Home ডাক্টার ইশতিহার ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৩

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৩

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৩
অনামিকা আহমেদ

ইশতিহার এর রূপ বাড়ি ছেড়েছে মোটে সাতদিন হয়েছে। তাতেই সুলেখা তার স্বামী কে অতিষ্ট করে তুলেছে তাদের বাড়ি ফিরিয়ে আনার জন্য। দুজনের অনুপস্থিতি যেনো মির্জা বাড়ির রমরমে ভাবকে পুরোপুরি মাটি করে দিয়েছে, সবাই যেনো কেমন চুপ করে থাকে কেও কারোর সাথে কথা বলে না। শেষে আমির সাহেব বাধ্য হন তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুতি নিতে।

পরিকল্পনা মাফেক পরের দিন সকাল সকাল বাড়ির প্রায় সকলে এসে হাজির হয় ইশতিহার এর এপার্টমেন্টে। ঠিকানা টা আদনানের কাছ থেকে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করেই জানা হয়েছে। রূপ সবে মাত্র চুলায় চা বসিয়েছে মাত্র, ভেজা চুলগুলো এখনও শুকিয়ে উঠেনি পুরোপুরি। এখানে আসার পর থেকে এমন একদিনও যায়নি যেদিন রূপ কে সকালে উঠে ফরজ গোসল সারতে হয়নি, ইশতিহার সেটা হতে দেয়নি।
চায়ের পাতিল টা চুলায় চাপিয়ে পেছনে ঘুরতেই হুড়মুড় করে বাড়ির ভেতর বেশ কয়েকজন কে প্রবেশ করতে দেখে রূপের গলা শুকিয়ে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই অতি চেনা মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতেই রূপের চোখে পানি চলে আসে। রূপ ছুটে গিয়ে সুলেখা কে জড়িয়ে ধরে। সুলেখা ও রূপ কে কাছে পেয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। তার দুটো বুকের ধন কে এতদিন চোখের সামনে না দেখতে পেয়ে তার বুকটা যেনো শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে উঠেছিল, আজ তাতে একটু পানির সঞ্চার হলো।
সুলেখা রূপের মুখটা তুলে আলতো করে তার কপালে চুমু খেয়ে বলে,

” কেমন আছিস মা? আর আমার নাতি কেমন আছে? ”
কথাগুলো বলতে বলতে তিনি রূপের পেটের ওপর হাত রাখেন। রূপ বেশ প্রশস্ত হেসে বলে,
” আমরা সবাই ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো? আর তোমার বাতের ব্যথা – ওষুধ খাওয়া হয় ঠিক মতো নাকি আমি নেই বলে বেমালুম ভুলে যাও।”
” বাতের ব্যথার চেয়ে যে মনের ব্যথাটা আজ বেশ বড় রূপ। তোরা সেটা বুঝিস না, বুঝলে আমাকে এভাবে ফেলে আসতে পারতি না।”
রূপ হয়তো কিছু একটা বলতো কিন্তু তার সুযোগ না দিয়ে আমির সাহেব গোলা ঝাড়া দিয়ে স্বভাব সুলভ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠেন,
” সে কোথায়? তাতে তো দেখতে পারছি না। ডেকে আনো তাকে।”
রূপের এতক্ষণে খেয়াল হয় বাড়ির বাকি সদস্যকে। রূপ শরীর আঁচলটা মাথায় টেনে আমির সাহেবের পা ধরে সালাম করতে যায়। অন্যদিন হলে হয়তো আমির সাহেব রূপ তে দূরে সরিয়ে দিতেন, এটাই তিনি সারাজীবন করে এসেছেন অবশ্য। নিজের বাবা না দাম দিলে বাড়ির বাকিরাও তাকে মূল্য দিতে ভুলে যায় এটাই স্বাভাবিক। পায়ে রূপের স্পর্শ পেতেই দীর্ঘদিনের নিজের করা অন্যা*য়ের দৃশ্যগুলো যেনো আমির সাহেবের চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকলো। রূপ কে অবাক করে দিয়ে তিনি রূপের মাথায় হাত রেখে বললেন,

