Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬ (২)
রুপান্জলি

অনন্যাকে আলাদা করে রুম দেওয়া হলেও সে বায়না ধরেছে পরশীর রুমে থাকবে বলে। পাশে ইরাদ থাকায় প্রথমে পরশী রাজি হয়নি। অনন্যা সিদ্বার্থের ফিয়ন্সি,, মেয়েটার হাতে এখনো জ্বল জ্বল করছে সিডের দেওয়া রিং। বিষয়টা নিশ্চয়ই ইরাদের ভালো লাগবে না? কিন্তু যখন অর্পনা এসে বললো অনন্যাকে সাথে রাখতে তখন আর মানা করতে পারলো না সে। পারশীর বিছানাটা কিং সাইজের হওয়ার দরুন খুব সহজেই চারজন এটে যায় তাই অনন্যা, পরশী, ইরাদ একসাথেই শুয়ে পরলো। বর্তমানে রুম জুড়ে পিনপতন নিরবতা বিরাজমান,, অনন্যা কানে ব্লুতুথ চেপে গান শুনছে,, অপরদিকে ইরাদ হয়তো কোনো কাস্টমারের সাথে কথা বলছে,,

ওপাশের কাস্টমারটি বোধয় টাইপিং কিংবা ম্যাসেজ করতে পারে না তাই কিছুক্ষণ পরপর নিচু স্বরে ভয়েজে কি রং হবে, কোন জায়গাটা হাইলাইট করতে হবে,, কোন জায়গায় নাম লেখা হবে,, নামের পাশাপাশি আর কোনো লেখা হবে কিনা সবটাই ঠিক ঠাক করে নিচ্ছে। এই দুজনার মাঝখানে শুয়ে থাকা পরশী বড্ড দোটানায় ভোগছে। আব্রাহাম বার বার ম্যাসেজ দিচ্ছে,, আজ থেকে নয় বহুদিন ধরেই এই ম্যাসেজের উৎপত্তি অথচ পরশী রিপ্লাই দিতে পারছে না। আবার মনে মনে তীব্র ভাবে অনুতাপের অনলে পুড়ছে সে। কাউকে এক তরফা ভালোবেসে দিনের পর দিন ম্যাসেজ, এফোর্ট দেওয়ার পরেও যদি ওপাশ থেকে কোনো রেসপন্স না আসে তখন যে ঠিক কতোটা যন্ত্রণা হয়। পারশীর থেকে ভালো আর কে জানে? আব্রাহামের ও নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে? হয়তো বার বার ইনবক্স চেক করছে পরশী রিপ্লাই দিয়েছে কিনা। দুনিয়ার নিয়ম নীতি কতো অদ্ভুত না? আমি যারে চাই, সে আমারে চায়না আর যে আমারে চায় তারে আমি দেখেও দেখিনা। পরশীর বড্ড অপরাধ বোধ হলো,, অনেক ভেবে দোটানা কাটিয়ে সে আব্রাহামের ইনবক্সে ঢুকে ছোট বাক্যে ম্যাসেজ পাঠালো আব্রাহাম!! আমাকে একটু সময় দিবেন প্লিজ!! জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবা হয়নি,, আমি এখনো সেই চার বছর আগেই থেমে আছি। আপনি ম্যাসেজ পাঠালে আমার যন্ত্রণা হয়, আপনার কষ্টগুলোর জন্য আফসোস হয়। যেহেতু হালাল ভাবে বিয়ে করছেন, সবটা নাহয় বিয়ের পরেই হোক। আর চারটা দিন অপেক্ষা করুন। “”

,,, পরশী জানে না ওপাশের মানুষটা তাকে কতোটা বুঝেছে তবে তার ম্যাসেজ পৌছানোর পর লোকটা ইনবক্স থেকে বেড়িয়ে গিয়েছে। কিছুটা স্বস্তি পেলো পরশী, তবে চোখ গাড়িয়ে দু ফোটা পানি গড়ালো। কি হতো সবটা সুন্দর হলে? রাত আপু না মারা গেলে? অরুন আর রাতের একটা সুন্দর সংসার হতো আর ঐ লোকটাও ভালো থাকতো, হয়তো ভালো থাকতো না কিন্তু এভাবে মরার মতো তো আর বাচতে হতো না। সবার নিরবতার মাঝেই ঘরের দরজায় নক করলো কেউ,, শব্দ শুনে পরশী আর ইরাদ দুজনেই দরজার দিকে ফিরে তাকালো। আবারও নক হতেই চোখ মুছে উত্তর করলো পরশী — কে?
,,, ওপাশ থেকে উত্তর এলো,, আমি!! সিদ্বার্থ।
,,, পারশী ধীরে সুস্থে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই সিদ্বার্থকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো — আসুন ভাইয়া!! ভিতরে এসে বসুন।

,,, সিদ্বার্থ ইশারায় নাকোচ করে বললো– প্রয়োজন নেই,, অনন্যাকে একটু জিজ্ঞেস করো তো ওর কাছে আমার ব্লুতুথ আছে কিনা? থাকলে আপাতত ফিরিয়ে দিতে বলো,, পরে নাহয় আবার আনবে।
,,, পরশী মাথা ঝাকিয়ে ভিতরে চলে এলো। দরজা একটু খোলা থাকার দরুন দরজার মুখোমুখি শুয়ে থাকা ইরাদকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সিদ্বার্থ। পরশী অনন্যার কাছে চলে যেতেই চোখাচোখি হলো দুজনার। ইরাদের চোখে মুখে তীব্র অভিমান,, আধো অন্ধকারে সিড সেই অভিমান টের পেলো কিনা কে জানে? সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, এই তাকিয়ে থাকাটা পছন্দ না ইরার। সে আকষ্মিক ঘুরে শুয়ে কম্ফোর্টার টেনে মাথাটা ঢেকে দিলো। সিদ্বার্থ ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে চোখ ঘুরালো। পরশী অনন্যার থেকে ব্লুতুথ টা নিয়ে সিদ্বার্থের কাছে গিয়ে ফেরত দিতেই চলে যেতে উদ্বত হলো সিড। যাবার আগে আরও একবার রুমের দিকে তাকাতে ভুলেনি ছেলেটা কিন্তু যেই আশায় তাকিয়েছিলো তা অধরাই থেকে গেলো। কঠোর রমনি এখনো নিজেকে ঢেকে রেখে গাট হয়ে শুয়ে আছে। সিদ্বার্থ চলে যেতেই পরশী আবারও দরজা লক করে এসে শুয়ে পরলো। ইরাদ এখনো কম্ফোর্টার দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছে,, পারশীর কেনো যেনো মনে হলো ইরাদ আপু এখন কাদবে, ভাববে হয়তো সিদ্বার্থ ভাই তাকে এখন আর ভালো বাসে না। বর্তমানে সিদ্বার্থের সকল মনযোগ অনন্যার কাছে,, কিন্তু এটা কি আদেও সত্যি? পরশীর তো মনে হয়না। সে কিছুক্ষণ আগেও সিদ্বার্থের চাহনিতে ইরাদের জন্য ব্যাকুলতা দেখেছে। পরশী কি মনে করে যেনো অনন্যাকে প্রশ্ন করলো —

