প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২২
insia isha chowdhury
আফসোস শব্দটা ছোট হলেও এর ভার অসীম। এমন এক অনুভূতি, যা মানুষের ভেতরের সমস্ত দৃঢ়তা, মনোবল আর মানসিক শান্তিকে মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। আজ যেমন সুপ্তি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে মুখে হাত চেপে নিঃশব্দে কাঁদছে। যেন তার কান্নার শব্দটুকুও কারও কানে না পৌঁছায়। বুকের ভেতর জমে থাকা অনুতাপ সুপ্তিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। ভীষণ আফসোস হচ্ছে তার কেন সে কোনোদিন প্রণয়কে নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি? এই যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছে না সুপ্তি। না সে এটাকে মেনে নিতে পারছে, না ভুলে যেতে পারছে। অনুভূতিগুলো গলায় আটকে থাকা এক অদৃশ্য কাঁটার মতো, যা প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে আরও গভীরে বিঁধে যাচ্ছে।
ভালোবাসা কি সত্যিই এতটা যন্ত্রণাদায়ক? যদি জানত, তবে হয়তো কখনোই এমন নীরব পাপ নিজের বুকে লালন-পালন করত না। নিজের অনুভূতিগুলোকে বছরের পর বছর গোপন রেখে একদিন সেগুলোরই শাস্তি পেতে হবে! এ কথা কি সে কখনো ভেবেছিল? অথচ কিছুদিন আগেই কত দৃঢ় কণ্ঠে মাকে বলেছিল,
“মা, তুমি অনেক কষ্ট করেছ। আমিও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কম সংগ্রাম করিনি। এখন থেকে এসব ভেবে আর কষ্ট পাব না।”
কিন্তু মানুষ কি সবসময় নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? তাহলে আজও কেন এত কষ্ট হচ্ছে তার? কেন প্রণয়ের নামটা মনে আসলেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে?
এখন রাত প্রায় আটটা। ড্রয়িংরুমে বসে ছিল ঋতু। এমন সময় কলিং বেলের শব্দ ভেসে আসতেই সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। ওড়নাটা গুছিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করল সোহেল।
সোহেলকে দেখে ঋতুর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া। কেমন আছো?”
সোহেল কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো এক হাত দিয়ে পিছনে সরিয়ে হালকা হেসে বলল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, বোনু। আমি তো ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?”
“এই তো, আমিও ভালো আছি।”
কথাটা বলেই ঋতু আশপাশে একবার তাকাল। তারপর কৌতূহলী স্বরে বলল,
“আর কেউ আসেনি? আমি তো শুনেছিলাম তোমরা কয়েকজন একসাথে আসবে। ভাবি তো সেই অনুযায়ী অনেক রান্নাবান্নাও করেছে। তবে তুমি একা কেন?”
সোহেলের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
“তোর কি মনে হয়, খাবারের কথা শুনে বাকিরা আসবে না? আসবেই। আসলে আমি মায়ের সঙ্গে একটু শপিং মলে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছু কাজ ছিল। কাজ শেষ হতেই সোজা এখানে চলে এলাম। রাজা, রনি আর শুভ একটু পরেই চলে আসবে।”
কথা বলতে বলতেই সোহেল ড্রয়িংরুমের ভেতরে এসে সোফায় বসে পড়ল। আর হাতে থাকা ব্যাগগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে দিল। এদিকে ঋতু দরজা বন্ধ করে সামনের সোফায় বসল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সোহেল ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সবকিছু ঠিকই আছে, কিন্তু বাড়িটা এত ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন? মনে হচ্ছে যেন কেউ নেই।”
ঋতু উত্তর দিল,
“আসলে বড় ভাবির বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন। প্রেসার ফল করেছিল। তাই ভাবি, আম্মু আর তামজীদ ওনাকে দেখতে গেছেন। আজ আর ফিরবেন না, কাল সকালে আসবেন। আর বড় ভাইয়া আর বাবা ব্যবসার কাজে চট্টগ্রাম শহরে গেছেন।
একটু থেমে ঋতু আবার বলল,
“ভাইয়া আর ভাবি সম্ভবত রান্নাঘরে আছে। আমি ডেকে আনছি। আর সুপ্তি…”
এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ঋতুর কথা শুনছিল সোহেল। কিন্তু ‘সুপ্তি’ নামটা কানে আসতেই সে খানিকটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“সুপ্তি আবার কে?”
ঋতু হেসে ফেলল।
“তুমি এত বছর ধরে আমাদের বাসায় আসছ, আর সুপ্তিকে চেনো না?”
