আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
শেখ বাড়ির পরিস্থিতি এখন গুমোট। আত্মীয়দের মাঝে আজকের বিয়ের ঘটনাটা যতখানি না বাজ ফেলেছে, তার কেবল সামান্য পরিমাণ শেখ বাড়ির মানুষগুলোর মাঝে। মাহতাব শেখ সবাইকে চমকে দিয়ে স্বভাবজাত নীরবই৷ রাতের খাবার ন’টার মাঝে খেয়ে তিনি ঘরে চলে গেছেন বিশ্রাম নিতে৷ বাড়ির বাকি সদস্যরা খেলো কি খেলো না কিংবা তাদের মানসিক হাল কী তা নিয়ে মাথাব্যথা তো নেই-ই৷ উপরন্তু তাওসিফ ফ্লাইটে বসে, নাওফিল বিয়ে করে লাপাত্তা, এসব শুনেও তার মাঝে কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি৷ আর এ কারণেই বাড়ির সদস্যগুলো নাওফিল দীধিতির বিয়ে নিয়ে রাগারাগি করার বদলে মাহতাব শেখকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
ঝুমুর একটু সুস্থ হওয়ার পর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াননি ও বাড়িতে৷ খুব লজ্জাবোধ, অস্বস্তিবোধ করছিলেন তিনি। সুহাইল সারা সময় তার খোঁজ নিলেও বিকাল থেকে ব্যস্ত ছিলেন বলে বর অদল বদলের ঘটনাটা জানতে দেরি হয়ে যায় তার। ঝুমুরের মন আর শরীরের অবস্থা জানতে পেরে তিনিই তাকে নিয়ে চলে যান সৌরভের বাসায়৷ অথচ এমনভাবে বিয়েটা হওয়ার পর দীধিতির মনের হালটাও কতটা বিষণ্ন থাকতে পারে, সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবলেন না ঝুমুর। কিরণ থাকতে চাইলে ওকেও রেখে যাননি। আজ আরও একবার তাই দীধিতি নিজের মায়ের অভাববোধ করল খুব।
ঝুমুরসহ শেখ বাড়িতে সকলে জানে, বিয়েটা হওয়ার পেছনে দায়ী কেবল নাওফিলই। কারণ, সে অনেক আগে থেকে দীধিতিকে পছন্দ করত। তাই তা জানার পর বড়ো ভাই হয়ে তাওসিফ এ বিয়ে করতে পারেনি। কাউকে জবাবদিহিও করতে পারবে না বলে আপাতত দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সে। দীধিতিও একরকম সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়েই বিয়েটা করেছে৷ নাওফিল ঘটনাটা এভাবেই সাজিয়ে জানাতে বলেছে ইয়াসিফকে। ইয়াসিফ তার চেয়েও সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে কথাগুলো উপস্থাপন করলে জাকির শেখ তখন একটা কথায় বলেন, ‘ওকে আর ওর বউকে বাংলোতে গিয়ে থাকতে বলিস। বাংলোটা ওর নিজের বাপ মায়ের কেনা তো। ওখানেই যেন সংসার পাতে। কিন্তু এ বাড়িতে যেন প্রবেশ করার দুঃসাহসও না দেখায়।’
-‘এ বাড়ির অংশীদারও তো ওর বাপ, কাকু!’ কথাটা ইয়াসিফের গলার মধ্যেই আটকে থাকে অবশ্য।
এরপর আর এ নিয়ে একটা অক্ষরও আলোচনা হয়নি শেখ বাড়িতে৷ ইয়াসিফ তামান্না, ঐশী, তন্বীকে আজ থেকে যেতে বলেছে। তারা দীধিতির সাথেই রয়েছে৷ তারপর দীধিতিকে রাত দশটার সময় নিয়ে আসে ওরা বাংলো বাড়িটিতে।
ফ্লোর জুড়ে গোলাপের পাপড়ি আর ক্যান্ডেলে সাজিয়ে রাখা বাসর ঘরটাই দীধিতিকে পৌঁছে দেওয়ার পরপরই রাতুল এসে বড়ো একটা লাগেজ রেখে যায় ঘরে৷ দীধিতিকে বলে, ‘ভাবিজান, এই লাগেজের ভেতর আপনার প্রয়োজনীয় সব কিছুসহ আমাদের বন্ধুদের পক্ষ থেকে ছোট্ট একটা উপহারও আছে৷ নাওফিল এলে ওকে প্লিজ ওটা দিয়ে দিয়েন আমাদের পক্ষ থেকে।’
জবাবে বিষণ্ন মুখটাই এক চিলতে হাসি ফোটাতে হয় দীধিতিকে। রাতুল বেরিয়ে গেলেই ঘরে আসে ঐশী৷ হাতে খাবারের ট্রে ওর। সেটা টেবিলে রেখে দীধিতিকে বলে, ‘ঘরে মিনি ফ্রিজ আছে যদিও৷ তাও গরম খাবারটা রেখে গেলাম। নাওফিল ভাইকে নিয়ে খেয়ে নিস। আর তোর তো মাথা ধরেছে। ইয়াসিফ ভাইয়া তাই মাথা ব্যথার ওষুধও দিয়ে দিয়েছেন এখানেই৷ খাওয়ার পর খেয়ে দিস৷’
ট্রে তে রাখা একটা জগভর্তি কোনো পানীয় বিশেষ। কিন্তু সেটা কীসের পানীয়? তা জিজ্ঞেস করল দীধিতি, ‘জগে ওটা কীসের শরবত?’
-‘আখের বোধ হয়। রুমানরা সবাই দেখলাম বোতল নিয়ে বসেছে। আমাদেরকেও ছোটো একটা বোতল দিয়ে খেতে বলল আর তোদের জন্য এক জগ পাঠিয়ে দিলো। তন্বী আর তামান্না বোধ হয় খেতেও আরম্ভ করেছে। তুই কী করবি? এখনই ফ্রেশ হবি? না অপেক্ষা করবি ভাইয়ার জন্য? ভাইয়া তো নাকি ব্যাঙ্কে গেছে টাকা তুলতে, আজই তোর দেনমোহর পরিশোধ করবে হয়ত।’
ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে বিছানাতে বসল দীধিতি। কথাটা সুন্দর শোনালেও এই মুহূর্তে সব কিছুর বিপরীতেই খুব চিন্তা কাজ করছে ওর, আগামী পরিস্থিতিগুলোর জন্য।
নিকাবটা খুলতে খুলতে বলল, ‘আমার বিয়ের পোশাক খুলেটুলে এক্ষুনি গোসল নিতে মন চাইছে।’
ঐশী একটু হেসে দুষ্টু গলায় বলল, ‘আহা খুলিস না এখন। আরেকটু কষ্ট করে থাক, ভাই৷ নাওফিল শেখ এসে নিজেই নিকাবটা খুলে দেখুক তোকে।’
কথাটা মনে ধরল দীধিতির। ঠোঁট চেপে হেসে নিকাবটা আবার বেঁধে নিলো। ঐশী লাগেজটা দেখে বলল তখন, ‘এই লাগেজে আমাদের চারজনের পক্ষ থেকে স্পেশালি তোর জন্য একটা গিফ্ট রেখেছি। ভাইয়া এলে খুলে দেখিস আর অবশ্যই ইউজ করিস।’
-‘চারজন বলতে কি অনুপমাও?’
-‘হ্যাঁ, ওরও না আজ থাকার ইচ্ছে ছিল খুব। কিন্তু ফ্যামিলি থেকে পারমিশন পেল না।’
-‘গিফ্ট তো একবার দিলিই। আবার কেন?’
ঐশী এক চোখ মেরে বলে, ‘ওই যে বললাম এটা স্পেশাল!’