,,, অনন্যা আপু!! তোমার আর সিড ভাইয়ার লাভ ম্যারেজ নাকি এরেন্জ?
,,, অনন্যা মেয়েটি বেশ মিশুক, সে এবার পারশী দিকে ফিরে তাকালো– এরেন্জ!! সিডের ডেড আর আমার বাপি ভার্সিটি জীবন থেকেই একসাথে উঠা বসা করেন। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই নাকি ওনারা একে অপরকে কথা দিয়ে রেখেছিলেন। এখন বড়ো হওয়ার পর সেই কথা রাখতে চাচ্ছেন।
,,,, পারশী বুঝার মতো মাথা ঝাকালো মানে সে বুঝেছে— তুমি সিড ভাইয়াকে পছন্দ করো?
,,,, উত্তর করলো অনন্যা — না করার একটা কারন দেখাও!! স্টাবলিস ম্যান, নামকরা মডেল, গুড লুকিং বয়, জেন্টাল, কেয়ারিং। একজন মেয়ে এর থেকে বেশি আর কি চাইতে পারে?

,,, তোমাকে সিড ভাইয়া পছন্দ করে?
,,, আমি যথেষ্ট সুন্দরী ও ওয়েল এডুক্যাটেড, আমার একটা ব্রাইট ফিউচার আছে, বাবার টাকা আছে, আমাকে পাওয়া সৌভাগ্য ব্যাতিত কিছুই না।
,,, পরশীর কেনো যেনো মনে হলো মেয়েটা নিজেকে নিয়ে বড্ডো অহংকার করে,, বিষয়টা খারাপ না, প্রতিটি মানুষের উচিৎ নিজ নিজ সৌন্দর্য নিয়ে অহংকার করা। পরশী আর কথা বাড়ালো না, তার যা জানার কথা ছিলো জানা হয়ে গিয়েছে। মনে মনে সস্থি ও পাচ্ছে কিছুটা, যাক!! মেয়েটা সিড ভাইকে ভালোবাসে না, ভালোবাসলে আবার আরেক বিপদ, সম্পর্কে তৃতীয় ব্যাক্তি গভীর ভাবে ভালোবাসলে গল্পটা এলোমেলো হয়ে যায়, যেমনটা চার বছর আগে হয়েছিলো।

,,,,, প্রকৃতির কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিহান। পাশে আরন্যক। সে মাত্রই ক্লাস থেকে বের হয়ে বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
মির্জা পরিবারের একটা দারুণ নিয়ম রয়েছে। এখানে প্রতিটি বাচ্চাকে মুখে কথা ফোটার পরপরই আরবি ও ইংরেজি শিক্ষার জন্য কোচিং সেন্টারে পাঠানো হয়। আরন্যক আর প্রকৃতিও সেই নিয়মের মাঝেই আবদ্ধ। দুজনকেই কাছের একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে দ্বীপ। সকাল নয়টা থেকে এগারোটা পর্যন্ত ক্লাস হয়। এক ঘণ্টা আরবি এবং এক ঘণ্টা ইংরেজি।

আরন্যকটা বুঝদারের মতো প্রতিদিন ক্লাসে আসলেও প্রকৃতিকে আনতে বড্ড বেগ পোহাতে হয় বিহানের। ইদানীং বিহানের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হচ্ছে ছেলে-মেয়ে দুটোকে কোচিং সেন্টারে দিয়ে যাওয়া আর ঠিক এগারোটার সময় এসে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এরপর বাদবাকি যা কাজ আছে, সেসব না হয় করবে।
বাপ-বেটার অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে কিছু সময়ের মাঝেই বিড়াল গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরা প্রকৃতি কাঁধে বিড়াল ব্যাগ ঝুলিয়ে মুখটা কাঁদো-কাঁদো করে কোচিং সেন্টার থেকে বের হলো। মেয়ের মুখের অবস্থা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল বিহান।হয়েছে আজ! প্রকৃতি গাল ফুলিয়েছে মানে আজ বিহানের অবস্থা নাজেহাল হবে নিশ্চিত। যখন মেয়েটার কোনো কিছু মনপুত হয় না, তখনই গাল ফুলিয়ে থাকে। এই মুহূর্তে ওকে কোলে নিলেও বিপদ, না নিলেও বিপদ। কোলে নিতে চাইলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কোল থেকে নেমে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে চাইবে, আর যদি কোলে না নেয় তাহলে গাল ফুলিয়ে থেকেই মাটিতে শুয়ে থাকবে। মোট কথা, সে মাটি ছাড়া কিছুই বোঝে না। কিছু হলেই মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা ব্যতীত তার কাছে কোনো সমাধান নেই। ভাগ্যিস বিহানকে আল্লাহ ধৈর্যশীল করে বানিয়েছেন, নয়তো সারাদিন এই বাপ-মেয়েকে কিভাবে সামলাত সে? বিহানের ভাবনাই সত্যি হলো। বিহান আর আরন্যকের সামনে এসে কংক্রিটের রাস্তায় ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল প্রকৃতি। বিহান পড়েছে দোটানায়। কী করবে এখন? কোলে নেবে নাকি নেবে না? নিলেই তো কেঁদে-কুটে একাকার করে দেবে, আবার না নিলে সারাদিন এখানেই পড়ে থাকবে। বিহান দোটানায় থাকলেও আরন্যক এগিয়ে গিয়ে প্রকৃতির পাশে বসে পড়ল। পরনের বিড়াল গেঞ্জিটা টেনে বলল—

