রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৭
সোহানা ইসলাম
পরের দিন সকাল বেলা।মিম আর ফিহা জারা’কে অনবরত সরি জানু,সরি জানু বলেই যাচ্ছে। কিন্তু জারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাছে না।। যদি চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায় তো আর বেশি করে সরি বলতে থাকে। এবার আর সহ্য করতে পারছে না এদের সরি বলা।
__” চুপ করবি তোরা, আর কতো সরি বলবি? ”
__” কিন্তু জানু তুই তো রেগে আছিস আমাদের উপর। ” মন খারাপ করে বলে ফিহা।
__” ওই টা কালকের বিষয় ছিল, এখন এটা বাদ দে। তাড়াতাড়ি পা চালা কলেজের ধেরি হয়ে যাচ্ছে। ”
মিম আর ফিহা জারা’কে জড়িয়ে ধরে বলে–” থ্যাঙ্কস জানু! উম মা।'”
এ. কে. খান. বড় মাঠের সামনে বেশ কিছু বিদেশি গাড়ি দাঁড়িয়ে। বড় বড় ব্যানার, কিছু মানুষ স্যুট-প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, একগুচ্ছ লোক মোবাইল কানে নিয়ে ব্যস্ত।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে—ফর্মাল ড্রেসে, চোখে গম্ভীরতা আর কাঁধে দায়িত্বের ছাপ নিয়ে—আরমান।হাতজোড়া পেছনে রাখা, সামনে ক্লায়েন্টদের নিয়ে জায়গা ঘুরে দেখাচ্ছে।
— “This is where we plan to build the solar hub. The locals are enthusiastic, and we aim to involve the community directly…”
তার গলার স্বর বদলে গেছে—মার্জিত, দৃঢ়, পুরোপুরি পেশাদার।
ওদিকে জারা আর তার দুই বান্ধবী কলেজের ইউনিফর্ম পরে ঘাটের দিকে যাচ্ছিল। জারা’র হঠাৎ চোখে পড়ল আরমানকে। মিম আর ফিহাও আরমানকে লক্ষ করে।
কিন্তু ফিহার চোখ আটকে যায় জাহেদের দিকে। কী হ্যান্ডসান লাগছে ফর্মাল ড্রেসাপে। ঘুমের ঘোরে জাহেদকে হিজরা বলার পর থেকে আর সে জাহেদের ফোন তুলেনি। প্রেম হওয়ার আগেই সে তাকে হিজরা বানিয়ে দিল, এই লজ্জায় সে কোথায় লুকাবে? ”
জারা আরমানকে এমন ভাবে আগে কখনো দেখেনি—পেন্ট-শার্ট, টাই, কপালের একপাশে সানগ্লাস তুলে রাখা, মুখে চাপা আত্মবিশ্বাস।
জারা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
না চাইতেও মন বলে উঠে — “উফ… কি সুইট লাগছে…” মনে মনে বলেই নিজের গাল টিপে নেয়, যেন নিজেকে থামাতে চায়।
ঠিক তখনই আরমানের দৃষ্টি জারার দিকে পড়ে। মাত্র এক সেকেন্ড। শুধু একবার চোখে চোখ।
আর তার পর…আরমান ধীরে মাথা ঘুরিয়ে নেয়, ক্লায়েন্টদের দিকে তাকিয়ে ফের ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে।
— “If you follow me this way, I’ll show you the tech center’s foundation plan…”
ভেতরে কোথাও একটা খচখচ করে উঠল।
“আমাকে দেখল… কিন্তু কিছু বলল না কেন? ”
তবুও সে হাসল। ছোট্ট একটা, নিজেকে বোঝানোর মতো হাসি। এখন ব্যস্ত। কলেজগামী মেয়েদের দিকে তাকানোর সময় কই!”
দুই দিন হয়ে গেছে জারা আর আরমানের দেখা নেই। তাদের শেষ দেখা হয়েছিল যেদিন সুইট বয় সেজে বিদেশি মানুষদের তাদের নতুন কোম্পানির তৈরির কাজ দেখাচ্ছিল । তখন আরমানের চোখে-মুখে অন্যরকম আলো ছিল। কিন্তু সেই আলো এখন জ্বলে-পুড়ে ধোঁয়া হয়ে গেছে।
আরমানের মাথায় রাগ জমে আছে। কারণও আছে—তিন দিন আগে সে যে চিঠিটা লিখেছিল, সেটায় ছিল তার মনের গভীর কথা। সে চেয়েছিল জারা সেটা পড়ে বুঝুক, সে কী অনুভব করে।
কিন্তু চিঠি দেওয়ার পরও কোনো উত্তর নেই। জারা এখন ব্লক খুলেনি। কিন্তু আরমান ভাবে একবার অন্য নাম্বার দিয়ে ফোন করবে? কিন্তু না। অহংকার তাকে বাঁধা দিচ্ছে। কিন্তু মনের ভেতরে ঝড়—বেয়াদব মেয়ে, সে কি চিঠি পড়েনি? না কি ইচ্ছে করেই উত্তর দেয়নি?