-‘তাহলেই হয়েছে! তোদের স্পেশাল গিফ্টের ধারণা করা শেষ আমার।’
-‘ওটা সত্যিই স্পেশাল, দোস্ত। আন্ডারেস্টিমেট করিস না প্লিজ। ওকে রেস্ট কর, আমি আসি।’
-‘আমার ফোনটা কোথায় রে? দিয়ে যা না!’
একটু মনে করে ঐশী জানাল, ‘তামান্নার কাছে বোধ হয়। আচ্ছা, আমি নিয়ে আসছি।’
দরজাটা আটকে ঐশী বেরিয়ে যেতেই দীধিতি বিশাল ঘরটার চারপাশে চোখ বুলাল। এ ঘরের মতো এ ঘরের জানালাটাও বিশাল। বিছানার ডান পাশে থাই গ্লাস দেওয়া জানালার পাল্লাদুটো খুলে দিলে জানালার কার্নিশ নির্বিঘ্নে এক মগ কফি হাতে নিয়ে বসে সুবিশাল আকাশ পানে চেয়ে মন ভালো করা যাবে। সারা ঘরে আসবাবগুলোও কেমন বিশাল বিশাল৷ উত্তর কোণের অ্যাকসেন্ট দেওয়ালের অর্ধেক জুড়েই কাঠের ওয়াল কেবিনেট। কেবিনেটের দু’দিকের পাল্লায় লম্বা দুটো করে আয়না। পূর্ব দিকে দেওয়াল লাগোয়া বেশ বড়ো বইয়ের তাক, তার পাশেই মাঝারি একটা টেবিল আর চেয়ার। বিছানার বাঁ দিকে একটি সিঙ্গেল সোফা। সোফা থেকে কিঞ্চিৎ দূরেই ফ্লোর ল্যাপ, ল্যাম্পের পাশেই সাদা টবে ফিকাস গাছ।
ঘরটা বেশিই জাঁকজমক লাগছে দীধিতির কাছে বড়ো বড়ো আসবাবগুলোর জন্য৷ যে ব্যক্তি ঘরটা গুছিয়েছে তার ঘর সাজানোর ধারণা খুব একটা উন্নত না বলেই মনে হচ্ছে। শোবার ঘর হলো শান্তির জায়গা। সেখানে ছিমছাম জিনিসই পছন্দ ওর৷ বইয়ের তাকগুলো, পড়ার টেবিল চেয়ার এই শোবার ঘরে সেট না করে আলাদা কোনো ঘরেও তো করা যেত। তারপর অত বড়ো ক্যাবিনেট না হয়ে ওয়্যারড্রোব আর একটা ড্রেসিং টেবিল থাকলেই বেশি ভালো হত। ক্যাবিনেটের পাশে থাকা ছোট্ট ফ্রিজটা আরও বেশি বেমানান। তবে ভালো লাগার মধ্যে বিছানার শিথানের দেওয়ালটার আর্টওয়ার্ক খুব সুন্দর লাগল ওর। ধূসর সাদা, মেঘলা রঙা আকাশের একটা ছবি মনে হচ্ছে যেন ওখানটা জুড়ে। সেই সাথে এল ই ডি স্ট্রিং লাইটগুলো ঝুলছে ওখানে। আবার ফলস সিলিঙে নীলচে কতগুলো আলো। ফ্লোরের নন-স্লিপ কার্পেট আর এই দুটো জিনিসই বেশি আরামদায়ক অনুভব হচ্ছে ওর। সামান্য গোলাপের পাপড়ি আর ক্যান্ডেলের পরিবর্তে অঢেল ফুলে সাজানো বাসরঘর দেখলে আরও বেশিই অস্বস্তি লাগত মনে হচ্ছে। যেটুকু সাজিয়েছে তাতেই যে লজ্জা আর অস্বস্তি ঘিরে ধরেছে ওর। ভালোবাসলেও তা তো আজ অবধি নাওফিলের কাছে সে প্রকাশ করা হয়নি৷ উলটে সেদিন নাওফিল ওকে নিজের অনুভূতির কথা জানালে তাকে সে প্রত্যাখ্যান করল৷ একটু পর সেই মানুষটির মুখোমুখি কীভাবে দাঁড়াবে সে চিন্তাটায় পুরো মস্তিষ্ক দখল করে রেখেছে।
ভারী শাড়ি, গহনা নিয়ে সেই দুপুর থেকে রাত প্রায় সাড়ে দশটা অবধি সে। আরও কতক্ষণ এভাবে থাকতে হবে কে জানে! মাথাটাও যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে যেন! ইচ্ছে করছে ঘরের সকল আলো নিভিয়ে শুধু সিলিঙের ওই নীলচে আলোগুলো জ্বেলে দিয়ে আর জানালার পাল্লাদুটো খুলে এক্ষুনি বিছানাতে গড়িয়ে পড়তে।
টেবিলে রাখা শরবতের জগটাই হঠাৎ নজর গেলে দীধিতির মনে হলো ওর অনেকক্ষণ আগে পানি তৃষ্ণা পেয়েছিল৷ কিন্তু টেনশনে টেনশনে তা ভুলে গেছে৷ নাওফিল আসা অবধি আর দেরি করা গেল না এবার। জগ থেকে এক গ্লাস ঢেলে নিয়ে এক চুমুক মুখে দিতেই টের পেল এটা মোটেও আখের রস নয়। একদম অজানা ভিন্ন কিছু! যেটা এর আগে জীবনেও মুখে দেয়নি সে৷ তাই বলে স্বাদটা মন্দ নয়৷ দারুণ কিছু! একটু সময় নিয়ে পুরো গ্লাসটা খালি করার পর দ্বিতীয় গ্লাস নেওয়ার আগ্রহবোধ করতেই দরজা খোলার আওয়াজ পেল৷ নাওফিল এসে পড়েছে। ঝট করেই তখন পিছু ফিরে দাঁড়িয়ে পড়ল দীধিতি৷ তা দেখে নাওফিল দরজাটা আটকে স্বাভাবিক পায়েই হেঁটে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। সালাম দিলো ওকে মিহি গলায়। দৃষ্টি ঝুঁকিয়েই দীধিতি সালামের জবাব দিলো। তারপর বিনা সঙ্কোচে নাওফিল ওর কপালে হাত রেখে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া জ্ঞাপন করল আর উভয়ের জন্য বরকতের দোয়া পাঠ করল।
এ সম্পর্কে দীধিতি অজ্ঞ৷ ওর কপালে হাত রেখে নাওফিল বিড়বিড় করে কী বলল তা জানতে বিস্ময় নিয়ে নাওফিলের দিকে তাকালে নাওফিল নিঃশব্দে ওর নিকাবটা ধৈর্যের সাথে খুলে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় দীধিতি আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। দেখে ওর আকাশ নীল চোখজোড়ায় নাওফিল অনিমেষ চেয়ে আছে৷ অপ্রতিভ দীধিতি তখন দৃষ্টি সরিয়ে নিতে গেলেই শুধায় নাওফিল, ‘কেন নীল চোখেই মানাচ্ছে তোমাকে?’
