Home তাকদীর তাকদীর পর্ব ৯

তাকদীর পর্ব ৯

তাকদীর পর্ব ৯
নিরুর কল্পনারাজ্য

—হি ইজ ম্যারিড নাও। তোর কী মনে হয়না অরিন এবার তুই বাড়াবাড়ি করছিস?
— না, না, না! তুই বেশি বুঝিস রুদ্র। জুনায়েদ এই বিয়েটা মানেনা। আরে, এক বাচ্চার ময়ের ওপর কার দরদ আসবে? যা করছি বেশ করছি!
রাগের পারদ এতোটা বেশি যে অরিন সর্বাঙ্গে যেনো ভূমিকম্পের ন্যায় কাঁপন সৃষ্টি হয়েছে। স্থির থাকার সত্ত্বেও তার হাত-পা কাঁপছে রাগবশত কারণে। রুদ্র অরিনের কব্জি টেনে ধরে তাকে নিজের সম্মুখে ফেরায়। চোখ-মুখ তার অসম্ভব রক্তিম হয়ে আছে। তীক্ষ্ণ; কটমট স্বরে সে জানতে চায়,

— তাই বলে তুই ওকে ড্রাগ দেওয়ার চিন্তা করবি?
অরিন একই স্বরে জবাব দেয়,
— আমি কেবল জুনায়েদকে পেতে চাই!
অবাক হয়না রুদ্র। পরিবর্তে রাগে ফেটে পড়া দৃষ্টে চেয়ে দাঁত পিষিয়ে শুধায়,
— তা- বলে নিজের শরীরটা বিলিয়ে দিতেও দু’বার ভাববি না? এতোটা ক্যারেক্টারলেস তুই?
কথাটা বলতে দেড়ি অথচ রুদ্রর গালে থাপ্পড় লাগতে দেড়ি হলোনা। অরিনের তুলতুলে হাতের পাঁচ আঙ্গুল রুদ্রের বাম কপোলে সজোরে আঘাত হানে। রুদ্র বা’দিকে ঝুঁকে পড়ে। হতবাক সে। অরিনের পানে চাইতেই অরিনের গম্ভীর স্বর তার কানে ভেসে আসে যে তর্জনী উঁচিয়ে তাকে শাসিয়ে যাচ্ছে,

— তোকে আমার ব্যাপারে কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে? বন্ধু, বন্ধুর মতো থাকবি। শালা, দু-চারদিন একটু পাত্তা কী দিয়ে দিলাম এখন লাইফ নিয়ে কথা বলতে এসেছে। ফারদার আমার ব্যাপারে নাক গলাবি তো তোর সাথে আমার সব শেষ। তুই কে হোস রে? আমাকে এসব বলার?
অরিন ক্যাফেটেরিয়া হতে বেরিয়ে যায়। অথচ রুদ্র সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। সে বিশ্বাস করে উঠতে পারেনা এই সে অরিন যার সাথে সে ছোটবেলা হতে বড় হয়েছে। অথচ অরিন বরাবরই এমন ছিলো। রুদ্র অরিনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রয়। যতক্ষন না অরিন বিলীন হয় ততক্ষণ অব্দি চেয়ে রয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্র। বিড়বিড়িয়ে বলে,
— পৃথিবীতে এতো এতো মেয়ে থাকতে আমি কেনো এমন একজনের প্রেমে পড়লাম যে অন্যতে মত্ত? এর খেসারত কী আমায় নিজের জীবন দিয়ে মেটাতে হবে?

