Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৯

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৯

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৯
সোহানা ইসলাম

” তোমরা বসো, আমি এক্ষুনি আসছি ”
বলেই রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন মারজিয়া বেগম। কিছু সময় পর হাতে করে একটা টিফিন কেরিয়ার আর বড় একটা থলে নিয়ে আসেন।
বড় থলেটা জাহেদের হাত দিয়ে বলেন–” একটায় পিঠে আর নারু আছে বাবা। আমি খেলার করেছি তখন তোমার এগুলো খুব ভালো লেগেছে। বেশি করে দিয়েছি সবাই খেয়ো কেমন। ”
হাত বারিয়ে থলেটা নেয় জাহেদ। একদিকে ভালো ও লাগছে আবার কেমন লজ্জা ও করছে তার। এখন মনে হচ্ছে তখন তেমনটা না করলেই ভালো হতো।
মারজিয়া বেগম টিফিন কেরিয়ার টা জিনিয়াকে দিয়ে বলেন –” এটাতে তোমার বড় ভাইয়ার জন্য খাবার আছে। নিয়ে যাও। সেতো আর আসনি তাই অল্প কিছু খাবার দিয়েছি। ”
মায়ের এমন আদিক্ষেতা করতে দেখে মুখ বাঁকায় জারা। ওই শয়তান লোকটা কে কেনো খাবার দিতে হবে তার মায়ের। ওই লোকটা যে তার মেয়েকে নির্লজ্জ বলছে সেকি তা যানে। জানলে হয়তো কখনোই এমন সুন্দর করে খাবার দিতো না।
জিনিয়া টিফিন কেরিয়ার টা নিয়ে বলে —

” ধন্যবাদ আন্টি। এখন তাহলে আমার আসি। ”
” আন্টিকে ধন্যবাদ দিচ্ছো বোকা মেয়ে? আমি কিন্তু খুব রাগ করছি তোমার উপর। ” রাগী রাগী ভাব নিয়ে কথাটা বললেও, আবার হেঁসে উঠেন মারজিয়া বেগম।
জিনিয়াও মিষ্টি এক টা হাসি দিয়ে বলে –” আচ্ছা আর ধন্যবাদ দিব না আন্টি। এখন যাই। জারা তোমারা তিনজন কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের সাথে দেখা করতে আসবে কেমন। ”
জিনিয়া ওদের তিনজন কে শুধু যাওয়ার কথা বলায় মুখ ফুলিয়ে জোহান বলে–” আমাকেই কেউ যাওয়ার কথা বললো না। ”
জোহান অভিমান করছে বোঝতে পেরে জিনিয়া জোহানের গাল টেনে বলে –” ওরে আমার হিরো ! তুমি রাগ করেছো ?? তুমি ও যাবে তোমার আপুদের সঙ্গে ঠিক আছে। ”
জিনিয়া তাকে হিরো বলায় না পারে একটা লুঙ্গি ডান্স দিতে। কী যে খুশি হয়েছে সে তা ওর চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে জিনিয়া কোমড় জরিয়ে ধরে জোহান বলে —” হিরো এখন নিশ্চয় যাবে কোউটি গার্ল এর সাথে দেখা করতে। ”

__ হিরো না ছাই? একেবারে ভিলেন হয়ে আমাদের মাঝে ঢুকে পরেছে এই ব্যাটারি। আমিই আজ পর্যন্ত ছুয়ে দেখলাম না আর এই এসে জরিয়ে ধরছে তার চাঁদ সুন্দরী কে। মনে মনে কথা গুলো বলে জোহানের গুষ্টি শুদ্ধো করছে রোহান।
” আচ্ছা আপু তোমার সবাই কিন্তু আবার আসবে আমাদের বাড়িতে। লজ্জা পাবে না এটা কিন্তু তোমার বোনের বাড়ি, মনে থাকবে? বললো জারা”
” আচ্ছা ঠিক আছে বলেই বাড়ির বাইরের দিকে হাঁটা দেয় সবাই। জারা, মিম আর ফিহা তাদের গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসে। যাওয়ার আগে জাহেদ সুযোগ বোঝে ফিহার কানে কানে বলে—” আসছি ? আর ধন্যবাদ আমাকে লজ্জায় পরার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কটকটি। ”
ফিহা কিছু বলে না শুধু মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে মিমদের সাথে। তার আজ জাহেদের দিকে তাকালেই কেনো জানি লজ্জা করছে। জারা আর মিম পুরো কথা শুনতে না পারলেও ধন্যবাদ টা শুনেছে।

” কী ব্যাপার জানু ? ধন্যবাদ, ধন্যবাদ ? ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে জারা।
” যার সাথে দেখা হলেই তোর সাথে ঝগড়া বেদে যায় সে আজ তোকে ধন্যবাদ দিলো?এখন বল তোকে ধন্যবাদ কেনো দিলো ভাইয়া? “জানতে চাইলো মিম ”
দুই বান্ধবী কে এমন গোয়েন্দাদের মতো জেরা করতে দেখে লজ্জায় আরও যেনো মিইয়ে গেলো ফিহা। না চাইতেও তার যেনো লজ্জা আরও বেরে যাচ্ছে। জারা’র বাহুতে চাপড় মেরে বলে–” ধ্যাত ভালো লাগে না। আমি কী করে যানব ধন্যবাদ কেনো দিলো আমার ওই জাহেদ খান? ”
____ হুম এখন ভিতরে চল তারপর তোর ক্লাস নিব আমরা __বললো মিম ”