কোম্পানির নতুন ব্রাঞ্চের কাজ নিয়েও সে দম ফেলার সময় পায় না। কিন্তু তবুও সুযোগ পেলেই মোবাইল নিয়ে চেক করে—জারা ব্লক খুলেছে কি না ? না।এখনও ব্লক খুলেনি। আরমানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। সেই হাসি রাগের, অভিমানের, আর গভীর টানের মিশ্রণ। কিছু বললেই আগে জিজ্ঞেস করে, আমি কে? এই কথা যেনো ঠোঁটের সামনে এসে থাকে। আমি কিছু বললেই ফট করে বলে দেয় বেয়াদব মেয়ে।
— আজ বোঝাব আমি কে?
দুপুর ২টা। কলেজ ছুটি। মিম আসেনি আজ—সর্দি-জ্বর। জারা আর ফিহা নদী পার হয়ে নৌকায় বসেছে।
ফিহা বলল,— “শোন, তুই আজ আবার গুমসুম কেন । কিছু হয়েছে?”
জারা কেমন চুপচাপ। মিহি কন্ঠে বলে— “কিছু হয়নি।”
ফিহা হেসে বলল,— “তুই এখনো ওই চিঠির বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে আছিস?”
…..জারা চুপ…..
নৌকা থেকে নেমে তারা বড় রাস্তায় উঠছে, এমন সময় তাদের সামনে এসে দাঁড়াল একজন।জাহেদ! লম্বা-চওড়া গড়ন, কালো সানগ্লাসে ঢাকা চোখ, মুখে কৌতুকের হাসি।
— “ভাবি, ভালো আছো?”
জারা থমকে গেল। ভাবি? সে তো কলেজের ছাত্রী!
ফিহা অবাক,— “আপনি কাকে ভাবি বলছেন?”
ছেলেটা সানগ্লাস নামাল। হেসে বলল,
— ” তোমার বান্ধবী, আর আমার ভাবি।”
জারা বিরক্ত হয়ে বলল,— ” জাহেদ ভাইয়া আপনি আমাকে ভাবি বলছেন কেন?”
— “ভাবি হও তো কি বলব। আচ্ছা এসব বাদ দাও ভাইয়া তোমাকে যেতে বলেছে।”
জারা কপাল কুঁচকালো,— “কোন ভাইয়া?”
— “আরমান ভাইয়া।”
এই নাম শুনে জারার বুকের ভেতর ধাক্কা খেল।
জাহেদ ধীরে বলল,— “ভাইয়া বলেছে, তোমাকে মাঠের বড় আমগাছটার কাছে যেতে। এখনই।”
জারা চোখ বড় বড় করে তাকাল,— “আমি যেতে পারব না।”
— “যেতে হবে। ভাইয়া বলছে এখনই যেতে, না গেলে রাগে যাবে ।”
ফিহা ততক্ষণে গম্ভীর হয়ে গেছে। জাহেদ আবার হেসে বলল,— “তুমি গেলে ভালো হবে ভাবি, নয়তো তোমার সাথে আমাকেও আস্ত রাখবে ভাইয়া।”
ফিহা রেগে গিয়ে বলল,— “এই! আপনি কে হুমকি দেওয়ার? জারাকে কেউ জোর করে নিয়ে যাবে না।”
জাহেদ এক মুহূর্ত ফিহার দিকে তাকাল। সেই চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক। ফিহা বুঝল না—কিন্তু জাহেদের ভেতরে অন্যরকম অনুভূতি। সে ফিহার প্রতি দুর্বল এটা যেনোও ফিহা তাকে পাওয়া দিচ্ছে না ,এই কটকটি মেয়ে তার মাথা নষ্ট করে ফেলেছে। এটাকেও মজা দেখাতে হবে, কিন্তু আজ সেটা দেখানোর সময় নয়।
— “শান্ত হও, ফিহা। তোমার বান্ধীর কোনো ক্ষতি হবে না।”
কথার মাঝেই জাহেদর ফোন বেজে ওঠে। সে ফোন বের করে কল করল,— “হ্যাঁ ভাইয়া, আনছি।”
কথা শেষ করেই জারার দিকে তাকাল,— “চলো।”
ফিহা জারার হাত চেপে ধরল,— ” জারা যাবে না । আপনি সরুন আমাদের সামনে থেকে। ”
জাহেদ হালকা হেসে বলল :— ” বেশি পাকামো করো না কটকটি, তোমার বান্ধবীর এখন যাও দরকার। তোমার বরং আমার সাথে এসো। ”
জারা রাগ নিয়ে বলে —” আমি যেতে চাই না মানে যেতে চাই না, ব্যাস। আমি এখন বাড়ি যাব। ফিহা চল। ”
ফিহার হাতে ধরে চলে যেতে চাইলে জাহেদ তাদের রাস্তা আটকিয়ে অসহায় ফেইস নিয়ে বলে —” প্লিজ একবার চলো! নিজের জন্য না হোক, আমাকে বাঁচানোর জন্য হলেও চলো প্লিজ? তুমি না আমার হাফ ইঞ্চি ভাবি হও। ”
জাহেদ তাকে বার বার ভাবি বলায় যেন আরও রাগ লাগছে জারা’র। চোখ রাঙ্গিয়ে বলে –” আমাকে আপনার কোন দিক দিয়ে ভাবি মনে হচ্ছে? আমি আপনার কোন ভাইয়ের বউ শুনি? ”
জাহেদ দাঁত কেলিয়ে বলে —” আমার ভাইয়ার বউ তুমি? এখন চলো প্লিজ! ”
দুপুরের রোদ হালকা লালচে। মাঠের বিশাল আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে আরমান। সাদা শার্টের হাতা গোটানো, চোখে সানগ্লাস। ঠোঁটে তীক্ষ্ণ রেখা।দূর থেকে আসতে থাকা জারাকে সে দেখল। জাহেদ তাকে এনে থামাল গাছের সামনে।
