Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৫

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৫

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৫
লামিয়া রহমান মেঘলা

রাত বারোটা বেজে গেছে।
কায়ান এবং সেরিনকে নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন বানু মির্জা। দুজনের কেউই ফোন ধরছে না, বাড়িতেও ফিরছে না। সারাদিনের মুষলধারে বৃষ্টির পর রাতের দিকে বৃষ্টি অনেকটাই থেমেছে। চারপাশে নেমে এসেছে শীতল, কাঁপন ধরানো এক নীরবতা।
নিজের কক্ষে বসে বানু মির্জা আহিকে দিয়ে দুজনকেই বারবার কল করালেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কেউই ফোন ধরল না।
মায়ের চোখেমুখে উদ্বেগের গভীর ছাপ দেখে আহি আলতো করে তাঁর হাতে হাত রাখল।
“আম্মা বেগম, এত চিন্তা করছেন কেন? ভাইয়া নেই, ভাবিও নেই। নিশ্চয়ই দুজন একসাথে কোথাও গেছে।”
বানু মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“যাক না, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু অন্তত আমাকে একটু বলে যাক কোথায় গেছে। আমার খুব চিন্তা হয়।”
আহি আর কিছু বলতে পারল না। সে জানে, মায়ের এই উদ্বেগ নিছক আবেগ নয়, গভীর মমতা।
ঠিক তখনই বানু মির্জার ফোন বেজে উঠল। তিনি দ্রুত ফোনটা হাতে নিলেন। স্ক্রিনে কায়ানের নাম্বার দেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে কল রিসিভ করলেন।
“হ্যালো, কায়ান।”
“আম্মা বেগম, বলেন।”
বানু মির্জার কণ্ঠে হালকা অভিমান মিশে গেল।
“বলেন মানে? কোথায় আছিস? সেরিন কোথায়? আমার তো খুব চিন্তা হচ্ছে।”
কায়ান যথাসম্ভব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“আম্মা বেগম, আমি একটু শহরের বাইরে আছি। ফিরতে তিন দিন সময় লাগবে।”
বানু মির্জার মুখে স্বস্তির রেখা ফুটে উঠল।
“আচ্ছা, কিন্তু আমাকে একটু জানাবি তো। আমার খুব চিন্তা হয়।”
কায়ান নরম স্বরে বলল,

“সরি, আম্মা বেগম।”
“ইটস ওকে। সেরিনের খেয়াল রাখিস।”
“হ্যাঁ।”
কল কেটে যেতেই বানু মির্জার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
মায়ের মুখের সেই হাসি দেখে আহি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে, আম্মা বেগম?”
বানু মির্জার দৃষ্টি যেন হঠাৎ বহু বছর পেছনে ফিরে গেল।
“ভাবছি, তোর বাবা বেঁচে থাকতে আমাকেও এভাবে নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যেত। কক্সবাজারে আমাদের কত স্মৃতি জমে আছে।”
আহি মিষ্টি করে হাসল।
“কায়ান ভাই সত্যিই কত পারফেক্ট, তাই না মা? দেখো, তার কাছে সব সম্পর্কেরই মূল্য আছে। আমিও চাই, আমার বেটার হাফ একদিন আমাকে এভাবেই সমুদ্রের ধারে বেড়াতে নিয়ে যাক।”
বানু মির্জা স্নেহভরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“অবশ্যই যাবে। আমার মেয়েটা যে ভীষণ লক্ষ্মী।”
আহির ঠোঁটেও ফুটে উঠল কোমল হাসি।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
বানু মির্জা এবং আহি দুজনেই একসাথে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে উর্মি। হাতে ঔষধের কৌটা।
দৃশ্যটা দেখে আহি বিস্মিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।