দুরুদুরু বুক নিয়ে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল দীধিতি। বেশিক্ষণ নাওফিলকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ দিলে সে ঠিক বুঝে যাবে ওর চোখের রহস্য। হেঁটে বিছানার কাছে চলে এলো। হঠাৎই মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল ওর। নাওফিলকে বলল, ‘আমার এক্ষুনি গোসল নিতে হবে। শরীর খারাপ লাগছে।’
কথাটা শোনার বর নাওফিল আবারও ওর কাছে এসে দাঁড়াল। দীধিতির দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে ওঠে আবার। কয়েক পল মৌন নাওফিল ওর এলোমেলো ছুটে চলা দৃষ্টিজোড়া দেখে সামনে থেকে সরে দাঁড়ালে ও দ্রুত পায়ে লাগেজের কাছে এসে বসে। লাগেজটা খোলার পর স্বভাবজাত কপাল কুঁচকে যায়, ‘কয়েকটা গিফ্ট বক্স ছাড়া এখানে তো কোনো জামাকাপড়ই নেই!’ বলেই পেছন ফিরে নাওফিলের দিকে চায় আবার৷
হাতের ব্যাগটা বিছানাতে রেখে নাওফিল বলল, ‘ওই বক্সগুলোতে থাকতে পারে৷ খুলে দেখো।’
-‘এগুলো তো গিফ্ট আমাদের বন্ধুদের তরফ থেকে। রাতুল ভাই যে বলল এখানে প্রয়োজনীয় সব কিছু আছে আমার?’
-‘তাই? তাহলে অবশ্যই আছে। লাগেজটা নিয়ে এসো, দেখি কী কী গিফ্ট দিলো।’
দীধিতি ওটা নিয়ে এগিয়ে এলো নাওফিলের কাছে, ‘আমার এখনই গোসল করাটা খুব দরকার যে!’
শরীরটা নেতিয়ে পড়তে চাইছে দীধিতির৷ চোখ ভেঙে ঘুম আসছে একদিকে, অন্যদিকে অসহ্য মাথা ব্যথা৷ কিন্তু তা খোলাখুলি বলতে দ্বিধা হচ্ছে নাওফিলকে। নাওফিলও কেমন যেন শুধু বারবার ওর চোখের দিকেই দেখছে৷ আর সেটা লক্ষ করেই তাড়াতাড়ি গোসলের বাহানায় বাথরুমে ঢুকে পড়তে চাইছে দীধিতি। নাওফিল ঘরে আসার কিছুক্ষণ আগেও ওর সৎ মনোবাসনা ছিল নিজের লুকানো সত্য আজ রাতেই প্রকাশ করবে সে নাওফিলের কাছে। কিন্তু এই মুহূর্তে নাওফিলের একবার ভাব গম্ভীরতা, আবার অতি স্বাভাবিকতা ওকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে সত্যটা জানার পর নাওফিল ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাবে কি না এই ভেবেই। ধোঁকা, ছলনা কম তো করা হয়নি সাড়ে বছর ধরে!
তবুও এত কিছুর পরও দুজনের এক হওয়া রুখে যায়নি। বিয়ের প্রথম রাতটা তাই আজ নিজেদের মাঝে ঝামেলা সৃষ্টি হতে পারে বা ফের দূরে সরে যেতে হতে পারে, এমন কিছুই করতে চায় না দীধিতি। ধীরে ধীরেই নিজের অপ্রকাশিত সকল কিছু প্রকাশ করবে নাওফিলকে।
লাগেজ থেকে একে একে সব উপহারের বাক্সগুলো বিছানার ওপর রাখল নাওফিল৷ দীধিতিকে ইশারায় নিজের পাশে বসতে বলে একটা বাক্স খুলতে খুলতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘বিয়ের দিন লেন্স ব্যবহারের শখ ছিল তোমার?’
-‘কই? না তো! আমার একদম সাদামাটা সাজে বউ সাজবার শখ ছিল। সেভাবেই তো সেজেছি।’ চোখদু’টো ডলতে ডলতে বেখেয়ালে সরল জবাবটা দিলো সে।
নাওফিল তা শুনে ওর মুখের দিকে একবার তাকাল, তারপর আবার বাক্সের র্যাপিং কাগজটা খোলায় মনোযোগ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ভুলে গেছ চোখে লেন্স পরেছ?’
তাড়াতাড়ি চোখ তুলল দীধিতি। সত্যিই কয়েক সেকেন্ডের মাঝে ভুলে গিয়েছিল আজ সে কোনো নকল বেশে নেই। নাওফিল তার চোখের স্বরূপটাই দেখছে। ও কি বলে দেবে এখনই সত্যিটা? কিন্তু এখন যে ওর একটুও এসব নিয়ে কথা বলতে মন চাইছে না। এমনকি কোনো কথা বলতেই মন চাইছে না ওর। শরীরটা ভারসাম্য হারাচ্ছে কেমন যেন! নাওফিলকে তা বলতে যাবে আর তখনই নাওফিল ওর সামনে একটা প্যাকেট বের করল। প্যাকেটটার ওপরে তামান্নাদের নাম লেখাসহ একটা চিরকুট। নাওফিল সেটা পড়ল–
“আমাদের প্রিয় বান্ধবী,
আজকের মধুর রাতটা আরও মধুময় করার জন্য আর আরামদায়ক ঘুমের জন্য আমাদের চারজনের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড দামী এই উপহারটা তোকে দিলাম। মূল্য দিয়ে বিচার করবি না উপহারটা। ভালোবাসা দিয়ে করবি। আমাদের দেওয়া এই দামী উপহারটাকে কিন্তু একদম হেলায় ফেলে রাখিস না আজ।”
দীধিতির শ্রান্ত মুখটার দিকে কপট বিস্ময় নিয়ে তাকাল নাওফিল, ‘বাবাহ্! প্রচণ্ড দামী উপহার দিয়েছে তোমার ফ্রেন্ডস। আরামদায়ক ঘুমের জন্য এটা। কী হতে পারে? খুলে দেখি না কি?’
ঝিমুনি কেটে গেছে দীধিতির৷ চিরকুটের কথাগুলো শোনার পর ওর ধারণা একটুও ভুল হবে না বলে মনে হচ্ছে৷ শেষমেশ লজ্জায় না পড়তে হয়। কাঁচুমাচু মুখ করে প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে থাকল। নাওফিল বেশ কৌতূহল নিয়ে প্যাকেটের ভেতর থেকে কালো রঙা সাটিন কাপড়ের একটা নাইটড্রেস বের করল৷ উপরে গাউন আর নিচে নাইটি। দীধিতির আন্দাজ সত্যিই সঠিক হওয়াতে সে মুখ খিঁচিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল লজ্জায়। নাওফিল নিচে পরার নাইটিটা আলাদাভাবে হাতে নিয়ে একবার সেটা দেখে, আরেকবার দীধিতিকে৷ তার পছন্দ হয়েছে বেশ। তবে মুখের ভাবটা খানিক গম্ভীর করে বলল, ‘তাহলে এটাই তোমার আজকের রাতের পোশাক? এটা ছাড়া আর কিছু নেই মনে হচ্ছে। সত্যিই খুব দামী জিনিস বটে। নিজের ঘুমও ভালো হবে, পাশেরজনেরও।’ বলেই ওটা এগিয়ে দিলো দীধিতিকে, ‘নাও, গোসলে যাবার তাড়া ছিল খুব তোমার। এবার তো যাও।’
-‘অসম্ভব, আমি পরব না এটা।’
-‘কিন্তু লাগেজে তোমার জন্য তো আর কোনো কাপড় নেই। তাহলে কি আমার জামা কাপড় পরবে?’