” বেঁচে থাকো, স্বামী সন্তান নিয়ে সুখী হও।”
রূপের চোখে পানি চলে আসে। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের পানি আড়াল করতে গিয়ে বলে,
” উনি ঘুমাচ্ছেন, আমি ডাক দিয়ে আসছি।”
এই বলে রূপ আর এক মুহুর্ত ও সেখানে দাঁড়ায় না। ছুটে তাদের বেড রুমের ভেতর চলে যায়।
বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে আছে ইশতিহার। শরীরে কাপড় নেই, বেড সিটটাই গায়ের ওপর দিয়ে রাখলেও উম্মুক্ত পেশল পিঠ দৃশ্যমান। বাদামী পিঠের ওপর হাজারো নখের আঁচড় জ্বলজ্বল করছে, কয়েকটা তো এতই লাল হয়ে আছে যেনো মনে হচ্ছে এই মাত্র কেও তার পিঠের ওপর আছর কেটে গেছে।
রূপ তড়িঘড়ি করে রুমে এসে ইশতিহার কে নাগানোর চেষ্টা করে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যেতেই ইশতিহার মাথা তুলে বিরক্তি ভরে রূপের দিকে তাকায়। ঘুমন্ত চোখ দুটো পুরোপুরি ভাবে খোলা যেনো তার কাছে জীবনের সবচেয়ে কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বালিশে আবারও মুখে গুঁজে দিয়ে সে হাস্কি কন্ঠে বলে,
” নিড মি এগেইন বেবী? একটু ঘুমোতে দাও, শরীরটা চাঙ্গা হতেই তোমাকে আবারো সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিবো। ট্রাস্ট মি, এইবার স্টার্ট করলে দুই ঘণ্টার আগে তোমার রক্ষা নেই।”

ইশতিহার এর এমন বেসামাল কথা শুনলে রূপের গাল লজ্জায় লাল হয়ে আসে। পিছে কেও এসব শুনে ফেলেছে নাকি সেটা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে সে রাগী চোখ মুখে তাকায় ইশতিহার এর দিকে। তারপর তার চুল টেনে ধরে তাকে জোর করে উঠে বসায় রূপ। বলে,
” নির্লজ্জ বেহায়া বেসরম পুরুষ। মাথায় খালি এসব ঘুরে তাই না? বাড়ি থেকে সবাই এসেছে, তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তারপর আসুন।”
কথাটা শুনতেই যেনো ইশতিহার এর চোখ থেকে ঘুম চলে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। মুখ দেখে ভালই বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা সে ভালোভাবে নেয়নি। রূপ সেটা বুঝতে পেরে গলাটা নরম করে বলে,

” ইশতিহার ওরা আমাদের নিতে এসেছে। না যান, কিন্তু সিনক্রিয়েট করবেন না প্লীজ। বাবা মা আছেন, ওনারা -”
” আলমারি থেকে বাথরোব টা দাও।”
” আপনি বাথরোব পড়ে মুরব্বিদের সামনে যাবেন।”
” তুমি চাইলে এভাবেও যেতে পারি। আমার কোনো সমস্যা নেয়, জানোই তো আমার আবার লজ্জা সরম কম।”
রূপ ইশতিহার এর দিকে মুখ ভেংচিয়ে তাকায়। ঠোঁটকাটা লোকটার সাথে সে কখনোই কথায় পেরে উঠে না। তাই আর দেরি না করে বাথরোব টা বের করে ছুঁড়ে দিয়ে বলে,
” আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি। আপনি তাড়াতাড়ি বাইরে আসুন, উনারা অপেক্ষা করছেন।”
এই বলে রূপ বের হয়ে গেলে ইশতিহার এর মুখে কুটিল হাসি ফুটে উঠে। এই দিনটার জন্যই সে অপেক্ষা করছি, ভয়ংকর এক পরিকল্পনা যে তার মাথায় ঘুরছে সেটা তাকে দেখে ভালই বোঝা যাচ্ছে।