“উর্মি, তোমার কাছে আম্মা বেগমের ঔষধের কৌটা কেন?”
উর্মি ভেতরে এসে মৃদু হাসল।
“আম্মা বেগম আমাকে বলেছেন রোজ তাঁকে ঔষধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে।”
আহি বিস্মিত চোখে মায়ের দিকে তাকাল।
“এগুলো কি বলছে, আম্মা বেগম? উর্মি কেন? তুমি আমাকে বলতে পারতে। সেরিন ভাবি আছে, শিমুল ভাবি আছে।”
মেয়ের কণ্ঠে অস্বস্তি টের পেয়ে বানু মির্জা শান্ত স্বরে বললেন,
“আহি, শান্ত হও মা।”
আহি চুপচাপ বসে পড়ল।
উর্মি ঔষধের কৌটাটা বানু মির্জার পাশে রেখে নরম স্বরে বলল,

“দুঃখিত আপু, আমি বুঝতে পারিনি এতে সমস্যা হবে।”
উর্মির মুখে কষ্টের ছাপ দেখে বানু মির্জা মেয়েকে হালকা বকুনি দিলেন।
“আহা আহি, এমন করিস কেন? এখানে যারা কাজ করে, তারাও আমাদের পরিবারেরই অংশ।”
মায়ের সামনে আহি আর কিছু বলল না।
উর্মি ধীর পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু দরজার বাইরে পা রাখতেই তার মুখের কোমলতা মিলিয়ে গেল। চেহারার রং পাল্টে গেল মুহূর্তে। চোখেমুখে ফুটে উঠল বিষাক্ত এক কঠোরতা।
মনে মনে দাঁত চেপে সে বলল,
“একবার এই বাড়িতে পুরোপুরি প্রবেশ করতে দাও, আহি। তারপর তোমার ব্যবস্থাও আমি করে নেব।”

সোফায় বসে দ্বিতীয় নাম্বারের সিগারেটের প্যাকেটটাও শেষ করল কায়ান।
আপতত তার উপরের শরীর অনাবৃত।
সামনেই সেরিনের ক্লান্ত, অবসন্ন দেহ।
বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে সে, শরীরটা কম্বলে মোড়া।
কায়ানের চোখ দুটো অসহ্য জ্বালায় পুড়ছে।
সে সিলিংয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মনের ভেতর জমে থাকা অন্ধকার ধীরে ধীরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
“আমি জানি, যা আমি দেখছি তার সবটাই সত্যি নয়, সেরিন।
কিন্তু তুমি যদি কোনোদিন আমার বুক থেকে উড়ে গিয়ে অন্য কারও আশ্রয় খুঁজতে চাও, তবে জেনে রাখো, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার মতো দয়ালু আমি নই।
আমি জানি তুমি কিছু লুকাচ্ছ।
একবার শুধু আমাকে সবটা বের করতে দাও।
তারপর এমন শেকল পরাব, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।
এই সিকদার কায়ান মাহবুব কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা তখন বুঝবে।”
কায়ানের ভেতরের এই অন্ধকার যেন ভালোবাসার চেয়েও ভয়ংকর।
তার ভালোবাসা আর অধিকারবোধের সীমারেখা অনেক আগেই মুছে গেছে।
এখন সেখানে শুধু এক অদ্ভুত ডার্ক অবসেশন, যেখানে সেরিন তার পৃথিবীর কেন্দ্র, আবার তার ধ্বংসের কারণও।

ভাবতে ভাবতেই সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল কায়ান।
পরদিন সকালে জানালা ভেদ করে একফালি রোদ ঘরে ঢুকতেই সেরিনের ঘুম ভাঙল।
সে ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভাঙল।
শরীরের ব্যথা অনেকটাই কমে এসেছে।
কীভাবে কমল, সে জানে না।
হয়তো কায়ান রাতেই তাকে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল।
সেরিন উঠে বিছানায় বসল।
পরমুহূর্তেই তার বুক ধক করে উঠল।
নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছে তার।
সে পাশে তাকাল।
সোফায় ঘুমিয়ে আছে কায়ান।
সেরিনের চোখ মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল।
নিজের প্রতি এমন ঘৃণা তার আগে কখনো হয়নি।
বারবার মনে হচ্ছে, লোকটা কেন তাকে শেষ করে দিল না।
মেরে ফেললেও হয়তো এত কষ্ট হতো না।
এমন স্ত্রীকে কে নিজের ঘরে রাখে?
তার বুক থেকে ফুঁপিয়ে কান্না বেরিয়ে এলো।
মনে মনে বলল,

