Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩০

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩০

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩০
সোহানা ইসলাম

সকাল ১০টা।
রোহানের চোখ ধীরে ধীরে। মাথাটা যেন পাথর হয়ে আছে, গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখ মেলে প্রথমেই বুঝতে পারল শরীরের প্রতিটা অস্থি টনটন করছে। বিছানার চাদরের উপর নিজের হাত সরানোর চেষ্টা করতেই একটা অদ্ভুত টান পড়ল।
ভ্রু কুঁচকে সে মাথা উঁচু করল।
তার হাত… কারো হাতে আটকে আছে।
রোহানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সাদা পাতলা পর্দার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো এসে পড়েছে সেই মেয়েটার মুখে।

” চাঁদ সুন্দরী ”
রোহান যেন কয়েক সেকেন্ড শ্বাস নিতে ভুলে গেল। জিনিয়া মাটিতে গদি পেতে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু তার হাত শক্ত করে ধরা রোহানের হাতে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়ে আছে, ঠোঁট হালকা খোলা। মুখে অদ্ভুত ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেও কোমল শান্তি।
“এখানে… জিনিয়া?” রোহান বিড়বিড় করে বলল। কীভাবে… কেন…? জাহেদ কোথায়?
মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করল।
রোহান হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। কোনো বাঁধা নেই, তবু তার মনের ভেতর অদ্ভুত কিছু টেনে ধরছে।
সে আস্তে করে জিনিয়ার মুখের ওপর পড়া চুলগুলো সরিয়ে দিল। আঙুলের ডগায় চুলের স্পর্শ পেয়ে তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত হাল্কা শিহরণ জাগল।
আর তখনই… কাল রাতের স্মৃতি তার মাথায় হানা দিল।
ফ্ল্যাশব্যাক

রাত ৩ টা, ঘর অন্ধকার। শুধু জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় রোহানের ঘর ম্লান আলোয় ঢাকা। বিছানায় শুয়ে রোহান কাঁপছে। তার শরীর জ্বরে পুড়ছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
সে একবার উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু মাথা ঘুরে গেল। ঠোঁট কামড়ে সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
কী হবে এখন? আরমানের শরীরও খারাপ,। কাউকে ডাকার মতো শক্তি তার নেই। পাশে শুয়ে আছে জাহেদ? মোবাইলটা পাশে আছে,? কিন্তু…
রোহান চোখ বুজল। শরীরের ভেতর জ্বালা, মাথার ভেতর যেন আগুন জ্বলছে।
তারপর শেষমেশ অনেক কষ্ট করে জাহেদ কে ডাক দেয়।
__ ” জা জাহেদ ”
উঠলো না সে। তাই আরও কয়েক বার ডাকে।
রোহানের এমন কাতর কন্ঠ শুনে ধরফরিয়ে উঠে বসে জাহেদ। রুমের লাইট অন করে এসে রোহানের দিকে তাকায়। রোহানের দিকে তাকিয়ে জাহেদ আঁতকে উঠে। চোখ, মুখ কেমন হয়ে আছে। জাহেদ চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল

___“রোহান ভাইয়া ? এই কী হয়েছে ? তোমার চেহারা এই রকম কেন?”
রোহান কষ্টে হাসল।
__“জ্বর… আর কিছু বলতে পারলো না। বিছানায় নেতিয়ে পড়ে রোহান।
রোহানের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যায় জাহেদ। এখন সে কি করবে? কীভাবে সামলাবে রোহান ভাইয়া কে?রোহান কে ধরে সে বিছানায় ভালো করে শুইয়ে দিল। তার শরীরে হাত দেওয়া যাচ্ছে না জ্বরের তাপে।
“আল্লাহ! তোমার গাঁ জ্বরে আগুনের মতো গরম হয়ে আছে । তুমি শুয়ে থাকো, আমি এক্ষুনি আসছি ।”
রোহান কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু জাহেদ তার কথা শুনল না। হন্তদন্ত হয়ে রুম থেকে বের হয়ে জিনিয়া কে ডাকে। আরমান কে ডাক দিতে গিয়েও দেয় না জাহেদ। হয়তো বড় ভাইয়ার শরীর ক্লান্ত বেশি। একটু পর জিনিয়া কে নিয়ে ফিরে এল।
রোহানের এই অবস্থা থেকে জিনিয়া কান্না করে দেয়। কয়েক ঘন্টার মধ্যে কি হয়ে গেছে মানুষ টা। মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। বিছানার দিকে এগিয়ে এসে রোহানের কপালে হাত রেখে জ্বর পরীক্ষা করে। রোহানের শরীরে হাত রাখা যাচ্ছে না। চোখে অশ্রু নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জাহেদ কে বলে___” ভা ভাইয়া আমাকে এক বালতি পানি এনে দিবে? ”
জাহেদ বোনের কথায় বিনাবাক্যে পানি আনতে চলে যায়। ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছার কারণে রোহান কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঠান্ডা পানির ছোঁয়া যেন আগুনের মধ্যে হাওয়া। রোহান হালকা শ্বাস ফেলে চোখ মেলার চেষ্টা করল।
রোহান ঠান্ডা পানি সহ্য করতে পারছে না বলে আবার জিনিয়া বলে__“জাহেদ ভাইয়া, একটু গরম পানি নিয়ে আসবে?উনি ঠান্ডা পানি সহ্য করতে পারছে না ।”

__ “ঠিক আছে।”
জাহেদ পানি আনতে গেল। জিনিয়া আস্তে করে তোয়ালে ভিজিয়ে রোহানের গলা, কপাল মুছিয়ে দিল। হাতের স্পর্শ পেয়ে বোঝাতে পারে এটা কে হতে পারে। তার হাতের স্পর্শে রোহানের বুকের ভেতর কেমন শান্তির স্রোত বইতে লাগল।
__“চোখ খুলোন রোহান ভাই ?” জিনিয়া আস্তে বলল।
জিনিয়ার কথা শুনেছে সে, কিন্তু চোখ খুলতে পারছে না।
জাহেদ গরম পানি আনলে আবারও সুন্দর করে রোহানের শরীর মুছিয়ে দেয় সে। ওষুধ খাইয়ে দিয়ে জিনিয়া তার গায়ে ব্ল্যাস্কেট টেনে দেয় । শরীরের জ্বরটা কিছুটা কমল।
__“আপনি ঘুমান।” জিনিয়া আস্তে বলল।
রোহান বহু কষ্টে মিহি কন্ঠে বলে
__ “তুমি…চলে যাও ?”
__“ না। আমি যাব না! ”
জাহেদ পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু চোখে ঘুম ভর করেছে। জিনিয়া সেটা টের পেয়ে বলল,

__“তুমি বরং জেরিনের সাথে ঘুমাও। আমি থাকছি।”
__“ কিন্তু…”
__“প্লিজ ভাইয়া।”
জাহেদ আর কিছু না বলে চলে গেল।
ঘরে শুধু রোহান আর জিনিয়া। রাতের নীরবতায় শুধু ভেজা তোয়ালে পানিতে ডোবানোর শব্দ।
জিনিয়া বারবার ভেজা কাপড় বদলাচ্ছে, রোহানের কপালে হাত রাখছে। তার হাতের স্পর্শে কেমন ঠান্ডা লাগছে, যেন জ্বরের উত্তাপ চুরি করে নিচ্ছে।
__“তুমি চ’চলে যাও! এত কষ্ট করতে হবে… আমার জন্য…” রোহান ফিসফিস করল।
__“ চুপ। কথা বলবেন না।” শক্ত একটা ধমক দিলো জিনিয়া!
সারারাত জিনিয়া জেগে থাকল। কপালে হাত, শরীর মুছিয়ে, ঠান্ডা পানি বদলে। যখন রোহানের জ্বর একটু কমল, তখনই তার চোখের ভারে জিনিয়ার মাথা নুয়ে এল। হাতটা শক্ত করে রোহানের হাতে রেখেই সে ঘুমিয়ে গেল।