“না, আশ্চর্যের ব্যাপার হলেও সত্যি, চিনি না। তাছাড়া আমরা তো অনেক আগেই এই বাসায় বেশি আসতাম। প্রণয় বিদেশে চলে যাওয়ার পর সেভাবে আর আসা হয়নি।”
“ও আচ্ছা। সুপ্তি আমার খালাতো বোন। পড়াশোনার জন্য এখন আমাদের সঙ্গেই থাকে।”
কথাটা শুনে সোহেল আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাই নাকি? তো কোথায় তোর সেই খালাতো বোন?”
ঋতু হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সুপ্তি পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকে। এখন ওর ঘরে আছে। কাল ওদের ইউনিভার্সিটিতে একটা প্রেজেন্টেশন আছে। সেটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই আমি আর ওকে বিরক্ত করতে চাইনি।”
সোহেল কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে যেন কিছু একটা ভেবে নিল। তারপর হঠাৎ বলল,
“ও নিশ্চয়ই চশমা পরে?”
ঋতু বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“ভাইয়া, তুমি কীভাবে বুঝলে? সত্যিই ও চশমা পরে। তবে সবসময় না, প্রয়োজন হলে পরে।”
সোহেল হেসে মাথা নাড়ল।
“আরে, এটা বুঝতে বিশেষ কিছু লাগে নাকি? তুই তো বললি মেয়েটা সারাক্ষণ পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। একেবারে বইপোকা টাইপ। আর বইপোকাদের সঙ্গে চশমার একটা বন্ধুত্ব থাকে। আজ না হয় কাল, চশমা তাদের নাকের ডগায় ঠিকই জায়গা করে নেয়।”
সোহেলের কথা শুনে ঋতু হেসে উঠল। প্রণয় গায়ের অ্যাপ্রোনটা খুলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই সোহেল উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাহ প্রণয়! তুই তো দেখছি বেশ ভালো ছেলের মতো নিজের বউকে সাহায্য করছিস।”
প্রণয় হালকা হেসে বলল,
“তেমন কিছু না। সবকিছু তোর ভাবিই করেছে, আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আর বাকিরা কোথায়? তুই একা কেন?”
“আরে আসবে, আসবে। সবাই আসছে।”
প্রণয় আর সোহেল কথা বলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘরের দিক থেকে সূচনার কিঞ্চিৎ আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। কণ্ঠে ভয়ের আভাস পেয়ে এক মুহূর্তও দেরি করল না প্রণয়। সে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল। ঋতুও যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। বাধ্য হয়ে তাকে দরজা খুলতে যেতে হলো। দরজা খুলতেই ঋতু খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কারণ সে মুখের সামনে বিশাল এক ফুলের তোড়া ধরে রেখেছে। এক মুহূর্তের জন্য ঋতুর মনে হলো, হয়তো তার ভাইয়ের কোনো বন্ধু এসেছে এবং উপহার হিসেবে ফুল নিয়ে এসেছে। এদিকে দরজা খোলার শব্দ পেয়ে রাফি ধীরে ধীরে ফুলের তোড়াটা মুখের সামনে থেকে সরাল। আর তারপরই দু’জনের চোখাচোখি হলো। পরমুহূর্তেই দু’জনেই বিস্ময়ে চমকে উঠল। রাফিকে দেখেই ঋতুর সেই রাস্তার ঘটনা মনে পড়ে গেল কীভাবে ছেলেটা তাকে রাস্তায় হেনস্তা করেছিল। মুহূর্তেই তার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আপনি তো সেই অসভ্য লোকটা! আমার বাড়িতে কী করতে এসেছেন?”
ঋতুকে দেখে এবং তার কথা শুনে রাফির ভীষণ বিরক্ত লাগল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে সূচনার পাঠানো মেসেজটা আরেকবার দেখল। সূচনা ফোনে কথা বলার সময়ই তাকে হোয়াটসঅ্যাপে বাড়ির লোকেশন পাঠিয়েছিল। লোকেশন তো ঠিকই আছে। তাহলে এই উটকো ঝামেলাটা এখানে কী করছে?ৎঋতুর কথার কোনো উত্তর দিল না রাফি। যেন এই মেয়েটার অস্তিত্বই তার কাছে গুরুত্বহীন। রাফির এই উপেক্ষা দেখে ঋতুর রাগ আরও বেড়ে গেল। তাই তাচ্ছিল্যভাবে বলল,
“আমি তো বুঝতেই পারছি না, আমার ভাই কোন সেন্সে আপনার মতো একটা ফালতু মানুষকে নিজের বন্ধু বানিয়েছে!”