ক্যাবিনেটে গিয়ে খোঁজার জন্য বিছানা ছেড়ে নাওফিল উঠলেই দীধিতি মৃদু ধমকের সাথে বলে, ‘ফাজলামি ছাড়ো! আর ওদেরকে ফোন করে বলো আমার জামা কাপড় বা শাড়ি যেটা মন চায় সেটা এনে দিতে৷’
পাঞ্জাবির পকেট হাতরেও নাওফিল ফোন পেল না তার। পরে খেয়াল হলো আসার সময় রুমানদের সাথে কথা বলার জন্য বসেছিল কিছুক্ষণ ওদের কাছে। ফোনটাও তখন ওদের ওখানেই রেখে আসা হয়েছে।
-‘ফোন নেই কাছে। আমি গিয়ে আনছি।’
যাওয়ার আগে নাইটিটা দীধিতির কোলের ওপর ছুঁড়ে দিলো। কিন্তু দরজা খোলা গেল না কতক্ষণ টানাটানি করেও। ডাকাডাকি করল নাওফিল সবুজদের। ওদেরও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সবটাই পরিকল্পনামাফিক তা আর বুঝতে বাকি নেই ওদের দুজনের৷ ঐশীও দীধিতির ফোনটা আর দিয়ে গেল না।
নাইটিটা হাতে নিয়ে নাওফিলের দিকে চেয়ে খুব রাগান্বিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীধিতি৷ তা দেখে নাওফিল অনুযোগ করল, ‘আমাকে এমন চাহনি দেওয়ার কারণ কী? আমি বলেছি এটা দিতে?’
বলেই নাওফিল নির্বিকারভাবে হেঁটে এসে আবারও উপহারগুলো খুলতে বসে গেল৷ দীধিতির দিকে ভ্রুক্ষেপ করল না আর৷ উপহারগুলো খুলে দেখল তাওসিফ মালদ্বীপের হানিমুন প্যাকেজ উপহার দিয়ে গেছে ওদের জন্য, ইয়াসিফ দিয়েছে রোলেক্সের দুটো কাপল ঘড়ি। অবশেষে বন্ধুদের দেওয়া উপহারটা খুলতে বসল নাওফিল। যেটা চারটা বাক্স খোলার পর একদম শেষ ছোট্ট একটা বাক্সে মিলল চারজন বন্ধুর দেওয়া সবচেয়ে সেরা উপহার, গর্ভনিরোধক খাপ। দীধিতির মাথা ঘুরে ওঠে বদমাশ বন্ধুগুলোর উপহারসামগ্রী দেখে।
নাওফিল নিম্ন ঠোঁট কামড়ে ধরে উপহারটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাপের গায়ের লেখা পড়ে কপট চিন্তিত মুখ করে বলে, ‘এই ডিজিটাল জিনিসের ডিজিটাল বুদ্ধিটা পাক্কা রুমানের। তোমার নাইটির বুদ্ধিটাও ঐশীর, বুঝলে? বাট ইট ওয়াজ নাইস। ট্রাই করার পর আমাদের ভালো লাগলে থ্যাঙ্কস জানাব ওদের, কী বলো?’
-‘আমাকে কি কোনো ড্রেস ম্যানেজ করে দিতে পারবে, নাওফিল?’ আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠল দীধিতি তখনই।
নাওফিলও একটু চমকে উঠল সহসা চিৎকারে। বউযের দিকে তাকিয়ে দেখল, লাল চোখজোড়ায় মেকি রাগের বদলে আসলে অস্বাভাবিক লজ্জারা ছোটাছুটি করছে।
-‘আরে চেঁচাও কেন? দেখলেই তো কোনো সাড়া দিলো না কেউ। তোমার ফোন কই? ওদের ফোন দিয়ে বলো ড্রেস নিয়ে আসতে।’
-‘আমার ফোনটাও ওরা রেখে দিয়েছে। থাকলে কি এতক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করতাম?’
-‘নাইস, তোমারও ফোন নেই আর আমারও। আমার পোশাক ছাড়া কোনো গতি নেই তাহলে। অবশ্য ক্যাবিনেটে খুঁজে আমারই কোনো পোশাক পাবো কি না সেই চিন্তাই করিনি এখনও। আচ্ছা ফাইভ মিনিটস। আমার টি শার্ট আর ক্যাজুয়াল ট্রাওজার এক্সট্রা আছে কি না দেখি!’ বলতে বলতেই ক্যাবিনেটের কাছে গেল।
মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল দীধিতি, ‘সিরিয়াসলি? আমাকে ওগুলো পরতে দেবে তুমি?’
ক্যাবিনেটে দুটো গেঞ্জি আর মাত্র একটা ট্রাওজারই পেল নাওফিল, জানাল, ‘আর কোনো উপায় নেই। নাইটিই তোমার একমাত্র সম্বল। আমার টিশার্ট দুটো থাকলেও ট্রাওজার একটাই।’
কোনো উত্তরই দিলো না আর দীধিতি। মাথা ধরেই ঠাস করে বিছানাতে শুয়ে পড়ল। আওয়াজ পেয়ে নাওফিল দ্রুত এগিয়ে এলো ওর কাছে, ‘মাথা ধরেছে?’
-‘অনেকক্ষণ। আর ঘুরছেও খুব।’ একটু মাতলামো মাতলামো কণ্ঠ লাগল মনে হলো।
পানি খোঁজার জন্য টেবিলে তাকালে নাওফিল দেখতে পেল খাবারের ট্রে রাখা ওখানে৷ ওকে বলল, ‘কষ্ট করে গোসলটা করে এসে নাইটিটাই পরো তাহলে। তারপর খেয়েদেয়ে ঘুম দাও।’
-‘আমি আর উঠতে পারব না। এভাবেই ঘুমিয়ে যাচ্ছি।’
কণ্ঠ পুরোটাই জড়িয়ে এসেছে দীধিতির। এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠল নাওফিল। প্রথম রাতে বউকে ভালো করে দেখার আগে, ছোঁয়ার আগেই বউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কি হয়? তাই কপট গম্ভীরতা হটিয়ে দীধিতিকে প্রতি যত্নশীল হলো সে। খাবারের ট্রে নিতে গিয়ে জগের শরবতটা চোখে পড়ল ওর, ভ্রুজোড়াও কুঞ্চিত হলো। জিজ্ঞেস করল দীধিতিকে, ‘এটা খেয়েছ নাকি তুমি? কে দিয়ে গেছে মহুয়া?’
-‘মহুয়া কী?’ ভাঙা গলায় ফিরতি প্রশ্ন রাখল দীধিতি।
-‘জগের ড্রিঙ্কসটা খেয়েছ তুমি?’
-‘হুঁ, বেশ ভালোই৷ খেয়ে দেখো।’
বিড়বিড় করে বিশ্রী ক’টা গালি ছুঁড়ল নাওফিল ইয়াসিফকে আর বন্ধুদের৷ দীধিতিকে আর বলল না মহুয়াকে বাংলা মদও বলা যায়। বলে আর কী হবে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে৷ খাবার নিয়ে এসে বসল সে বিছানাতে৷ দীধিতিকে জোর করেই উঠিয়ে খায়িয়ে দিলো কয়েক লোকমা মাংস ভাত, নিজেও খেল। গ্লাসে দুধ রাখা ছিল তার জন্যই। কিন্তু সেটা সে দীধিতিকেই জোরজুলুম করে অর্ধেক খায়িয়ে নিজে অর্ধেকটা খেয়ে নেয়।
ট্রেতে একটা ট্যাবলেট দেখে দীধিতির খেয়ালে এলো ঐশী মাথা ব্যথার ওষুধের কথা বলে গিয়েছিল ওকে৷ নাওফিল হাত ধুতে উঠে পড়তেই দীধিতি ট্যাবলেটটা হাতে নিলো৷ এটা দেখতে গোলাপী রঙের৷ কিন্তু মাথা ব্যথার ট্যাবলেট দেখতে গোলাপী হয় না সেটা ভেবে ক্ষণিকের জন্য ওর খটকা লাগলেও পরবর্তীতে বন্ধুদের প্রতি বিশ্বাস আর নিজের নেশাঘোর চেপে ধরার ফলে যাচাই বাছাইয়ে গেল না৷ টুপ করে পানি দিয়ে গিলে খেল৷ তারপর গোসলের উদ্দেশ্যে উঠে পড়ল বিছানা থেকে। শাড়িটা না খুললে ঘুমটাও ঠিকঠাক হবে না বলে শেষমেশ নাইটি নিয়েই একটু ঢুলতে ঢুলতে চলে গেল সে গোসলে। নাওফিল পেছনে দাঁড়িয়ে ওর ওই অবস্থা দেখে আপনাআপনিই দুঃখ, আফসোস করতে থাকল, ‘এক জামাআতে দাঁড়িয়ে শোকরানা নামাজটা আর পড়া হলো না আমাদের!’
