব না?”
“তোর বাপের কি এখানে কোনো চিরস্থায়ী জমিদারী আছে নাকি? তোর ভাই, বাপ, চাচা সবাই রক্ত পানি করে টাকা ইনকাম করেছে কি তোর এই খামখেয়ালি ইচ্ছামতো ওড়ানোর জন্য? আপাতত পুরো এক বছর তোকে নির্দিষ্ট একটা বেতনেই চলতে হবে। যখন তুই নিজে পুরো বিজনেসের কোনো একটা বড় দায়িত্ব একা সামলাতে পারবি। তখন নাহয় তোকে পার্টনারশিপ দেওয়ার কথা ভাববো।”
বাবার কথায় কলরব মুখটা কাঁচুমাচু করে ফেলল। অলেখা বললেন,
“তুমি এখন একটু চুপ করো তো। কলরব, দিব্য, আমি তোমাদের দুই ভাইকেই পরিষ্কার করে বলছি। ভালো করে শুনে নাও। নবনী এখন মাঝপথে আটকে থাকা পড়াশোনা করতে চাইছে। ঠিক আছে। ও পরীক্ষাটা দিক। পড়ুক। কিন্তু ও কোনোদিন বাড়ির বাইরে গিয়ে চাকরি করতে পারবে না। আর নিযানা। ওর এই পরীক্ষাটা শেষ হয়ে গেলেই ও আর ওপরে পড়াশোনা কন্টিনিউ করবে না। ওখানেই ইতি। আমার কথা তোমরা দুজনে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছো? এটাই এই বাড়ির সিদ্ধান্ত আর এটাই আমারও শেষ কথা। নয়তো এই বুড়ো বয়সে এসে আমি ও তোমাদের বাবাকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হবো!”
অলেখা বেগমের মুখে ‘ডিভোর্স’ শব্দটা শোনামাত্রই আরশাদ তালুকদার খাটের ওপর এক প্রকার ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। হতভম্ব হয়ে বললেন,
“তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে অলেখা? ঘরে জোয়ান ছেলেপুলেদের সামনে এসব কী কথা বলছো তুমি? আমাদের এত বছরের সংসারে হঠাৎ ডিভোর্সের কথা কেন আসছে? আমি আবার কী করলাম?”
“তুমি কী করোনি? নিজের বোনের মেয়ের প্রতি অতিরিক্ত দরদ দেখাতে গিয়েই তো এই সংসারে আজ এত বড় সমস্যার সূচনা করেছ তুমি। আমি সারাজীবন এই সংসারের জন্য নিজের যা যা স্বপ্ন কোরবানি দিয়ে মুখ বুজে সহ্য করলাম। আজ অন্যের বেলায় সেই নিয়মের ব্যতিক্রম কেন হবে শুনি? বিয়ের পর আমারও তো ইচ্ছা ছিল আরও পড়াশোনা করার। নিজের একটা সুন্দর ক্যারিয়ার গড়ার। আমি কি পেরেছিলাম? সংসার আর নিয়মের বেড়াজালে আমি তো পারিনি। পরবর্তীতে অবশ্য আমি নিজেই বুঝেছি যে একটা মেয়ের আদতে আসল দায়িত্বটা ঠিক কোথায়। একটা মেয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় আর দায়িত্ব হলো তার সংসার, তার স্বামী আর তার সন্তান।”
তিনি একটু দম নিয়ে দিব্যর দিকে চেয়ে আরও দৃঢ় গলায় বললেন,
“মা যদি নিজের ক্যারিয়ারের দোহাই দিয়ে সারাদিন বাইরে চাকরি করে আর পড়াশোনা করে বেড়ায়। তবে ওর ঘরে থাকা ছোট বাচ্চাটাকে মানুষ করবে কে, শুনি? কাজের লোক দিয়ে ঘরের সন্তান মানুষ করাবে? তাতে বাচ্চাটার পুরো শৈশবটাই তো নষ্ট হয়ে যাবে! মায়ের কোল ছাড়া কেউ কোনোদিন একটা সন্তানকে সেই সুশিক্ষায় মানুষ করতে পারে না। আমি তো বলেই দিলাম। এটাই আমার শেষ কথা। এখন তোমরা দুজনে আমার ঘর থেকে আসতে পারো।”
বিছানায় ফোন হাতে আধশোয়া হয়ে আছে কলরব। ওর চোখমুখ গম্ভীর। কী যেন একটা গভীর চিন্তায় ডুবে আছে সে। নিযানা বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওর হাবভাব বোঝার চেষ্টা করেও শেষমেশ কিছু ধরতে পারল না। এদিকে নিযানার নিজেরই এখন মাথায় হাত। সবজি কাটতে গিয়ে অসাবধানতাবশত নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা বেশ খানিকটা কেটে ফেলেছে সে। ক্ষতটা থেকে এখনো তাজা। আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো। কালকে কলেজে ওর একটা জরুরি প্র্যাক্টিক্যাল অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। সেখানে যেমন আঁকিবুঁকির কাজ আছে তেমনই আছে লেখার ঝক্কি। এই কাটা আঙুল নিয়ে সে এখন কলমটাই বা ধরবে কীভাবে? আর আঁকবেই বা কী করে? ওর এখন ইচ্ছে করছে নিজের মাথার চুল নিজে ছিঁড়তে। ঠিক তখনই ওর মনে পড়লো কায়েফের কথা। একটু আশার আলো পেয়ে নিযানা চটপট বিছানা থেকে নিজের বই, খাতা আর ড্রয়িং শিট তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কলরব আড়চোখে ওর যাওয়া খেয়াল করলেও মুখে কিছু বলল না। আপন মনেই ফোন ঘাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই নিযানা গোমড়া মুখখানা নিয়ে ঘরে ফেরত এলো। ওর এমন হতাশ অবয়ব দেখে কলরব ফোন থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোর? এই মাঝরাতে এসব খাতা-পত্র নিয়ে কই গিয়েছিলিস?”