— এই ন্যাচার, উঠ। এখানে অনেক জার্ম্স রয়েছে। তর স্কিন খারাপ হয়ে যাবে। চল, বাড়িতে গিয়ে একটা সুন্দর জায়গা খুঁজে দিবো। সেখানে সারাদিন গড়াগড়ি দিস।
ছেলের কথায় বিমুগ্ধ হলো বিহান। ছেলেটার আচার-আচরণে কেমন ধৈর্যের ঘ্রাণ পাওয়া গেল না? ছেলেটা নিশ্চয়ই বড় হয়ে তার মতো ধৈর্যশীল হবে।বিহান এক বুক আশা নিয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়ে মানুষ স্কিনের প্রতি খুব সেনসিটিভ হয়। প্রকৃতি নিশ্চয়ই স্কিনের চিন্তায় এখনই লাফিয়ে উঠে পড়বে? বিহানের এক বুক আশাকে পায়ের তলায় মাড়িয়ে প্রকৃতি একবার আরন্যকের দিকে তাকিয়ে আবারও রাস্তার ধুলোবালি পরিমাপ করে নিল। পরপর গলা ফাটিয়ে দিল এক চিৎকার।মুহূর্তেই বিহানের মুখখানি চুপসে গেল। কাকে নিয়ে কী ভাবছিল সে? অর্পনার মেয়ে কিনা স্কিন নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে! এই মেয়ের মা-ই তো নিজেকে মেয়ে মনে করে না। আগে শুধু ছেলেদের মতো পোশাক পরত, এখন রকস্টার হওয়ার পর হাতে গাঁ*জাখোর ছেলে-পুলের মতো বেল্টের ব্রেসলেট, সিলভারের মোটা চুড়ি, রুপোর বালা— আরও কত কী যে পরে! বিহানের দেখলেই রাগ লাগে।

আজ একটা কথা খুব ভালো করেই বুঝে নিয়েছে বিহান। এই মেয়ের বাপকে সে সামলাতে পারলেও এই মেয়েকে বিহানের ছেলে সামলাতে পারবে না। এই মেয়ে বাপের চেয়েও হাজারগুণ জেদি আর মায়ের মতোই ঘাড়ত্যাড়া হয়েছে। এখন আর কী করার?
কান্না তো করছেই। বিহান এগিয়ে গিয়ে চট করেই কোলে তুলে নিল মেয়েকে। প্রকৃতির কান্নার তোপ আরও বাড়ল। মোচড়ামুচড়ি করে একাকার অবস্থা।বিহান জোরপূর্বক প্রকৃতিকে নিয়ে গাড়ির ডোর খুলে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে রেখে ডোর লক করে দিল। পরপর আরন্যককে পিছনের সিটে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। প্রকৃতি এবার জেদ দেখিয়ে কেঁদে-কুটে গাড়ির জিনিসপত্র ফেলতে লাগল।বিহান লম্বা লম্বা দুটো দম নিয়ে প্রকৃতিকে টেনে কোলে বসাল। এখনো কাঁদছে মেয়েটা। কেঁদে-কুটে চোখের পানি, নাকের পানি একাকার করে ফেলেছে।
আরন্যক পিছন থেকে বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল—

— ন্যাচার!! ইট্স বেড ম্যানার্স। কান্না থামা, নয়তো বড় হয়ে তর সাথে মিলে মিলে আমি রাজনীতি করবো না।
হুট করেই প্রকৃতির কান্না থেমে গেল। সে আর ফরেস্ট মিলে মিলে প্ল্যান করেছে বড় হয়ে পাপ্পা আর বিহান পাপ্পার মতো ভাই-বোন মিলেমিশে রাজনীতি করবে। যদিও তারা রাজনীতি কী, বুঝে না। তবুও প্রকৃতির ইচ্ছে, সে বড় হয়ে একদম পাপ্পার মতো হবে। আর বিহান পাপ্পা যেমন সারাক্ষণ পাপ্পার সাথে সাথে থাকে, ফরেস্টও তার সাথে সাথে থাকবে। আরন্যকের কথায় প্রকৃতিকে থেমে যেতে দেখে ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট হলো বিহান। ছেলেটা এতক্ষণ এই কথাটা বললে কী এমন ক্ষতি হতো? সবসময় এত মেপে মেপে কথা বলা কার থেকে শিখেছে এই ছেলে? আল্লাহ জানেন।
বিহান প্রকৃতিকে এবার গাড়ির ড্যাশবোর্ডে বসিয়ে দিয়ে নাটকীয় স্বরে বলল—

— ইসস! এত কান্না! নাকটা পুরো লাল হয়ে গিয়েছে। দেখি, পাপ্পার দিকে তাকাও। নাকটা মুছে দেই।
প্রকৃতি ছোট ছোট হাতে গাল মুছে বিহানের দিকে তাকাল।
বিহান পাশ থেকে টিস্যু নিয়ে প্রকৃতির নাক মুছে, আরেকটা টিস্যু ভিজিয়ে চোখ মুছে দিতে দিতে বলল— এবার বলেন দেখি, আমার আম্মা কেন কান্না করছে? কেউ বকেছে? মিস মেরেছে?
প্রকৃতি মাথা ঝাঁকিয়ে একবার হ্যাঁ জানাল, আবার না জানাল। এই গোলমেলে উত্তরের মানে বিহান বুঝতে পারে। এর মানে হচ্ছে, কেউ একজন ওকে কিছু একটা বলেছে, কিন্তু মিস তাকে মারেনি। প্রকৃতি এবার পকেট থেকে খেলনার ভাঙা রিভলবারটা বের করে বিহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—

— ছোয়ান আমাল লিভবা বেঙে পেলেছে, এতা আমাল লাব্বে না, আমাকে নতুন লিভবা পাচেস (পার্চেস) কলে দাও।
বিহান ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। এতে মিশে রইল হাজার খানেক আফসোস। — এই কথা? এর জন্য এভাবে কেঁদে কেঁদে বেহাল হতে হবে? তুমি চাইলে পাপ্পা তোমাকে রিভলবারের গোডাউনে নিয়ে যাব, মা। তাও তুই কাঁদিস না। তুই কাঁদলে তকে থামানোর সাধ্য কারোর নেই।
শেষের কথাগুলো বিড়বিড় করেই বলল। নয়তো আবার শুনে নিয়ে কাঁদতে শুরু করলে আজকে আর বাড়ি যাওয়া হবে না। আর মেয়েটা কাঁদলে তারও কেমন বুক মুচড়ে ওঠে।মির্জা বাড়িতে আমার-তোমার বাচ্চা বলতে কিছু হয় না। সবটাই “”আমাদের বাচ্চা””-র মাঝে সীমাবদ্ধ। হতে পারে ডিএনএ ১০০% ম্যাচ করবে না, ৫% তো করবে! এটুকুই কম কী?
প্রকৃতি এবার ড্যাশবোর্ড থেকে নেমে বিহানের কোলে বসে গলা জড়িয়ে ধরল। আরন্যকও পিছন থেকে সামনে চলে এলো।এখন তারা টয় শপে যাবে। প্রকৃতির যতগুলো রিভলবার পছন্দ হবে, সব এনে জড়ো করবে মেয়ের পায়ের কাছে। এই কয়েক টাকার টয়ের জন্য যদি মেয়েটা এভাবে কান্না করে, তাহলে তারা দুই ভাই রোজগার করে কার জন্য?

