Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫১

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫১

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫১
মহাসিন

দেখতে দেখতে একটা মাস কেটে গেল।
ঘড়ির কাঁটা সকাল দশটার ঘর ছুঁয়েছে। ড্রয়িং রুমের সোফায় পা গুটিয়ে বসে আছে কলি আর শাপলা। চা এর কাপ হাতে, মুখে আড্ডার ফোয়ারা। নীলাঞ্জনা আর কবিতা গেছে কেনাকাটা করতে। বাড়িটা তাই আজ একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
শাপলা আঁড়চোখে কলির দিকে তাকাল।

_ “তা তোর পরিবারের সাথে দেখা করবি না?”
কলি হাসল। মলিন সে হাসি।
_ “আমি তো আমার পরিবারের সাথেই আছি।”
শাপলা কপালে ভাঁজ ফেলল।
_”আরে পাগলী, আমি তোর মা বাবার কথা বলছি।”
কলির হাসিটা এবার একদম মিলিয়ে গেল। গলার স্বর কেঁপে উঠল একটু।
_”তারা আমার কেউ না। যদি আমার কিছুর দাম থাকতো ওদের কাছে, তাহলে ব_য়_স্ক একটা লোকের সাথে বিয়ে দিতে চাইতো না।”
কথাটা শেষ হতেই টিং টং। কলিং বেল বেজে উঠল।
শাপলা কাপটা টি টেবিলে রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো দরজার কাছে। দরজা খুলতেই দেখল, একজন অচেনা লোক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বাদামি রঙের একটা বক্স।
শাপলা ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
_”আপনি কে?”
লোকটা চারপাশে একবার চোখ বুলাল।
_ “এই বাড়িতে শাপলা কে?”
_”আমি শাপলা।”

_”আপনার জন্য একটা পার্সেল আছে।” বলেই লোকটা বক্সটা শাপলার হাতে ধরিয়ে দিল।
শাপলা বক্সটা উল্টেপাল্টে দেখছে। নাম নেই, ঠিকানা নেই। শুধু একটা সাদা কাগজ আঠা দিয়ে লাগানো। এরই মাঝে লোকটা পিছন ঘুরে হাঁটা দিল।
_”এই যে শুনছেন, কে দিয়েছে এটা?” শাপলা ডাকল।
কোনো উত্তর নেই। শাপলা চোখ তুলে তাকাতেই দেখল গলিটা ফাঁকা। লোকটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে যেন।
দরজাটা চট করে বন্ধ করে শাপলা ফিরে এলো ড্রয়িংরুমে।
কলি সোজা হয়ে বসল।
_ “কে আসছিলো?”
শাপলা সোফায় বসতে বসতে বলল,
_”একটা লোক বক্স দিয়ে গেল। জানি না কে দিছে। জিজ্ঞেস করার আগেই চলে গেল।”
কলি বক্সটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। _”হয়তো সিয়াম ভাইয়া দিয়েছে। তা ছাড়া কে দেবে?”
শাপলা চমকে উঠল।
_”কি? সে তো আমাকে কিছু বলেনি।”
কলি চোখ টিপল।

_”হয়তো তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছে, তাই কিছু বলেনি।”
শাপলা বক্সটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_”চল, দুজনে মিলে বক্সটা খুলে দেখি।”
কলি সাথে সাথে হাত চেপে ধরল।
_ “ধ্যাত, না। তোর স্বামী তোকে পার্সোনাল কিছু দিতে পারে। তুই বরং পরে খুলিস।”
শাপলার কপালে ভাঁজ পড়ল।
_”আচ্ছা, কি দিতে পারে?”
কলি কাঁধ ঝাঁকাল।
_”আমি কিভাবে বলব কি দেবে? তবে এটা শিওর ভালো কিছু একটাই আছে এই বক্সে।”
একটু থেমে কলি প্রসঙ্গ পাল্টাল। গলাটা নরম করে বলল,
_”আচ্ছা শাপলা, তোর আপু নাকি অনেক সুন্দর ছিল?”
শাপলা চমকে তাকাল।