ঋতুর ধারণা ছিল আজ তার ভাইয়ের বন্ধুরা আসবে। আর এই লোকটাকে সে আগে কখনো দেখেনি তাদের বাড়িতে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিল সে প্রণয়ের বন্ধু। রাফি ফোনটা পকেটে রেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কে কার বন্ধু?”
“কেন? আপনি নিশ্চয়ই প্রণয় ভাইয়ার বন্ধু। না হলে এ বাড়িতে এসেছেন কেন?”
প্রণয়ের নাম শুনে রাফির মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। তার মানে এই মেয়েটা প্রণয়ের বোন! রাফি তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“কী? আমি আর প্রণয়ের বন্ধু? জীবনে মরে যাব, তবুও তোমার ভাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব না! ওকে দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে। বন্ধু তো অনেক দূরের কথা! আমার জীবনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর মানুষদের একজন ওই প্রণয়। শত্রুকেও আমি এতটা অপছন্দ করি না, যতটা তাকে করি। আই জাস্ট হেট হিম।”
ঋতু মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেল। লোকটা যদি তার ভাইয়ের বন্ধু না হয়, তাহলে এখানে এসেছে কেন? আর তার সামনেই কীভাবে তার ভাইকে অপমান করছে? প্রথমে রাস্তায় তাকে অপমান করেছে, আর এখন তার বাড়িতে এসে তার ভাইকে অপমান করছে! রাফি তখনও দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, আর ঋতু দাঁড়িয়ে ছিল দরজার ওপাশে। ইতিমধ্যে রাফির কথা শুনে ঋতুর রাগ সপ্তম আকাশে পৌঁছে গেছে। সে দ্রুত দরজা বন্ধ করার জন্য হ্যান্ডেলে হাত রাখল। কিন্তু এক পা এগোতেই বিপত্তি ঘটল। টাইলসের ওপর জুতোর তলা পিছলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল সে।ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল ঋতু। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে অনুভব করল, কেউ একজন তাকে ধরে ফেলেছে। ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই দেখতে পেল রাফি তাকে ধরে আছে।
তাই সে নিচে পড়ে যায়নি। কিন্তু নিজের কোমরে রাফির হাত দেখতে পেয়েই তার রাগ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। অন্যদিকে, ঋতুকে হঠাৎ পড়ে যেতে দেখে রাফিও আর কিছু ভাবেনি। হাতে থাকা ফুলের তোড়া মাটিতে ফেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ফেলেছিল। কিন্তু ঋতুর চোখে সেসব কিছুই পড়ল না। শুধু দেখল, রাফির হাত তার কোমরে। মুহূর্তেই ঋতু ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠল,
“আপনি একটা অসভ্য! আমাকে স্পর্শ করেছেন কেন?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রাফি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো হাত সরিয়ে নিল। ঋতুকে ছেড়ে দিতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। হঠাৎ ভর হারিয়ে ঋতু পড়ে গেল। কোমরেও বেশ ভালোই লেগেছে।
আহত ও ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে সে রাফির দিকে তাকাল।
রাফিও সমান কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার মতো মেয়েকে স্পর্শ করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই।”
প্রণয় খুব যত্ন করে সূচনার আঙুলে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছিল। সালাদ বানানোর জন্য শসা কাটতে গিয়ে অসাবধানতাবশত চাকুর ধার লেগে সূচনার আঙুল কেটে গেছে। ব্যথায় ওর মুখ থেকে চাপা একটা শব্দ বেরিয়ে আসতেই প্রণয় তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছিল। ব্যান্ডেজ করতে করতে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সূচনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খানিকটা শাসনের সুরে বলল,
“তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? কখনো ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাও, আর এখন আবার হাত কেটে বসলে! এক মুহূর্তের জন্য পাশে ছিলাম না, আর এর মধ্যেই এই কাণ্ড করে ফেললে।”
সূচনা সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টে বলল,