,,, দ্বীপ মির্জার এই হুটহাট মাঝরাতে ফিরে আসাটা বড্ড বিরক্ত করে অর্পনাকে। কতবার নিষেধ করেছে রাত করে ড্রাইভ না করতে, কিন্তু মানব সেসব কানে তোলার প্রয়োজন মনে করে না। কাল রাতেও একই কাজ করেছে, যার ফলে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে এখন বেলা ১২টা। উঠে আবার গোসল না করে ফোন নিয়ে বসেছে।অর্পনা বিছানা গোছাতে গোছাতে বিরক্তিকর দৃষ্টিতে দ্বীপের দিকে তাকাল, তবে কিছু বলল না। ইদানীং ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটি করতে তার ভালো লাগে না। মন, মস্তিষ্ক যেন সার্বক্ষণিক ক্লান্ত হয়ে থাকে। তাই আর বিষয়টা নিয়ে কথা বাড়াল না, বরং অন্য বিষয় টেনে নরম স্বরে বলল—
— আমার বাপের বাড়ি থেকে লোক এসেছে।
দ্বীপ ফোনে মনোযোগ রেখেই বলল— আই নো!!
অর্পনা কুশন সাজিয়ে রেখে দ্বীপের পাশাপাশি বসল। গালের কাছে পড়ে থাকা চুলগুলো নিয়ে সব চুল একসাথে খোঁপা করে আবারও নরম স্বরে বলল— আমি ইরাদ আর সুহাসিনী আন্টির কথা বলিনি।
দ্বীপ কেমন ভ্রু কুঁচকে অর্পনার দিকে তাকাল— ওরা ব্যতীত আবার কে?

— আমার মামাতো ভাই আর তার ফিয়ন্সি এসেছে।
দ্বীপের শান্ত মেজাজ অশান্ত করে তুলতে এটুকু বাক্যই বোধহয় যথেষ্ট ছিল। মুহূর্তেই তার চোখেমুখের রং বদলাল। রাগে কপালের রগখানা ফুলে উঠতেই অর্পনা তাড়াহুড়ো করে বলল— অন্য কেউ নয়, সিড ভাইয়া আর অনন্যা এসেছে। ওদের সঙ্গে কোনো রূপ ঝামেলা করবেন না, প্লিজ! আমি নিজ দায়িত্বে ওদেরকে এনেছি। পারশীর বিয়ে অ্যাটেন্ড করেই চলে যাবে।
রাগের তোপে হাতের ফোনখানা বিছানায় ছুড়ে ফেলল দ্বীপ। দাঁতে দাঁত চেপে অসন্তোষভরা কণ্ঠে আওড়াল— কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করবে না, তাই না? ইটস ওকে। তুমি আমাকে যেভাবে ট্রিট করবে, আমার তরফ থেকে সেইম ফিডব্যাকই পাবে।
এই পর্যায়ে এসে হুট করেই অর্পনা কেমন রেগে গেল। দ্বীপের চেয়েও অধিক জেদ নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে আওড়াল— আপনার মনে হচ্ছে না, একটু বেশি বেশি বলছেন? এই একটা বিষয় ব্যতীত আর কোন বিষয়ে আপনার অনুমতি ছাড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি? উত্তর দিন আজ।

বলেই ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস নিতে লাগল অর্পনা। কপালে দুটো ভাঁজ পড়েছে। মাথায় কষ্ট হচ্ছে। বিষয়টা বুঝতে পেরেই শান্ত হয়ে এলো দ্বীপ। নিজের খরখরে হাতখানা অর্পনার মাথায় রেখে বলল— কুল! মাথা ঠান্ডা রাখো আর ওদেরকে চলে যেতে বলো। সামনাসামনি হলে তোমার মামাতো ভাইকে আমি জায়গায় পুঁতে দিতেও দুবার ভাবব না। তখন হয়তো তোমার নিজেরই কষ্ট হবে।
স্বামীর নরম স্পর্শ আর কোমল স্বর শুনে হুট করেই দ্বীপের বুকে মাথা হেলিয়ে দিল অর্পনা। এই জায়গাটায় এত শান্তি! এই শান্তি বোধহয় পুরো ধরাধামে খুঁজলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্পনার আকস্মিক কাণ্ডে থমকাল দ্বীপ। আশা করেনি বোধহয় এমনটা। তবে এই থমকে থাকা ভাব বেশিক্ষণ টিকল না। এক হাতে আগলে নিয়ে একদম নিজের নিকটে নিয়ে এলো।

এই পর্যায়ে ফুঁপিয়ে উঠল অর্পনা— আমার সাথে এমন করবেন না, প্লিজ। ভালো লাগে না। তর্ক করতে বড্ড ক্লান্ত লাগে আমার। ভেতর থেকে কথা আসতে চায় না। আমি যা করছি, সবটা নিজের জন্যই। একটু স্যাক্রিফাইস করুন। সিড ভাইয়া মোটেও আপনার সামনে আসবে না। প্রমিজ!
অর্পনার প্রতিটি কথায় ঝরে পড়েছে অপারগতার রেশ। আগের সেই কথায় কথায় তর্ক করা, তিক্ত কথা শোনানো অর্পনাটা কোথায় যে হারিয়ে গেল, খুঁজেই পাচ্ছে না দ্বীপ।সে মাথাটা ঝুঁকিয়ে অর্পনার মাথায় চুমু খেল— এর জন্য কাঁদতে হবে কেন? স্বাভাবিকভাবে বললেই হয়। তোমার জন্য না হয় মেনেই নিলাম। তবে এতে তোমার কী ভালো হবে, তার এক্সপ্লানেশন আমার চাই। শীঘ্রই দেবে।
অর্পনা উত্তর করল না। সেভাবেই পড়ে রইল দ্বীপের বুকে।অর্পনার পরনে হ্যান্ড এমব্রয়ডারি করা কোটা কাপড়ের শাড়ি। দ্বীপ এক হাত গলিয়ে অর্পনার পেট জড়িয়ে ধরে ওকে আরেকটু কাছে টেনে নিল। অপর হাতে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেই এই পর্যায়ে পুরোপুরি ভেঙে গেল অর্পনা। কান্নার মাত্রা বাড়ল—