জুনায়েদের সম্মুখে এমুহূর্তে ফারিশ দাঁড়িয়ে। চারপাশের আবহাওয়ার অবস্থা তখন যা-তা। বেশ জোরদার আওয়াজে ডেকে উঠছে আকাশ। টুকটাক বজ্রপাতের দেখাও মিলছে। হাওয়াও কম নয় বৈকি। আকাশ কালো করে এসেছে। কালবৈশাখী ঝড় তেড়ে আসার পূর্ব সংকেত। যার দরুণ এই মুহূর্তে প্রতিটি মানুষ নিজেদের স্থান পরিবর্তন করে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পানে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে দু’জন পুরুষ একে অপরের সম্মুখে। যারা কেও কাওকে চেনে না। জানে না। কখনো একে অপরের সাক্ষাৎ ও হয়নি। ফারিশ কোনো কাজের উদ্দেশ্যে এই হাইওয়ে হয়েই যাচ্ছিলো। মাঝপথে আমিরার আদল দেখতে পেয়ে সে নিজের কার থামায়। নিশ্চিত হতে এগিয়ে আসে আমিরার পানে। সত্যিকার অর্থেই আমিরা কিনা তা পরখ করে নেয়। হ্যাঁ! সত্যিই। সে আমিরাই। ফারিশের পিতৃসুলভ সত্ত্বা জেগে ওঠে হুট করেই। সে ডাক দেয় পেছন থেকে আমিরাকে,

— আমিরা?
আমিরা অতি চেনা-পরিচিত ডাক শুনে আনন্দে উৎফুল্লিত হয়ে ওঠে। জুনায়েদের কোলে থেকেও সে লাফিয়ে ওঠে খুশিতে। ফারিশের পানে ফিরে চায়। জুনায়েদ ভ্রু কুঁচকায়। আমিরার হঠাৎ লাফিয়ে ওঠার কারণ সে ধরতে পারেনা। তার কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমিরার ওষ্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে স্পষ্ট একটি শব্দ,
— আব্বু!
এরপর অনবরত! সে জপতেই থাকে সে একই শব্দ।
— আব্বু? আব্বুজান!
জুনায়েদ বিস্মিত হয়। ঘাড় ঘুরিয়ে চায় সম্মুখে উপস্থিত ফারিশের পানে। ফারিশ–যে বর্তমানে নিজের কোট হাতে দাঁড়িয়ে। পরণে ফর্মাল পোশাক। ওয়েস্ট কোটে পূর্ণাঙ্গ পুরুষের রূপ ধারণ করে আছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট খুশির ঝিলিক ফুঁটে উঠেছে রাতের আঁধারে জ্বলতে থাকা হাজারও নক্ষত্রমন্ডলীর ন্যায়। কতদিন পর নিজের মেয়েকে দেখতে পেলো সে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে তার। সে এগিয়ে যায়। আমিরাকে সামান্য ছোঁয়ার তাগিদে হাত বাড়ায়। জুনায়েদ সাথে সাথেই সরে যায়। একবিন্দু সময়ও সে নেয়না। আমিরা তখন ডান হাত বাড়িয়ে ফারিশের আশায় চেয়ে। তার খুশি যেনো কমছেই না। জুনায়েদ কুঞ্চিত কপালে হেলমেটের ভেতর হতেই শুধায়,