নিযানা হাতের জিনিসগুলো ধপ করে বিছানার ওপর রেখে ওর পাশে বসল। বিরস মুখ করে ম্লান গলায় বলল,
“আমার হাতটা কেটে গেছে কলরব। আমি কলমই ধরতে পারছি না। অথচ কালকে কলেজে প্র্যাক্টিকালের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। ভেবেছিলাম কায়েফের থেকে একটু সাহায্য নেব। ও আমাকে এঁকে-লিখে দেবে। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম ও নিজেই অফিসের একগাদা কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে বসে আছে। ওই ব্যস্ততা দেখে আর ডিস্টার্ব করতে ইচ্ছে করল না। তাই চলে এসেছি। এখন আমি কী করব বলো তো?”
কথাগুলো বলতে বলতে নিজের অসহায়ত্ব সামলাতে পারল না নিযানা। ওঁর চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল বিছানার চাদরে। নিযানার এই কান্না দেখে কলরবের ভেতরের সুপ্ত রাগটা এক মুহুর্তে আরও চড়ে গেল। এমনিতেই সে এক দুশ্চিন্তার পাহাড় মাথায় নিয়ে বসে আছে। তার ওপর আবার এই মেয়ের মাঝরাতের ঘ্যানঘ্যানানি! ওর ইচ্ছা করে নিযানার এই অতি-আবেগী গালে ঠাটিয়ে দুটো চড় লাগিয়ে দিতে। বিরক্ত ও চড়া গলায় বলল,
“এই এই! তুই আবার কাঁদছিস কেন, হ্যাঁ? কথায় কথায় এই ঘ্যানঘ্যানে কান্না ছাড়া জীবনে আর কী পারিস তুই?”
নিযানা ধমক খেয়ে ওর দিকে ভিজে চোখে তাকাল। তারপর নাক টানতে টানতে বলল,
“আমি কী করব বলো? আমার কাছে এই পড়াশোনা, এই সংসার সবকিছু খুব কঠিন মনে হচ্ছে। আমি কিছুতেই একা সব সামলাতে পারছি না।”
ওর চোখের জল আর কাঁচুমাচু মুখটা দেখে কলরবের রাগটা কেমন যেন এক নিমেষে জল হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে উঠে বসল। তারপর নিযানার ড্রয়িং শিট আর কলমটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে খ্যাপাটে গলায় বলল,
“আমার কাছে দে। আমিই করে দিচ্ছি তোর অ্যাসাইনমেন্ট। যদিও আমি যা করব, তা হয়তো তোর ওই পারফেকশনিস্ট মনের মতো অত নিখুঁত হবে না। তাও একদম জমা না দেওয়ার চেয়ে কিছু একটা জমা হওয়া তো ভালো, নাকি? আর দয়া করে এখন ওই কান্নাটা বন্ধ কর তো! দুনিয়ার একটা কাজও তো ঠিকঠাক করতে পারিস না। খালি ভ্যা ভ্যা করা ছাড়া!”
নিযানা দুই হাত দিয়ে চোখের পানিটুকু আলতো করে মুছে ফেলল। কলরব ড্রয়িং শিট আর লেখার টপিকগুলো এক নজর নিখুঁতভাবে দেখে-টেখে নিয়ে বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে কলম আর স্কেল তুলে নিল। ওর এই শান্ত ও নিবিষ্ট চিত্তে কাজ করা দেখে নিযানা বিছানার এক কোণে বসে ভাবতে লাগল। ছেলেটার আসলে হয়েছেটা কী? আজ এতটা গম্ভীর কেন সে? ওঁর এই এলোমেলো চুলের নিচে মস্তিস্কের ঠিক কোন কুঠুরিতে কোন চিন্তাটা এমন করে ঘুরপাক খাচ্ছে? মনের কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারল না নিযানা। নরম গলায় ডাকল,
“কলরব? কী হয়েছে তোমার?”
কলরব আপন মগ্নতা থেকে এক প্রকার চমকে উঠল যেন। ওর লেখার হাতটা থমকে গেল। নিস্পৃহ গলায় বলল,
“কোথায়, কী আবার হবে? কিছু হয়নি।”
নিযানা ওর চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল, “কিছু একটা তো নিশ্চয়ই হয়েছে। তোমাকে আজ এমন গম্ভীর লাগছে কেন?”
কলরব হাতের কলমটা খাতার ওপর রেখে কিছুক্ষণ নীরবতায় ডুবে রইল। তারপর বলল,
“দেখ নিযানা, একটা মস্ত বড় গাছ থেকে হাজার হাজার দেশলাইয়ের কাঠি তৈরি হয়। আবার ঠিক তেমনি, একটা মাত্র সামান্য দেশলাইয়ের কাঠি কিন্তু একশোটা বিশাল গাছকে এক লহমায় পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে। পারে কিনা বল?”