— আমার পল্লবকে খুঁজে এনে দিন না, দ্বীপ। আপনার তো কত কত ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আরও একবার এনে দেন না। আমি কথা দিচ্ছি, এবার আর কোথাও হারিয়ে যেতে দেব না।
উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে কিছুক্ষণ নীরব থাকল দ্বীপ। পরক্ষণেই গাঢ় নিশ্বাস ফেলে বলল— খোঁজ করছি আমি। পেয়ে যাব শীঘ্রই। কিন্তু কতদিন? আর কতদিন ওকে খুঁজে খুঁজে বের করবে তুমি? মানতে শিখো, পল্লব আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক নেই।
— আপনিও তো ছিলেন না। সুস্থ হয়েছেন না, বলুন? আমি আপনাকে সুস্থ করতে পারলে, ওকে পারব না?
— পারবে না। আমি আর পল্লব এক নই, ভেলোরা। তখন তুমি আমার স্ত্রী ছিলে, বাট পল্লবের ক্ষেত্রে তুমি শুধুই ওর ফ্রেন্ড। এসব থেকে বেরোতে হলে পিছুটানের প্রয়োজন, ভালোবাসাময় একটা পৃথিবী প্রয়োজন, আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বেঁচে থাকার ইচ্ছা। কিন্তু পল্লবের…
অর্পনা এবার দ্বীপের বুকে নাক-মুখ চেপে ধরল। যেন এমনটা করলেই সবটা আবার আগের মতো হয়ে যাবে। রাত্রি ফিরে আসবে, পল্লব ঠিক হয়ে যাবে। অরুণ ফিরে আসবে, ইরাদ হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারপর আবারও মিলিত হতে পারবে পাঁচজন।

— পাপ্পা!! ও পাপ্পা!! মাম্মা!! পকিতি এছেছে তো, মাম্মা!!
দূর থেকে মেয়ের ডাক শুনে অর্পনা তড়িঘড়ি করে সরে যেতে চাইল, কিন্তু দ্বীপ ছাড়ল না। আটকে রাখল সেভাবেই। তবে অর্পনার উন্মুক্ত উদর থেকে হাত সরিয়ে শাড়ি টেনে সযত্নে ঢেকে দিল উদরখানা।
বাংলাদেশে একটা নিয়ম বড্ড প্রচলিত। একজন স্বামী কোনোভাবেই বাবা-মা, সমাজ আর সন্তানদের সামনে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারবে না, সম্মান দেখাতে পারবে না। অথচ ঠিকই উঁচু স্বরে ধমক দিতে পারবে, অকথ্য ভাষায় বকাবকি করতে পারবে, রাস্তায় কিংবা পরিবারের সামনে ঠাস ঠুস চড়-থাপ্পড়, লাথি, ঘুষি মারতে পারবে। এগুলো স্বাভাবিক, কিন্তু ভালোবাসাটা অস্বাভাবিক, লজ্জাজনক।পুরুষ যদি বুঝত যে তার করা সম্মান-অসম্মানের উপর ডিপেন্ড করে তার স্ত্রী কতটা সম্মান পাবে আর কতটা লাঞ্ছনা পাবে, তাহলে সমাজে নিপীড়ন শব্দটাই থাকত না।প্রকৃতি ছুটে এসে বাবা আর মাকে একসাথে বসে থাকতে দেখে লাফাতে লাফাতে বাবার পায়ের কাছে থামল। এরপর ধীরে ধীরে কাঠবিড়ালির বাচ্চার মতো কোলে উঠে দুজনের গলা জড়িয়ে ধরতেই দ্বীপ মেয়ের ফুলো ফুলো গালে চুমু খেয়ে শুধাল—

— আজ কী পড়েছেন, আম্মা?
প্রকৃতি নিজেও পাপ্পার গালে চুমু খেল। মায়ের দিকে চোখ যেতেই দেখল মায়ের চোখের পাপড়ি ভেজা। সে ছোট ছোট হাতে মায়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল— আছকে বিছতা চব্ব অত্থ (শব্দ অর্থ) চিকেছি। মিস আলও পতিছতা তা চব্ব অত্থ হোম ওয়ালক দিয়েছে।
প্রকৃতির স্পর্শ পেলেই সুস্মিতা কাইসারের কথা স্মরণে আসে অর্পনার। মেয়েরা কেন মায়ের মতো হয়? জানে না অর্পনা।সে মেয়ের হাত দুটো হাতের আজলায় নিয়ে চুমু খেয়ে বলল—
— প্রকৃতি কি সেই হোমওয়ার্কগুলো আজ কমপ্লিট করবে?
প্রকৃতি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝাল। মানে করবে না। তারপর মায়ের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একে একে চারটি আঙুল উঁচু করে বলল— আছকে পকিতি পব্বে না, কালন। কাল তেকে পছি মাম্মাল বিয়ে। সেজন্ন বিয়ান পাপ্পা মিচেল তেকে চাদ্দিনেল চুতি নিয়েচে।
মেয়ের কথায় অসন্তুষ্ট হলো অর্পনা, তবে কিছু বলল না। এমনিতেও সে ছোটবেলায় এর থেকেও বেশি ফাঁকিবাজ ছিল। তাই মেয়েকে বকাবকি করার মানেই হয় না। সামনে বিয়ে, যেহেতু চারটা দিন না পড়লে আহামরি ক্ষতি হবে না। মাকে বকাবকি করতে না দেখে অনেক খুশি হলো প্রকৃতি। সে উৎফুল্ল মনে ব্যাগ থেকে সদ্য কেনা খেলনার রিভলবারটি বের করে বাবা-মাকে দেখিয়ে বলল— এইযে দেকো, আমাল নিউ লিভবা।
দ্বীপ মেয়ের ছোট্ট কাঁধে থুতনি রেখে শুধাল— এটা দিয়ে আপনি কী করবেন, আম্মা?