“আমি আপনাকে কিছু বলতে পারছি না, কায়ান।
আমাকে ক্ষমা করে দিন।
আমি মুখ খুললেই আমাদের পরিবারটা এলোমেলো হয়ে যাবে।
সবকিছু ভেঙে যাবে।
আমাকে ক্ষমা করে দিন।
আমার মতো স্ত্রীর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।”
সেরিন কাঁদছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে কারও উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠল সে।
কায়ান।
সে পেছন থেকে শক্ত করে সেরিনকে জড়িয়ে ধরেছে।
এমনভাবে, যেন ছেড়ে দিলে মানুষটা হারিয়ে যাবে।
দুজন অনেকক্ষণ সেভাবেই বসে রইল।
নীরব।
স্থির।
শুধু তাদের ভারী নিশ্বাসের শব্দ ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙছিল।
সেরিনের ভেতর ভয়, অপরাধবোধ আর অসহায়তা একসাথে তোলপাড় করছে।
অন্যদিকে কায়ানের আলিঙ্গনে আছে এক অদ্ভুত আঁকড়ে ধরা অন্ধকার, যেখানে ভালোবাসা আর মালিকানার সীমা আলাদা করা অসম্ভব।
কিছুক্ষণ পর কায়ান নিচু স্বরে বলল,

“যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, চলো সেখানে যাই।”
সেরিন কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায়?”
কায়ানের কণ্ঠ গভীর, স্থির।
“সমুদ্রে।”
সেরিন আর না করল না।
তার নিজের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, ভয়, সব যেন অনেক আগেই মুছে গেছে।
এখন কায়ান তাকে যেখানে নিয়ে যাবে, সে সেখানেই যাবে।
এক অসহায় আত্মসমর্পণের মতো।
অথবা হয়তো এক নীরব বন্দিত্বের মতো।

সকালের খাবারের সঙ্গে সেরিন এবং কায়ানের জন্য মেনশনে এসে পৌঁছাল অনেকগুলো নতুন পোশাক।
সাওয়ার নিয়ে সেরিন একটি ড্রেস পরে নিল। পোশাকটি গায়ে দিতেই তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন উঠল।
এটা ঠিক সেই ড্রেসের মতো, যেটা সে পরেছিল সেই সফরে, যখন সেরিন, শিমুল, জেবরান, কায়ান এবং মেহেরীন একসাথে কক্সবাজার গিয়েছিল।
এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে দাঁড়াল।
কাপড়ের স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্মৃতিগুলোও যেন জেগে উঠল।
সেরিন নিঃশব্দে পোশাকটা পরে নিল।
নিচে কায়ান খাবার নিয়ে বসে আছে।
সেরিন ধীর পায়ে গিয়ে কায়ানের পাশে বসল।
আজও কায়ানের চোখে সেই গভীরতা, সেই অদ্ভুত স্থিরতা।
যেন তার ভেতরে অনেক কথা জমে আছে, কিন্তু শব্দ হয়ে বেরোতে চাইছে না।
কায়ান নিজের হাতে সেরিনকে খাবার খাইয়ে দিল।
তার প্রতিটি স্পর্শে ছিল এক ধরনের নীরব যত্ন, অথচ সেই যত্নের গভীরে লুকিয়ে ছিল অধিকারবোধের তীব্র ছাপ।