নিযানা ওর এই গম্ভীর ফিলোসফিক্যাল কথাবার্তা শুনে সিরিয়াস হয়ে গেল। ওর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই পারে।”
“তো? আমি আসলে বলছিলাম। এই মুহূর্তে আমার বেশ কিছু টাকা লাগবে। এটাই হলো আসল মেইন কথা। আর আমি যতদূর জানি। তোর বাপের বস্তা বস্তা কালো টাকা আছে। তুই একটা কাজ কর না। তোর বাপকে গিয়ে বল না যে, যৌতুক হিসেবে একমাত্র আদরের জামাইকে কিছু টাকা যেন দিয়ে দেয়।”
কথাটা শোনামাত্রই নিযানার পুরো চোখমুখ তীব্র বিরক্তিতে কুঁকড়ে গেল। এতক্ষণ ধরে সে মনে মনে ভাবছিল কলরব বোধহয় নিজের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার বা জীবনের কোনো মস্ত বড় টানাপোড়েন নিয়ে এত সিরিয়াস কথা বলছে! ওর মুখ থেকে যে শেষমেশ এমন একটা ফালতু আর সস্তা রসিকতা বেরিয়ে আসবে তা সে স্বপ্নেও আশা করেনি। তবুও নিযানা বিরক্তিটুকু চেপে সরল গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কত টাকা লাগবে তোমার? আমাকে বলো। আমি আব্বুকে বলে সত্যিই তোমাকে টাকার ব্যবস্থা করে দেব।”
কলরব খাতা থেকে মুখ তুলে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল। তারপর বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল,
“তোর কি আমাকে আসলেই এত বড় ছোটলোক মনে হয়? আমি তোর বাপের থেকে টাকা নেব?সিরিয়াসলি? আমি কোন কথাটা সত্যি বলেছি আর কোনটা স্রেফ তোর সাথে মজা করেছি। তুই এই সামান্যতম তফাতটুকুও বুঝিস না?”
নিযানা অসহায় দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অভিমানী গলায় বলল,
“আমি সত্যি তোমাকে কোনোদিন বুঝতে পারি না, কলরব। তোমাকে বোঝা খুব কঠিন।”
কলরব মুখ তুলে তাকাল। নিযানা তখনো অপলক চেয়ে ছিল বিধায় আবারও দুজনের চার চোখ এক হলো। কলরব নিজেই কেমন যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে চট করে চোখ সরিয়ে নিল। খাতার পাতায় আবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে উদাসীন গলায় বলল,
“আসলেই, আজ অব্দি এই দুনিয়ায় আমাকে কেউই ঠিকঠাক বোঝেনি। তুই আর নতুন কী বুঝবি?মাঝেমধ্যে আমি নিজেই তো নিজেকে বুঝে উঠতে পারি না। নে, ধর তোর অ্যাসাইনমেন্ট। হয়ে গেছে।”
নিযানা খাতার পাতার দিকে তাকাতেই ওর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। কলরবের করা নিখুঁত স্কেচ আর সুন্দর লেখার দিকে চেয়ে সে এক প্রকার মুগ্ধ হয়ে বলল,
“ওয়াও কলরব! তুমি সত্যিই খুব সুন্দর আর্ট করো!”
নিযানা খুশি মনে খাতাটা নিজের দিকে টেনে নিতে গেলেই কলরব হাত দিয়ে ওটা আটকে ধরল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মাখানো হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কী রে? এত বড় একটা উপকার করলাম। আগে একটা ধন্যবাদ তো দিবি?”
নিযানা ভ্রু কুঁচকে বলল, “তোমাকেও আবার ধন্যবাদ দিতে হবে নাকি?”
“আচ্ছা, ধন্যবাদ দিতে না চাইলে একটা কাজ কর। তুই বরং একটা চুমু দে।”
নিযানা পুরো হাঁ করে তাকাল ওর দিকে। কলরবের মুখ তখনো গম্ভীর। যেন কত বড় একটা পাওনা সে দাবি করেছে। কথাটা সে বরাবরের মতোই স্রেফ মজা করেই বলেছিল। কিন্তু ওর সেই ঘোর কাটার আগেই নিজের শুষ্ক ওষ্ঠে এক জোড়া নরম, কম্পিত ঠোঁটের আকস্মিক স্পর্শ পেতেই তীব্রভাবে চমকে উঠল কলরব।
মুহূর্তের জন্য ওর চারপাশ যেন থমকে গেল। এক অজানা, তীব্র শিহরণে সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে ডেকে উঠল যেন।কাজটা করে ফেলার পরমুহূর্তেই নিযানা লজ্জায় আর সংকোচে হাওয়ার বেগে বিছানা ছেড়ে উঠে চলে গেল। টেবিলের ওপর গিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজের বই-খাতাগুলো গোছাতে লাগল। ওর ফর্সা গাল দুটো তখন তীব্র লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠেছে। হাত দুটো কাঁপছে থরথর করে। কলরব অবাক চোখে কিছুক্ষণ নিযানার পিঠের দিকে চেয়ে রইল। পরক্ষণেই সে বিছানায় ধপ করে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ জোড়া গিয়ে ঠেকল ছাদের সিলিং-এ। এক অদ্ভুত, অচেনা অনুভূতিতে ছেয়ে গেছে ওর পুরো মন। আজকাল কেমন সব আজব, হিসাব-নিকাশের বাইরের জিনিস ঘটছে তার সাথে! নিযানা বই গোছানোর ছলে আড়চোখে অনবরত কলরবের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিল। কিন্তু কলরবকে অমন নিস্পৃহ আর উদাস হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে ওর নিজের মনটা এক নিমেষে ভার হয়ে এলো। সে ভেবেছিল কলরব হয়তো আগের মতো ক্ষ্যাপাটে কোনো রিয়াক্ট করবে। তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। কিন্তু ওর এই নিস্তব্ধতা দেখে নিযানার মনে হলো। ও কি তবে রাগ করল? কিছুক্ষণ পর, নিজের বুকের ওপর আচমকা একটা ছোট্ট, নরম শরীরের কোমল উপস্থিতি টের পেতেই থমকে গেল কলরব। সে তখনো সিলিং-এর দিকেই চেয়ে ছিল। নিযানা ততক্ষণে ঘরের মেইন লাইটটা অফ করে দিয়ে এসেছে। শুধু জিরো ওয়াটের নীল মায়াবী আলোটা জ্বলছে ঘরের কোণে। সে গুটিগুটি পায়ে এসে কলরবের বুকের ওপর নিজের মাথাটা ঠেকিয়েছে। কলরব এক চুলও নড়ল না। ওর বুকের ভেতরটা তখনো অশান্ত ঝড়ের মতো কাঁপছে। তবুও সে চুপ করে রইল। নিযানা ওর এই দীর্ঘ নীরবতার অনেকগুলো ভুল আর আশঙ্কাজনক অর্থ খুঁজে পেল অবুঝ মনে। ওর চোখ দুটো আবার ভিজে এলো। কম্পিত গলায় বলল,
“আই অ্যাম স্যরি, কলরব! আমার ওইভাবে কথা বলা একদম উচিত হয়নি।’
নীলচে আবছা আলোর আঁধারে ঘরটা ডুবে আছে। প্রত্যুত্তরে বেশ কিছুক্ষণ পর কলরবের ভারী গলা ভেসে এলো,
“কীসের কথা বলছিস?”