— তোমাল আল বিয়ান পাপ্পাল মতো টাছ টাছ কলে মানুছ মাব্বো।
— কিন্তু পাপ্পা তো এমনি এমনি মানুষ মারে না, মা। পাপ্পা বাজে লোকেদের শাস্তি দেয়।
প্রকৃতি রিভলবারটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বলল— পকিতি ও বাজে লোকাদে শাত্তি দিবে।
মেয়ের উত্তরে যেন বড্ড সন্তুষ্ট হলো দ্বীপ। মেয়ের গালে ফের চুমু খেয়ে বলল— দ্যাটস মাই চাইল্ড। তুমি বড় হয়ে মাম্মা-পাপ্পার মতো খুব স্ট্রং হবে। অন্যায়কে অন্যায় বলবে। আবার ন্যায় পেতে হলে প্রয়োজনে নিজেই অন্যায় করবে। জীবনে যা চাইবে, তা জোর করে হলেও নিজের করে নেবে। কারণ, জীবন ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে শখ হোক কিংবা সুখের উৎস, এক কথায় বিসর্জন দিতে নেই। মাঝেমধ্যে কৌশল করে হলেও নিজের করে নিতে হয়।

প্রকৃতি তার বাবার সব কথা বুঝেনি, তবে মাথায় সেইভ করে রেখেছে। যখন আরও বড় হবে, তখন এই সব কথার মিনিং বের করে সব বুঝে নেবে। বাবা-মেয়ের এই সিরিয়াস আলোচনা পছন্দ হলো না অর্পনার। শেষে কিনা লোকটা মেয়েকে মানুষ মারা শেখাচ্ছে! তাকে দিয়েও পাঁচটা খুন করিয়েছে। এখনো হাত পরখ করলে তাদের রক্তের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। মেয়েকেও তার পথের পথিক বানাবে নাকি এই লোক? সে রাগী দৃষ্টিতে বাবা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির হাত থেকে খেলনার রিভলবারটি নিয়ে বলল— এসব রাখো। চলো, গোসল করবে।
প্রকৃতির মাথায় যেন বর্ষাকালের আকাশ কাঁপানো বাজ পড়ল। সে দ্রুতগতিতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে নাক সিটকে বলল— নো নো!! গোচল পচা, বাজে, মিচ বলেছে পতিদিন গুচল কত্তে হয় না। যালা পতিদিন গুচো কলে তালা পচা মেয়ে।
মেয়ের কথায় ঠোঁট টিপে হাসল দ্বীপ। এত সুনিপুণভাবে মিথ্যা তো সেও কোনোদিন বলতে পারেনি। কার মতো হলো মেয়েটা? অর্পনা চোখ ছোট ছোট করে শুধাল— কোন মিস বলেছে?

— আলু মিচ।
অর্পনা বিরক্ত হলো— এটা আলু না, আলো। ঠিক করে বলতে শিখো। আর আপনি, ছাড়ুন নিজের মেয়েকে। আমি বাথটবে গিজার দিচ্ছি।
বলেই বিছানা থেকে উঠতে নেবে, প্রকৃতি হুট করেই দ্বীপের বুকে মুখ গুঁজে চোখ বুজে নিল। ঠোঁট টিপে হাসি আটকাতে পারছে না মেয়েটা। তবুও ঘুমের ভান করে বলল— পকিতি ঘুম।
এবার শব্দ করে হেসে ফেলল দ্বীপ। এখন পরিষ্কার হলো, মেয়ে তার মায়ের মতোই পাক্কা অভিনেত্রী হয়েছে। মেয়ের ভাবভঙ্গি দেখে চোখ ফিরাল অর্পনা। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল—
— কান ধরে কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় যখন সোহান, নিবৃতা, মিথি তাকিয়ে তাকিয়ে হাসবে, তখন সব ঘুম এমনি পালিয়ে যাবে।
প্রকৃতির মনটা ধপ করেই খারাপ হয়ে গেল। মাম্মা তাকে থ্রেট দিচ্ছে? ওই সোহান আর মিথিটা বাজে, খালি তাকে পচায়। তবে নিবৃতা খুব ভালো। সে চোখ মেলে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বাবার দিকে তাকাল।দ্বীপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাল। প্রকৃতি নিষ্পাপ মুখ করে বলল— আমাকে লুকিয়ে পেলো পাপ্পা!! পিজ পিজ পিজ!!

মেয়ের ইংরেজি বলার ধরনে ফের হাসল দ্বীপ। মেয়েকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল। মেয়েটার গোসলের প্রতি এত অনীহা। পানি ছোঁয়ালেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে। অর্পনা প্রতিদিন গোসল করায় ওকে, নিশ্চয়ই কষ্ট হয়? আজ না হয় দ্বীপ একটু হেল্প করে দিল। মাঝেমধ্যে স্ত্রীকে কাজে হেল্প করলে হয়তো স্ত্রীর কাজ একেবারে ফুরিয়ে যায় না, কিন্তু এটুকু এফোর্ট পেলে স্ত্রীর মন ভালো হওয়ার চান্স থাকে। স্বামীর ভালোবাসা পেলে মেয়েরা থালা-বাসন মাজতে মাজতেও হাসে, আর স্বামীর অবহেলায় মেয়েরা খাবার মুখে নিয়েও কাঁদে। স্বামী হচ্ছে সত্যিকারের সাইক্রিয়াটিস্ট, যে চাইলেই স্ত্রীকে মানসিক রোগী থেকে সুস্থ মানবীতে পরিণত করতে পারে, আবার চাইলেই মানসিক রোগী থেকে পাগল বানিয়ে দিতে পারে।