_ “তোকে কে বলছে?”
_”নীলাঞ্জনা ভাবী একদিন বলেছিল।”
শাপলার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। গলার স্বরটা দূরে চলে গেল।
_”হ্যাঁ, আমার আপু অনেক সুন্দর ছিল। ওর মতো সুন্দর মেয়ে আমি আজ পর্যন্ত দেখি নাই। ও এত পরিমাণে সুন্দর ছিল যে—”
কথাটা শেষ হলো না। আবার টিং টং। কলিং বেল বেজে উঠল।
কলি উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই নীলাঞ্জনা আর কবিতা ঢুকল। দুজনের হাতেই বড় বড় শপিং ব্যাগ। ব্যাগগুলো ছুঁড়ে ফেলে দুজনেই দুপ করে সোফায় বসে পড়ল।কবিতার চোখ আটকে গেল টেবিলের উপর রাখা বাদামি বক্সটার উপর। ভ্রু নাচিয়ে বলল,

_”এটা কি?”
কলি হাসল।
_”সিয়াম ভাইয়া শাপলাকে দিয়েছে।”
কবিতা শাপলার দিকে ঘুরে তাকাল।
_”তুই কি শিওর এটা সিয়াম তোকে দিয়েছে?”
শাপলা মাথা নাড়ল।
_”না। সে তো আমাকে কিছু বলেনি যে কিছু দেবে। এমনি আন্দাজ করছি।”
নীলাঞ্জনা বক্সটা হাতে নিল দেখতে দেখতে বলল,
_ “কে দিয়ে গেছে এটা?”
শাপলা স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
_”একটা লোক দিয়ে গেছে আমাকে। জিজ্ঞেস করার আগেই চলে গেছে।”
কবিতা বলল,

_”চল, এটা খুলে দেখি।”
এই বলেই সে নীলাঞ্জনার হাত থেকে বক্সটা টেনে নিল। শাপলা, কলি, নীলাঞ্জনা তিনজোড়া চোখ বক্সের উপর স্থির হয়ে গেল। ঘরের বাতাসটা ভারী হয়ে এলো। ঢাকনা খোলার শব্দটা যেন বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। বক্সটা খুলতেই সবাই ভয়ে আঁতকে উঠল।
কবিতা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বক্সটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। ধপাস করে শব্দ হলো। ঢাকনা ছিটকে একদিকে, বক্সটা আরেক দিকে। ভেতরে একটা কা__টা হা__ত। র__ক্ত জমে কালচে বাদামি হয়ে আছে। আ_ঙু_লগুলো অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো।
মুহূর্তের মধ্যে চারজন একসাথে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কারো মুখে কথা নেই। শুধু শ্বাস নেয়ার শব্দ, আর কলির কান্না চাপা দেয়ার চেষ্টা।
ভ_য়ে শাপলার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে ঢোক গিলতে পারছে না। পা দুটো মেঝের সাথে আটকে গেছে।
নীলাঞ্জনা কাঁপা হাতে পুলিশকে ফোন করে দ্রুত আসতে বলল। তারপর আরিফকে কল দিয়ে সব খুলে বলল যেন সবাই তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসে।

এক ঘণ্টা পর।
ঘরের বাতাসটা এখনো ভারী। সবাই সোফায় বসে আছে। সামনে পুলিশ অফিসার রকি রায়। সবার সামনে বসে আছে।
রকি রায় চোখ থেকে চশমাটা খুলে শাপলার দিকে তাকালেন। গলার স্বর গম্ভীর।
_ “তোমার কোনো শত্রু আছে?”
শাপলা কাঁপা গলায় বলল,
_ “সিরাজ… সিরাজ আমার বড় শত্রু। কিন্তু আমার মনে হয় না সে এমন কিছু করবে।”
পাশ থেকে নিরব লাফিয়ে উঠল।
_”অফিসার, আমি একদম শিওর এটা সিরাজের কাজ। ও ছাড়া আর কেউ না।”
রকি রায় মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ, তাও হতে পারে। তাকে তো আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। সে হয়তো আড়াল থেকে এসব করছে।”
একটু থেমে তিনি সিয়ামের দিকে ঘুরে তাকালেন। “আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”
সিয়াম চোয়াল শক্ত করল। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।