“সেদিনের পর একবারের জন্যেও তুমি আমার কাছে আসোনি। এখনো রেগে আছো আমার ওপর?”
এবারও বেশ কিছুক্ষণ কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। ঘরের দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক আওয়াজ যেন তীব্র হয়ে বাজতে লাগল। নিযানা বার কয়েক মাথা সামান্য উঁচিয়ে কলরবের মুখের পানে চাইল। কিন্তু এই নীলচে আলোয় ওর মুখের তেমন কোনো স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। নির্লিপ্ত আর উদাসীন মনে হলো তাকে। নিযানা নিজের ভেতরের ছটফটানি দমাতে আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ওর কথা ঠোঁটের কোণেই অব্যক্ত রেখে কলরব শান্ত গলায় বলল,
“আমি অসুস্থ ছিলাম।”
এই স্পষ্ট আর সাজানো মিথ্যাটা বুঝতে নিযানার মোটেও কষ্ট হলো না। বুকটা মুচড়ে উঠলো ওর৷
“আমি নিজে থেকে তোমার কাছে ফিরে এসেছি কলরব।”
“দয়া করেছিস?”
“কলরব!”
আহত শোনাল নিযানার গলা। বুকটা ওর অভিমানে ভেঙে আসতে চাইল। কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য সিলিং-এর দিকে তাকিয়েই একনাগাড়ে বলে চলল,
“তোর কী মনে হয় নিযানা? কথাগুলো এত সহজে ভোলার মতো? আমি তোকে সেদিনও বলেছিলাম। চড়ের আঘাতের চেয়ে কথার আঘাত অনেক বেশি তীব্র হয়। তা সহজে শুকায় না। হ্যাঁ, আমি মানছি আমি নিজেও তোকে অনেক কথা বলেছি। তোকে কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু এটলিস্ট আমি নিজের ভুলটা স্বীকার তো করি! আসলে আমার অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমি একটা আস্ত নির্বোধ। তুই বারবার মুখে বলেছিস তুই আমাকে অপছন্দ করিস। আমাকে ঘৃণা করিস। আমি তাও একটা নির্লজ্জ, বেহায়ার মতো তোর সাথে আচরণ করেছি। তোর মতে জোর করে তোর ওপর নিজের অধিকারের ফায়দা তুলেছি। তুই সোজাসুজি মুখে আমায় ছোট করতে না পারলেও আচরণের মাধ্যমে রীতিমতো আমাকে ফিল করিয়েছিস যে আমি আসলে একটা…! যাই হোক, আমি তোর ওপর রেগে নেই। ভুলটা আসলে আমারই ছিল। সেটা আমি এখন স্বীকার করে নিজেকে ভালোমতো বুঝিয়ে নিয়েছি। আর পূর্বের সবকিছুর জন্য আমিও তোর কাছে স্যরি। তোর ইচ্ছা না হলে তুই আমাকে ক্ষমা করিস না। জোর নেই।”
কলরবের মুখের এই নিরাসক্ত কথাগুলো নিযানার বুকে তীরের মতো বিঁধল। কাল রাতে যে মানুষটার হাত ধরে সে অনন্তকাল পথ চলার কথা ভাবছিলো সে আজ কতটা দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলছে! নিযানা ওর বুক থেকে মাথা তুলে প্রায় কম্পিত গলায় বলল,
“কেন বলছো এসব কথা? আমি তো নিজের ভুলের জন্য তোমার কাছে স্যরি বলেছি। ভুল তো তুমিও করেছিলে শুরুতে। আমি কি তোমাকে মনে মনে ক্ষমা করে দিইনি? সেদিনের পর তো বেশ অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। আমরা কত স্বাভাবিকভাবে একসাথে আছি। আল্লাহ! আমি বিন্দুমাত্র বুঝতেই পারিনি যে তুমি মনের ভেতর এত বড় একটা অভিমান আর রাগ পুষে রেখে এভাবে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছ!”
নিযানার সত্যি সত্যি কান্না পেয়ে গেল। সত্যিই কোনোদিন তলিয়ে ভাবতে পারেনি যে, হাসিখুশি আর খ্যাপাটে স্বভাবের এই ছেলেটা মনের ভেতরে এতটা কুঁকড়ে আছে। ভেবে দেখলে সেদিনের দুপুরে আঘাত করার মতো জঘন্য কথাই সে বলেছিল। অথচ তারপর অহংকারবশত একটা ‘স্যরি’ বলার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেনি। ও তো এতকিছু মনেই রাখেনি। বরং গত চব্বিশ ঘণ্টায় মনে মনে বড্ড খুশি ছিল এটা ভেবে যে কলরবের সাথে তার দূরত্ব কমছে। সম্পর্কটা বুঝি এবার স্বাভাবিক হচ্ছে। কলরব ওর ভেতরের এই অস্থিরতা টের পেয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি রেগে নেই নিযানা। তুই ভুল ভাবছিস। অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘুমা তো। বালিশে গিয়ে ঘুমা।”
নিযানা ওর বুকের ওপর থেকে মুখ তুলে ছলছল চোখে তাকাল,
“তুমি যা বলছ, তা আমায় বিশ্বাস করতে বলছো?”