“এটা কি আমি ইচ্ছে করে করেছি নাকি এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে।”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ, সবকিছুই তো তোমার এক্সিডেন্টলি হয়। কখনো কখনো আমার মনে হয়, আমার মা একটা বাচ্চা মেয়ের সাথেই আমার বিয়ে দিয়েছে। এখন এই বাচ্চা মেয়েটাকে আমারই পেলে-পুষে বড় করতে হবে।”
“আরে ধুর! আপনি যে কী বলেন না! আমার বয়স এখন আঠারো বছর। আমি আবার বাচ্চা হলাম কিভাবে? আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি।”
সূচনার কথায় প্রণয়ের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো করে সূচনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, তাহলে আমি তোমার বড় হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।”
প্রণয়ের কথা শুনে সূচনা বিরক্ত মুখে বলল,
“আপনি আসলেই খুব বিরক্তিকর। আমি কী বলি, তার আগামাথা কিছুই বোঝেন না।”
রাফি স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল,
“তুমি পড়ে যাচ্ছিলে বলেই মানুষ হিসেবে ধরেছিলাম। কিন্তু আমার বোঝা উচিত ছিল…
তুমি প্রণয়ের বোন। তোমার প্রতি মায়া দেখানোই উচিত না। ”
ঋতু ব্যথায় মুখ কুঁচকে আহত কণ্ঠে বলে উঠল,
“ইস! আমার কোমরটা একদম ভেঙে গেছে।”
ঋতুর কথা শুনে রাফি কোনো সহানুভূতি দেখানোর বদলে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“বেশ হয়েছে তোমার কোমর ভেঙেছে। তুমি সব সময় ফটর ফটর করো। আমার প্রথমেই তোমাকে ধরা ভুল হয়েছে। প্রথমেই তোমার কোমর ভাঙা উচিত ছিল। এটা তোমার শাস্তি। তোমার মতো মেয়ের সাথে একদম ঠিক হয়েছে।”
রাফির কথা শুনে ঋতুর মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। এই লোকটাকে সে আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে এক্ষুনি লোকটাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। একটা মেয়ের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, সেই ন্যূনতম ভদ্রতাটুকুও এই লোকটার জানা নেই। ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঋতু বলল,
“অসভ্য! তুই একটা জঙ্গল!”
রাফি এই মেয়েটাকে দেখেই বুঝেছিল, বয়সে সে অনেক ছোট। তবুও সে শুরু থেকেই তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলেছে। এমনকি প্রণয়ের বোন জেনেও যথেষ্ট ভদ্রতা বজায় রেখেছিল। একটু আগেই বিপদ থেকে বাঁচিয়েও ছিল তাকে। অথচ এই মেয়ে তার ভালো ব্যবহার বা ভদ্রতার কোনো কিছুরই মূল্য দিল না। উল্টো এখন তাকে তুই-তোকারি করছে, আবার জঙ্গলও বলছে! রাফির রাগ এবার মাথায় চড়ে বসল। সে ভ্রু কুঁচকে ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি যদি জঙ্গল হই, তাহলে আমি সাধারণ জঙ্গল। কিন্তু তুই আর তোর ভাই? তোরা তো একেবারে অ্যামাজন জঙ্গল!”
রাফির কথা শুনে ঋতু কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আরও রেগে গেল। তাকে এবং তার ভাইকে অ্যামাজন জঙ্গল বলছে
এদিকে সোহেল সোফায় আধশোয়া হয়ে ফেসবুক স্ক্রল করছিল। কিছুক্ষণ আগে ঋতু দরজা খুলতে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল হয়তো তার বন্ধুরাই এসেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতক্ষণ হয়ে গেল তবুও কেউ ভেতরে ঢুকল না। বিষয়টা খটকা লাগতেই সোহেল ফোনটা পাশে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে সে যা দেখল, তাতে তার আত্মা প্রায় শরীর ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ঋতু দুই হাতে এক অচেনা ছেলের চুল এমনভাবে ধরে আছে যেন আরেকটু হলেই গোটা মাথাটাই খুলে ফেলবে। আর ছেলেটাও কম যায় না। সেও ঋতুর চুলের একগোছা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে আছে।
দৃশ্যটা দেখে সোহেলের চোয়াল ঝুলে পড়ল।
ঠিক তখনই সে শুনতে পেল ছেলেটি দাঁতে দাঁত চেপে বলছে,
“খবরদার! আমার একদম পছন্দ না কেউ আমার চুল ধরুক। তাড়াতাড়ি আমার চুল ছাড়!”
ঋতুও সমান তেজে জবাব দিল,
“না, ছাড়ব না! তোর সাহস কত বড়! তুই আমাকে আর আমার ভাইকে অ্যামাজন জঙ্গল বলিস!”
ব্যাস! রাফির মাথাও গরম হয়ে গেল। সে ঋতুর চুলে নিজের মুঠোটা আরও শক্ত করে বলল,
“ঠিকই বলেছি! তুই আর তোর ভাই দুজনেই অ্যামাজন জঙ্গল!”
“তুই এত বড় শয়তান তুই জীবনেও বউ পাবি না!”