— “ভাইয়া, কাজ শেষ।”
আরমান হালকা মাথা নাড়ল। জাহেদ সরে গেল, তবে দূরে দাঁড়িয়ে রইল—চোখ ফিহার দিকে।
জারা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর তীব্র ধকধক শব্দ। সাহস করে উপরে তাকাতে পারছে না।
আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। পায়ের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে যেন। থেমে দাঁড়িয়ে সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,— “দুই দিন। পুরো দুই দিন।”
জারা চুপ।
— “দুই দিন ধরে আমি পাগলের মতো অপেক্ষা করলাম। একটা উত্তর না, একটা ইঙ্গিত না। আমি কি ভিখারি নাকি? ব্লক খুলোনি কেন? “”
জারা মাথা নিচু করেই বলল আস্তে,
— “আমি… আমি চিঠি ”
আরমান হেসে ফেলল—কিন্তু সেই হাসিতে ব্যথা আর তীব্র রাগ মিশে আছে।
— “কী আমি, আমি করছো ?চিঠিটা পড়েছো? না কি ইচ্ছে করেই পাত্তা দাওনি?”
জারা কিছু বলল না। নীরবতা যেন বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
আরমান হঠাৎ এক পা এগিয়ে এসে জারার বাহু ধরে টেনে কাছে নিল। তার কণ্ঠ গর্জে উঠল,
— “চুপ করে আছো কেন? উত্তর দাও!”
জারা কেঁপে উঠল। তবুও কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু।
এই চুপচাপ আচরণ যেন আরমানের মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল। সে জারার বাহু শক্ত করে ঝাঁকাতে লাগল।— “আমি তোমার সঙ্গে মজা করছি নাকি, মানজারা? দুই দিন ধরে আমি কেমন ছিলাম জানো? চিঠি পড়েছো কি না সে-ই টা বলো !”
ঝাঁকুনির ধাক্কায় জারার চোখ ভিজে উঠল। মুখে তীব্র যন্ত্রণা। তবুও সে কিছু বলল না।
হঠাৎ জারার বুক ফেটে গেল। সে তো চিঠি টা পরতে পারে নি। কিন্তু এত রাগ, এত অপমান, এত চেপে রাখা কষ্ট—আর সহ্য হলো না। এই লোকটা কোন অধিকারে তার শরীরের স্পর্শ করেছে? সে হঠাৎ হাত তুলে একটা জোরে চড় মারল আরমানের গালে। –” আপনি কে? কে আপনি, এতো সাহস কী করে হয় আপনার, আমায় গায়ে হাত দেওয়ার।অসভ্য, শয়তান লোক। কোনো অধিকারে যখন তখন আমার সাথে এমন করেন?
পাখিরা হঠাৎ উড়ে গেল গাছ থেকে। বাতাস থমকে গেল।
আরমান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তার চোখের ভেতর এমন আগুন জ্বলে উঠল যা ভাষায় বোঝানো যায় না। ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল, চোয়াল কেঁপে উঠছে।
সে ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে জারার দিকে তাকাল। তার চোখে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যে কেউ দেখলে শিউরে উঠবে।
এক মুহূর্তে সে জারার চোয়াল চেপে ধরল। এত শক্ত করে যে জারা ব্যথায় কেঁদে ফেলল।
— “আমাকে চড় মারার সাহস হলো কী করে তোর?”
জারা হাত দিয়ে চেষ্টা করল তার হাত ছুটাতে।
— “ছা ছারোন… প্লিজ ছাড়োন… ব্যথা লাগছে!”
কিন্তু আরমানের হাত একটুও শিথিল হলো না। তার গলার স্বর গম্ভীর, তীব্র, আর ভয়ংকর শান্ত,
— “তোর ধারণা আছে , আমি যখন রাগ করি তখন কী হয়।”
জারা মরিয়া হয়ে হাত দিয়ে চেপে ধরল তার কব্জি, কিন্তু কোনো ফল নেই। তার গাল লাল হয়ে গেছে। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
আরমান একদম কাছে ঝুঁকে বলল,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৬
— “আমার ধৈর্য নিয়ে খেলা করা ভুল হয়েছে তোর। আজ আমি বোঝাব, আমি কে। কি অধিকার আছে আমার? ”
বাতাসে যেন হাহাকার। জারা কাঁপছে। তার হৃদস্পন্দন এত জোরে বাজছে যে শব্দটাও শোনা যায়।