“না করার কী আছে? আরে বাল, আমি সত্যিই রেগে নেই।”
“তাহলে প্রুভ করো।”
“কীসের প্রমাণ?”
“যে তুমি সত্যিই রেগে নেই। আমি সত্যিই স্যরি কলরব।”
কলরব হালকা করে হাসল। ওর গলার স্বর থেকে সেই কঠিন কাঠিন্যটুকু এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। নিযানার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলল,
“বুঝতে পেরেছি। এত সিরিয়াস হচ্ছিস কেন তুই? আরে, আমি স্রেফ একটু মজা করেছি তোর সাথে। এবার ঘুমা, মা।”
নিযানা অবশ্য ওর এই মৌখিক আশ্বাসে পুরোপুরি শান্ত হতে পারল না। সে নিজের ভেতরের সমস্ত দ্বিধা আর আড়ষ্টতা এক ঝটকায় মাড়িয়ে দিয়ে আরেকটু নিবিড়ভাবে সেঁটে গেল কলরবের চওড়া বুকে। ওর গলাটা জড়িয়ে ধরল নিজের দু-হাতে। তারপর কাতর আর মায়াবী চোখে চাইল কলরবের পানে। স্পষ্ট বোঝা গেল ওর চোখের মণিজোড়া আবেগে ছলছল করছে। কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্ধাঙ্গীনির চোখের অব্যক্ত ইশারা আর ওর শরীরের উষ্ণতা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হলো না তার। ভেতরের জমানো সব অভিমান, রাগ আর দূরত্বের দেয়াল নিমেষেই ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল। শেষমেশ সে হার মানল তার এই অবুঝ রমণীর মিষ্টি জেদের কাছে। ওর কোমরটা নিজের শক্ত বাহুডোরে টেনে নিতে নিতে কলরব ফিসফিস করে বলল,
“পরে মেজাজ খারাপ করলে, লাথি দিয়ে নিচে ফেলে দেব বলে দিলাম।”
নিশিথ রাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চারপাশ। শোবার ঘরের মৃদু আলোয় নবনী বিছানায় শুয়ে দিয়াকে একের পর এক রূপকথার গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই গল্পে পিচ্চিটার দু-চোখের পাতা এক হওয়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই। কিছুতেই সে ঘুমাতে চাচ্ছে না। ওদিকে দিব্য শান্ত হয়ে পাশে শুয়ে থাকলেও ওর মনটা মোটেও শান্ত নেই। শপিং মলের সেই ঘটনার পর থেকে নবনীর ভেতরের রাগটা যে বিন্দুমাত্র কমেনি তা ওর থমথমে মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। দিব্য কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এত রাগের কি আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর, দিয়া ক্লান্ত হয়ে মায়ের বুকে মাথা রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। চারপাশটা আরও একটু নিঝুম হতেই দিব্য নিজের একটা হাত রাখল নবনীর নরম হাতের ওপর। কিন্তু স্পর্শটুকু পেতেই নবনী এক ঝটকা টান মেরে ওঁর হাতটা ছাড়িয়ে নিল। দিব্য এবার একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। নবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল,
“আর ঠিক কীভাবে কোন ভাষায় ‘স্যরি’ বললে আপনি আমায় মাপ করবেন, শুনি? এবার কি অভিমানের মাত্রাটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না তালুকদার গিন্নি? সকাল থেকে দেখছি শুধু মুখটাই ভার করে আছেন। এভাবে চললে আমি কিন্তু এই ঘর ছেড়ে বাইরে গিয়ে অন্য কোথাও ঘুমাব, বলে দিলাম।”
দিব্যর মুখ থেকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার এই আকস্মিক কথাটি শোনামাত্রই নবনী চট করে ওর দিকে তাকাল। বুকটা কেঁপে উঠল। ওর ওই চলে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকিতে ভেতরের কঠিন রাগটা পলকে কিছুটা নরম হয়ে এলো। মনে মনে তারও মনে হলো। আসলেই কি সে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? কিন্তু রাগ হলে যে ওর নিজের ওপরও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সে কথাই বা বোঝায় কীভাবে! সে নিজের ভেতরের দুর্বলতাটুকু আড়াল করতে আমতা আমতা করে বলল,
“কী! আপনি আমাকে ঘর ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন?”
দিব্য ওর মুখের ভঙ্গি দেখে একটু বাঁকা হেসে বলল,
“ইশ! কী যে বলেন না ম্যাডাম। আমার কি এত বড় স্পর্ধা আছে যে আমি আপনাকে হুমকি দেব?”
“নাটক করবেন না একদম!”
নবনী ঠোঁট উল্টে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল। দিব্য আলতো করে দিয়ার মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিল।
“আস্তে কথা বলুন, দিয়া উঠে যাবে কিন্তু।”
মেয়ের দিকে তাকাতেই নবনীর রাগ-অভিমান যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেল। ওর চোখে-মুখে ভর করল গভীর দুশ্চিন্তা। চিন্তিত আর আকুল গলায় বলল,
“আচ্ছা, আপনি কি ইদানীং একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? দিয়া আজকাল রাত করে ঘুমাতে যায়। সারাদিন কেমন যেন একটা অরুচি, কিছুতেই ঠিকমতো খেতে চায় না। আচ্ছা ওর ভেতরে কোনো অসুখ-বিসুখ দানা বাঁধেনি তো? রাতে কি ওর ঠিকঠাক ঘুম হয় না? আমাদের কি কালই ওকে একবার ভালো কোনো চাইল্ড স্পেশালিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত?”