খাবার শেষ করে সে সেরিনকে ওষুধ খাইয়ে দিল।
এরপর দুজন রওনা করল চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।
গাড়ি ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল দূরের সমুদ্রের দিকে।
সেরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
পথ যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অতীতের গভীরে।
মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা, যেদিন তারা হঠাৎ এক গ্রামে আটকে পড়েছিল।
সেই অপ্রত্যাশিত থেমে যাওয়া থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের গল্প।
প্রেমের প্রথম সূচনা।
দুজন মানুষের হৃদয়ের অদৃশ্য বন্ধন।
জীবনের কত অধ্যায়ই না পার করে এসেছে সে।
তাদের বিয়ের বয়স খুব বেশি না হলেও, এই ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই সেরিনকে সহ্য করতে হয়েছে অসংখ্য ঝড়।
ভালোবাসা কখনও তাকে আশ্রয় দিয়েছে, কখনও শ্বাসরুদ্ধ করে তুলেছে।
সব স্মৃতি যেন একসাথে সুখ আর বিষাদের রঙ মেখে ফিরে আসে।
সেরিন ধীরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের রাস্তা বরাবর গাড়ি এগিয়ে চলেছে।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, এক পাশে সবুজে মোড়া টিলা, অন্য পাশে দূরে প্রসারিত আকাশ।
পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া রাস্তা যেন প্রকৃতির বুকে আঁকা এক দীর্ঘ কবিতা।
কোথাও সারি সারি রাবার গাছ, কোথাও ঘন সবুজ বন, কোথাও ছোট ছোট গ্রাম, যেখানে সকালের আলোয় টিনের ছাদ চিকচিক করছে।
দূরে কুয়াশার আবরণে পাহাড়গুলো নরম ধূসর রঙে মিশে গেছে।
রাস্তার ধারে নাম না জানা বুনো ফুল বাতাসে দুলছে।
মাঝে মাঝে লবণাক্ত হাওয়ার আভাস এসে জানান দিচ্ছে, সমুদ্র আর খুব দূরে নেই।
কায়ান গাড়ির জানালা নামিয়ে দিল।
বাইরের দমকা হাওয়া মুহূর্তেই ভেতরে ঢুকে সেরিনের চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।
তার অবাধ্য চুল উড়ে এসে বারবার কায়ানের চোখে মুখে লাগছে।
সেরিন নিজের চুলগুলো বাঁধতে চাইতেই কায়ান বাম হাতে তার হাত চেপে ধরল।
সেরিন বিস্মিত চোখে তাকাল কায়ানের দিকে।
কায়ানের কণ্ঠ নিচু, গভীর, অথচ আশ্চর্য কোমল।

“বেঁধো না। ওভাবেই থাকুক।”
সেরিন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
তার অবাধ্য চুলগুলো বাতাসে ভেসে বারবার এসে পড়ছে কায়ানের মুখে।
কিন্তু কায়ান একবারের জন্যও বিরক্ত হলো না।
বরং সেই এলোমেলো চুলের স্পর্শ যেন তাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিচ্ছে।
যেন সে এই বিশৃঙ্খল সৌন্দর্যটুকু অনুভব করতে চায়, নিজের ভেতর জমিয়ে রাখতে চায়।
বাম হাতে এখনো সেরিনের হাত ধরা।
আঙুলের ফাঁকে আঙুল গেঁথে আছে শক্ত করে।
এমনভাবে, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই এই হাতছাড়া করতে পারবে না।
সেরিন ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আবার জানালার বাইরে তাকাল।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৪

তার চোখে চিকচিক করছে অদ্ভুত এক আবেশ।
আর কায়ান সেভাবেই ড্রাইভ করতে থাকল কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।
সমুদ্রের দিকে।
সেই জায়গায়, যেখানে একসময় তাদের গল্প শুরু হয়েছিল।
হয়তো আবারও সেখানেই লেখা হবে তাদের সম্পর্কের নতুন কোনো অধ্যায়।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here