— কে আপনি?
ফারিশ জুনায়েদের পানে তাকায়। কাঠখোট্টা এক পুরুষ। বয়সে ফারিশের থেকে বড় হতে পারে। অসাধারণ বলিষ্ঠ দেহের প্রতিটি খাঁজ স্পষ্টতর। দেখতে কোনো ধনী পরিবারের পুরুষ মনে হলো। ফারিশ চট করে ভেবে ফেললো বহুকিছু জুনায়েদের ব্যাপারে। সে গম্ভীরমুখো হয়ে খানিক চেয়ে থেকে জবাব দেয়,
— আমি আমিরার আব্বু, আয়রার হাসব্যান্ড। আপনি কে? আয়রার কাজিন? আগে তো কখনো দেখিনি!
জুনায়েদের আশঙ্কা সঠিক হলো। সাথে ফারিশের এহেন জবাব যেনো ঘি তে আগুন ঢালার ন্যায় কাজ করলো। তার সর্বাঙ্গে জ্বলন ধরলো। মস্তিষ্ক টগবগিয়ে উঠলো অজানা কারণে। ফর্সা মুখশ্রী রক্তিম আভায় ছেয়ে গেলো। নীল সায়রের ন্যায় চোখদুটোতে ফুটে উঠলো আক্রোশ। কাজিন? আজ অব্দি কখনো জুনায়েদ তার বিবাহিত স্ত্রীর নাম জানতে পারেনি৷ অথচ আজ সে তার স্ত্রীর নাম জানতে পেরেছে তাও এমন এক ব্যক্তির মুখ হতে যাকে কিনা জুনায়েদ কখনো আশা করেনি৷ তার ওপর জুনায়েদ কিনা সেই মেয়ের কাজিন হয়? এটা কী কোনো কৌতুক ছিলো? সে আয়রা নামক লাফজটি নিজমনে একবার উচ্চারণ করলো ধীরে ধীরে সময় নিয়ে, ভেঙে ভেঙে,

— আয়…রা!
জুনায়েদ একপলক তাকালো ফারিশের পানে। তার সাথে কথা বলার কোনো রুচি সে নিজের মাঝে দেখালো না। সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে আমিরাকে নিয়ে সে চলে যেতে চায়লো। আমিরা তার পথ রোধ করলো। বাচ্চা বাচ্চা মিহি কন্ঠে বলে উঠলো,
— আঙ্তেল, আব্বু। আব্বুজানের তাছে যাবো তো।
ফারিশ নিজেও ডাকলো স্বর উঁচিয়ে,
— এইযে মিস্টার! আমার মেয়েকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?
জুনায়েদ থমকায়। পিছু ফিরে তাকায়। ফারিশ এগিয়ে আসে দ্রুত পায়ে। আমিরার পানে হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের কাছে নিতে চেয়ে হাত বাড়ায় পুনরায়। বলে,
— আমিরাকে দিন, একটু ছুঁয়ে দেখি মেয়েটাকে।
ফারিশের চোখে স্পষ্ট আকুলতা। তবে এই দৃষ্টি জুনায়েদের মন এক মুহূর্তের জন্যেও গলাতে পারলোনা। তার কঠোর হৃদয়ে একফোঁটাও শীতল আভা পাওয়া গেলোনা। সে স্থির চোখে চেয়ে প্রশ্ন করলো গম্ভীর স্বরে,
— কে আপনি?

ফারিশ বিরক্ত হয়। বিরক্তির সুর কেটে পাল্টা জবাবে ভ্রু কুঁচকে বলে,
— আরে ভাই, বললাম-ই তো আমি আমিরার আব্বু আর আয়রার হাসব্যা.…….
বাকিটুকু সম্পূর্ণ করার পূর্বেই জুনায়েদের পক্ষ হতে তার হুশিয়ারি কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
— মাইন্ড ইয়্যুর ল্যাঙ্গুয়েজ, ম্যান। আমার ওয়াইফের নাম আমি অন্যকোনো পুরুষের মুখ হতে শুনতে একদমই ইচ্ছুক নই।
অবাক হয় ফারিশ। ওয়াইফ? কে কার ওয়াইফ? সে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে রইলো। অতিরিক্ত বিস্ময়তা নিয়েই বোধহয় শুধালো,
— ওয়াইফ?
জুনায়েদ তিক্ত-বিরক্ত হলো। বিরক্তি নিয়ে ঝাড়ি মেরে প্রত্যুত্তরে বললো,
— হ্যাঁ, ওয়াইফ।
— না! মিথ্যে বলছেন আপনি। কীভাবে সম্ভব এটা। আমাদের ডিভোর্সের একসপ্তাহ ও পেরোয়নি। আমি কীভাবে জানলাম না..
জুনায়েদ প্রচন্ড হতাশ হয় ফারিশের এমন বোকা বোকা কথায়। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার ভেতর হতে। আয়রা নামক রমণীটি এমন একটা লোকের সাথে কীভাবে সংসার করতো? অবশ্য তার মা আয়রা সম্পর্কে এসব বলতে চেয়েছিলো। জুনায়েদ আগ্রহ দেখায়নি বিধায় সে কিছু জানেনা। তবু একবার রুহানি সৈয়দ বলেছিলেন মেয়েটার স্বামী তাকে চিট করেছিলো। একারণেই তিনি চান জুনায়েদ যেনো সেই মেয়েকে বিয়ে করে। সেই ঘটনাপ্রবাহ মনে করেই সে এবার মুখ খোলে। বাম ভ্রু’টা সামান্য উঁচিয়ে জবাব দেয়,