রোহান আর জিনিয়া পাশাপাশি হাঁটছে। কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে না।তাদের মাঝে চলছে গভীর নীরবতা। জাহেদ জেরিনের হাত ধরে রোহান দের সামনে হাঁটছে। রোহান বার বার তার চাঁদ সুন্দরী কে আড়চোখে দেখছে। ভালোবাসার মানুষ কে লুকিয়ে দেখার মজাই আলাদা। রোহান জিনিয়া কে লক্ষ করছে, সে টিফিন কেরিয়ার টা একবার এ হাত তো, একবার ওহাত। একটানা অনেক টা সময় টিফিন কেরিয়ার বহন করায় হয়তো হাতে ব্যাথা করছে তার। কষ্ট করবে তারপর ও মুখ ফুটে তাকে বলবে না এই মেয়ে। তাই রোহান নিজেই নিরবতা ভেঙ্গে বলে–
” ওই টা আমার হাতে দাও ”
জিনিয়া হাঁটার তালে থাকায় রোহানের কথা ভালো করে লক্ষ করেনি। শুধু বোঝতে পেরেছে
রোহান তাকে কিছু বলেছে? তাই না বোঝার মতো করে বলে —” কী ?? কিছু বলেছেন আপনি?? ”
” হুম বলছি, ওই টিফিন কেরিয়ার টা আমার হাতে দাও। ”
” না থাক! আমি পারব নিতে। ”
” বেশি পাকামো করো না? দাও ওইটা আমার কাছে ”
জিনিয়া আর কথা না বাড়িয়ে টিফিন কেরিয়ার টা রোহান কে দিয়ে দেয়।
কিছু সময় পর তারা সবাই বাড়িতে পৌঁছে যায়। বাড়ির ভিতরে এসে রোহান গলা ছেড়ে ডাক দেয় আরমান কে।

” আরমান… এই আরমান! ”
রোহানের এমন গলা ছেড়ে ডাক শুনে আরমান বোঝাতে পারে তারা চলে চলেছে। কিন্তু এমন ষাঁর এর মতো চেঁচানো কী আছে । তারা যে রাষ্ট্র উদ্ধার করে এসে তার সিগনাল দিচ্ছে মন হচ্ছে আরমানের কাছে। আরমান না খেয়েই শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। বেড থেকে উঠে চলে আসে রুমের বাহিরে। ভ্রু কুঁচকে তাকায় সবার দিকে। রোহান আর জাহেদের হাতে এগুলো কী? এগুলো কী যানার জন্য রোহানকে জিজ্ঞেস করে –” এগুলো কী তোদের হাতে? যাওয়ার সময় তো খালি হাতে গেলি এখন বরা হাতে ফিরলি কীভাবে? রাস্তায় বসে আবার ভিক্ষে করিস তো তোরা দুইটা?? ”
” হুম ভিক্ষে করেই এনেছি তোর জন্য খাবার। নে ধর। “টিফিন কেরিয়ার টা আরমান এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে রোহান।

” খাবার মানে? ”
জাহেদ এবার কিছু টা বেঙ্গ করে বলে –” হ্যাঁ খাবার ! আমাদের তো আর তোমার মতো না হওয়া শশুড় বাড়ি নেই যে খাবার দিবে?? ”
জাহেদের কথায় পাওা দিলো না আরমান। রোহানের দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকায়।
” আরে ভাই এগুলো তোর শাশুড়ী পাঠিয়েছে। মানে জারা’র আম্মু । ” বললো রোহান
” এই খাবার গুলো আমার জন্য পাঠিয়েছে?? কিন্তু তিনি তো আমায় চিনেও না ঠিক করে। ”
” শুধু একবার শুনেছে আমাদের সাথে বড় ভাইও আছে। তুমি তো আমাদের সাথে যাওনি। তাই আন্টি তোমার জন্য খাবার পাঠিয়েছে। কী ভালো শাশুড়ী তোমার। জামাই না হওয়ার আগেই কেমন তোমার জামাই আদর করছে। ” বলল জাহেদ।
রোহান আর জাহেদ এর মুখ থেকে বার বার শাশুড়ী ডাক শোনা টা বোঝতে পারলো না জিনিয়া। এগুলো তো জারা’র আম্মু পাঠিয়েছে। তাহলে ওরা শাশুড়ী বলছে কেনো। মাথায় কিছু ঢুকছে না তার। বিষয়টা খোলাসা করে জানার জন্য জেরিন কে রুমে পাঠিয়ে দেয় জিনিয়া। রাতে অনেক হয়েছে তাই যেনো গিয়ে ঘুমিয়ে পরে।
” আচ্ছা তোমার বার বার শাশুড়ী বলছো কেন? এগুলো তো জারা’র আম্মু পাঠিয়েছে। ”
জিনিয়ার প্রশ্নে জাহেদ বলে –” হ্যাঁ সেটা ইতো বলছি। জারা’র আম্মু তো শাশুড়ী হয় ভাইয়ার। আর জারা’ আমাদের ভাবি। ”