ওদিকে গোসলে ঢুকে দীধিতির টালমাটাল অবস্থা৷ ভারী শাড়িটা খুলে সে বাথরুমের ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। মাথার খোঁপাটা খুব সহজভাবে বাঁধা ছিল বলে রক্ষা। তারপরও যে ক’টা ক্লিপ এঁটে দেওয়া ছিল সে ক’টাই খুলতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে পড়ল ও, সেই সাথে হিতাহিতবোধ হারিয়ে নোংরা নোংরা গালি দিতে থাকল বন্ধুদের, ক্লিপ খুলতে গিয়ে কতগুলো চুলও ছিঁড়ে আনল। শেষে অর্ধেক ক্লিপ চুলের মধ্যেই জড়িয়ে থাকল।
গোসলের পর একটু ভালো লাগলেও নেশাভাব ছোটেনি দীধিতির। নাওফিল জামা কাপড় পালটে বিছানাতেই বসে ছিল। দীধিতি বেরিয়ে এলে ওকে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে ওর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুমিয়ে পরবে না কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে?’
কীসের অপেক্ষা? দুজনের কাছাকাছি আসার! কী সোজাসাপটা প্রশ্ন কোনো জড়তা ছাড়াই! বেলেহাজ মিনসে! এমন বিষয়ে বর সরাসরিভাবে বিয়ের প্রথম রাতেই বউকে জিজ্ঞেস করতে পারে? দীধিতি চোখ ছোটো ছোটো করে কপাল কুঁচকে নাওফিলকে একটু দেখে তার পাশ কেটে চলে এলো বিছানায়৷ আর নাওফিল ওর হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে চলে গেল বাথরুমে।
ভেবেছিল মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এসে দেখবে দীধিতি ঘুমে বেহুঁশ৷ কিন্তু সে শুয়ে অনবরত এপাশ ওপাশ করছে মিনিটে মিনিটে৷ নাওফিল জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুম আসছে না?’
-‘লাইটগুলো নিভিয়ে দাও। আলোতে বিরক্ত লাগছে।’ ভার গলায় বলল দীধিতি।
ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটার বেশি বাজে এখন৷ ঘরের প্রতিটি আলো নিভিয়ে সিলিঙের নীলচে আলোগুলো জ্বেলে দিলো নাওফিল। বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল দীধিতির দিকেই পাশ ফিরে৷ তার বেলী ফুলের মতো, বেলী ফুলের সুঘ্রাণের মতো সুন্দর বউটা কপালের ওপর হাত ফেলে চোখ বুজে আছে৷ বোঝা যাচ্ছে, মাথা ব্যথা কমেনি বলে ঘুমটাও ধরছে না৷ ওর কাছে সরে এসে শুলো নাওফিল৷ কপালের ওপর থেকে ওর হাত ফেলে নিজেই ওর কপালটা তিন আঙুলে চেপে দিতে শুরু করল৷
অদ্ভুত হলেও সত্য, দীধিতিকে নিয়ে কখনই ও কোনোরকম কল্পনা করেনি৷ না নৈতিক কিছু, না অনৈতিক কিছু। অথচ ভালোবাসার মানুষ থাকলে তাকে ঘিরে হাজাররকম জল্পনা কল্পনা করে প্রেমিকরা, রাতের পর রাত কত শত দুষ্টু চিন্তাও করে। কিন্তু নাওফিল শুরুতে শুধু ওকে নিয়ে ছক কষেই গেছে। আর ভালোবাসা হয়ে যাবার পর শুধু ভাবত, ভালোবাসা হলেই কী আর না হলেই বা কী? সে কোনোদিনও ঘর সংসারে জড়াবে না। জীবনটাকে টিকিয়ে রাখবে ততদিন, যতদিন না নিজের মা-বাব আর বোনের সঠিক নিখোঁজ বা মৃত সংবাদ জানতে পারে। আর নিজেকে ততটাই জঘন্য তৈরি করবে, যতটা করলে লোকে জাকির শেখকে বলবে, ‘ভাইয়ের ছেলেকে মানুষ করতে ভাইয়ের থেকে ছিনিয়ে আনলে। অথচ পারলে না। সেই অমানুষই হলো ভাতিজা তোমার।’ আর এটাই হবে জাকির শেখের শাস্তিস্বরূপ।
হ্যাঁ, এভাবেই শাস্তিটা ভেবে রেখেছিল নাওফিল। কিন্তু সব ভাবনা পালটে গেল ভালোবাসায় হৃদয় ঘনীভূত হয়ে এলে।
বেশ আরাম পাচ্ছিল দীধিতি। তাই বুকের গহিনে সুউচ্চ লজ্জা, জড়তার শৃঙ্গ থাকলেও চুপচাপ রইল সে। এক লহমায় সুখের বাতাসে ভাসছে সে মনে মনে। আশা তো ছেড়েই দিয়েছিল পাশের মানুষটিকে পাওয়ার! তবুও শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনকারী বিধাতা ওর প্রতি সদয় হলেন বলে এই প্রথমবার মন থেকে সায় পেয়েছিল সে শুকরিয়া আদায়ের জন্য নামাজ পড়ার৷ কিন্তু শরীরটা তার এত বিরুদ্ধে চলছে কেন কে জানে? ধীরে ধীরে শুধু অস্থিরতা বেড়েই চলেছে৷ নাওফিলের স্পর্শে আশকারা পেয়ে বসছে অবাধ্য অনুভূতিরা৷ বড্ড লজ্জাকর অনুভূতির ঝড় বইছে শরীরের আনাচে কানাচে। ছিহঃ কী বেশরম অবস্থা ওর! পুরুষ হয়ে যেখানে নাওফিল এখন অবধি ওর পানে কামুক চোখে চাইল না, সেখানে ওর মধ্যে বাড়াবাড়ি রকমের চাওয়া অনুভব কেন হচ্ছে? কী সরল, স্নিগ্ধ আর মমতা ভরা স্পর্শ নাওফিলের! অথচ সেই স্পর্শই ওর শরীরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। দু হাতে চাদর খামচে ধরে ঘাপটি মেরে পড়ে রইল ও। নাওফিলের মুখের দিকে তাকানোর সাধও হজম করে রইল। যদি ওর চাহনিতে মন গভীরের কামুকতা টের পেয়ে যায় নাওফিল, সেই ভয়ে!
কিন্তু সে চোখ বুজে থাকায় দেখতেই পেল না, নাওফিলের বিধ্বংসী, কামাতুর চাউনি স্থির হচ্ছে একবার ওর লাভ আকৃতির পুরু ঠোঁটজোড়াতে, আরেকবার হৃদয় লুকিয়ে থাকা বক্ষপটে। অস্থিরতায় যত ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে দীধিতি, তত ঘনঘনই সে বক্ষপট ঢেউ খেলছে। মায়ময় নীলচে আলোয় তা দেখতে দেখতে নাওফিলের পাগল হওয়ার যোগাড়। এভাবে কতক্ষণ?