_”আমারও ওই সিরাজকেই সন্দেহ হয়। ও ছাড়া আর কেউ নেই যে এমনটা করবে।”
রকি রায় আবার শাপলার দিকে তাকালেন। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ।
_”ভালো করে ভেবে বলেন। অতীতের কোনো শত্রু আছে কি না?”
শাপলার শরীরটা কেঁপে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল অতীতের ঘটনা। গলা কেঁপে এলো।
_ “অতীতের শত্রু আছে… যে আমার বোনকে মে__রে, ওর শরীর টু_ক_রো টু_ক_রো করে আমাদের বাড়িতে গিফট বক্সে করে পাঠিয়ে ছিল।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কলি শাপলার হাত চেপে ধরল। নীলাঞ্জনার চোখে পানি।
রকি রায় বলল “আপনি প্রথম থেকে সব বলেন। কি হয়েছিল?”
শাপলা মাথা নিচু করল। অতীতের দরজাটা আবার খুলে গেল আর সেই দরজার ওপাশে শুধু র_ক্ত আর কা_ন্না। শাপলা অতীত বলতে লাগলো,

*****অতীত*****
সকাল হয়ে গেছে। চারদিকে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে ভরে উঠেছে চারপাশ। সূর্যের নরম আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে ঘরের ভিতর, কিন্তু শাপলা শিখা এখনও গভীর ঘুমে মগ্ন।
মৌসুমী বেগম দুই মেয়েকে খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলতে চান। কিন্তু কে শোনে কার কথা! শাপলা আর শিখা দুই বোন মায়ের কথায় পাত্তা দেয় না। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
মৌসুমী বেগম তিন চারবার এসে ডেকে গেছেন। কিন্তু দুই বোনের কোনো সাড়া নেই। শেষে রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগলেন,
“শাপলা! এই শাপলা! তোরা আর কত ঘুমোবি? তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠ! তোদের নিয়ে আমার যত জ্বালা! একদম শান্তিতে থাকতে দিস না?”
ঘুম ঘুম চোখে শাপলা বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল,
“উফ্ মা! বিরক্ত করো না তো! একদম ভালো লাগে না। একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও!”
পাশে শুয়ে থাকা শিখা আরও বিরক্ত হয়ে বলল,
“উফ্ শাপলা, মায়ের সাথে কথা বলিস না তো! একটু চুপ করে ঘুমোতে দে। তুই যা, আমি তাহলে শান্তিতে ঘুমাই।”

শাপলা জবাব দিল, “তুইই যা। আমি ঘুমাবো।”
মৌসুমী বেগম আর সহ্য করতে পারলেন না। চিৎকার করতে করতে সরাসরি মেয়েদের ঘরের সামনে চলে এলেন।
“এই! তোদের আর ঘুমাতে হবে না! এখনই উঠে পড়! নইলে দেখবি কী হয়!”
শেষমেশ বাধ্য হয়ে দুই বোন উঠে পড়ল। চোখ কচলে, মুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে এসে বসল।
মৌসুমী বেগম চোখ বড় বড় করে বললেন,
“এখন তোদের খেতে দেওয়া উচিত না। আমি ডেকে ডেকে পাগল হয়ে যাচ্ছি, আর তোরা আমার কথায় কানই দিস না!”

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫০

শিখা মুখ বেঁকিয়ে বলল, “চুপ করো তো মা। এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে ভালো লাগে নাকি?”
মৌসুমী বেগম হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন।
“তাড়াতাড়ি খেয়ে বিদায় হ। আমারও কাজ আছে।”
দুই বোন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসল। মায়ের রাগ তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই সকালের আলোয়, পাখির ডাকে আর মায়ের চেনা বকুনিতে তাদের ছোট্ট সংসারটা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here