বিস্তারিত দৃষ্টিতে তাকায় জিনিয়া জাহেদের দিকে। এসব কি বলছে তার ভাই। বড় ভাইয়া কবে জারাকে পছন্দ করে? সে তো কিছুই যানে না এসব। জারা তাদের ভাবি হয়ে গেলো আর সে জানতেই পারলো না। ছানাবড়া হয়ে যাওয়া চোখ নিয়ে জাহেদের দিকে তাকিয়ে জানতে চায় –” জারা আমাদের ভাবি হলো কবে ?? ”
” আরও অনেক দিন আগে। তুই অনেক ধেরী করে ফেলেছিস যানতে। চু চেট ”
জিনিয়া এবার আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলে –” ভাইয়া আমার কিন্তু জারাকে ভাবি বেশ পছন্দ হয়েছে। ”
বোনের কথা কোনো প্রতি উওর করলো না আরমান। শুধু বিনিময়ে মুচকি একটা হাসি দেয়।

রাত ১১ প্রায়। তিন বান্ধবী মিলে শুয়ে বসে গল্প করছে। গল্পের মেনই বিষয় হলো জাহেদ কেনো ফিহা কে ধন্যবাদ দিলো। এই নিয়ে ফিহার মাথা নষ্ট করে ফেলছে মিম আর জারা। ফিহাও কোনো কথা বলে পেরে উঠছে না তাদের সাথে। ফিহা যদি কিছু বলেও ঐটা তেও চেপ ধরে ওকে পঁচাচ্ছে। তাদের কথোপকথন এর মাঝে ফোন বেজে ওঠে। কার ফোন বাজে দেখার জন্য তিনজন মোবাইল হাতে নেয়। দেখে জারা’র ফোন বাজচ্ছে। জারা ফোনের স্কিনে তাকিয়ে হ্যাং হয়ে আছে। তাকে এতো রাতে এই শয়তান লোকটা কেন ফোন করছে? ফোন ধরছে না সে, শুরু তাকিয়ে আছে।
জারা ফোন রিসিভ করছে না দেখে ফিহা জারাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে –” এই জানু কলটা রিসিভ কর। বার বার কেটে যাচ্ছে তো?? ”
” জানু তুই এমন ভাবে মোবাইলের স্কিনে তাকিয়ে আছিস কেন?? কে কল করেছে তোকে?? ” জানতে চাইলো মিম ”
জারা তাদের দুইজনের দিকে ফোনটা বারিয়ে দিয়ে বলে —” ও..ও-ই শয়তান লোকটা ফোন করছে। ”
জারা’র কথা বোঝল না দুই জন। তাই ফিহা বলে –” কার কথা বলছি তুই? কোন শয়তান লোক? ”
” ও-ই আরমান খান ”
” মানে জিনিয়া আপুর বড় ভাই ?? ” অবাক হয়ে মিম বলে।
” হুম ”

জারা’র কথায় ফিহা হটাৎ করে উওেজিত হয়ে বলে –” তাড়াতাড়ি কল টা রিসিভ কর জানু। দেখ কোনো বিপদ হলো না তো আবার ওদের?? ”
ফিহার এমন করে উওেজিত হয়ে যাওয়া টা বিরক্ত কর মনে হলো মিম এর কাছে। বিপদ হলে আর ও আগেই ফোন দিতো নিশ্চয়। তারা তো সেই নয়টার দিকে বাড়ি চলে গেছে। তাই কপাল কুঁচকে ফিহার দিকে তাকিয়ে বলে–” তুই এতো উওেজিত হচ্ছিস কেন ? ”
ফিহা ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে –” না… আমি কেন জিওেজিত হব ?? জারা কল টা রিসিভ করে দেখ কী বলে ভাইয়া?? “”
কলটা বাজতে বাজতে টেকে গেলো এবার। জারা যে হাফ ছেড়ে বাঁচল। তার আর ওই শয়তান লোকটা সাথে কথা বলতে হবে না। কিন্তু তার ভাবনা কে ভুল প্রমাণ করে আবারও ফোন বেজে ওঠে।
জারা মনে মনে ভাবে
উফ! আবার এই শয়তান লোকটা ! হঠাৎ কেন ফোন দিল? ধরব না? কিন্তু যদি কোনো বিপদে পড়ে কল করে…?

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ১৮

(একটু থেমে) চল ধরেই ফেলি… বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে!
কলটা রিসিভ করে
জারা জড়ানো গলায় সালাম দেয়—”
আসসালামু… হ্যালো… মানে হায়ালাইকুম… ওহ না— আসসা… হেলাইকুম সালাম?? ”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here