,,,, বিকালের একটু আগের মুহূর্তে খেতে বসল ইরাদ। এখন আপাতত বসার ঘরে রোমানা বেগম ব্যতীত কেউ নেই। দুপুরের দিকে এমনিতেও বাড়ির পুরুষগণ বাড়িতে থাকে না। সকাল সকাল যে যার কাজে চলে যায়। আর মেয়েরা যারা আছে, তারা দুপুরের পরপরই খাবার খেয়ে রুমে চলে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। যে যার মতো খেয়ে-দেয়ে নিজেদের ঘরে চলে গিয়েছে, শুধু খাওয়া হয়নি ইরাদের। খাওয়ার টেবিলে সিদ্বার্থের মুখোমুখি যাতে না হতে হয়, তাই এই প্রচেষ্টা। একটা মানুষ তার জীবনে অন্তঃপ্রান্ত জ্বালিয়ে সর্বসুখ কেড়ে নিয়েছে। বাবা থাকতেও বাবা নেই, মা থাকতেও মা নেই। এত বড় পরিবার থাকা সত্ত্বেও সে তাদের কাছে মৃত। এমন একটা মানুষের মুখোমুখি হওয়া কতটা যৌক্তিক? এই মানুষটার প্রতি ইরার হয়তো এক আকাশ পরিমাণ অভিযোগ রয়েছে, হাজারটা প্রশ্ন রয়েছে, এক ডালা রাগ রয়েছে। কিন্তু সেসব প্রকাশ করারও অধিকার নেই ইদানীং। লোকটা বোধহয় অন্য কারোর। সে এখন অন্য কারোর অভিযোগ শুনতে ব্যস্ত।সেসব থাক! অন্য কারোর কোনো কিছু নিয়ে টানাহেঁচড়া করা ইরাদের পছন্দ না। জীবনে সবাই সবার মতো এগিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। সবাই তো আর তার মতো কপাল নিয়ে জন্মায়নি, তাই না? ইরাদের ভাবনার মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সিদ্বার্থ। সেও দুপুরে খায়নি। দ্বীপের মুখোমুখি হবে না বলে এই বেলাটা ঘুমিয়েই কাটিয়েছে।সিদ্বার্থকে নিচে নামতে দেখে রোমানা বেগম হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে এগিয়ে এলেন— ঘুম ভেঙেছে তোমার? আসো বাবা, বসে পড়ো। আমি খাবার দিচ্ছি।

বলতে বলতে ইরাদের পাশের চেয়ারটা টেনে দিলেন।রোমানা বেগমের কাণ্ডে বোকা বনে তাকিয়ে রইল ইরাদ। যার মুখোমুখি হবে না বলে এই বেলা না খেয়ে থাকল, এখন কিনা তার সাথেই বসে খেতে হবে!রোমানা বেগম সদ্য ধোয়া প্লেটটা রেখে খাবার সাজাচ্ছিলেন, তখনই ফোন বেজে উঠল। কানে তুলতেই দেখলেন অর্পনা কল করেছে। রোমানা বেগম কানে ফোন রেখেই কেমন তাড়া দেখালেন—
— ইরাদ! আম্মু, হুট করেই আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ পড়ে গিয়েছে। তুমি সিদ্বার্থকে খাবারটা বেড়ে দিতে পারবে?

এই পর্যায়ে ইরার হতবিহ্বলতার পরিমাণ বাড়ল বই কমল না। সে কী করে সিডকে খাবার বেড়ে দিতে পারে? সিডের সাথে তো তার ঝামেলা চলছে। কিন্তু এই কথাটা তো রোমানা বেগমকে বলা যাবে না। তিনি মুরুব্বি মানুষ। তিনি তো আর তাদের বিষয়ে কিছু জানেন না, তাই না? রোমানা বেগম ইরার কোনো অনুমতি না নিয়েই উপরে চলে গেলেন। উনাকে যেতে দেখে প্লেটে হাত রেখে মাথা নিচু করে বসে রইল ইরাদ। ভেতরটা কেমন হাঁসফাঁস করছে। খাবার মুখে তোলার শক্তি পাচ্ছে না। সিদ্বার্থ তাকিয়ে রইল সেদিকে। ইরার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে নরম স্বরে বলল— সমস্যা নেই। আপনি কন্টিনিউ করুন। আমি বরং পরে খেয়ে নেব।
ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল ইরাদ। সহসাই দুজনের চোখাচোখি হলো।সিদ্বার্থ একজন নামকরা মডেল। তার চোখ, মুখ, এমনকি শরীরের অন্তঃপ্রান্তে তীব্র সৌন্দর্য বিরাজমান। ইরাদের মনে পড়ল পাঁচ বছর আগের কথা। তখন সিদ্বার্থকে যতটা আকর্ষণীয় লাগত, এখন তা বেড়ে কয়েকগুণ হয়েছে। পাঁচ বছর আগের সেই পঁচিশ বছরের যুবক এখন ত্রিশ বছরের মানবেতে পরিণত হয়েছে। তবে এসবে মন দেওয়া ইরাদের কাম্য নয়। সে দৃঢ় কণ্ঠে আওড়াল—

— বসুন। যাবেন না। আপনি চলে গেলে আন্টি আমাকে খারাপ ভাববে।
কী মনে করে যেন দ্বিমত করল না সিদ্বার্থ। রোমানা বেগমের টেনে দেওয়া ইরাদের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল। ইরাদ ধীরে ধীরে প্লেটে খাবার দিয়ে, ছোট ছোট ডিসে তরকারি বেড়ে সামনে রেখে দিল। যা লাগবে, তা না হয় নিয়ে খাবে। এভাবে বারবার খাবার এগিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। খাবার বেড়ে দিয়ে নিজে খাওয়ায় মন দিল ইরাদ। সিদ্বার্থ এখনো ইরাদের দিকেই তাকিয়ে। মেয়েটা খুব ধীরে ধীরে খায়। অল্প অল্প ভাত মেখে মুখে লোকমা তুলে ধীরে ধীরে চিবোয়। দেখতে ভালো লাগে তার। আগেও যখন তারা রেস্টুরেন্টে কিংবা হাসপাতালে একসাথে খাবার খেত, তখন খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েটাকে এভাবেই দেখত সে।হয়তো মাঝে অনেকটা সময় পেরিয়েছে, দুজনের মাঝে দূরত্ব বেড়েছে, কিন্তু দৃশ্যগুলো এখনো তরতাজা হয়ে রয়েছে তার চোখে।সব স্মৃতি চাইলেই ভোলা যায়? কিছু স্মৃতি আনমনেই রয়ে যায়।ইরাদ বিষয়টা বুঝতে পেরে খাবারের প্লেটে চোখ রেখেই সিদ্বার্থের উদ্দেশ্যে বলল—