আধা ঘণ্টা পরই আচমকা উচ্চ আওয়াজে গানের হদিস মিলল কোথা থেকে যেন। শিরশিরে অনুভূতিতে আরও তাণ্ডব বইয়ে দিলো গানের কথাগুলো–
এত কাছে দু’জনে
প্রেম ভরা যৌবনে
এত কাছে দু’জনে
প্রেম ভরা যৌবনে
হঠাৎ ভুলে ভুল না হয়ে যায়…২
মায়াবী রাত মাতাল নেশাতে
আজ মনে মন চায় যে মেশাতে
মায়াবী রাত মাতাল নেশাতে
আজ মনে মন চায় যে মেশাতে
দীপ নিভিয়ে ঝড় যে বয়ে যায়
এত কাছে দু’জনে
প্রেম ভরা যৌবনে
হঠাৎ ভুলে ভুল না হয়ে যায়
আঁখিতে যে জ্বলে কামনার বহ্নি
অঙ্গ যে চায় সঙ্গ যে তন্বী
আঁখিতে যে জ্বলে কামনার বহ্নি
অঙ্গ যে চায় সঙ্গ যে তন্বী
মনের কথা মনেই রয়ে যায়
ওরা দুজন এক সঙ্গেই তড়াক করে উঠে বসল। ‘গান বাজছে কোথায়?’ দীধিতি বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল৷ নাওফিল জবাব দিলো না। চোর খোঁজার মতো নাওফিল ঘরের চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে আর ভাবছে, রাইট টাইমিঙে একেবারে রাইট গান কীভাবে বেজে উঠল? নিশ্চয়ই ঘরে কেউ আছে! ভেবেই ঝট করে দীধিতির দিকে লক্ষ করল। ওর পোশাক ঠিক আছে তো? না, ওপরের গাউনটা বুকের কাছ থেকে সরে গেছে ওর। পায়ের কাছে ভাঁজ হয়ে থাকা চাদরটা দ্রুত হাতে নিয়ে তাই দীধিতিকে ডুবিয়ে দিলো তার মাঝে।
-‘কী করছ, নাওফিল?’ বিরক্তি নিয়ে মাথার ওপর থেকে ফেলে দিলো দীধিতি চাদরটা।
-‘রোবটা ঠিকঠাক করে পরে তারপর চাদর ফেলবে। ঘরের মাঝে ওরা কেউ লুকিয়ে আছে। ক্যাবিনেটের ভেতর, শিওর।’ বলেই বিছানা থেকে নামতে গেল নাওফিল ওখানে খোঁজার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু দীধিতি বলল, ‘গান ঘরের বাইরে বাজছে। ভেতরে কোথায়?’
-‘বাইরে?’
হঠাৎ করে গানের আওয়াজ কমে গেল। নাওফিল কান পেতে শুনে বুঝতে পারল, আসলেই বাইরে বাজছে।
এবং গানটা বাজাচ্ছে শিহাব তন্বীর উদ্দেশ্যে। ওদের আকদ হয়ে আছে ঘরোয়াভাবে। আগামী মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়েছে।তাই এখন অবধি দুজনকে এক সঙ্গে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি। আজকে নাওফিলের বিয়ের বাহানায় শিহাব চেয়েছিল ওদের বাসরটাও সেড়ে নিতে। কিন্তু তন্বী তাকে বিরহে রেখে দু বান্ধবীর সাথে ঘর আটকে শুয়ে পড়েছে। সেই বিরহেই শিহাব গান বাজিয়ে শোনাচ্ছে তাকে। মহুয়া নেশা মাথায় চড়ে গেছে তার। তাই থামাথামির কোনো লক্ষণ নেই। একই গান লাগাতার বেজে চলেছে, তা এখন মৃদু আওয়াজে ভেসে আসছে ঘরে।
নাওফিল কিছু একটা ভেবে মুখ লুকিয়ে দুষ্টু হেসে চোরা চোখে তাকাল দীধিতির দিকে৷ আজকে রাতে যদিও কোনো দুষ্টুমির পরিকল্পনা নেই ওর। কিন্তু প্রকৃতিই স্বয়ং ওদের উষ্কে দিতে চাইছে বোধ হয়।
এসি অন থাকার পরও দীধিতি দরদর করে ঘামছে, বক্ষঃস্থলে ডামাডোল চলছে ওর। অস্বাভাবিক আর বেপরোয়া উত্তেজনায় ঠোঁট কামড়ে ধরে, চোখ বুজে, মাথা নুইয়ে বসে রইল৷ ছটফটিয়ে নাওফিলকে বলে উঠল, ‘আমার প্রচণ্ড অস্থির লাগছে!’
নাওফিলও খেয়াল করল হলদে সাদা পাপড়ির মতো ফরসা কপালে ঘাম চিকচিক করছে ওর, ‘এসি তো চলছেই। আরও ঠান্ডা প্রয়োজন?’
-‘না, আই থিঙ্ক আমার তোমাকে প্রয়োজন। আই নিড য়্যু ব্যাডলি, নাওফিল।’
-‘কী কী? কী বললে?’ বিস্ময় নাওফিলের চোখে।
সমস্ত লজ্জা ভুলে বসেছে দীধিতি। জীবনে এই প্রথম এমন বাড়াবাড়ি অনুভূতির কবলে পড়ল সে৷ কিন্তু আজই কেন এমন হচ্ছে? নাওফিলের কাছাকাছি তো বহুবার আসা হয়েছে৷ কখনই তো ওর সঙ্গে অন্তরঙ্গতার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেনি, ভাবনাতেই আসেনি তা। তাহলে আজই কেন? তাও সাংঘাতিকভাবে!
মহুয়াই কি শেষে কব্জা করে নিলো দীধিতিকে? কিন্তু তাই বলে ঘনিষ্ঠতা কেন চাইবে ও? অন্যভাবেও এলোমেলো আচরণ করতে পারে। নাওফিলের চেনা মেয়েটা যে এমন নয়৷ নাওফিল জানে, সে না এগোলে দীধিতিও যেচে পড়ে এগোবে না৷ আর দুজনের সম্পর্কের পরিস্থিতি বর্তমান যে পর্যায়ে, তাতে নাওফিল এগোলেও সহজে ধরা দেওয়ার কথা না দীধিতির। বিয়েটা হয়ে গেলেও দুজনের মাঝে চূড়ান্ত বোঝাপড়াটা যে বাকিই পড়ে আছে। সেই বোঝাপড়া না হওয়া অবধি নাওফিলও চায় না দৈহিক খোরাক পূরণে স্রেফ শরীরের মিলন ঘটাতে।
-‘দীধি, আমার মনে হচ্ছে তোমার ঘুম জরুরি এই মুহূর্তে৷ তুমি নিজের মাঝে নেই।’
কান্না কান্না গলায় বলে উঠল দীধিতি, ‘হয়ত। আমার কী হয়েছে? আ’ম ফিলিং এক্সট্রিমলি সেক্সুয়ালি ডিমান্ডিং।’
-‘সিরিয়াসলি!’ আকাশ ছোঁয়া বিস্মিতভাব এবার নাওফিলের।
শব্দটা উচ্চারণ করতেই দীধিতি ভাবনাতীত নাওফিলের উরুতে এসে বসে পড়ল। ওর সাদা রঙা পলো শার্টের কলার মুঠোয় চেপে ধরে অনুরোধ করল, ‘প্লিজ হেল্প মি, নাওফিল। আমি নিতে পারছি না এই অস্থিরতা!’
এই অপ্রত্যাশিত, অভাবনীয় মুহূর্ত নাওফিল এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না৷ বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দীধিতির সারা মুখে দৃষ্টি বুলায়৷ আচমকা এই পরিবর্তন কেন? সমস্যাটা কী? সেটাই বুঝতে চাইছে দীধিতির মুখে চেয়ে। কেন যেন মনে হচ্ছে ওর বন্ধুরা বা ইয়াসিফ উলটোপালটা কিছু করেছে দীধিতির সাথে৷ আজ মহুয়াই বা কই থেকে আনল ইয়াসিফ? ওটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সে যা জানে তাতে তো এমন পাগলামি করার কথা না! সর্বোপরি একটু মাতলামোই না করবে দীধিতি। তাহলে কাহিনি কী?