— তো কী করবে? তোর মতো বাস্টার্ডের জন্য বসে থাকবে?
ফারিশের মাথায় ধপ করেই আগুন জ্বলে ওঠে,
— সাহস কীভাবে হয় আমার সাথে তুইতোকারি করার?
জুনায়েদ আমিরার পানে চেয়ে দেখে একবার। মেয়েটা বাবার কাছে যাওয়ার জন্য হাসফাস করছে। জুনায়েদ চোখ ঘুরিয়ে ফারিশের ওপর রাখে।
— সাহস? সাহসের এখনও দেখলি কী? যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার–নামতো শুনেছিস-ই। ফারদার আমার বউ আর মেয়ের দিকে চোখ দিলে গলা কেটে পদ্মায় ভাসাবো!
ফারিশ আরেক দফা চমকায়। জুনায়েদ শাহরিয়ার? হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার সে এই নাম শুনেছে। খবরের কাগজে তো প্রায় এর নাম থাকেই। কখনো কারও সাথে মারামারি তো কখনো এদিক-ওদিকে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়ানো। এসব তার সম্পর্কে আর নতুন কী? নতুন মেয়েদের সাথে তো তাকে অহরহ দেখা যায়। এমন একজন কী করে আয়রাকে বিয়ে করতে পারে? পারেইনা। অসম্ভব! আয়রাও কখনো এমন পুরুষকে বিয়ে করতে পারেনা। ফারিশ সেই চমকের সহিত-ই বলে ওঠে,
— অসম্ভব। একজন বখাটে; বেপরোয়া আর উন্মাদ পুরুষের সাথে কখনো আয়রা বিয়ে করতে পারেনা!
জুনায়েদের বুঝে আসেনা এমন বলদ কোথায় পাওয়া যায়? যেখানে এই পুরুষ নিজে তার স্ত্রীকে ঠকিয়েছে সেখানে কী করে সে আশায় আছে যে তার স্ত্রী এখনও তার আশায় বসে থাকবে! তার মেজাজ সপ্তমে উঠে যায়। কেনো যেনো সে মেনে নিতে পারেনা ব্যাপারটা। এটার কারণ সে নিজেও জানেনা। মস্তিষ্ক যেনো আপনাআপনিই চলছে। বরফের ন্যায় শীতল স্বটে সে তাকে সাবধান করলো,