নবনীর মুখের সিরিয়াসনেস দেখে দিব্যর বুকের ভেতর থেকে একটা জোরালো হাসি উথলে উঠল। এমন আতঙ্কিত মুখ করে বলছে যেন কী না কী এক মস্ত বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে! তবে এই মুহূর্তে হাসলে যে ম্যাডামের রেগে যাওয়া ওই বারুদ আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে তা সে ভালো করেই জানে। তাই নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে, ওঁর সমস্ত মান-অভিমান এক নিমেষে চূর্ণ করে দিয়ে দিব্য এক টানে নবনীকে নিজের চওড়া বুকের ভেতর জড়িয়ে নিল। নবনী এবার আর হাত পা ছুড়ে নড়েচড়ে ওঠার কোনো চেষ্টা করল না। ওঁর সমস্ত ক্লান্তি আর রাগ যেন ওই শক্ত বাহুডোরে এসে শান্ত হয়ে গেল। নিজের শরীরটাকে আরও একটু গুটিয়ে নিয়ে দিব্যর চওড়া বুকে নির্ভরতায় মুখ গুঁজল। দিব্য ওর মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,
“তুমি যতটা ভাবছ। তেমন বড় কোনো সমস্যাই না ওটা। তাও তোমার মনের শান্তির জন্য আমি কালই একবার ভালো চাইল্ড স্পেশালিস্টের সাথে কথা বলে দেখব। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে কী মনে হয় জানো? ওর আসলে কোনো অসুখ হয়নি। ও একা হয়ে পড়েছে। এই মস্ত বড় বাড়িতে আরও একটা খেলার সাথী পেলে ও একদম ঠিক হয়ে যাবে।”
দিব্যর এই প্রচ্ছন্ন ইশারা বুঝতে নবনীর এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে বুকের ওপর থেকেই মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল,
“আপনার খালি ওই এক বাজে কথা! একটা কথা শুনুন, আপনি প্লিজ আমার ওপর রাগ করবেন না, কিন্তু আমি এই মুহূর্তে চাই না আমাদের জীবনে নতুন কেউ আসুক।”
দিব্য একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন নবনী? কী সমস্যা?”
“দিয়া এখনো ছোট। এখন যদি এমন কিছু হয়। তবে বাইরের মানুষজন সব বাজে ভাববে।”
“আশ্চর্য! এতে মানুষের বাজে ভাবার কী আছে শুনি?”
নবনী ম্লান হেসে বলল, “আপনি পুরুষ মানুষ। আপনি সমাজ আর মানুষের ভেতরের এই কুৎসিত রূপটা বুঝবেন না।”
“তোমার সত্যিই তাই মনে হয়?”
নবনী বলল, “যদি বাড়ির আর বাইরের সবাই আমাদের দিকে বাজে নজরে তাকায়? আমার… আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগবে না, খুব খারাপ লাগবে তখন।”
“কিন্তু তোমার হঠাৎ এমনটা মনে হওয়ার কারণ কী, নবনী?”
নবনী একটু চুপ করে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই একটা ভাইয়ার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি পরিবারের চাপে আবার বিয়ে করেছিলেন। ওর প্রথম পক্ষের একটা মাত্র তিন বছরের ছোট ছেলে ছিল। তো, বিয়ের ঠিক দুই মাসের মাথায় নতুন ভাবি যখন ওনাদের পরিবারে আবারও মা হওয়ার খবরটা দিল তখন ওই ভাইয়াসহ বাড়ির সবাই রেগে গিয়েছিল। ভাইয়া নাকি কয়েকদিন অব্দি নতুন ভাবির সাথে একটা কথাও বলেনি। ওনাকে অবহেলা করেছিল। আপনি… আপনিও কি তখন ওনাদের মতো আমার ওপর এমন রাগ করবেন না?”
নবনীর আশঙ্কার কথা শুনে দিব্যর বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটা যে মনের ভেতর কতটা ভয় আর সমাজলজ্জার দেওয়াল বয়ে বেড়াচ্ছে তা এই একটা কথাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল। দিব্য নবনীর কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াাল। তারপর বলল,
“তুমি কি আস্ত একটা পাগল, নবনী? সত্যিই কি তোমার এই দিব্য তালুকদারকে ওই সংকীর্ণমনা পুরুষগুলোর মতো মনে হয়?”
নবনীর চোখ দুটো তখনো সামান্য ছলছল করছে। সে দিব্যর বুকের ওপর হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
“আমি জানি কিন্তু এটাও জানি আপনি দিয়াকে কতটা ভালোবাসেন৷ ভেবেছিলাম আপনি এসব নিয়ে সবসময় স্রেফ মজাই করেন।”
দিব্য ওর কোমর জড়িয়ে থাকা হাতের বাঁধনটা আরেকটু নিবিড় করল। ঠোঁটের কোণে আশ্বস্ত করা হাসিটা ফুটিয়ে বলল,
“তুমি ওসব ফালতু সমাজ আর লোকলজ্জার কথা একদম ভাববে না তো! তুমিও একটুখানি মজায় করে নতুন একজন অতিথিকে ল্যান্ড করিয়েই দাও। তারপর দেখবা আমি সহ এই বাড়ির সবাই মিলে আরও কত বেশি মজা করি।এমনিতেই আমার বয়সটা একটু একটু করে বাড়ছে তো। এখনি যদি তোড়জোড় শুরু না করি। তবে পুরো একটা আস্ত ক্রিকেট টিম বানানোর আগেই যদি হুট করে ওপরে চলে যাই। তাহলে কিন্তু ওদিকে বাংলাদেশের আর ওয়ার্ল্ড কাপ জেতা হবে না!”
“চুপ করুন একদম! মুখে কিচ্ছু আটকায় না আপনার!”
“আচ্ছা। একদম চুপ। সবটাই আপনার মর্জি ম্যাডাম।”
“হুমমম…!”