~ বর্তমান ~
রোহান কিছুক্ষণ জিনিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। চোখের নিচে হালকা কালো দাগ পড়েছে—সারারাত জেগে থাকার প্রমাণ। তার বুকের ভেতর হালকা কষ্টের ঢেউ উঠল।
এই মেয়েটা সারারাত জেগেছে… শুধু আমার জন্য। কিন্তু আমার জন্য কেন এতো কষ্ট করলে তুমি? তুমি তো আমায় ভালোবাস না চাঁদ সুন্দরী?
হাত ছাড়াতে গিয়েও পারল না। মনের ভেতর অদ্ভুত টান। উল্টো আঙুলের ডগা দিয়ে জিনিয়ার চুলের গোড়া ছুঁয়ে দিল। চুলের গন্ধ তার নাকে এল, হালকা শ্যাম্পুর মিষ্টি সুবাস।
রোহান নিজেকে সামলাতে পারল না, ফিসফিস করে বলল,
“ধন্যবাদ, চাঁদ সুন্দরী …”
তার শব্দে হয়তো নড়েচড়ে উঠল মেয়েটা। চোখের পাপড়ি কাঁপল, তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল। হালকা ঝাপসা চোখে রোহানের দিকে তাকাল।

__“ আপনি… জেগে গেছেন ?” কণ্ঠস্বর কর্কশ, সারারাত না ঘুমানোর ক্লান্তি স্পষ্ট।
রোহান মৃদু হাসল।
__“হ্যাঁ… কিন্তু তুমি এখানে কেন ?”
জিনিয়া হালকা চোখ পাকাল,
__“জ্বর ছিল আপনার । আমি না থাকলে কে থাকবে ? এখানে আর কে আছে? ”
রোহান কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর যেন কিছু গলগল করছে।
__“তুমি সারারাত… জেগেছ আমার জন্য ?”
জিনিয়া ঠোঁট কামড়াল।
__” হু হুমম! ”
উঠে বসল জিনিয়া। নিজের হাতের ওপর হাত রেখে টের পেল কেমন ব্যথা করছে। রাতভর তো হাত নাড়িয়েছে, তোয়ালে চিপেছে।
রোহান হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরে ফেলল।

__“তোমার হাত লাল হয়ে গেছে।”
__“ও ও , কিছু না।” জিনিয়া হাত ছাড়াতে চাইল,
কিন্তু রোহান শক্ত করে ধরে রাখল।
__“আমার জন্য এত কষ্ট কেন করলে? আমায় তো ভালোবাস না তুমি? তাহলে? দয়া করে এই মা মরা ছেলেকে সেবা করতে এসেছো?”
‘মা’ মরা ছেলে ‘ কথা টা শুনে জিনিয়ার কলিজায় টান লাগে। বুক টা মুচড় দিয়ে উঠে। সে তো দয়া দেখাতে আসেনি। জিনিয়া হালকা রাগী গলায় বলল,
__“ চুপচাপ বসে থাকেন। আমি জাহেদ ভাইয়া কে দিয়ে খাবার আর ঔষধ পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
রোহান হালকা হেসে বলল,
“ এতো চিন্তা করতে হবে না ? তুমি তো সারারাত করেছো অনেক আমার জন্য ।”
__“হ্যাঁ, করবো। আপনার এখনো জ্বর আছে।”
সে উঠে গেল। রোহান তার পেছনের দিকে তাকিয়ে রইল। হালকা সাদা কটন কুর্তি, চুল খোলা, ক্লান্ত অথচ মায়াবী মুখ। রোহান মাথা ঠুকল বিছানায়। “তুমি কেন এত আলাদা জিনিয়া? আমার ভালোবাসা কেন গ্রহন করছ না তুমি?খুব কষ্ট হয় তোমার জন্য এই বুকটায়। কেন তোমার জন্য আমার বুক কেঁপে ওঠে বারবার? মনে মনে কথা গুলো বলে রোহান।