কলারটা দীধিতির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো নাওফিল, ‘রিল্যাক্স দীধি, আমি আছি। কিচ্ছু হবে না। তুমি শুয়ে পড়ো আমি তোমাকে ঘুমাতে হেল্প করছি। মাথা টিপে দিচ্ছি।’
মাথা নাড়তে নাড়তে অবাধ্য দীধিতি বলল, ‘না না, আমি তোমাকে বোঝাতে পারছি না আমার কেমন লাগছে। আই রিপিট, আ’ম ফিলিং সেক্সুয়ালি অ্যাট্রাক্টেড। আ’ম য়্যোর ওয়াইফ, রাইট? সো নাও য়্যু ক্যান টাচ্ মি লাইক য়্যু ডু।’
বলার পর দীধিতি নিজেই নাওফিলের ঠোঁটের পাশে , গালের মাঝে আর্দ্র চুমু খেল শক্তভাবে। বাঁ গালটা সম্পূর্ণ ভেজা অনুভব করতেই নাওফিলের শরীরে চকিতেই বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইল যেন । মৃদু ধাক্কায় দীধিতির মুখটা সরিয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, ‘আমার অনেক জবাব নেওয়ার আছে তোমার থেকে, বোঝাপড়াও আছে৷ সেগুলো না হওয়া পর্যন্ত এসব চলবে না।’
কল্পনাতীত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল দীধিতি তা শুনেই, রেগে বলল, ‘য়্যু আর ইনসাল্টিং মি, নাওফিল!’
-‘স্যরি। বাট য়্যু ফোরসড্ মি, ডিয়ার। তাছাড়া আমি তোমার দেনমোহর পরিশোধ করিনি কিন্তু।’
-‘প্রয়োজন নেই। মাফ করে দিয়েছি। আমার তোমাকে লাগবে।’ বলেই দীধিতি চূড়ান্ত আক্রমণ করে বসল নাওফিলের ঠোঁটে।
স্পোর্টস কারটা নিয়ে ইয়াসিফ বেলা এগারোটায় বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল৷ বাংলোতে ঢুকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় ঠকঠক করতে করতে রুমানকে ডাকতে থাকল৷ বসার ঘরের মেঝেতে সব আসবাব সরিয়ে বিছানা করে চার বন্ধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মহুয়ার নেশা কাটেনি হয়ত এখনও।
ঐশী ইয়াসিফের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে দ্রুত পায়ে এসে দরজাটা খুলে দিলো। ঘরের ভেতর ঢুকে রুমানদের অবস্থা দেখে ইয়াসিফ বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এরা এখনও ওঠেনি কেন?’
-‘রাত ভরে ঘুমিয়েছে না কি? তাই বেলা ভরে ঘুমাচ্ছে।’
-‘আর জাদ কই? ওরা ঘুম থেকে উঠেছে?’
-‘হ্যাঁ, শুধু নাওফিল ভাইয়া উঠেছে একটু আগেই৷’
-‘একটু ডাক দাও তো ওকে। তোমরা নাশতা করেছ?’
-‘আমরা তিন বান্ধবী করে নিয়েছি শুধু। নাওফিল ভাইকে করতে বললাম না। ভাইয়া বলল দীধিতি উঠলে করবে।’
কথা চলতেই নাওফিল ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ওর দিকে ইয়াসিফের চোখ পড়লেই ওকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে হেসে বলল, ‘কীরে চোখ মুখের অবস্থা খারাপ কেন? রাতভর কামলা দিয়েছিস না কি?’
ঐশী মুখে হাত দিয়ে হেসে সরে পড়ল ওখান থেকে৷ যতই হোক ইয়াসিফ সম্পর্কে ভাসুর। তার লাজ লজ্জা কম থাকলেও ঐশীর খুব।
গোসল নিয়েছে নাওফিল খুব সকালেই। ঘুম ঠিকমতো না হওয়ায় চোখ লাল হয়ে আছে, মুখটাও কেমন শুকনো লাগছে সারাদিন পর গতকাল রাতে কয়েক লোকমা ভাত খেয়েছিল বলেই হয়ত। মিনিটখানিক ধরে শান্ত চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকল সে ইয়াসিফের দিকে। ইয়াসিফ তখনও মিটিমিটি হেসে যাচ্ছে৷ আর তা দেখেই নাওফিল আর পারল না নিজেকে আটকাতে৷ পা থেকে একটা স্লিপার খুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল ইয়াসিফকে, তারপর ছুটে গেল ওর দিকে৷ স্লিপারটা হাতে ক্যাচ করেই ইয়াসিফ হাসতে হাসতে ছুট দিলো৷ চেঁচিয়ে বলতে থাকল, ‘তোর সাহস কত বড়ো! বড়ো ভাইকে স্যান্ডেল ছুঁড়ছিস?’
-‘তুই দাঁড়া না! আমি আজকে বড়ো ভাই মান্য করে কঠিন ভক্তি করব তোকে।’
ইয়াসিফ সোফার পেছন দিকে আর নাওফিল সামনের দিকে৷ যেন মনে হচ্ছে দুজন ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে৷ কিছুক্ষণ সে খেলা চলার পর নাওফিল ধপ্ করে সোফায় বসে পড়ল৷ দস্যি ছেলে ইয়াসিফ তখন স্লিপারটা নাওফিলের কোলে ছুঁড়ে দিয়ে ওর পাশে এসে বসে বলল, ‘খেলা তাহলে রাতে ভালোই চলেছে, না কি? কয় ওভার খেললি?’
সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়েছিল নাওফিল। ঘাড় কাত করে ইয়াসিফের দিকে চেয়ে কটমট করে বলল, ‘সে*ক্স ট্যাবলেট কেন দিয়েছিলি তোরা মাথা ব্যথার ওষুধের নাম করে? এটা কী ধরনের ফাজলামি? ওটার সাইড ইফেক্ট জানিস না? যদি কোনো সমস্যা হত দীধির?’
ইয়াসিফ চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল বিস্ময়ে, ‘তোর বউ কি খেয়েছিল ট্যাবলেট? সত্যি ভাই? আরে আমি তো মজা করে দিয়েছি ওটা খাপসহ। আমি তো জানি তোরা দেখার পর দুজন দুজনের সামনে একটু লজ্জা শরম পাবি, ব্যাস এটুকুই। এখন তোর বউ যদি মূর্খের মতো মাথা ব্যথার ওষুধ বলে বিশ্বাস করে নেয়, তাহলে কি সেটা আমাদের দোষ? তুষাররা তো কন*মও দিয়েছে মজা করে। তেমনই ওটাও মজা করেই দিয়েছি আমি।’
-‘আমার বউকে মূর্খ বললে তোর দাঁত ফেলে দেব। ও হুঁশে থাকলে তো টের পাবে! মহুয়াও গিলিয়েছিস ওকে, আবার সে*ক্স ট্যাবলেটও। মহুয়া খেয়ে ওর হুঁশজ্ঞান কি স্বাভাবিক ছিল? আমি আবার ভালো স্বামী হতে গিয়ে দুধও খায়িয়ে দিয়েছিলাম।’
-‘ওয়াও! সেরের ওপর সোয়া সের।’ বলতে বলতে তালি দিয়ে পেট ধরে হাসতে আরম্ভ করল ইয়াসিফ।
সেই শব্দে ঘর ছেড়ে তন্বীরা বেরিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল ওদের দু’ভাইকে, ‘কী নিয়ে এত হাসছেন, ভাইয়া?’