বসার ঘরে পিন পতন নীরবতা। সকলের মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইশতিহার, যে কিনা বেশ শান্ত ভাবে পায়ের ওপর প তুলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। এদিকে রূপ কাপা কাপা হাতে কেটলি থেকে কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিচ্ছে সকলের হাতে। ইশতিহার এর চোখের দিকে তাকানোর যেনো বিন্দুমাত্র সাহস নেই তার। কোনোরকমে এই দায়িত্ব পালন করে কখন সে এখন থেকে গা ঢাকা দিয়ে পারবে সেটা ভাবতেই ব্যস্ত সে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে আমির সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন,
” অনেক হয়েছে তোমার নাটক ইশতিহার। স্ত্রী সমেত বড় থেকে বের হয়ে প্রমাণ করেছো যে তুমি অনেক টাকার মালিক হতে গেছি? বেশ, তবে এখন বাড়ি ফিরে এসো, মির্জা বংশের কেও এভাবে বাড়ি ছেড়ে এপার্টমেন্টে এসে উঠে না।”
ইশতিহার চায়ের কাপটা কাচের টেবিলের ওপর রাখে। তারপর সে বলে উঠে,

” আমার জানা মতে মির্জা বংশে এমন ইতিহাস ও নেই যে কোনো বোন তার অন্য বোন কে সিঁড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তার বাচ্চা হত্যা*র চেষ্টা করে। আমরিন চাচী তার মেয়েকে ভালই শিক্ষা দিয়েছেন, একেবারে বংশের প্রতিকূলের শিক্ষা।”
” তার জন্য আমরিন এর অরুণা ক্ষমাপ্রার্থী। দেখো মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আর অরুণা তো জেনে বুঝে কিছু করেনি, ছোট মানুষ হাত লেগে পরে গিয়েছে।”
আমির সাহেবের কথা শুনতেই ইশতিহার হো হো করে হেসে উঠে। হাসির মাঝেই একবার বাজপাখির দৃষ্টিতে চায় আমরিন আর অরুণার দিকে। গা জ্বলে আসে তার। তাই চোখ নামিয়ে বলে,
” ছোট মানুষ? ভুল করে করেছে? আপনার কি তাই মনে হয়? আমার তো মনে হয়না। সবই সম্পত্তি হাতানোর প্ল্যানের অংশ মাত্র। তাও আপনি যখন বাড়ি বয়ে এসে আমাদের ফিরিয়ে নিত চাইছেন তবে আমরা যাব। কিন্তু একটা শর্তে।”

” কি শর্ত?”
” আমরিন চাচী আর অরুণা কে রূপের পা ধরে ক্ষমা চাইতে হবে সকলের সামনে। আর আবারও যদি তারা একই ভুল করে ফেলে তাহলে পরিণতি যে ঠিক কতটা খারাপ হবে সেটা যেন তারা নিজেদের মাথায় ঢুকিয়ে নেয়।”
ইশতিহার এর কথা শুনতেই সবাই অবাকের শীর্ষে পৌঁছায়। খোকন সাহেব তো গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে দেয় যার স্ত্রী সন্তান কে অপমান করার জন্য। আমির সাহেব তাকে থামিয়ে বলেন,
” ইশতিহার ঠিকই বলেছে, যখন ওরা দোষ করেছিল তখন তাদের শাসনের জায়গায় প্রশ্রয় দেওয়া আমাদের ভুল হয়েছে। এখন ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আমরিন অরুণা তোমরা রূপের পা ধরে ক্ষমা চাও।”
আমরিন আর অরুণার মুখ শুকিয়ে আসে। রূপ তাদের বাধা দিতেই যাবে কিন্তু ইশতিহার এর চোখে চোখ পড়তেই তার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। আমরিন আর অরুণা রূপের পা ধরে বলে,
” আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আমরা তোমার আর তোমার বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছি। এমন আর কখনও হবে না, আমাদের ক্ষমা করে দাও আপু।”

” হ্যাঁ রে রূপ, আমাদের মাফ করে দেয়। এ কাজ আর কখনও করবো না।”
প্রথমে অরুণা বলে তারপর আমরিন তার সাথে তাল মেলায়। রূপ মুখে আঁচল জড়িয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশতিহার এর মুখে তখন বিজয়ের হাসি। সে উঠে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠে,

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১২

” রূপ আমার অর্ধাঙ্গিনী। আর আমার অর্ধাঙ্গিনী কে অপমান করা মনে আমাকে অপমান করা, ইশতিহার মির্জা কে অপমান করা। আমি সবার উদ্দেশ্যে বলছি, যদি কেউ আমার স্ত্রীর প্রতি কিংবা আমার সন্তানের প্রতি বিন্দুমাত্র অবজ্ঞা অবহেলা করেছো তাহলে তার ফল এর চেয়েও খারাপ হবে। এটা ইশতিহার মির্জার প্রমিজ।”

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here