বিকেল ঠিক ৪টা। আরমান আর জাহেদ নতুন কোম্পানির কাজকর্ম কেমন চলছে তা দেখতে একসাথে বের হয়। রোহানও তাদের সাথে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু আরমান তাকে নিয়ে আসনি। শরীর তার এমনিতেই ঠিক নেই, একদিনের জ্বর ওকে একেবারে জব্দ করে ফেলেছে। আরমান তাই রোহান কে রেস্ট নিতে বলে এসেছে। জিনিয়া কেও বলে এসেছে, যেন রোহানের দিকে খেয়াল রাখে। কিছু প্রয়োজন হলে যেন এগিয়ে দেয়।
দু’জনেই হালকা কথাবার্তায় মেতে উঠে মাঠের ভেতর অনেকটা দূর চলে যায়, খেয়ালই করে না যে চারপাশে কেমন ফাঁকা।
হঠাৎ করেই পিছন দিক থেকে এক তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা যায়—
“আমার বনুর শখের খরগোশ!”
দু’জনই থমকে দাঁড়ায়, অবাক দৃষ্টিতে একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে সামনে ঘুরে চিৎকারের উৎসের দিকে চোখ পড়ে।
দেখে, তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট বাচ্চা ছেলে। মুখে অস্থিরতা, চোখে পানি জমে উঠেছে।
আরমান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, কিন্তু ছেলেটিকে চিনতে পারে না। অথচ জাহেদের চোখে একরাশ বিস্ময় ভেসে ওঠে। সে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলে—

“এ তো…! জোহান ”
আরমান আর জাহেদ যখন কথার খেয়ালে ঠিক তখনই বিপদ ঘটে যায়। মাঠের ঘাসের ভেতর লাফাতে লাফাতে ছুটছিল সাদা রঙের ছোট্ট খরগোশটি। আরমানের পায়ের নিচে হঠাৎ করেই সেটা চলে আসে।
“ধপ!”
একটা চাপা শব্দ হয়। আরমান থমকে নিচের দিকে তাকায়। বুক কেঁপে ওঠে তার। খরগোশটা নিথর হয়ে পড়ে আছে মাটিতে।
আরমান স্তব্ধ হয়ে যায়—
“ওহ না…”
ওদিকে বাচ্চা ছেলেটা দৌড়ে আসে। তার মুখে আতঙ্ক, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়াচ্ছে। সে আর কিছু না ভেবে মাটিতে বসে পড়ে খরগোশটাকে বুকে তুলে নেয়।
“আমার বনুর…! তুমি…তুমি…”
তার কণ্ঠে কান্নার সাথে রাগও মিশে যায়।
হঠাৎ সে আরমানের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে আগুন—
“তুমি কেন করলা এটা?! তুমি আমার বনুর খরগোশ মেরে ফেললা!”
আরমান অবাক হয়ে হাত তুলে বোঝানোর চেষ্টা করে—

“শোন…শোনো, আমি ইচ্ছে করে করিনি। ও হঠাৎ পায়ের নিচে চলে এসেছিল।”
কিন্তু ছেলেটি কিছু শুনতে রাজি নয়। কান্না আর ক্ষোভে তার ছোট্ট মুখ লাল হয়ে গেছে।
“তুমি মিথ্যা বলতেছ! তুমি আমার বনুর শখের খরগোশ মেরে ফেলেছ ! আমি বনুর কাছে বিচার দিব !”
আরমানের গলা শুকিয়ে যায়। সে থেমে যায় কিছুক্ষণের জন্য। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জাহেদ সবকিছু দেখছে।
__”শুনো জোহান এটা ইচ্ছে করে করেনি ভাইয়া। এটা একটা দূর্ঘটনা। ” বলল জাহেদ
জাহেদ এর কথা শুনে আরমান এর মনে হলো সে এই বাচ্চা ছেলেটাকে আগে থেকে চিনে। তাই আরমান জাহেদের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকায়।
জাহেদ আরমান এর দৃষ্টি বোঝতে পারে। তাই বলে ___” আরে ভাইয়া এটা তোমার একমাত্র শালা! ”
আরমান অবাক হয়ে বলে ___” শালা? ”
__” হ্যা! ভাবির ছোট ভাই ও! ”
জাহেদের মুখে শুনে আরমান থমকে দাঁড়াল।
___“এই ছেলে… আমার একমাত্র শালা?”
চোখ সরু করে জোহানের দিকে তাকাল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বলল,
___“কান্না করো না শালাবাবু। এটা একটা দুর্ঘটনা।”
শালা শব্দটা কানে যেতেই জোহানের রাগে চোখ লাল। গলা উঁচু করে বলল,
___“কি?! তুমি আমাকে শালা বলে গালি দিচ্ছ?”
আরমান হতবাক,