— I dare you to speak her name twice!
ফারিশ তেঁতে ওঠে,
— সমস্যা টা কী আপনার? দিন আমার মেয়েকে। ওর যদি আপনার সাথে বিয়ে হয়েও থাকে তাহলেও আমিরা কিন্তু আমার বায়োলজিকাল মেয়ে। ওর ওপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
জুনায়েদ তপ্ত স্বরে তার জবাব করে,
— অধিকার মাই ফুট! ফাক অফ। আদারওয়াইজ এই জায়গা থেকে তুই আর নড়ার চান্সটাও পাবিনা।
ফারিশ অপলক চেয়ে থাকে তার পানে। জুনায়েদ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ায়না। বড় বড় পদক্ষেপে সে বাইকের কাছে যায়। ফারিশ এবার তাকে পিছু ডাকার সাহস পায়না। বাংলাদেশে শাহরিয়ার পরিবার বিজন্যাসে টপ থ্রি সারির মাঝে। সে চেয়ে রয় মেয়ের পানে। তার অনুশোচনা জতে আরম্ভ করে। তার মেয়েকে, নিজের সন্তানকে ছুঁতে না পারার আফসোস। সাথে বক্ষপিঞ্জরে কেমন ধড়ফড়ানিও অনুভব করে। আয়রার কী সত্যিই বিয়ে হয়ে গেলো?
অপরদিকে আমিরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আদো আদো বুলিতে বলছে,
— আমি আব্বু তাচে যাবো!
জুনায়েদ ইতোমধ্যেই অসম্ভব রেগে আছে। আমিরার কান্নায় তার রাগের পারদ বাড়ে বৈ কমেনা। সে নিজেকে যথেসঁট ধাতস্থ করে। শান্ত রাখার চেষ্টা করে জবাব দেয়,

— আঙকেল আছিনা? আব্বুকে কেনো প্রয়োজন প্রিন্সেস? তোমার বাবা তোমাকে যা যা দিতে পারে আমি তার দ্বিগুণ দিতে পারবো।
আমিরা তবু ক্ষান্ত হয়না। সে ক্রন্দনরত অবস্থাতে বাবার কাছে যাওয়ার জন্য জেদ ধরে থাকে। ফারিশ অসহায় হয়ে চেয়ে থাকে মেয়ের ক্রন্দনরত ছোট আদলের পানে।চোখদুটোতে তার হাহাকার এবং অসহায়ত্ব। জুনায়েদ নির্দয়তায় তাকে নিয়ে বাইকে উঠে পড়ে। একবারও আমিরাকে তার জন্মদাতার সংস্পর্শে আসার সুযোগটুকুও দিলোনা। না-তো আমিরার কান্নাতে সে গলে গেলো। সে কেবল থ্রোটল চেপে যথাসম্ভব দ্রুত শাহরিয়ার কুঞ্জে পৌঁছালো। আমিরা তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো। আর জুনায়েদের মস্তিষ্ক ছিলো আগ্নেয়গিরির লাভার ন্যায় উত্তপ্ত যেখানে এই মুহূর্তে যে কারও ধ্বংস অনিবার্য। জুনায়েদ বাইক থামিয়ে বড্ড আদুরেভাবে আমিরাকে কোলে তুলে নিলো। আমিরা চোখ কচলে কচলে চোখদুটো সম্পূর্ণ লাল করে ফেলেছে। জুনায়েদ হেলমেট না খুলে কেবল ওপরের গ্লাসখানা তুলেই এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। তার কপালখানাতে ভাঁজ পড়েছে দু’তিনটে। সে যে ভীষণ বিরক্ত তা তাকে দেখামাত্রই যে কেও ধারণা করে নিতে পারবে। তার মনস্পটে কেবল কিছুমুহূর্ত পূর্বের ঘটে যাওয়ার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির বিচরণ ঘটছে। জুনায়েদ ড্রইং রুমে যেতেই সেখানে আয়রা এবং রুহানি সৈয়দকে সোফায় বসে থাকতে দেখতে পেলো। আয়রা সোফায় মাথা নিচু করে কপালে দু’হাত ঠেকিয়ে বসে আছে আর রুহানি সৈয়দ সমানে তার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। আয়রার মাথায় সফেদ ওড়না। জুনায়েদ তাদের পানে একপলক তাকালো। চেহারাতে সেই আগের মতো জৌলুস নেই যা বেরোনোর সময় ছিলো। আমিরা আম্মুকে দেখে ডুকরে উঠলো। ফলস্বরূপ আয়রা অনুধাবন করতে পারলো আমিরার আগমন। কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাটার চোখ-মুখ ফুলে উঠেছে। আমিরাকে দেখেই যেনো আয়রার অধরা মনে প্রাণ ফিরেছে। সে অতি দ্রুত উঠে গিয়ে জুনায়েদের কোল হতে আমিরাকে টেন নিলো নিজের কাছে। নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো সন্তপর্ণে। মায়ের বুক পেয়ে আমিরা যেনো আরও জোরেই কেঁদে ফেললো। আমিরা কাপন্ত স্বরে, দুরুদুরু বুকে উদ্বীগ্ন হয়ে শুধালো আমিরাকে,