নবনী ওর বুকে নিজের মুখটা আরেকটু ভালোভাবে গুঁজে দিয়ে শান্ত হলো। কিছুক্ষণ ঘরের ভেতর একটা নীরবতা বিরাজ করল। কেবল দুজনের নিঃশ্বাসের ওম একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দিব্য গম্ভীর গলায় বলল,
“আচ্ছা নবনী, একটা কথা খেয়াল করেছ? তুমি ইদানীং কিন্তু বেশ খানিকটা মোটা হয়ে গেছ!”
কথাটা শোনামাত্রই নবনী ঝট করে বুক থেকে মাথা তুলল। ওর ফর্সা কপালে কৃত্রিম রাগের একটা কুঁচকানো ভাঁজ। পাল্টা জবাব দিল,
“তাই নাকি? আর আপনি যে দিনকে দিন আস্ত একটা বুড়ো হয়ে গেছেন। তা খেয়াল করেছেন?”
দিব্য পুরো আকাশ থেকে পড়ার ভঙ্গি করল। নিজের গাল হাত দিয়ে ছুয়ে বলল,
“কী আশ্চর্য! আমাকে তোমার কোন দিক দিয়ে বুড়ো মনে হয়, আজব তো!”
“সব দিক দিয়েই! বিশেষ করে বয়সের দিক দিয়ে। আমার থেকে কত বছরের বড় আপনি, হিসাব আছে?”
নবনী বিজয়ী হাসির ছোঁয়া ঠোঁটে ঝুলিয়ে ওর চিবুক ছুঁয়ে দিল। দিব্য বলল,
“তাই? এত বড় কথা! দাঁড়াও, কালকে সিট মাস্কগুলো তিনটা একসাথে মুখে লাগাবো। দেখবা একেবারে বিশ বছরের হয়ে তোমার সামনে ঘুরঘুর করছি!”
নবনী খিলখিল করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। শান্ত, নিঝুম মাঝরাতে ওর সেই অনাবিল খুশির হাসির তোপে দিব্যর পুরো চওড়া শরীরটা কাঁপতে লাগল। নবনীকে ওভাবে হাসতে দেখে দিব্যর নিজেরও ঠোঁটের কোণ গলে এক রাশ অকৃত্রিম প্রশান্তির হাসি বেরিয়ে এলো। ওর জড়িয়ে থাকা বাহুডোরের ভেতর হাসতে থাকা এই অপরূপা রমণী আর পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট দিয়ার দিকে তাকিয়ে দিব্যর মনে হলো। এই মুহূর্তে বোধহয় এই মস্ত বড় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটা সে নিজে। জীবনের কন্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে এমন একটা মুহূর্ত আর এমন একটা ভালোবাসায় জড়ানো ছিমছাম নিখুঁত জীবনের স্বপ্ন সে সবসময় নিজের মনের অবচেতনে দেখে এসেছে। কিন্তু অতীতের সেই ঝড়-ঝাপটা পার করে তা যে আদতে কোনোদিন সত্যি সত্যি ওর হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেবে তা সে কখনো ভাবেনি। ব্যাস, এই এক টুকরো শান্ত পৃথিবী আর বুকভরা ভালোবাসার মাঝেই বোধহয় দিব্য তালুকদারের জীবনের পরম পাওয়া। সবকিছুর পূর্ণতা মিলে গেল। আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই এই নশ্বর জীবনের কাছে।
ভোরের নরম আলো জানালার পর্দা গলে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। ঘুমের ঘোরে হঠাৎই নড়েচড়ে উঠল কলরব। আধো-ঘুম আধো-জাগরণের নিজের খুব কাছে একটা অতি চেনা শরীরের কোমল উষ্ণতা আর শান্ত হৃৎপিণ্ডের ধকধক আওয়াজ অনুভব করতে পারল। জোর করে চোখের পাতা মেলতেই চোখের সীমানায় ধরা দিল ঘুমন্ত নিযানার এক অপরূপ মুখচ্ছবি। ওর অবাধ্য রেশমি চুলের অবিন্যস্ত কিছু গোছা মুখের অর্ধেকটা ঢেকে রেখেছে। নিযানা নিশ্চিন্তে কলরবের গলার ঠিক কাছটায় মাথা গুঁজে ঘুমিয়ে আছে। কলরব এক পলকের জন্য পুরোপুরি থমকে গেল। ওর চঞ্চল চোখজোড়া কেন যেন এই স্নিগ্ধ রূপ থেকে আর সরতে চাইল না। ঘুমন্ত নিযানাকে এই প্রথম ওর এতখানি মায়াবী আর শান্ত মনে হলো। সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে আলতো আর কাঁপা আঙুলে ওর মুখের ওপর অবাধ্যভাবে পড়ে থাকা চুলগুলো আলগোছে কানের পিঠে গুঁজে দিল। ঠিক তখনই, আচমকা নিযানা ঘুমের ঘোরেই ওর হাতটা বাড়িয়ে কলরবের কোমর জড়িয়ে ধরে আরেকটু নিবিড়ভাবে সেঁটে গেল ওর সাথে। কলরবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসির রেখা ফুটে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় সশব্দে করাঘাত করল কেউ। হঠাৎ এই আওয়াজে নিযানা চমকে নড়েচড়ে উঠল। ধড়ফড় করে দু-চোখ মেলতেই সে একদম নিজের মুখের সামনে কলরবের প্রখর দৃষ্টিটা আবিষ্কার করল। মুহূর্তের জন্য দুজনের চার চোখ এক হলো।আর পরক্ষণেই লজ্জায়, সংকোচে রমণীর ফর্সা গাল দুটো একেবারে রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। কলরবের ওই একদৃষ্টে চেয়ে থাকা গভীর চাহনি ওর ভেতরের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিল। দরজায় আবারও অধৈর্য ধাক্কা পড়তেই কলরব ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কে?”