— চোখ সরান। আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
সিদ্বার্থ মানল না। উল্টো প্রশ্ন করল— এখনো বিয়ে করেননি?
— বিয়ে করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ?
— কারোর কারোর কাছে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ, আবার কারোর কাছে নয়।
— তবে আমার মতো চালচুলোহীন, পরিবার ছাড়া, বাজে প্রকৃতির মেয়েদের বিয়ের প্রয়োজন পড়ে না। তারা বিয়ে ছাড়াই সবকিছু করতে পারে। আমাদের কাছে বিয়েটা অত গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সিদ্বার্থ কেমন কাতর দৃষ্টিতে ইরাদের দিকে তাকাল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, ইরাদ তাকে কিসের কথা বলে হার্ট করার চেষ্টা করছে।কিন্তু কাজটা তো সে করেনি। কে করেছে, তাও জানে না। নিজেকে প্রুভ করার কোনো ওয়ে নেই তার কাছে। এই মুহূর্তে একটাই রাস্তা খোলা সেটা হচ্ছে ভালোবাসা আর বিশ্বাস। কিন্তু ইরাদ তো এর একটাও তাকে করে না। বরং মনজুড়ে রয়েছে এক আকাশসম ঘৃণা। সেই ঘৃণা নিয়ে তার সামান্য মুখের কথা কি মানতে চাইবে?
কখনোই না। সিদ্বার্থের কাতরতা এবার চাহনির সাথে সাথে কণ্ঠস্বরেও দৃশ্যমান হলো—

— আপনি আমাকে ঠিক কতটা অবিশ্বাস আর ঘৃণা করেন, ইরাদ?
সিদ্বার্থের এহেন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল ইরাদ। বুকের এক কোণে কেমন চিনচিনে ব্যথার আবির্ভাব ঘটল।
ইরাদের কেন যেন আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করল না। অকারণেই দুর্বল হয়ে পড়ছে সে, যা বড্ড অপ্রয়োজনীয়। তাই খাবার অর্ধেক না ফুরাতেই উঠে যেতে চাইল।বিষয়টা বুঝতেই তৎক্ষণাৎ ইরাদের হাতের কনুই চেপে ধরল সিদ্বার্থ।হালকা টান দিতেই ছিমছাম গড়নের ইরাদ খেই হারিয়ে সিদ্বার্থের দিকে অনেকটা এগিয়ে গেল। থুতনি ঠেকল লোকটার বাহুতে।সিদ্বার্থ অকারণেই আরেকটু টান দিল। এই পর্যায়ে ইরাদের স্থান হলো বুকে।কিছুক্ষণের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে গেল ইরাদ। একে তো বহুদিন পর সেই পরিচিত স্পর্শ, তার মধ্যে সিডের হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিক কম্পন।বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না ইরাদ। মুখ তুলে চাইতেই মুখোমুখি হলো দুজন। লম্বা-চওড়া গড়নের লোকটা তার দিকেই ঝুঁকে আছে। ইরাদ সরে যেতে চাইলে সিদ্বার্থ হাতের চাপ আরও বৃদ্ধি করল। সাথে সাথে চোখ গরম করে তাকাল ইরাদ। সিদ্বার্থ সেসবের পাত্তা দিল না। উল্টো দাঁতে দাঁত চেপে বলল—

— চুপচাপ বসে থাকুন। না খেয়ে উঠলে আমার ভদ্রতার মুখোশটা আপনাআপনি আলাদা হয়ে যাবে। তখন কী থেকে কী করে ফেলব, নিজেও জানি না, ইরাদ।
ইরাদও সমান তালে দাঁতে দাঁত চেপে বলল— ছাড়ুন! অসভ্যতা করছেন কেন? বাড়াবাড়ি করলে আপনার ফিয়ন্সিকে জানাতে বাধ্য হব আমি।
ইরাদের চোখেমুখে দৃঢ়তা থাকলেও চোখজোড়াতে পানির আবির্ভাব ঘটেছে।নিজের ফিয়ন্সির থেকে জেন্টল পদবি পাওয়া ছেলেটা চরম অবাধ্যের ন্যায় ইরাদের কনুই ধরে আবারও টান বসাল।এই পর্যায়ে ইরাদ খেই হারালেও সিডের বুকে জায়গা নেয়নি। বরং বুকে হাত দিয়ে নিজেকে দূরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে।উদ্দেশ্যে সফল না হওয়া সিদ্বার্থ আড়চোখে বুকে রাখা ইরাদের হাতটার দিকে তাকাল।সাথে সাথে হাত সরিয়ে নিল ইরাদ। চোখেমুখে তীব্র অনীহা, যেন সিদ্বার্থের থেকে ঘৃণিত বস্তু পৃথিবীতে দুটো নেই।ব্যথিত হাসল সিদ্বার্থ— যদি অপরাধী না হতাম, এতক্ষণে অসভ্যতা কাকে বলে, কিভাবে করে, সবটা পাই টু পাই বুঝিয়ে দিতাম।(কনুই ছেড়ে ইরাদকে দূরে সরিয়ে)

— সম্পূর্ণ খাবার শেষ করে উঠুন। নয়তো অপরাধের হিসাব করা বন্ধ করে অপরাধের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হব। অভিযোগ করার সময়টুকুও পাবেন না আপনি।
সিদ্বার্থের কথার মানে বুঝতে পেরে ফের শক্ত চাহনিতে তাকাল ইরাদ। সিদ্বার্থ কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে।জোরাজোরি করার ফলে ইরাদের কাঁধ থেকে ওড়না কিছুটা সরে গিয়েছে। সিদ্বার্থের দৃষ্টি সেখানেই স্থির।ইরাদ দাঁতে দাঁত চেপে সে ঠিক করে খাওয়ায় মনোযোগ দিল।সিদ্বার্থ ওপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে ঘাড় ডলে ইরার দিকে হালকা মাথা কাত করে ফিসফিস করে আওড়াল— ইসস! অস্তিত্বে মিশে যেতে পারতাম।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬

ইরাদ ফের চোখ রাঙিয়ে তাকাল।সিদ্বার্থ কিছুই বোঝে না এমন ভাব করে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। তপ্ত শ্বাস ফেলল ইরাদ।এত বড় অপরাধ করার পরও মানুষ এতটা নির্লিপ্ত কী করে হয়? আদৌ কি সিদ্বার্থের মনে কোনো অনুতপ্ততা রয়েছে?নাকি যা করেছে, সেটা উনার কাছে ঠিক মনে হয়?ঠিক মনে না হলেই একটা মেয়ের সম্মান নিয়ে এভাবে খেলতেন?নিশ্চয়ই না।
পুরুষ মানুষ আসলেই স্বার্থপর। নিজের স্বার্থ হাসিলে নারীকে পায়ের তলায় পিষে দিতেও দুবার ভাবে না।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৬ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here