— আম্মু, আম্মুজান, ও আম্মু, কী হয়েছে আমার পরাণের? কাঁদছেন কেনো এভাবে?
আমিরার তরফ হতে কোনো জবাব আসেনা। ফলস্বরূপ আয়রা আরও খানিকটা চিন্তিত হয়। উদ্বেগভরা কন্ঠে জুনায়েদের পানে তাকিয়ে চিন্তিত আদলে কঠোর স্বরে শুধায়,
— কী হয়েছে? ও এভাবে কাঁদছে কেনো?
জুনায়েদ পরোয়া করলোনা আয়রার এ’প্রশ্নের। সে ধীরে ধীরে হেলমেট খুলে হাতের মাধ্যমে কোমড়ে ঠেস দিয়ে রাখলো। অতঃপর চিরচারিত গাম্ভীর্যতা এবং অনুভূতিহীন চোখে চেয়ে রইলো আয়রার পানে। সে চোখে আপাতত ভীষণ বিরক্তির আভাস। আয়রা ভুল বুঝলো। তার মনে হলো— নিশ্চয় জুনায়েদ কিছু করেছে তার মেয়ের সাথে। কাঁদিয়েছে ওকে। হয়তো প্রতিশোধ নেওয়া জন্য। তাকে বিয়ে করার শাস্তিস্বরূপ সে এমনটা করেছে। ভয় দেখিয়েছে তার মেয়েকে। তার মস্তিষ্ক ধপ করে জ্বলে উঠলো। শান্ত রূপ তার অকস্মাৎ রুদ্রমূর্তি ধারণ করলো। জুনায়েদের পানে তাকিয়ে সৈয়দ রুহানি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন ছেলে তার এই মুহূর্তে প্রচন্ড খারাপ মুডে আছে। মেজাজ খারাপ বোধহয়। তিনি জল আর গড়াতে চায়লেন না। হিতে বিপরীত ও হতে পারে। জুনায়েদ যা বেয়াদব ছেলে। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করলেন। এগিয়ে যেতে উদ্যত হতেই তার কানে ভেসে এলো এক শব্দ,
—-ঠাস!

তিনি বাকরূদ্ধ হলেন। বাকরূদ্ধ হলো জুনায়েদ ও। আয়রা চেঁচিয়ে বলছে,
— আমার ওপর ক্ষোভ আছে তো আমাকেই নাহয় বলতেন, আমার মেয়েকে এভাবে নিয়ে গিয়ে কাঁদানোর কী মানে? আমার মেয়ের থেকে আপনি দূরেই থাকবেন।

তাকদীর পর্ব ৮

রূহানি সৈয়দ ছেলের পানে তাকালেন। বিস্ময়ে তার চোয়াল ঝুলে পড়েছে। জুনায়েদ হতবাক লোচনে চেয়ে মেঝের পানে। বা’গালে চর মারার দরুণ তা সামান্য হেলেছে। জুনায়েদ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। গালের ভেতরে জিহ্ব ঠেলে চোখ বুজে নিলো। নিজেকে সামলানোর বহু প্রচেষ্টা চালালো সে। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। সে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলো নিজেকে। ফলস্বরূপ নীল মণির সাদাটে অংশ লাল হয়ে গেলো। রুহানি সৈয়দ ভীত হলেন। যা ভয় পাচ্ছিল তা-ই হয়েছে। এবার? এবার কী হবে?

তাকদীর পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here