নিযানা লজ্জার চোটে ওর কথার কোনো প্রত্যুত্তর দিতে পারল না। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে, দরজাটা খুলল। দরজা খুলতেই ওপাশে দিব্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“গুড মর্নিং, ভাইয়া।”
দিব্য ওঁর মাথায় আলতো করে হাত রেখে স্নেহের সুরে বলল,
“গুড মর্নিং। কলরব কোথায়? এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি?”
নিযানা আমতা আমতা করে বিছানার পানে চেয়ে কিছু একটা বলতে নিতেই দেখল। কলরব এতক্ষণ দিব্যি জেগে থাকা সত্ত্বেও এখন চাদর মুড়ি দিয়ে আস্ত এক কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমানোর ভান করে পড়ে আছে। ও যে নিখুঁত একটা নাটক করছে তা নিযানা খুব ভালো করেই বুঝল। দিব্য আর দরজায় দাঁড়িয়ে না থেকে হনহন পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে সোজা গিয়ে দাঁড়াল বিছানার পাশে। কম্বলের ওপর দিয়ে কলরবকে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বেশ গম্ভীর ও চড়া গলায় ডাকল,
“কলরব! অনেক নাটক হয়েছে তোর। এবার ওঠ। নিচে তোকে খোঁজার জন্য থানা থেকে পুলিশ এসেছে!”
নিযানা অবাক হয়ে বড় বড় চোখে চাইল। দিব্যর কথা শুনে কলরবের ঘুমের ভান এক মুহুর্তে উবে গেল। সে কম্বলটা এক ঝটকায় সরিয়ে মুখটা বের করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“তা, নিচে পুলিশ এসেছে তো আমাকে ডাকছো কেন ভাইয়া? ওদের জন্য চা-নাস্তা বানানো কি আমার কাজ নাকি? বাড়ির কোনো মহিলাকে বলো নাস্তা বানিয়ে দিতে। ওদের ড্রয়িংরুমে বসতে দাও।”
দিব্যর কপাল কুঁচকে চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“আর একটাও যদি ফালতু কথা বলেছিস, তাহলে খুব খারাপ হবে কলরব! ওরা এখানে চা-নাস্তা খেতে আসেনি। তোকে অ্যারেস্ট করতে এসেছে। ইডিয়ট কোথাকার! ওদের কাছে প্রপার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে। এখন সাফ সাফ বল। ব্যাকগ্রাউন্ডে কী জঘন্য কীর্তি ঘটিয়েছিস তুই?”
কলরব এমন ভান করল যেন সে আস্ত আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়েছে। শোয়া থেকে চট করে উঠে বসে হতভম্ব আর ভেবাচেকা খাওয়া গলায় বলল,
“আমাকে ধরতে এসেছে? কিন্তু কেন? আমি আবার কী করলাম?”
“সেটা তুই আমার চেয়ে ঢের ভালো জানিস!”
কলরব নিরীহ মুখে নিযানার দিকে তাকাল, “আমি কী করেছি, হ্যাঁ? এই নিযানা। তুই-ই বল না ভাইয়াকে! কাল রাতে কি আমি ঘর থেকে বের হয়ে কোনো চুরি-ডাকাতি করতে গিয়েছিলাম? তুই তো সারাটা রাত আমার সাথেই ছিলিস। পুলিশদের নির্ঘাত কোনো বড় ভুল হচ্ছে ভাইয়া। তুমি উনাদের গিয়ে বলো যে ওটা অন্য কেউ। কলরব এমন কিছু করতেই পারে না। তুমি বললে উনারা ঠিকই বুঝবেন।”
দিব্য বিরক্ত গলায় বলল, “অনেক হয়েছে তোর এই সস্তা নাটক! এসব ঢং তুই নিচে গিয়ে আম্মু আর তোর ভাবিদের দেখাস। আমার সামনে দেখিয়ে বিন্দুমাত্র লাভ নেই। তোকে নিয়ে যে আমি ঠিক কী করব তা আমার নিজেরও আর মাথায় আসে না! এই তালুকদার বাড়ির মান-সম্মান ধুলোয় মেশাতে এতদিনে শুধু এই একটা কীর্তিই বাকি ছিল, তাই না? বেশি কথা না বাড়িয়ে দ্রুত নিচে চল আমার সাথে।”
কলরব বড্ড কাঁচুমাচু মুখ করে ঠোঁট উল্টে বিড়বিড় করতে করতে বিছানা থেকে নামল। ওঁর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে। সে যেন অতি বড় এক নির্দোষ বালক। যাকে জোর করে ফাঁসানো হচ্ছে। ওদিকে নিযানার বুকের ভেতরটা তখন দুরুদুরু করে কাঁপছে। আচমকা সাতসকালে পুলিশ কেন এই বাড়িতে কলরবকে ধরতে আসবে? কী এমন মারাত্মক কাণ্ড ঘটিয়ে বসে আছে এই খ্যাপাটে ছেলেটা? সে আর নিজের উদ্বেগ চেপে রাখতে না পেরে চিন্তিত ও কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
এই অবেলায় পর্ব ৪৩
“ভাইয়া… সত্যি কি বড় কোনো সমস্যা হয়েছে?”
দিব্য নিযানার ওই ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে ভেতরের তীব্র মানসিক অস্থিরতাটুকু অনায়াসেই আন্দাজ করতে পারল। ছোট ভাইয়ের ওপর রাগ থাকলেও এই মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে সে নিজের গলার স্বর কিছুটা নরম করল। ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তুই অযথা ভয় পাস না নিযানা। বোধহয় তেমন বড় কোনো সমস্যা না। তাছাড়া ও যখন নিজেই বলল সে তেমন কিছু করেনি। এখন এই কথাটা সত্যি প্রমাণিত হলেই ভালো।”