___“গালি দিচ্ছি মানে? আমি তো শুধু বললাম তুমি আমার একমাত্র শালা।”
জোহান তেড়ে উঠল,
___“এই তো আবার বললে! গালি দিলা আবার!”
আরমান বিরক্ত হয়ে বলল,
___“গালি কই দিলাম? যা সত্যি তাই বললাম।”
জোহানের রাগ তখন আকাশ ছোঁয়া। চারটে খরগোশ ঝুড়িতে তুলল, এমনকি মরে যাওয়া খরগোশটাকেও। তারপর হঠাৎ সে করে বসল এক কাণ্ড—
আরমানের হাতে দাঁত বসিয়ে দিল!
আরমান চিৎকার দিয়ে উঠল,
____“আssssহ! এই ছেলে পুরো বোনের মতো! শুধু কামড় দেয়। সেদিন বোন কামড় দিলো, আজ ভাই কামড় দিল!”
আর খরগোশের ঝুড়ি নিয়ে জোহান দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল, চিৎকার করতে করতে—
____“ওও আম্মু গো! ওও বনু গো!”
আরমান হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তার পিছনে দৌড়াচ্ছে। জাহেদও ছুটল, কিন্তু হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
___“আমার বড় ভাইকে এই টুকু ছেলে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে!”
জোহানের চিৎকার শুনে মারজিয়া বেগম হকচকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
মাকে দেখে জোহান সাথে সাথেই বিচার চেয়ে উঠল,

___“আম্মু! ওই লোকটা বনুর খরগোশ মেরে ফেলছে! আবার আমাকে শালা বলে গালি দিছে!”
ঠিক তখনই হাপাতে হাপাতে আরমান আর জাহেদ এসে পৌঁছল। জোহান তার মায়ের পেছনে লুকিয়ে মুখ বাঁকাচ্ছে।
আরমান তাকাল মারজিয়া বেগমের দিকে। মনে মনে ভাবল,
“হুবহু জারার মতো দেখতে! ছোটখাটো মহিলা… মনে হয় জারার বড় বোন হইবে!”
তারপর হালকা লজ্জা নিয়েই বলল,
__“আপা… একটু সরে দাঁড়ান, আমি ওই ছেলের দাঁত ভাঙব!”
জাহেদের মাথায় হাত,!“হায় আল্লাহ! ভাইয়া নিজের না হওয়া শাশুড়িকে আপা বলছে!”
দৌড়ে এসে কানে কানে জাহেদ বলল,
__“ভাইয়া, এটা তোমার শাশুড়ি হবে, আপা না!”
আরমান জিভ কামড় দিল।
___“ ইন্না-লিল্লাহ! কি বলে ফেললাম!”
কিন্তু নিজের মনে ভাবল,
“দোষটা আমার না। জারার মতোই দেখতে তো তিনি। ছোট খাটো ! তাই তো বলি, আমার না হওয়া বউ হাফ ইঞ্চির মতো কেন?শাশুড়ি মা এমন ছোট হলে বউ তো ছোট হবেই!”
মারজিয়া বেগম সব শুনে ফেললেন। মুখে লজ্জার আভা ফুটল, কিন্তু প্রকাশ করলেন না। তিনি হঠাৎ জাহেদকে দেখে বললেন,

___“আরে বাবা, তুমি? কেমন আছো? তোমরা যে সেই গেলে, আর তো এলেই না।”
জাহেদ হেসে উত্তর দিল __” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন আন্টি??
মারজিয়া বেগম ও হেসে উত্তর দিলেন। কিন্তু তিনি জাহেদের পাশে থাকা ছেলে টাকে চিনতে পরছেন না।তাই তিনি আরমানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
__“ও কে বাবা?”
জাহেদ বলল,
__“উনি আমার বড় ভাই, আরমান খান।”

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ২৯

ঠিক তখনই জারা ঘর থেকে বের হয়ে আসে । চোখে মুখে ঘুমের ঘোর, চুলগুলো খোলা, পরনে লাল কুর্তি—গায়ে কোনো উরনা নেই।
চোখ কচলাতে কচলাতে এসে দাঁড়াল মায়ের পাশে।
জোহান তার বোনের কোমর জড়িয়ে ধরে চিৎকার করল,
___“বনু! তুমি জানো না, ওই লোকটা তোমার খরগোশ মেরে ফেলছে!”
এই কথার পর জারার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here