“আমি যদি বউ না পাই, তাহলে তুইও বর পাবি না!”
“তোর বউ তোর জীবন তেজপাতা বানিয়ে দিবে! সারাজীবন নাকানি-চুবানি খাওয়াবে!”
“আর তোর স্বামী তোর জীবন অতিষ্ঠ করে দিবে! সারাদিন কাজ করাবে! আমি শেষবারের মতো বলছি, আমার চুল ছেড়ে দে!”
“আগে তুই আমার চুল ছাড়! তারপর সরি বল!”
কথাটা বলেই ঋতু আবারও রাফির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাফি এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেল। মেয়ে মানুষ বলে সে ঠিকমতো শক্তি প্রয়োগও করতে পারছে না। অথচ এই ছোটখাটো মেয়েটার গায়ে মনে হচ্ছে হাতির জোর! রাফি একবার ডানে সরায়, ঋতু আবার সামনে আসে। একবার পেছনে সরে, ঋতু আবার চুলে টান দেয়। শেষ পর্যন্ত ধৈর্য হারিয়ে রাফি ঋতুর চুল ছেড়ে দিল। তারপর এক হাতে তার কাঁধ চেপে ধরে আরেক হাত কোমরে রেখে তাকে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়ালের সাথে আটকে দিল। আর অতিরিক্ত ক্রোধ নিয়ে বলল,
“এতটুকু একটা লিলিপুট! তোর গায়ে এত শক্তি আসে কোথা থেকে?”
ঋতু ছটফট করতে করতে বলল,
“তুই এখনও আমার আসল রূপ দেখিসই নাই! ছাড় আমাকে, শয়তান!”
এদিকে এতক্ষণ ধরে পুরো ঘটনা দেখে সোহেলের অবস্থা প্রায় কোমায় যাওয়ার মতো। হঠাৎ ঋতুর পিঠ দেয়ালে লেগে “ধপ” শব্দ হতেই সে বাস্তবে ফিরে এল।
তারপর বুক চাপড়ে হতাশা নিয়ে বলে উঠল,
“আরে ঋতু! তুই কি করছিস? এই চুনোপুঁটির সাথে পারছিস না? এই জন্যই কি প্রণয় তোকে ক্যারাটে ক্লাসে ভর্তি করিয়েছিল?”
ঋতু আর রাফি দুজনেই একসাথে তার দিকে তাকালো। কিন্তু সোহেল থামল না। সে আবার বলল,
“ছিঃ ছিঃ ছিঃ! মানছি এতদিন প্র্যাকটিস করিস নি! তাই বলে একটা ছেলের সাথে জিততেও পারছিস না! দুঃখে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে!”
তারপর রাফির দিকে আঙুল তুলে বলল,
“আর তুই ভাই! একটা মেয়ে মানুষের সাথে এরকম ঝগড়া-মারামারি করছিস? ঠিক ছোট বাচ্চাদের মত। তোর লজ্জা করে না?”
সোহেলের কথা শুনে এবার রাফি আর ঋতু দুজনেই হতভম্ব হয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা এখনও কেউ কাউকে ছাড়েনি। এদিকে সোহেলের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে সুপ্তিও হাতে নোটবুক নিয়েই নিচে নেমে এলো। কিছুক্ষণ আগে পানি নিতে এসেছিল সে ড্রয়িং রুমে । কারণ ভার্সিটির প্রেজেন্টেশনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। তাই আবার পড়তে বসেছিল। নিজেকে স্বাভাবিক করে। কিন্তু সোহেলের এত জোরে চেঁচামেচি শুনে আর স্থির থাকতে পারেনি।
সামনে এগিয়ে এসে দৃশ্যটা দেখে একদম থমকে গেল সুপ্তি। ঋতু আর রাফি যেন দুইজন জন্মশত্রু!
ঠিক তখনই প্রণয় আর সূচনাও চলে এলো।সামনের দৃশ্যটা দেখে দুজনেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। রাফি এক হাতে ঋতুর চুল ধরে আছে। আর ঋতু দুই হাতে রাফির চুল এমনভাবে চেপে ধরে আছে যেন ছাড়ার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।
প্রণয়ের নব্য সূচনা পর্ব ২১
নিজের বোনের এমন অবস্থা দেখে প্রনয়ের প্রচণ্ড রাগ হল। ধীরে ধীরে ভ্রু কুঁচকাল। বিস্ময়, অবিশ্বাস আর ক্রমশ জমতে থাকা রাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল। অবশেষে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে বলে উঠল,
“হোয়াট দা হেল! এসব কী হচ্ছে?”