ইয়াসিফ হাসতে হাসতে পেছন ফিরে ওদের দেখে নাওফিলকে বলল, ‘তোর শালিকাদের দোষ। আমি কিন্তু খাপসহ দিয়েছিলাম ট্রেতে রাখতে৷ ওরা খাপ রেখে দিয়ে ট্যাবলেট রেখে দিলো শুধু। যাতে দীধিতি সত্যিই খায় ওটা।’
বিচ্ছিরি লজ্জায় পড়ে গেল ওরা তিনজন। দীধিতির সঙ্গে একটু মজা করার উদ্দেশ্য ছিল৷ কিন্তু নাওফিলের সামনে কেমন বিব্রতবোধ হচ্ছে যেন ওদের৷ তন্বী কোনোরকমে হেসে জবাবদিহি দিলো, ‘আমরা তো শুধু মজা করতেই দিয়েছিলাম৷ দীধিতি ঠিক আছে তো, ভাইয়া?’
নাওফিল একটুও তাকাল না ওদের দিকে। ঠোঁট চেপে ধরে অন্যদিকে চেয়ে বসে রইল। ইয়াসিফ বলল, ‘আরে এটা তো জিজ্ঞেস করবে জাদকে৷ তোমাদের মজার ঠেলা সামলেছে তো আমার ভাই। বেঠিক থাকলে সেটা আমার ভাই থাকবে।’
-‘তন্বী, তোমরা ঘরে যাও দীধির কাছে৷ ওকে ঘুম থেকে তুলে একটু হেল্প করো গিয়ে।’ নাওফিলও বিব্রতবোধ নিয়ে বলল ওদের।
অনুমতি পেয়ে তামান্না আগে দৌঁড়ল। পেছন পেছন ঐশী আর তন্বীও গেল৷ তখন ইয়াসিফ বাইরে ইশারা করে নাওফিলকে ডাকল ওর সঙ্গে যেতে। দুইজন বাগানের কাছটায় এসে দাঁড়াল। ইয়াসিফের হাতে একটা ফাইল৷ নাওফিল সেটা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘রিপোর্ট কখন আনতে গিয়েছিলি?’
-‘গতকাল রাতেই কল করেছিল সাদ। এদিকটা সামলে নিতে গিয়ে আর ঢাকা ঢোকার সময় পাইনি। তারপর ভোরবেলা বের হই। আমার কাজ সেড়ে হসপিটাল গিয়ে সাদের সঙ্গে দেখা করে রিপোর্টটা নিয়ে আসি।’
রিপোর্টটা নাওফিল খুলে দেখতে দেখতে ভর্ৎসনা করল, ‘তুই তো আজাইরা ঘুরঘুর করিস৷ আর মন চাইলে ডেটে যাস। তোর আবার কী কাজ?’
ইয়াসিফ প্রতিবাদ করে না। মৃদু হাসতে হাসতে ফোনে স্লাইড করে সে। তার ব্যক্তিগত জীবনের সব কিছুই তাওসিফ, নাওফিল অবগত থাকলেও পেশাগত জীবনের এক চুল কথাও শেয়ার করে না সে কাউকে।
এদিকে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টটা দেখে নাওফিল হাসে, ‘রেজাল্ট তো পজিটিভ, ভাই।’
-‘হওয়ারই কথা। কিন্তু তোর মনির চেহারার সাথে তেমন মিল নেই ওর৷ শুধু উচ্চতা ছাড়া।
-‘বাবার মুখের আদল পেয়েছে তাহলে।’
-‘তবে তো শ্বেতকায় হওয়ার কথা ওর।’
রিপোর্টের কাগজটা আবার ফাইলে ঢুকিয়ে নিলো নাওফিল। চিন্তিত দেখাচ্ছে ওকে, ‘আমিও এটাই ভাবছি। আব্বুর বন্ধু চারজনই শ্বেতাঙ্গ। তাদের মাঝেই একজন দীধিতির বাবা। জিনগতভাবে দীধিতিরও তাহলে শ্বেতাঙ্গ হওয়ার কথা, যেহেতু মনির মতো দেখতে হয়নি ও৷ কিন্তু গতকাল রাত থেকে দুটো জিনিসে আমার চোখ আটকে যাচ্ছে খুব৷ দীধিতিকে কেন যেন গতকাল রাতে মাত্রাতিরিক্ত ফরসা লাগছিল৷ শেতাঙ্গদের মতোই৷ সেই সাথে চোখের নীল লেন্সে যেন পুরোটাই বিদেশিনি৷ আগে কখনও এমন সাদা লাগেনি ওকে।’
-‘এতকাল দেখেছিস মেকআপ সেকআপে হয়ত। কাল মেকআপ ছাড়া ফ্রেশ লুকে ছিল। তাই পরিবর্তনটা চোখে পড়েছে।কিন্তু ওর বাবা তাহলে কে হতে পারে?’
-‘মনির কাছে কোনো ছবিই নেই কারও৷ এমনকি রেজা হকেরও না৷ ছবি থাকলে তো ঠিক জেনে যেতাম।’
-‘আমার মনে হয় তোর এর মাঝেই অস্ট্রেলিয়া যাওয়া দরকার আবার।’
-‘যেতে তো হবেই। মনিকে সারপ্রাইজটা দেব না? কিন্তু এখন না৷ দীধিতির সাথে কথাবার্তা বলতে হবে। টেরোরিস্ট জাইমাকে খাঁচা থেকে বের করে আনার ব্যবস্থাটা করতে হবে আগে। আর কতদিন লুকিয়ে থেকে প্রাইভেট নাম্বার থেকে যোগাযোগ করবে? বাংলাদেশে তাকে টেনে নিয়ে আসবই আমি৷ আমার আত্মবিশ্বাসটা দিনদিন বাড়ছেই। এই মহিলা আমার খালামনি সম্পর্কে খোঁজ দিতে পারবে নিশ্চিত। আর দেখিস, তোর ইনভেস্টিগেশনে ধরা পড়বে জাইমা এখনও জড়িত টেরোরিজমে। এতই সহজ এই জগত থেকে বেরিয়ে আসা? যেখানে আব্বু আম্মুই পারেনি।’
-‘আচ্ছা থাক এসব কথা এখন৷ দাদার সঙ্গে দেখা করবি না?’
-‘নিশ্চয়ই। অফিসে গিয়ে দেখা করব৷ ও বাড়িতে আপাতত ঢুকছি না ততদিন৷ যতদিন না স্বয়ং জাকির শেখ নিজে থেকে নিতে আসে।’
-‘আমি কিছুদিনের মধ্যেই রাঙামাটি যাচ্ছি, বুঝলি? কবে ফিরব বলতে পারছি না। মিহাদও নেই, তুই সতর্কভাবে চলাফেরা করিস৷ আর তোদের ঘড়িদুটো কিন্তু খুব স্পেশাল। তুই হাতেই রাখিস সব সময়। দীধিতি বাইরে গেলে অবশ্যই ওটাই ওকে ইউজ করতে বলিস। আসছি আমি৷ দুপুরের পর ঢাকা ঢুকে যাব। একেবারে রাঙামাটি যাওয়ার আগে ফিরব এখানে।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩০
-‘আচ্ছা, খেয়াল রাখিস নিজের।’
ভাইকে বিদায় দিয়ে নাওফিল ফাইলটা সযত্নে হাতের মাঝে আগলে রেখে বাসায় ঢুকে পড়ল।
আরেকটা পর্ব বাড়াচ্ছি আপনাদের কথা ভেবেই। ৩০(গ) সমাপ্তি পর্ব আগামীকাল দেব। গঠনমূলক মন্তব্য চাই কিন্তু আজ প্রত্যেকের। করবেন তো?
